ইসলাম কাদের জন্য?

ইসলাম কাদের জন্য?
الحمد لله رب العلمين و الصلوة والسلام على سيد المرسلين وخاتم النبيين وعلى اله واصحا به اجمعين و من تبعهم باحسان ودعا بدعوتهم الى يوم الدين . اما بعد

প্রিয় পাঠক! আমাদের আজকের দরসটির নাম হলো ইসলাম কাদের? এই দরসটি প্রস্তুত করা হয়েছে মুসলমানদের জন্য। এই দরসে অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুরআন সুন্নাহর এমন সব প্রমাণাদি, যার দ্বারা মুসলমানরা নিজ দায়িত্ব অনুভব করতে পারবে।
কোনো অমুসলিম ভাইকে যদি প্রশ্ন কারা হয়, বলুনতো, ইসলাম কাদের জন্য? এর উত্তরে তারা বলবে, ইসলাম মুসলমানদের ধর্ম। একই প্রশ্ন যদি কোনো মুসলমানকে করা হয়, তাহলে তার উত্তরে মুসলমানরা বলবে ইসলাম আমাদের ধর্ম। বন্ধুগণ! উত্তরটি কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক হয়নি। সঠিক উত্তর হলো, ইসলাম সকল মানুষের। ইসলাম হলো, আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ধর্ম। ইসলাম মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। আল্লাহর নেয়ামত হিন্দু মুসলিম সবার জন্য সমান হয়। পৃথিবীর আটশ কোটি মানুষের মধ্যে, মাত্র দুইশ কোটি মানুষ মুসলিম। এটা কীভাবে সম্ভব আল্লাহ তা‘আলা মাত্র ২০ ভাগ মুসলমানকে ইসলামের মতো নেয়ামত দেবেন, আর বাকিদেরকে দেবেন না? না, এটা হতে পারে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ধর্ম সকল মানুষের জন্য। কারণ আল্লাহর নেয়ামত সবার জন্য সমান হয়। যেমন পানি, চাঁদ, সূর্য, শষ্য, ধান, গম ইত্যাদি। আল্লাহর এসব নেয়ামতের মধ্যে কোনো ধরনের ভাগ হয় না। এমনটিও হয় না যে, এটা মুসলমানদের জন্য আর ওটা অমুসলিমদের জন্য। ঠিক ইসলাম যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তাই ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য হতে পারে না। ইসলামকে মানা হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল অমুসলিম ও মুসলিমদের জন্য সমান।
চলুন দেখি কুরআন এ ব্যাপারে কী বলে?
কুরআনে হাকীমে আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা এরশাদ করেন-
اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللهِ الْاِسْلَامُ
নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম।
কোনো অমুসলিম যদি পরকালের সফলতার জন্য, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মকে অনুসরণ করে, তাহলে সে কি সফল হবে? মুক্তি পাবে? না কখনও না । আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَمَنْ يَّـبْتَغِ غَيْرَالْاِسْلَامِ دِيْناً فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَفىِ الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخٰسِرِيْنَ
অর্থ: যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম কামনা করবে, তার থেকে তা কখনই কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আল্লাহ তা‘আলা তার নেয়ামতকে সকল মানুষের জন্য ব্যাপক করেছেন। বাতাস সকল মানুষের জন্য। পানি সকল মানুষের জন্য। চন্দ্র, সূর্য সবকিছু সকল মানুষের জন্য। আর ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য হবে, এটা হতে পারে না। সকল মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম।
এখন প্রশ্ন হলো, এই কথা কি অমুসলিমরা জানে যে, ইসলাম তাদেরও ধর্ম? জানে না। মুসলমানরা জানে। কারণ তারা কুরআন পড়ে। অমুসলিমরা তো আর কুরআন পড়ে না। আমরা মুসলমানরা কি অমুসলিমদেরকে বলেছি যে, ভাই! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, কারণ ইসলাম আপনারই ধর্ম। আপনার মালিকের পক্ষ থেকে আসা ধর্ম যদি আপনি না মানেন, তাহলে আপনাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে জ¦লতে হবে। আমরাকি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি?
