আশেকে রাসূল জনাব মুহাম্মদ আহমদ (রামকৃষ্ণ শর্মা)-এর সাক্ষাৎকার

আসলে আমার কাছে মনে হয়েছে, আল্লাহর নবীর সবচে’ বড় সুন্নত হলো দাওয়াত, এজন্য নবীজী কুরআন শরীফ পাঠ করে শোনাতেন এবং তিনি পবিত্র কুরআনের হাফেযও ছিলেন। আমার কথা হলো, আমি এই সুন্নাত থেকে মাহরুম থাকবো কেন? তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা তো আমাকে ভালো স্মৃতিশক্তিও দিয়েছেন। এজন্য আমি কুরআন শরীফ মুখস্থ করা শুরু করেছি। আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া তিন মাসে ষোল পারা হিফয করেছি। এখন আমার প্রধান সাধনা হলো কুরআনে কারীমের হিফয। আমি সবচে’ বেশি সময় এখন কুরআন হিফয করায় ব্যয় করছি।

আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আহমদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: মুহাম্মদ ভাই! আপনার আগমনে খুবই খুশি হয়েছি। আপনার কথা আব্বু আলোচনা করছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য আব্বু আমাকে নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। সাথে এ-ও বলেছিলেন তার সাকক্ষাতকারটি রবিউল আওয়াল মাসেই প্রকাশ কর। আকস্মিক ব্যাপার আপনি এমন সময় এসেছেন যখন রবিউল আওয়াল সংখ্যার প্রস্ততি চলছে।

মুহাম্মদ আহমদ: গতকাল আমি জামাতে সময় লাগিয়ে নিজামুদ্দীন মারকাযে এলাম। এসে হযরতকে ফোন করেছি। ফোন পেয়ে খুবই খুশি হলেন। তিনি তখন দিল্লীতেই ছিলেন। বাটলা হাউজে প্রোগ্রাম ছিল। আলহামদুলিল্লাহ আমি তাতে সরিক হলাম এবং হযরতের সাথে সাক্ষাতও হয়ে গেল। আরও অনেক লোক তাঁর সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিল। হযরত আমাকে আপনার সাথে দেখা করার কথা বললেন। তাছাড়া আরমুগানের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকার দেয়ার কথাও বলেছেন। বলুন, আমাকে এখন কী করতে হবে?

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপনার বংশীয় পরিচয় দিন?

মুহাম্মদ আহমদ:  ১৯৬৫ সালের ২১ জানুয়ারী হরিদুয়ারে একটি পন্ডিত বংশে আমার জন্ম। আমার বাবা ছিলেন একজন বড় যোগী। তার নাম কেশুরাম শর্মা। তিনি আমার নাম রেখেছিলেন রামকৃষ্ণ শর্মা। আমার বংশে একজন অনেক বড় ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন। তার নাম ছিল শ্রীরাম শর্মা। তাকেই গায়ত্রী সমাজের এক প্রকার ফাউন্ডার বলা চলে। শান্তিকুঞ্জ হরিদুয়ারে তার আশ্রম ছিল। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা জানা এমন কোনো হিন্দু নেই যে তাঁকে না জানে। তিনি আমাদের দূর সম্পর্কের দাদা ছিলেন। হযরত মাওলানা বলেছেন শ্রীরাম শর্মাজী মাওলানা শামস নবীদ উসমানীর কাছে কালেমাও পড়েছিলেন। আমার একশ’ ভাগ বিশ্বাস তিনি অবশ্যই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যের পূজারী। আমরা এতোটুকুই জানি তিনি মৃত্যুর আগেই সমাধি গ্রহণ করেছিলেন। যারা দেখেছে তারা বলেছে মৃত্যুর পর তার পুরো শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল। মাওলানা সাহেব আমাকে বলেছেন তার শিষ্যরা তাকে বিষ পান করিয়েছিল।
আমাদের বংশ হলো আর্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত। আমি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করি স্বরস্বতী স্কুলে। পরবর্তীতে হরিদুয়ার গুরুকুল আশ্রমে ভর্তি হই। সেখানে হিন্দী এবং সংস্কৃত শিখি। বেদগুলো পড়ি। দুুই বছরের জন্য উচ্চশিক্ষার জন্য গুরুকুলে আরো পড়াশোনা করি। তারপর দিল্লীর নিকটবর্তী বুপুরা গুরুকুলে সংস্কৃতের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। শান্তিকুঞ্জের ম্যাগাজিনগুলোতে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ধর্মীয় পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কিছু বলুন

