ইসলাম প্রচার আনুসঙ্গিক নয় মৌলিক ফরজ

এক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা দূর করা খুবই জরুরী। তা হলো ইসলাম প্রচার মুসলিম জাতির জন্য আনুসঙ্গিক বা দ্বিতীয় স্তরের কোনো কাজ নয়, বরং কুরআন কারীম বলে, মুসলমানদেরকে এই কাজের জন্যই পাঠানো হয়েছে।

 {كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ}

‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।’

প্রত্যেক নবীর মাধমেই উম্মতের পরিচয় হয়। আল্লাহ বলেন-

{قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ}

বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝেসুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। 

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায় দাওয়াতকে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের পরিচয় ও শেয়ার বানিয়েছেন। এমনিভাবে এই উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দাওয়াতকে উদ্দেশ্য বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। পানাহার করা, বাচ্চাদের লালন-পালন করা, বাড়ি বানানো, রুজি তালাশ করা, এসব কিছু মানুষের জীবনের প্রয়োজন মাত্র। জীবনের উদ্দেশ্য নয়।

   ভুল প্রচলনের কারণে আমরা জীবনের উদ্দেশ্য আর জীবনের প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য বুঝে উঠতে পারিনি। ফলে এর তারতীব উল্টে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও জেহেন পরিষ্কার হওয়া উচিত।

কিছু জিনিস থাকে যা মানুষের জীবনের প্রয়োজন, আর কিছু থাকে উদ্দেশ্য। জরুরত বা প্রয়োজনের হক হলো অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিস অর্জন করে নেওয়া। উদাহরণস্বরূপ প্রসাব-পায়খানা, এটা মানুষের প্রয়োজন। কোনো বড় জ্ঞানী ব্যক্তি যদি আধা ঘণ্টা পর্যন্ত ইস্তিঞ্জায় থাকে, বাথরুম থেকে বের না হয়, তাহলে বাসার সবাই পেরেশান হয়ে যাবে। বলবে কী হলো, হার্ট অ্যাটাক হলো না তো! কারণ, সবাই এস্তেঞ্জাকে জরুরত বা প্রয়োজন মনে করে। এর চাহিদা হলো, অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজন থেকে ফারেগ হয়ে যাওয়া।

 এমনিভাবে খাবারও মানুষের প্রয়োজন। কোনো দস্তরখানে যদি বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার রেখে দেওয়া হয়। আর একজন আল্লামা সাহেব একঘণ্টা পর্যন্ত সেই দস্তরখানে বসে থাকে তাহলেও মানুষ পেরেশান হয়ে যাবে, অস্থির হয়ে যাবে। এর কারণ হলো, খাবার মানুষের প্রয়োজন মাত্র, আর প্রয়োজন অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হয়। প্রয়োজন শেষ করেই মূল কাজে লেগে যেতে হয়।

বাথরুমে যাওয়া আর খাবার খাওয়ার মতো রোজগার ও মানুষের প্রয়োজন। রোজগার মানুষের উদ্দেশ্য নয়। এর হক হলো, অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় রোজগার কামাই করে, মূল কাজে লেগে যাওয়া। এই ভুল ধারণা প্রচলন হওয়ার কারণে আমরা রুজি বা কামাইকে প্রয়োজনের পরিবর্তে মূল উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছি। এর একটি ক্ষতি হলো, জীবনের উদ্দেশ্য দৃষ্টির আড়াল হয়ে গিয়েছে। আর বিষয়টি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমাদের যেসব সাথী দাওয়াতের কাজে সম্পৃক্ত, তারা এই দাওয়াত দিতে বাধ্য হচ্ছে যে, দাওয়াতের জন্য সময় বের করুন। বাস্তবতা হলো, এই কাজে দাওয়াত দেওয়াই দাওয়াতের কাজকে শিথিল করে দিয়েছে যে, তাবলিগের জন্য সময় বের করুন। চিল্লার জন্য সময় বের করুন। গাশতের জন্য সময় ফারেগ করুন। অবস্থাতো এই হওয়া উচিত ছিল। খাবারের জন্য সময় বের করুন, বাচ্চাদের জন্য সময় বের করুন। রুজি-রোজগারের জন্য সময় বের করুন। দাওয়াতের সাথে লাগা তো জীবনের উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্যের জন্য সময় বের করা হয় না। উদ্দেশ্যের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিতে হবে। নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। মুসলমানের শান হবে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করবে। মুসলমান ব্যবসাও করবে, কৃষিও করবে, সন্তানের খবরও নেবে, জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনও পুরা করবে। আর তার জীবনের উদ্দেশ্য বানাবে দাওয়াত। দাওয়াতই তার জীবনের পেশা ও নেশা। দাওয়াতই তার পরিচয়। দাওয়াতের কাজ করে এ ধরনের ধারণা সঠিক নয়। আপনি যদি সোনালি যুগে একটু দৃষ্টি বুলান, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট অনুভব করবেন।

