আব্দুর রহমান সাহেব (রঘুবীর সিং)-এর সাক্ষাৎকার

একথা চিন্তা করে আমি শিউরে উঠি, যদি আমার প্রভু আমাকে হেদায়েত না দিতেন তাহলে কুফরের উপর আমার মৃত্যু হত। মাঝে মাঝে পেরেশান হয়ে যাই এই ভেবে যে, না জানি আমার কোনো বদ আমলের কারণে আমার কাছ থেকে ইসলামের নেআমত ছিনিয়ে নেয়া হয়? কারণ ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ হল প্রকৃত সফলতা। এগুলো ভেবে প্রায়ই আমি সেজদাবনত হয়ে যাই এবং দুআ করি, হে আল্লাহ! আপনি তো সকল দাতার দাতা। আপনার নবী বলেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোনো কিছু দিয়ে ফেরত নিল তার উদাহরণ হল বমি করে আবার তা চেটে খাওয়া। আপনি তো সজ্জন ও ভদ্রতম। আপনি আমাকে আমার চাওয়া ছাড়াই হেদায়েত দান করেছেন। অতএব, আর খাতেমাও যেন ঈমানের সাথেই হয়। আমার বিশ্বাস الله আমার খাতেমা ঈমানের সাথেই করবেন। انشاء الله আপনিও দুআ করবেন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ।
আব্দুর রহমান: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: ভাই আব্দুর রহমান! ভাল আছেন তো? আরমুগানের জন্য আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।
আব্দুর রহমান: আলহামদুলিল্লাহ! আমি ভাল আছি। আহমদ ভাই! অবশ্যই বলুন। এটাতো আমার জন্য খুবই সৌভাগ্যের বিষয়।

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপানার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিন।
আব্দুর রহমান: আমার নাম রঘু সিং ছিল। আমি খাতুলী গ্রামের এক কুমার সম্প্রদায়ের লোক। আদর করে সবাই আমাকে রঘু বলে ডাকতো। ১৯৭১ খৃঃ আল্লাহ আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। তখন আমার বয়স আনুমানিক ২১ বছর। আমার পিতা দীপচন্দ্রজীর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আমরা তিন ভাই এবং দুই বোন জীবিত রয়েছি। আমার বিবাহের বছর মা মারা যান। তখন আমি জেনারেল মার্চেন্টের দোকান করতাম। মাঝে সেলুনের দোকানও করেছিলাম। শরীয়তের দৃষ্টিতে নিম্নমানের হওয়াতে তা ছেড়ে দিয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী শুনান।
আব্দুর রহমান: ঘটনা হল, ১৯ বছর বয়সে আমার বিবাহ হয়। আমার বিবি খুবই সুন্দরী ছিল। তার পিতৃপুরুষও আমাদের খান্দানের চেয়ে সম্মানিত ছিল। তার পিতা একজন ভাল কৃষক ছিলেন। কিছু কারবারও করতেন। আমরা গরীব হওয়ায় তা করতে পারতাম না। আমি দশম ক্লাসে ফেল করেছিলাম। সে আমার চেয়ে বেশী পড়াশোনা জানতো। সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ ছিল। তাকে আমার খুব পছন্দ হল এবং মুহাব্বত সৃষ্টি হয়ে গেল। একবার তার পিত্রালয়ের লোকেরা তাকে নিতে আসলো এবং সে চলে গেল। কিছুদিন পর তাকে আনতে গেলাম। কিন্তু সে আসতে চাইল না। আমি খুব কষ্ট পেলাম। এরপর আমার পিতা তাকে আনতে গেলেন। কিন্তু তারা আনতে দিলো না। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে সুপারিশ করেও কোনো কাজ হল না। সকল প্রকার বাহ্যিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মোল্লা মুনশীদের- মাধ্যমে তাবিজ-কবজ ও ঝাড়-ফুঁক করাতে লাগলাম। কিন্তু এতে কোনো কাজ হল না।

