গুজরাটের সুহায়ল সিদ্দিকী (যুবরাজ সিং) এর একটি সাক্ষাৎকার

একজন মানুষ সফর করে, ভ্রমণ করে, রেল ভ্রমণ, দু’-তিন ঘণ্টার ভ্রমণ। কখনো কখনো রেলে চেকিং হয়। অন্যথায় যখন স্টেশনে নেমে যাত্রী গেট অতিক্রম করে ঘরে ফিরতে উদ্যত হয়, তখন টিকিট চেক হয়। (তদ্রূপ) এই দুনিয়ার রেল থেকে আপন ঘর পরকালে ফেরার পথে সেখানকার দরজায় অবশ্যই টিকিট চেকিং হয় আর এখানকার টিকিট ঈমান। ঈমান ব্যতিরেকে টিকিটবিহীন যাত্রীর ন্যায় মানুষ নরক (জাহান্নাম)-এর জেলের মুখে যাবে। এজন্য আমাদেরকে সমগ্র দুনিয়ার মানুষ যেন এই টিকেট সংগ্রহ করতে উৎসাহী হয় সেজন্য বলা তো দরকার। ইসলাম এমন এক সত্য যে, যদি তা মানুষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় তাহলে সকলের অবস্থা আমার ন্যায় পাল্টে যাবে। আমাদের মুসলমানদের এটা বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য। যার পরকাল এবং জান্নাত-জাহান্নামের ওপর বিশ্বাস না হয়, সে আমার দিল্কে জিজ্ঞেস করে নিক যে, জাহান্নাম কত বড় বিপজ্জনক জায়গা।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মুহাম্মদ সুহায়ল: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: সুহায়ল ভাই, আমাদের এখান থেকে আরমুগান নামে একটি মাসিক দাওয়াতী ম্যাগাজিন বের হয় আপনি তা জানেন। এতে ইসলাম গ্রহণকারী সৌভাগ্যবান ভাই-বোনদের আত্মজীবনী সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। আব্বুর নির্দেশ যে, আমি আপনার থেকে এজন্য একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। এজন্য আপনাকে ভেতরে ডেকেছি।

মুহাম্মদ সুহায়ল: ভাই আহমদ, অবশ্যই। আমার নিজেরই ইচ্ছা যে আমার মতো হতভাগার ওপর আল্লাহর অপার করুণার কাহিনী লোকে পড়ুক, যাতে লোকের উপকার হয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার বংশগত ও পারিবারিক পরিচয় দিন।
মুহাম্মদ সুহায়ল: আমি গুজরাটের মাহসানা জেলার একটি গ্রামের ঠাকুর জমিদার পরিবারের সন্তান। আমার পুরানো নাম যুবরাজ সিং হিসেবেই লোকে আমাকে জানে ও চেনে। পরে পণ্ডিতেরা আমার রাশির জন্য বিখ্যাত নাম সরিয়ে আমার নাম রাখে মহেশ। কিন্তু যুবরাজ নামই মশহুর হয়ে যায়। ১৯৮৩ সালের ১৩ই আগস্ট আমার জন্ম তারিখ। আমাদের নিজেদের পারিবারিক কলেজ আছে। এ. জে. জসপাল ঠাকুর কলেজ। এতে আমি বি.কম. পড়ছিলাম। এমতাবস্থায় আমাকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়। আমার এক ভাই ও এক বোন আছে। আমার ভগ্নিপতি একজন বড় নেতা। মূলত তিনি বি. জে. পি.’র লোক। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের ওজন বাড়াবার জন্য তিনি এ বছর কংগ্রেস থেকে নির্বাচন করেন এবং বিজয়ী হন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন।