মুহাম্মদ আহমদ: আমি দিল্লি গুরুকুলের পড়াশোনা করছিলাম। সেখানে দুজন মুসলমান শুদ্ধি হয়ে এসেছিল। তাদের একজন ছিল সাহারানপুরের হতভাগা যুবক। প্রথমে তার নাম ছিল মুহাম্মদ তৈয়্যব। পরবর্তীতে সে শিবপ্রসাদ নাম ধারণ করে। সে দারুল উলূম দেওবন্দে দুই বছর কেরাতের কোর্স করেছিল। প্রথমে নিজেকে মুহাম্মদ তৈয়ব কাসেমী নামে পরিচয় দিত। আরেকজন ছিল বিহারের মূর্খ ও মজদুর মাঝ বয়সী লোক। প্রথমে তার নাম ছিল জাভেদ আখতার। ধর্ম পরিবর্তন করে হয়েছিল দয়ানন্দ। এক যুবক। নাম মাওলানা শামস নবীদ উসমানী। লখনৌতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি কারও কাছে এই দুজনের মুরতাদ হওয়ার ঘটনা শুনেছিলেন। তারপর তিনি সুনিপথে মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা শোনান। মাওলানা তাকে গুরুকুল নিয়ে তাদের দুজনকে বুঝাতে বলেন। এই সুবাদে তিনি দুই-তিনবার আমাদের এখানে আসেন। বিষয়টি তাকে খুবই চিন্তিত করে। আমি একদিন শিবপ্রসাদকে জিজ্ঞেস করলাম এই লোকটি এখানে বারবার আসে কেন? শিবপ্রসাদ আমাকে বললো এ আমাকে পুনরায় ইসলামে ফিরিয়ে নিতে চাইছে। আপনি এর সাথে কথা বলুন। ইসলামে তো কিছুই নেই। আপনি তাকে আমাদের মতো হিন্দু হয়ে যেতে বলেন। এই ব্যক্তি হিন্দু হলে খুবই উপকার হবে।
ভাই আহমদ! যখনই আমি এই দুর্ভাগা শিবপ্রসাদের সঙ্গে কথা বলতাম তখনই সে আমাদের প্রিয়নবী (তাঁর প্রতি কোটিকোটি দরূদ ও সালাম) সম্পর্কে খুবই খারাপ মন্তব্য করতো। বিশেষ করে তার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে খুবই ঘৃণ্য রকমের অপবাদ দিত। সত্যি কথা কী, তার কথাগুলো তখনও আমার কাছে খারাপ লাগতো। এক সপ্তাহ পর শামস নবীদ উসমানী সাহেব এলেন। কথা বলে জানতে পারলাম তিনি একজন মাওলানা। কথা প্রসঙ্গে তিনি আমাকে মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের সাথে দেখা করতে বললেন। খুব নম্রতার সাথে বললেন তিনি আমাদের মুরুব্বী। খুবই সত্যবাদী মানুষ। আপনি যদি তাকে বুঝাতে পারেন তাহলে আমরাও আপনার সাথে থাকবো। মোটকথা তার বদৌলতেই অমৃতসরের একটি গ্রামে হযরতের সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত হয়।
আমি আমার দুজন বন্ধুকে নিয়ে একটি মসজিদে চলে যাই। মাওলানা সাহেব আমাদের সাথে খুবই আন্তরিকতার সাথে মিলিত হলেন। আমরা তাঁর চরিত্রে মুগ্ধ হলাম। আমি তাঁকে বৈদিক ধর্মে আসার জন্য দাওয়াত দিলাম। বললাম এরচে বড় ধর্ম আর নেই। আমাদের পূর্বসূরীদের ধর্ম এটা। আমাদের স্রষ্টা যদি ইসলাম ধর্মই আমাদের জন্য পছন্দ করতেন তাহলে আমরা ভারতে জন্মগ্রহণ করতাম না। এখানকার বৈদিক ধর্মই মানানসই। তারপর শিবপ্রসাদের কাছে শোনা নবীজি সম্পর্কে দু-একটি কথা হযরতকে শোনালাম। হযরত তখন গাড়ি থেকে তাঁর ব্যাগ আনালেন এবং হিন্দীতে লেখা একটি পুস্তিকা বের করে আমাকে দিলেন। বইটির নাম ‘ইসলামকে পয়গম্বর হযরত মুহাম্মাদ’ (ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। পুস্তিকাটির লেখক প্রফেসর কে এস রামা রাও। বইটি আমার হাতে দিয়ে বললেন এটি একজন হিন্দু ভাইয়ের লেখা। আমার অনুরোধ এ বইটি আপনি পড়ে দেখবেন। আপনার কাছে আমার আরেকটি কথা এই বইটি পড়ার সময় তিনি ‘ইসলাম ও মুসলমানদের পয়গম্বর’ কথাটি মাথায় রাখবেন না। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো বাণী বা কুরআনের কোনো একটি শব্দ দ্বারাও একথা প্রমাণিত নয় যে, তিনি কেবল মুসলমানদের পয়গম্বর বরং তিনি ছিলেন পুরো মানবতার জন্য সর্বশেষ পয়গম্বর।
এই ছোট্ট পুস্তিকাটি দুই-তিনবার পড়বেন। তারপর আমি নিজে এসে গুরুকুল আশ্রমে আপনার সাথে সক্ষাত করবো। মাওলানা সাহেবের কোথাও সফরে যাওয়ার তাড়া ছিল। তাঁর সাথে মোটমাট আধা ঘন্টা কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি ফিরে এসে পুরো পুস্তিকাটি একবার পড়লাম। আমার মনে হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো মানবতার নয় শুধু আমার রাসূল। গুরুকুলের পরিবেশ, আমার পরিবার এবং আমার ধর্ম আমাকে বারবার ঝাঁকুনি দিতে লাগলো। এক পর্যায়ে আমি বইটি ছাদের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম। ভাবলাম তার বিরুদ্ধে যত বই আছে আমি এবার সেগুলো পড়বো।