ওকে আমার খুব মনে পড়তো। কোনো কাজেই মন বসতো না। ওর চিন্তায় একেবারে আধা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমার পিতাকে কেউ বললো, শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত আকরর খান ওয়ালী মসজিদে মুসলমানদের বড় এজতেমা হয়। সেখানে অনেক মাওলানা সাহেব আসেন। তুমি ওকে ওখানে নিয়ে যাও। আমার পিতা শনিবার সকালে ওখানে পৌঁছলেন। লোকেরা বললো, মসজিদের বাহিরে বস। প্রোগ্রাম শেষ হলে কোনো মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবো। মসজিদের বাইরে একজন মৌলভী সাহেব তেহারী বিক্রি করতো। আমার পিতা তার কাছে গেলেন। নিজের দুঃখের কথা বললেন। তিনি বললেন, আমরা খাতুলীওয়ালারা সকল কাজে ফুলাতের লোকদের স্বরণাপন্ন হই। ঐ যে দাঁড়িয়ে এক যুবক বয়ান করছে তার বাড়ী ফুলাত। দেখতে যদিও মৌলভী মনে হচ্ছে না কিন্তু সে ফুলাতের লোক। এখানে ফুলাতের অনেক লোক এসেছে। তিনি যখন বের হবেন তখন তার পিছু নিবে। তিনি কাজ করতে চাইবেন না কিন্তু যদি করে দেন তাহলে মনে কর তোমার কাজ হয়ে যাবে।

আহমদ আওয়াহ: সেই নওজোওয়ান কে ছিল?
আব্দুর রহমান: বলছি, মূলত তিনি ছিলেন আপনার আব্বু। তখন তিনি মিশন স্কুলের একাদশ শ্রেণীতে পড়তেন। স্কুলের ড্রেসেই এজতেমায় শরীক হতেন। সে জামাআতের সাথে সর্বদা জুড়ে থাকতেন। ভাল বয়ান করতে পারতেন কিন্তু মানুষ তখন তাকে মৌলভী সাহেব বলার কল্পনাও করতে পারতো না। সাপ্তাহিক ইজতেমায় জুড়নেওয়ালী বা সকালের ছয় নাম্বারের কথা অধিকাংশ সময় তিনিই করতেন। এশরাক থেকে ফারেগ হয়ে তিনি বের হলেন। ব্যাগ সাথেই ছিল। স্কুলের দিকে যাচ্ছিলেন। আমার পিতা পিছে দৌঁড়ালেন এবং মৌলভী সাহেব, মৌলভী সাহেব বলে ডাকতে শুরু করলেন। তিনি মৌলভী হলে বা নিজেকে মৌলভী মনে করলে ডাক শুনতেন। আমার আব্বা দৌড়ে গিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন- কী ব্যাপার এতো ডাকছি তারপরও শুনছেন না যে? আপনার আব্বা বললেন, আপনিতো মৌলভী সাহেব বলে ডাকছিলেন। আমি তো মৌলভী সাহেব নই। আমার পিতা বললেন, তেহারী বিক্রেতা মৌলভী তো ঠিকই বলেছেন, ফুলাতের লোকরা নিজেদের খুব গোপন রাখে।

আব্বা তাকে বললেন, আমার একটা কাজ আপনাকে করে দিতে হবে। তিনি জানতে চাইলেন কাজটি কী? আব্বা বললেন, ছেলের বউ বাপের বাড়ি থেকে আসছে না। চিন্তায় চিন্তায় ছেলেটা মরে যাচ্ছে, কোনো কাজকাম করে না। এমন কোনো তাবিজ দিন যাতে তার বউ তার কাছে ফিরে আসে। তিনি বললেন, ভাই মোল্লাজী আপনার সাথে মজাক করেছেন। আমার পরদাদাও তো কোনোদিন তাবিজ বানায়নি। আমার আব্বাকে মোল্লাজী বলেছিলেন, তিনি অস্বীকার করবেন। কোনভাবেই তুমি মানবে না। আপনার পিতার অস্বীকার করা দেখে তার একীন হলে গেল যে, তিনি গুমনাম টাইপের লোক। সবার কাজ করে দেননা। এজন্য তিনি বারবার অনুরোধ করে বললেন, আপনি আমাকে টলাতে পারবেন না। আমার সবকিছু ভাল করেই জানা আছে। যতক্ষণ আপনি আমাকে কাজ করে না দিবেন ততক্ষণ আপনার পিছু ছাড়বো না।
মৌলভী সাহেব বলেন যে, অনেক বুঝানো সমঝানোর পরও যখন সে নাছোড়বান্দা তখন জান বাঁচানোর জন্য বললেন, আগামী শনিবার আসবেন। তার খেয়াল ছিল কোনো কবিরাজের কাছ থেকে তাবিজ নিয়ে তাকে দিয়ে দিবেন। ঐ সময় ফুলাতে হযরত শায়েখ যাকারিয়া রহ.-এর একজন মুরীদ হাফেজ আব্দুল লতীফ সাহেব মাদরসায় পড়াতেন। তিনি একাজ জানতেন। তার নিকট হতে তাবীজ নিয়ে দেয়ার ইচ্ছা ছিল। আমার আব্বা শনিবারের ওয়াদার উপর তাকে ছেড়ে দিলেন। সাপ্তাহিক প্রোগ্রামে সকালের দুই নাম্বারের বয়ান তারই ছিল। মাওলানা সাহেব বলেন যে, কেবল সূর্য উঠছে কথা বলতে বলতে জুতা পাহারাদারের দিকে তাকাতেই আমার পিতার দিকে নজর পড়ে যায়। তিনি আমাকে নিয়ে সকাল সকালই পৌঁছে গিয়েছেন। কুমোরদের সকাল খুব তাড়াতাড়ি হয়। মানে তারা খুব সকালেই ঘুম থেকে ওঠে। গত সপ্তাহের কথা মনে পড়লো। তাবিজের কথা তো ভুলে গেছি। কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে কথা শেষ করলাম। এরপর তিনি প্রথম এশরাকের নিয়ত বাঁধলেন, তখন হযরত শাহ আব্দুল কাদের জিলানী রহ.-এর একজন কর্মচারীকে কিছু পয়সা দিয়ে জায়নামাযে দাঁড় করিয়ে দেয়ার ঘটনা স্মরণ হয়ে গেল।

