জনাবা আয়েশা রাজী সাহেবা (নওমুসলিম)-এর সাক্ষাৎকার

হক্ব এবং সত্যের জন্য মানুষের কুরবানী দিতে হয়। মানুষ আযম করবে এবং হক অনুসন্ধানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হবে। তাহলে সত্য তার সামনে প্রকাশিত হবেই। আমি এমন অবস্থায়ই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম, হক্বের উপর ভরসা করার কারণে আল্লাহ তাআলা আমাকে সাহায্য করেছেন এবং আমাকে সাহস দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ আমি আমার লক্ষে পৌঁছেছি। আল্লাহ তাআলা মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর অটল এবং অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। কারণ, আসল জিনিস (ঈমানের হালাতে মৃত্যু) তো এখনো বাকী আছে।


আসমা জাতুল ফাওযাইন: আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।
আয়েশা রাজী: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আয়েশা রাজী, অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা যে, আরমুগানে মানুষের কারগুজারী ছাপা হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত আপনার ইন্টারভিউ নেওয়া হয় নাই, আমি কয়েকবার আব্বাকে বলেছিলাম যে, আয়েশা রাজীর ইন্টারভিউ ছাপানো দরকার!
আয়েশা রাজী: আমার নিজেরও এমন ইচ্ছা ছিল, আমি উমরের পিতাকে কয়েকবার বলেছি যে, হযরতজীকে বল এই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে যেন আমার নামও এসে যায়। হতে পারে এটাই আমার নাজাতের ওসীলা হবে। হযরত ফোনে কয়েকবার বলেছিলেনও, কিন্তু সব কিছুর একটা সময় আছে, এজন্য গত মাসে হযরত হুকুম করলেন এখানে এসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য, পরবর্তী মাসে তা ছাপা হবে। আলহামদুলিল্লাহ সেই সময় এসে গেছে।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার বংশীয় পরিচয় দিন!
আয়েশা রাজী: আমি পানি পথের হরিয়ানার অধিবাসী। আপনার জানা আছে, হিন্দুস্তানের শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য এবং আধ্যাত্মিকতা সকল দিক থেকেই দেশের মধ্যে তার উল্লেখযোগ্য অবস্থান রয়েছে। এই পানিপথের যমুনা নদীর তীরবর্তী এক গ্রাম্য ব্রাহ্মণ শর্মা পরিবারে আমার জন্ম।
আমার পরিবার অত্যন্ত ধার্মিক, আমরা চার ভাই, তিন বোন। আমি সবার ছোট। আমাদের গ্রামে মুসলমানদের কয়েকটি ঘর ছিল। তারা যেমন দুনিয়াবী দৃষ্টিকোন থেকে কমজোর ছিল, তেমনি ধর্মীয় দিক থেকে কমজোর ছিল। অনেকের তো সম্ভবত এটাও জানা ছিল না যে, ইসলাম কী জিনিস বরং অনেকে নামের দিক থেকেও মুসলমান ছিল না অর্থাৎ তাদের এবং তাদের সন্তানদের নাম হিন্দুদের মত রাখত। আমি স্কুলে ভর্তি হলাম, আমার সাথে দু-তিন জন মুসলমান মেয়েও পড়ত। তাদের মধ্যে একজনের মা ছিল ইউপির। দ্বীনের ব্যাপারে তার কিছু জানা শোনা ছিলো, অন্যথায় অধিকাংশ মেয়েদের এটাই জানা ছিল না যে, কালিমা কী? প্রাইমারী শেষ করার পর আমার বড় ভাই আমাকে লুধিয়ানা ভর্তি করিয়ে দেন সেখানে প্রথমে হাইস্কুল পাশ করে আলহামদুলিল্লাহ দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করি। আল্লাহ তাআলা আমাকে পরীক্ষায় ফেলতে চাচ্ছিলেন, তাই লুধিয়ানা যাওয়াটাই আমার জীবনের মোড় পরিবর্তনের মাধ্যম হয়।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে কিছু বলুন।