উদ্দেশ্য এই পুস্তিকাটি পড়ে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমার যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে এটাকে নষ্ট করা। আমি শিবপ্রসাদের কাছে পরামর্শ চাইলাম। সে আমাকে বললো অমুসলিমদের লেখা বই খোঁজার দরকার নেই। মুসলমানদের মধ্যেই অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে লিখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে সে তসলিমা নাসরিন ও সালমান রুশদীর কয়েকটি বইয়ের নাম বললো। আমি তাকে বইগুলো সংগ্রহ করে দিতে বললাম। সে তার পরিচিতদের কাছ থেকে এ দু লেখকের চারটি বই আমাকে এনে দিল। আমি চারটি বই-ই পড়ে ফেললাম। কিন্তু রামাকৃষ্ণ রাওয়ের ক্ষুদ্র পুস্তিকায় যে পরিমাণ সত্য ছিল, ঐ ক্ষুদ্র পুস্তিকা আমার ভেতর যে প্রভাব ফেলেছিল মিথ্যার সয়লাবে ভরপুর এই বিশালবিশাল চারটি বই পড়েও সেই প্রভাব সামান্যতম হ্রাস পেল না। বরং প্রিয় নবীর কর্ম ও আখলাকের সততা আমাকে আরো বেশি ব্যথিত করে তুলল। আমার মনে হলো তসলিমা নাসরিন এবং সালমান রুশদী আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে বিতাড়িত। তারা দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে বলেই এমন এক মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে যাচ্ছে।
এক রাতের ঘটনা। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম, আমার দাদাজান (যাকে আমরা ভারতের ভাষায় দেবতার চে’ কম মনে করি না) শ্রীরাম শর্মাকে। তিনি আমাকে বললেন বেটা! উন্মাদ মতো কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছ? হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তো আমাদের সেই নরাশংস, যাকে কল্কি অবতারও বলা হয়েছে। তাঁকে মানা ছাড়া মুক্তির কোনো উপায় নেই। আমার মুক্তিও হয়েছে তাঁর কালেমা পড়েই। ধোঁকার পথ ছাড়। মাওলানা কালিমের কাছে চলে যাও। জলদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কালেমা পড়ে নাও। মোটেও দেরী করো না।
আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমার অবস্থা তখন বর্ণনাতীত। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালবাসায় আমি তখন পাগলপ্রায়। আমি নিজেকে সান্তনা দেয়ার জন্য ভাবলাম রামাকৃষ্ণের বইটি আরেকার পড়বো। তখন ভোর চারটা। আমি ছাদে গেলাম। রাতে সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল আর তাতে বইটি ভিজে গিয়েছিল। আমি বইটি নিয়ে ঘরে চলে এলাম। চোখে লাগালাম, চুমু খেলাম। কিছু কাগজ পুড়িয়ে বইটি শুকালাম, তারপর পড়তে শুরু করলাম। আমার খুব কান্না পেল। অনেকক্ষণ কাঁদলাম। কাঁদতে কাঁদতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম মাওলানা কালিম সিদ্দিকী। তিনি পন্ডিত রামকৃষ্ণজীকে বলছেন চলুন, আপনাকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিই। আমি বললাম আমি তো এই উদ্দেশ্যেই আপনার কাছে এসেছি। তিনি আমাকে একটি মসজিদে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বালিশে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। এতো সুন্দর চেহারা আহমদ সাহেব! আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না। চেহারায় যেমন আলোর উদ্ভাস আর তেমনি উজ্জলতা। আমি কাছে গিয়ে তার পায়ে মাথা লাগালাম। তিনি বসা অবস্থায় আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। অত্যন্ত মমতার সাথে আমাকে কিছু কথা বললেন এখন আমি তা ভুলে গেছি।
আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, সকালে ভাবলাম ফুলাত যাবো। ফুলাতের ঠিকানা আমার জানা ছিল না। প্রথমে আমি সনিপথ ঈদগাহে গেলাম। সেখানে এক মাস্টার সাহেব আমাকে ফুলাতের ঠিকানা বলে দিল। সন্ধার সময় আমি ফুলাত পৌঁছে গেলাম। সেখানে ইসলাম নামক এক মাস্টার সাহেবের সাথে আমার দেখা হলো। তিনি নিজেও মুক্তিশ্বর আশ্রমের মহারাজার পুত্র। তার বাবাও মুসলমান হয়ে মুক্তিশ্বর ছেড়ে ফুলাতে চলে এসেছেন। তিনি আমাকে ‘আপকি আমানত’ দেন। বইটি আমি কয়েকবার পড়ি। তৃতীয় দিন ২০ এপ্রিল ২০০৪ সাল। দুপুরের পর মাওলানা আগমন করেন। ‘আপকি আমানত’ আগেই আমাকে মুসলমান বানিয়ে রেখেছিল। মাওলানা সাহেব আমাকে কালেমা পড়ালেন। আমি বললাম কোনো মুসলমান কি পেয়ারা নবীর নামে নিজের নাম রাখতে পারে? মাওলানা সাহেব বললেন অবশ্যই। আপনার নাম মুহাম্মদ আহমদ।

