আমলের দাওয়াতের সমানও কি ঈমানের দাওয়াতের অবকাশ নেই?

আমলের দাওয়াতের সমানও কি ঈমানের দাওয়াতের অবকাশ নেই? 

আসুন কিছু সময়ের জন্য মনে করুন মেনে নিলাম যে, সকলেরই জানা আছে, এতমামে হুজ্জাত হয়ে গিয়েছে। এখন আর অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়ার প্রয়োজন নেই। তাহলে আমি সেই সাদাসিধে কর্ণধারদের খেদমতে এই আবেদন করতে চাই। সকল মুসলমানের কি জানা নেই যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ। চুরি করা, গিবত করা কবিরা গোনাহ। একথা সকলেরই জানা। তাহলে তাদের জন্য ওয়াজ নসিহত করেন কেন? নামাজ রোজা আর ভালো কাজের দাওয়াত দেন কেন? মানুষকে পাপ থেকে বাঁচতে বলেন কেন? আপনার কথা সত্য যে, এতমামে হুজ্জত হয়ে গিয়েছে, তাহলে আমলের ক্ষেত্রেও তো এতমামে হুজ্জাত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আপনি জাতির আত্মশুদ্ধির জন্য ওয়াজ নাসিহত ইত্যাদির প্রয়োজন বোধ করেন তাহলে যেই ঈমান ছাড়া কোনো আমল গ্রহণযোগ্য নয়। ইমান ছাড়া মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ইমান ছাড়া মানুষ চিরকাল জাহান্নামে যাবে। এই অমুসলিমদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া আমলের দাওয়াতের সমানও কি অবকাশ নেই?

   আমরা ওই বুজর্গদের কাছে আবেদন করছি, যারা অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতকে খুবই হালকা দৃষ্টিতে দেখেন এবং সুন্নত মুস্তাহাব বলেন। তাদের খেদমতে আমার একটি আবেদন পেশ করতে মন চায়, তা হলো, ঈমানের পূর্ণতার জন্য, এসলাহের জন্য, ছোট ছোট সুন্নাত জিন্দা করার জন্য, মুসলমানদের অন্তরে সুন্নাতের আজমত সৃষ্টির জন্য যেই চেষ্টা চালানো হয়, তাদের কাছে এতটুকুও কি অবকাশ নেই যে, নবীজীর মিশন এবং সুন্নাতে মাকসুদা তথা অমুসলিমদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত এই দিকে ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাবে।

একটি প্রশ্ন

ধর্ম প্রচারের পথে শয়তান কীভাবে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে, এক বন্ধুর পত্রে তা অনুমান করা যায়। সেই সাথী অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতী কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, স্থানীয় উলামাদের মাঝে দাওয়াতী বিষয়ে আলোচনা হলো, উলামাদের মধ্যে দুই একজন তাফসির গ্রন্থ থেকে সুরা আবাসার তাফসির পেশ করলেন, শেষে তিনি যে বিষয়টি পেশ করলেন, তা হলো, আল্লাহ তাআলা একজন সাধারণ মুসলমান আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম রা. এর মোকাবেলায় কুরাইশদের কাফেরদেরকে প্রাধান্য দেওয়ায় নবীজীকে সতর্ক করেছেন। এর থেকে বোঝা যায়, আমলের দাওয়াত আর ঈমানের দাওয়াত এই দুটোর মধ্যে আমলের দাওয়াতকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই প্রশ্নটি খুবই সুন্দর।

    এই অধম সেই বন্ধুকে উত্তর লিখেছে। সেই মুফাসসিরের সম্মান স্বীকার করি, তবে আমাদের জন্য প্রমাণ হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল। দেখতে হবে সূরা আবাসা নাজিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল কী ছিল? তিনি কি অমুসলিমদের দাওয়াতকে দ্বিতীয় স্তরে রেখেছেন? মুসলমানদের আমলের ইসলাহের গুরুত্ব দিয়েছিলেন না অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি মেহনত ছেড়ে দিয়েছিলেন? কোনো সিরাতের ছাত্র একথা বলতে পারবেন না যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাওয়াতের এই আন্দোলনে বা এই কাজে কিছুটা কম আগ্রহী হয়েছেন বরং এই কাজের গুরুত্ব বেড়েই চলেছিল। নিশ্চয় একজন মুফাসসিরে কুরআন থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হুকুম বেশি বুঝেছেন এবং বেশি আমলকারী ছিলেন। এই অধমের কাছে ওই মুফাসসিরদের রায় বেশি মনোমুগ্ধকর মনে হয় যারা বলেন, বাহ্যত দেখা যাচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সতর্ক করা হয়েছে, বাস্তবে মক্কার কুরাইশ কাফেরদেরকেই সতর্ক করা হয়েছে। তাদেরকে ধমক দেওয়া হয়েছে। অথবা এখানে আগ্রহী আর অনাগ্রহী এর মধ্যে আগ্রহীকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। আমলের দাওয়াতও জরুরী, ঈমানের দাওয়াতও জরুরী। একটি অপরটি থেকে ভিন্ন করা যাবে না। তবে প্রধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাত অনুযায়ী দিতে হবে। কুরআন সুন্নায় ঈমানের দাওয়াতের প্রাধান্য, সূর্যের আলোর ন্যায় স্পষ্ট।

