অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল (রাজেন্দ্র মালিক)-এর সাক্ষাৎকার

দুআ করবেন আল্লাহ তাআলা যেন ঈমানের ওপর আমৃত্যু অটল রাখেন এবং দুনিয়ার প্রতিটি কোনে কুরআন পৌঁছানোর এরাদা পূর্ণ করে দেন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: উকিল সাহেব! ফুলাত থেকে প্রকাশিত উর্দু ম্যাগাজিন আরমুগানের দস্তরখানে পাঠক ও আরমুগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ হতে আপনাকে হৃদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানাচ্ছি। অনুরোধ করছি, আরমুগানের পাঠকদের নিকট আপনার পারিবারিক পরিচয় তুলে ধরুন।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: আমি হরিয়ানার কর্নাল জেলার এক জাট পরিবারের এক অতি সাধারণ মানুষ। পিতাজী আমার নাম রেখেছিলেন রাজেন্দ্র মালিক। ২২ শে ফেব্র“য়ারী ১৯৪৭ সালে আমার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলেই লাভ করি। তারপর হরিয়ানা বোর্ড থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করি। রোহিতক ইউনির্ভাসিটি থেকে এল.এল.বি করি। তার পর পানিপথ কোটে ওকালতি শুরু করি। পরবর্তীতে ইউনির্ভাসিটি থেকেই খ.খ.গ করি। দশ বছর পূর্বে কাইথল জেলার এক জমিদার পরিবারে বিবাহ করেছি। আমার স্ত্রীও এল.এল.বি পাশ। মালিক আমাকে দুটি সন্তানের পিতা বানিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: গ্রামে নরেশ নামে আমার এক বাল্যবন্ধু ছিল। গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত দুজনে একই ক্লাশে পড়াশোনা করেছি। তারপর সে এম.বি.এ করতে থাকে আর আমি এল.এল.বিতে ভর্তি হই। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল অনেক গভীর। পানিপথের এক পন্ডিত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। উভয়ে পরস্পরে ‘দিউয়ানা’ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবার তাদের বিয়েতে সম্মত হয় না। দিল্লীতে এক মুসলিম উকীলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে তাদের ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ করার পরামর্শ দেয়। তারা দুজন মুসলমান হয়ে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কেউ এভাবে মুসলমান বানিয়ে বিবাহ পড়াতে রাজি হয়নি। নরেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। আমি তার পাগল হয়ে যাওয়ার আশংকা করি। এজন্য আমি দু’জন উকীলসহ তাদের নিয়ে দিল্লীর জামে মসজিদে যাই। ইমাম সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত হয়। তিনি বলেন, আমরা তাদের মুসলমান বানাবো কিন্তু শর্ত হল, এলাকার দুজন দায়িত্বশীল মুসলমানকে নিয়ে আসুন যারা এদের দু’জনকে জানে। আমি বলি, দুজনের পরিবর্তে আমরা তিনজন উকীল সাক্ষী হচ্ছি। তিনি বলেন, না দুজন মুসলমানকেই নিয়ে আসুন।

আমরা পানিপথ ফিরে যাই। কয়েকদিনের প্রচেষ্টায় দুজন লোককে যাগাড় করে দিল্লী পেঁছি। ইমাম সাহেব তাদের দু’জনকে কালিমা পড়ালেন। ছেলের নাম রাখেন নরেশ আবদুল্লাহ আর মেয়ের নাম মারয়াম ফাতিমা। এবার আমরা তাকে দুজনের বিবাহ পড়িয়ে দিতে বলি। তিনি অস্বীকার করে বলেন, বিবাহ কাযীদের দিয়েই পড়াবেন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই বিবাহ। আমরা নিরাশ হয়ে ফিরে আসি। দিল্লীতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাযী খুঁজতে থাকি কিন্তু পাওয়া গেল না। পানিপথ এসেও কয়েক মসজিদে যাই কিন্তু কেউ তাদের বিবাহ পড়াতে রাজী হয়নি। ইতোমধ্যে কেরানার এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত হয়। আমি তাকে নরেশের অবস্থা খুলে বলি। তিনি বলেন, আপনি ওদের নিয়ে কেরানায় চলে আসুন। আমাদের ওখানকার ইমাম সাহেব ওদের বিবাহ পড়িয়ে দেবেন।

