ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ খালেদ (বিনোদ কুমার খান্না) এর একটি সাক্ষাৎকার

আমি বলি যে, মুসলমানদের দাওয়াতী অনুভূতি সৃষ্টি করা খুবই জরুরী। যদি মুসলমানদের মাঝে এই জিম্মাদারির অনুভূতি জাগে তাহলে দাওয়াতের কাজ করা সহজ হয়ে যাবে। বর্তমান পরিবেশ খুবই অনুকূল। ওদিকে পিপাসা ও অস্থিরতা আছে। কিন্তু আমাদের ভেতর যদি মানুষকে কিছু দেবার ও পরিতৃপ্ত করার চেতনাই না থাকে তাহলে কী করা যাবে? এ জন্য মাওলানা সাহেব সর্বদা এই চিন্তায় অস্থির থাকেন এবং দিন রাত এ কথাই বলেন, মুসলমানদের তথা সমস্ত মানব জাতির বরং বলতে গেলে গোটা সৃষ্টি জগতের সমস্ত সমস্যার সমাধান হলো, মুসলমানদের ভেতর দাওয়াতী জিম্মাদারির অনুভূতি জাগ্রত করা। এ ব্যাপারে অনেক কাজ করা দরকার।


মুহাম্মদ খালেদ. আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আহমদ আওয়াহ. ওয়া আলাইকুমুুুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ. ভাই খালেদ সাহেব! আপনাকে একটু কষ্ট দিতে চাই। আমাদের এখানে ফুলাত থেকে আরমুগান নামে একটি দাওয়াতী উর্দূ পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।

মুহাম্মদ খালেদ. হ্যা, আহমদ ভাই! আরমুগান সম্পর্কে বেশ অবগত আছি। এতে আমার নাম প্রকাশিত হলে তা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হবে। আপনি যা জানতে চান বলুন আমি প্রস্তুত।

আহমদ আওয়াহ.  প্রথমে আপনার পারিবারিক পরিচয় দিন?

মুহাম্মদ খালেদ. আলহামদুলিল্লাহ! আমার বর্তমান নাম মুহাম্মদ খালেদ এবং আমার পারিবারিক নাম ছিল বিনোদ কুমার খান্না। ১৯৫২ সালের ২রা আগস্ট পাঞ্জাবের প্রসিদ্ধ শহর জালেন্দরে আমার জন্ম। আমার পৈতৃক নিবাস পাটিয়ালায়। আমার পিতার নাম ড.অনিল কুমার খান্না। পেশাগত দিক দিয়ে তিনি একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। পাঁচ বছর আগে বিদ্যুৎ ও পানি বিভাগের হাইডেল শাখার এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। আমিও ইলেক্ট্রিকেল বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করি এবং পিতার বিভাগেই চাকুরী পাই। ১৫ বছর যাবত আমার পোস্টিং জালেন্দরেই। তিন বছর আগে প্রমোশন হবার সঙ্গে বদলী হই। বর্তমানে আমি সেখানে স্বপরিবারে থাকি। অনেক দিন হলো, মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত হয়নি। আমাকে অফিসের কাজে দিল্লী আসতে হয়েছিলো। তাই সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। আলহামদুলিল্লাহ! সাক্ষাৎ হয়ে গেল এবং জরুরী কিছু পরামর্শ হলো।

আহমদ আওয়াহ. দয়া করে আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কিছু বলবেন?

মুহাম্মদ খালেদ. আজ থেকে তেরো বছর পূর্বে ১৯৯২ সালের ১৯ এপ্রিল আমি দিল্লীতে অফিসের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম। দিল্লী থেকে সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেসের টিকিট কেটে ট্রেনে বসলাম। ট্রেনটি মুজাফ্ফরনগর স্টেশনে পৌঁছল। লোকজন ট্রেনে উঠলো। এদের মধ্যে একজন (আমি যদি জন্মসূত্রেপ্রাপ্ত ভাষায় বলি) দেবতাও আরোহণ করলেন। আমার ধারণা সেই ভাষায় এটাই সঠিক হবে। ইসলামি ভাষায় দয়ালু ও মেহেরবান প্রভুর ফেরেস্তা এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর সত্যিকার ওয়ারিসও বলতে পারি। তিনি আমার থেকে অল্প দূরে তৃতীয় সিটে বসলেন। ২ মিনিট গাড়িটি থামল। এরপর গাড়ি খুব দ্রুত ছেড়ে দিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ির গতি বৃদ্ধি পেল। আহমদ ভাই ! সেই দেবতা ও ফেরেস্তা সুলভ মানুষটি হলেন আপনারই পিতা মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেব। যিনি আমার অন্তরঙ্গ পরম সুহৃদ।

