চৌধুরী আব্দুল্লাহ সাহেবের সাক্ষাতকার

আমাদের শাইখ হযরত মাও. কালিম সিদ্দিকী দা. বা. বলেন, এই হিন্দুস্থানের লোকেরা রোগী মাত্র। তাদের শত্রুতা আর চক্রান্ত হলো ঐ রোগের হইচই। এই সব রোগের চিকিৎসা হলো ভালোবাসা আর সাহস । আরমুগানের পাঠকদের নিকট আমার আবেদন হলো, অমুসলিমদের যেন দুশমন না মনে করে; বরং রুগী মনে করে ভালোবাসার কথা দিয়ে তার চিকিৎসা করে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
চৌধুরী আবদুল্লাহ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু?

আহমদ আওয়াহ: চৌধুরী সাহেব! প্রতিটি কাজেরই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। কতদিন যাবত আপনার আলোচনা শুনছি। আব্বু প্রায়ই তার বয়ানে আপনার নাম ধরে আলোচনা করেন। আমি কয়েকবার ভেবেছি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেব। অনেক দিন পর আজ সেই দিন এলো। আমাদের এখান থেকে আরমুগান নামে একটা মাসিক পত্রিকা বের হয়। আমি ঐ পত্রিকার পক্ষে আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি।
চৌধুরী আবদুল্লাহ: মাওলানা আহমদ সাহেব! আরমুগানের সাথে আমার নতুন করে পরিচয় করানোর প্রয়োজন নেই। ব্যস্ততার কারণে বরং কিছুটা অলসতার কারণে উর্দূ শেখা হয়নি। তবে খুবই যত্মের সাথে আরমুগান অন্যকে দিয়ে পড়িয়ে শুনি। আমি হাফেয ইদ্রীস সাহেব ও মাওলানা ওয়াসি সাহেবকে কতবার বলেছি আমরা যারা উর্দূ পড়তে পারি না তাদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করুন। আরমুগানের হিন্দী সংস্করণ বের করার ব্যবস্থা করুন। তাদের সাথে যখন কথা হয় তখন মনে হয় আমাদের ব্যথা তারা বুঝতে পেরেছেন। মনে হয় আগামী মাস থেকেই আরমুগানের হিন্দি সংস্করণ বের হতে শুরু করবে। কিন্তু কতদিন যাবত অপেক্ষায় আছি। বুঝি, তাদেরও অনেক ব্যস্ততা। নতুন একটি ম্যাগাজিন বের করা সহজ কথা নয়। আমি মাওলানা সাহেবকে বলেছি বেশি না পারি হিন্দি সংস্করণের জন্য অন্তত পাঁচশ সদস্য যোগাড় করা আমার দায়িত্ব, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ডাক একদিন অবশ্যই শুনবেন।

আহমদ আওয়াহ: নিরাশ হবেন না। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই আপনার আশা পূর্ণ হবে। ঈদের পর আশা করছি আরমুগানের হিন্দী সংস্করণ বের হতে শুরু করবে।
চৌধুরী আবদুল্লাহ: আহমদ ভাই! আপনাকে পেট ভরে মিষ্টি খাওয়াবো যদি এ খবর সত্যি হয়।

আহমদ আওয়াহ: চৌধুরী সাহেব! আপনার বংশীয় পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলবেন?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: আমি ১৯৫১ সালের ৬ ডিসেম্বর এই ফুলাতেরই প্রতিবেশী গ্রামে এক জাট খান্দানে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বাবা ছিলেন একজন জমিদার। ইংরেজ আমলে ইন্টারমিডিয়েট পাস। কর্মজীবনে তিনি প্রাইমারি স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন। তার বয়স একশ’ এক বছর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন আমার পিতাজী ছিলেন সেই স্কুলের হেড মাস্টার। এই স্কুলেই আমি প্রাইমারি এবং জুনিয়র হাই স্কুল পাস করেছি। তারপর এস. এস কলেজ থেকে হাইস্কুল এবং ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। খান্দানি ঐতিহ্য হিসেবেই ব্যায়াম এবং বডি বিল্ডিংয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলাম। ইন্টার পর্যন্ত মরুভূমিতে কুস্তি লড়েছি। কুস্তিযুদ্ধে অনেক পুরস্কার জিতেছি। উত্তর প্রদেশের বিহার অঞ্চলে প্রচুর নাম কামিয়েছি। ছেলেবেলা থেকেই ছিলাম নির্ভীক এবং বীর স্বভাবের। আমার বাবা দুর্বল ও গরীবদের প্রতি খুব মনোযোগী ছিলেন। প্রচুর গরীব শিক্ষার্থীর ফিস তিনি নিয়মিত নিজের পকেট থেকে আদায় করতেন। বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার অভ্যাস। আমরা সব ভাই এই স্বভাবটা পিতাজীর কাছ থেকে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি।
এই আবেগের কারণেই অসহায় নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে অনেক খুনি এবং বদমাশের সাথে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। তাদের মোকাবেলা করতে গিয়ে শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে মিশতে হয় কিছু বাজে মানুষের সাথে। তারপর এই অসৎসঙ্গ আমাকে সেদিকে টানে। এক সময় এসব অসৎদের সঙ্গেই আমার একটা স্থায়ী সম্পর্ক হয়ে যায়। সেই হিসেবেই পুরো এলাকায় আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে। জানি না কত মানুষের অন্তরে আমার নাম একটি সাক্ষাত ভীতিকর মূর্তি হয়ে বসে আছে। পুলিশের অনেক লোক পর্যন্ত আমার নাম শুনে ভয় পায়।