১৫ ই জানুয়ারী আমরা তিন উকীল ওদের দুজনকে নিয়ে কেরানা পৌঁছি। ইমাম সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত হলে তিনি বলেন, আপনারা ফুলাত চলে যান সেখানেই এর সমাধান হয়ে যাবে। আমরা বলি, জনাব, অনেক জায়গায় ধাক্কা খেয়ে খেয়ে এখানে এসেছি। আপনি সঙ্গে চলুন। ফুলাত কেন কলকাতায় যেতেও রাজী আছি। তিনি আমাদের সঙ্গে যেতে রাজী হলেন। আমরা ফুলাত পৌঁছলাম। প্রচন্ড শীত পড়েছিল। ফুলাত এসে মাওলানা কালিম সাহেবের (আপনার পিতার) বাড়ি গেলাম। জানতে পেলাম, হযরত বাড়িতেই আছেন। ইমাম সাহেব বললেন, আপনাদের সৌভাগ্য হযরতকে পেয়ে গেছেন। নইলে অধিকাংশ সময়ই তিনি সফরে থাকেন। বহুলোক তাঁর সাক্ষাতপ্রার্থী ছিল। লোকজনের ভীড় লেগেছিল। অনেক কষ্টে সময় পাওয়া গেল। পৃথক একটি কক্ষে কথাবার্তা হল। ইমাম সাহেব বললেন, এরা দুজন মুসলমান হতে চায় এবং মুসলমান হয়ে বিবাহ করতে চায়। মাওলানা সাহেব বললেন, মুসলমান হওয়া এবং ঈমান কবুল করার প্রশ্নে প্রত্যেকেরই তাড়াতাড়ি করা চাই। আর প্রত্যেক মুসলমানেরই তার রক্তসম্পর্কীয় ভাই বোনদের চিরস্থায়ী নরকযন্ত্রণা থেকে রক্ষা করার জন্য মুসলমান বানানোর এবং কুফর-শিরক থেকে তওবা করানোর চেষ্টা করা উচিত। এজন্য আপনার উচিত ছিল কেরানাতেই তাদের কালিমা পড়িয়ে দেয়া। আর বিবাহের ব্যাপারটি তো উকীলদের মাধ্যমেই হতে পারে। ভালো হবে যদি বাড়ি গিয়ে মাতা-পিতাকে রাজী করানো যায়। মাতা-পিতা সন্তানকে অত্যন্ত মহব্ববত করেন। তাদের সঙ্গে বিদ্রোহের পথ অবলম্বনের পরিবর্তে তাদের খোশামুদ করা হলে তারা সন্তানের সুখের জন্য সমাজবিরুদ্ধ ব্যাপারেও রাজি হয়ে যান।

আমার পরামর্শ হল, আপনারা বাড়ি চলে যান। বরং আমার সবিনয় অনুরোধ, আপনারা এদের বাড়ি নিয়ে গিয়ে এদের পিতা-মাতাকে রাজী করিয়ে বিবাহের ব্যবস্থা করুন। এভাবেই তাদের বিবাহের ব্যবস্থা হতে পারে। আমি বললাম, তারা রাজি নয়। অনেক চেষ্টা করে দেখা হয়েছে। তারা কিছুতেই রাজী হবে না। হযরত বললেন, তাহলে তো বিবাহটা আদালতেই হওয়া দরকার। আমরা এ জাতীয় চক্করে পড়তে চাই না।