আমার পাশেই মুজাফ্ফরনগরের একজন গ্রাম্য ব্যাক্তি বসে ছিলেন। সম্ভবত; তিনি জাট চৌধুরী হবেন। গাড়ির গতি বৃদ্ধি পেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, মুজাফ্ফরনগর আসতে আর কতটুকু দেরী? উত্তরে মাওলানা সাহেব বললেন তাউজী! গাড়ি মুজাফ্ফরনগর তো ছেড়ে এলো। আমরা যেখানে উঠেছি সেটাই মুজাফ্ফনগর ছিল। আর চৌধুরী সাহেবকে মুজাফ্ফনগর স্টেশনে নামতে হবে। তাই তিনি সিটের নিচ থেকে তার মাল-সামানগুলি বের করে মাথায় নিয়ে নামার উদ্দেশ্যে দরজার দিকে অগ্রসর হলেন এবং চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামতে চাইলেন। মাওলানা সাহেব তার হাত ধরে থামিয়ে দিলেন দু‘হাত দিয়ে আটকালেন ও বললেন, তাউজী! আপনি এখন আর নামতে পারবেন না। আপনি দেওবন্দ স্টেশন পর্যন্ত চলুন। সেখানে গাড়ি থামাবে। আপনি নেমে অন্য গাড়িতে মুজাফফরনগর চলে আসবেন। সেই চৌধুরী সাহেব নামার জন্য এই বলে জিদ করতে লাগলেন যে, আমার মেয়ের বিয়ের কথা পাকা-পাকি করার জন্য পাত্রপক্ষ আসছে আমাকে দ্রুত পৌঁছতে হবে।

মাওলানা সাহেব তাকে টেনে নিজের সিটের দিকে নিয়ে এলেন এবং তাকে বুঝাতে লাগলেন যে, তাউজী! আপনি জীবিত থাকলেই তো আপনার মেয়ের বিয়ের কথা পাকাপাকি করতে পারবেন। চলতি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামলে বাঁচবেন কীভাবে? সে নেমে যাওয়ার জন্য জিদ করছিল। কিন্তু মাওলানা সাহেব মজবুতভাবে তার গতিরোধ করে রাখলেন এবং বললেন যে, দেওবন্দের আগে আপনাকে নামতে দেবো না। চৌধুরী সাহেব যখন বুঝতে পারলেন যে, চলন্ত গাড়ি থেকে আমাকে কিছুতেই নামতে দিবেনা ; তখন বাধ্য হয়ে আপন সামান-পত্র সিটের নিচে রাখলেন। দেওবন্দ স্টেশন এলে গাড়ি থামলো। মাওলানা সাহেব তার পুটলী নিজ হাতে উঠালেন ও তাকে নামিয়ে দিলেন। এরপর পুটলী হাতে তুলে দিলেন।

আমি এই পুরো দৃশ্যটি বসে বসে দেখছিলাম। আমাদের পরিবারকে খুব ধার্মিক মনে করা হতো। স্বয়ং আমার নিজের ব্যাপারেও এই ধারণা ছিল যে, আমি একজন সামাজিক মানুষ। এই দৃশ্য দেখে আমার বিবেকে খুব আঘাত লাগে। আমার মনে হলো যে, আমারই স্বধর্মী হিন্দু ভাই আমারই সামনে থেকে উঠে গিয়ে কেমন যেন চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যাচ্ছিলো আর একজন ভিন্নধর্মী মুসলমান ব্যক্তি এই উৎকট সাম্প্রদায়িকতার যুগে (যুগটি ছিল বাবরি মসজিদ রামজন্মভূমির অগ্নি যুগে) তার জীবন বাঁচালো! মাওলানা সাহেব যদি তাকে বাধা না দিতেন এবং টেনে না নিয়ে আসতেন তাহলে চৌধুরী সাহেব তো মারাই যাচ্ছিলেন। আমি নিজ অবস্থার উপর খুব লজ্জিত হলাম। আমার সিট থেকে উঠে মাওলানা সাহেবের সামনের সিটে বসলাম। মাওলানা সাহেবকে বললাম, মাওলানা সাহেব! আপনি আমাকে অনেক বড় শাস্তি দিয়েছেন এবং এমন কষ্ট হচ্ছে যে, মন চাচ্ছে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যাই। মাওলানা সাহেব আমাকে পরম স্নেহভরে বললেন, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি তো আপনার থেকে দূরে বসেছি। আপনার সঙ্গে আমার কোন কথা-বার্তাও হয়নি। তারপরও যদি কোন কষ্ট হয়ে থাকে তাহলে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি আমার ভ্রমনসঙ্গী। আর একজন মুসলমানের উপর তার সফর সঙ্গীর বিরাট হক থাকে।
আমি বললাম, মাওলানা সাহেব! হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের এই অগ্নিযুগে আপনি একজন হিন্দুকে মহাব্বতের সাথে পরিশ্রম করে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আর আমার এই ধর্মীয় ভাই কেমন যেন আমার সামনে থেকে উঠে মারাই গেলো। আমার এতটুকু অনুভূতি এলোনা যে, আমি তাকে ঠেকাই। অথচ আপনি দূর থেকে গিয়ে তাকে বাঁচানোর জন্য অস্থির হয়ে গেলেন। তখন আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার মত অনুভূতিহীন ব্যক্তির বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। বাস্তবেই মাওলানা সাহেব! আপনার জন্য এটা ছিল গৌরবের বিষয়। আপনার এ আচরণ আমাকে বিরাট শাস্তি দিয়েছে। আমার বুঝে আসছে না আমি নিজেকে এর কী শাস্তি দেবো?