এক স্থানে একটি মাহফিলে আমার মুরশিদ এক আলোচনার উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। তা হলো-

{لَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ}

‘আমি তোমাদের প্রতি একটি কিতাব অবতীর্ণ করেছি; এতে তোমাদের জন্যে উপদেশ রয়েছে। তোমরা কি বোঝো না? 

  এই আয়াত দিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কুরআনে কারীমের আয়নায় নিজের অবস্থার মুহাসাবা করা ও কুরআনের তাদাব্বুর করার আবেদন পেশ করলাম। তখন একজন বড় সম্মানিত আলেমে দীন অধমের আবেদন প্রত্যাখ্যান ও রদ করে বললেন, এই ধরনের চিন্তা নতুনত্বপ্রিয়, আধুনিক চিন্তাধারা, ধর্মের প্রচারের গুরুত্বের ক্ষেত্রে আজিব কথা। সেই বক্তব্যের সারমর্ম হলো, কুরআনে কারীম যদি তাদাব্বুর আর চিন্তা ফিকির করা ছাড়া সওয়াব না হওয়ার শর্ত করা হতো তাহলে  الم এর মধ্যে ত্রিশ সওয়াব হতো কেন? এখানে বোঝার কী আছে।

দাওয়াতের জন্য নবীজীর অস্থিরতা

এছাড়াও তিনি তার বয়ানে যেই আয়াতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তা হলো –

{ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ}

‘এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সদয় হোন।’ 

পুরো আলোচনায় তাজকির এবং দাওায়াত ইলাল্লাহর গুরুত্ব এবং অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে নবীজীকে সতর্ক করার আলোচনা করেছেন। এও বলেছেন, ঈমানওয়ালাদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নবীজীর অস্থিরতা সীমা অতিরঞ্জন হয়ে গিয়েছিল, বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা এই কাজে বাধা দিয়েছেন আর সতর্ক করেছেন। কখনও বলেছেন-

 { وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ}

‘এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সদয় হোন।’ 

কখনও বলেছেন-

{لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ}

‘তারা বিশ্বাস করে না বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্মঘাতী হবেন।

কখনও বলেছেন- 

{إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ}

‘আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন।

প্রকাশ থাকে যে, কোনো একজন ব্যক্তির কথা লেখায় আনা ভালো কথা নয়। কিন্তু এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়, এই ভুল ধারণার কারণে অনেক সাধারণ মুসলমান শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়। তাই এই ভুল ধারণা দূর হওয়া জরুরী। উলামাদের এক মজলিসে সেই আলেমের সাথে এই অধমের সাক্ষাৎ হয়ে যায়। নিজের ভুল ধারণা দূর করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে বললাম, বেয়াদবি ক্ষমা করবেন। আমি কি আপনাদের কাছে একটি প্রশ্ন করতে পারি?

{ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا}

‘তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’

{وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ }

‘আমি কোরআনকে বুঝবার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?

এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই আয়াতগুলোতে কুরআনের তাদাব্বুরের দাওয়াত না থাকলে কী আছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে, অধিক অস্থিরতা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। হুকুম দেওয়া হয়েছে-

{ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ}

‘এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সদয় হোন। 

এই সতর্কের পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন না নিয়মিত চালিয়ে গিয়েছেন?

কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জবানে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো একটি মুহূর্তের জন্যও অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতী কাজের দরদ ও এই কাজে বিন্দুমাত্র আগ্রহ কমেনি। নাউযুবিল্লাহ, এমন তো হতে পারে না, বাধা দেওয়ার পর, সতর্ক করার পর নবীজী কুরআনের হুকুম অমান্য করবেন। তাহলে কে করবে? উত্তর ছিল চুপ থাকা ও নীরবতা। কারণ কুরআনের এই আয়াতের মাফহুম কুরআনের কোনো ছাত্র বোঝেনি।