আহমদ আওয়াহ:  তারপর কী হলো?

মুহাম্মদ আহমদ: মাওলানা সাহেব আমাকে ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত আইনী কাগজপত্র প্রস্তুত করিয়ে তারপর চল্লিশ দিনের জন্য তাবলীগে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ভুপালে চিল্লা কাটালাম। আলহামদুলিল্লাহ! সেখানে আমি নামায শিখে নিই। এক চিল্লায় দশ বার আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখি।

আহমদ আওয়াহ: গুরুকুল আশ্রমের লোকেরা আপনার খোঁজ নেয়নি?

মুহাম্মদ আহমদ: নিশ্চয়ই তারা আমাকে খুঁজে থাকবে। জামাত থেকে আসার পর মাওলানা আমাকে গুরুকুলে গিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিলেন। শিবপ্রসাদকে ইসলামে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। কিন্তু আহমদ ভাই! সত্যকথা হলো এর মতো হতোভাগা আমি আর দেখিনি। তার নাম শুনলেই আমি চরম অস্থিরতা অনুভব করি। আমার অবস্থা এখন এমন, আমার প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে মহব্বত করে না আমি তাকে আল্লাহর শত্রু মনে করি। আমি মনে করি এটা আল্লাহর অভিশাপ। আমাদের নবী যেভাবে আমাদের অভিশপ্ত জায়গাগুলোর পাশ দিয়ে দ্রুত পথ চলতে বলেছেন, এই ধরনের অভিশপ্ত লোকদের পাশ দিয়েও আমি ঠিক সেভাবেই দ্রুত হেঁটে যাই এবং শংকাবোধ করি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি শিবপ্রসাদের উপর কাজ করেননি?