ভাই আহমদ! অবস্থা এক সময় এতোটাই জটিল হয়ে যায়- একদিনের কথা, আমি খাতুলির থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছি। পুলিশ কিংবা কোতায়ালের কোনো লোক গেটের সামনে দাঁড়ানো ছিল। আমাকে দেখামাত্রই তারা ভেতরে চলে গেল এবং ফিসফিস করে কী সব বলতে লাগলো। না জানি আবার কখন ধরে পঙ্গু বানিয়ে দেয়! মানুষ আমার নামে হিন্দু কায়স্থ সমাজে এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে থাকে। মানুষ আমার নাম শোনামাত্রই চাঁদা দিয়ে দেয়।

আমার প্রতি আল্লাহ তাআলার অসীম কৃপা এই অবস্থায়ও আমি সর্বদা নির্যাতিত ও অসহায়দের পাশে থেকেছি। এদের সাথেই আমি আমার জীবন-মরণের সার্থকতা ভেবেছি। এজন্য আমি প্রপার্টি ডিলিং করেছি। এটা খুব ভালো চলছে। কয়েকটি শহরে আমি আমার নামে কলোনী বানিয়েছি। সেগুলো খুব দ্রুত আবাদ হয়ে উঠেছে। গরীব দুঃখীদের জন্য আমি কাজ করতে পারছি এটাই আমার তৃপ্তি। আমার ব্যবসায়ও দ্রুত উন্নতি হয়েছে। তারপর ১৯৯২ সালের ২৬ ডিসেম্বর আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়েত নসীব করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমান হওয়ার ঘটনাটি বলুন।
চৌধুরী আবদুল্লাহ: কোনো নির্যাতিত কিংবা দুঃখী মানুষের প্রতি আমার কোনো সাহায্য হয়তো আল্লাহ তাআলার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তাই এই নাপাক বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার করুণা জেগেছে। ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম খুবই রাগী। মাঝে মাঝে আমার রাগ এতোটাই চরমে উঠতো যে মনে হতো শরীরে আগুন জ্বলছে। একবার ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বললেন- ব্লাড প্রেসার খুব বেড়ে গেছে। তারপর আমার রোগ ধীরেধীরে বাড়তে লাগলো। দেখা গেল সারা শরীরে ব্যাথা এবং একাধারে ব্যাথা বেড়েই চললো। এজন্য আমাকে ইনজেকশন নিতে হলো এবং এভাবে এটা অভ্যাসে পরিণত হলো। এক সময় দেখা গেল চারটি কোর্টভিন দুটোদুটো করে মিশিয়ে সকাল-সন্ধ্যা নিতে হতো।
একদিনের ঘটনা। সন্ধাবেলা আমি ক্লিনিকে গিয়েছি ইনজেকশন নেয়ার জন্য। ক্লিানিকটি ছিল টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশে। আপনার আব্বু মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব সেখানে ফোন করতে গিয়েছিলেন। সেই সময় ফুলাতে ফোনের ব্যবস্থা ছিল না। তাছাড়া শহর থেকেও সরাসরি ফোন করার ব্যবস্থা ছিল না। বরং ডাক্তার সাহেবের ফোনে কলব্যাক করে কথা বলতে হতো। আপনার আব্বু তখন ফোন করার জন্য ক্লিনিকে বসে ছিলেন। আমি ডাক্তার সাহেবকে ইনজেকশন দিলাম। তিনি ইনজেকশন দুটি একসাথে আমার হাতে পুশ করে দিলেন। মাওলানা সাহেব এই ঔষধের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন। একজন সাধারণ মানুষকে এই ইনজেকশন দেয়ার পর অন্তত দশ ঘন্টা তাকে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে হয়। অথচ দুটি ইনজেকশন নিয়ে আমি দিব্যি কথা বলছিলাম। আমার এই অবস্থা দেখে মাওলানা সাহেব অস্থির হয়ে পড়লেন। মনে হলো যেন ইনজেকশন আমাকে নয় তাকে দেয়া হয়েছে। আমাকে বললেন- চৌধুরী সাহেব! আপনি তো নিজের প্রতি অবিচার করছেন। এই ইনজেকশন আপনি কেন নিচ্ছেন? বললামÑ-আমার সারা শরীরে ব্যথা। আমার রাগ অতিরিক্ত। ফলে সকাল-বিকাল আমাকে চারটা ইনজেকশন নিতে হয়।