হে আল্লাহ! আমি তো জায়নামায পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম, দিল পরিবর্তন করা তোমার কাজ। এই ঘটনা থেকে উপায় গ্রহণ করে তিনি দুই রাকাআত নামায পড়ে আমার আব্বাকে বললেন, আপনার ছেলেকে গোসল করতে বলুন। এরপর তিনি নামায শেষ করে আমাকে নিয়ে মসজিদের বাহিরে একটি কামরায় প্রবেশ করলেন। তিনবার কালেমায়ে তাইয়েবা পড়ালেন এবং হিন্দি ভাষায় এর অর্থ বলে দিলেন এবং আমাকে বললেন, ব্যাস! এক মালিক সবকিছু করতে পারেন। যদি তুমি একথা দিলে বসিয়ে নিতে পারো তবে মালিক তোমার কাউকে ডাকা ছাড়াই তোমার কাছে পৌঁছে দিবেন এবং আমাকে একটি কাগজে হিন্দি ভাষায় কালিমায়ে তাইয়েবা লিখে দিয়ে বললেন, সর্বদা একনিষ্ঠভাবে জঁপ করবে। বাহিরে এসে বাবাকে বললেন তাকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছি। যদি সে এটা জঁপে তবে মালিক অবশ্যই শুনবেন। মাওলানা সাহেব বলেন, এরপর মসজিদে গিয়ে আবার দুই রাকাআত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে খুব দুআ করলেন, ইলাহী! আমি তো মুখে বলে দিয়েছি দিলের বিষয়তো আপনার হাতে।

আমরা দ্ইুজন নিশ্চিন্তে ঘর ফিরলাম। চতুর্থদিন আমার শ্বশুর আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমার বাড়িতে এলেন। খুশি মনেই তাকে রেখে চলে গেলেন। আমি খুব করে কলেমা জঁপতে থাকলাম। কখনো জোরে মজা করে পড়তাম কখনো আনন্দে আভিভূত হয়ে যেতাম। পরবর্তী শনিবার আব্বা দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে উপস্থিত হলেন। এই শনিবার আপনার পিতা আসলেন না। তিনি নিরাশ হয়ে ফিরে গেলেন। তৃতীয় শনিবার আবার এলেন। ইজতেমা শেষ করে আপনার আব্বা যখন মসজিদ থেকে বের হলেন তখন আমার আব্বা তাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং দুকেজি মিষ্টি পেশ করলেন। তিনি এই বলে ফেরৎ দিলেন যে এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। মালিক আপনার সহায় হয়েছেন। আব্বা জিজ্ঞাসা করলেন, আমার ছেলে যে সারাক্ষণ আপনার দেয়া মন্ত্র পাঠ করে এতে কোনো ক্ষতি হবে না তো? তিনি বললেন! কোনো ক্ষতি হবেনা বরং ফায়দা হবে।