মাওলানা সাহেব আমার এই অনুভূতি দেখে খুব খুশী হলেন এবং অত্যন্ত স্নেহভরে আমার দুই হাত ধরে চুমু খেলেন। বললেন, প্রিয় ভাইটি আমার! মালিকের দয়া যে, আপনার এই অনুভূতি হয়েছে অন্যথায় এই দুনিয়াতে সকলেই নিজেকে তার মধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। আর আমি তো আপনার থেকেও অকেজো ও নিষ্কর্মা। আল্লাহর দয়া যে, তিনি আমাকে মুসলিম পরিবারে জন্ম দিয়েছেন। যার কারণে মানবতার কিছু মূলনীতি পেয়েছি। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন মানুষ ও জীব জন্তু কার কী অধিকার বলে দিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ মাওলানা সাহেব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী শুনালেন এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লামের সত্যিকার ওয়ারিস আল্লাহ ওয়ালাদের ঘটনা শুনালেন। কথা হচ্ছিল, স্নেহ-মমতা ও ভালবাসার এবং বক্তাও ছিলেন এমনতরো যে, আশ-পাশের লোকেরা জড়ো হয়ে গেলো। বারবার হৃদয় বিগলিত হচ্ছিলো। কিছু মানুষ তো কেঁদেই ফেললেন।

আমি মাওলানা সাহেবের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বললেন, সুফি দরবেশদের এক প্রসিদ্ধ ও ঐতিহাসিক গ্রাম ফুলাত যেখানে পৃথিবীর প্রসিদ্ধ ইসলামি স্কলার শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি সেখানেই থাকতেন। মাওলানা সাহেব আমাকে ঠিকানা লিখে দিলেন এবং আমার ঠিকানাও জেনে নিলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন যে, আমি জালেন্দরের ইঞ্জিনিয়ার, তখন তাঁর ঘনিষ্ট দু‘জন সাথীর ফোন নাম্বার ও ঠিকানা লিখে দিলেন, যারা জালেন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে যাতায়াত করেন এবং আমাকে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য খুব জোর দিলেন। মূলত; মাওলানা সাহেবের সেই দুই সাথী তাঁর মুরিদ ছিলো। জালেন্দর গিয়ে আমি তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করি। তারা আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে। তাঁরা আমাকে মাওলানা সাহেবের লিখিত ‘আপকি আমানত আপকি সেবামে’ এবং “ইসলাম কেয়া হ্যায়?” নামক দু‘টো বই পড়তে দেন। ট্রেনের ভিতরেই ইসলামের এক ঝলক আলো আমি মাওলানা সাহেবের আমলের রূপে দেখেছিলাম। আর এই বই দু‘টো পড়ার পর আমার আর কোন সন্দেহের অবকাশ রইল না। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।

শুরুতে আমাকে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার খবর গোপন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এক বছর পর্যন্ত আমি প্রকাশ করিনি। কিন্তু পরে আমার খেয়াল হলো যে, আমি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি হয়ে একটি ভুল পথে প্রকাশ্যভাবে চলবো, আর আল্লাহর যমিনের উপর আল্লাহর আসমানের নিচে বসবাস করে গোপনে আল্লাহর এবাদত বন্দেগি করবো, এ আবার কী ধরণের ভীরুতা ও কাপুরুষতা? আমি আদালতে গিয়ে আমার ইসলাম গ্রহণের আইনগত কাগজ-পত্র প্রস্তুত করে নিলাম। এরপর আমার পরিবারের লোকদের সামনে প্রকাশ করলাম। আমার স্ত্রীকেও বলে দিলাম। পরিবারের লোকেরা আমার প্রতি খুবই ক্ষিপ্ত হলো। আমার পিতা ছাড়া সকলেই আমাকে গাল-মন্দ করতে লাগলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললো। আমার আব্বু বললেন, এভাবে ঝগড়া-বিবাদ করার দ্বারা কোন লাভ নেই। সে পাগলতো নয়; শিক্ষিত ছেলে। সতর্ক ও বুদ্ধিমানও বটে। একথা ঠিক যে, ধর্র্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত একটা বড় ধরণের সিদ্ধান্ত। খুব চিন্তা-ভাবনা করে নেওয়া উচিত। আমি তাঁকে বলে দিই যে, আমি দু‘বছর খুব ভেবে-চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

ইসলামকে পুরোপুরিভাবে জানা ও নামাজ রোজা ইত্যাদি শিখার জন্য একজন লোক খুঁজছিলাম। এমন সময় সাহারানপুরের অধিবাসী একজন মাওলানা এশতেয়াক সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁর কাছে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। তিন-চার দিন পর তিনি আমাকে বললেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর আপনার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। কেননা সে হিন্দু এখন তাঁর সঙ্গে আপনার থাকাটা বৈধ নয়। আমি খুব চিন্তা-ভাবনা করেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আমার ইচ্ছা ছিল যে, একজন পাক্কা মুসলমানের মত ইসলামের প্রত্যেকটি নিয়ম-কানুনকে শিখবো ও জানবো। আমি একটি রুম ভাড়া নিলাম এবং স্ত্রীকে আমার অপারগতার কথা বললাম। সমস্যা ছিল আমার দুই বাচ্চাকে নিয়ে। একটি তখন দুধ পান করছিল। এই সমস্যার পরেও আমার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে বিরোধীতা করা হয়েছে এবং আমাকে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

