আমরা সেই জাতি, শ্রেষ্ঠ উম্মত যার উপাধি

আমরা সেই জাতি, শ্রেষ্ঠ উম্মত যার উপাধি
দাওয়াতি বিষয়ে গবেষণামূলক একটি প্রবন্ধ
জগত সৃষ্টির নীতি ঃ এই বিশ্বের স্রষ্টা এবং পরিচালক হলেন সেই মহান সত্তা, যিনি সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী। তিনি সবকিছুর খবর রাখেন। সবকিছু দেখেন। নিজ জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় বিশ্বের বস্তুসমূহকে বিভিন্ন স্তরভেদে মর্যাদা দান করেছেন। এছাড়া সৃষ্টির মাঝে বানিয়েছেন উঁচু-নিচুর স্তর। রেখেছেন সুন্দর ব্যবস্থাপনা, ঘটিয়েছেন কুদরতের উত্তম বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীকে সুশৃঙ্খল বানানোর জন্য কিছু জিনিসকে বানিয়েছেন রাজা আর কিছু প্রজা। এই বিন্যাসের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন শ্রেষ্ঠতম ও নিম্নতর
স্তর। তাঁর জ্ঞান প্রজ্ঞা ও ইচ্ছায় সম্মানিত বস্তুকে দান করেছেন শ্রেষ্ঠ মর্যাদা। অন্যান্য বস্তুকে দিয়েছেন নিম্নতর স্তর। সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ বস্তুকে রেখেছেন উপরে। যেমন আরশ, কুরসি, জান্নাত এসব জিনিসের মর্যাদা ও স্থান হলো সর্বোচ্চ আসনে। এর বিপরীতে তুচ্ছ ও ঘৃণ্য বস্তুকে রেখেছেন সর্বনিম্ন স্থানে। যেমন জাহান্নাম যার স্থান সর্বনিম্নে। বিশ্ব জগতসমূহের স্রষ্টা, মহাজ্ঞানী আল্লাহ যেই বস্তু যেই স্থানের জন্য উপযুক্ত, তাকে সেই স্থানের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। প্রতিটি বস্তু যদি তার স্বস্থানে স্থির থাকে তাহলে এই বিশ্বের নেজাম ও শৃঙ্খলা সুন্দরভাবে চলবে। যেখানেই শৃঙ্খলার পরিবর্তন আসবে, সেখানেই নিয়ম ও শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়বে। এমনকি স্তরগুলোর পরিবর্তনকে দুর্ঘটনা বা এক্সিডেন্ট বলা হবে।
মানুষের দুটি শক্তি
এই প্রকৃত সত্য বিষয়টি আমরা চলমান জীবনে দেখতে পাই, তার অস্তিত্ব নিজের ভিতরে অনুভব করতে পারি, তাহলোÑ মানুষের অস্তিত্বই হলো একটি জগত। যার মধ্যে রয়েছে সব জিনিসের নমুনা। কোরআনে করীমে আল্লাহ পাক বলেনÑ
وَفِـيْ أنْـفُـسِـكُـمْ أَفَـلَا تُـبْـصِـرُوْنَ
অর্থ: এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও, তোমরা কি অনুধাবন করবে না? নিজেদের মধ্যেই রয়েছে (নিদর্শনাবলী) তোমরা কি দেখ না?