আমাদের সবার সরদার নবীজীর জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাহাবারা, আবু বকর রা., উমর রা., আলী রা. অথবা আব্দুর রহমান বিন আউফ রা., খালিদ বিন ওয়ালিদ রা., বেলালে হাবশী রা., মোটকথা সে যুগের ছোট-বড় সবাই জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতেন। এর সাথে অন্যান্য প্রয়োজনকে জীবনের উদ্দেশ্যের অনুগামী বানিয়ে কাজ সম্পাদন করতেন।

প্রয়োজনের একটি হক হলো, তা উদ্দেশ্যের অনুগামী হবে। উদাহরণস্বরূপ, গাড়ি বানানোর উদ্দেশ্য হলো গাড়ি দিয়ে মাল বহন করবে। বা আরোহী গাড়ির মাধ্যমে তার গন্তব্যে পৌঁছবে। ওয়ার্কশপে যাওয়া গাড়ির প্রয়োজন। এখন যদি গাড়িকে ওয়ার্কশপেই রেখে দেয়া হয় তাহলে এই গাড়িকে অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা দেওয়া হবে। তাকে ভাঙারির দোকানে বা ড্রাস্ট হিসেবে রেখে দেওয়া হবে। গাড়ি ওয়ার্কশপে যাওয়া গাড়ির উদ্দেশ্যের অনুগামী বানানো হবে।

   কিন্তু আফসোস! আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ, তাদের মধ্যেও উত্তম জাতি, তারা তাদের প্রয়োজনকে উদ্দেশ্যের অনুগামী করার পরিবর্তে প্রয়োজনকে উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। আর জীবনের উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে রেখেছে।

এই জুলুম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যারা দীনের খেদমত করার সৌভাগ্য অর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তাদের দ্বারা দীনের কোনো খেদমত- দরস, তাদরিস, ইমামতী ইত্যাদি দাওয়াতী কোনো শাখায় সুযোগ করে দেওয়া হয়, তারাও এই উদ্দেশ্যকে প্রয়োজন মনে করে না।

এসব কাজ আঞ্জাম দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের জেহেন রোজগারের দিকে থাকে। মাসিক বেতনের দিকে দৃষ্টি থাকে বেশি। মোটকথা, কারও মাকসাদ নিজ উদ্দেশ্যে কাজের সুযোগ পেয়েও তাকে প্রয়োজন বানিয়ে ফেলে।

এই বাস্তবতা মনে রাখতে হবে, আল্লাহর নিয়ম ও সুন্নাত হলো, তার ভাগ্যে যে পরিমাণ রিজিক পাওয়ার সে পরিমাণ রিজিক সে পেয়েই যাবে। তাকে তা দান করা হবে। আর দীন তার চেষ্টা অনুযায়ী পাবে। মানুষের এই ক্ষমতা নেই যে, সে তার চেষ্টার মাধ্যমে রিজিক কম বেশি করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

{وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ}

আর পৃথিবীতে কোনো বিচরণশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে। 

যদি মানুষের চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমেই রিজিক বৃদ্ধি করা যেত, তাহলে অক্লান্ত পরিশ্রমকারী শ্রমিকরাই সবচেয়ে বিত্তশালী হতো। আর অধিক মেধা আর যোগ্যতা যদি রিজিক বৃদ্ধির কারণ হতো তাহলে বড় বড় মেধাবী শিক্ষিত লোক অশিক্ষিতদের অধীনে চাকরি করতে হতো না।