মুহাম্মদ সুহায়ল: গোধরা ঘটনার পর ২০০০ সালের দাঙ্গায় আমাদের আট বন্ধুর একটি দল ছিল যারা এ দাঙ্গায় অত্যন্ত উৎসাহভরে অংশ নিতাম। আমাদের এলাকায় পশুত্ব ও বর্বরতার উলঙ্গ নৃত্য চলছিল। আমাদের গ্রাম থেকে ১৫ কি.মি. দূরে সুন্দরপুর গ্রামে ৬০/৭০ জন লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। আমরাও তখন যৌবনের উন্মাদনায় বাহাদুরী ভেবে এতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের বাড়ির কাছেই গ্রামে একটি ছোট্ট মসজিদ ছিল। লোকে বলত এটি এক বিরাট ঐতিহাসিক মসজিদ। পীর হামদানী নামে একজন বড় পীর এটি নির্মাণ করেছিলেন। গুজরাটের লোকেরা তাঁর হাতে মুসলমান হয়েছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের গ্রামের এই মসজিদটি ধ্বসিয়ে দিতে হবে। আমরা আট বন্ধু এই উদ্দেশ্যে যাই। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও আমরা মূল মসজিদ ধ্বসাতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল আমাদের কোদাল লোহার নয়, কাঠের তৈরি। নিরুপায় হয়ে আমরা বাইরের দেয়াল ভাঙতে শুরু করলাম। যা মাত্র বছর কয়েক আগে গ্রামের লোকেরা গেঁথেছিল। এই দেয়াল ধ্বসিয়ে আমরা ভাবলাম যে, এই মসজিদ জ্বালিয়ে দিতে হবে। পেট্রোল আনা হল। পুরনো কাপড়ে পেট্রোল ঢেলে মসজিদ জ্বালাবার জন্য আমাদের এক সাথী আগুন ধরালে সেই আগুন তার নিজের কাপড়েই লেগে যায় এবং সেখানেই পুড়ে মারা যায়। আমি এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমরা সাথীরা চেষ্টা চালাই অন্তত কিছুটা হলেও মসজিদের ক্ষতি করতে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমার আরও চার বন্ধু আকস্মিকভাবে একের পর এক মারা যায়। তাদের মাথায় ব্যথা হত। এরপর সেই ব্যথায় ছটফট করে মারা গেল। আমি ছাড়া আর দুই বন্ধু পাগল হয়ে যায়। আমি ভীত হয়ে পড়ি। ভয়ে-আতংকে আমি পালিয়ে বেড়াতে থাকি। রাতের বেলায় আমি সেই ভগ্নপ্রায় মসজিদে গিয়ে কাঁদতাম যে, হে মুসলমানদের ভগবান! আমাকে ক্ষমা করে দাও। মসজিদের মেঝেয় মাথা ঠুকতাম আর কাঁদতাম। এ সময় আমি অনেক স্বপ্ন দেখি এবং স্বপ্নে স্বর্গ-নরক (জান্নাত ও জাহান্নাম) দু’টোই দেখতাম।

আহমদ আওয়াহ: জান্নাত-জাহান্নাম কিভাবে দেখা দিত? দু’একটি স্বপ্নের কতা আমাদেরকে বলুন।
মুহাম্মদ সুহায়ল: একবার দেখি, আমি নরকে। সেখানে একজন দারোগা আছে। সে আমার ঐ সব সাথীকে যারা মসজিদ ধ্বসাতে আমার সাথী ছিল তার জল্লাদদের দ্বারা শাস্তি দিচ্ছে। আর শাস্তি হল এই! লম্বা লম্বা লোহার কাঁটার জাল। এর ওপর ফেলে তাদেরকে টানা হচ্ছে। এতে করে তাদের শরীরের চামড়া ও মাংস ঘাড় থেকে পা পর্যন্ত খুলে যাচ্ছে। এরপর আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এরপর আবার তাদের উল্টো করে টাঙানো/ লটকানো হল এবং নিচে আগুন জ্বালানো হল, যা মুখ থেকে ওপর পর্যন্ত গ্রাস করল। দেখলাম, দু’জন জল্লাদ তাদেরকে হান্টার দিয়ে পিটাচ্ছে আর তারা কাঁদছে, চিৎকার করছে আর বলছে, আমাদের মাফ করে দাও। আমরা আর কোন মুসলমানকে মারব না, কোন মসজিদ ধ্বসাব না। দারোগা তখন উত্তেজিত হয়ে বলছে, তওবার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। মৃত্যুর পর আর কোন তওবাহ নেই। এ ধরনের ভয়াবহ ও ভীতিকর দৃশ্য প্রত্যেক দিন দেখতাম। ভয়ে ও আতংকে আমি তখন পাগলের মত হয়ে যেতাম।