অবৈধ সম্পর্ককে আল্লাহ তাআলার আইন মোতাবেক বৈধ করার জন্য আমরা যদি তাদের বিবাহ করিয়েও দিই সেক্ষেত্রে আমাদের কাছে তো কোনো কাগজপত্র থাকে না। যারা বিবাহ পড়ায় কাগজপত্র তারাই দিতে পারে। আমরা বললাম, আপনি তাদের মুসলমান করে বিবাহ পড়িয়ে দিন। যখন এরা মুসলমান হয়ে যাবে তখন তো আপনাকেই এ কাজটি করে দিতে হবে। যেমন এরা হিন্দু হলে মন্দিরে গিয়ে ধর্ণা দিতো আর পুরোহিত ঠাকুর তার ব্যবস্থা করে দিতো। হযরত সাহেব বললেন, ঠিক আছে আমি এদের কালিমা পড়িয়ে দিচ্ছি। আপনারা মিরাঠ চলে যান। সেখানে উকীল আছে। তারা কাউকে দিয়ে বিবাহ পড়িয়ে কাগজপত্র করে দিবেন।

আমরা বললাম, আপনি মুসলমান করে বিবাহ পড়িয়ে দিন। আইনী কাগজপত্র আমরা নিজেরাই করে দেবো। আমরা তিনজনই উকীল। মাওলানা সাহেব বললেন, আসলে আপনাদের তো নিকাহনামাও প্রয়োজন পড়বে। আমি তাদের কালিমা পড়িয়ে দিই। আমাদের এখানে হাফেজ আবদুল্লাহ সাহেব আছেন তিনি এলাকায় বিবাহ পড়ান। আপনারা তার ওখানে গিয়ে বিবাহ পড়িয়ে নিন। তিনি নিকাহনামাও বানিয়ে দিবেন। আপনারা সেটাকে আদালতে রেজিস্ট্রি করে নিবেন। আমি বললাম, ঠিক আছে আপনি কালিমা পড়িয়ে দিন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি বলছিলেন তারা দিল্লী জামে মসজিদেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল…
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: মৌলভী আহমদ আহেব! আমার ভয় হচ্ছিল, ইমাম সাহেব এদের বিবাহ পড়াননি একথা জানতে পেলে তিনি না ভেবে বসেন “ডাল মে কুছ কালা হ্যায়” এজন্য ব্যাপারটা চেপে গেছি।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হল বলুন?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: মাওলানা সাহেবের তাড়া ছিল। দ্রুত তিনি তাদের দুজনকে সামনে বসিয়ে এবং আমাদের তিন উকীলকেও লক্ষ্য করে বললেন, আপনারাও শুনুন, মানুষ যে দেশে বসবাস করে সে দেশের বিচারক ও কর্তাকে না মানলে বিদ্রোহী সাব্যস্ত হয়। বিদ্রোহীকে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব দেয়া হয় না। রাষ্ট্রের কোনো সুবিধা লাভ করার তার অধিকার থাকে না। ধরা পড়লে তার শাস্তি আজীবন জেল অথবা ফাঁসির রজ্জু।