-সূরা জারিয়াত-২১
উদাহরণ স¦রূপ মানুষের মধ্যে দুটি শক্তি আছে। একটি হলো রূহ্, যার সম্পর্ক হলো ঊর্ধ্বজগতের সাথে। অপরটি হলো নফস, যার সম্পর্ক নিম্নজগতের সাথে। তাই রূহ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনÑ
وَيَسْأَلُـوْنَـكَ عَـنِ الـرُّوْ حِ قُـلِ الـرُّوْ حُ مِـنْ أَمْـرِ رَبِّـىْ وَمَـا أُوْتِـيْـتُـمْ مِـنَ الْـعِـلْـمِ إِلَّا قَـلِـيْـلًا
অর্থ: তারা আপনাকে ‘রূহ’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, রূহ আমার পালনকর্তার আদেশঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। -বনী ইসরাইলÑ৮৫
নফস সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনÑ
وَمَـا أُبَـرِّئُ نَـفْـسِـيْ إِنَّ الـنَّـفْـسَ لَأَمَّـارَةٌ بِالـسُّـوْءِ إِلَّا مَـا رَحِـمَ رَبِّـيْ إِنَّ رَبِّـي ْغَـفُـوْرٌ رَحِـيْـمٌ
অর্থ: আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নয় যার প্রতি আমার প্রতিপালক অনুগ্রহ করেই।
নিশ্চয় আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল, দয়ালু। -ইউসুফÑ৫৩
এই আয়াত দ্বারা বুঝা গেলো নফসের সম্পর্ক নিম্ন জগতের সাথে। এখন মানব জীবনের সফরকে সুশৃঙ্খল এবং আল্লাহর ইচ্ছামতো চলার জন্য প্রয়োজন হলো রূহ। এর অবস্থান হলো বাহন এর মতো। আর নফসের অবস্থান হলো আরোহীর ন্যায়। আর আরোহী নিজ বাহনের অধীনে থাকে। মনগড়া জীবনের উপর আল্লাহর চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে হবে। যদি নফসের প্রশিক্ষণ না হয়, আর নফসের অবাধ্যতা যদি রূহের উপর বিজয় লাভ করে তখন জীবনকে দুর্ঘটনার শিকার বলে মনে করা হবে।

শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়াও একটি দুর্ঘটনা
কোনো কোম্পানি যখন একটি গাড়ি তৈরি করে, তাতে কিছু জিনিস বানানো হয়। কিছু তৈরি করা হয় উপরে রাখার জন্য, আর কিছু নিচের জন্য। যদি উপরের জিনিসটি নিচে রাখা হয়, আর নিচেরটি উপরে, তাহলে এটাকেও দুর্ঘটনা বলা হবে। যেমন, গাড়ির চাকা নিচে থাকে, আর মেশিন থাকে উপরে। চলন্ত গাড়ি যদি উল্টে যায় তাহলে চাকাগুলো থাকবে উপরে আর ছাদ ও সিট থাকবে নিচে। এমতাবস্থায় শুধু গাড়ির আরোহীগণই আহত হবেন না। বরং দুর্ঘটনাস্থল; সেখানকার লোকজন ও জিনিসপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বহু উদাহরণ আছে। ঘরের ছাদ থাকে উপরে আর ফ্লোর থাকে নিচে। যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে এটাকে দুর্ঘটনা বলা হবে। দুনিয়ার সব জিনিসের মধ্যেই রয়েছে এই মূলনীতি। আল্লাহর অমোঘ বিধান অনুযায়ী এ কথাই বুঝা যায় আপনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই বিধানই দেখতে পাবেন। এমনকি মানুষের অঙ্গসমূহের মধ্যেও এর বাস্তবতা ফুটে ওঠে। শরীরের যেই অঙ্গটি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ তাকে রাখা হয়েছে উপরে। তার বিপরীত অঙ্গকে রাখা হয়েছে নিম্নে ও নিচু
স্তরে। যেমন মাথা হলো অঙ্গের সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ। তাকে রাখা হয়েছে উপরে। আর পাকে মনে করা হয় নিচ। তার স্থান হলো নিচে। আকল বুদ্ধির অবস্থান হলো বাদশাহর মতো। পায়ের অবস্থান হলো গোলামের মতো। গোলামের বেলাও এই মূলনীতি রাখা হয়েছে। সম্মানিত পোশাক (টুপি) মাথায় রাখা হয়। আর পায়ের পোশাক জুতাকে রাখা হয় মাটিতে, যা মিলে থকে ময়লা আবর্জনার সাথে। এখন যদি মাথা এবং টুপিকে নিচে রাখা হয়, আর জুতা এবং পা রাখা হয় উপরে। তাহলে এটাকেও দুর্ঘটনা বলা হবে। একটু আগে বেড়ে একথা বলা যেতে পারে যে, দুনিয়ার সকল সৃষ্টির মাঝে যেই শৃঙ্খলা ও তারতীব রয়েছে এবং বিশ্বের স্রষ্টা যাকে যেই স্থানের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। সেই শৃঙ্খলা যখনই উল্টে যাবে, তখনই কেয়ামত শুরু হয়ে যাবে। এমনিভাবে মাখলুকের বিভিন্ন অঙ্গ বা সম্প্রদায়ের এবং বংশের নির্দিষ্ট স্তরগুলো যখন উল্টে যাবে, তখন সেই জাতি বা বংশের কেয়ামতই বলা হবে। এ ব্যাপারে আরেকটি উদাহরণ পেশ করছি। আল্লাহ পাক বলেনÑ
