জনাব আব্দুর রহমান (অনিল রাও শাস্ত্রী)-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

মুসলমান ভাইদের কাছে আমার বিনীত আবেদন এটাই যে, আমাদের মত দুঃখী মানুষদের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করুন যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন। কিন্তু তাদের মা-বাপ দোযখে জ্বলছেন। একটু গভীরভাবে এই দুঃখ-কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করুন এবং নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যেই দায়িত্ব আমাদের মুসলমানদের কাঁধে সোপর্দ করেছেন সেজন্য ভাবুন।


আব্দুর রহমান: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আহমদ আওয়াহ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। ভাই আব্দুর রহমান! বেশ কিছুকাল আগে থেকে আমাদের এখানে ‘আরমুগান-ই-দাওয়াত’ নামে প্রকাশিত একটি পুস্তকে হযরত মাওলানা আলী মিঞা নদভী (সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সারা ভারতে এই ডাকনামেই মশহূর।-অনুবাদক) (আল্লাহ তাঁর কবরকে আলোকিত করুন)-র নামে আপনার একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় থেকে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমি খুব আগ্রহী ছিলাম। আপনি এমন এক সময় এসেছেন যখন আমার অন্য একটি প্রয়োজন সামনে। ফুলাত থেকে প্রকাশিত দাওয়াতী মাসিক ‘আরমুগান’-এ ইসলামে নবাগত সৌভাগ্যবান ভাই-বোনদের সাক্ষাৎকার প্রকাশের ধারা চলছে। সেপ্টেম্বর সংখ্যার জন্য আমি সন্ধান করছিলাম আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের। খুব ভাল সময়ে আপনি এসে গেছেন।

আব্দুর রহমান: আমারও কতগুলো খুব জরুরী পরামর্শ মাওলানা সাহেবের সঙ্গে করার ছিল। বছরখানেক হয়ে গেছে দেখা-সাক্ষাতের। ভালই হল যে, আপনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়ে গেল। আপনার সাক্ষাৎ আমার মনও চাচ্ছিল। আসলে হায়দারাবাদে আমাদের বহু বন্ধু-বান্ধব আপনার কথা খুব বলে। ওখানকার পত্রিকাগুলোতে আরমুগানের বরাতে অনেক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় যদ্দারা বিরাট দাওয়াতী পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে এবং আলহামদুলিল্লাহ মানুষের মধ্যে দাওয়াতী প্রেরণা জন্ম নিচ্ছে। আমাদের এখানে ওরাঙ্গিল থেকে বহু মানুষ ফুলাত সফরের বিশেষভাবে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রোগ্রাম তৈরি করছে। আল্লাহ তা’আলা আপনার হায়াত ও ইলমের মধ্যে বরকত দিন। মন খুশিতে ভরে ওঠে যখন দেখি যে, আমাদের হযরতের সাহেবযাদাও এই মিশনের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। আল্লাহু তা’আলা কবুল করুন।

আহমদ আওয়াহ: আমীন! আল্লাহ আপনার যবান মুবারক করুন এবং আমার মত অযোগ্যকেও তাঁর দীনের খেদমতে বিশেষ করে দাওয়াতের ময়দানে কবুল করুন। আমীন। জনাব আব্দুর রহমান সাহেব। আপনি আপনার বংশীয় ও পারিবারিক পরিচয় দিন।
আব্দুর রহমান:  ওরাঙ্গিল শহরের একটি বিরাট ব্যবসায়ী পরিবারে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে ১৯৫৪ সালের ১৩ই আগস্ট তারিখে আমার জন্ম। জন্মের পর আমার নাম রাখা হয় অনিল রাও। পাঁচ বছর বয়সে আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১৯৫৯ সালে হাইস্কুলে, অতঃপর সেখান থেকে কলেজে ১৯৬১ সালে ইন্টার, ‘৬৪ সালে বিএসসি এবং ১৯৬৬ সালে ফিজিক্স-এ এমএসসি পাস করি। অতঃপর পিএইচডি করার জন্য রেজিস্ট্রেশন করাই।