এই গোটা সৃষ্টিজগতের মালিক ও হাকিম একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তার ফাইনাল ও আপটুডেট বর্তমান সংবিধান কনস্টিটিউশন কুরআন মাজীদ। বেদও মালিকের পক্ষ থেকে প্রেরিত আইন ছিল। সেটা ছিল সংবিধানের প্রথম সংস্করণ ও আদিগ্রন্থ। ফাইনাল পরিপূর্ণ সংস্করণ হল কুরআন। এখন যে ব্যক্তি আল্লাহকে মানবে না, তাকে একক মানবে না তার ফাইনাল আইন কুরআন মানবে না সে বিদ্রোহী, গাদ্দার বিবেচিত হবে। আল্লাহর জমীনে তার বসবাস করা, এখানের আলো-বাতাস ভোগ করার তার অধিকার নেই। এজন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হলে অথবা কোনো পদাধিকার গ্রহণ করতে হলে তাকে সংবিধানের ওপর শপথ গ্রহণ করানো হয়। আল্লাহর সৃষ্টিজগতে বসবাসের অধিকার পেতে হলে তার ফাইনাল সংবিধান কুরআন মুতাবেক জীবন-যাপনের শপথ নিতে হবে। এটাকেই বলে কালিমা পড়ানো। একেই বলে ঈমান গ্রহণ করা। মৃত্যুর চেকপোস্টে ইমিগ্রেশন স্টাফ আল্লাহর ফেরেশতারা এটা চেকিং করে দেখবেন। ঈমান না থাকলে চিরস্থায়ী নরকে নিক্ষেপ করবে। এজন্য সত্যমনে মালিককে হাজির নাজির জেনে দু’লাইন আরবী কালিমা পড়–ন। ভাবুন, আমি মুসলমান হওয়ার জন্য এবং কুরআন অনুযায়ী জীবন-যাপন করার জন্য শপথ গ্রহণ করছি। হযরত বললেন, আসুন আমরা সবাই কালিমা পড়ে নিই। আমাদের লক্ষ করে বললেন, উকীল সাহেব! আপনারা আইনবিদ, এদের দু’জনের চেয়ে বরং আপনাদের শপথগ্রহণ বেশী জরুরী।
মাওলানা সাহেব আমাদের তিনজনকেও কালিমা পড়ালেন। তারপর হিন্দিতে কিছুটা ব্যাখ্যা করে এর মর্মও বলে দিলেন। তারপর বললেন, এখন আপনারা হাফেজ আবদুল্লাহ সাহেবের ওখানে চলে যান। তাকে দিয়ে বিবাহ পড়িয়ে নিন। তবে একটি কথা স্মরণ রাখুন। এমনিতে যে ব্যক্তি ঈমান গ্রহণ করে না সে কুকুরেরও অধম। কেননা কুকুরও ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তার মালিকের কাছে পড়ে থাকে, দুয়ার ছাড়ে না তাহলে মানুষ যদি দ্বারে দ্বারে ঘুরে মরে সে তো কুকুরেরও অধম হল। কিন্তু ঈমানের প্রকৃত প্রয়োজন হবে মৃত্যুর সময়। কাজেই এই শপথের ওপর আমৃত্যু অটল থাকা চাই। সেই ঈমানই ধর্তব্য হবে যেটা অন্তর্যামী মালিক কবুল করবেন। এজন্য শপথটা সাচ্চা দিলে অন্তরাত্মা থেকে হওয়া চাই।

হযরত মাওলানা সাহেব আমাদের পাঁচজনকেই তাঁর কিতাব ‘আপকি আমানত, আপকি সেবা মে’ আনিয়ে দিলেন। মাস্টার আকরাম সাহেবকে ডেকে আমাদের ভালো করে গরম চা আর নাস্তা করাতে বললেন। আরেক ব্যক্তিকে আমাদের হাফেজ আবদুল্লাহ সাহেবের ওখানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিলেন। তারপর তাঁর দৌহিত্র মাওলানা মুহাম্মদ উমর সাহেবকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি আমাদের ইসলাম ও ঈমান সম্বন্ধে বোঝালেন। চা নাস্তা শেষ হলে আমরা হাফেজ আবদুল্লাহ সাহেবের ওখানে গেলাম। তিনি বিবাহ পড়াতে অস্বীকার করে বললেন, প্রথমে আপনারা ইসলাম গ্রহণের এফিডেভিট বানান, তার একটা কপি আমার কাছেও থাকা দরকার। আমি বললাম, আমাদের কাছে ইমাম বুখারীর সার্টিফিকেট আছে। হাফেজ সাহেব হযরতজীকে ফোন করলেন। হযরত বললেন, ঐ সার্টিফিকেটের এক কপি নিয়ে বিবাহ পড়িয়ে দাও।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি তখন সত্যমনেই তাদের সঙ্গে কালিমা পড়েছিলেন?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: না, আসলে হযরত বিবাহ পড়াতে অস্বীকার করে দেন কিনা এই আশংকায় পড়ে নিয়েছিলাম। তবে মাওলানা সাহেব যে বিষয়গুলো বলেছিলেন তা মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। মন-ও বলছিল, কথা একেবারে ষোল আনাই সঠিক। হযরত এÑও বলেছিলেন, কুরআন সম্পর্কে ধারণা করা হয়, এটা মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ অথচ কুরআন মাজীদ হল মালিকের পক্ষ হতে প্রেরিত গোটা জগতবাসীর জন্য পরিপূর্ণ ও সর্বশেষ সম্বোধন।। এটা জানা ও মানা যেমনভাবে আবদুল্লাহ আর মুহাম্মদ উমরের জন্য জরুরী অনুরূপ নরেশ আর রাজেন্দ্রর জন্যও জরুরী।