الـرِّجَـالُ قَـوَّامُـوْنَ عَـلـٰى الـنِّـسَـاءِ بِـمَـا فَـضَّـلَ اللّٰهُ بَـعْـضَـهُـمْ عَـلٰـى بَـعْـضٍ وَبِـمَـا أَنْـفَـقُـوْا مِـنْ أَمْـوَالِـهِـمْ فَـالـصَّـالِـحَـاتُ قَـانِـتَـاتٌ حَـافِـظَـاتٌ لِـلْـغَـيْـبِ بِـمَـا حَـفِـظَ اللّٰهُ وَالـلَّاتِـيْ تَـخَـافُـوْنَ نُـشُـوْزَهُـنَّ فَـعِـظُـوْهُـنَّ وَاهْـجُـرُوْ هُـنَّ فِـي الْـمَـضَـاجِـعِ وَاضْـرِبُـوْهُـنَّ فَـإِنْ أَطَـعْـنَـكُـمْ فَـلَا تَـبْـغُـوْا عَـلَـيْـهِـنَّ سَـبِـيْـلًا إِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَـلِـيًّا كَـبِـيْـرًا
অর্থ: পুরুষেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল। এ জন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সেমতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগত এবং আল্লাহ্ যা হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাজত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার ওপর শ্রেষ্ঠ। -নিসা-৩৪
এটা প্রাকৃতিক মূলনীতি। নারীগণ পুরুষের উপর আদিষ্ট এমন চরিত্র যদি দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে কমপক্ষে তাকে কেয়ামতের আলামত বলা হবে। এখানে এ কথাও স্পষ্ট হওয়া সঙ্গত মনে হচ্ছে যে, বর্তমান পশ্চিমা সংস্কৃতির যেই দাওয়াত দেয়া হচ্ছে, তা কেবল অপ্রাকৃতিকই নয় বরং অসম্ভব। মানুষ ও বিশ্বজগতকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন প্রত্যেককে তার নিজ আসনে মর্যাদার স্থান দিয়ে দুনিয়ার নেজাম ও শৃঙ্খলা ঠিক রেখেছেন। অন্যথায় এই সুবিন্যস্ত নেজামের উপর চলা অসম্ভব হবে। পিতা-পুত্র কি কখনো এক হয়? স¦ামী-স্ত্রীর অধিকার কি সমান হওয়া সম্ভব? ইমাম ও মুক্তাদির মযার্দা কি সমান হতে পারে? রাজা-আর প্রজা কি সমমর্যাদার হতে পারে? এই সমান অধিকারের নির্বুদ্ধিতার বুলি, পৃথিবীর সৃষ্টির সাথে অসংগতি ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? ইসলাম হলো প্রাকৃতিক ধর্ম। ইসলাম পরস্পর সমতার শুধু শিক্ষাই দেয়নি বরং কার্যত নমুনা উপস্থাপনও করেছে। এমনভাবে স্তর ও মর্যাদার প্রাকৃতিক বন্ধনের সাথে মিলিয়েছে, যাতে কোনো মানুষ বা সৃষ্টি যেন জুলুমের শিকার না হয়। ইসলাম এভাবেই প্রত্যেকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি প্রত্যেকের হক, সম্মান কিভাবে আদায় করা যায় তার প্রশিক্ষণ দিয়েছে। উপরের বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে এই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। এই বিশ্বের শৃঙ্খলায় আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সম্মানিত সৃষ্টি ও জিনিসকে উঁচু মর্যাদা দান করেছেন। আর তুচ্ছ জিনিসকে রেখেছেন নিম্নস্থানে। এ কথাটি এভাবেও বলা যেতে পারে যে, উঁচু ও উপরের জিনিস হলো ইজ্জত-সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আর নিচের জিনিস হলো তুচ্ছ ও অমর্যাদার
অন্তর্ভুক্ত। একথাও ঠিক যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সকল মানুষ এবং সমস্ত জিনিস নিজ প্রাকৃতিক স্থানে স্থির থাকবে ততক্ষণ দুনিয়াও প্রাকৃতিক নিয়মে চলতে থাকবে। যখন তার মর্যাদার শৃঙ্খলা উল্টে যাবে, তখন তাকে বলা হবে দুর্ঘটনা। এর দ্বারা শুধু রীতি-নীতির মধ্যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না, বরং উপস্থিত সকল বস্তু ও মানুষও প্রভাবিত হবে। আর এটা এক ধরনের ছোট কেয়ামত হয়ে যাবে। একই সাথে একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করতে চান, তখন নিয়ন্ত্রিত জিনিসকে উল্টে দেন। লূত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের শাস্তির বর্ণনা কুরআনে কারিমে পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ
فَـجَـعَـلْـنَـا عَـالِـيَـهَـا سَـافِـلَـهَـا وَأَمْـطَـرْنَـا عَـلَـيْـهِـمْ حِـجَـارَةً مِـنْ سِـجِّـيْـلٍ
অর্থ: অতঃপর আমি জনপদটিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর কঙ্করের প্রস্তর বর্ষণ করলাম। (হিজর-৭৪)

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদদাওয়াতের ফিকির এবং আমলের ময়দান