কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ সাহেব (সামীর)-এর সাক্ষাৎকার

হযরত অত্যন্ত সত্যকথা বলেছেন যে, এই দেশ সৌহার্দ সম্প্রীতির দেশ। ভালোবাসায় এদেশের মানুষের দুর্বল। পারস্পরিক ভালবাসা ও মুহাব্বতের সামনে এদের হিম্মত স্থির থাকতে পারেনা, সাথে সাথেই তার প্রতি দূর্বল হয়ে যায়, এই সম্প্রদায়ের ভালবাসার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি আমরা এই অবুঝ লোকদেরকে সে সমস্ত প্রচারহীন রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে।
তাদেরকে নিজেদের ভাই মনে করে মুহাব্বতের সাথে যদি দাওয়াত দেই তাহলে এমন হতে পারে না যে, তারা অস্বীকার করে বসবে। এখানে দাওয়াতের কাজ করার জন্য বাহাছ মোবাহাছা ও প্রামাণিক আলোচনা এবং তার যোগ্যতার প্রয়োজন নাই বরং প্রয়োজন শুধু সাহস এবং মুহাব্বতের। আর মুহাব্বত সাহসের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। শর্ত হল মুহাব্বত ভিতর থেকে আসতে হবে এবং দিল পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যখন একজন অল্প শিক্ষিত, সরল সোজা গ্রাম্য যুবকের দুই ফোঁটা অশ্র“ আমার সারা জীবনের কুফর ও শিরক থেকে মুক্তির উপায় হতে পারে এবং রহমাতুলল্লি আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত রাতে আল্লাহর সম্মুখে ক্রন্দন আহাযারী আমাদের নসীব হয়ে যায় তাহলে এই দেশ অচিরেই ইসলামের বড় মারকায হয়ে যাবে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: ওয়া আলাইকুমুসস সালাম ওয়ারাহামাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ সাহেব আব্বা এইমাত্র বললেন যে, তিনি আপনার নাম কাজী মুহাম্মদ শুরাইছ রেখেছেন।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হ্যাঁ, মাওলানা আহমদ সাহেব! এখনো আমি ভালভাবে ঘোষণা করি নাই কিন্তু হযরত জী আমার নাম কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ রেখেছেন। নামটা যদিও একটু কঠিন কিন্তু হযরত যখন ইতিহাস বললেন, তখন ভালো লাগল এবং অন্তরে এই কথা আসল যে, আল্লাহ তাআলা যদি নামের বরকতে কাজী শুরাইহ-এর লক্ষ ভাগের এক ভাগ গুণাবলী আমাকে দান করেন তাহলে আমার বেড়া পার হয়ে যাবে।

আহমদ আওয়াহ: আব্বা বলে থাকেন মুসলমানের, সমস্ত দুনিয়ার সফলতা এবং উন্নতি এর মধ্যে যে, চৌদ্দশত বছর পূর্বের আখলাকের সাথে নিজেদের আখলাক মিলিয়ে নিবে। এই মেযাজ থেকে দুনিয়াবাসীর দূরে থাকার কারণে আজকের এই অবনতি। এজন্য আব্বু মাদরাসা এবং অফিসের নাম খাইরুল কুরানের সাথে মিলিয়ে রাখার প্রতি তাকিদ দিয়ে থাকেন। যেমন ধরুন মাদরাসায়ে সিফাতুল ইসলাম, দারুল আরকাম, দারে আবু আয়্যুব ইত্যাদি। কাজী শুরাইাহ আমাদের নবীজির চতুর্থ খলীফার যামানায় প্রসিদ্ধ একজন কাজী ছিলেন।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হ্যাঁ, তিনি সেই ঘটনা শুনিয়েছেন, হযরত আলী রাযি.-এর সাথে এক ইয়াহুদীর লৌহ বর্মের ব্যাপারে মুকাদ্দামার মধ্যে শরঈ সাক্ষী না থাকার কারণে হযরত আলী রাযি.-এর বিরুদ্ধে ফায়সালা করেছিলেন। আর এই ইনসাফ দেখে সেই ইয়াহুদী মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।

