উত্তম জাতির অবস্থান এবং তাদের দায়িত্ব

উত্তম জাতির অবস্থান এবং তাদের দায়িত্ব
পৃথিবীর যে কোনে স্থানে যে কোনো জাতি, যে কোনো ধর্মের এবং যে, কোনো গ্রুপের মানুষ হোক না কেন, সকলের ইচ্ছা জাগে, প্রত্যেকেই আশা করে তারা যেন সফল হয়। বরং জীবনের সকল চেষ্টা সাধানা ত্যাগ তিতিক্ষা এই উদ্দেশ্য হয় যে, মানুষ যেন সফল হয়। এই সফলতাকে উদ্দেশ্যে এবং লক্ষ বানানোর ব্যাপারে পুরো বিশ্ব একমত। দুজন মানুষ পরস্পর স্ববিরোধী চিন্তা ধারা হোক। ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করী, বিভিন্ন দলিলের লোকজন, তাদের অবস্থা তো হলো, এই যে, একজন যদি বলে, এটা দিন। অপর জন বলে এটা রাত। এই দুনো দলকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কী চান? উভয় দল এই উত্তর দিবেন যে, আমরা সফলতা চাই।
মানুষ এই সফলতার জন্য নিজ নিজ চিন্তা দ্বারায় বিভিন্ন পদ্ধতি আদর্শ ধর্ম ভিন্নমত পোষণ কারী প্রত্যেকের দাবী হলো, সে যেই পথে আছে সে পথেই সফলতা।
একজন সাদাসিধা মানুষ যখন এই সমস্ত পথগুলো থেকে সত্য ও সঠিক পথটি খুঁজে বের করতে চায়। তাহলে তার জন্য উচিত সফলতা সৃষ্টি কারী এবং সফলতা সস্পর্কে এক মাত্র জ্ঞানী ও জ্ঞাত, মহান সত্ত্বার এই ব্যাপারে কী নির্দেশ আছে তা জানা। আর সফলতার জন্য কী পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তা জানার জন্য কুরআনে হাকিমের স্বরনা পন্ন হতে হবে। যে, ব্যেপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ.
অর্থ.আর কুরআনে কারীমে রয়েছে অন্তরের আরগ্য এবং মুমিনের জন্য হেদায়াত এবং রহমত।
আল্লাতাআলা বলেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ – অর্থাত এই দুনিয়া হল, খনস্থায়ী একদিন তা শেষ হয়ে যাবে। মানুষের মঞ্জিল গন্তব্য হলো মৃত্যু থেকে বাচার জন্য। সেই চেষ্টাও তাকে মৃত্যুর নিকটবর্তি করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন। يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ
হে মানুষ সকল তুমি যেই চেষ্টা করছ এই সব চেষ্টাই তোমার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মৃত্যুর পর আসল জীবনের শুরু হবে। এই দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনের ভালো মন্দ যা কিছুই করবে তার প্রতিদান তুমি পাবে। এখানে যা কিছু বপন করা হবে মৃত্যুর পর তাই কাটতে হবে। এক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেনে.
فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ.
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে এমন ভাবে জীবন যাপন করে যে, মৃত্যুর পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশের। ঘোষণা পেয়ে যাবে যে সে সফল হয়ে যাবে।
প্রত্যেকে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান মানুষ যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ঈমানের নেয়ামত দান করেছেন, কুরআনের প্রতি যাদের আছে বিশ্বাস। তারা কুরআনের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিবে। নিজের সমস্ত সমস্যার এবং সকল চেষ্টা সাধনার ভিত্তি ঐ জিনিসকে বানানো উচিত।
ঐ পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিৎ যে পথে চললে তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে যাওয়ার জামানত পাওয়া যাবে। আমাদের মতো দূর্বলদের জন্য কুরআন কারীম একটি সংক্ষিপ্ত পথ এবং কর্মফল বলে দিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন – وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى
যে ব্যক্তি আল্লাহ কে হাজির মেনে ভয় করল এবং যে নিজেকে কুপ্রবিত্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখল তার ঠিকানা হলো জান্নাত।
আমরা যারা মুমিন ও মুসলিম দাবিদার আমাদের থেকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর চিন্তা এবং তার সামনে উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি হারিয়ে যাওয়ার মত। মুমিন তো সে যার জাগতিক কোনো কাজ পরকালকে সামনে রেখে করবে এবং সামনে রাখবে ওখানকার লাভকে সওয়াব। মুমিনের আখেরাতের আশা ছাড়া আর কোনো কিছু উদ্দেশ্য হওয়া অনুচিৎ। বিশেষত খালেস দ্বীনী কাজ যা ইবাদতের সূরতে সম্পূর্ন করা হয়, যেমন রোজা, নামাজ, ইসলামী শিক্ষা প্রশিক্ষণ, তাবলিগ, জিকির, ইত্যাদি এ গুলোর যদি মুহাসাবা করা হয়। তাহলে দেখা যাবে এ গুলোও জাগতিক লাভের জন্য বা নাম দাম পদমর্যাদা অর্জনের জন্য করা হচ্ছে। অল্প কিছু লোক ছাড়া বরং আমরা যদি আমাদের নিয়ত এবং আমাদের ভিতরের অবস্থার কথা মুহাসাবা করি তাহলে আমাদেরকেও কাফের এবং দুনিয়ার অন্যান্য জাতির কাতারেই দেখা যাবে। যে ব্যাপারে কুরআনে কারিমে আল্লাহ তা’লা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন।
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآَخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ.