মাওলানা সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন- আপনি দিনে অন্তত ২ বার আত্মহত্যা করে চলছেন। আপনি অন্য কোনো উপায়ে চিকিৎসা করছেন না কেন? এই ইনজেকশন আপনি এখনি ছাড়ুন। তারপর তিনি বললেন- আচ্ছা, আপনার এতো রাগ হয় কেন? আমি বললাম- যখন কোনো সবল ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তির উপর অত্যাচার চালায় তখন আমার মন চায় তাকে খুন করে ফেলি বা নিজের জীবনটা দিয়ে দিই। আর এসব করতে গিয়েই আমি শতশত মোকদ্দমায় ফেঁসে গেছি। এ-ও বললাম- কতবার এই নেশা কাটাবার জন্য মাসের পর মাস হাসপাতালে থেকেছি। হেকিম দেখিয়েছি। লাখ লাখ রুপি ঢেলেছি। যদি বলি- অন্তত দশ লাখ রুপি আমি এই চিকিৎসায় ব্যয় করেছি তাহলে মিথ্যা হবে না। মাওলানা সাহেব বললেন- আপনি থাকেন কোথায়? আমি বললাম, মাওলানা সাহেব! আপনি মনে হয় ফুলাতের লোক। তিনি বললেন- হ্যাঁ, আপনি কিভাবে চিনলেন?
আমি বললাম- ফুলাতের পথে আমি কিছু জমি খরিদ করেছি। সেখানেই আপনাকে আসা-যাওয়ার পথে দেখেছি। আমি আপনার প্রতিবেশী। আমার নামও হয়তো আপনি শুনেছেন। আমার নাম শোনামাত্রই তিনি বললেন- আচ্ছা, আপনিই সেই ব্যক্তি! আমাদের পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত যার নাম ছাপা হয়। বললাম- সেই অধম অপদার্থ আমিই। মাওলানা সাহেব বললেন- আপনি তো জীবনে অনেক চিকিৎসা করিয়েছেন এবার একটা মাস সময় আমাদের দেন। আপনি ফুলাতে আমাদের ঘরে আসুন। সেখানে আরামে খানাপিনা করবেন। আপনার চিকিৎসার সব দায়-দায়িত্ব আমার। আপনার কোনো পয়সা খরচ হবে না। আপনি আমার সাথে থাকবেন। মালিকের অনুগ্রহে আমি আশাবাদী এক মাসের মধ্যেই আপনি এই ইনজেকশনের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

মাওলানা সাহেব কথাগুলো খুব জোর দিয়ে বললেন। তারপর আমাকে বললেন- কথা দিন, কবে আপনি ফুলাতে আসছেন? আমি বললাম- মাওলানা সাহেব! আমি আপনার ভালোবাসার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল। এই মুহূর্তে আমি খুবই পেরেশানির ভেতর রয়েছি। বেশ কয়েকটি মামলা চলছে। এগুলোর হাজিরা থেকে মুক্ত হয়েই আপনার ওখানে চলে আসবো। আপনার কথা আমি অবশ্যই শুনবো।

মাওলানা সাহেবের অনুমতি নিয়ে আমি বাড়ি চলে এলাম। আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং হৃদ্যতার কারণে তাঁর অস্থির চেহারাটি আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগলো। রাতে এক দুইবার অল্প ঘুম পেয়েছিল তখন স্বপ্নে দেখলাম- মাওলানা সাহেব আমার সামনে কাঁদছেন। তিনি আমাকে বারবার বলছেন- চৌধুরী সাহেব! নিজের জীবনের প্রতি যত্মবান হোন। নিজের প্রতি অবিচার করবেন না। তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি ভাবছি, ভগবান! এ তোমার কেমন জগৎ সংসার! কিছু লোক অন্য মানুষের গর্দান উড়িয়ে নিজেদের স্বপ্ন নির্মাণ করছে আবার কিছু লোক অন্যের বেদনায় নীরবে অস্থির হয়ে কাঁদছে।