এই ব্যথা তোমার কাছে কাম্য

এই আয়াতগুলো মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতী দরদ পুরো মানব জাতির কল্যাণকামিতায় চূড়ান্ত পর্যায়ের অস্থিরতার আলোচনা করা হয়েছে। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত¡না দেওয়া হয়েছিল, মুসলিম জাতিকে বলা হচ্ছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাদের আদর্শ বানানো হয়েছে। মানুষের হেদায়াতের জন্য নবীয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে পরিমাণ ব্যথা ও অস্থিরতা ছিল, সেই অস্থিরতা তোমাদের মধ্যে পাওয়া যাওয়া কাম্য। এর মধ্যে এই নিদর্শনা দেওয়া হয়েছে যে, হে মুসলমান! তোমরা যদি আমার সাথে পরকালে সাক্ষাৎ করতে চাও তাহলে আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে তোমাদের জীবনের আদর্শ বানাও। মানুষের হেদায়াতের জন্য ওই অস্থিরতাই তোমাদের থেকে কাম্য, ‘মনে হয় তুমি তোমার জীবন শেষ করে দেবে কেন তারা ঈমান আনছে না, এই উদ্দেশ্যে।

   অনেক বুজুর্গের দাওয়াতের দরদ ব্যথা ও প্রয়োজন বোঝেন ও অনুভব করেন। কিন্তু তাদের ধারণা, এই অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতের জন্য আমাদের পরিবেশ অনুকূল নয়। বিশেষ করে আমাদের তো একেবারেই অনুকূল না। তাদের খেদমতে এই আবদার পেশ করতে চাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবারা যেই পরিবেশে দাওয়াতী কাজ করেছিলেন সেই পরিবেশ কি অনুকূল ছিল? সে সময় পরিবেশ বেশি অনুকূল ছিল না আজ বেশি অনুকূল? আবু জাহেল আবু লাহাবের মতো ইসলামের দুশমন এই যুগে আছে কি? সে যুগে আল্লাহর প্রিয় ঘর কাবায় ৩৬০টি মূর্তি রাখা হয়েছিল। সে যুগে ইসলামের নাম নেয়া অপরাধ ছিল। পরিবেশ অনুকূল হওয়া যদি জরুরী হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম যদি পরিবেশ অনুকূল হওয়ার চিন্তা করতেন যে, এখনও তো পরিবেশ প্রতিকূল, অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা কর, তাহলে আমাদেরকেও মূর্তিপূজা করতে হতো, আর মন্দিরের ঘণ্টা বাজাতে হতো। বাস্তবতা হলো, বর্তমান যুগে পরিবেশ যে পরিমাণ অনুকূল পূর্বে এমন অনুকূল যুগ আর ছিল না। এটা হলো জ্ঞান ও বুদ্ধির যুগ। প্রতিটি কথা জ্ঞান বুদ্ধির পাল্লায় মাপা হয়। ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মই জ্ঞান ও বুদ্ধির মাপকাঠিতে টিকে না। প্রচার মাধ্যম খুবই সহজলভ্য। আপনি ইন্টারনেটকেই ধরুন, আঙ্গুলের ইশারায় আপনার ঘরে বসেই কোটি মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছিয়ে দিতে পারেন। এমনিভাবে ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। দাওয়াতের ক্ষেত্রে ভাষা অনেক গুরুত্ব রাখে। এই যুগে আপনি যদি শুধু ইংরেজি জানেন তাহলে দুনিয়ার যেকোনো স্থানে আপনার কথা অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। দাওয়াতের জন্য আন্তর্জাতিক একটি দিক হলো, আন্তর্জাতিক আইনে আপনি ধর্মের ওপর আমল করতে এবং ধর্মের প্রচারের ক্ষেত্রে স্বাধীন। যা মানুষের মৌলিক অধিকার। দুনিয়ার কোথাও কেউ আপনার প্রচার কাজে বাধা দিতে পারবে না। মোটকথা, বর্তমান যুগ দাওয়াতের জন্য সর্বদিক থেকে অনুকূল।

    পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের মনে একটি বিষয় আসে যে, ধর্ম পরিবর্তন করলে হিন্দু সংগঠনগুলো কঠিন দুশমনি করে। ইদানীং কিছু খ্রিস্টান পাদ্রী ও মিশনারিদের সাথে কিছু জুলুম হওয়ার কারণে এই ধারণা আরও প্রকট হয়েছে। এই বিষয়ে এতটুকু বলতে চাই, হিন্দুস্থানের ভূমি আধ্যাত্মিকতার জন্য অত্যন্ত অনুকূল। যেখান থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসার সুঘ্রাণ পেয়েছিলেন। কল্যাণকামিতার সাথে আধ্যাত্মিকতার দিকে আহ্বানকারী বড়ই মূল্যায়ন রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক চিন্তাশীল ও জাগতিক কর্মকা-ের কর্মীদের বিরোধিতা করা হয়। কিন্তু আধ্যাত্মিতার কর্মীদের বিরোধিতা করা হয় না। আওরঙ্গজেব ও আলমগীরের সাথে তাদের দুশমনি।