আহমদ আওয়াহ: এরূপ উচ্চশিক্ষা লাভ করা সত্ত্বেও আপনি হরিদ্বার, ঋষিকেশ গেলেন কিভাবে?
আব্দুর রহমান:  আমার পিতা আমাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু জানি না কেন, আমার মন এ ধরনের ঝামেলায় জড়াতে ভয় পেত। আমার পিতাজী বিয়ের জন্য চাপ দিলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। আমি হরিদ্বার অভিমুখে রওয়ানা হই। আমি ব্রহ্মচারী জীবন যাপন করতে চাইলাম। আমাদের পরিবার ছিল আর্যসমাজী। হরিদ্বারে গিয়ে একের পর এক ছয়টি আশ্রমে থাকি। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ আমার মনঃপুত হয়নি, হরিদ্বারে একজন ইঞ্জিনিয়ার বি.এইচ.এল.এ চাকুরি করতেন এবং তিনি ছিলেন বিজয়ওয়াড়ার বাসিন্দা। তার সঙ্গে আমার ভাল বন্ধুত্ব জন্মে। তিনি আমার অস্থিরতাদৃষ্টে আমাকে ঋষিকেশে শান্তিকুঞ্জ নামক আশ্রমে যাবার পরামর্শ দেন কিংবা সেখানে অন্য কোন সমাজী আশ্রমের সন্ধান করতে বলেন। আমি ঋষিকেশ গিয়ে সন্ধান শুরু করি। বহু অনুসন্ধানের পর আমি শ্রী নিত্যানন্দজী মহারাজার সত্যপ্রকাশ আশ্রম আমার জন্য উপযোগী ভাবি, যেখানে অধিকাংশই লেখাপড়া জানা শিক্ষিত লোক থাকত। স্বয়ং স্বামী নিত্যানন্দজীও অনেক লেখাপড়া জানা শিক্ষিত লোক ছিলেন। এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে সংস্কৃত ভাষায় ডক্টরেট করার পর অনেকদিন তিনি রীডার, অতঃপর প্রফেসর ছিলেন। ছয় বছর পর্যন্ত সেখানে ব্রহ্মচারী থেকে জ্ঞান শিখতে থাকি। ছ’বছর পর স্বামীজি আমাকে পরীক্ষার জন্য যোগ সাধনা করান এবং আমাকে শাস্ত্রী পদ দান করেন। শাস্ত্রী হবার পর আমি সাত বছরে চব্বিশটি যোগ করি। এ ছিল এক বিরাট পরীক্ষা। কিন্তু আমি সব কিছু ত্যাগ করে আমার মালিককে পাবার জন্য এসেছিলাম। এজন্য আমি কঠিন থেকে কঠিনতম সময়তেও সাহসহারা হই নাই।

ওরাঙ্গিল থেকে আসার সাত বছর পর আমার ভাই ও পিতাজী আমাকে খুঁজতে খুঁজতে ঋষিকেশ এসে পৌঁছেন এবং জানি না তারা কিভাবে আমাকে খুঁজে বের করেন ও আমার আশ্রমে আসেন। এক সপ্তাহ পর্যন্ত তারা আমাকে তোষামোদ ও খোশামোদ করতে থাকেন এবং আমি বাড়ি ফিরে যাবার জন্য জোর করতে থাকেন। কিন্তু আমার মন ঘরে ফিরতে ভয় পায়। আমি আমার পিতা ও ভাইকে খুবই খোশামোদ করি এবং ঈশ্বরকে পাওয়া পর্যন্ত আমাকে সেখানে থাকতে দেবার জন্য বলি। তারা এই শর্তে আমাকে ছেড়ে চলে যান যে, আমি আমার খরচে আশ্রমে থাকব এবং কারুর দান-খয়রাত খাব না। তাঁরা আশ্রমের অদ্যাবধি যে টাকা আমার বাবদ খরচ হয়েছে তা দিয়ে যান এবং ভবিষ্যতের ব্যয়াদি নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আশ্রম ফান্ডে জমা করেন।