এই অস্থিরতার ভেতর দিয়ে আমি রাতটি পার করি। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কিছুক্ষণ ব্যায়াম করে বাগানে পানি দেয়ার জন্য পাইপটা তুলেছি এমন সময় দরজায় নক হলো। দরজা খুলে দেখি হাফেয ইদ্রীস সাহেব দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে বললাম- আসুন মাওলানা সাহেব! ভেতরে ঢুকেই হাফেয সাহেব বললেন- ফুলাত থেকে এসেছি। তার হাতে একটি চিঠি ও ছোট একটি পুস্তিকা। পুস্তিকাটি হিন্দীতে লেখা, আমি বললাম- এই কি সেই দেবতাদের ফুলাত, যেখানকার একজন মহাত্মা অতিথির সাথে খাতুলিতে ক্লিনিকে সাক্ষাত হয়েছিল? যাঁর ভালোবাসা পুরোটি রাত আমাকে অস্থির করে রেখেছে? হাফেয সাহেব বলেন- তাঁর পক্ষ থেকেই একটি প্রেমপত্র নিয়ে এসেছি। আপনার ভালোবাসায় তিনিও গতরাতে একটুও ঘুমাতে পারেননি। হাফেয সাহেব চিঠিটি আমার হাতে দিলেন। আমার ভাতিজা বাগানে পানি দিচ্ছিল, আমি তাকে ডাকলাম, বললাম- বেটা এসো, এক দেবতার পক্ষ থেকে প্রেমপত্র এসেছে। আমি পত্রটি ভালোবাসায় মাথায় ছোঁয়ালাম এবং চুমু খেলাম। তারপর খুলে পড়তে লাগলাম। মাওলানা আহমদ, আমি পত্রটি লেমিনেটিং করে সযত্মে এখনও আমার কাছে রেখে দিয়েছি। সেই পত্রটি ছিল এই-

“আমার একান্ত প্রিয় ভাই চৌধুরীজী! তাঁর প্রতি সালাম যিনি সত্য পথের পথিক। ডাক্তার সাহেবের ক্লিনিকে আপনার সাথে দেখা হবার পর চলে এসেছি ঠিক কিন্তু আমার অবুঝ মন আপনাতে আটকে রয়েছে। রাতভর আপনার অবস্থার কথা ভেবেছি। যে ইনজেকশন আপনাকে দেয়া হচ্ছিল তার ফলশ্র“তিতে নেমে আসা অপেক্ষমান মৃত্যু আমাকে সারা রাত অস্থির করে রেখেছে। আমি জানি এই জীবন নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। কুরআন আমাকে জানিয়েছে মৃত্যু এক মুহূর্ত আগেও আসে না এবং তাকে পেছানোও যায় না। কিন্তু এই জীবনের পর একটি স্থায়ী জীবন আছে। সেখানে আছে অনন্ত সুখের স্বর্গ এবং অনন্ত দুঃখের নরক। নরকের একটি দুঃখ কিংবা এক পলের শাস্তি পুরো জীবনের অগ্নিদহনের চেয়েও ভয়াবহ। কানে শোনা কথা এবং চোখে দেখা ঘটনাও মিথ্যা হতে পারে কিন্তু আমার প্রিয় ভাই! ঈশ্বরের সত্য পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের কথায় কোনো মিথ্যা নেই। আপনি যদি মুসলমান না হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তাহলে আপনাকে নরকের শাস্তি ভোগ করতে হবে। এজন্য আপনার এই প্রিয় ভাইয়ের প্রতি অনুগ্রহ করে এবং জীবনের প্রতি মমতা করে ঈমান কবুল করে নিন এবং মুসলমান হয়ে যান। সত্য দিলে পাঠ করুন- আশহাদু আললা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া পূজনীয় আর কেউ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও সর্বশেষ পয়গম্বর।
আমার প্রিয় ভাই! আপনি যদি সর্বশেষ খোদায়ী পত্র এবং অন্তিম সংবিধান কুরআন শরীফকে মেনে চলার অঙ্গীকার করে এই কালেমা না পড়েন তাহলে আপনাকে নরকে জ্বলতে হবে। আমার ভাই! একবার ভেবে দেখুন, সেই নরক থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়! এই নরকে একবার প্রবেশ করার পর আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। আমার প্রিয় ভাই! আপনাকে কিভাবে বুঝাবো রাতটি আমার কিভাবে কেটেছে! রাত ১টার সময় আমি অস্থির হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠেছি। তারপর মালিকের সামনে মাথা রেখে আপনার জন্য দুআ করেছি। বলেছি, নির্যাতিত দুর্বলদের প্রতি অবিচার সইতে পারে না এবং নিজের ক্ষোভ ও ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলে যে বান্দা নিজেকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে- হে মালিক! তোমার সে বান্দা তোমার হেদায়েত এবং করুণার কতই না যোগ্য! আমি আশাবাদী আমার মালিক এই দুঃখী বান্দার দুআ অবশ্যই শুনবেন।