আমি সর্বদা সেই কালিমা জঁপতে থাকলাম। একদিন আনন্দচিত্তে খুব জোরে জোরে এই কালিমা পড়ছিলাম। ফুলাতে একজন মোল্লাজী ছিল যে ছুতারের কাজ করতো। তার নাম ছিল গোলাম হোসাইন। তিনি আমাদের মহল্লায় দরজা জানালা বানাতেন। আমার এই কালিমা জঁপ করার শব্দ শুনে ফেললেন। তিনি আমাকে ভাল করেই চিনতেন। শোনামাত্রই জিজ্ঞাসা করলেন। কিরে রঘু! কী পড়ছিস? আমি বললাম মন্ত্র পড়ছি। ফুলাতের মৌলভী সাহেব বাতলে দিয়েছিলেন। এর দ্বারাই তো আমার বউ ফিরে এসেছে। তিনি বললেন এটা তো ইসলামের কালিমা। এই কালিমা পড়েই তো মানুষ মুসলমান হয়। আমি বললাম, তাহলে কি আমি মুসলমান হয়ে গেছি? তিনি বললেন যদি সাচ্চা দিলে পড়ে থাকো তাহলে তুমি মুসলমান হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমিতো সাচ্চা দিলে এবং বিশ্বাসের সাথে পড়ি। তুমিও হয়তো এভাবে পড় না। তিনি বললেন, তাহলে তো তুমি মুসলমান হয়ে গেছে। আমি বললাম, এখন তাহলে কী করণীয়? তিনি বললেন, এখন তোমার মুসলমানী নাম রাখতে হবে এবং নামায শিখে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া উচিৎ। আমি বললাম, কী নাম রাখবো? তিনি বললেন আঃ রহমান রাখো। জিজ্ঞাসা করলাম, নামায কে শিখাবে? তিনি বললেন, আমি শিখাবো। আমি বললাম, ঠিক আছে।

তিনি প্রতি রাতে আমাকে সময় দিতেন। সন্ধ্যার পর তিনি নামায শিখাতেন। ১৫-২০ দিনের মধ্যেই আমি সুন্দর করে নামায পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে হিন্দী ভাষায় দুএকটি কিতাব এনে দিলেন যেমন বেহেস্তের চাবি। দোযখে শাস্তি ইত্যাদি আমি চুপে চুপে নামায পড়তে থাকি। আর বইগুলো বিবিকে দেখাই এবং তাকে আমার মুসলমান হওয়ার ঘটনা শুনাই তাকে কসম দিয়ে বলি প্রকৃত হিন্দু বিবি স্বামীর সাথে তার চিতায় পুুড়ে তোমারও উচিৎ আমার ধর্মগ্রহণ করা। সে প্রস্তুত হয়ে গেল। মোল্লাজী গোলাম হোসেন তাকে কালিমা পড়িয়ে দিলেন। নাম রাখলেন ফাতিমা। এখন থেকে আমরা একে অপরের পাহারাদারী করে সতর্কতার সাথে নামায পড়তে লাগলাম। একদিন আমার আব্বা আমাকে নামায পড়তে দেখে খুব বকলেন। আমিও স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম আমি মুসলমান হয়ে গেছি। আপনার যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তিনি আমার ভাইদেরকে সাথে নিয়ে আমাকে খুব মারলেন। ফলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলাম।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হল?
আব্দুর রহমান: আমি ৩০ দিন বাহিরে থাকলাম। আমি দিল্লী চলে গিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল এখানেই কোনো কাজে লেগে যাবো। আমার আব্বা পাঁচ-ছজন জন লোক নিয়ে ফুলাত গেলেন। আপনার পিতার কাছে আমার সন্ধান জানতে চাইলেন। তিনি অজ্ঞতা জানালেন, কিন্তু তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তিনি বলছিলেন, আপনি ওকে যাদু করেছেন। তাকে মুসলমান বানিয়েছেন। সে আপনার কাছেই আছে। যদি পরশুর মধ্যে সে ফিরে না আসে তাহলে আমরা থানায় রিপোর্ট করবো। আপনার আব্বা খুব চিন্তিত হলেন। তিনি বুঝালেন, আজ পর্যন্ত তার সাথে আমার দেখা হয়নি। আমি আপনার উপকার করেছি তার বিনিময়ে আপনি এই দিলেন? আমি একথাও জানি না যে, সে মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আমার আব্বা কিছুক্ষণ অকথ্য ভাষায় তাকে গালিগালাজ করে ফিরে এলেন।

