একজন নিরক্ষর একনিষ্ঠ দা‘য়ী ফাতেমার সাক্ষাৎকার

চতুর দিকে মানুষ ঈমান ছাড়াই আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, এ ব্যাপারে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আমি যখন জানতে পারি কোনো হিন্দু মারা গিয়েছে, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমার ঘুম আসে না। এমন লাগে আমি মরে গিয়েছি আর আগুনে জ্বলছি। এই পরিমান কষ্ট আমি অনুভব করি। আসল দাওয়াত তো হলো মানুষকে প্রিয় নবীর দস্তরখানে মানুষকে আহ্বান করা। আল্লাহ তাআলা এই অধমকে জোরপূর্বক এই কামে লাগিয়েছেন।


আসমা যাতুল ফাউযাইন: আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।
ফাতেমা: ওয়াআলাইকুমুস সালাম।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: আপনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন?
ফাতেমা: আমার বাপের বাড়ী কান্ধালার পাশে, আইলাম নামক এক কৃষকপল্লীতে আমার জন্ম। আমার পিতার নাম আব্দুর রশীদ। তিনি খদ্দর বিক্রি করতেন।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: আপনার বিবাহ কোথায় হয়েছে?
ফাতেমা: আমার প্রথম বিবাহ বড়হানার পাশে সুলতানপুর গ্রামে হয়েছিল। আমার স্বামী হঠাৎ করেই রোগাক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তার টি.বি হয়েছিল। তারপর মুহাম্মদপুর গ্রামে আমার বিবাহ হয়। স্বামীর নাম আইনুদ্দীন। তিনি খুবই সহজ সরল মানুষ। পানিপথে খদ্দরের ব্যবসা। দুটি ব্যাপারে তিনি খুব খেয়াল রাখেন। একশত টাকা লাভ হলে তার অর্ধেক অবশ্যই তুলে রাখেন। আর কাপড় বেচেন খুব ঈমানদারীর সাথে। ধোঁকা-প্রতারণা তার স্বভাবে নেই।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: মুহাম্মাপুরে কতজন মুসলমান বাস করেন?
ফাতেমা: মুহাম্মদপুর আসলে হিন্দুদের গ্রাম। মুসলমানের সংখ্যা খুবই কম।। তাও নামকা ওয়াস্তে। ছোট্ট একটা মসজিদ আছে।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: দ্বীনের কাজের প্রতি আপনি কিভাবে আগ্রহী হলেন?
ফাতেমা: আমি তো অশিক্ষিত মূর্খ মানুষ। দ্বীন থেকে দূরে অকেজো এক মুসলমান ছিলাম। আমাদের গ্রামে জাট পরিবারের একটা মহিলা মারা যায়। স্বামী তার আরেকটি মহিলাকে ঘরে তোলে। প্রথম পক্ষের দুটি যুবতী মেয়ে ছিল। তারা আমার কাছে আসা-যাওয়া করতো। আমি চুড়ি বিক্রি করতাম। ওরা আমাকে আম্মী বলে ডাকতো। গ্রামের অধিকাংশ ছেলে পেলেই আমাকে আম্মী বলতো। সবাই আমাকে বিশ্বাস করতো। কারো কিছুর প্রয়োজন হলে, জিনিসপত্রের দরকার হলে আমি বাজার থেকে এনে দিতাম। কেউ অসুস্থ হলে বড়হানা নিয়ে ঔষধ-পত্রের ব্যবস্থা করতাম।