মাওলানা ইশতেয়াক সাহেব আমাকে বললেন, মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেবকে আমরা জালেন্দরে দাওয়াত দিয়েছি। তিনি আগামী সপ্তাহে পাঞ্জাব সফরের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। তাঁর মূল সফর ছিলো লুধিয়ানা জেলার সুুমরালায়। আমি নিয়ত করলাম, মাওলানা সাহেবের জালেন্দর সফর হোক আর না হোক, কথা বলার সুযোগ থাকুক আর না থাকুক সুমরালা গিয়েই সাক্ষাৎ করবো । আমি ছুটি নিয়ে দুপুরের আগেই সুমরালায় পৌঁছে গেলাম। আছরের পর মাওলানা সাহেব এলেন। সাক্ষাৎ হয়ে গেল। আমার ইসলাম কবুল করায় তিনি খুব আনন্দিত হলেন এবং আমাকে বললেন যে, কয়েক রাত তিনি আমার হেদায়াতের জন্য দু’আ করেছেন যে, হে আল্লাহ! কত ভালো মানুষ। বিবেকবান মানুষ। সে তো অবশ্যই হেদায়াত পাবার হকদার। আল্লাহর শুকরিয়া যে, আমার আল্লাহ সে কথাগুলো শুনেছেন। আমার স্ত্রীর থেকে পৃথক হওয়া অদ্ভুত সমস্যাগুলিকে কেন্দ্র করে মাওলানা সাহেবর সাথে পরামর্শ করলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে আল্লাহর প্রত্যেক হুকুম মানা ও তার সন্তুষ্টির উপর ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সাথে এও বললেন যে, আপনাকে যে কোন হুকুমের উপর আমল করার আগে কোন দা’য়ীর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। কেননা দাওয়াতের বিধান হয় আলাদা।

ইসলামি শরিয়াতের মূলনীতি হলো, দু‘টো লাভের মধ্যে যদি একটি গ্রহণ করতেই হয় তাহলে, সেটাই গ্রহণ করতে হবে; যেটাতে বেশি লাভ। আর দু‘টো ক্ষতির মধ্যে যদি একটা ক্ষতি মেনে নিতেই হয়, তবে সেটাই মানতে হবে; যাতে ক্ষতির পরিমাণ কম। আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা হলো, এমতাবস্থায় যদি সতর্কতা ও সাবধানতার সাথে স্বামীকে স্ত্রীর সাথে রেখে দেওয়া হয়। আর স্বামী যদি স্ত্রীর হেদায়াতের গভীরভাবে ফিকির করে, তাহলে স্ত্রী-পুত্র সবাই মুসলমানই হয়ে যায়। আর যদি পৃথক করে দেওয়া হয়; তাহলে এ সম্ভাবনা খুব কমই থাকে। এমতাবস্থায় গায়রে মাহরামের সাথে থাকা একটি গুনাহ। কিন্তু দু‘টি সন্তান ও স্ত্রীর ইসলাম গ্রহণের আশায় এটাকে মেনে নেয়া যেতে পারে। অতএব আল্লাহর কাছে তওবাহ করতে থাকুন এবং অল্প কিছু দুরত্ব বজায় রেখে সতর্কতার সাথে থাকুন। অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্ক মনে করে থাকবেন না বরং নিজেকে একজন দা’য়ী এবং তাকে মাদউ’ (দাওয়াতের উদ্দিষ্ট ব্যক্তি) ভেবে থাকবেন। মাওলানা সাহেব আমাকে তাঁর ফোন নাম্বার দিলেন এবং গুরুত্ব দিয়ে বললেন, কোন সমস্যা-সংকটে ফোনে পরামর্শ করবেন।

এই সাক্ষাৎ আমার জন্য পরম শান্তি বয়ে আনলো। আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। বাসায় আমার ট্রেনের ঘটনার সাথে মাওলানা সাহেবের পরিচয় করে রেখেছিলাম। সুমরালা থেকে ফিরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বললাম, মাওলানা সাহেব আমাকে অনেক গাল-মন্দ করেছেন এবং বলেছেন যে, মুসলমান হয়ে এত সুন্দর অনুগত ও প্রেয়সী স্ত্রীকে কিভাবে পরিত্যাগ করতে পারো? এখন তো তার হক আরো বেড়ে গেছে। আমি আমার স্ত্রীকে এটাও বলেছি, মাওলানা সাহেব আমাকে এ কথাও বলেছেন যে, সবচাইতে ভালো মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজ স্ত্রীর সাথে আচার-ব্যবহারে উত্তম। মাওলানা সাহেব আমাকে উর্দূ কুরআন শরীফ পাঠ করার পরামর্শ দিয়েছেন। আমি প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কুরআন শরীফ পড়তে শুরু করি এবং আধা ঘণ্টা স্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য ব্যয় করি। সেখানে তার সাথে ভালোবাসার কথা বলি এবং ইসলামের সত্যতা ও হিন্দু ধর্মের যুক্তি-বুদ্ধি বিরোধী কিছু কথা বলি।

চার বছর লাগাতার লেগে থাকার পর আমার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করতে সম্মত হয়। এদিকে আমিও কুরআন শরীফ এবং উর্দূ এমনভাবে পড়েছি যে, আমি উর্দূ ভালোভাবে লিখতে সক্ষম। ১৯৯৯ সালে জানুয়ারিতে আমার স্ত্রীকে নিয়ে দু‘দিনের জন্য ফুলাত সফর করি। মাওলানা সাহেব খুব খুশি হলেন এবং বললেন যে, আপনার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে। তখন আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের সন্তান চারজন ছিল। আর একজনের জন্মের সময় কাছাকাছি ছিল। এমন সময় আমার জন্য হজ্জের সফর করা কঠিন ছিল। ফলে আমরা পরের বছর হজ্জের পাকা-পোখতা নিয়ত করি। আলহামদুলিল্লাহ! ২০০০ সালে পাঁচ বাচ্চাসহ হজ্জের সৌভাগ্য অর্জন করি। হজ্জের এই সফরে দশদিন মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থান আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগে। ১৯৯৬ ইং মাওলানা সাহেবের ‘আরমুগানে দা‘ওয়াত’ নামক বইটি পড়ি। পড়ার পর আমার অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সমস্ত মানবজাতিকে নবী (সা.)-এর ব্যথা ও দরদের সাথে ইসলামের দাওয়াতকে লক্ষ ও উদ্দেশ্য বানানো ব্যতিত মুসলমানিত্বের দাবি মিথ্যা।

