আব্দুর রশিদ দুস্তোম (সুনিত কুমার)-এর সাক্ষাৎকার

আমার কাছে মনে হয়, আমদের যেসব ভাই কুফর এবং শিরকের মধ্যে পড়ে আছে তাদের কথা সকলেরই ভাবা উচিত। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত শ্রেণী, ক্ষুদ্র বলে যাদের অন্যরা দূরে সরিয়ে রেখেছে। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন আমাদের অঞ্চলে কাওড়ে শরীক হওয়ার প্রবণতা কী রকম বাড়ছে। এর আগে মাত্র তিন দিনের জন্য রাস্তা বন্ধ হতো। আর এখন রাস্তা বন্ধ থাকে প্রায় ১৫ দিন। সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে মানুষের কষ্ট বাড়ছে। শত শত মাইল গরমের মধ্যে পায়ে হেঁটে মানুষ আসছে। এটা আমাদের সাথে শত্র“তার উদ্দেশ্যে নয়। বরং এটা প্রমাণ করে ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। মালিককে সন্তষ্ট করার অনুভূতি শক্তিলাভ করেছে। আমরা যদি আমাদের জীবনের মূল মিশন হিসেবে দাওয়াতকে গ্রহণ করি এবং তাদের বুঝাতে সক্ষম হইÑ এটা মালিককে খুশি করার পথ নয় বরং নারাজ করার পথ। শিরকের দিকে এই পথচলা ধর্মকর্ম নয় বরং কেবলই পাপ। আমার ধারণা, তাহলে আবেগ ও উদ্দীপনা নিয়েই তারা হজ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। আসলে আমরা এখন রেওয়াজী মুসলমান। আমাদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ নেই। আমি হরযতকে বলেছি। এই সাত বছরে আমি ২২টি বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছি। তার মধ্যে কেবল পাঁচজনকে এমন পেয়েছি যাদের দাড়ি আছে। তাদের মধ্যে পরিপূর্ণ দাড়ি ছিল মাত্র দুই জনের। এই যখন ইসলাম এবং নবীর তরিকার সাথে আমাদের সম্পর্ক তখন আমরা অন্যদের কীভাবে দ্বীনের পথে ডাকবো? আমরাই তো আমাদের জীবনে ইসলামকে অনুসরণ করতে পছন্দ করি না। আমাদের নামাযের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলমানদের মধ্যে শতকরা দশজনও নামাযী নয়। যারা নামায পড়ে তাদের কাছে সকল কাজ সম্পাদনের পর দ্বিতীয় স্তরে আসে নামায।
আহমদ আওয়াহ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু?
আব্দুর রশিদ দুস্তোম : ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
প্রশ্ন : আপনার পরিচয় বলুন!
উত্তর : আমার নাম আব্দুর রশিদ দোস্তাম। আলহামদুলিল্লাহ! আমি একজন মুসলমান। এখন থেকে ছয় বছর আগে আমি মুসলমান হয়েছি। আমার পূর্বনাম ছিল সুনীত কুমার সুরিয়াউনসি। আমি হরিদুয়ারের নিকটবর্তী একটি গ্রামে হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। আমি সায়েন্স বায়ো সাইড এ গ্রাজুয়েশন করেছি।
প্রশ্ন : আপনার এ নাম কে রাখলো?
উত্তর : আসলে মাওলানা আসলাম কাযেমী আমার নাম রেখেছিলেন আব্দুর রশিদ। আমি কোর্টে সার্টিফিকেট বানাতে গেলাম। তখন আফগানিস্তানে আব্দুর রশিদ দোস্তাম পৃথিবীময় এক আলোচিত ব্যক্তি। উকিল সাহেব যখন আমার নাম জানতে চাইলেন আমি বললাম আব্দুর রশিদ। তিনি বললেন আব্দুর রশিদ দোস্তাম? আমি বললাম হ্যাঁ, আব্দুর রশিদ দোস্তাম। তাছাড়া দোস্তি মানে তো বন্ধু। বন্ধুত্ব তো ভালো বিষয়।
প্রশ্ন : কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন বলবে কী?