আমার তো মনে হচ্ছে তিনি আমার প্রার্থনা শোনছেন। সুতরাং আপনি আপনার মুসলমান হওয়ার শুভ সংবাদটি আমাকে দিন। যেন আপনার এই প্রিয় ভাই অন্তরে সামান্য স্বস্তি পেতে পারে। আমি আপনাকে যে সর্বশেষ পয়গম্বরের কালেমার প্রতি আমন্ত্রণ জানাচ্ছি তাঁর জীবন সম্পর্কিত একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকাও আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। কামনা করি আমার অন্তরের কথা আপনাকে স্পর্শ করুক। আল্লাহ তায়ালা আমাকে ও আপনাকে হেদায়েতের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আমাদের মৃত্যু হোক হেদায়েতের উপর।
ওয়াস সালাম
আপনার ভালোবাসায় অধীর আপনার ভাই-
মুহাম্মদ কালিম
১৩ ডিসেম্বর- ১৯৯৭

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: চিঠিটি আমি আমার ভাতিজাকে জোরে জোরে পড়ে শোনালাম। পত্রের অকৃত্রিম ভালোবাসা আমার অস্তিত্বের রন্ধ্র্রেরন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছিল। আমি চিঠিটি পড়ছিলাম আর পত্রের নিখাঁদ ভালোবাসার ছোঁয়ায় আমার এক একটা লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তাঁর ভালোবাসার হাতে আমি এক বন্দি গোলাম। মন চাইছিল সঙ্গেসঙ্গে ছুটে গিয়ে হযরতকে জড়িয়ে ধরি। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁর স্বপ্ন পূরণ করি। কিন্তু সেদিনই গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার তারিখ ছিল। মামলার সাক্ষীদের সাথে কথা বলার দরকার ছিল। উকিলের সাথেও দেখা করার প্রয়োজন ছিল। তাই আমি হাফেয সাহেবকে বললাম- রাতে কিংবা আগামীকাল আমি মাওলানা সাহেবের সাথে দেখা করবো। সেদিন মুজাফফরনগর থেকে ফিরতে বেশ দেরী হয়ে গিয়েছিল। এত রাতে মাওলানা সাহেবের কাছে যাওয়া ঠিক মনে হয়নি। রাতে দেরী করে শোয়ার কারণে ঘুম ভাঙ্গে সকাল দশটায়। এগারটার সময় ফুলাত গিয়ে শোনলাম হযরত সফরে চলে গেছেন।

তারপর আট-নয়বার ফুলাত গিয়েছি। আল্লাহ তাআলা আমার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন- একবারও মাওলানা সাহেবের সাথে দেখা হয়নি। ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ। মাওলানা সাহেব বুলন্দ শহরে যাওয়ার কথা। তখন তিনি খাতুলি থেকে হাফেয ইদ্রীস সাহেবকে এই বলে পাঠিয়ে দিলেন- আজ সন্ধ্যায় আমি ফিরছি, আপনি আসলে দেখা হবে। সেদিনও আমার তিনটি মামলার তারিখ ছিল। আমি অনেক রাতে ঘরে ফিরি। রাত দশটায় প্রচন্ড শীতের মধ্যে মোটর সাইকেলে করে রওয়ানা দেই ফুলাতের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে আমার ভাতিজা। আমার আসার সংবাদ শুনে মাওলানা সাহেব বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। এখন যেটাকে খানকা বলা হচ্ছে সেখানেই প্রথম সাক্ষাত হয়। মাওলানা সাহেব আমাকে দেখেই বলেন- কালেমা পড়ে নিয়েছেন তো! আমি তাঁর সাথে একান্তে কথা বলার আবেদন জানাই। মাওলানা সাহেব আমাকে ঘরের ভেতর একটি কক্ষে নিয়ে যান।

আমি তাঁকে বলি- আপনার প্রেমপত্র আমাকে গোলাম বানিয়ে ফেলেছে। এখন আপনি চাইলে আমাকে বিক্রিও করতে পারেন। আবার মুক্তও করতে পারেন। প্রথমেই আমি ক্ষমা চাইছি সাক্ষাতে আসতে অনেক দেরী হয়ে গেল। এর আগে আমি এগার-বারোবার এসেছি। আপনার সাথে দেখা হয়নি। আমার মুসলমান হওয়ার দুটি পদ্ধতি হতে পারে। সবার সামনে এমনকি মসজিদে আমাকে কালেমা পড়তে পারেন। এতেও আমি আনন্দচিত্তে রাজি আছি। আবার এ-ও হতে পারে, আমার দু’জন স্ত্রী রয়েছেন। তাদের ছেলে-মেয়ে আছে। আমি এখন কালেমা পড়ে নিই। তারপর আমি আমার মামলাগুলো থেকে উদ্ধার হই। পরিবারের লোকদের প্রস্তুত করি। তারপর সকলের সামনে আমার মুসলমান হওয়ার কথা ঘোষণা করি। আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। আপনার হয়তো জানা নেই, আমি জেলা শিবসেনার প্রধান ছিলাম।