আয়েশা রাজী: পূর্বেই বলেছি আমার বড় ভাই রাজেন্দ্র শর্মা লুধিয়ানা থাকতেন। তিনি আমাকে লুধিয়ানা নিয়ে যান। সেখানে একটি মিশনারী স্কুলে ভর্তি হই। আমাকে এক খৃস্টান মেয়ে বাইবেল দেয়। আমি জন্মগতভাবেই ধার্মিক ছিলাম। বাস্তবিক পক্ষে সত্য নবীর সত্য বাণী, “প্রত্যেক শিশু স্বভাবজাত ভাবে ইসলামের উপর জন্ম লাভ করে কিন্তু তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী খৃস্টান অথবা মূর্তি পূজাক বানায়।” কিছু মানুষের স্বভাব এমন হয় যে, তার উপর পরিবেশের প্রভাব অন্যদের তুলনায় কম পড়ে, সম্ভবত আমার স্বভাব তেমনি ছিল।
নিজ ধর্মের প্রতি আমার কোনো আস্থা ছিল না। আমার নিকট এসব অর্থহীন ফালতুও মনে হত। যেন কোনো নি®প্রাণ নাটক আর কি। এজন্য আমার ভেতর সত্যের তৃষ্ণা অনুভব করি।
আমি বাইবেল পড়লাম, কিন্তু বাইবেলের তিনে এক এবং একে তিনের মত দুর্বোধ্য বিষয় আসাকে দ্বন্দ্বে ফেলে দিল। আমি স্বপ্নে দেখলাম, হযরত ঈসা আ. তাশরীফ এনেছেন এবং বলছেন, আমার ধর্ম ইসলাম, আর বর্তমান খৃস্টধর্ম আমার আনীত ধর্মের বিকৃত রূপ। চোখ খোলার পর ইসলাম সম্বন্ধে জানার আগ্রহ হল কিন্তু লুধিয়ানায় ইসলামী কালচার সম্বন্ধে জানা আমার জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। একদা স্কুল থেকে ফিরার পথে এক মসজিদে মাহফিল হচ্ছিল। বাহিরে চা, টুপিওয়ালারা দোকান দিয়েছিল। সেখানে হিন্দী এবং উর্দু ভাষায় ইসলামী বইও ছিল। আমি কয়েকটা বই কিনলাম। তার মধ্যে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতও ছিল। লেখকের নাম এখন মনে নাই। আমি পড়ার পর মনে হল, এটাই আমার পিপাসিত জিনিস। এরপর ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশী জানার ইচ্ছা হল। আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু না কিছু আসতে থাকল। আমি লুধিয়ানাতে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি মুসলমান হব। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, এই কাজ দিল্লীর জামে মসজিদের ইমাম সাহেব করেন। ছুটিতে আমি বাড়ি এসেছিলাম। শিরকের পরিবেশে আমার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হত। বার বার বাড়ি ছাড়ার কথা মনে হল।
আমি এক মুসলমান পরিবারের সাথে সম্পর্ক করলাম এবং তাদের দিয়ে ইউপি থেকে বোরকা আনালাম। একদিন সাহরীর সময় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম এবং জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পায়ে ঁেহটে যমুনা পর্যন্ত পৌছলাম, যমুনা পার হওয়ার জন্য নদীতে নেমে পড়লাম, নদীতে আমার গলা পানি ছিল কয়েকবার মনে হল যে, আমি ডুবে যাব, আমাকে একজন বলেছিল, বেশির চেয়ে বেশি কোমর পানি হবে। কিন্তু সেদিন বৃষ্টি হওয়ায় পানি বেড়ে গিয়েছিল। আমি কয়েকবার মনে মনে বললাম আমার আল্লাহ আমাকে দেখছেন যদি আমি মারা যাই তবে আমার এ মরণ আপনার মহব্বত, ভালবাসা এবং আপনার তালাশে হবে। বোন আসমা, জানিনা কোথায় আমি সেদিন এত সাহস পেয়েছিলাম। আল্লাহর শোকর যমুনা পার হয়ে গেলাম।