উত্তর : আমি গুরুকুলের ছাত্র ছিলাম। গুরুকুল ধার্মিক হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান। স্কুলের যে কোনো বিষয়েই আমি অংশগ্রহণ করতাম এবং আগে আগে থাকতাম। ছাত্র জীবনে আমি লেখাপড়া খেলাধুলা সবটাতে বেশ অগ্রসর ছিলাম। বিশেষ করে ব্রেক ড্যান্সে আমার দক্ষতা ছিল দেখার মতো। ব্রেক ড্যান্সে ভালো করার জন্য মানুষের শরীরের জোড়ায় একটা বিন্যাস থাকতে হয়। আল্লাহ তায়ালা জন্মগতভাবেই আমাকে সে রকম করে সৃষ্টি করেছিলেন। মুম্বাই থেকে কয়েকটি সংগঠন আমাকে নিতে এসেছে। তারা বলেছে, তুমি ব্রেক ড্যান্সে পৃথিবীব্যাপী সুনাম কুড়াতে পারবে। তোমার শরীরের প্রতিটি জোড়ায় ঘূর্ণনের বিশেষ দক্ষতা আছে। এমনটি সাধারণত দেখা যায় না।
আমাদের গ্রামে মন্দির মসজিদ পাশাপাশি। আমি ভাবলাম মন্দির মসজিদ দুটোই মালিকের পূজোর জায়গা। এ দুয়ের মাঝে আবার পার্থক্য কী? আমাদের গ্রামে চমৎকার স্বভাবের একজন মানুষ বারবার আমাকে নাচতে নিষেধ করতো। বলতো, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এতো সুন্দর শারীরিক অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তোমার এই সৌন্দর্যের হিসাবও নেবেন। সে সবসময় প্রার্থনা করতো আমি যেন হেদায়েত পাই। আমাকে মসজিদে যাওয়ার জন্য বলতো। আমি মসজিদে বাইরে দাঁড়িয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের দৃশ্য দেখতাম প্রতিদিন। অভিভূত হতাম। গরম-ঠান্ডা, ঝড়-বৃষ্টি সর্বাবস্থায় চমৎকার শৃঙ্খলা এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে এরা মালিকের পূজা করে। নামাযীদের এই দৃশ্য আমার খুব ভালো লাগতো। আমি যখন মন্দিরে যেতাম আমার ভেতরে তখন সে অনুভূতিটুকু পেতাম না। মনে হতো মন্দিরে একটা রেওয়াজ পালন হয় মাত্র। মাঝে মাঝে আক্ষেপ হতো। আহ! আমি যদি মুসলমান হতাম। তাহলে মসজিদে গিয়ে ওরকমভাবে নামায পড়তে পারতাম। মুহাম্মদ উমর ভাই একবার আমাকে দেওবন্দ নিয়ে গেলেন। সেখানে মুহাম্মদ আসলাম কাযেমীর কাছে আমরা আতর আনতে গেলাম। আমি তাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করলাম। তিনি একজন ভালো দাঈ। আমাকে খুব ভালো করে ইসলাম সম্পর্কে বুঝালেন। তাওহিদ, রেসালাত এবং আখেরাতের বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিলেন। আর বললেন, তুমি মুসলমান হয়ে যাও। মুসলমান হয়ে নামায পড়তে পারাই একজন মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সফলতা। আমি ইসলাম কবুল করে ফেললাম। দ্বিতীয় দিন তিনি আমাকে ফুলাতে মাওলানা কালিম সিদ্দীকির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। যাকে আমরা আব্বাজী বলি।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণ করার পর আপনার অনুভূতি কি হয়েছিল?