জাট সম্প্রদায় এবং অন্যান্য লোকজনও নিজেদের কিশোরী ও তরুণী মেয়েদেরকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিতো। ওই মেয়ে দুটিকে তার পিতা আর সৎমা অনেক জ্বালাতন করতো। একবার মেয়ে দুটি আমাকে বলল, আম্মী! ইসলাম ধর্ম আমাদের খুব ভালো লাগে। আমাদের তুমি কোনওভাবে মুসলমান বানিয়ে দাও। আমি চিন্তা করলাম, এতে পেরেশানহাল মেয়ে দুটি পেরেশানী থেকে বেঁচে যাবে এবং জাহান্নামের আগুন থেকেও রক্ষা পাবে। আমি তাদের নিয়ে নেযামুদ্দীন মারকাযে গেলাম। সেখানকার আপাজী তাদের কালিমা পড়ালেন। একজনের নাম রাখলেন আওয়ারী অপরজনের সারওয়ারী। হিন্দি কিতাব পড়ে পড়ে তারা নামায শিখতে লাগল। পাবন্দীর সাথে নিয়মিত নামায পড়তে লাগল। তাদের দেখে আমারও লজ্জা লাগল যে, দুদিনের মুসলমান নামাযের এমন পাবন্দী করছে আর আমি পুরনো মুসলমান জামাত থেকে কত দূর! আমিও নামায পড়া শুরু করে দিলাম। চিন্তা করলাম, মাটির সৃষ্টি এই মেয়ে দুটির লজ্জায় তুমি নামায পড়লে আর আল্লাহর বিধানকে লজ্জা করলে না! একথা মনে করে নামাযে খুব কাঁদলাম। দুআ করলাম আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দাও। এখন থেকে আমি তোমার আদেশ মনে করে তোমাকে ভালোবেসে নামায পড়বো।

এরপর আমি মেয়ে দুটির জন্য সম্বন্ধ খুঁজতে লাগলাম। পানিপথের দুজন ভালো মুসলমান প্রস্তুত হয়ে গেল। দুজনকে বিবাহ দিয়ে দিলাম। আল্লাহর শোকর! সুখে-শান্তিতেই তাদের দিন কাটছে। তারপর আমি মুহাম্মদপুর চলে আসি। আমাদের ওখানকার জাট পরিবারের অনেক বড় এক বদমাশ বড় হানার কসাইদের সঙ্গে ফুলাত এসে মুসলমান হয়েছিল। হযরতজী তার নাম রেখেছিল আসলাম। সে এখন নামাযী হয়ে গিয়েছে। পূর্বের সমস্ত বদমাশী ছেড়ে দিয়েছে। চিন্তা করলাম এমন বড় মাপের দুশমন যদি মুসলমান হয়ে এতটা শুধরে যেতে পারে তাহলে এই যে সহজ-সরল লোকজন যারা আমাকে ভালোবাসে এরা দ্বীন গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলে কতইনা ভালো হবে।
আমি আমার কাছে আসা মহিলা ও তরুণীদের বোঝাতে শুরু করে দিলাম। আমি তো আর কিছু জানি না। আল্লাহ যা বলাতে চান দু’ চার কথা বলি। প্রথম মেয়ে দু’টির ছয়মাস পর আরেকটি মেয়ে তৈরী হয়ে যায়। আমি তাকে দিল্লী নিয়ে গিয়ে মুসলমান বানিয়ে দিই। আল্লাহ তাআলা তার জন্যও পাত্রের ব্যবস্থা করে দেন।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: এরকম যুবতী মেয়েদের নিয়ে যেতে আপনার ভয় লাগেনি?
ফাতেমা: প্রথমবার ভয় লেগেছিল। কিন্তু আমি চিন্তা করলাম, গাঁয়ের লোকেরা আমাকে বিশ্বাস করে। কেউ দেখে ফেললে বলে দেবো, চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাচ্ছি। আর এটা সত্য কথাই ছিল। কারণ, আমি তো তাদের কুফুরের চিকিৎসা করাতেই নিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তীতে এই ভয় ভেঙ্গে যায়। আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা জমে যায়। ভাবতাম, যদি কেউ কিছু বলে তাহলে স্পষ্ট বলে দেবো নরক থেকে বাঁচানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ! কেউ কোনো কিছু জিজ্ঞেস করেনি এবং কোনরকম সন্দেহও করেনি।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: এরপর আর কারও ওপর কাজ করেছেন কি?