আহমদ আওয়াহ: আব্বুকে আপনি আপনার নাম বলে দিয়েছিলেন?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: না, বলিনি। তিনি উদাহরণ হিসেবে নাম বলেছিলেন কিন্তু মনে হচ্ছিল তিনি শুধু আমাকেই বলছিলেন। হযরত একথাও বলেছিলেন, এটা ঠিক যে, মুসলমানদের দায়িত্ব ছিল তাদের রক্তসম্পর্কীয় অমুসলিম ভাই-বোনদের নিকট ইসলামের আহবান পৌঁছে দেয়া। আর এ ব্যাপারে অবহেলার কারণে তারা হাশরের ময়দানের পাকড়াও হবে কিন্তু আপনারও ‘আমাদের পৌছানো হয়নি’ বলে বাঁচতে পারবেন না। কারণ, পৃথিবীর সকল আইন অনুযায়ীই আইন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা সর্বাপেক্ষা বড় আইনী অপরাধ। আমার মনে হল, তিনি খাঁটি কথাই বলেছেন। আমি কুরআন পড়ার ইচ্ছা করলাম। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন আমার এক মুসলিম উকীল বন্ধুর কাছ থেকে কুরআন মাজীদ চাইলাম। তিনি বললেন, এনে দিবেন। কয়েকদিন তাগাদা দেয়ার পর তিনি হিন্দি অনুবাদ সম্বলিত একখানা ছোট সাইজের কুরআন এনে দিলেন। আমি পড়া আরম্ভ করলাম।
মাওলানা আহমদ! যেই আমি পড়া শুরু করলাম আমার ভেতরে কী যে এক আলোড়ন সৃষ্টি হল, বলার ভাষা নেই। মনে হল, সারা জীবন আমি আসলে কিছুই পড়িনি। গোটা জীবনটাই বরবাদ করে দিয়েছি। দুদিন পর্যন্ত কাছারীতেও গেলাম না। মুন্সীকে বলে দিলাম তারিখ পাল্টে দাও। অথচ বড় বড় মোকাদ্দমারও তারিখ চলছিল। কুরআন মাজীদ শেষ করে আবারও পড়া আরম্ভ করলাম। ‘আপকি আমানত’-ও খোঁজ করলাম। মালিকের দয়ায় পেয়ে গেলাম। পড়ে অনুমান করলাম, একেবারে মোটা মাথার লোকদের উদ্দেশ্যে হযরত সাহেব ভালোবাসার মধু দিয়ে কুরআন মাজীদের চিকিৎসাপত্রের সারাংশ পাঠককে পান করিয়েছেন। হযরতের সঙ্গে সাক্ষাত করতে ও সত্যিকারভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। কেরানার ইমাম সাহেবের কাছে গেলাম। ইমাম সাহেব হযরতকে ফোন করলেন, রিং হতেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয়া হল। কয়েকবারই এমন হল, ইমাম সাহেব বললেন, হযরত হয়তো সফরে গিয়েছেন। ফুলাত ফোন করে জানা গেল হযরত রাজস্থানের সফরে আছেন।
হতাশা অস্থিরতার এক পর্যায়ে হঠাৎ ইমাম সাহেবের ফোন বেজে উঠল। হযরত সাহেব তাকে ফোন করেছিলেন। ইমাম সাহেব হযরতকে একথা বলেÑ পানিপথ থেকে যে উকীল সাহেব আমাদের সঙ্গে এসেছিলেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান- আমাকে ফোন ধরিয়ে দিলেন। হযরত বললেন, আমি ব্যস্ত ছিলাম। বার বার কেটে দেয়া সত্ত্বেও ফোন করা হচ্ছিল। বিরক্ত হচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল, কোনো পেরেশানহাল দুঃখী ব্যক্তি তো নয়, যে সান্ত¡না পেতে চায়! হয়তো আমার কথায় সে সান্ত¡না লাভ করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাকে মাফ করুন- একারণেই আমি মন না চাইতেও কলব্যাক করলাম। বললাম, হযরত! বাস্তবিকই আমি দুঃখী মানুষ। সান্ত¡নাপ্রার্থী। আমি এল.এল.এম করেছি, এল.ডি করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু আপনি যে সংবিধান পড়ালেন তা আমার নিদ্রা উড়িয়ে দিয়েছে। কত বড় মোকাদ্দমা আমাকে সামলাতে হবে, কত বড় আদালতের সামনে আমাকে দাঁড়াতে হবে আমার বুঝে এসেছে। হযরত! আপনি তো আমাকে অসুস্থ করে দিলেন এখন চিকিৎসা কে করবে। হযরত বললেন, উকীল সাহেব! আপনি শুধু উকীল হিসেবে কুরআন পড়েছেন।
আমি বললাম, হযরত আমি অভিযোগী হিসেবে কুরআন পড়েছি। পড়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি আসলে অভিযোগী নই আমি তো অপরাধী। আর আমার জন্য নরকের শাস্তি নির্ধারণ করেছি। এই শাস্তি ইনসাফপূর্ণ, এটা সঠিক জাজমেন্ট। এখন আমাকে পরিত্রাণের উপায় বলে দিন। হযরত সাহেব বললেন, আসলে আপনি উকীল হেতু উকীল হিসেবে কিংবা অভিযোগের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআন পড়েছেন এবার আপনি এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআন পাঠ করুন যে, মায়ের চেয়ে সত্তরগুণ বেশী মমতাময় সৌন্দর্যসমূহকে আপন সৌন্দর্যের আধার থেকে সৌন্দর্যদানকারী, প্রিয়তম মালিকের ‘মহব্বতনামা’ পাঠ করছি। আমি বলি, আমি অবশ্যই পড়বো হাজার বার কুরআন পড়বো বরং জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পড়বো। কিন্তু আগে তো গর্ত থেকে উদ্ধার করবেন। বললেন, আপনি অন্তরাত্মা থেকে কালিমা পড়েন নি? বললাম, আমি তো নরেশের বিবাহ পড়ানোর জন্য কালিমা পড়েছিলাম। এখন সত্যমনে পড়তে চাই। হযরত ফোনেই আমাকে আবার কালিমা পড়িয়ে দিলেন। আমার নাম রাখলেন মুহাম্মদ ইকবাল। তারপর জানতে চাইলেন, ওদের দুজনের কী অবস্থা? বললাম, চন্ডিগড় হাইকোর্টে কাগজপত্র তৈরী করতে গিয়েছে। হযরত বললেন, এদেরও সাচ্চা মুসলমান বানানোর ফিকির করবেন। তাদের বাধ্য করবেন তারা যেন পরিবারের লোকজনের ওপর কাজ করে, তাদের ইসলামের দাওয়াত দেয়। হযরত আরও বললেন, আপনার দুই উকীল বন্ধুকেও কুরআন পড়াবেন। আমি বললাম, কুরআন অধ্যয়নের সময় তারাও আমার সঙ্গে ছিল।

আহমদ আওয়াহ: এটা কোনো সময়ের কথা?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: এটা গতকালের ঘটনা । হযরতের সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য মনটা বেচাইন হয়ে উঠল। দিল্লীর ঠিকানা জানা ছিল না। ফুলাত ফোন করেও নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। তবে জানতে পেলাম, তিনি রাজস্থান থেকে ফুলাত আসছেন। আর থাকতে পারলাম না। আজই ফুলাত চলে এসেছি। আকরাম ভাই জানালেন আজকে দিল্লী থাকলে খলীলুল্লাহ মসজিদে যোহর নামাজ পড়বেন। আপনি চেষ্টা করে দেখুন। আলহামদুলিল্লাহ যোহরের একটু আগেই পৌঁছে যাই। আমার আল্লাহ তখনই সাক্ষাত করিয়ে দিলেন। হযরত আমার বাকী দুই উকীল সঙ্গীকেও পুনরায় কালিমা পড়িয়েছেন। আমরা এখন তিনজন জীবন-মরণের সাথী। মালিকের কৃতজ্ঞতা, এই বন্ধুত্ব আমাদের খুব কাজে লেগেছে। হযরত বললেন, এই বন্ধুত্ব ঈমানের পর এখন মৃত্যুপরবর্তীর জন্যও পাকা হয়ে গেল। হযরত বললেন, আপনি আরমুগানের জন্য একটি সাক্ষাৎকার দিয়ে দিন। বলেও ছিলাম যে, মুসলমান হয়েছি একদিনও পুরো হয়নি আমি কী বলবো? কিন্তু হযরতকে যখন পীর মেনেছি কথাও তো শুনতেই হবে। এজন্যই আপনাকে এই দাস্তান শোনালাম।