১৩ ডিসেম্বর আপনার পত্র পাওয়ার পর সন্ধ্যায় এই পদ থেকে আমি ইস্তফা দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন আমি মাওলানা সাহেবের পিছনেই অবশিষ্ট জীবন কাটিয়ে দেবো। মাওলানা সাহেব বললেন- প্রথমেই কালেমা পড়ে আমার অন্তর ঠান্ডা করুন। আমি বললাম- পড়িয়ে দিন। আমি আপনার চিঠিতেই সত্য দিলে কালেমা পড়ে নিয়েছি। আমার নামও রেখে ফেলেছি আব্দুল্লাহ। মাওলানা সাহেব বললেন- ঈমান প্রতিনিয়তই তাজা করতে হয় এবং তাজা রাখতে হয়। তারপর আমাকে তিনি কালেমা পড়ালেন এবং বললেন- আবদুল্লাহ খুবই সুন্দর নাম। আমাদের নবীজি বলেছেন- আবদুল্লাহ এবং আব্দুর রহমান আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই প্রিয় নাম।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: মাওলানা সাহেব আমাকে সময় করে নামায ইত্যাদি শিখতে বললেন এবং পরিবারের লোকদের জন্য ভাবতে বললেন। আলহামদুলিল্লাহ দুই মাসের মধ্যে আমার ছোট স্ত্রী এবং তার চার সন্তান ইসলাম গ্রহণ করে। মামলা-মোকদ্দমায় খুব পেরেশান ছিলাম। মাওলানা সাহেব বলেছেন- যখনই কোনো মোকদ্দমায় যাবেন দুই রাকাত সালাতুত তাওবা এবং সালাতুল হাজত পড়ে যাবেন। আল্লাহ তায়ালা যখন বান্দার তাওবা কবুল করেন তখন তার অপরাধ ফেরেশতাদের পর্যন্ত ভুলিয়ে দেন এবং আমলনামা থেকেও নিশ্চিহ্ন করে দেন। আমি এই প্রেসক্রিপশন সযত্মে ব্যবহার করেছি। আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া। খুব সহজেই তিনি আমাকে সকল মামলা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন মাত্র দুটি মামলা আছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইনজেকশনের কী হলো?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: ইসলাম গ্রহণের পর রমযান মাস এলো। মাওলানা সাহেব আমাকে ডাকলেন। বললেন- আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কোনো মানুষ যদি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় তাহলে পাহাড় কেটে দুধের নদী পর্যন্ত প্রবাহিত করতে পারে। এই ইনজেকশন একটি নেশা। ইসলামে নেশা হারাম। আপনি গুনাহ মনে করে খাঁটি দিলে তাওবা করুন। পুরো রমযান মাস রোযা রাখুন। রমযানের শেষ দিকে আমাদের সাথে মসজিদে এসে কয়েকদিন এতেকাফ করুন। আমি সাহস করলাম এবং প্রতিদিন সালাতুত তাওবা পড়ে এই অঙ্গীকার করতে লাগলাম- হারাম থেকে আমাকে বাঁচতেই হবে। ব্যথায় হাত-পা কাঁপতো। কিন্তু আমি সাহস হারাতাম না। নিজেকে বলতাম- জীবন চলে যাক তবু আমি হারাম কাজ করবো না। রমযানের শেষ দশকে মামলা-মোকদ্দমার কারণে ফুলাত আসতে পারিনি। মাওলানা সাহেব ইদ্রীস সাহেবকে পাঠিয়েছিলেন ফুলাতের জামে মসজিদে তিন দিন কাটাবার জন্য। একথা যখন ফুলাতের লোকেরা শুনেছে তখন এ নিয়ে অভিযোগ তুলেছে যে, একজন ডাকাত-বদমাশকে মসজিদে আনার কোনো মানে হয়?
আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আমাকে ফোর্টভিনের আযাব থেকেও নাজাত দিয়েছেন। আহমদ ভাই! কী আশ্চর্যের বিষয়। মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাতের এক মাসের মধ্যেই আমি সেই ফোর্টভিন থেকে মুক্তি পেলাম বিগত বিশ বছরেও আমি যার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না।