উত্তর : আমি আল্লাহ তায়ালার লক্ষ কোটি শুকরিয়া আদায় করছি। এর কথা যখন ভাবি তখন আমার শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। আমি যদি ইসলাম গ্রহণ না করতাম তাহলে আমার কী সর্বনাশ হতো! আমার প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ করুণা, তিনি আমাকে শিরকের অপবিত্রতা থেকে রক্ষা করেছেন। নইলে খেলাধূলা, নাচগানসহ প্রিয় কাজগুলোর সব সরঞ্জামই আমার হাতের নাগালে ছিল। রেডিওতে আমি সমবেত সঙ্গীত গেয়েছি। এখনও নজীবাবাদ রেডিও থেকে আমার গাওয়া দলীয় সংঙ্গীত প্রচারিত হয়। বহু দিন আগে রেডিওতে আমি একটি গান গেয়েছিলাম। গানটি ছিল এরকমÑ
আও মিলকর ইতিহাস রচায়ঁ …..
এসো মিলে রচি নতুন ইতিহাস ….
আমার প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহÑউমর ভাই, মাওলানা আসলাম মিলে আমাকে মাওলানা কালিম সিদ্দীকির কাছে পাঠিয়েছেন। আসল কথা কী, ফুলের স্বভাব হলো প্রস্ফুটিত হওয়া। কিন্তু যদি বৃষ্টি না হয়, গাছে পানি না দেয়া হয় তাহলে ফুল মরে যায়। প্রতিটি মানুষও স্বভাবগতভাবে মুসলমান। ইসলাম একটি স্বভাব ধর্ম। কিন্তু সেই স্বভাবজাত ধর্মকে ফুটিয়ে তোলার জন্য পরিবেশ ও দাওয়াতের পানি না পায় তাহলে ফোটার আগেই মরে যায়। আমি মহান আল্লাহর লাখ লাখ কৃতজ্ঞতা আদায় করি। তিনি আমাকে শুকিয়ে ঝরে পড়ার আগেই রক্ষা করছেন।
প্রশ্ন: ইসলম গ্রহণ করার পর আপনি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন কি?
উত্তর : সত্যিকথা কী, মানুষ যদি একমাত্র আল্লাহর সাথে বন্ধনকে দৃঢ়ভাবে গড়ে তোলে তাহলে সর্বাবস্থায় আল্লাহর তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ তার সাথে থাকে। কিন্তু মানুষ খুবই দুর্বল। মানুষ ভুলে যায় গাফেল হয়ে পড়ে। তাছাড়া আমার মধ্যে ধৈর্যশক্তি খুবই কম। মানুষের উচিত চিন্তা করা আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ কত বেশুমার! তাই ঈমান ও ইসলাম তো হবে কেবল আল্লাহর জন্য। তিনিই সকাল বেলা সূর্য উদিত করেন। যদি একজন মানুষ চিন্তা করে, যে সূর্যটা উঠেছে এটা আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য উদিত করেছেন এই দিনটি আল্লাহ তায়ালা কেবল আমার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এই রাত সৃষ্টি করেছেন আমার আরামের জন্য। আমার সামান্য সুখের জন্য এই শীতল বাতাস প্রবাহিত করেছেন। এভাবে মানুষ যদি ভাবে তাহলে আল্লাহ তায়ালার প্রতি তার ভালবাসা কত গভীরে গিয়ে পৌঁছবে? কিন্তু মানুষ খুবই দুর্বল। যখন সে এক পরিবেশ থেকে আরেক পরিবেশে যায় তখন তার জন্য নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে আমাদের এই সময়ে যখন সন্দেহ প্রবণতা একটা স্বাভাবিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আমি সবচে’ বেশি কষ্ট পেয়েছি আমার মুসলমান ভাইদের এই আচরণে যে, তারা আমাকে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করতে থাকে। তাদের প্রশ্ন থেকে এক রকমের সন্দেহ ঝরে পড়ে। তবুও আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া। আমাকে ভালোবাসেন এমন মানুষও কম পাইনি। বিশেষ করে আমাদের হযরত আমাকে ভালোবাসেন এবং জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন।