মুহাম্মদ আহমদ: আসলে আমি তাকে গভীরভাবে জানতে চেষ্টা করেছি। আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি কেন তার প্রতি আল্লাহ তায়ালার এ অভিশাপ নেমে এলো। পরে জানতে পারলাম সে তার মাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। একবার কোনো এক কারণে সে তার মাকে লাথি পর্যন্ত মেরেছিল। এরই শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা তাকে পৃথিবীতে হতভাগা করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপমানের অপরাধে তাকে দিয়েছেন কুকুরের মৃত্যু। গুরুকুল আশ্রমের লোকেরা তার শেষকৃত্য করতেও অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে পুলিশের লোকেরা তাকে পায়ে রশি লাগিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। নোংরা একটি নালায় ফেলে দিয়ে ময়লা আবর্জনা দিয়ে ঢেকে দেয়। ঘটনাটি শুনে আমি কিছুটা স্বস্তিবোধ করেছি। আমার মোটেও কষ্ট হয়নি। সত্যিকথা কী প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যারা বেয়াদবী করে তাদের প্রতি করুণা বা দয়াবোধের জন্য আমার ভেতর সামান্যতম জায়গাও নেই। এটা আমার এক রকমের দুর্বলতাই ধরুন।

আহমদ আওয়াহ: গুরুকুল আশ্রমের লোকেরা আপনার এই বেশভূষা দেখে বিরোধিতা করেনি?

মুহাম্মদ আহমদ: আমি জামাত থেকে ফিরে এসে হযরত মাওলানার হাতে বাইয়াত হয়েছি। হযরত মাওলানার পরামর্শে উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম এবং শামায়েলে তিরমিযী কিনেছি। আলহামদুলিল্লাহ! প্রাণখুলে সুন্নাতের উপর চলতে চেষ্টা করছি। পাগড়ি-চুল সকল ক্ষেত্রেই সুন্নতের অনুসরণ করছি। এই বেশভূষায় আমি যেখানেই গিয়েছি, সম্মান পেয়েছি। প্রায় চার বছর হতে চলেছে। আজ পর্যন্ত কেউ আমার এই বেশভূষাকে বেয়াদবীর দৃষ্টিতে দেখেনি।
আহমদ আওয়াহ: গত বছর আপনি ওমরা করতে গিয়েছিলেন। তো সেখানকার সফর কেমন ছিল?
উত্তর : পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মরণ আমাকে খুব কষ্ট দিত। বারংবার মদীনার কথা মনে পড়তো। আল-হামদুলিল্লাহ! আমি এখন উর্দূ পড়তে পারি। আরবিও অল্প-অল্প শিখেছি। নাগপুর গিয়ে কুরআন শরীফের ক্লাশ করেছি। এখন বিশেষভাবে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীগ্রন্থ পাঠ করছি। আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া এ পর্যন্ত সীরাত বিষয়ক একশ’টির বেশি কিতাব পড়েছি। কিতাবের মধ্যে যখনই মদীনার কথা পড়তাম তখনই স্মৃতিতে মদীনার নাম জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠতো। এক রাতে তাহাজ্জুদের শেষে দুআ করলাম হে আল্লাহ! তোমার জন্য আমার সবকিছু উৎসর্গ হোক। তিনি আমার কথা শুনলেন। আমার প্রতি দয়ালু হলেন। তাঁর একান্ত অনুগ্রহে আমাকে পাসপোর্ট এবং ভিসা ছাড়াই এমনকি জাহাজ ছাড়া আমাকে মদীনায় পৌঁছে দেন। মক্কা শরীফে গিয়ে ওমরা আদায় করি।

আহমদ আওয়াহ: সেটা কী করে সম্ভব?