ফাতেমা: এক জমিদার পুত্র আমার বাড়ির দোকানে ঔষধ স্টক করতো। সে ছিল ডাক্তার। আমাকে সে নামায পড়তে দেখতো। একদিন আমাকে বলতে লাগল, আরে আম্মা! আপনি নামায পড়েন কেন? সামনে মোমবাতি রাখা ছিল। বললাম, ভাইয়া! তোমার আঙ্গুলগুলো একটু মোমবাতির ওপর রাখো তো। সে বলল, কেন তাহলে তো আঙ্গুল জ্বলে যাবে। বললাম, বেটা! সামান্য মোমবাতির আগুনেই যখন তোমার আঙ্গুলগুলো জ্বালাতে পারছো না তাহলে দোযখের আগুন কিভাবে সহ্য করবে? তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোনো হিন্দুকে মরতে দেখেছো? বলল, হ্যাঁ, দেখেছি। বললাম, তাকে জ্বলতে দেখেছো! বলল, দেখেছি। বললাম, না তুমি দেখোনি, দেখলে আর হিন্দু থাকতে না। দুদিন পর একটি হিন্দু মহিলা মারা গেল। তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল। চিতায় উঠিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হল। সমস্ত কাপড় জ্বলে গেল। লাশ উলঙ্গ হয়ে পড়ল। অতঃপর লাঠি দিয়ে তার মাথা ফুঁড়ে দেয়া হল। অত্যন্ত নির্মমভাবে তাকে ভষ্ম করা হল।
ঘটনাক্রমে পরদিন এক মুসলমান ধোপা মারা গেল। ছেলেটি তাকে দেখতে গেল। মুর্দাকে খুব ভালোভাবে গোসল করানো হল। যত্ম করে কাফন পরানো হল। খুশবু লাগানো হল এবং অত্যন্ত নম্রভাবে কবরে নামানো হল। লোকেরা যখন মাটি দিতে লাগল, সে বলল, আমিও কি মাটি দিতে পারি? লোকেরা বলল, তুমি যদি গোসল করে পাকসাফ হয়ে থাকো তাহলে দিতে পারো। অন্যথায় হাত লাগিয়ো না। দাফন শেষ হওয়ার পর সে ফিরে আসল। এখন সে আর আগের মানুষটি নেই। একেবারেই শান্ত নীরব। আমি একদিন বড়হানা গেলাম। তার জন্য একটি হাদীসের কিতাব নিয়ে আসলাম। কিতাব পড়ে সে চুপি চুপি নামায পড়তে লাগল। সে তার স্ত্রীকে নামায পড়ার কথা বলল। স্ত্রী গিয়ে ঘরের লোকজনকে বলে দিল। লোকজন তার ওপর অত্যাচার শুরু করল। মুসীবতের বড় বড় পাহাড় তার মাথায় ভেঙ্গে পড়ল। তার অবস্থা দৃষ্টে আমরা সবাই কাঁদতাম। তাকে নিয়মিত পিটানো হতো, অসহ্য হয়ে সে বলতো, তোমরা আমার গলা কেটে ফেলো, আমি অন্তত খোদার কাছে গিয়ে বলতে পারব, তোমার জন্য আমি গলা কাটিয়ে দিয়েছি। তাকে কামরায় আবদ্ধ করে মরিচের ধূনি দেয়া হল।
একদিন সে জান বাঁচাতে আমার ঘরে ঢুকে পড়ল- আমার এটা জানা ছিল না। তার পরিবারের লোকজন আমার পেছন পেছন বাড়িতে চলে আসে। আমার ঘরে তল্লাশী চালাতে থাকে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, সে আমার ঘরে নেই। আমি ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে লাগলাম, উপরে গিয়ে মাচায়ও খুঁেজ দেখো। তারা মাঁচায় চড়ে খুঁজতে লাগল। সেখানে কাঠের বড় বড় তিনটি বাক্সে সর্ষে বোঝাই করা ছিল। আমি বললাম, বাক্সের পেছনেও খোঁজ করে দেখো, সেখানেও লুকিয়ে থাকতে পারে। তারা বাক্স সরিয়ে দেখল এবং না পেয়ে চলে গেল। আমি কপাট বন্ধ করে উপরে গেলাম, আর সে বাক্সের পেছনে থেকে বেরিয়ে এল। বলতে লাগল, আম্মী! আমার আল্লাহ যদি এখানে তাদের অন্ধ না করে দিতেন তাহলে ওরা আজ আমাকে মেরে ফেলতো। তারা যখন আমাকে খোঁজ করছিল? আমি তো বাক্সের পেছনেই ছিলাম। উপর দিয়ে আমার মাথা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু তাদের কেউ তা দেখতে পায়নি। এই ঘটনায় আমার সাচ্চা ঈমান নসীব হল। আমার ছেলে ইন্তেজারও পরদিন চিল্লায় চলে গেল। আমার মেয়েরাও নামায পড়তে লাগল। আমার দুটি ভাইও আইলাম থেকে এই ঘটনা শুনে জামাআতে চলে গেল।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: তারপর কী হল?