ব্যাস! আমাকে কিছু করতে হবে ভেবে আমি জালেন্দরে চামরার রঙ করে এমন একটি গ্রামকে দাওয়াতী কাজ করার জন্য চিহ্নিত করি। আমার সাথে কিছু লোককে জড়িয়ে নিলাম এবং পরিবারের লোকদের উপর মেহনত করার পাশা-পাশি ঐ এলাকার মানুষের উপর কাজ করা শুরু করলাম। আলহামদুলিল্লাহ! কয়েক বছরের প্রচেষ্টা আল্লাহ তা’আলা কবুল করার ফলে, পাঞ্জাবে এ বংশের প্রায় দু‘শো মানুষ কুফর ও শিরক থেকে তওবা করেছে। জালেন্দরে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা বানিয়েছি। এছাড়াও গুরুদওয়ারের তিনজন পুরোহিত মুসলমান হয়েছে। এটা আমার মদিনার উপস্থিতির অত্যাশ্চর্য আবেগে হয়েছিল। মন চাচ্ছিল যে, পায়ে না চলে প্রিয় নবী (সা.)-এর শহরে ডানায় ভর দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলি। রওজায়ে আতহারে পৌঁছে আমি আত্মহারা হয়ে পড়ি। সে ছিল এক আশ্চর্য অবস্থা। আমি অনুভব করলাম যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন।

আমি আমার লজ্জা ও অনুতপ্ততা প্রকাশ করলাম যে, হে প্রিয় নবী! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি তো দাওয়াতের জন্য কত কুরবানী দিয়েছেন, কিন্তু আমরা তো শুধু নামে মাত্র মুসলমান। আরমুগানে দাওয়াত থেকে আমি এই বুঝেছি যে, আপনার মতো দরদ-ব্যথা ব্যতিত ‘আমরা আপনার’ এ কথা বলার অধিকার আমাদের নেই। আমার এই ধারণা কি সত্য? আমাকে এমন মনে হলো যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ধারণাকে সমর্থন করেছেন এবং বলেছেন যে, নিঃসন্দেহে আমার এই কাজ ব্যতীত ‘আমার’ বলার অধিকার নেই। আর তোমার সাথে যেই ভালোবাসা তা হলো এইজন্য যে, তুমি সমাজের অসংখ্য দুর্বল লোকদেরকে জহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছ।

আহমদ আওয়াহ. এই কথাগুলি আপনার জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে?

মুহাম্মদ খালেদ. তাতো বলতে পারি না, আমার নিদ্রাবস্থায় না অজ্ঞাত অবস্থায়। কিন্তু এর মধ্যে এতো মজা ছিল যে, আজ পর্যন্ত এর স্বাদ অনুভব হয়। বরং যখনই আমার বিন্দু পরিমাণ গাফলতি আসে। আমি তার কল্পনা করে নেই। আমার আবেগ সতেজ হয়ে উঠে, এমনকি মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থান কালিন এই ঘটনা আমাকে নেশার মত ছেয়ে ছিল। আলহামদুলিল্লাহ! দশ দিনের মধ্যে এই অধমের সাথে ২১ বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বপ্নে সাক্ষাৎ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ! আমি সেখানেই দাড়ি রাখি এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবন যাপন করার অঙ্গীকার করি। চাকরী করা অবস্থায় এই ব্যাপারে অসতর্কতা বশত; যা হয়েছিল, তার একটি তালিকা তৈরী করি। হজ্জ থেকে ফিরার পর হকদারদের হক আদায় করতে শুরু করি। আল্লাহ তা’আলা আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ সফলতা দান করেছেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনার সন্তানদের লেখাপড়ার কী হল?