আহমদ আওয়াহ: জী, তার এই ঘটনা প্রসিদ্ধ, এটা ছাড়াও তার ইনসাফ এবং ন্যায়পরায়নতার অনেক ঘটনা আছে। কাজী সাহেব, আব্বা হয়তো আপনাকে ইন্টারভিউর কথা বলেছেন?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: জী, এখনই বলেছেন। আমি বলছিলাম, বারবার অনুমতি চাওয়ার পরও আপনি আমার ইসলাম গ্রহণ করার কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন এ অবস্থায় ইন্টারভিউ ছাপাটা ঠিক হবে কিনা? হযরতজী বললেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য তো নসীহত এবং দাওয়াতী জযবা পয়দা করা। আপনি আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিবেন। তাছাড়া এখন রমযান মাস চলছে। এখন এই বরকতময় মাসে আপনার অবস্থা ছাপানোই ভালো।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পারিবারিক পরিচয় দিন।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হরিয়ানার জাট বংশে ২৩ শে মে ১৯৬২ সালে আমার জন্ম, রোহিতক থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করেছি, তারপর বিএসসি করি। আমার আব্বা চন্ডিগড়ে জজ ছিলেন। তিনি আমার লাইন পরিবর্তন করে দিলেন এবং এলএলবি করতে বললেন। আমি এলএলবি করে চন্ডিগড়ে ওকালতী শুরু করি। এরপর চঈঝ প্রথমবার কোয়ালিফাই করি। বর্তমানে জেলা আদালতে ঈওঅ ডিজি পদে আছি। ইনশাআল্লাহ খুব শ্রীঘ্রই জজ হওয়ার আশা আছে। আমার এক বোন উঝচ তাঁর স্বামী অউগ, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর শোকর যে, আমাদের বংশ খুব শিক্ষিত। সকলে উর্দূতে বেশ দক্ষ। আমার দাদা উর্দূর ভালো কবি ছিলেন।
নিজের পদবী লিখতেন মাখতুম।
হযরত মাখতুম পানিপথির তিনি ছিলেন ভক্ত, অনুরক্ত।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলামের ঘটনাটি বলুন।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: আমি এডিশনাল ডিসট্রিক কোর্টে জজ ছিলাম। আমাদের বংশে মানবতা প্রেমের অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। ঘরে বৃদ্ধ মহিলা এবং বড়রা, মহান ব্যক্তি সূফি সাধকদের এবং ভালমানুষদের গল্প শুনাতেন, আমার পিতা বড় আমানতদার অফিসার ছিলেন। আমি প্রেম চাঁদ এবং পঞ্চ পরমেশ্বরের গল্প পড়েছি।
এই ঘটনার মাধ্যমে আমার মনে একথা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, বিচারকের আসনে মানুষ স্রষ্ঠার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বসে। সমস্ত মানুষকে এক নজরে দেখা এবং ইনসাফ করা তার কর্তব্য। আল্লাহ শোকর যে, আমিও বিষয়টির প্রতি লক্ষ রাখতাম এবং আদালতে ইনসাফ করার চেষ্টা করতাম। যখন মানুষ ভাল কাজ করে তখন আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে মানুষের অন্তরে তার প্রতি সম্মান ভালবাসা দিয়ে দেন। আমি যেখানেই যেতাম, মানুষ আমার ঈমানদারীর কারণে আমাকে অনেক সম্মান করত।
আমি আরো লক্ষ করেছি, অমুসলিম ঘুষখোরও আমাকে সম্মান করত। শুধু তাই নয় বরং আমার অফিসারও আমার ঈমানদারীর কারণে আমাকে ইজ্জত করতেন। পাঁচ বছর আগের কথা। একদিন সকালে মর্নিং ওয়াক করছিলাম। অত্যন্ত বিনয়ী ও দরদী হযরতের এক শাগরেদ আমার কাছে এসে বলল অত্যন্ত খুশির কথা যে, আপনি আমাদের শহরে এসেছেন। সকলে আপনার প্রশংসা করে, আপনাকে অন্তর থেকে ভালোবাসে। আমি কয়েকদিন যাবত আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আপনি আমাকে দশ মিনিট সময় দিলে খুব খুশি হতাম।