ফাতেমা: হুসাইনপুরের মাওলানা মুআয এবং হাফেজ নওয়াব সাহেব তাকে নিয়ে ফুলাত আসল। হযরতজী তাকে কালিমা পড়ালেন। নাম রাখলেন সুহাইব। তারপর তাকে জামাআতে পাঠিয়ে দিলেন।
এরপর তার পরিবার আমাকে জ্বালাতন শুরু করল। প্রতিদিনই এসে বলতো, হয় তার সন্ধান দাও, অন্যথায় তোমাদের সবাই পুড়িয়ে মারবো। একদিন যখন তারা একেবারে মারামারির প্রস্তুতি নিল তখন আমি ঘরে তালা দিয়ে সন্তানদের নিয়ে বড়হানা চলে আসলাম। ভেবেছিলাম, ঘরদোর ভেঙ্গে অন্যেরা দখল করে নিবে। কিন্তু সেখানকার জাট সম্প্রদায় একটি জিনিসও কাউকে বের করতে দেয়নি। বড় হানায় প্রতিদিনই পুলিশ আসতো। এখানেও যখন জ্বালাতন শুরু হল, আমি সঠেরী চলে আসলাম। তারপর ফুলাত এসে হযরতজীর মুরীদ হয়ে গেলাম।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: আপনি ঘরবাড়ি সবকিছু ছেড়ে এসেছেন দুঃখ লাগেনি?
ফাতেমা: সত্য বলছি, প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগতো। পরে চিন্তা করলাম, দ্বীনের জন্য এবং আল্লাহর মহব্বতেই তো ছেড়েছি। এতে মন ভালো হয়ে গেল।
আমার স্বামী এতে খুবই দুঃখিত হয়। সে বলেও যে, তুমি আমাদের বরবাদ করে দিয়েছো। আমি তাকে সাফ বলে দিয়েছি, নিজের দ্বীনের জন্য, আল্লাহর ভালোবাসার জন্য এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথে চলার কারণে যদি তুমিও চাও আমাকে ছেড়ে দিতে পারো, আসলে এ জাতীয় কথা মুখে আনাও পাপ- কিন্তু একদিন সে বলেছিল, তুমি আমাকে মেরে ফেলেছো, আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো- এরই প্রেক্ষিতে আমি ওকথা মুখে এনেছিলাম।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: এমতাবস্থায় আপনার সন্তানদের কী মনোভাব?
ফাতেমা: ছেলে-মেয়েদের কোনো দুঃখ নেই। ছেলে ইন্তেজারের বয়স চৌদ্দ বৎসর। সে বলে, আম্মী! আমরা তো কেবল বাড়ি ছেড়েছি, আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো ভূখাও ছিলেন। এখনতো আমাদের ভূখা থাকা বাকী আছে। আমার দুই মেয়ে শায়েস্তা আর গুলিস্তাও খুব খুশি। ওরা বলে, মা! আসবাবপত্র কোনো কাজের জিনিস? মরে গেলে তো এমনিই তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। আমাদের সৌভাগ্য যে, নবীর অনুসরণে ঘরবাড়ি ছাড়তে পেরেছি।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: এ অবস্থায় আপনার পিত্রালয়ের কী অভিব্যক্তি?