আহমদ আওয়াহ: তারপর?
আব্দুর রহমান: জানিনা কেন যেন আমার দিল-মন পেরশান হতে লাগলো। ফুলাত যাওয়ার খুবই আগ্রহ জাগলো। আপনার আব্বার সাথে দেখা করতে মনে চাইলো। পেরেশানীতে রাতে ঘুমাতেও পরছিলাম না। বাধ্য হয়ে স্টেশনে গেলাম। রাতেই খাতুলীগামী একটি ট্রেনে খাতুলী পৌঁছলাম। সকাল সকালই পায়ে হেঁটে ফুলাত পৌঁছে গেলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে দেখে খুবই খুশী হলেন। আমি ঘটনার আদ্যোপান্ত তাঁকে শুনালাম। তিনি বললেন, আমি তো খুব পেরেশান ছিলাম। আমাদের পরিবারের লোকেরা পুলিশকে খুবই ভয় পায়। খুব দুআ করছিলাম। আল্লাহর শোকর, তুমি চলে এসেছো। আমি তাকে বললাম, আপনি আমকে নিয়ে খাতুলী চলুন। আমার হাত ধরে আমার বাবার হাতে পৌঁছে দিয়ে বলুন, এই নিন আপনার ছেলে। এখন তাকে ছেড়ে দিবেন বা বন্দি করে রাখবেন এটা আপরার ব্যাপার এবং তার কাছেই জেনেন নিন, আমার সাথে তার কোনো সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা? তিনি বললেন, তোমার বাবা তোমাকে মারবেন। আমি বললাম, আমি নিজেকে সামলে নেবো। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন এবং আব্বার হাতে তুলে দিয়ে ঐ কথাগুলোই বললেন।
এরপর কিছু দিন আমি পরিস্থিতি ঠান্ডা করার জন্য ঘরেই অবস্থান করতে লাগলাম। আমাদের মহল্লার পাশেই কিছু মুসলমান বেকারীর কাজ করতো। যারা ছিল পুনার অধিবাসী। আমি হেকমতের সাথে আব্বাকে একথার উপর রাজী করলাম যে, আমিও তাদের সাথে সেখানে যাবো এবং কিছু কাজ-কারবার করবো। আমি পুনা চলে গেলাম এরপর বিবিকেও নিয়ে এলাম। সেখানে গিয়ে এলাকার কথা খুব মনে পড়তো। কিছু-আয় উপার্জন করে খাতুলীর একটি মুসলিম পল্লীতে বাড়ি বানালাম। জামাআতে সময় লাগাতে থাকলাম। আলহামদুলিল্লাহ! দ্বীনের সাথে একটা ভালো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

মহারাষ্ট্রের এক জামাআতের সাথে মুজাফফর নগর আমাদের একটি রোখ পড়লে পিড়াপীড়ি করে আমাকে জামাআতের আমীর বাননো হল। আমরা ফুলাত পৌছলাম। আমি আরবী লাহজায় আযান শিখেছিলাম। জোহরের আযান দিলাম। এরপর মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাতের জন্য তার ঘরে গেলাম তখন আপনার পিতা মাওলানা হয়ে গেছেন। আমি তার কাছে গেলাম কিন্তু তিনি আমাকে চিনতে পারলেন না। যখন বললাম আমি খাতুলির আপনার সেই রঘু তখন তিনি আমাকে নতুন আকৃতিতে দেখে খুব খুশি হলেন। এরপর যখন জানতে পারলেন, জোহরের আযান আমি দিয়েছি তখন আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং খুব খুশি হলেন। যে সময়টুকু এ এলাকায় লাগিয়েছি তাতে খুব ফায়দা হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হল?
আব্দুর রহমান: এরপর মাওলানা সাহেবের পরামর্শে খাতুলীতে অবস্থান শুরু করলাম সেখানে থেকেই বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। প্রায় ১০ বছর ধরে খাতুলীতে বসবাস করছি। কিন্তু বাড়ীর লোকেরা জানতো যে, আমি পুনাতে আছি। প্রথমে নাপিতের দোকান দিয়েছিলাম কিন্তু মুসলমানদের দাড়ি মন্ডানো দেখে আমার আশ্চর্য লাগতো। নবীর সুন্নতের উপর অস্ত্র চালানো আমার জন্য মুশকিল ছিল। পরে আমি জেনারেল মার্চেন্ট এর দোকান খুললাম। আলহামদুলিল্লাহ! এখন খুব ভাল চলছে।

