এক রাজত্বের দাম

এক রাজত্বের দাম
বাদশাহ হারুনুর রশিদ তার যুগে এক বড় আল্লাহর ওলি ছিলেন, বাদশার খুব ইচ্ছা ছিল তার সাথে দেখা করবে। কিন্তু বুযুর্গ বাদশার সাথে সাক্ষাত প্রদানে ইচ্ছুক না। একবার বাদশাহ তাঁর দরবারে উপস্থিত হলেন। বুযুর্গের কাছে দুআ চাইলেন এবং তাকে কিছু উপদেশ দেওয়ার জন্য আবেদন করলেন বাদশা হারুনু রশিদ। ন্যায়বিচার ও ইনসাফাফের সাথে দেশ পরিচালনা করা, কারো প্রতি জুলুম না করা, এবং পরকালে জওয়াবদেহিতার প্রতি খেয়াল রাখার উপদেশ দিলেন বুযুর্গ।
হারুনুর রশিদ আবদার করলেন জনাব! আমি আপনার কাছে কিছু হাদিয়া পেশ করতে চাই। যদি আপনি তা গ্রহণ করতেন। বুযুর্গ বললেন, আমার প্রয়োজন ও পছন্দের প্রতি দৃষ্টিপোষণকারী আমার প্রতিপালক তিনি নিজেই আমার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। আমার কোনো প্রয়োজন নেই। হারুনুর রশিদের বার বার পীড়া পীড়ির পর বুযুর্গ উপদেশ মূলক বললেন, আমাকে হাদিয়া দেয়ার মতো তোমার কাছে এমন কি জিনিস আছে? হারুনুর রশিদ বললেন, পৃথিবীর ষাট ভাগ এলাকায় আমার রাজত্ব। জনাব! আর আপনি আমাকে বলছেন আমার কাছে কী আছে আপনাকে দেয়ার মতো? বুযুর্গ বললেন, ইনসাফের সাথে বল, মনে করো তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছ, তোমার প্র¯্রাব বন্ধ হয়ে গেছে। আর পুরো দেশের চিকিৎসকগণ তোমার চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হয়ে গেছে। তুমি সুস্থও হলে না, আর মনে কর মৃত্যু তোমার মাথার উপর চলে এসেছে। এমন সময় এক ওজির এসে বলল, একজন চিকিৎসক আছে, যে আপনার চিকিৎসা করতে পারবে। কিন্তু চিকিৎসা খুবই দামি। তাহলে কি তুমি ঐ চিকিৎসককে ডেকে আনবে? বাদশা বললেন, অবশ্যই তাকে ডেকে আনবো। বুযুর্গ বললেন, চিকিৎসক এসে বলল, চিকিৎসা তো শতভাগই হবে, তবে আমার চিকিৎসা খুবই দামি। এই চিকিৎসার বিনিময়ে আমাকে অর্ধেক রাজত্ব দিতে হবে। ইনসাফের সাথে বল, তুমি কি চিকিৎসা করাবে? বললেন বুযুর্গ। বাদশা বলল, যে কোনো বিনিময়েই আমি চিকিৎসা করাবো। বুযুর্গ বললেন, চিকিৎসা শুরু হলো, উপকারও হলো, প্র¯্রাবও খুলে গেল, চিকিৎসকের সাথে তার ওয়াদা অনুযায়ী অর্ধেক রাজত্ব লেখে দিয়ে দিলে। কিন্তু এখন আরেকটি সমস্যাও সৃষ্টি হলো, তা হলো, প্র¯্রাব এখন আর বন্ধ হয় না। সর্বদা প্র¯্রাব বের হতেই থাকে। মসজিদে গেলেও প্রস্রাব বের হয়। দরবারে গেলেও একই অবস্থা। লজ্জার কারণে বাসা থেকে বের হওয়াই বন্ধ হয়ে গেছে। এই রোগের জন্যও চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়েছ, কোনো লাভ হলো না, শেষে নিরাশ হয়ে আবার ঐ চিকিৎসককে ডাকা হলো, সে এসে বলল, রোগ তো নিরাময় হবে এব্যাপারে শতভাগ গ্যারান্টি। কিন্তু আমার চিকিৎসা খুবই দামি। এই চিকিৎসার বিনিময়ে বাকি অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দিতে হবে। হে বাদশাহ ইনসাফের সাথে বল, তুমি কি চিকিৎসা করাবে? বাদশাহ বলল, অবশ্যই চিকিৎসা করাবো। বুযুর্গ বললেন, তোমার কাছে কী আছে? তোমার রাজত্বের কী মূল্য? একবার প্র¯্রাব আসা আর একবার বন্ধ হওয়াই হলো এর মূল্য।
প্রস্রাব আসা ও বন্ধ হওয়াও নেয়ামত
চিন্তা করুন, একবার প্রস্রাব আসা এবং একবার বন্ধ হওয়া এমন এক নেয়ামত, যা বাদশাহ হারুনু রশিদের পৃথিবীর ষাট ভাগের রাজত্বের দাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কতবার প্রস্রাব আসে, আর কত বার বন্ধ থাকে, কখনো কি আমরা চিন্তা করেছি? যে, এই প্র¯্রাব আসা আর বন্ধ হওয়াও আল্লাহ তাআলার একটি নেয়ামত। যার জন্য শুকর করা ওয়াজিব। এমনকি আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম তার শুকরিয়া আদায়ের জন্য প্রস্রাব করার পর এক বিষেশ দুআ শিখিয়েছেন।
الحمد الله الذى اذهب عنى الأذى وعافانى .
আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া যিনি আমার কষ্ট দূর করেছেন এবং মুক্তি দান করেছেন।
শ্বাস আসা ও যাওয়া কত বড় নেয়ামত। কষ্টের সাথে শ^াস আসাও নেয়ামত। এর মর্যাদা তার কাছেই জিজ্ঞাসা করুন, যার নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা কি এর কোনো শুকরিয়া আদায় করেছি? আমরা জিহ্বা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করি। এই স্বাদ গ্রহণের জন্য আল্লাহ তাআলা জিহ্বার মধ্যে ষাট হাজার ছিদ্র বানিয়েছেন। আমাদের কি শুকরিয়া আদায় করার তৌফিক হয়েছে? চোখ, কান, হাত,পা মোট কথা শরিরের প্রতিটি অঙ্গ এবং তার প্রতিটি অংশ আল্লাহ তাআলার একটি নেয়ামত। শুধু মানুষের শরীরটাই হলো এক পৃথিবী। মেডিকেল সাইন্স যে পর্যন্ত পৌঁছেছে, সে অনুযায়ী পঁচিশ হাজার নেজাম এবং ডিপার্মেন্ট চলছে শুধু এই শরীর নিয়ে। প্রতিটি নেজামের উপর শিক্ষার জন্যই অনেক বছর প্রয়োজন। এই নিয়ামতগুলোর শুকর তো দুরের কথা এগুলো নেয়ামত হওয়ারই অনুভূতি আমাদের নেই।
শরীরে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা
উদাহরণ স্বরুপ এই ব্যবস্থার একটি মৌলিক আলোচনা করছি। মানুষের শরীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা। এই রক্ত চলাচলের সাথে সম্পর্ক হলো মানুষের জীবিত ও মৃত্যুর। হার্ড থেকে রক্তের পাম্প করা হয়, রক্তনালী দ্বারা পুরো শরীরে রক্তের নেজাম চলে। একজন মানুষের মধ্যে রক্তের যেই নালী আছে, যাকে নবজ বা নাড় বলা হয়। এই গুলোকে যদি একটি পাইপ লাইন বানিয়ে লম্বা করা হয়, তাহলে এই দুনিয়ার আট চক্কর লাগানো যাবে। কোনো শহরের একটি পানির লাইনের সিস্টেম করতে কত সময় অর্থ খরচ হয়। এই বিষয়ে কোনো বিজ্ঞ মানুষকে জিজ্ঞাসা করুন। এই দুনিয়ার আট চক্কর লাগানো ওয়ালা পাইপ আমাদের শরীরে আল্লাহ তাআলা ফিট করে রেখেছেন। কখনো কি এই খেয়াল এসেছে? এর জন্য কতো শুকরিয়া আদায় করা উচিত। রক্তের নালী দুই প্রকার । একটি যেখান থেকে রক্ত দিলের দিকে যায়। তাকে (ধৎঃৎু ) নবজ বলে। আর দ্বিতীয় নালী হলো, যা অন্তর থেকে ফেরত যায়। তাকে (াধহব) নাড় বলে। রক্তের নালী গুলো দিল থেকে রক্তকে শরীরের দিকে এবং শরীর থেকে দিলের দিকে প্রবাহ রাখে। বিভিন্ন স্থানে ওয়াল ফিট করা হয়েছে। যেমন পানির হেন্ডপাম থেকে আমরা দেখি। দুইটি ওয়াল থাকে যার কাজ হলো, উপরে যেতে দেওয়া এবং নিচে জমিনের দিকে যাওয়া থেকে বিরত রাখা। হার্ডপাম্পওয়ালা ওয়াল (াধষাব)যদি খারাপ হয়ে যায়, তাহলে হার্ডপাম্প খারাপ হয়ে যায়। তাহলে পুরো বাড়ির লোকজন পিপাসিত থাকতে হয়। এমনি ভাবে রক্তের নালীর একটি ওয়াল যদি খারাপ হয়ে যায়, তাহলে হার্ড এটাক (যবধৎঃ ধঃঃধপশ)হয়ে যায়। যার কারণে মানুষ মারাও যায়। বা মৃত্যুপ্রায় হয়ে যায়। এই ওয়াল পরিবর্তন বা খুলার জন্য, বদলানোর জন্য অপারেশন করতে হয়। সেখানে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। আর কৃত্রিম ওয়াল বেশী থেকে বেশী দশ বছর কাজ করে। দুই লক্ষ টাকার ওয়াল মানুষের আশি পঁচাশি বছরের জীবনে কাজে লাগাতে পারে নি। মানুষের শরীরে এমন চুয়াল্লিশ হাজার ওয়াল আছে যা দিলের প্রতিটি স্পন্ধনের সাথে এক বার খুলে এবং একবার বন্ধ হয়। দিলের একবার স্পন্ধনে কেমন জানি আটাশি হাজার নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষ পায়। যার উপর আটাশি হাজার শুকর ওয়াজি হয়। আর এই চুয়াল্লিশ হাজার ওয়াল যদি মানুষকে কিনে লাগাতে হতো, তাহলে ষোলো আরব সাত লক্ষ টাকা খরচ করতে হতো। কখনো কি এর শুকরিয়া আদায়ের ভাগ্য যুটেছে। কম পক্ষে এই ষোলো আরব সাত কোটির কাছা কাছি চুয়াল্লিশ হাজার ওয়ালা এই স্পন্ধের সাথে আটাশি হাজার নেয়ামতের মাধ্যমে রক্তের এই নেজামের হাজারো অংশ নয়। আবার রক্তের বিভিন্ন অংশ লাল কালো, নিল ইত্যাদি এই সবগুলো আবার সমষ্টি করা। যা শরীরের বিভিন্ন অংগ সুসজ্জিত হয়েছে। এই বিষয়ে জানার জন্য বছরকে বছর পড়া শোনার প্রয়োজন। এটাতো একটি সিস্টেমের কথা, এমন পঁচিশ হাজার নেজাম শুধু মানুষের শরীরে চলছে। এগুলোর কোনো একটির বিস্তারিত বিষয়ে যদি জানতে চায় তাহলে মানুষ হয়রান হয়ে উঠবে। মহান মালিকের কি শান যে তিনি কতো কতো নেয়ামত মানুষের শরীরে দান করেছেন।
মোট কথা মানুষ কোটি কোটি নেয়ামত পাওয়ার পরও শুকরিয়া আদায়ের সুযোগ হয় না। আর অল্প একটু পেরেশানী এলেই মানুষ না শুকরীয়া করতে থাকে। কেমন দুর্ভাগ্য এবং কেমন অকৃতজ্ঞ। শুধু একবার দিলের স্পন্ধনের খোলা ও বন্ধের মধ্যে মানুষের আঠারো হাজার নেয়ামত খরচ হয়। আর না জানি এক নি:শ্বাসে কতো অসংক্ষ নেয়ামত ভোগ করে। নেয়ামতের বৃষ্টি বর্ষণ হয় এর পরও মানুষ অকৃতজ্ঞ। একটু পেরেশানী হলে অভিযোগ করে আর অকৃতজ্ঞ হয়। আর পেরেশানী ও মাত্র কয়েকটি বেশীর বেশী হলে চার পাঁচটি।
কয়েক বছর থেকে একটি জরিপ করছি, পাঠকদেরকেও বলছি কেউ যদি এমন কাওকে পান যার মধ্যে একত্রে দশটি পেরেশানী আছে, তাহলে আমাকে জানাবেন। আজ পর্যন্ত আমি এমন কাওকে পাইনি। এমনকি সর্ব শেষ দ্বীনী হালকার মানুষ তাদের সমস্যাকে অনেক বড় বনিয়ে হুজুরদের কাছে পেশ করে দুআ চাওয়ার জন্য। এর পরও আজ পর্যন্ত এমন একজন মানুষও পাইনি যে, যিনি তিন চারটির বেশী পেরেশানী নিয়ে আসে।
আফসোসের বিষয়, সমস্যার কথা বলার লোক অনেক বেশী, কিন্তু শুকর আদায় কারার লোক অনেক কম। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ. আমার বান্দাদের মধ্য অল্প লোকেই শুকুর গুজার হয়।
অস্থিরতা একপ্রকারের নেয়ামত
পেরেশানী অস্থিরতা যদি ঈমানের অবস্থায় হয়, তাহলে সে নিজেই একটি নেয়ামত। তার বিনিময়ে প্রতিদান ও সওয়াব পাওয়া যায়। মুমিনের শরীরে যদি একটি কাঁটাও বিঁধে তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়। একটি গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।
ما من مسلم يشاك شوكة فما فوقها إلا كتبت له بها درجة ومحيت عنه تها خطيئة.
ঈমান এত বড় একটি নেয়ামত, মানুষ যদি একটু চিন্তা ভাবনা করে কাজ করে তাহলে এই মহান নেয়ামতের বিপরিতে সকল নেয়ামত খুবই নগন্য এই নেয়ামত থাকা সত্যেও অকৃতজ্ঞতার কোনো সুুযোগ নেই। ঈমানের সহিত প্রতিটি কষ্ট বিপদ আপদ সুস্পষ্ট নেয়ামত।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