আমি বললাম, এখন আমার সাথে চলেন, কথা হবে সাথে এককাপ চাও পান করবেন। সে তখন বলল, আমাদের হযরত বলেন, কুরআনের ঘোষণা হল যখন কারো সাথে সাক্ষাত করবে তখন তার থেকে অনুমতি নিবে, আমি বললাম আমি সময় দিলাম আমার হাতে এখনই সময় আছে। সে অত্যন্ত খুশি হয়ে আমার সাথে বাসায় আসল এবং বলল, জজ সাহেব! আমার মনে একথা উদয় হল যে, আপনি একজন ঈমানদার এবং ভালো অফিসার, আপনার একদিন মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ আদালতে অপরাধীদের কাতারে দাঁড়াতে হবে এবং আপনার উপর গাদ্দারদের মুকাদ্দামা দায়ের করা হবে।
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমার উপর গাদ্দারীর মুকাদ্দামা হবে? বলল, জ্বী, কেননা কোনো দেশের নাগরিক যদি সে দেশের সরকার এবং সেখানকার সংবিধান (ঈড়হংরঃরঃঁঃরড়হ) না মানে, তাহলে সে রাষ্ট্রদ্রোহী এবং গাদ্দার হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পৃথিবীর সবকিছুর মালিক এক আল্লাহ তাআলা। তার সংবিধান হল আল-কুরআনুল কারীম।

কাজেই যে আল্লাহ এবং কুরআনকে অস্বীকার করবে সেও রাষ্ট্রদ্রোহী এবং গাদ্দার বলে বিবেচিত হবে। আমি বললাম, আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে যে, আমার উপর এই মুকাদ্দামা চলবে? সে অত্যন্ত দরদের সাথে বলল, আমি তো এত বড় শিক্ষিত না যে, আপনাকে দলীল-প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিব কিন্তু যখন চোখ খুলবে (যাকে আপনারা মৃত্যু বা চোখ বন্ধ হওয়া বলেন আমরা তাকে চোখ খোলা বলি) তখন আমাদের কথাই সত্য হবে।
কিন্তু তখন আপনার করার কিছুই থাকবে না। তাই বাধ্য হয়ে আপনাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। একথা বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে ব্যাথায় দু’ফোটা অশ্র“ প্রবাহিত হল যার এক ফোঁটা মাটিতে পড়ল। আরেক ফোঁটা চোঁখর পলাকে আটকে গেল। মাওলানা আহমদ সাহেব মুহাব্বত ও ভালবাসা এবং ব্যাথায় তার অশ্র“ প্রবাহিত হওয়াই আমার জন্য ফাঁদ হয়ে গেল। আমার তখন মনে হল, তার এই সহানুভূতিশীল কথা অবশ্যই সত্য। আর এটা মানার মধ্যেই আমার উপকার। তাই আমি তাকে বললাম, তাহলে আমার এখন কী করতে হবে? সে বলল, আজকে এক তারিখ, আমাদের হযরত আজ সোনিপথ আসবেন। তিনি আপনাকে কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানিয়ে দিবেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কখন যেতে হবে? সে বলল, দশটায় এখান থেকে রওনা দিলে এগারটায় সেখানে পৌঁছে যাবেন। আমরা সময় মত রওয়ানা হয়ে গেলাম। হযরত সাড়ে এগারটায় সেখানে পৌঁছান। গাড়ীর আওয়াজ শুনে আমি ঘর থেকে বের হলাম। মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাত করলাম। বললাম, আমি মুসলমান হতে চাই। হযরত বললেন, ঈমান হল অন্তরে বিশ্বাসের নাম, আপনি ইচ্ছা করেছেন ব্যস হয়ে গেছে।

আমরাও যাতে সওয়াবের মধ্যে শরীক হয়ে যাই এজন্য কালিমা পড়ে নিন। এই কালিমা সর্বশেষ বিধান কুরআনকে মানা, নবীকে মানা, নবীর তরীকায় চলার অঙ্গীকার। হযরত আমাকে কালিমা পড়ালেন এবং উর্দুতে তার তরজমাও পড়ালেন। এরপর আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনি কি ইসলাম সম্বন্ধে পড়াশোনা করেছেন? আমি বললাম, এলএলবিতে মুসলিম প্রিন্সিপাল ‘ল’ কিছু কিছু পড়েছিলাম। সে সময় যা কিছু পড়েছিলাম ততটুকুই। এছাড়া আর একটি শব্দও পড়া হয়নি। মুসলমানদের সাথে খুব সম্পর্কও ছিল না। এমনকি যারা নামে মুসলমান তাদের সাথেও সম্পর্ক ছিলনা। হরিয়ানায় তো মুসলমান নাই বললেই চলে। তখন হযরত বললেন, তাহলে