মুহাম্মদ আহমদ: বিমান-পাসপোর্ট এসব শুধু উপকরণ। এর সৃষ্টিকর্তা তো আল্লাহ। আর আল্লাহ তায়ালা কোনো উপকরণের অধীন নন। তিনি চাইলে উপকরণ ছাড়াও যা খুশি করতে পারেন। বিমানের বাইরে আল্লাহ আরও অনেক বাহন সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি চাইলে যে কোনভাবেই বান্দার ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন।

আহমদ আওয়াহ: সেটা কিভাবে হলো আমাদেরকে ‘বলুন’

মুহাম্মদ আহমদ: আহমদ ভাই, এখনও এটা বলার সময় আসেনি।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা, মক্কা-মদীনার কথা কিছু বলুন।

মুহাম্মদ আহমদ: সেখানে এক মাস ছিলাম। মদীনা থেকে দুই বার ও মক্কা থেকে সাত বার ওমরা করেছি। মদীনায় এই অধমের প্রতি আল্লাহ তায়ালার রহমতের বিস্ময়কর প্রকাশ দেখেছি। এই দুর্বল ও নাপাক বান্দার প্রতি তাঁর নবীর মহব্বতের যে বরকত নাযিল হয়েছে তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না।

আহমদ আওয়াহ: সে সম্পর্কে আমাদেরকেও কিছু বলবেন কি?

মুহাম্মদ আহমদ: সে কথা অন্য কোনো মজলিসে এসে হবে ইন্শাআল্লাহ।

আহমদ আওয়াহ: বর্তমানে আপনি কোথায় থাকছেন?

মুহাম্মদ আহমদ: এখন আমি বেনারসে থাকছি। সেখান থেকে দাওয়াত নিয়ে হরিদুয়ার, ঋষিকেশ, আজিন, মথুরা, এলাহাবাদ, অযোধ্যাসহ নানা তীর্থস্থানে যাচ্ছি।

আহমদ আওয়াহ: ওখান থেকে কোনো ফলাফল আসছে? কোনো লোকের হেদায়াতও কি হয়েছে?

মুহাম্মদ আহমদ:  আলহামদুলিল্লাহ! খুব ভালো ফলাফল পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ এগুলো যখন সামনে চলে আসবে তখন প্রতিটি মুসলমানই গর্ববোধ করবে। আমার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ একটা অনুগ্রহ যে, তিনি এই অপবিত্র এক বান্দাকে কোথা থেকে কোথায় উঠিয়ে এনেছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি বিয়ে করেছেন?

মুহাম্মদ আহমদ: ইসলাম গ্রহণের আগে আমি বিয়ে-শাদীর কথা ভাবিওনি। ইসলাম গ্রহণের পর পারিবারিক দায়-দায়িত্বের বিষয়টি আমার কাছে বেশ ঝামেলার মনে হতো। দুই মাস আগে হযরতের সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। তখন তিনি আমাকে বিয়ের কথা বললেন, এ বিষয়ে হাদীস শোনালেন। হাদীসের কথা শুনে খুবই সন্ত্রস্ত হলাম। বললাম আমি এখনই চাইলে আজই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই। ইনশাআল্লাহ হযরত খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। দুআ করুন, আল্লাহ তায়ালা যেন কোনো নেক সঙ্গিনী দান করেন। আমি যেন পারিবারিক জীবনটাও সুন্নত মোতাবেক চালাতে পারি।

আহমদ আওয়াহ: ইদানিং আপনার অধিকাংশ সময় কথায় অতিবাহিত করছেন?

মুহাম্মদ আহমদ: আসলে আমার কাছে মনে হয়েছে, আল্লাহর নবীর সবচে’ বড় সুন্নত হলো দাওয়াত, এজন্য নবীজি কুরআন শরীফ পাঠ করে শোনাতেন এবং তিনি পবিত্র কুরআনের হাফেযও ছিলেন। আমার মনে হচ্ছে, আমি এই সুন্নাত থেকে মাহরুম হবো কেন? তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা তো আমাকে স্মৃতিশক্তিও দিয়েছেন। এজন্য আমি কুরআন শরীফ মুখস্ত করা শুরু করেছি। আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া তিন মাসে ষোল পারা হিফয করেছি। এই মুহূর্তে আমার প্রধান সাধনা হলো কুরআনে কারীমের হিফজ। আমি সবচে’ বেশি সময় এখন এতেই ব্যয় করছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক শুকরিয়া। আপনার গাড়ির সময় হয়ে এসেছে।

মুহাম্মদ আহমদ: জি, আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তখন আবার কথা হবে।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান : মার্চ ২০০৮
অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