মুহাম্মদ খালেদ. আহমদ ভাই! আমার তিন ছেলে। আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, আব্দুর রহীম এবং দুই মেয়ে ফাতেমা ও আয়েশা। আমার স্ত্রীর নাম ও রেখেছি আমেনা। আমি আমার বাচ্চাদের শুধু লেখাপড়ার জন্য একজন মাওলানা সাহেবকে বাসায় রেখেছি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমি পরিবার পরিকল্পনার সমর্থক ছিলাম। ফলে ১১ বছরে আমাদের এক ছেলে এক মেয়ে ছয় বছরের ব্যবধানে জন্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করলাম তখন আমার মনে হলো যে, কোনো কিছু অসম্পূর্ণ ভালো নয়। আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি বুঝে আসুক আর না আসুক আমাকে ইসলামকেই মানতে হবে। আল্লাহ তা’আলা আমাকে ছ’জন সন্তান দান করেছেন। এতে আমি খুবই খুশি। মদিনা মুনওয়ারায় অবস্থানকালে ইসলামের ধারায় আমার অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আমার কাছে ইসলামের প্রতিটি বিধি-নিষেধ একশত ভাগ বিবেক অনুযায়ী সত্য মনে হয়। এমন কি পরিবার পরিকল্পনা তথা জন্মনিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে বড় বড় স্কলারদের সাথে বিতর্ক করতে পারি। আমার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি সন্তান গর্ভধারিনী মেয়েকে বিয়ে করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর আমরা মুসলমান হয়ে আহমক ইংরেজদের খপ্পড়ে পড়ে পরিবার পরিকল্পনার বোকামীপনাকে উন্নতি-অগ্রগতি মনে করছি। এটা কতটা বোকামি! আমার আশা যে, আমার আল্লাহ যদি আমাকে বিশ জন সন্তান দান করেন আর আমি তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ইসলামি হক আদায় করি তাহলে সকলেই উজ্জল নক্ষত্রে পরিণত হবে। ইনশাআল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ আমার সন্তান স্কুলেও যায় এবং দ্বীনি শিক্ষার (ধর্মীয় শিক্ষার) অবস্থায়ও আমি তৃপ্ত ও নিশ্চিন্ত।

আহমদ আওয়াহ. আপনি কি আপনার পিতা-মাতার উপর দাওয়াতী কাজ করেছেন?

মুহাম্মদ খালেদ. আমার উপর আল্লাহর রহম করম যে, আমার আব্বা অবসরের পর পাতিয়ালায় নিজের বাড়ি চলে যান। আর আমি হজ্জের সময় মুলতাজাম (অর্থাৎ কাবা শরীফের দরজা ও হজরে আসওয়াদের মাঝখানের স্থানকে মুলতাজাম বলা হয়) এবং আরাফার ময়দানে আমার পিতা-মাতা ও ছোট বোনের হেদায়াতের জন্য খুব দু’আ করি। হজ্জ থেকে ফিরে প্রথমে পাতিয়ালায় যাই। এমন লাগছিলো যে, আমার পিতা নিজেই প্রস্তুত ছিলেন। মূলত; তিনি পাকিস্তানের সূফী বাবা বুলে শাহ্ চিশতির মুরিদ বাবা সানূলী শাহ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বাবা সানূলী শাহ গুরুদাসপুরের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল ১২৫ বছর। অনেক মুজাহাদা করে ছিলেন। তওহীদে বিশ্বসী ছিলেন। জিকির ইত্যাদি করতেন। পাঞ্জাবী ভাষায় তাছাউফের উপর তার বাণী ছাপা হয়েছে। সম্ভবত তিনি কোথাও তাঁর হাতে বাইয়াতও হয়ে ছিলেন। হজ্জ থেকে ফিরার পর আমার কাছে যমযমের পানি চাইলেন এবং দাঁড়িয়ে খুব শ্রদ্ধার সাথে পান করলেন। মদিনার খেজুরকে চোখে লাগিয়ে মহাব্বতের সাথে খেলেন এবং বারবার বলতে লাগলেন যে, মদিনা এবং মদিনা ওয়ালাদের কথা শুনাও। আমি যখন তাঁকে মদিনার কিছু ঘটনা শুনালাম, তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন বেটা! তুমি বড়ই সৌভাগ্য অর্জন করেছ। তাঁর মদিনার প্রতি এতো শ্রদ্ধা-ভক্তি আমার জানা ছিলো না।

মদিনা ওয়ালার পয়গাম শুনিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে বলি। তিনি বললেন, আমি তো তোমার আসার অপেক্ষায় ছিলাম। আমাকে আমার বাবা শাহ সানূলী স্বপ্নে দেখিয়েছেন তিনি আমাকে বলেছেন সত্যিকারের ধর্ম তো ইসলামই। তারপরও তা মেনে নিচ্ছো না কেন? আমি তাকে কলেমা পড়তে বললে, তিনি কলেমা পড়েন। তার নাম রাখি মুহাম্মদ ওমর। এরপর আমি অত্যন্ত ভালোবেসে আমার মাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বলতে থাকি। তিন দিনের চেষ্টায় তিনিও মুসলমান হয়ে যান। এরপর আমাদের গোটা পরিবারে রইলো কেবলমাত্র আমার ছোট বোন। বিয়ের এক বছর পর সে বিধাব হয়ে যায়। আমাদের সকলের ইসলাম গ্রহণের পর তাকে মুসলমান করতে খুব বেশি চেষ্টা করতে হয়নি। সে নিজে খুব ভাল মানুষ ছিলো। বরং বলতে কি আমাদের সকলের চেয়ে সে ভাল।

আহমদ আওয়াহ. মা-শা-আল্লাহ! খালিদ সহেব! আপনার সাথে আল্লাহর খাস রহমত আছে। নইলে বাড়ির লোকদের ব্যাপারে বিরাট সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়।

মুহাম্মদ খালেদ. আলহামদুলিল্লাহ! আমার আল্লাহ আমার ভাগ্যে সব কিছু বিনা কষ্টে লিখে রেখেছিলেন। আসলেই এর শোকর আদায় করতে পারবো না।

আহমদ আওয়াহ. আপনি তো দিন-রাত দাওয়াতের ধ্যানে থাকেন। আপনার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা ও সমস্যা-সমাধানের কথা জানাবেন?