বন্ধুগণ! অমুসলিমদেরকে কারা দাওয়াত দিবে? এখন কি কোনো নবী আসবে তাদেরকে দাওয়াত দিতে? না কোনো ফেরেশতা আসবে? কেউ আসবেন না, এই দায়িত্ব আমাদেরই, আমাদেরকেই দাওয়াত দিতে হবে। সকল মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব হলো আমাদের মুসলামানদের। আল্লাহর দরবারে দু‘আ করি, তিনি যেন আমাদেরকে দাওয়াতের হক আদায় করার তৌফিক দান করেন। আমিন!!
আল্লাহ কাদের ?
কোনো অমুসলিম ভাইকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুন তো আপনার ¯্রষ্টা বা মালিক কে? কেউ বলবে ইশ্বর, কেউ বলবে ভগবান, কেউ বলবে মালিকে। মুসলমানরা বলবে আমাদের মালিকের না হলো আল্লাহ। এই উত্তর কি সঠিক? আল্লাহ কি শুধু মুসলমানদের ¯্রষ্টা? না, তিনি হলেন সকল মানুষের ¯্রষ্টা ও মালিক। তারই ইবাদত করতে হবে। দেখুন এ ব্যাপরে আল্লাহ তাআলা কী বলেন-
কুরআনে হাকীমে আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা তাঁর ইবাদতের হুকুম দিতে গিয়ে এরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ*

অর্থ: হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেযগারি অর্জন করতে পারবে।

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা (ياايهاالناس) শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ হয়, হে মানুষগণ! এখানে “الناس” শব্দের ভেতর রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নিয়ে, কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে, সকল মানুষ অন্তর্ভুক্ত। এখানে না আছে কোনো যুগের শর্ত, না আছে কোনো অঞ্চল নির্দিষ্ট। বরং সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিচ্ছেন। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সকল অমুসলিম তারাও মানুষ। পৃথিবীর আটশ কোটি মানুষ সকলেই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো আটশ কোটি মানুষ সকলেই কি আল্লাহকে মাননে? আল্লাহর ইবাদত করে? অথবা কমপক্ষে এতটুকু কি জানা আছে যে, আমাদেরকে এক আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে? যদি উত্তর হয় ‘না’। তাহলে কোনো মুসলমানের পক্ষ থেকে অমুসলিম ভাইদের কাছে এ কথা পৌঁছানো হয়েছে? তবে অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব কার? অবশ্যই মুসলমানদের । আমরা কি তাদের কাছে এই দাওয়াত পৌঁছিয়েছি? কখনও কি অমুসলিম ভাইকে বলেছি? ভাই! আপনার মালিক হলেন আল্লাহ, তাকেই মানতে হবে। মুসলমানের উচিত, তারা সকল মানুষের কাছে আল্লাহর পয়গাম ও দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন।
মুহাম্মাদ সা. কাদের নবী?
কোনো অমুসলিমকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বলুন তো! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদের নবী? তারা বলবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের নবী। এমনিভাবে মুসলমানদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুন তো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদের নবী? তখন তারা বলবে তিনি তো আমাদেরই নবী। এই উত্তরগুলো কি সঠিক? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি শুধু মুসলমানদেরই নবী ?
চলুন আমরা কুরআনে হাকীমকে জিজ্ঞাসা করি, কুরআন এ ব্যাপারে কি বলে? কুরআনে হাকীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآَمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ: বলে দাও, হে মানব ম-লী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল, সমগ্র আসমান ও জমিনে তার রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর ওপর, তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর ওপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর এবং তাঁর সমস্ত কালামের ওপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।
আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে النَّاسُ‘মানুষ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, ইয়াহুদী ইত্যাদি, সকলেরই নবী হলেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারণ তারা সকলেই মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি জানে বা মনে করে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাল্লাম তাদেরও নবী? না কখণও না। তারা জানে না। জানবে কিভাবে? তারা তো কুরআন পড়ে না। মুসলমানরা কুরআন পড়ে। কিন্তু আমরা কোনোদিন কোনো অমুসলিমদেরকে বলি নি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম তাদেরও নবী। এর জন্য অপরাধী হলাম আমরাই ।
উপরোক্ত আয়াতে লক্ষ করলে আরো একটি বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। এখানে جَمِيعًا শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে। যার অর্থ হলো ‘সবাই’এখানে বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে, কোন শব্দ প্রয়োগ করা হয়নি। অতএব, আমাদের জন্য উচিত, আমরা নিজেরা ভুল ধারণা পোষণ করবো না এবং অন্য মানুষের ভুলটি ভাঙিয়ে দিবো। চলুন আমরা সকল মানুষের কাছে এই পয়গাম পৌঁছিয়ে দিই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাদের হক আদায় করার তৌফিক দান করুন।
কুরআন কাদের?