এরপর স্বপ্নে আমাকে স্বর্গ (জান্নাত) দেখানো হত। দেখতাম, দুধের বড় পুকুর বরং তার চেয়েও প্রশস্ত বড় নদী। সেই নদী দিয়ে দুধের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সুদৃশ্য সেই স্রোত। একটি নদী মধুর। একটি ঠাণ্ডা পানির। এত স্বচ্ছ ও সুনির্মল যে, এতে আমি আমার ছবি দেখেছি। আরেকটি নদী শরাবের। আমি বললাম, শরাব তো খারাপ জিনিস। আমাদের পরিবারে শরাব খুব খারাপ মনে করা হয়। উত্তর আসল, এ পাক-পবিত্র ও সুগন্ধিযুক্ত শরাব। এ পান করে কেউ উন্মত্ত হয় না, নেশাগ্রস্ত হয় না। একবার দেখলাম খুব সুন্দর একটি গাছ। এত বিরাট ও বিশাল যে, হাজার হাজার লোক তার ছায়ায় স্থান পেতে পারে। কখনো খুব সুন্দর বাগান দেখতাম এবং সব সময় সেখান থেকে আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! ধ্বনি তিনবার ভেসে আসত। আমার ভাল লাগত না। আমি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহু আকবার না বললে আমাকে তুলে স্বর্গ থেকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হত। আমার ঘুম ভেঙে যেত। দেখতে পেতাম বিছানার নিচে পড়ে আছি।

একবার আমি স্বর্গ দেখলাম। আমি তখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললাম। সেখানে বহু বালক-বালিকা। তাঁরা আমার খেদমতে লেগে গেল। এভাবে অনেকদিন অতিবাহিত হয়। গুজরাটে দাঙ্গা হতে থাকে। কিন্তু এবার আমার ভেতর থেকে মনে হত যেন আমি মুসলমান। যখন মুসলমানদের এসব দাঙ্গায় মারা যাবার খবর পেতাম আমি মনে খুব দুঃখ পেতাম। মনটা খুব ব্যথিত হত। একবার বিজাপুর যাই। সেখানে একটি মসজিদ দেখতে পাই। সেখানকার ইমাম সাহেব ছিলেন সাহারনপুরের। তিনি মাওলানা কালীম সাহেবের সঙ্গে হরিয়ানার কাজ করেছেন। আমি তাঁকে আমার অবস্থা গোটাটাই খুলে বলি। তিনি বলেন, আল্লাহ আপনাকে ভালবাসেন। তিনি যদি আপনাকে ভাল না বাসতেন তাহলে আপনার সাথীদের মত আপনাকেও জাহান্নামে জ্বালাতেন। আপনি তাঁর রহমতের মূল্য দিন, কদর করুন এবং ইসলাম কবুল করুন। তিনি বললেন, বাবরী মসজিদ শহীদ করতে সর্বপ্রথম যে দুই যুবক কোদাল চালিয়েছিল তারা আমাদের মাওলানা (কালীম সিদ্দিকী) সাহেবের হাতে মুসলমান হয়েছেন। সম্ভবত আপনাকেও আল্লাহপাক হেদায়াত দানপূর্বক সত্যিকারের পথের ওপর আনতে চান, এখন আর দেরি করা উচিত নয়। হরিয়ানার দুই-একজন ডাকাতের মুসলমান হবার কাহিনীও তিনি আমাকে শোনান। স্বপ্ন দেখার আগে ইসলামের কথা শুনলে ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হতাম। ঠাকুর কলেজে কোন মুসলমানকে ভর্তি হতে দিতাম না। কিন্তু জানি না কেন, ইসলামের সব কিছুই এখন ভাল লাগতে লাগল। বিজাপুর থেকে বাড়ি এলাম এবং সংকল্প নিলাম আমাকে মুসলমান হতে হবে, অন্যথায় আমার সাথীদের মত আমাকেও নরক যন্ত্রণায় শাস্তি ভোগ করতে হবে।