আহমদ আওয়াহ: শিবসেনার মতো একটি সংগঠনের জেলা দায়িত্বশীল ছিলেন আপনি। মুসলমান হওয়ার পর কি নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় না?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: একেবারেই না। আমার কাছে মনে হয় আমি যেন স্বভাবজাতভাবেই মুসলমান ছিলাম। ইসলামের প্রতিটি কথাই আমার কাছে মনে হয় আত্মার খোরাক।

আহমদ আওয়াহ: আপনার দ্বিতীয় স্ত্রীর কী হলো?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: সে এখনও মুসলমান হয়নি। আমি তাকে তালাক দিয়ে দিয়েছি। সম্পদে তার যতটুকু পাওনা ছিল তা আদায় করে দিয়েছি। তার থেকে আমার এক কন্যা ও এক পুত্র আমার সাথে দিল্লীতেই আছে। মাওলানা সাহেবের পরামর্শে আমি দিল্লীতে একটি বাসা নিয়ে বসবাস করছি। এ সিদ্ধান্ত আমার কাছে খুবই স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে। তাছাড়া আমার মুসলমান হওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ করা সহজ হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আব্বু কি আপনাকে দাওয়াতের কাজে যুক্ত করেননি?
চৌধুরী আবদুল্লাহ: কেন নয়? তাছাড়া আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে আমি যা কিছু করি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই চেষ্টা করি। আমার ভাই একটি হাই স্কুল পরিচালনা করতেন। সেখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছিল মুসলমান। অন্যদিকে খাতুলিতে এক মুসলমান একটি জুনিয়র হাই স্কুল চালাতো। এই স্কুলের দায়িত্বশীল একজন হাজী সাহেব। তিনি খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। হেড মাস্টারের সাথে বিতর্কের সূত্র ধরে সেখানকার ধর্ম বিষয়ক তিনজন শিক্ষক দুই মাস ধরে কোনো ক্লাস নিচ্ছেন না। হাজী সাহেব বিষয়টি যাচাই না করে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন- আমি মাদ্রাসা রাখবো না। শুধু স্কুল চালাবো, তারপর তিনি তিনজন হাফেয ও মাওলানাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। হঠাৎ করেই একদিন আমি আমার ভাইয়ের স্কুলে যাই। কিছু মুসলমান ছেলেকে স্কুল ছুটির সময় বাইরে আসতে দেখে তাদের কালেমা শুনাতে বলি। কালেমা তাদের মনে ছিল না একথা আমার মনে বড় আঘাত দেয়। আমি ভাইকে বলি আপনার স্কুল মুসলমান মহল্লায়। আপনি যদি এখানে কুরআন শরীফ ও উর্দূ শেখাতে শুরু করেন তাহলে আপনার ছাত্রসংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। কথাটা তার কাছেও যৌক্তিক মনে হয়।

তারপর আমি মাওলানা সাহেবকে শিক্ষক দিতে বলি। মাওলানা সাহেব মুসলিম স্কুল থেকে বরখাস্ত করা হাফেয সাহেব ও মাওলানা সাহেবকে পাঠিয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আমার ভাইয়ের স্কুলে এখন পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণীতে কুরআন শরীফ এবং ধর্ম বিষয়ের পাঠ মাদ্রাসার মতোই চলছে। আলহামদুলিল্লাহ আমার ভাইও মুসলমান হয়ে গেছেন। তাঁর নাম আব্দুর রহমান। আমাদের দুই ভাইয়ের গল্প মাওলানা সাহেব মাঝে মধ্যেই ওয়াজের মধ্যে বলেন।

আহমদ আওয়াহ: আরামুগানের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
চৌধুরী আবদুল্লাহ: কারও বাইরের অবস্থা দেখে প্রতিপক্ষ মনে করা, তাকে ইসলামের দুশমন বলে সিদ্ধান্ত নেয়া এটা ঠিক নয়। দৃশ্যত শিবসেনার জেলা দায়িত্বশীল অসংখ্য অন্যায় অপকর্ম এবং মামলা-মোকদ্দমায় নিমজ্জিত আমার মতো এক অচ্ছ্যুত মানুষের কাছেও বাবরি মসজিদ শাহাদাতের পর ইসলাম বিরোধী পরিস্থিতি ছিল চরম ঘৃণাদায়ক।