এতবড় সিদ্ধান্ত কিভাবে নিলেন? আমি বললাম, আপনার এই মুরীদ আমার কাছে এসে অত্যন্ত মুহাব্বতের সাথে বলল, আপনি ঈমানদার অফিসার অথচ আপনার উপর সর্বোচ্চ আদালতে গাদ্দারীর মুকাদ্দমা দায়ের করা হবে। আমি তার কাছে প্রমাণ চাইলে তিনি অত্যন্ত মুহাব্বতের সাথে দুফোঁটা অশ্র“ প্রবাহিত করে দেন। এক ফোঁটা মাটিতে পড়ে, আরেকটা ফোঁটা চোখেই আটকে যায়। হযরত আজকে আমার বুঝে আসল, অপরাধী হাতকড়া পরে কিভাবে অসহায় হয়ে যায়। তার ভালবাসাভরা দুফোঁটা অশ্র“ আমার জন্য ফাঁদ হয়ে গেল। আমার অন্তর বলল, মুহাব্বতভরা মানুষের কথা মানার মধ্যেই উপকার এমন উপকারী মিথ্যুক হতে পারে না। হযরত আমার নাম কাজী শুরাইহ রেখেছেন এবং কাজী শুরাইহ এর পুরো ঘটনা শুনিয়েছেন। আমাকে বারবার ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং ইসলাম সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে বলেছেন। কিতাবের একটি লিস্ট করে এক মাওলানা সাহেব দায়িত্ব দিলেন দিল্লি থেকে তা সংগ্রহ করে দেয়ার জন্য।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কি আপনি কিতাবগুলো পড়েছেন?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: সর্বপ্রথম আমি ‘আপনার আমানত আপনার সেবায়’ পড়ি। এই কিতাব আমাকে আমার সিদ্ধান্তের উপর আস্থা সৃষ্টি করে। আমি চিন্তা-ভাবনা ছাড়া কত বড় চিন্তা ভাবনার কাজ করেছি। আসলে সত্যকথা হল আমার আল্লাহ আমাকে কত চিন্তা-ভাবনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করে ছাড়া নেওয়ার উপর বাধ্য করেছেন। এরপর আমি মরণের পরে কী হবে? পড়ি। এই কিতাব পড়ার পর আখেরাতের কথা বিশেষত হাশরের মাঠে হিসাব নিকাশের কথা আমার মন মস্তিষ্কে এমনভাবে বসে গেল যে, এখন আমি আদালতে বিচারকের আসনে বসি আর আমার মন আমাকে আল্লাহর আদালতে হিসাব দেওয়ার সময় অপরাধীদের কাতারে দন্ডায়মান পায় অনেক সময় এই ভয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এই দুই কিতাবের পর আরো কয়েকশ কিতাব পড়ে ফেলেছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিবারে এখনো জানাননি?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে, আমি খুব পেরেশান। কিন্তু যখনি হযরতকে বলি হযরত তখন বলেন, আরো কয়েকদিন পরে ঘোষণা দিবেন। আলহামদুলিল্লাহ আমার স্ত্রী, দুই সন্তান মুসলমান। আমরা চারজন ঘরে নামাজের পাবন্দী করি। আজ হযরত বললেন, রমযানের পরে ঘোষণা দিতে। আমার মনে বারবার আত্মমর্যাদাবোধের কারণে এই জযবা এসেছিল, হযরত আবু যর (রাঃ)-কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি আপনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর মনে হয়, একজন পথপ্রদর্শক বানিয়েছি। সুতরাং নিজের মনমতো চলার চেয়ে তাকে মানার মধ্যেই আমার সফলতা। বিভিন্ন বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা হল, হযরতের আদেশ মানার দ্বারাই আমার উপকার হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: নামায কোথায় পড়েন আর জুমার নামায কি আদায় করেন?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: ব্যাপকভাবে যদিও ঘোষণা দেই নাই কিন্তু তারপরও অনেক মুসলমান আলহামদুলিল্লাহ আমাদের ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে জানেন। জুমার সময় যেখানে থাকি তার আশপাশে খুঁজে জামে মসজিদ বের করি। আল হামদুলিল্লাহ জুমার নামাষের খুব পাবন্দি করি। তাছাড়া এ পর্যন্ত সাত বার তিন দিন সময় লাগিয়েছি অবশ্য তা দূরে গিয়ে লাগিয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করে আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হরিয়ানায় ১৯৪৭-এর পর ইসলাম এবং মুসলমান ছিল না বললেই চলে। এজন্য রসম ও প্রথার দিক দিয়ে ইসলামের সাথে সম্পর্ক ছিলনা।