আমি আহমদাবাদ জামে মসজিদে যাই ও ইসলাম কবুল করি। মাওলানা সাহেব বাড়ির লোকদের থেকে ইসলাম গোপন রাখার জন্য বলেন। আমি আহমদাবাদ থেকে ‘রাহবরে নামায’ (নামায নির্দেশিকা) নিয়ে আসি এবং তা থেকে নামায শিখতে ও মুখস্ত করতে থাকি। অতঃপর ক্রমান্বয়ে মুখস্ত ও সে মুতাবিক লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তে শুরু করি। পরীক্ষার পর গ্রীষ্মের ছুটি হল। আমি জামা’আতে যাবার প্রোগ্রাম তৈরি করি। বাড়ির লোকদের কাছ থেকে গোয়া ভ্রমণের টিকিট সংগ্রহ করি ও সেই টিকিটে আমার বন্ধুকে পাঠিয়ে আমি বরোদায় চিল্লা দিই। ফাযাইলে আ’মাল ‘মরনে কে বাদ কিয়া হোগা (মৃত্যুর পর কী হবে?) ইত্যাদি পুস্তক পাঠ করি। আমি যখন জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থা সম্পর্কে পড়তাম তখন সে সব আমার চোখে দেখা মনে হত। আমি চিল্লা দিয়ে ঘরে ফিরে চুপিসারে নামায পড়তে থাকি।

একদিন আমাদের চাকর বীরেন্দ্র সিং আকস্মিকভাবেই দুধ নিয়ে আমার কামরায় এসে যায় এবং আমাকে নামায পড়তে দেখে ফেলে। সে আমার পিতাজী ও বাড়ির লোকদের জানিয়ে দেয় যে, ছোট বাবু তো মুসলমানদের মত নামায পড়ছিলেন। আমার পিতাজীর কিছুটা সন্দেহ আগেই হয়েছিল। আমি কলেজ থেকে আসতেই পিতাজী আমাকে দরজামুখে আটকে দেন এবং বলেন, আমরা জেনে ফেলেছি যে, তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। এখন তোমাকে হয় ইসলাম অথবা ঘর যে কোন একটা ছাড়তে হবে। এমন অধার্মিকের জন্য এই ঘরের দরজা খুলতে পারি না।

আমি যখন জামা’আতে ছিলাম তখন আমি ভাবতাম, ইসলামের জন্য যদি আমাকে দেশ ছেড়ে বুখারায়ও যেতে হয় তাহলে খুশীর সঙ্গে চলে যাব। আমি ভাবলাম যে, আল্লার শোকর, ইসলাম আমার শিরা-উপশিরায় বসে গেছে এভাবে যে, জান-প্রাণ ও ইসলামের মধ্যে কোন একটাকে ছাড়তে বলা হয়। আমাকে তাহলে জীবন পরিত্যাগ করা আমার জন্য সহজ হয়ে ইসলাম ছাড়ার কল্পনাও আমার জন্য মৃত্যুতুল্য। আমি ভাবলাম যে, আল্লাহর যমীনে আর কতদিন মাথা নীচু করে বেঁচে থাকব? মনচাহি জীবন ছেড়ে রবচাহি (অর্থাৎ আমার মন যেভাবে চায় সেভাবে নয় বরং আমার প্রভূ প্রতিপালক যেভাবে চান সেভাবে) জীবনের নামই তো ইসলাম! যখন মনচাহি ছেড়েছি তখন রবচাহির জন্য মনচাহি ছাড়া মুশকিল কিসের? আমি পিতাজীকে পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, যদি এই কথা হয়, ব্যাপারটা এই হয় তাহলে আমি ঘর ছাড়ছি। ইসলাম ছেড়ে দেব এরূপ কল্পনাও বোকামী। এরপর আমার মোবাইল, আমার এটিএম ক্রেডিট কার্ড আমার থেকে কেড়ে নেয়া হল। আমি আহমদাবাদ পৌঁছি। সেখানে জোহাপুরা মসজিদে যাই। কিন্তু সেখানকার সকল লোকই ছিল ভীত। এজন্য সেখানকার লোকেরা আমাকে থাকার অনুমতি দিল না। সেখান থেকে দরিয়াপুর পুরান মারকাযে গেলাম। তারা আমার সার্টিফিকেট প্রভৃতি দেখল। তারা ফোন করে আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিল। তারা যখন জানতে পেল যে, আমার পিতা সেখানকার বিখ্যাত বি.জে.পি.’