অর্থ: ঐ (কাফেরেরা ) দুনিয়ার জীবনে শুধু বাহ্যিক অবস্থাকেই জানে আর পরকাল সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন- বেখবর।
অন্যস্থানে আছে-
بَلِ ادَّارَكَ عِلْمُهُمْ فِي الْآَخِرَةِ بَلْ هُمْ فِي شَكٍّ مِنْهَا بَلْ هُمْ مِنْهَا عَمُونَ.
পরকালের জ্ঞান সম্পর্কে তাদের জ্ঞান উলট পালট বরং এব্যাপারে তারা সন্দিহান বরং এবিষয়ে তারা অন্ধ। আমার শাইখ মুফাক্কেরে ইসলাম হযরত মাওলানা সইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র. এর অনুবাদ করেছেন, পরকালের ব্যাপারে তাদের জ্ঞান পাঞ্চার হয়েগেছে। বরং এ ব্যাপারে সে সন্দিহান বরং সে এব্যাপারে অন্ধ। দায়িত্ব আদায়ের অনুভুতি আমাদের থেকে লোপ পাচ্ছে। আমাদের দৃষ্টি শুধু অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বরং এটি একটি বাস্তব সত্য যে, হাশরের ময়দানে এবং প্রতিদান দিবসে এই প্রশ্ন করা হবে না যে, নিজের অধিকার অর্জন কর নি কেন? সেখানে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে সেটা হবে তোমার ফরজ দায়িত্ব কতটুকু আদায় করেছ? তোমাকে যে জিম্মাদারী দেওয়া হয়েছিল তা কতটুকু সম্পন্œ করেছ? শরীয়ত মানুষকে তার অধিকার আদায়ের অনুমতি দিয়েছে কিন্তু অধিকার অর্জনের দায়িত্ব দেন নি। বরং ক্ষমা করে দেয়া, নিজের হক, অধিকার ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে লাভ বর্ণনা করেছে এবং বার বার এরজন্য মহান প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকা স্বরুপ আলোচনার পর একটি বিষয় আলোচনা করতে যাচ্ছি। তা হলো ব্যক্তিগত ভাবে একজন মুসলমান হিসেবে এবং সামষ্টিগত ভাবে মুসলিম জাতির অন্তরভুক্ত হওয়ার দিক থেকেও আমরা সকলেই সফলতা চাই। যার ভিত্তি হল জাহান্নাম হতে মুক্ত এবং জান্নাতে প্রবেশ। এই সফলতার জন্য আমাদেরকে হাশরের ময়দানের হিসাব নিকাশ এবং প্রতিটি মুহুর্তে আল্লাহর সামনে দাড়ানোর ও উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি থাকতে হবে। পরকালের লাঞ্চনা হতে মুক্তি এবং আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের জন্য নিজের চেষ্টা সাধনা করতে হবে। নিজ অধিকার আদায়ের জন্য সকল প্রকার জায়েয নাজায়েয চেষ্টা সাধনা করার পরিবর্তে (যা আমাদের সকল সমস্যার ভিত্তি হয়েগিয়েছে) পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নিজ ফরজ দায়িত্ব আদায় করা এবং পরিপূর্ণ ভাবে নিজের দায়িত্ব আদায় করাকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানাতে হবে। চাই এই কথা আমাদের জন্য যত কঠিনই হোক না কেন। তাহলেই আমাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। একজন মুসলমান হিসেবে এবং উত্তম জাতি হিসেবে আমাদের জিম্মাদারী এবং দায়িত্ব কি? এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদেরকে এই দুনিয়াতে পাঠানোর কী উদ্দেশ্য। আবার অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এবং উত্তম জাতির একজন ব্যক্তি হওয়ার দিক থেকে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পার্থক্য কি? দুটি আয়াতের মধ্যে চিন্তা ফিকির করার দ্বারা পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে যাবে। প্রথম আয়াত হল
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ (৫৬)
আমি জিন ও মানব জাতিকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হল আমাদের জিন্দেগীকে বন্দেগী বানাতে হবে। আমাদের সৃষ্টিকর্তা মালিকের এবাদত বন্দেগী ও অনুগত্ব স্বীকার করতে হবে। অন্যত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آَمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ.