এর দ্বারা স্পষ্ট বোঝা গেল, যার ভাগ্যে যতটুকু রিজিক লেখা আছে তাকে ততটুকুই দেওয়া হবে। বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, মানুষ যখন তার মায়ের পেটে থাকে, তাকে রুহ দেওয়ার আগেই তার রিজিক, বয়স, মৃত্যু লেখে দেওয়া হয়।-الرزق مقسوم والحريص محروم- এটা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রসিদ্ধ হাদিস। আর শরিয়তে রিজিক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জীবনে কাজে লাগে এমন সকল জিনিস। এর দ্বারা বোঝা যায়, কারও চেষ্টা সাধনা আর প্রচেষ্টা ও যোগ্যতার মাধ্যমে কখনও রিজিক বাড়বে না। আর রিজিক বাড়ানো কমানোর ক্ষমতাও মানুষের নেই, মানুষ এর মুকাল্লিফ না। আল্লাহ তাআলা বলেন- 

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ .

‘আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’

{ وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (৩৯) وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى}

‘এবং মানুষ তাই পায়, যা সে করে, তার কর্ম শিগগিরই দেখা হবে।’

{وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ}

‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।’  

যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা নেই সে বিষয়ে তাকে তার বাধ্য বানানো হয়নি। জীবনের প্রয়োজনকে উদ্দেশ্য মনে করে তার সাথে লেগে যাওয়া, ইসলাম প্রচার যা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য বানানো হয়েছে চেষ্টা ও সাধনার পরই তার প্রতিদান দেওয়া হবে।

এমন বিষয়কে উপেক্ষা করা এর মাধ্যমে তার মধ্যে সংকীর্ণতা বয়ে আসবে। শরীয়ত শুধু মানুষের এতটুকু মুকাল্লাফ বানিয়েছে বরং এর অনুমতি দিয়েছে, রিজিকের ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি যদি ঈমান পূর্ণ ও তাওয়াক্কুলের অবস্থায় এখনও পৌঁছেনি, তাহলে দীনের দাওয়াতকে উদ্দেশ্য বানিয়ে শরীয়তের গ-ির মধ্যে থেকে রোজগারকে প্রয়োজন মনে করে চেষ্টা করে, তাকেও দীন এবং পরকালের প্রতিদানের মাধ্যম বানিয়ে নিন। একেই বলা হয়েছে-

كسب الحلال فريضة بعد الفريضة

‘হালাল উপার্জনের অনুমতি রয়েছে, আর এটা অন্যান্য ফরজের পর ফরজ। এটাকে পেশা বানানো আর এর মাধ্যেই লেগে থাকার অনুমতি নেই।’

    এমনি দুনিয়ার দৃষ্টিতে জীবনকে শুধু উপার্জনের মধ্যে নিয়োজিত করে রাখাও বোকামির কাজ। একটু চিন্তা করুন, মানুষ আরামে খাবারের জন্য উপার্জন করে। আর মানুষ সকল আরামকে কুরবান করছে রোজগারের জন্য। আর সারাজীবন উপার্জনের মধ্যে লেগে থাকার কারণে আর আরাম ভোগ করতে পারে না। এই বোকামির জন্য যে পরিমাণ আফসোস করা হবে সেটাও হবে খুব কম। এর চেয়ে আরও আফসোসের বিষয় হলো, এতো কষ্টের পরও তার থেকে হালাল হারামের পার্থক্যও আর থাকে না। বরং উপার্জনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন, তাকওয়ার সাথে উপার্জন অনেক সহজ, উপার্জনের জন্য পথ বের করা, এর জন্য এমন স্থান থেকে রিজিকের ওয়াদা করা হয়েছে যা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا  وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ 

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন।

দাওয়াতের কাজকে জীবনের উদ্দেশ্য না মনে করার কারণে জাতির ওইসংখ্যক লোক যারা দীনি খেদমতের জযবা রাখে, আগ্রহ রাখে, কোনো প্রকারের খেদমতে লেগে আছে বরং দীনের দাওয়াতে লেগে আছে, সেই কষ্টে জর্জরিত।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব দা,বা,

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