র লীডার, যিনি বর্তমানে মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে তখন তারাও আমাকে সেখানে থাকার অনুমতি দিল না এবং ওযরখাহি পেশ করল। আমার কাছে তখন খাওয়ার মত পয়সা ছিল না। আমি চা-বিস্কুট নিতাম এবং বিসমিল্লাহ পড়ে গভীর একীন নিয়ে খেতাম এবং দোআ করতাম, আমার আল্লাহ! আপনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। আমার এই চা ও বিস্কুটে তিনদিনের শক্তি দাও। আমার আল্লাহর শোকর। তিনদিন পর্যন্ত আমার খিদে লাগত না। একজন আমাকে পালনপুর পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে একজন হাজী সাহেব আমাকে বললেন যদি সোধপুর চলে যাও তাহলে সেখানে তোমার ব্যবস্থা হতে পারে। সোধপুর পৌঁছলাম। সেখান থেকে আমাকে রাজস্থানে নিউ জয়পুর হোটেলে যা জয়পুর আজমীর হাইওয়ের ওপর অবস্থিত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হোটেলের মালিক যিকরু ভাই আমাকে ২৫ দিন সেখানে রাখেন। সেখানে নামায পড়তাম এবং আপন মর্জি মাফিক হোটেলের কিছু কাজও করতাম। অথচ তিনি আমাকে নিষেধ করতেন। তিনি আহমদ ভাই ডিলাক্স-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ছিলেন মাওলানা কালীম সাহেবের একান্ত জন। তিনি আমাকে ফুলাত যাবার পরামর্শ দিলেন। ঠিকানা নিয়ে আমি দিল্লী আসি। প্রথম জামে মসজিদে পৌঁছি খেয়াল ছিল ইসলাম গ্রহণের সার্টিফিকেট বানাব যাতে লোকে সন্দেহ না করে। সেখানে জনৈক বুখারী সাহেব ইমাম। তিনি আমাকে জুমুআর দিন আসতে বললেন। যখন এখানে (ফুলাতে) এলাম তখন এখানকার পরিবেশ দেখে মনে হল যেন আমি আমার নিজের বাড়িতে আছি।

আহমদ আওয়াহ: এখানে এসে বিশেষ কী বিষয় অনুভব করলেন?
মুহাম্মদ সুহায়ল: এখানে আমরা সবাই মাওলানা সাহেবকে আব্বীজী বলি। আমি ফুলাত এসে সাহাবাদের যেসব কাহিনী ‘হেকায়াতুস-সাহাবা’তে পড়েছিলাম এবং আমাদের নবী করীম (সা.)-এর জীবনের সকল অবস্থা চোখে দেখতে থাকি। কখনো কখনো ঘরের কথা মনে পড়ত। মাওলানা সাহেব সম্পর্কে জানতাম যে, তিনি আজ সফর থেকে এসে যাবেন। প্রথমে খুশী লাগত। মাওলানা সাহেব আসলেন। করমর্দন (মোসাফাহা) করলেন। কখনো গলাও জড়িয়ে ধরতেন। এতে করে আমার দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যেত।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর এখন কী অনুভব করছেন? আপনার কী ধারণা যে, আপনি যদি ইসলাম কবুল না করতেন তাহলে কী হত?
মুহাম্মদ সুহায়ল: কুফরের ওপর মারা যাবার কল্পনাও আমার জন্য জাহান্নামের চেয়ে কম (যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্টকর) নয়। ভাইটি আমার! আমার ওপর আল্লাহর দয়া ছিল। নইলে আমার সাথীদের থেকে আমি জাহান্নামের বেশি হকদার ছিলাম, বেশি উপযুক্ত ছিলাম। আমি জমিদারি ও মালদারির অহংকারে কত রকমের জুলুম করতাম। আল্লাহর যমীনের ওপর চলতাম, তাঁর দেওয়া খাবার খেতাম, তাঁর দেয়া শরীর দ্বারা তাঁর হক আদায় করতামনা শুধু তাই নয়, বরং তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সব কাজ করতাম। আমি ইসলাম কবুল করার পর একদিন ঘরে ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি দেখছিলাম। তার সামনে আমার মা প্রসাদ রেখেছিলেন। দুই-তিনটে পিঁপড়ে সেসব প্রসাদের কিছু কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর একটা কুকুর বাইরে থেকে এল। কুকুরটিও সেসব প্রসাদ খেল এবং চেটেপুটে খেয়ে পা তুলে সেখানে পেশাব করল। বিষ্ণুমূর্তি না ঠেকাতে পারল পিপড়েকে না কুকুরকে। আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর খুব হাসলাম। নিজেকেই বললাম, সুহায়ল! যদি আমার আল্লাহ আমার ওপর মেহেরবান না হতেন এবং আমাকে তিনি হেদায়াত না দিতেন, পথ প্রদর্শন না করতেন তাহলে আমিও বোকার মতই এই মূর্তির সামনেই মাথা নত করতাম। যখন কোন হিন্দু ভাইয়ের সাথে কথা বলতাম তখন আমার আরও আফসোস হত ও বিস্ময় লাগত। তারা বলত, দেখো! আমরা যেই ভগবানের মূর্তিকে পূজা করি সেতো আমাদের সাথে, আর মুসলমানরা যেই খোদার পূজা করে তাঁকে কে দেখেছে? আমি তাদের বলতাম, আচ্ছা! বল দেখি, যেই বাতাসের মধ্যে আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করি তার ভেতর অক্সিজেন আছে কি নেই? তারা বলত, যদি অক্সিজেন না থাকত তাহলে আমরা তো মরে যেতাম। আমি বললাম, যেই অক্সিজেনের সাহায্যে তোমরা শ্বাস গ্রহণ কর তা কি তোমরা দেখেছে? তারা বলত, দেখিনি বটে, তবে আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে অনুভব করি।

আমি বলতাম, অক্সিজেন না দেখে অনুভব কর, বিশ্বাস কর আর অক্সিজেন যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই মালিককে অনুভব কর না, বিশ্বাস কর না! তোমাদের বুদ্ধি ও জ্ঞানের ওপর আফসোস! আমার ইচ্ছা, ব্যাপারটা একটু ঠাণ্ডা হলে ওয়ার্ল্ড নিউজে আমি আমার কাহিনী লিখে পাঠাব। এজন্য যে, আমাদের পরিবারকে গোটা এলাকায় সব দিক দিয়েই বড় মনে করা হয়। লোকে আমাকে দেখে মনে করত, ‘তুমি তো স্বর্গে আছ, স্বর্গে থাক। ইসলামের নাম শুনলেই আমি জ্বলে উঠতাম। সম্ভবত যে শব্দটি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণার ছিল তা ছিল মুসলমান। কিন্তু সত্য যখন এল, আর আমার জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর থেকে পর্দা সরে গেল, তখন আমার ধারণা, আমার সত্যিকার মালিক কে, তাঁর ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা না মেনে আমি কেমনতরো নরকে বেঁচে ছিলাম। এখন আমার কাছে যদি সবচেয়ে প্রিয় কোন শব্দ থেকে থাকে তাহলে সেটা হল ইসলাম। যদি কেউ আমার কাছে ইসলাম ও মুসলমানের জন্য জীবন চায়, রক্ত চায়, তাহলে আমি মনে করি, তা হবে আমার জন্য পরম সৌভাগ্য। এই ভেবে আমি খুশী মনে দিয়ে দেব। এজন্য আমি মানুষের সামনে আমার কাহিনী শোনাতে চাই যাতে লোকে জানে এ ধরনের বড় ঘরের ছেলে কোন লোভে পড়ে তো এমত সিদ্ধান্ত নেবে না। ইসলাম সত্য বলেই তো ঘর-বাড়ি সব কিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি ঘরের লোকদের সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন কি?