কিন্ত যেহেতু আকীদা এবং পরিপূর্ণ নিয়মকানুনের ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যাচারাল ধর্ম এজন্য আমার কাছে একেবারে অপরিচিত মনে হয়নি বরং মনে হয়েছে, এটা আমার পূর্বে থেকেই ছিল! হযরত কত সুন্দর কথা বলেন, সোনিপথে তার বয়ান শুনেছিলাম। তিনি বলেন, ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম, পিপাসার্ত ব্যক্তির ঠোঁটে পানি রাখলে যেমন সে তা গ্রহণ করে নিবে এমনিভাবে মানুষের স্বভাব। স্বভাবজাত ধর্ম তালাশ করে। তার কাছে স্বভাবগত ধর্ম নতুন লাগে না। তবে শর্ত হল, এই ধর্ম তার ঠোঁটে লাগিয়ে দিতে হবে।

আহমদ আওয়াহ: আব্বা আপনাকে দাওয়াতের কাজে লাগাননি? পরিবার পরিজন আত্মীয়-স্বজনের নিকট কাজ করতে বলেননি?
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হ্যাঁ, বলেছেন আলহামদুলিল্লাহ! আমি কাজ করছি। আলহামদুলিল্লাহ আমার এক ফুফু এবং তার স্বামী মুসলমান হয়েছে, আমার চাচার এক ছেলে মুসলমান হয়েছে। আমার ছয় চাকর মুসলমান হয়ে ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছে এবং দুজন মুসলমান মেয়েকে বিবাহ করেছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! খুব ভাল! আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: হযরত অত্যন্ত সত্যকথা বলেছেন যে, এই দেশ সৌহার্দ সম্প্রীতির দেশ। ভালোবাসায় এদেশের মানুষের দুর্বল। পারস্পরিক ভালবাসা ও মুহাব্বতের সামনে এদের হিম্মত স্থির থাকতে পারেনা, সাথে সাথেই তার প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। এই সম্প্রদায়ের ভালবাসার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি আমরা এই অবুঝ লোকদের সে সমস্ত প্রচারহীন রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে। তাদের নিজেদের ভাই মনে করে মুহাব্বতের সাথে যদি দাওয়াত দিই তাহলে এমন হতে পারে না যে, তারা অস্বীকার করে বসবে। এখানে দাওয়াতের কাজ করার জন্য বাহাছ মোবাহাছা ও প্রামাণিক আলোচনা এবং তার যোগ্যতার প্রয়োজন নাই বরং প্রয়োজন শুধু সাহস এবং মুহাব্বতের। আর মুহাব্বত সাহসের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। শর্ত হল মুহাব্বত ভিতর থেকে আসতে হবে এবং দিল পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যখন একজন অল্প শিক্ষিত, সরল সোজা গ্রাম্য যুবকের দুই ফোঁটা অশ্র“ আমার সারা জীবনের কুফর ও শিরক থেকে মুক্তির উপায় হতে পারে এবং রহমাতুলল্লি আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তো রাতে আল্লাহর সম্মুখে ক্রন্দন আহাজারী আমাদের নসীব হয়ে যায় তাহলে এই দেশ অচিরেই ইসলামের বড় মারকায হয়ে যাবে।

আহমদ আওয়াহ: অনেক অনেক ধন্যবাদ।
কাজী মুহাম্মদ শুরাইহ: আপনাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ এই মুবারক কাজে আমাকে শরীক করার জন্য। ইনশাআল্লাহ ফুলাতে দেখা হবে।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, সেপ্টেম্বর- ২০০৯