মুহাম্মদ খালেদ. আহমদ ভাই! আসলে আমার জীবনে আলোকোজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় আপনার পিতার ভালবাসার স্নিগ্ধ পরশে। আমার দৃষ্টিতে কোন আদর্শ বা নবী (সা.)-এর সত্যিকার অনুসারী কোন মুসলমান যদি থাকেন; যাঁকে আমি দেখেছি তাহলে তিনি মাওলানা কালিম সাহেব। আমি বলি লুধিয়ানায় মাওলানা সাহেবের একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন ইসলাম একটি নূর, একটি আলো, আর মুসলমান হলো সেই আলোতে আলোকিত এক ইউনিট। আলো ও আলোকোজ্জ্বল রোশনীর বাধ্য-বাধকতা হলো আলো ছড়ানো। অর্থাৎ মুসলমান হলে সে অবশ্যই দা’য়ী হবে এবং দা’য়ী হবে এ ধরনের যে, তাকে দা’য়ী হিসেবে চেনা যাবে। আমি তো আলহামদুলিল্লাহ আমার কাজ ও মূল পেশা হিসাবে দাওয়াতকেই মনে করি।

আমাকে যদি কেউ আমার পেশা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করে তাহলে আমি এটা বলি না যে, আমি ইলিক্ট্রিকেল বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার। আমি বলি আমার পেশা হলো দাওয়াত। এটা বলাও মাওলানা সাহেবের কাছ থেকে শিখেছি। আলহামদুলিল্লাহ! এই পরিচয়ের দ্বারা আমার অনেক উপকার হয়েছে। প্রথমে এই পরিচয় দিতে শুরু করেছিলাম, বলতে বলতে এই কথা ও এই বিষয়টি চেতনায় বসে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ! আমার বেতনের অর্ধেক টাকা দাওয়াতের জন্য ব্যয় করি। আমার স্ত্রী-সন্তানও সর্বদা সমান শরীক থাকে। আমার ধারণা, আমরা যদি আমাদের মর্যাদা ও পেশায় সচেতন হই। তাহলে দেখা যাবে পুরো দুনিয়ার মানুষ ইসলামের জন্য পিপাসার্ত এবং ইসলামের দাওয়াতের জন্য পরিবেশ একেবারে অনুকূল। এ ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো যে, মানুষ এ কাজের জন্য প্রস্তুত নেই। মুসলমানদের মাঝে দাওয়াতের চেতনা সৃষ্টি করা এবং তাঁকে এ ব্যাপারে তার দ্বায়িত্বের উপলব্ধি করানো তো বেশ কঠিন। মূলত; মানুষ একটি সামাজিক জীব। তার জীবনের প্রত্যেক স্থরে একটি সমাজের প্রয়োজন হয়। তা এমন সমাজ যা ইসলামের উপর বেঁচে থাকার জন্য সহযোগী হয়।

আমি আপনাকে একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা শুনাচ্ছি। জালেন্দরে যারা চামরার কাজ করে (চামার) এমন কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে একজন দ্বায়িত্বশীল ও খুবই ফিকিরমন্দ সাথী আছেন। যিনি পাহলোয়ান নামে প্রসিদ্ধ। চামারদের ভিতর কাজ করার ক্ষেত্রে খুবই কর্মঠ সাথী। হজ্জও করেছেন। সেই এলাকায় ছয়টি মসজিদের ভিত্তি স্থাপনের মধ্যে তারও একটি বড় অংশ রয়েছে। মাদরাসা স্থাপনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করেছেন। নিজের চারটি সন্তানকে হাফেজ বানিয়েছেন এবং বড় মেয়েটিকেও হিফজ পড়িয়েছেন।

চার বার তারাবিতে কুরআন শুনিয়েছে। যখন মেয়েটির বিয়ের সময় হলো, কোন মুসলমান তাকে বিবাহ করতে রাজি হয়নি। চার বছর যাবত চেষ্টা করেছেন। অনেক সাধারণ পরিবারে খুব মামুলী ধরণের ছেলের সঙ্গেও বিয়ের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চামার বংশের বলে মানুষ দূরে সরে যায়। তিনি খুবই আবেগী মানুষ। একান্ত নিরুপায় হয়ে তিনি তাঁর হাফেজ মেয়েটিকে একই সম্প্রদায়ের এক অমুসলিম চামার ছেলের কাছে বিয়ে দেন। যার বাড়িতে শূকর পোষা হয় এবং তার গোস্ত রান্না হয়। এখন পাহলোয়ানের এই অবস্থা যে, মুসলমানদের নাম আসলেই গালি দেয়। আমি তাকে বুঝিয়েও ছিলাম যে, একজন অমুসলিমের কাছে বিয়ে দেওয়া ও হারামে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে অবিবাহিত থাকাই ভালো ছিলো।

আসলে হয়েছিল কি, তার কারখানায় একজন মুসলমান চাকুরী করত সে ছিল নিরক্ষর ও মোটা বুদ্ধির। পাহলোয়ান সাহেব সেই ছেলেকে তার মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করল এবং বলল যে, আমি কখনোও চামারদের মধ্যে বিবাহ করবো না। ব্যাস, তিনি রাগে ও ক্ষোভে বলেন যে, আমার এক মূর্খ অধীনস্থও এই মেয়েকে বিবাহ করতে অস্বীকার করে। এই ক্ষোভে তিনি একজন অমুসলিমের সাথে হিন্দুয়ানী রীতিতে বিয়ে দেন। এ বিষয়টি স্বয়ং আমার জন্যও খুবই দুঃখজনক ছিলো। আর সেই মেয়ে তো পুরো রাত কাঁদতে কাঁদতে অস্থির থাকতো। এমনকি কয়েকবার বিষও পান করেছে। কিন্তু হায়াত ছিল বলে মরেনি।