মুহাম্মদ সুহায়ল:  রক্তের সম্পর্ক আবেগদীপ্ত সম্পর্ক হয়ে থাকে। আপন ঘরের লোকদের খুবই স্মরণ করি বরং ঘরের লোকদের চেয়েও বেশি তাদের মৃত্যুর কথা খুব মনে হয়। এখন তো আমার জন্য সেখানে যোগাযোগ করা সহজ নয়। হ্যাঁ, আমি দোআ করি। আমি আব্বুজীকে দোআর জন্য বলেছি। আমার বিশ্বাস আছে। তিনি ওয়াদা করেছেন এবং আমাকে বলেছেন যে, তিনি দোআ করেন। আল্লাহ তাঁর দোআ অবশ্যই কবুল করবেন এবং ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আমার পুরো পরিবার ইসলামের ছায়ায় আসবে। একদিন আমি আব্বীজি মাওলানা কালীম সাহেবকে বললাম, আপনি আমার বাপ, আমার গুরু সবকিছু। আপনার কাছে একটি জিনিস চাইব। আপনি দেবেন? আমার নাম মাওলানা সাহেব রেখেছিলেন সুহায়ল খান। আমার দিল চায়, আমার নাম আপনার সঙ্গে জুড়ুক। আপনি যখন আমার মা-বাপ বরং তার চেয়েও বেশি। কেননা মা-বাপ তো ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। অতএব আমি যদি সুহায়ল সিদ্দিকী লিখতে থাকি আপনি আমাকে অনুমতি দেবেন। আশা করি, আমি যদি সুহায়ল সিদ্দিকী লিখতে থাকি তাহলে মাওলানা কালীম সিদ্দিকীর মত আল্লাহ আমাকেও মানুষে হেদায়াতের মাধ্যম বানাবেন। কমপক্ষে আমার পরিবারের জন্য তো ইসলামের ফয়সালা হয়ে যাবে। আব্বীজি বললেন, বেটা! সত্যি কথা এই এখনও তো কালীম সিদ্দিকী নিজেও মুসলমান হয়নি। আসল কথা হল, আমাদের নবী করীম (সা.) আমাদেরকে সত্য সংবাদ দিয়েছেন যে, কিয়ামতের আগে প্রতিটি কাঁচা-পাকা ঘরে ইসলাম প্রবেশ করবে। সেই খবর তো সত্য হতে হবে। নাম কালীম সিদ্দিকীর হচ্ছে। এ ধরনের হতভাগার সঙ্গে জুড়ে কী লাভ? আসলে এই সিদ্দিকী নিসবত হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রা.)-র দিকে যিনি কোনরূপ দ্বিধা-দ্বন্দ ছাড়াই এতটুকু ইতস্তত না করে প্রথম সুযোগেই আল্লাহর রসূল (সা.)-কে সত্য মেনেছেন। এজন্য তিনি সিদ্দিক হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। আপনি জান্নাত-জাহান্নাম স্বপ্নে দেখে ইসলামের সত্যতা সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। আপনি এই নিয়তে নিজেকে সুহায়ল সিদ্দিকী লিখুন। এরপর থেকে আমার নাম সুহায়ল খানের স্থলে সুহায়ল সিদ্দিকী বলি।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমানদের জন্য কোন পয়গাম দেবেন কি?
মুহাম্মদ সুহায়ল:  একজন মানুষ সফর করে, ভ্রমণ করে, রেল ভ্রমণ, দু’তিন ঘণ্টার ভ্রমণ। কখনো কখনো রেলে চেকিং হয়। অন্যথায় স্টেশনে নেমে যাত্রী যখন গেট অতিক্রম করে ঘরে ফিরতে উদ্যত হয়, তখন টিকিট চেক হয়। (তদ্রুপ) এই দুনিয়ার রেল থেকে আপন ঘর পরকালে ফেরার পথে সেখানকার দরজায় অবশ্যই টিকেট চেকিং হয় আর এখানকার টিকিট হল ঈমান। ঈমান ব্যতিরেকে টিকিটবিহীন যাত্রীর ন্যায়। মানুষ নরক (জাহান্নাম)-এর জেলের মুখে যাবে। এজন্য আমাদেরকে সমগ্র দুনিয়ার মানুষ যেন এই টিকিট সংগ্রহ করে, করতে উৎসাহী হয় সেজন্য বলা তো দরকার। ইসলাম এমন এক সত্য যে, যদি তা মানুষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সকলের অবস্থা আমার মতো পাল্টে যাবে। আমাদের মুসলমানদের এটা বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য। যার পরকাল ও জান্নাত-জাহান্নামের ওপর বিশ্বাস না হয় সে আমার দিলকে জিজ্ঞেস করে নিক যে, জাহান্নাম কত বড় বিপজ্জনক জায়গা। (ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে) আল্লাহ বাঁচান! আল্লাহ বাঁচান! আর জান্নাত কেমন জায়গা। এর জন্য মানুষ কুরবান হোক।

আহমদ আওয়াহ: বহুত বহুত শুকরিয়া। আসসালামু আলাইকুম।
মুহাম্মদ সুহায়ল:  ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মসিক আরমুগান, এপ্রিল-মে, ২০০৬ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