প্রশ্ন: আপনার মা-বাবা বেঁচে আছেন, তাদের সাথে আপনার কোনো রকম যোগাযোগ আছে? তাদের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন? এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ! আমার মা-বাবা জীবিত। কয়েক বছর আগে আব্বু আদেশ করেছিলেন তাদের সাথে সাক্ষাত করতে। বিশেষ করে তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করতে বলেছেন। আমি ফোনে মায়ের সাথে কথা বলেছি। আমার বোনের বিয়ে উপলক্ষে তিনি আমাকে ঘরে যেতে বলেছেন। তিনি বলেছেন এক বোনের বিয়েতে তিন ভাই থাকবে আর এক ভাই থাকবে না এতো এক মৃত উৎসব। এটা হয় না। আমি আমার বোনের শ্বশুরলায়ের লোকদের সাথে কথা বলেছি। তারাও অনুমতি দিয়েছে। বলেছে, সে যদি ধর্ম ভ্রষ্ট হয়ে থাকে, অর্ধম হয়ে গিয়ে থাকে তাতে আমাদের কী? আমি তখন আমার বোনের জন্য কিছু উপহার কিনলাম। বোনের বিয়ের উৎসবে অংশগ্রহণ করলাম। সকলেই খুশি হলো। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আমার ভাই এবং কয়েকজন আত্মীয় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে আমাকে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর জোর করে নাপিতের দোকানে ঢুকিয়ে দেয়। সোজা বলে দেয়, এর দাড়ি কামিয়ে দাও। আমি কেঁদে কেঁদে অনুনয় বিনয় করতে থাকি। ক্ষুর হাতে চেপে ধরি। আমি কাতর কণ্ঠে বলি, আমার গলা কেটে দাও কিন্তু আমার নবীর সুন্নাত কেটো না। নাপিতও বাঁধা দেয়। কিন্তু তারা জোর করে আমার দাড়ি কামিয়ে দেয়। আমি কোনো মতে জান নিয়ে সেখান থেকে পালাই। তারপর পথেপথে কেঁদে ফিরি। আয়না দেখা আমার একটা অভ্যাস। কিন্তু এ কথা মনে হলেই আমার কান্না পেতো।
আমার নবীর সুন্নাত বঞ্চিত মুখ আমি কীভাবে দেখবো? লজ্জায় আমি আর ফুলাতে আসিনি। এদিকে হযরত আমার সন্ধানে চারদিকে লোক পাঠান। এ-ও বলে পাঠান, লজ্জার কী আছে? তুমি দ্বীনের দাওয়াতের উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলে, তারা জোর করে তোমার দাড়ি কেটে দিয়েছে। এক একটি কাটা দাড়ির বিনিময়ে তুমি নেকি পাবে। এ ঘটনার পর আমি খোলামেলা আর বাড়িতে যাইনি। মাঝে মাঝে রাতের বেলা মায়ের সাথে দেখা করতে গেছি। আমার মা ইসলামের অনেকটা কাছে চলে এসেছেন। আমরা সবাই তার জন্য দুআও করছি। আমার বিশ্বাস সামনের বার যখন যাবো তখন তিনি অবশ্যই কালেমা পড়ে নেবেন। আমার মা সন্তানদের মধ্যে আমাকে সবচে’ বেশি ভালোবাসেন। তার ভালোবাসা এখন আরো বেড়েছে। আমার মায়ের পর বাবার জন্য কাজ করবো।
প্রশ্ন : শুনেছি আপনি দাওয়াতের একজন প্রাণোচ্ছল কর্মী। আপনার দাওয়াতী কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ইসলাম গ্রহণের পর আমি সামান্য দীনি শিক্ষা অর্জন করেছি। তারপর হযরত আমাকে কম্পিউটার কোর্স করিয়েছেন। আজকাল মেওয়ানায় ডিটিপি ওয়ার্ক করছি। তবে জীবনের মূল লক্ষ্য হলো দাওয়াত। হযরত আমাকে সফরে সঙ্গে নিয়ে যান। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে দ্বীনের বাণী পৌঁছে দেয়া আমাদের কর্তব্য। সবসময় বলি টেন্ডুলকার, সালমান খান তো আমাদের আইডল হতে পারে না। আমাদের আইডল হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তার জীবনই পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠতম নমুনা। আমাদের নবী মানুষের কাছে সত্তর বার পর্যন্ত যেতেন। নিজ হাতে শত্রুর পায়খানা-প্রসাব পর্যন্ত পরিষ্কার করতেন। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন। পাথরের আঘাত সহ্য করেছেন। আহত অবস্থায় আঙ্গুরের বাগানে গিয়ে উঠেছেন। তারপর সেখানে ‘ইয়া আরহামার রাহিমীন, ইয়া আরহামার রাহিমীন’ বলে কাতর প্রার্থনা করেছেন। যারা কষ্ট দিয়েছে যারা পাথর মেরেছে তাদের জন্য দুআ করেছেন। আমার দুঃখ হয় আমিও যদি একজন মানুষের কাছে সত্তরবার না হলেও অন্তত সাতবার যেতে পারতাম। আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে হলেও মালিকের দরবারে ‘ইয়া আরহামার রাহিমীন’ বলে প্রার্থনা করতে পারতাম। পারতাম রক্তের ভাইদের হোদায়েত কামনা করে মুনাজাত করতে।
গত কয়েক মাস ধরে আল্লাহ তায়ালা আমাকে কিছুটা শক্তি দিয়েছেন। হযরত আমার কাজের রিপোর্ট শোনেন। খুশি হন, সাহস দেন ও দুআ করেন। আল্লাহ তায়ালার এক নেক বান্দাকে তাঁর দীনের এক দাঈকে সামান্য আনন্দ দেয়ার নেশা আমাকে এপথে আরও উদ্দীপ্ত করে। আলহামদুলিল্লাহ! কয়েক মাসে তেইশ ব্যক্তি এই অধমের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য লোকও রয়েছে। এর জন্য আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে বার বার শুকরিয়া আদায় করি। আমার আশা এক্ষেত্রে আমি একটি পথ পেয়ে গেছি। আল্লাহ তায়ালা হয়তো আমাদের তার দীনের কাজে সামান্য খেদমত করার সুযোগ দিবেন। এর আগেও কিছু লোক হয়তো মুসলমান হতো কিন্তু আমি তাদের কালেমা পড়াতাম না। পরে হযরত বলেছেন, কালেমা পড়ার জন্য বিশেষ কারও কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে যদি মৃত্যু হয়ে যায় তাহলে কী হবে! এরপর থেকেই মূলত আমি কালেমা পড়াতে শুরু করেছি।
প্রশ্ন : মুসলমান ভাইদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো পয়গাম?
উত্তর : আমিই কী আর পয়গামই বা দেবো কী! আমার কাছে মনে হয়, আমদের যেসব ভাই কুফর এবং শিরকের মধ্যে পড়ে আছে তাদের কথা সকলেরই ভাবা উচিত। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত শ্রেণী, ক্ষুদ্র বলে যাদের অন্যরা দূরে সরিয়ে রেখেছে। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন আমাদের অঞ্চলে কাওড়ে শরীক হওয়ার প্রবণতা কী রকম বাড়ছে। এর আগে মাত্র তিন দিনের জন্য রাস্তা বন্ধ হতো। আর এখন রাস্তা বন্ধ থাকে প্রায় ১৫ দিন। সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে মানুষের কষ্ট বাড়ছে। শত শত মাইল গরমের মধ্যে পায়ে হেঁটে মানুষ আসছে। এটা আমাদের সাথে শত্র“তার উদ্দেশ্যে নয়। বরং এটা প্রমাণ করে ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। মালিককে সন্তষ্ট করার অনুভূতি শক্তিলাভ করেছে। আমরা যদি আমাদের জীবনের মূল মিশন হিসেবে