কুরআন সম্পর্কে আমাদের মাঝে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। কোনো হিন্দু ভাইকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুনতো কুরআন কাদের গ্রন্থ? উত্তরে তারা বলবে এটা মুসলমানদের গ্রন্থ। আমাদের গ্রন্থ হলো গীতা, রামায়ন, ইত্যাদি। খ্রিস্টান ভাইয়েরা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলবে আমাদের কিতাব হলো বাইবেল। আর কুরআন হলো মুসলমানদের কিতাব। ঠিক কোনো মুসলমানকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বলুন তো কুরআন কাদের জন্য? তাহলে মুসলমানরাও বলবে, কুরআন আমাদের জন্য। চলুন কুরআনকে জিজ্ঞাসা করি, কুরআন এ ব্যাপারে কি বলে- আল্লাহ তাআলা বলেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

অর্থ: রমযান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।

উক্ত আয়াতের প্রতি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, هُدًى لِلنَّاسِ (সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েত) বলা হয়েছে। তাতে শুধু মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়নি, তা কেবল তোমাদের জন্য পথ প্রদর্শক। অতএব, আমরা যদি মনে করি যে, আল-কুরআন শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ, তাহলে তা হবে নিছক ভুল ধারণা ।
আবার একই প্রশ্ন উঠবে ৬শ কোটি অমুসলিম তারা কি জানে এই কিতাব তাদের জন্য পথ পদর্শক? এর উত্তরে আপনি নিজেই বলবেন অবশ্যই তারা জানে না।
কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য হলো, সকল মানুষের হেদায়াত। শুধু মুসলমানের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহ তা‘আলা সকল মানুষকে তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু শুধু ২০ ভাগ মানুষ মুসলমান এবাদাত করবে? এমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু মাত্র ২০ ভাগ মানুষ তার ওপর ঈমান আনে। ঠিক কুরআন আল্লাহ তা‘আলা সকল মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু এর অনুসারী মাত্র ২০ ভাগ। বাকি ৮০ ভাগ অমুসলিম তাদের এটাও তো জানা নেই যে, আল্লাহ তাদের প্রতিপালক। তাদেরকে আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। এও জানে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও নবী। কুরআন তাদের হেদায়েতের জন্য এসেছে এটাও তাদের জানা নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তা‘আলা কি ৮০ ভাগ অমুসলিমদের জন্য আরো কোনো ধর্ম পাঠাবেন? তাদের জন্য কি আরো কোনো রাসুল আসবেন? না, কখনও না। কারণ আল্লাহ তা‘আলার একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন শেষ রাসুল তার পরে আর কোনো নবী আসবেন না। ওহীর ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে গিয়েছে। আর নতুন কোনো কিতাব তো আসার প্রশ্নই আসে না। এখন দেখতে হবে ৮০ ভাগ অমুসলিমদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছানো এবং তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব কাদের? আল্লাহ তা‘আলা কি মুসলমানাদেরকে শুধু মুসলমানাদের এসলাহের জন্য পাঠিয়েছেন? না কি অমুসলিমদের পর্যন্ত ইসলাম পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন? দেখুন এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কী বলেন।

মুসলমান কাদের জন্য?
সাধারণ মুসলমানদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমারা কাদের জন্য তাহলে অনেকেই বলেন, আমরা আল্লাহর জন্য। এই উত্তরটিও সঠিক তার অবস্থান থেকে। সামষ্টিকভাবে আমরা হলাম সকল মানুষের জন্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল মানুষের জন্য বের করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كنتم خير امة اخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر..