ফাতেমা: আমার বাপের বাড়ির লোকজন আমার প্রতি অসন্তুষ্ট। তারা যেন কেমন প্রজাতির লোক। তাদের বাড়িতে গেলে ঘরে ঢুকতে দেয় না। বলে, তুমি তো আমাদেরও মারার অবস্থা করবে! পিতাজী বলেন, কেউ তোমাকেও মেরে ফেলবে, তোমার ছেলে পেলেগুলোকেও তুলে নিয়ে খুন করবে। আমি বলেছি, কেউ আমাকে হত্যা করলে করুক, মরতে তো এমনিতেই হবে, ব্যাস, শাহাদাতের মৃত্যু নসীব হবে। আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন মৃত্যু কামনা করতেন। আমি বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছি, আমি বর্তমানে ফুলাত আছি। আমার সন্তানেরা আছে কান্ধালায়। কেউ আর তাদের মারবে কি তোমরাই সবাই মিলে ওদের মেরে ফেলো। এতে আমি খুশী আছি। আর যাই হোক, আল্লাহ তাআলার কাছে তো বলতে পারবো, তোমার দ্বীনের জন্য আমি আমার সন্তানদেরও কুরবান করেছি।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: বর্তমানে সাঠেরী অবস্থানকালীন কাউকে দাওয়াত দিয়েছেন?
ফাতেমা: প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানকার মহিলাদের আপনাদের এখানকার ইজতিমায় নিয়ে আসি। কয়েকজন মহিলা তো সবার নিকট দ্বীন পৌঁছে দেয়ার পাক্কা এরাদা করে নিয়েছে। এক কামারের ছেলে মুসলমান হতে প্রস্তুত। সামনের জুমআয় সে হযরতজীর নিকট মুসলমান হতে আসবে। আমি যেখানেই যাই সবাইকে দ্বীনের কথা বলি। হরিয়ানায় যখন আত্মীয়-স্বজনের ওখানে যাই যেখানে মুসলমান নেই বললেও বলে। এমনকি ওখানকার মুসলমানের নামও হিন্দুয়ানী সেখানেও মহিলাদের খুব বুঝাতে থাকি। হিন্দু মহিলারাও জড়ো হয়। জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা উঠলেই আমার চোখে পানি এসে যায়। কেঁদে কেঁদে তাদের বোঝাই, বোনেরা! শীঘ্রই পাক্কা মুসলমান হয়ে যাও। দ্বীন কবুল করে নাও। ঈমান নিয়ে যদি মারা যাও তাহলে দোযখের আগুন থেকে বেঁচে যাবে।। আমার চোখের পানি দেখে মহিলাদের মন মোম হয়ে যায়। চলে আসার সময়ও হিন্দু মেয়েরা টেনে ধরে, আরও শোনাও আরও শোনাও!
আমি কত লোককে যে হযরতজীর ‘আপকি আমানত আপকি সেবা মেঁ’ হাদিয়া দিয়েছি। দশজন এই কিতাব পড়ে শিবাজীর মাথাই ফুঁড়ে দিয়েছে। সুহাইবের তিন বন্ধু এসেছিলেন হযরতজীর নিকট কালিমা পড়তে। হযরতজীকে পায় নি, আবার আসবে। হায় আমি যদি কিছু পড়তে পারতাম, কুরআন শরীফ পড়তে পারতাম। (কাঁদতে কাঁদতে) তাহলে আরও কত লোককে বুঝাতে পারতাম! আমার এই একটাই দুঃখ।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: এখন পড়ায় লেগে যান, এখনও পড়তে পারবেন।
ফাতেমা: একদিন স্বপ্নে দেখি, মুখ নেকাবে ঢাকা এক বুযুর্গ ব্যক্তি। আমার কাছে কিছুটা মনে হল, ইনি আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমাকে একটি কুরআন শরীফ দিয়ে বলছেন, পড়ে নাও। (কাঁদতে কাঁদতে) হায়! যদি আমি লেখাপড়া জানতাম!