আরেকটি মজার কথা বলছি- আমাদের খান্দানের এক ছেলে। আমার দুঃসম্পর্কের ভাই। তার বাবা ডাক্তার, হঠাৎ মুসলমান হয়ে আব্দুর রহমান হয়ে গেল। তারপর এসে ফুলাতে থাকতে লাগলো, তার জন্য আমার ভাবি খুব কান্নাকাটি করতো। তার কান্না দেখে আমারও মায়া হতো। কতবার ভেবেছি একবার গিয়ে এই হযরতজীকেও শেষ করে দিয়ে আসি। আমার মাথার উপর কতো মামলা ঝুলছে সেখানে না হয় আরেকটি বাড়বে। কিন্তু আহমদ ভাই! সত্য বলছি- আমি যখন ইসলাম পেলাম তখন আমার মনে হলো এটা ছিল আমার অন্তরের মমতা। আর আমার জন্ম হয়েছে এই মমতার উপর। বাবরী মসজিদ শাহাদাতের পর একজন শিবসেনার মুসলমান হওয়া আবশ্যই একটি আশ্চর্যের বিষয়। কিন্তু আমার কাছে এটা মোটেও আশ্চর্যের মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয় না এটা বিস্ময়কর কিছু। বরং এটা আমাদের দেশের ত্র“টি। আমাদের হযরতের ভাষায়- ভালোবাসার আবেগই শ্রেষ্ঠ শক্তি। এই জাতি সকল অস্ত্র ও সকল হামলা ঠেকাতে পারে কিন্তু ভালোবাসার আঘাতকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। হযরতের ভালোবাসা আমাকে এতোটাই গোলাম করে ফেলেছে, আমি রন্ধ্রেরন্ধ্রে তার কাছে বন্দি। কেবল ভালোবাসা আর খাঁটি মমতাই আমাকে কাবু করতে পেরেছে। আমি কোনো চমক দেখিনি, কোনো কথাও শুনিনি। আমাকে হেদায়েতের পথ দেখিয়েছে কেবল ভালোবাসা আর দরদ।

ফুলাতের এক কসাই, নাম জামালুদ্দিন। খাতুলিতে ব্যবসা করে। পাঁচ বছর আগের ঘটনা। একদিন সকাল দশটার সময় তার সাথে আমার দেখা। সে আমাকে বললো- চৌধুরী সাহেব! আপনি এখানে ঘুরছেন অথচ মাওলানা সাহেব এক সপ্তাহ যাবত বিছানায় পড়া। আহমদ ভাই কী বলবো! এ কথা শোনা মাত্রই আমার জীবন বের হবার উপক্রম। আমি সঙ্গে-সঙ্গে ঘরে গেলাম। তারপর গাড়ি নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে পৌনে বারোটার সময় ফুলাত গিয়ে হাজির হলাম। মাওলানা সাহেব তখন মুম্বাই থেকে আগত কিছু মেহমানের সাথে বসে কথা বলছিলেন। তার চেহারায় ছিল নিষ্পাপ হাসি। জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলাম।
বললাম- জামালুদ্দীন আমাকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। সে বললো আপনি বিছানায় পড়ে আছেন। সারা রাস্তা আমি আল্লাহর কাছে এই দুআ করতে করতে এসেছি হে আল্লাহ! আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও তুমি হযরতকে বাঁচিয়ে রাখো। আপনি ভালো আছেন দেখে জীবন ফিরে পেয়েছি। বাকী জীবনেও দুআ করে যাবো আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের জীবন দিয়ে হলেও আপনাকে বাঁচিয়ে রাখেন। মাওলানা সাহেব বললেন- প্রচন্ড গরমের মধ্যে পাঞ্জাবে এক সপ্তাহ সফর করতে হয়েছে। গরমের কারণে মূত্রাশয়ে যন্ত্রণা হচ্ছিল। আজ সকালে পাথর বের হয়ে গেছে।

আমাদের হযরত সত্যই বলেন- ভারতবর্ষের মানুষগুলো শত্র“ নয়, বরং রোগী। তাদের শত্র“তা এবং চক্রান্ত হলো তাদের ব্যাধির চিৎকার। প্রয়োজন ভালোবাসা দিয়ে সাহস দিয়ে তাদের চিকিৎসা করার। আরমুগানের পাঠকদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ তারা যেন ভারতবাসীকে প্রতিপক্ষ না ভাবেন। বরং অসুস্থ মনে করেন। তাদের চিকিৎসা হলো ভালোবাসা মেশানো দুটো কথা। সাথে সাথে আমি সকলের কাছে আমার জীবনের সুন্দর সমাপ্তির জন্য দুআ চাই।

আহমদ আওয়াহ: চৌধুরী সাহেব! আপনাকে অনেক শুকরিয়া।
চৌধুরী আবদুল্লাহ: শুকরিয়া তো আপনাকে জানানো উচিত। আপনি আমাকে আরমুগানের মাহফিলে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, সেপ্টেম্বর- ২০০৮