যমুনা পার হয়ে দিল্লীর রাস্তা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, আমাকে বরোত হয়ে দিল্লী যেতে হবে। এক মুসলমান ভাই আমাকে বলল যে, সেখানে মুসলমান হওয়ার জন্য দুজন জানা শোনা ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসাবে নিয়ে যেতে হবে অন্যথায় সেখানে এই কাজ হবে না। আমি বললাম তাহলে আমি কী করব, আমার তো অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। তখন সে বলল, তাহলে তুমি এক কাজ করো দেওবন্দ চলে যাও। আমি বললাম আমি একা দেওবন্দ কিভাবে যাব? তখন আমার উপর তার দয়া হল সে আমাকে বলল দেওবন্দ পর্যন্ত আমি তোমাকে পৌঁছে দিব। তবে আমরা বাসে একটু দুরে দূরে বসব, আমি তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে প্রথমে কিরানা তারপর শামেলী সেখান থেকে নানুতা হয়ে দেওবন্দ নিয়ে যান, দুইটার দিকে আমরা দেওবন্দ পৌঁছি। তারা মাদরাসায় মুসলমান বানাতে অপারগতা প্রকাশ করে। তখন এক মাওলানা বলল, একে সদর গেটের মাওলানা আসলাম এর নিকট নিয়ে যাও, সেখানে এই কাজ হয়ে যাবে। তিনি মাওলানা আসলাম সাহেবের নিকট নিয়ে যান, মাওলানা আসলাম সাহেব আমাদের খানা খাওয়ান -এবং সান্তনা দেন এবং হযরত (মাওলানা মুহাম্মাদ কলীম) -এর সাথে ফুলাতে যোগাযোগ করেন। হযরত বললেন, এখনই কালিমা পড়িয়ে দিন আর দু’-একদিন পর ফুলাত পাঠিয়ে দিবেন। তিনি আমাকে কালেমা পড়ান আমার নাম রাখেন আয়েশা। দুই-তিন দিন পর ফুলাত পাঠিয়ে দেন।
ফুলাতে কয়েকদিন ছিলাম সেখানে নামায-কালাম শিখতে থাকলাম। তারপর পড়াশোনা এবং দ্বীন শিখার জন্য মালিয়ার কোটলা শাকেরা রাজীর কাছে পাঠান। সেখানে আমি কুরআন শরীফ এবং দ্বীনি বিষয়গুলি শিখি। শাকেরা রাজী অত্যন্ত ভালো মেয়ে, আমাকে অনেক মুহাব্বতের সাথে রাখেন। কুরআন শরীফ শেষ করার পর ফুলাত ফিরে আসলাম তখন হযরত দিল্লীর এক যুবক হাবীবুর রহমানের সাথে আমার বিবাহ করিয়ে দেন।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার কাছে এই নতুন পরিবেশ আশ্চর্যজনক মনে হয়নি? বাবা-মা ছাড়া বিবাহ কেমন লেগেছে?
আয়েশা রাজী: হযরত মাওলানা আসলাম সাহেব এবং তাদের পরিবারের লোকেরা আমার সাথে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করেছে। ঈমান আনার মত সৌভাগ্য লাভ করতে পারা এবং আখেরাতের সফলতার অনুভূতি অন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। যদি কখনো দিলে কিছু আসত তাহলে সাথে সাথে নিজেকে বুঝাতাম।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার শ্বশুর কিভাবে বিবাহ দিয়েছেন?
আয়েশা রাজী: আলহামদুলিল্লাহ! আমার স্বামী হযরতের হাতে বাইয়াত। তাঁর মাতা অত্যন্ত ভালো মানুষ। পরিপূর্ণ সুন্নত মুতাবেক অত্যন্ত সাদাসিধাভাবে আমাদের বিবাহ দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ আমার নিজেকে একাকি মনে হয়নি।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার স্বামী কী করেন?
আয়েশা রাজী: তিনি এক্সপোর্ট-এর কাজ করেন, কিন্তু তাঁর উপর এমন এমন পরিস্থিতি এসেছে যা মনে হয় অনেক কম লোকেরই এসেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের সাহস দেন, আমার স্বামীর দাওয়াতের আগ্রহ এবং নিত্যদিনের সাফল্য আমাদের আগ্রহ উদ্দীপনা এবং সাহস বাড়িয়ে দেয়।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার পরিবারের লোকজন আপনাকে খুঁজেনি?