সব ধরনের পরহেজগারীর পরও তিনি দায়ী ছিলেন না। তিনি দাওয়াতী কাজ করেননি। তিনি মন্দিরের জায়গীর দিয়েছিলেন, এই কাজকে তার দাওয়াতী প্রচেষ্টা বলা যায় না। তার জীবনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের সামনে আছে। ফলে মানুষ তার বিরোধী। কিন্তু হিন্দুস্থানে সবচেয়ে বেশি ধর্মান্তরিত করেছেন ধর্ম প্রচারক আধ্যাত্মিক রাহবার দায়ী হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি আজমেরী রহ। আমির কবির সাইয়েদ আলী হামদানী রহ.। একথা সকল অমুসলিম জানে। ঐতিহাসিকরা এই ব্যপারে একমত। কিন্তু কোনো কট্টর হিন্দুও এমন নেই যে, তাকে খারাপ বলে। সকলেই তার আস্তানায় যায়। মাথা নয় বরং অন্তর ঝুঁকিয়ে যায়। এই জাতি কল্যাণকামী ও দরদওয়ালা আধ্যাত্মিক কর্মীদের জন্য অন্তর বিছিয়ে দেওয়া যাতি। আপনি পরীক্ষা করে দেখুন যেকোনো অমুসলিম ভাইকে দরদমাখা ভাষায় আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিয়ে দেখুন সে ইসলাম গ্রহণ করুক আর না করুক সে আপনার অবশ্যই অনুগ্রহ স্বীকার করবে। এরপরও পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ার অভিযোগ কীভাবে হতে পারে?

এই অধমকে এক মুহসিন সম্মানিত বুযুর্গ বললেন, আমার কাছে এক যুবক ইসলাম গ্রহণ করতে এসেছে, আমি তাকে বললাম, যাও তোমার জাতির কাছে যাও। তাদেরকে বুঝিয়ে সমঝিয়ে ইসলামের জন্য প্রস্তুত কর। এরপর আমার কাছে এসো। তোমাকে একা মুসলমান বানালে কে তোমাকে বিয়ে করবে? সামাজিক সমস্যাগুলো কে সমাধা করবে? চিন্তা করুন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এমন কথা বলতেন তাদের বিয়ে কে করবে, তাহলে কি ইসলাম এপর্যন্ত বিস্তার লাভ করতো? ইসলামে হিজরত, নুসরত, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘তালিফে কলবের’ জন্য যাকাতের অষ্টম ভাগ শরিয়তের বিধান কেন? এ ধরনের ধারণা অনেক মানুষের দাওয়াতের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজ বংশ পরিবার ছেড়ে আসা ইসলাম গ্রহণকারী সৌভাগ্যবান নওমুসলিমদের আমাদের ওপর কতটুকু হক অধিকার রয়েছে খুব কম লোকেরই অনুভূতি রয়েছে। সামাজিক জীবনে তাদেরকে কতটুকু কাছে টেনে আনতে হবে। গলায় বুকে জড়িয়ে রাখতে হবে, এর কতটুকু প্রয়োজন, কোনো সৌভাগ্যবানই তা অনুভব করতে পারবে। কোনো নওমুসলিমকে কিছু সদকার টাকা দিয়ে পথে ভিক্ষুকের ঝুলি হাতে তুলে দিয়ে তাদের অভ্যাস খারাপ করে মনে করছি আমরা অনেক কাজ করেছি। এ ক্ষেত্রে যদি আমরা উত্তম যুগ অধ্যয়ন করতে পারি তাহলে একটি নমুনা আমাদের সামনে আসবে।

   এক সফর থেকে ফিরছিলাম। শ্রদ্ধাভাজন এক বুযুর্গ আমাকে বললেন, আমি এই সফরে আমেরিকায় গিয়েছিলাম, পুরো এক মাস প্রত্যেক বক্তৃতায় আপনার কথা বলেছি। আমি খুবই বিনয়ের সাথে উনাকে বললাম, এটা দাওয়াতের কোন দৃষ্টিভঙ্গি যে, আপনার মতো ওয়ারিসে নবীর জিম্মাদার আপনি এই কাজকে আমার কথা বলছেন কেন? এটাতো মূলত কুরআন ও সুন্নাতের কথা। দ্বিতীয় কথা হলো আপনি দেশের বাইরে দাওয়াতের কথা বলেন, দেশে বলেন না কেন?

এ ধরনের ঘটনা মানুষকে উৎসাহ দেয় যে, আপনি খুব ভালো ও নতুন আন্দোলন শুরু করেছেন। আসলেই বাস্তবেই আপনি অনেক বড় কাজ করেছেন। যারা কাজ থেকে একটু দূরে তারা এই দাওয়াতের কর্মকে এমন জামাতের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়, যাদেরকে তারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট মনে করে।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