আহমদ আওয়াহ: আগামীতে কী করার ইচ্ছা?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: আমার ইচ্ছা কুরআন মাজীদ কুরআনের বাণী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবো। আমি লক্ষ করেছি, লোকেরা কেমনভাবে অন্ধকার ছড়িয়ে দিচ্ছে। চৌরাস্তায় বড় বড় বোর্ড লগিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ দাওয়াই বিক্রি করছে। আর যেটা সত্য ও নির্ভুল পয়গাম লোকেরা তার খবরও জানে না। সত্য বলছি, কুরআন মাজীদ সম্পর্কে এতটুকুই জানতাম যে, কুরআন এমন এক কিতাব যার মধ্যে বিধর্মী কাফেরদের হত্যা করার ফাতওয়া দেয়া হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করে কেমন অনুভব করছেন?
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: মাওলানা সাহেব! কালকুঠরীতে আবদ্ধ বন্দীর গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হয়ে গেছে। হঠাৎ এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে গলা থেকে দড়ি খুলে তাকে মুক্তি দেয়া হলে তার যে অনুভূতি হবে- সত্য দিলে ইসলাম গ্রহণ করে গতকাল থেকে আমার সেই অনুভূতি হচ্ছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! আল্লাহ তাআলার এক নবী হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তূর নামক এক পর্বতে আগুনের সন্ধানে গিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা সেখানেই তাকে নবী বানিয়ে নিয়েছিলেন। তো আনতে গেলেন আগুন আর পেয়ে গেলেন নবুওয়াত- আপনার সঙ্গেও এমনটিই হয়েছে।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: আপনি যথার্থই বলেছেন। আসলে মানুষের উপকার করাকে মালিক অত্যন্ত পছন্দ করেন। নরেশের প্রতি আমার করুণা হয়েছিল। ভেবেছিলাম এভাবে পাগল হয়ে যাওয়া অথবা আত্মহত্যা করে মারা যাওয়ার চেয়ে বিবাহ হয়ে যাওয়াই ভালো। অধর্ম হয়। হোক জানটাতো বাঁচল! আমি করুণা ও সমবেদনা নিয়ে তাকে সঙ্গ দিয়েছি। দ্বারে দ্বারে ঘোরাফেরা করেছি। আমার মালিকের করুণা জাগল যে, আমার বান্দার ওপর সে করুণা করছেÑ হোক সে গুনাহগারÑ ব্যাস, আল্লাহ তাআলা আমার মতো কমীনাকে ঈমানের জন্য কবুল করে নিলেন।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে দু’-এক কথা।
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: দুআ করবেন আল্লাহ তাআলা যেন ঈমানের ওপর আমৃত্যু অটল রাখেন এবং দুনিয়ার প্রতিটি কোণে কুরআন পৌঁছানোর এরাদা পূর্ণ করে দেন।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! মুবারক হোক, মুবারক হোক। অনেক অনেক শোকরিয়া। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!


 

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ফেরুয়ারী ২০১০