অর্থ. তোমরা সর্ব উত্তম জাতি তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের কল্যানের জন্য তোমরা সৎকাজের আদশ করবে অসৎকাজ হতে বাধা প্রদান করবে। এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।
শব্দগুলোর উপর একটু চিন্তা করুন। أُخْرِجَتْ لِلْمُؤْمِنِينَ বলা হয়নি।خْرِجَ لِلنَّاسِ ,বা خْرِجَتْ
لِلنَّاسِ ও বলা হয়নি। (অর্থাৎ শুধু মুমিনদের কল্যানের জন্য বের করা হয়েছে। বা নিজেরা বের হয়েছে। বা এমনিই বের হয়েছ) বরং আল্লাহ তা’আলা বলছেন, বরং তোমাদেরকে ইচ্ছকৃত ভাবে বড় একটি উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে অস্তিত্বে আনা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্য হল পুরো মানব জাতির কল্যাণের জন্য এবং সেই কল্যাণের কথাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো প্রত্যেক ভালো কাজের নির্দেশ দিবে এবং মন্দ কাজ হতে বাধা দিবে। এখানে একটি বিষয় বুঝে নেওয়া উচিৎ যে, যখন ভালো কাজের নির্র্দেশ দেওয়ার কথা আসে তখন সাধারণ ভাবেই মাথা থেকে ঐ ভালো গুলোর কথা বের হয়ে যায়। যার পর আর কোনো কল্যান গ্রহণ যোগ্য হয় না। যেমন কুফর ও শিরক।
দ্বিতীয় একটি বিষয়ের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তাহলে উত্তম জাতি তার দায়িত্ব কর্র্তব্য এবং তার অবস্থান থেকে এতো দূরে সরে গেছে যে, তারা খাবার দাবার ব্যবসা বাণিজ্য, দুনিয়া অর্র্জনকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। একজন যাতে উত্তম হিসাবে ইবাদত, যিকির আযকার শিক্ষা, দীক্ষাতে তার জীবনের উদ্দেশ্য বানানো হয়নি। হ্যাঁ একজন মানুষ হিসাবে এই ইবাদত বন্দেগীর নির্দেশ রয়েছে। এটা তার সাধারণ মানুষ হিসাবে জিম্মাদারী কিন্তু উত্তম জাতি হিসাবে তার দায়িত্ব শুধু সাধারণ ইবাদতই নয় বরং নিজে ইবাদত বন্দেগী করবে। সাথে সাথে আল্লাহর বান্দাদেরকে তার ইবাদত বন্দেগীর দাওয়াত দিবে এবং তার অবাধ্যতার পথে বাধা দিবে। এটা ফরজ দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য বানানো হয়েছে। একটি উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। বাহ্যত একজন দ্বীনদার মুসলমান যিনি জিকিরে ব্যস্ত থাকে, সারারাত নামাজ পড়ে, সারাদিন রোজা রাখে। দেখতে মুত্তাকি মনে হয়। কিন্তু সে দাওয়াতের ফরজ দায়িত্ব থেকে উদাসীন। তাহলে তার উদাহরণ হল ঐ হাকিমের মত, কোনো বাদশা কোনো এক এলাকার জন্য হাকিম হিসাবে নিযুক্ত করল। যাতে ঐ এলাকার জনগণ আইন শৃঙ্খলা ঠিক রাখে। এখন সেই হাকিম চিন্তা করল সে নিজে বাদশার নির্দেশগুলো মানবে এবং তার আনুগত্ব থাকবে। চাই এলাকার লোক আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করুক, বা বাদশার বিদ্রোহী হোক, কিছু আসে যায় না। প্রকাশ থাকে যে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি এই হাকীমের ব্যাপারে বলবে, তিনি দায়িত্ব হীন ও দায়িত্ব অবজ্ঞাকারী একজন মানুষ। কারণ তার দায়িত্ব ছিল এলাকার লোকেরা যেন, কোনো ধরনের বেআইনী ও বাদশার অবাধ্যতা না করে; সে দিকে খেয়াল রাখবে। এ হাকিম এই দায়িত্ব পালন যা করার কবেন। বাদশা তাকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করবে এবং সে বহিষ্কারের যোগ্য হবে।