দাওয়াতকে গ্রহণ করি এবং তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হই। এটা মালিককে খুশি করার পথ নয় বরং নারাজ করার পথ। শিরকের দিকে এই পথচলা ধর্মকর্ম নয় বরং কেবলই পাপ। আমার ধারণা, তাহলে আবেগ ও উদ্দীপনা নিয়েই তারা হজ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। আসলে আমরা এখন রেওয়াজী মুসলমান। আমাদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ নেই। আমি হরযতকে বলেছি। এই সাত বছরে আমি ২২টি বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছি। তার মধ্যে কেবল পাঁচজনকে এমন পেয়েছি যাদের দাড়ি আছে। তাদের মধ্যে পরিপূর্ণ দাড়ি ছিল মাত্র দুই জনের। এই যখন ইসলাম এবং নবীর তরিকার সাথে আমাদের সম্পর্ক তখন আমরা অন্যদেরকে কীভাবে দ্বীনের পথে ডাকবো? আমরাই তো আমাদের জীবনে ইসলামকে অনুসরণ করতে পছন্দ করি না। আমাদের নামাযের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলমানদের মধ্যে শতকরা দশজনও নামাযী নয়। যারা নামায পড়ে তাদের কাছে সকল কাজ সম্পাদনের পর দ্বিতীয় স্তরে আসে নামায।
প্রশ্ন: মাশাআল্লাহ! নামাযের ব্যাপারে আপনি খুবই যতœবান। নামায সম্পর্কে আপনি খুবই ভাবেন। এ সম্পর্কে আর একটু খুলে বলবেন কি?
উত্তর : আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য শুকরিয়া। নামাযের আকর্ষণেই আমি মুসলমান হয়েছি। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ গত পাঁচ বছরে আমার এক ওয়াক্ত নামাযও কাযা হয়নি। এ পর্যন্ত সর্বমোট সাতষট্টি ওয়াক্ত নামাযের জামাত ছুটেছে। ২০০২ সালে সাত ওয়াক্ত, ২০০০ সালে তের ওয়াক্ত, ১৯৯৯ সালে ষোল ওয়াক্ত এবং ১৯৯৮ সালে একুশ ওয়াক্ত। এ বছর সফর কম হয়েছে এবং দশ ওয়াক্ত জামাত ছুটেছে। আলহামদুলিল্লাহ। কোনো জামাতই আমার শরীয়ত সম্মত ওযর ছাড়া ছুটেনি।
প্রশ্ন : আপনি তো একেবারে হিসাব করে রেখেছেন!
উত্তর : প্রতিটি মানুষই লাভ-ক্ষতির হিসাব রাখে। প্রোপার্টি পকেট, ব্যাংক ব্যালেন্স, দোকানপাট, বাড়িঘর-সবকিছুরই মানুষ হিসাব রাখে। অথচ একজন মুসলমানের প্রকৃত সম্পদ তো এগুলো। আমি বুঝি না, নামাযের মূল্য কি দোকানপাট এবং ধনসম্পদ থেকে কম! মানুষ কত রকমের ক্ষতির কথা মনে রাখে। কিন্তু নামায ছুটে গেলে কিংবা জামাত ছুটে গেলে ভুলে যায়। যেন এর মূল্য দোকান পাটের ক্ষতির চাইতেও তুচ্ছ। আসলে আমাদের অন্তরে নামাযের মূল্য নেই। হযরত তো বলেন, যদি কোনো মানুষ নামাযের প্রতি যত্মবান হতে পারে তাহলে তার পুরো জীবনটাই শুদ্ধ হয়ে উঠবে।
প্রশ্ন: জাযাকাল্লাহ! আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া! অত্যন্ত মূল্যবান কথা বলেছেন।
উত্তর : আমার জন্য দুআ করবেন। এই কথাগুলোই যেন আমার জীবনে বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহ তায়ালা যেন আমার জীবনটাকে কুরআনী দাওয়াতের দৃষ্টান্ত বানিয়ে দেন। তিনি যেন আমার জীবনটা এই দাওয়াতের পথে কবুল করেন এবং আমাকে যেন শাহাদাতের মৃত্যু দেন। শাহাদাতের মৃত্যুই একজন মুমিনের জীবনের মেরাজ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মার্চ- ২০০৩