তোমরা সর্বত্তম জাতি, তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর।
এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা النَّاسُ‘মানুষ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ হলো, অমুসলিমরাও মানুষ। মুসলিম জাতিকে শুধু মুসলমানদের জন্য পাঠাননি বরং সকল অমুসলিমদের জন্যও পাঠিয়েছেন।
বিশ্বের মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। (১) خير امة ‘উত্তম জাতি’ বলে সম্বোধন করেছেন। (২) الناس‘মানুষ’। অর্থাৎ মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আর ৬শত কোটি অমুসলিম “মানুষ” এর জন্য । ২শত কোটি মুসলমান خيرامة ‘উত্তম জাতি’ ৬শত কোটি অমুসলিম মানুষকে المعروف সৎকাজের আদেশ করবে এবং المنكر অসৎ কাজের বাঁধা প্রদান করবে।
এই আয়াতে একটি সুক্ষ্ম বিষয় বুঝা যায়। তা হল উম্মতের দায়িত্বকে ঈমানের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। জিম্মাদারি দুই প্রকার।
(১) ব্যক্তিগত জিম্মাদারি। (২) সমষ্টিগত জিম্মাদারি।
ব্যক্তিগত দায়িত্বে আল্লাহ তা‘আলা নিজের হক প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন। وما خلقت الجن واللأنس الا ليعبدون
কিন্তু যেখানে সমষ্টিগত দায়িত্বের কথা আলোচনা করা হয়েছে, সেখানে বান্দার হককে প্রধান্য দিয়েছেন।
উপরোক্ত আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উম্মত যেন জাতীয় দায়িত্বের কথা চিন্তা করতে গিয়ে এ ধোঁকায় না পড়ে যে, এটাতো আমার কাজ নয়। আমার দায়িত্ব নয়। এর দ্বারা জাতিয় দায়িত্বের অনুভব হয়।
উল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে মুফাস্সিরগন লিখেছেন- خير امة উত্তম জাতি হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত।
(১) امربالمعروف সৎ কাজের আদেশ। (২)نهي عن المنكر অসৎকাজের নিষেধ। (৩) ايمان بالله আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।
একটু ভাবুন, আমরা কি এই তিনটি শর্তের ওপর আমল করছি? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে আমরা কি উত্তম জাতি? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এই জাতিকে উত্তম জাতি বানানোর ফিকির করতে হবে কি-না? এই জন্য আমাদেরকে امربالمعروف এবং نهي عن المنكر অর্থাৎ ধর্মের দাওয়াত ও তাবলিগ করতে হবে।
যদি আমরা এই জিম্মাদারি আদায় না করি, তাহলে আমাদের ওপর আসতে পারে আল্লাহর কঠিন শাস্তি।
মোটকথা, মুসলমানদের কাজ হলো, সকল মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেবে। তাদের সামনে কুরআন ও নবীজীর পরিচয় তুলে ধরবে। আর ইসলামের পরিচয় করিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে।
আল্লাহর দরবারে দু‘আ করি, তিনি যেন উম্মতকে তার জিম্মাদারির হক আদায় করার তৌফিক দান করেন। আমিন! অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব শুধু শরয়ী না, মানবিক দায়িত্বও বটে।
অমুসলিমদের দাওয়াত দেয়া মানবতার দাবি
মানব থেকে মানবতা, প্রতিটি মানুষের মানবতার দাবি হলো, সে অন্য মানুষের উপকার করবে। আর কেউ যদি কোনো বিপদে পড়ে তাহলে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। আমরা মুসলমানগণ জানি, প্রতিটি অমুসলিম মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ তাআলা বলেনÑ
إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِيْنَ فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِيْنَ فِيْهَا اُولـٰئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ
অর্থ: আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারা সৃষ্টির অধম।
প্রিয় পাঠক! আপনার প্রতিবেশী হিন্দু বা খ্রিস্টানদের বাড়িতে যদি আগুন লেগে যায়, তাহলে আপনি কি বসে থাকবেন? না আগুন নিভাতে যাবেন? অবশ্যই আগুন নিভাতে যাবেন। আল্লাাহ না করুন, যদি কোনো মুসলিম মহল্লায় আগুন লেগে যায়, তাহলে প্রতিবেশী অমুসলিম ভাইয়েরা কি বসে থাকবেন? না আগুন নিভাতে যাবে না? অবশ্যই আগুন নিভাতে আসবে। দেখুন! আমরা দুনিয়াতে ক্ষণস্থায়ী আগুন থেকে উদ্ধার করার জন্য কত সুন্দর মানবতার পরিচয় দিয়ে থাকি। কিন্তু একটুু কি চিন্তা করেছি যে, দুনিয়ার আগুনে জ্বলে যদি কারো ত্বক নষ্ট হয়ে যায়, বা ঘর-বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যায়, তাহলে ঔষধ দ্বারা পুনরায় ত্বক ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে উত্তম বাড়ি বানানো সম্ভব। কিন্তু যে ভাইটি ইসলাম গ্রহণ না করে, চিরস্থায়ী আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, যার থেকে ফেরানো বা বাঁচানোর কোনো পথ নেই, সেই চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য কি কখনো ভেবেছি?