এমনি ভাবে উত্তম জাতি হিসাবে আমাদের ফরজ দায়িত্ব, আমাদের ইবাদত ও দাসত্ব হল এই, যে, নিজেরা ইবাদত ও দাসত্ব এবং পরিপূর্র্ণভাবে আনুগত্য স্বীকার করবো। আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেচে থাকবো। সাথে সাথে মানবজাতিকে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসব। তাদেরকে কুফর শিরক এবং প্রত্যেক অবাধ্যতা থেকে বাচানোর দায়িত্বকে নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য বানাবো। যেমনিভাবে আল্লাহর প্রিয় হাবিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুনিয়াতে দাসত্বের চূড়াই থেকে বাস্তব জীবনে আমল করে দেখিয়ে দিয়েছেন। যারা আল্লার নৈকট্য লাভ করতে চায় এবং পরকালের হিসাব নিকাসের সম্মুখীন হওয়াকে বিশ^াস রাখে, তাদের জন্য তাঁর পবিত্র জীবনকে আদর্শ বানানো হয়েছে। আল্লাহ তা’লা বলেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآَخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا.
রাসুলের জীবন তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা করে এবং পরকালে বিশ^াস রাখে।
উত্তম জাতির দুনিয়াতে অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হলো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সাহাবাগন যা কিছু বুঝে ছিলেন, তা এই উম্মতের আসল দয়িত্ব; যা একজন সাধারণ সাহাবীর জবান ও আমল দ্বারা প্রকাশ হয়েছে। হযরত রবিয়া বিন আমের রা. খুব শান শাওকাতের সাথে রুস্তামের দরবারে পৌঁছল। রুস্তম যখন জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কেন এসেছ? তখন তিনি উত্তম জাতির অবস্থান কেমন বুঝেছেন এবং বুুঝিয়েছেন তা একটু লক্ষ করুন, তিনি বললেন-
الله ابعثنا لتخرج من شاء من عبادة العباد الي عبادة الله وحده ومن ضيق الدنيا و الي سعتها ومن جور الأديان الي عدل الاسلام.
আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন, আল্লাহ যাদের চান তার বান্দাদেরকে বান্দার গুলামী থেকে বাঁচিয়ে এক আল্লাহর দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাদেরকে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বাঁচিয়ে প্রশস্ততার দিকে এবং ধর্মের অন্যায় অত্যাচার থেকে বাঁচিয়ে ইসলামের ন্যায় ইনসাফের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছি।
এটা হলো এই জাতির উত্তম জাতি হওয়ার দিক থেকে তার অবস্থান ও দায়িত্ব ও ফরজ কাজ। যেই কাজ এই জাতি ভুলে গেছে। ফলে দুনিয়াতেই লাঞ্চনা বঞ্চনা এবং ব্যর্থতার মধ্যে পড়ে আছে। ওখানেও যেখানে ফরজ দায়িত্ব আদায়ের ব্যাপারে হিসাব নেওয়া হবে, সেখানে অসম্মানিত হতে হবে, যদি এই মহান অপরাধ থেকে তাওবা না করে।
হযরত মাওলানা শাহ আবরারুল হক সাহেব রহ. ‘আশরাফুল হেদায়াত’ নামক কিতাবে হযরত থানবী রহ. কয়েকটি নির্বাচিত মালফুজাত সংকলন করছেন। যার মধ্যে স্পষ্ট বলেছেন যে, শিক্ষা প্রশিক্ষণ, জিকির আজকার এসব কিছু মাধ্যম মাত্র। আর আসল কাজ হল দাওয়াত। হযরত মুফতি মোহাম্মদ শফি সাহেব রহ. খাইরুল করুনের অনেক কয়টি আয়াতের তাফসির ঈমানের দাওয়াতকে আসল ও মূল এবং প্রাসংঙ্গিক সর্ব প্রকার ফরজ বলে স্পষ্ট করেছেন। ঈমানের দিকে দাওয়াত যা মুসলিম জাতির প্রতি আসল ফরজ এবং দয়ালু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আসল সুন্নাত। এই কারণেই সকল নবীদের দুনিয়াতে আগমন। এই কাজটির এতো অবহেলা করা হচ্ছে। বিশেষ ও সাধারণ মানুষ এর অনুমান করতে পারেন। এটা একটি অনেক বড় জুলুম যা আজ আমরা মানুষের সাথে করছি। এমনকি নিজেদের সাথেও এই অন্যায় করছি। এব্যাপারে আমাদের হিসাব দিতে হবে। সেখানে আমাদের দায়িত্ব ও জিম্মাদারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