আয়েশা রাজী: শুরুতে অনেক খুঁজাখুজি করেছে। থানায় জি.ডি করেছে। গ্রামের কিছু লোককে পেরেশান করেছে। আমি চলে আসার সময় একটি চিরকুট লিখে এসেছিলাম, আমি কোনো ছেলের কারণে যাচ্ছি না, কেউ আমাকে নিয়েও যাচ্ছেনা; বরং আমি সত্যের সন্ধানে ছিলাম তা-আমি পেয়ে গেছি। আমাকে খোঁজা অনর্থক। যদি আল্লাহ চায় তাহলে আমি নিজেই যোগাযোগ করব। কিন্তু তারপরও তারা অনেক খোঁজাখুজি করেছে।
আমার আব্বার ইন্তেকাল আমার সামনেই হয়েছিল। আমি বিভিন্নভাবে বাড়ীর খবর নিচ্ছিলাম। আমি জানতে পারলাম, আমার মা অসুস্থ, মৃত্যুশয্যায় শায়িত। মাকে খুব মনে পড়তে লাগল। চিন্তিত ছিলাম যে, শিরকের উপর তার মৃত্যু না হয়ে যায়। আমি আমার স্বামীকে বললাম, কত মানুষকে আপনি কালিমা পড়িয়েছেন অথচ আমার মা কালিমা ছাড়া মারা যাচ্ছেন। এমন দাঈর সাথে আমার বিবাহ হয়ে কী লাভ হল? তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন আর বললেন, আজকেই যাচ্ছি। আমাদের আম্মাজান (শাশুড়ী আম্মা) বললেন, আমি তোমাদের একা যেতে দিব না, আমিও যাব। আমরা বাড়ী থেকে বাচ্চা-কাচ্চাসহ রওয়ানা দিলাম। আমি আমার শাশুড়ী আম্মা এবং স্বামীকে বললাম, আপনারা কোনো মুসলমানের বাড়িতে অবস্থান করেন।
আমি বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছি। যদি ৩টার মধ্যে ফিরে না আসি তাহালে আপনারা ফিরে যাবেন। বুঝবেন আমাদের চারজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার শাশুড়ী আম্মা জায়নামাযে বসে গেলেন। আমি বোরকা পড়ে বাড়ী পৌঁছলে লোকেরা পেরেশান হয়ে গেল। আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলেন। এদিকে ৪টা বেজে গেল কিন্তু তারা আমাকে অনুমতি দিল না, আমার শাশুড়ী আম্মা থাকতে না পেরে সোজা আমাদের বাড়ীতে চলে আসলেন। আমি আমার স্বামী এবং শাশুড়ী আম্মার অনেক প্রশংসা করলাম। তখন আম্মা তাদের সাথে দেখা করতে চাইলে আমি বললাম, এখন তো আমার তাড়াতাড়ি যেতে হবে। দু-তিন দিন পর আবার আসব। পরে আমার স্বামীকে নিয়ে গেলাম। আমি এবং আমার স্বামী আম্মাকে বুঝালাম, আলহামদুলিল্লাহ! তিনি বাড়ীর সবাইকে বের করে দিয়ে একা একা কথা বললেন এবং কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। আর আমাকে তার অলংকারের মধ্যে থেকে কয়েক ভরি স্বর্ণ দিলেন। আমার স্বামী, বাচ্চা এবং আমাকে কাপড় চোপড় দিলেন।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: এর পর কি আপনারা সেখানে গিয়েছিলেন?
আয়েশা রাজী: তাঁর জীবদ্দশায় আরো দুবার গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার দুইভাই এবং তাদের স্ত্রী আমাদের যাওয়াতে অসন্তুষ্ট। বিশেষত আম্মা প্রত্যেকবার কিছু না কিছু দিয়ে দিতেন, এই কারণে আমাদের জন্য যাওয়া মুশকিল হয়ে গেল। তার একমাস পর আম্মা ইন্তেকাল করেন। আলহামদুলিল্লাহ! তাঁর কালিমার ওপর ইন্তেকাল হয়েছে।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: পরিবারের বাকী সন্তানদের কী খবর?
আয়েশা রাজী: আমার দুই ভাই এবং দুই বোনের সাথে ভাল সম্পর্ক আছে, তারা আমাকে ভালবাসে। আমরা সকলের জন্য দুআ করছি আল্লাহ যেন সকলকে হেদায়েত দান করেন। আসলে পরিবারের লোকজন ততটা বিরোধী নয় যতটা আমরা মনে করেছিলাম। এলাকার লোকদের চাপের কারণে তারা একটু ভয় পায়, বড় ভাইয়া আমাকে বলেছে তোর যদি দেখা করতে মনে চায় তাহলে বলবি, আমি দেখা করে আসব। তোরা এখানে আসলে আমাদের সমস্যা হয়।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার স্বামী হাবীব ভাই অনেক বড় দাঈ। আব্বা তার কথা অনেক বলেন, তিনি কি দাওয়াতের ক্ষেত্রে আপনাকেও শরীক করেন?