প্রিয় পাঠক! আমাদের অনেক অমুসলিম বন্ধু আছেন, যাদের সাথে একত্রে চলা-ফেরা করি। একই অফিসে চাকরি করি। তার দোকান থেকে কেনা-কাটা করি। তার বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত বাড়াই। একথাও জানি এই ভাইটি মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী আগুনে জ্বলবে।
প্রিয় পাঠক! আমাদের কেমন মানবতা? আমার সামনে আমার এক ভাই বা বোন জাহান্নামের চিরস্থায়ী আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, কিন্তু কোনো দিন এই ভাইটিকে বলিনি যে, ভাই! তুমি যে পথে চলছো এটা জাহান্নামের পথ। কোনো দিন তাকে জান্নাতের পথ ইসলাম দেখাইনি। কেমন জানি তাকে আগুনে জ্বলতে দেখেও আমি চুপ হয়ে আছি। এটা আমাদের কেমন মানবতা? আর কতো দিন এভাবে দেখব? বলুন! এভাবে আর কতোদিন বসে বসে তাদেরকে আগুনে ঝাঁপ দিতে দেখব? চলুন, আর সময় নেই, আমার কাছে যদি সত্যিকার মানবতা থাকে, তাহলে আমার প্রতিবেশী অমুসলিমকে আগুনে জ্বলতে দেব না। আমাদের দায়িত্ব হলো তাকে জান্নাতের পথ দেখিয়ে দেয়া। মানা না মানা তার ব্যাপার। দাওয়াত পাওয়া তাদের অধিকার, গ্রহণ করা-না করা তাদের এখতিয়ার। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাদের আমানত ‘ইসলাম’ তাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে ওদেরকে চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর মাধ্যম বানিয়ে নিন এবং আমাদের ওপর তিনি খুশি হয়ে যান। আমীন।
জালিম কে?
আসুন, আমরা একটু ভাবি, অমুসলিম সম্প্রদায় আমাদের সাথে যে শত্রুতা পোষোণ ও অত্যাচার করে, তা তিন প্রকার। অমুসলিমদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর অবমাননাকর বা উগ্র কথা বার্তা। যা আমাদের কানে আসে বা চোখে পড়ার কারণে অন্তর ব্যথিত হয়। তাদের আচরণে আমরা কষ্ট পাই বা আমাদের মন ভাঙে। এর বিনিময়ে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করি। হাদিস শরিফে আছে প্রতিটি বস্তুর মূল্য তত বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, শারীরিক কষ্ট। বিভিন্ন ধরণের দাঙ্গা হাঙ্গামা আমাদেরকে শারীরিকভাবে কষ্ট দেয়। এর ফল কি দাঁড়ায়? হাদিসের এসেছে মুমিনের গায়ে কাঁটা বিঁধলে এর প্রতিদানে তার একটি গুনাহ মাফ হয়, একটি নেকী যোগ হয়। মর্যাদার সিঁড়ি এক ধাপ বৃদ্ধি পায়। একটি কাঁটা যখন এতো লাভ তখন এতসব কষ্টের বিনিময়ের তো হিসাব করে শেষ করা যাবে না। আর যখন এসব কষ্ট কেবল মুসলমান হওয়ার কারণে, আমাদেরকে দেওয়া হয়। এর বিনিময় কী হবে তা আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের শত্রুতা হচ্ছে, মুসলিম হওয়ার কারনে আমাদেরকে হত্যা করে। শহীদ করে দেয়। চিন্তা করুন শাহাদাত কত বড় সম্মানের বিষয়। আল্লাহ তাআল বলেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ
আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলিও না। বরং তারা জীবিত, কিন্ত তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে না।