ইসলাম ধর্মে দাওয়াত এবং জিহাদের কত গুরুত্ব এর অনুমান করার জন্য কুরআন ও সীরাতে পাকের অধ্যায়ন এমন ভাবে করা উচিৎ। এক মতে কুরআন কারিমে (৬৬৬৬)টি আয়াত আছে এর মধ্যে ছয় হাজারেও বেশী আয়াত ঈমানেরদিকে; দাওয়াত ও জিাহাদ সম্পর্কিত। আর সীরাতে পাক হলো কুরআনে পাকের আমলী তাফসীর। তাফসীরের যত বড় কিতাবই হোক না কেন, সেখান থেকে যদি দাওয়াত এবং জিহাদের অধ্যায় বের করে নেওয়া হয়। তাহলে অল্প কয়েকটি পাতা ছাড়া আর কিছু থাকবে না। কুরান এবং সীরাতের অধিকাংশ অংশ বেকার হয়ে যাবে। যদি এই আয়াত গুলী আমলের অযোগ্য হয়। তাহলে এটা কত বড় যুলূম। এই যুলূম থেকে বাঁচার জন্য তওবা করা উচিৎ।
সীরাতের উপর দৃষ্টি না রাখার কারণে আমাদের ধারণা হলো এমন, যে এমন অবস্থায় কি দাওয়াতের অনুকুল পরিবেশ আছে? আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় বলুন তো যেই যুগে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াতের দায়িত্ব আদায় করছেন। সে সময় কি পরিবেশ অনুকুল ছিল?
ইনসাফের সাথে ভাবুন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি আমাদের মতো মনে করতেন যে, এখন তো দাওয়াতের পরিবেশ নেই। তাহলে কি আমরা শিরক ও কুফরীর মধ্যে ঘুর পাক খেতাম না?
তিনি ইয়াতিম অবস্থায় এই কাজের জন্য দাড়িয়ে গেলেন। জীবনকে হাতের তালূতে রেখে বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করতে লাগলেন। নির্যাতন সহ্য করেছেন। চিন্তিত ও পেরেশান হয়েছেন। মানবতাকে পথ দেখিয়েছেন। রহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপথ গামী লোকদেরকে পথ দেখিয়েছেন। মানুষের সকল প্রকার ব্যথার ওষুধ দিয়েছেন। আসুন আমরা এই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য ও অনুসরণ করে জান বাজি রাখার ইচ্ছা করি।
শেষে একটি কথা বলে শেষ করছি, আমাদের উচিৎ আমরা যেন এই ফরজ দায়িত্ব আদায় কারার আসল ফিকির দাওয়াতের কাজকে জীবনের উদ্দেশ্য বানাই। এটা দুনিয়া আখেরাত সকল সমস্যার সমাধান। দুনিয়াতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক সহ যত সমস্যা আছে সবগুলোর সমাধান হলো দাওয়াত। যার মধ্যে পরিপূর্ণ রয়েছে সমাধান। মোট কথা আপনার সকল সমস্যার সমাধান হলো দাওয়াত। কিন্তু জাগতিক সমস্যা দূর করার নিয়তে দাওয়াতী কাজ করা নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন ما اسئلكم عليه من اجر আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না।
এই আয়াতের মুলনীতিতে আল্লাহকে ভালোবেসে মাজলূম মানবতাকে কুফর শিরকের অন্ধকার হতে বের করার জন্য চেষ্টা সাধনা করা। চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন থেকে বের করার জন্য নিষ্ঠার সাথে দাওয়াতী কাজ করা আম্বীয়া আ: এর আসল সুন্নাত। আর এইটাই তাদের কাজের পদ্ধতি আল্লাহ তা’লা এই উম্মতকে উত্তম জাতি অবস্থান বুঝার এবং নিজ দায়িত্ব আমাদের ফিকির দান করুন।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