আহমদ আওয়াহ: শুনলাম আপনি একটি মক্তবও নাকি খুলেছেন?
আব্দুর রহমান: আমার শ্বশুরালয়ের বেশ কিছু সদস্য মুসলমান হয়েছে।
আমার দুই শালাকে আল্লাহ তায়ালা আমার প্রচেষ্টায় হেদায়েত দান করেছেন। সেখানে তালীমের কোনো ব্যবস্থা ছিলনা। মাওলানা সাহেবের সাথে মাশওয়ারা করলাম। তিনি বললেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কিছু করা উচিৎ। আলহামদুলিল্লাহ! সেখানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা পূর্বে মসজিদে চলতো। এখন গ্রামের লোকেরা জমিন দিয়েছে। চারটি কামরা তৈরী হয়েছে। ৫জন উস্তাদ কাজ করছেন। আল্লাহর শোকর ভাল কাজ চলছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার কতজন সন্তান এবং তারা কী করে?
আব্দুর রহমান: আমার পাঁচ সন্তান। তিনজন পুত্র সন্তান। উসমান, আলী ও হাসান। আর দুইজন কন্যাসন্তান। আয়েশা ও যয়নব। আলহামদুলিল্লাহ সকলেই দ্বীনী তালীম হাসিল করছে। বড় ছেলে হাফেজ হয়ে গেছে এখন গুজরাটের এক মাদরাসায় পড়াশোনা করেছে। মুহাম্মদ আলীর ১৬ পারা হিফয হয়েছে আর মুহাম্মদ হাসানের তিন পারা হেফজ হয়েছে। সে সবচেয়ে বেশী ধীশক্তি সম্পন্ন। আয়েশা ও যায়নব উভয়েরই কোরআন শিখা হয়ে গেছে। এখন হেফজ শুরু করেছে। আমি শবে কদরে এবং জামাআতে গিয়েও দুআ করেছি যে, হে আল্লাহ! আমার সবগুলো সন্তানকে হাফেজ আলেম এবং দ্বীনের দায়ী বানিয়ে দিন। ছাহাবায়ে কেরামের মত পাক্কা মুসলমান বানিয়ে দিন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যেই সত্তা আমাকে অন্ধকার থেকে বের করে হেদায়েতের পথে এনেছেন তিনি অবশ্যই আমার ফরিয়াদ শুনবেন।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম পূর্ব জীবনের ব্যপারে আপনার অনুভূতি কী?
আব্দুর রহমান: একথা চিন্তা করে আমি শিউরে উঠি, যদি আমার প্রভু আমাকে হেদায়েত না দিতেন তাহলে কুফরের উপর আমার মৃত্যু হত। মাঝে মাঝে পেরেশান হয়ে যাই এই ভেবে যে, না জানি আমার কোনো বদ আমলের কারণে আমার কাছ থেকে ইসলামের নেআমত ছিনিয়ে নেয়া হয়? কারণ, ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ হল প্রকৃত সফলতা। এগুলো ভেবে প্রায়ই আমি সেজদাবনত হয়ে যাই এবং দুআ করি,

হে আল্লাহ! আপনি তো সকল দাতার দাতা। আপনার নবী বলেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোনো কিছু দিয়ে ফেরত নিল তার উদাহরণ হল বমি করে আবার তা চেটে খাওয়া। আপনি তো সজ্জন ও ভদ্রতম। আপনি আমাকে আমার চাওয়া ছাড়াই হেদায়েত দান করেছেন। অতএব, আর খাতেমাও যেন ঈমানের সাথেই হয়।

আমার বিশ্বাস আল্লাহ আমার খাতেমা ঈমানের সাথেই করবেন। ইনশাআল্লাহ আপনিও দুআ করবেন।

আহমদ আওয়াহ: অবশ্যই আপনার জন্য দুআ করবো আপনাকে অসংখ্য শুকরিয়া আসসালামু আলাই কুম
আব্দুর রহমান: ওয়া আলাইকুম আসসালাম


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও.আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, আগষ্ট- ২০০৪