আয়েশা রাজী: আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তাকে অনেক বড় নেয়ামত দান করেছেন। বহুলোক তার দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, আমাদের হযরত বলেন, দাঈর একটা টার্গেট থাকা উচিৎ যে, প্রত্যেক দিন কমপক্ষে একজনকে দাওয়াত দিয়ে মুসলমান বানাবো। কখনো মাসের পর মাস তাঁর এই সংখ্যা পূর্ণ হতে থাকে। এখনতো একদিনেই কয়েকজন মুসলমান হয়। আবার কখনো কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন খুব পেরেশান হয়ে যান। কখনো কাঁদতে থাকেন আর বলতে থাকেন আমার কোনো গুনার কারণে আল্লাহ রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। তখন গিয়ে হযরতের সাথে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাত করা সম্ভব না হলে ফোন করেন। কিন্তু কখনো ফোনে পাওয়া যায় না।
কিছুদিন আগে একবার এমন হয়েছে, দুই মাস যাবৎ হযরতের সাক্ষাত হয়নি এবং ফোনেও যোগাযোগ হয়নি। এদিকে দাওয়াতের কাজও কিছুটা স্থির হয়ে গেল। ব্যস! ঘরে মাতম শুরু হয়ে গেল। যখনি দেখা হয়, দেখি তিনি কাঁদছেন। আমি অনেক বুঝিয়েছি। হয়তো হযরত সফরে আছেন। যার কারণে আপনি যোগাযোগ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, না হযরত নারাজ হয়েছেন। আল্লাহর শোকর এর মধ্যে ফোন পাওয়া গেল। হযরত বললেন, তোমরা আমার রুহানী সন্তান তোমাদের উপর নারাজ হব কেন? মনে হল যেন তার উপর ঈদের দিন অতিক্রান্ত হয়ে গেল। তারপর তিনি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। তখন সকালে একজন তার হাতে মুসলমান হতো, সন্ধ্যায় আরেকজন। তখন আমার কাছে মনে হল যে, তাঁর কথাই সত্য। হযরতের সাথে সাক্ষাতের পর হযরত বললেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দাঈর হেফাজতের জন্য এই পদ্ধতি জারী আছে। দা‘য়ী এই যেন একথা মনে না করে যে, আমার কারণেই কাজ হচ্ছে; বরং একথা মনে প্রাণে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ যাকে চান হেদায়েত দান করেন। আর দাঈর কান্না আল্লাহ তাআলার কাছে অতিশয় প্রিয়। এজন্য আল্লাহ কখনো রাস্তা খুলে দেন আবার কখনো বন্ধ করে দেন।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আপনার সন্তানদের লেখাপড়ার কী খবর?
আয়েশা রাজী: আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ! চারজনই পড়ছে। ইনশাআল্লাহ! চারজনকেই হাফেজ এবং আলেম বানাব। আল্লাহ তাআলা আমাদের আশা পূরণ করেন এবং তাদের দ্বীনের দা‘য়ী বানান।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আব্বা বলেছিলেন, আপনি বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হন। তখন আপনার কেমন লাগে?
আয়েশা রাজী: কামাই রোজগার এবং অসুস্থতা ইত্যাদির সমস্যা আসে। অধিকাংশ সময় সাহাবায়ে কেরামের কুরবানী স্মরণ করি আর বলি, আমরা তো ঈমানের জন্য কোনো কুরবানী দিইনি। আর কখনো হিম্মত হারা হয়ে গেলে ভাল কোনো স্বপ্ন দেখি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে আলহামদুলিল্লাহ অনেক বার দেখি এবং পুরো মাস জুড়ে তার মজা এবং খুশী থাকে। গত সপ্তাহে আলহামদুলিল্লাহ অত্যন্ত ভাল অবস্থায় যিয়ারত হয়েছে। উমরের আব্বা বলেন, যিয়ারতের পর অনেক সময় পর্যন্ত তোমার চেহারা উজ্জ্বল থাকে।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: আরমুগানের পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।
আয়েশা রাজী: হক্ব এবং সত্যের জন্য মানুষের কুরবানী দিতে হয়। মানুষ আযম করবে এবং হক্ অনুসন্ধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে। তাহলে সত্য তার সামনে প্রকাশিত হবেই। আমি এমন অবস্থায়ই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম, হক্বের উপর ভরসা করার কারণে আল্লাহ তাআলা আমাকে সাহায্য করেছেন এবং আমাকে সাহস দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ আমি আমার লক্ষ্যে পৌছেছি। আল্লাহ তাআলা মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর অটল এবং অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। কারণ আসল জিনিস (ঈমানের হালাতে মৃত্যু) তো এখনো বাকী আছে।

আসমা জাতুল ফাওযাইন: অনেক অনেক শুকরিয়া আয়েশা রাজী। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আয়েশা রাজী: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
আসমা যাতুল ফাওযাইন
মাসিক আরমুগান, আগস্ট- ২০০৯