আল্লাহর দয়া যে, আপনার আব্বুর সেখানে সফর হলো। আমি পুরো ঘটনা শোনালাম। তিনি জালেন্দর গিয়ে পাহলোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে বুঝিয়ে বললেন যে, আপনি আখিরাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই মুসলমান হয়েছেন। তাহলে ওই মুসলমানদের থেকে কী আশা করেন? অতঃপর তাঁর দুই সাথীকে ওই মেয়ের স্বামীর পিছনে দাওয়াত দেওয়ার জন্য লাগিয়ে দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! সে মুসলমান হয়ে বাড়ি ছেড়ে একেবারে চলে এসেছে। তাদের আবার বিয়ে পড়ানো হয়েছে এবং মাওলানা সাহেব পহলোয়ান কে আশ্বস্ত করলেন যে, আপনার মেয়েদের বিয়ের জিম্মাদারী আমাদের। আল্লাহর শোকর! এখন সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। আহমদ ভাই! সত্য কথা হলো যে, ওই মেয়ের স্বামীর ইসলাম গ্রহণ করার আনন্দ আমার মুসলমান হওয়ার চেয়ে বেশি। তার কারণ হলো, যখন আমি মুসলমান হয়েছিলাম তখন আমার দাওয়াতী চেতনা ছিল না। এর বিষয়টি আমার ঘাড়ে চড়েছিল। আমি রাত-দিন এ ব্যাপারে মাওলানা সাহেবের জন্য দু’আ করি।

তাই আমি বলি যে, মুসলমানদের দাওয়াতী অনুভূতি সৃষ্টি করা খুবই জরুরী। যদি মুসলমানদের মাঝে এই জিম্মাদারির অনুভূতি জাগে তাহলে দাওয়াতের কাজ করা সহজ হয়ে যাবে। বর্তমান পরিবেশ খুবই অনুকূল। ওদিকে পিপাসা ও অস্থিরতা আছে। কিন্তু আমাদের ভেতর যদি মানুষকে কিছু দেবার ও পরিতৃপ্ত করার চেতনাই না থাকে তাহলে কী করা যাবে? এ জন্য মাওলানা সাহেব সর্বদা এই চিন্তায় অস্থির থাকেন এবং দিন রাত এ কথাই বলেন, মুসলমানদের এবং সমস্ত মানব জাতির বরং বলতে গেলে গোটা সৃষ্টি জগতের সমস্ত সমস্যার সমাধান হলো, মুসলমানদের ভেতর দাওয়াতী জিম্মাদারির অনুভূতি জাগ্রত করা, এ ব্যাপারে অনেক কাজ করা দরকার।

আহমদ আওয়াহ. অনেক অনেক শুকরিয়া খালেদ ভাই! ‘আরমুগানের’ জন্য অনেক মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি, কিন্তু আমার খুবই অনুভূতি জাগছে যে, আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দাওয়াতী কাজের যেভাবে বুঝ দান করেছেন, অন্য কাউকে দেননি। আপনার সাথে থেকে এ বিষয়ে আরো কিছু শিখতে হবে। আল্লাহ যদি সুযোগ দেন তাহলে আপনার সাথে থাকবো।

মুহাম্মদ খালেদ. আহমদ ভাই! আপনি আমাকে লজ্জিত করছেন। আমি নিজে খুবই দুঃখিত ও বিষণœতা বোধ করছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত হওয়ার হক আদায় করছি না। যা কিছু মুখে মুখে বলছি তা আপনার পিতার ব্যাক্ত ব্যথার ফয়েজ। এটা ঠিক যে, মাওলানা সাহেব আমার ও আমাদের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণকারী অসংখ্য মানুষের জন্য এই কথা প্রমাণ করেন যে, ইসলামের জন্য পরিস্থিতি কেমন অনুকূল। মাওলানা সাহেব বলেন যে, দাওয়াতের আওয়াজ দানকারী এক ব্যক্তি অনুভূতিহীন অবস্থায় এক ব্যক্তির গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়তে উদ্দ্যত এক চৌধুরীকে হাত ধরে সিটে বসিয়ে দেয়া; এই ছোট একটি সংবেদনশীলতার আ’মলটি অসংখ্য মানুষের হেদায়েত লাভের উসিলা হয়। এরচে’ বেশি দাওয়াতের পরিবেশ অনুকূল হওয়ার আর কী প্রমাণ চাই?

আহমদ আওয়াহ. সঠিক কথাই বলেছেন। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি অনেক বড় কাজের কথা বললেন এবং এ থেকে ‘আরমুগানের’ পাঠক-পাঠিকার অনেক উপকার হবে ইনশাআল্লাহ। আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

মুহাম্মদ খালেদ. ধন্যবাদ। আপনি আমাকে এই কল্যাণকর কাজে শরীক করেছেন। ওয়া আলাইকুমুুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। ফি আমানিল্লাহ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মে ২০০৫ ইং
আনুবাদঃ মুফতি যুবায়রে আহমদ