শিক্ষিত লোকেরাই জানে কেন তারা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাতানো পথে চলে না। চারদিকে কত মানুষ ঈমান ছাড়া আগুনে চলে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। আমি যখন কোনো হিন্দুর মৃত্যু সংবাদ শুনি তখন বহুরাত পর্যন্ত ঘুম আসে না। যেন আমিই মৃত্যুবরণ করে আগুনে জ্বলছি। এতটাই কষ্ট হয় তখন।

 

আসমা যাতুল ফাউযাইন: দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করার পূর্বে ও বর্তমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য অনুভব করেন?
ফাতেমা: মাঝে মাঝে কাউকে পেয়ে গেলে তাকে দাওয়াত করি। এখনতো আমার ঘরদোর নেই- কোথায় দাওয়াত (নিমন্ত্রণ) করব? আমি কিছুটা সামলে উঠি, আল্লাহর ইচ্ছায় একটা ঠিকানার ব্যবস্থা হোক তখন দ্বীনের পথে আনার জন্য দাওয়াতের ব্যবস্থা করব। দাওয়াতের বাহানায় লোকেরা ঈমান গ্রহণ করবে। শশী নামে আমার এক বান্ধবী আছে। আমি তাকে হযরতজীর কিতাব ‘আপকি আমানত আপকি সেবা মেঁ’ দিয়েছিলাম। সে তার ঘরের সমস্ত মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেছে। আমাকে বলে, আমি তো আর্যসমাজী হয়ে গিয়েছি। আমি কোনো রকম ভনিতা না করে সহজ কথায় তাকে বোঝাই, পয়নালা থেকে সরে কুয়োয় এসে পড়েছো। আর্যসমাজী হয়ে কী লাভ? যিনি সৃষ্টি করেছেন তার সমাজে চলে এসো। মুসলমান হয়ে যাও! আমার ইচ্ছা তাকে দাওয়াত করব।

আসমা যাতুল ফাউযাইন: আপনি যে মানুষকে ঈমান কবুল করে নেয়ার কথা বলেন, আরবীতে তাকে দাওয়াত বলে। এটাই হল আসল দাওয়াত। তো এই কাজে লাগার আগের আর পরের অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য বুঝতে পারেন?
ফাতেমা: (কাঁদতে শুরু করেন) এজন্যই বলি, হায়! আমি যদি শিক্ষিত হতাম! আপনি সত্যই বলেছেন, প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখানের প্রতি লোকদের আহবান করাই হচ্ছে আসল দাওয়াত।
সত্যকথা হল, এই কাজে লাগার পূর্বে, আরে আমি কি লেগেছি? মূলত এই নাপাক বান্দার প্রতি আল্লাহ করুণা করেছেন, তিনি আমাকে জোরপূর্বক কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। আমি যতদিন নিজেকে একাজে লাগাইনি, বর্তমানে আমি তখনকার আমিকে মুসলমানই মনে করি না। ঈমানের স্বাদ তো আমি মুহাম্মাদপুরের ঘরবাড়ি ছাড়ার পর বুঝতে পেরেছি। আমি একথা মানতেই পারি না যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ না করেও মানুষ মুসলমান হতে পারে। যতদিন দ্বীনের কাজে, ঈমানের পথে আনার কাজে কিছুটা কুরবানী না দেয়া হবে, ঈমানের পরিচয়ই মানুষ বুঝতে পারবে না। অথচ নাম রেখেই সবাই নিজেকে মুসলমান ভাবতে থাকে। গত পরশু কান্ধালার হযরতজী (হযরত মাওলানা ইফতিখারুল হাসান কান্ধালবী) বলছিলেন, শুধু আল্লাহ আল্লাহ বললেই দিল সাফ হয় না। আল্লাহ তাআলার ভালোবাসায় কিছু করলে কিছু কুরবানী পেশ করলে তবেই কিছু পাওয়া যায়।
আসমা যাতুল ফাউযাইন: আপনাকে অনেক অনেক শোকরিয়া! আপনি আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া আদায় করুন, তিনি আপনাকে এত বড় কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। আর আমাদের জন্যও দুআ করবেন।
ফাতেমা: দুআতো আপনি করবেন। আমার তো দোআর যোগ্যতা নেই। আল্লাহ হাফেজ।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
আসমা যাতুল ফাউযাইন
মাসিক আরমুগান, আগস্ট- ২০০৬