বোঝাগেল তাদের শত্রুতায় আমাদের মনে আঘাত লাগে। এতে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। তাদের নিপীড়নে আমাদের পাপ মোচন হয়। নেকি লেখা হয়। আর জান্নাতে সম্মান আরো বৃদ্ধি পায়। সর্বোচ্চ শাহাদাতের গৌরব লাভ হয়।
এর বিপরীতে মুসলিম জাতিকে শ্্েরষ্ঠ জাতির মর্যাদা দান করে যেন তাদেরকে ইসলাম নামক দুর্গের সংবর্ধনা কমিটির দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। তাদের আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই হল, লোকদেরকে ইসলামের সুরক্ষিত ও নিরাপদ দুর্গের প্রতি দাওয়াত দেবে।
আমরা তো আমাদের আকৃতি, স্বভাব চরিত্র, লেন-দেন, আচার ব্যবহার এতটা ভীতিপ্রদ অদ্ভত এবং বিশ্্রী করে রেখেছি যে, কুফর ও শিরকের ভ্রষ্টতা ও পেরেশানিতে ঘাবড়ে গিয়ে কোনো ব্যাক্তি যখন ইসলামের শ^াশ^ত সত্যের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে চায়। তো আমাদের আখলাক- চরিত্র দেখে ফিরে যায়। আমাদের আচরণ তাদের ইসলাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়। অন্য দিকে অমুসলিমরা আমাদের চির মুক্তি ও জান্নাতের যাওয়ার মাধ্যম হয়। আর আমরা হই তাদের ইসলাম ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার মাধ্যম। এবার ইনসাফের সাথে বলুন জালেম কারা? তারা না আমরা। তাদের হক তাদের কাছে না দেওয়ার কারণে তারা মাজলুম। আর আমরা হলাম জালেম। আর আল্লাহর সাহায্য থাকে মাজলুমের সাথে। জুলুমের প্রতিকার হলো হকদারের হক আদায় করে দেওয়া।
মোট কথা তাদের হক আদায় না করার কারণে আমরা জালিম। আর অমুসলিমরা হলো মাজলুম। আসুন আমরা জালিমের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে নিই। আর অমুসলিমদের হক আসলাম তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিই।
রাসূল -এর সব চেয়ে প্রিয় সুন্নাত
রাসূলুল্লাহ -এর সবচেয়ে বড় সুন্নাত ছিল দাওয়াত। বিশেষত অমুসলিম ভাই-বোনদের মাঝে দাওয়াত। তিনি ১০০ ভাগ অমুসলিমের মাঝে দাওয়াতি কাজ শুরু করেছেন। অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন এবং যারা মুসলমান হয়েছেন, তাদের ইসলাহ ও সংশোধন করেছেন। ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসূলাল্লাহ , আপনার অবর্তমানে আমাদের কাজ কী? নবী কারীম বললেন, আমার যা কাজ ছিল তোমাদেরও একই কাজ। উত্তর শুনে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন দেশে দাওয়াত দিতে ছড়িয়ে পড়লেন। এখন প্রশ্ন হলো তারা বিভিন্ন দেশে সফর করে কাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন? অবশ্যই অমুসলিমদের কাছে ইসলাম প্রচার করেছেন এবং লোকেরা দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। মোটকথা, নবীজীর সবচেয়ে বড় আশা ছিল প্রতিটি মানুষ যেন ইসলাম গ্রহণ করে।
তাইতো আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সান্তনা দিচ্ছেন-
لعلك باخع نفسك ان لايكونوا مؤمنين
তারা ঈমান আনছে না এই দুঃখে হয়ত তুমি নিজের জীবন শেষ কওে দেবে। -২৬ঃ ৩
আল্লাহ আমাদের অন্তরে উম্মতের দরদ সৃষ্টি করে দিন। উম্মতের ফিকির করার তৌফিক দান করুন। আমিন।