আহমদ আওয়াহ: এতদিন পর্যন্ত একজন অধ্যাপক স্বামীজির প্রশিক্ষণাধীনে এ ধরনের লেখাপড়া জানা লোকের সাথে আশ্রমে থাকা সত্ত্বেও ইসলামের দিকে আসার খেয়াল আপনার মনে কিভাবে জাগল? আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আমাদেরকে একটু বিস্তারিত বলুন।
আব্দুর রহমান: আসলে যেই সত্য মালিকের সন্ধানে আমি ওয়াঙ্গিল ছেড়ে ছিলাম আমার ওপর আমার সেই মালিক করুণা করলেন এবং তিনি আমার জন্য নিজেই রাস্তা বের করে দিলেন। আহমদ ভাই, আপনার জানা আছে যে, আর্য সমাজ হিন্দু ধর্মেরই সংশোধিত রূপ। এতে এক নিরাকার খোদার উপাসনার দাবি করা হয়েছে। মূর্তি পূজা ও পুরানো দেবমালা কাহিনী অস্বীকার করা হয়েছে, প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই ধর্মের মূল গ্রন্থ ‘সত্যার্থ প্রকাশ’। এটি স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী রচিত। এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ ইসলাম ধর্ম ও এর শিক্ষামালা দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হন এবং তিনি হিন্দুদেরকে মুসলমান হতে বাধা দেবার জন্য হিন্দু ধর্মকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তিমাফিক বানাবার জন্য আর্য সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর দাবি হল, আর্য সমাজ শতকরা একশ ভাগ বৈদিক ধর্ম যা যুক্তি-তর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং একদম বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক। কিন্তু যখন আমি আর্য সমাজ পড়লাম আমার মনে তখন অনেক কিছু কাঁটার মত খচখচ করে বিঁঁধতে থাকে। ১৩ বছরের কঠিন কঠোর তপস্যা সত্ত্বেও আমি আমার ভেতর কোন পরিবর্তন অনুভব করলাম না। কখনো কখনো আমি স্বামী নিত্যানন্দজীর কাছাকাছি হতে চেষ্টা করতাম এবং তাতে বুঝলাম তিনি নিজেই তাঁর বিষয়ে তৃপ্ত নন। ১৯৯২ সাল আমার জন্য ছিল কঠিন সময়। মা-বাপকে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে ১৩টি বছর সন্ন্যাস গ্রহণের পর লোকে আমাকে শাস্ত্রীজি বলত। এ ছাড়া আমার ভেতরের মানুষটাকে আগের তুলনায় কিছুটা পতিত অবস্থায়ই পেলাম। নানা ধরনের খেয়াল আমার দিলে জাগল। কোন কোন সময় কয়েকদিন পর্যন্ত আমার ঘুম আসত না। কখনো খেয়াল জাগত, খোদাকে পাবার রাস্তাই ভুল। আমাকে অন্য পথ খুঁজতে হবে। কখনো এই ধারণা জাগত আমার আত্মাটাই ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ। এজন্য আমার ওপর কোন আছর হচ্ছে না। রাত্রে যখন আমার ঘুম আসত না তখন আমি উঠে পড়তাম এবং মনে মনেই আমার মালিকের কাছে দো’আ করতাম, হে সত্য মালিক! তুমি যদি থাকো এবং অবশ্যই তুমি আছ তাহলে তুমি তোমার অনিল রাওকে তোমার পথ দেখাও। তুমি খুব ভাল জান যে, আমি সব কিছু কেবল আর কেবল তোমাকে পাবার জন্য ছেড়েছি। এ সময় উত্তর কাশীতে কঠিন ভূমিকম্প দেখা দেয়। পুরো হরিদ্বার ও ঋষিকেশ কেঁপে ওঠে। আমার মনও আরও ভয় পেয়ে যায়। এভাবে আমিও যদি কোন দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় মারা যাতই তাহেল আমার কী হবে। ১৯৯২ সালে ১৭ই ডিসেম্বরের রাত। আমাকে স্বামীজি ডেকে পাঠান এবং বলেণ হরিয়ানার সোনীপথ জেলার রাই নামক স্থানে একটি বড় আর্য সমাজ আশ্রম আছে। সেখানে আশ্রমের ৫০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে উৎসব অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমার সেখানে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার শরীর ভাল নয়। এমনিতেও আমি আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি। ওখানকার প্রোগ্রামে সভাপতিত্ব করা ও যজ্ঞের জন্য কাল আপনাকে যেতে হবে। একথা শুনে আমি খুশি হই যে, স্বামীজি আমাকে কত ভালবাসেন। খুশি খুশি আপন কামরায় ফিরে আসি। সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। কিন্তু রাত্রে বিছানায় শুতে গিয়ে আমার মনে হল এই সংসারের সামনে পরিচয় ও যশ-নাম-খ্যাতি হলে কী আসে-যায় তাতে? তুমি কি এজন্য ওরাঙ্গিল ছেড়েছিলে। মা-বাপ, ভাই-বোন সব কিছু ত্যাগ করে কি এই নামের জন্যই তুমি এসেছিলে? আমার দিল খুব ব্যথিত হল। আমার ঘুম উড়ে গেল। আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম এবং চোখ বন্ধ করে মালিকের কাছে প্রার্থন করতে লাগলাম, হে আমার মালিক! তুমি সব কিছু করনেওয়ালা। আমার যেতে হবে। হে আমার মালিক! আর কতদিন আমি অন্ধকারে ঘুরে মরব। আমাকে তুমি সত্য পথ দেখিয়ে দাও। সেই পথ যা তোমার পছন্দনীয়। সেই পথ যেপথে চলে আমি তোমাকে পেতে পারি। খুব কেঁদে কেঁদে আমি দো’আ করতে থাকি। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখি কি আমি এক মসজিদে আছি। সেখানে একজন সৌম্যদর্শন মাওলানা সাহেব একটি সাদা চাদর গায়ে এবং পরনে লুঙ্গি। হেলান দিয়ে বসে আছেন। বহু মানুষ আদব সহকারে বসে আছে। লোকেরা বলল, ইনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, সেই মুহাম্মদ সাহেব যিনি মুসলমানদের ধর্মগুরু? তখন স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন : না, না, আমি কেবল মুসলমানদের ধর্মগুরু (রসূল) নই, বরং আমি তোমাদেরও রসূল। এরপর তিনি আমায় ধরলেন ও নিজের কাছে বসালেন এবং পরম সমাদরে আমাকে গলার সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললেন, যে তালাশ করে সে পায়। তুমি যদি কোন সমব্যথী ও সংবেদনশীল কাউকে পাও তবে তার কদর করবে। আজকের দিন তোমার জন্য ঈদের দিন।

আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমার মনের অবস্থা ছিল আজীব ধরনের। আমার এক ধরনের পুলক অনুভূতি লাগছিল। নিজের মনেই নিজে খুশি হচ্ছিলাম। আমার সাথীরা আমাকে আর কখনো এত খুশি দেখেনি। তারা বলতে লাগল, স্বামীজি তাঁর স্থলে সভাপতিত্ব করার জন্য পাঠাচ্ছেন। আসলেই কর্তা আপনার খুশি হবার কথা। তারা কী করে জানবে আমি কেন এত খুশি! সকাল সকাল উঠে আমি ঋষিকেশ বাস আড্ডায় পৌঁছি। সেখান থেকে সাহারনপুর বাস টার্মিনাল। টার্মিনালের সামনে একটি মসজিদ দেখতে পাই। আমি মসজিদের ভেতর যাই। লোকে আমাকে বিস্ময়ভরে দেখছিল। আমি তাদের বলি, মালিকের ঘর দেখার জন্য এসেছি। মসজিদের ভেতর গিয়ে আমি চারিদিকে খোঁজাখুঁিজ শুরু করি রাত্রে দেখা কোন লোক পাই কি না। কিন্তু মসজিদ ছিল খালি। মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমি এবং বড়োৎগামী বাসে গিয়ে উঠে বসি। বড়োৎ থেকে হরিয়ানার বাস পাব। সোনীপথগামী হরিয়ানা রোড ওয়েজ-এ যেয়ে বসি। সামনের সিটে আপনার আব্বা মাওলানা কালীম সাহেব বসাছিলেন। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, আপনার পাশে আর কেউ আছেন? তিনি বললেন, না কেউ নেই। আপনি আসতে পারেন। এরপর আমাকে খুশি হয়ে পাশে বসালেন। অতঃপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, পণ্ডিতজী! কোত্থেকে আসছেন? আমি বললাম, ঋষিকেশ সত্যপ্রকাশ আশ্রম থেকে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, সোনীপথ যাচ্ছেন। আমি বলি না, রাই-এ আর্য সমাজ আশ্রমের ৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে যজ্ঞ করার জন্য যাচ্ছি। জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আর্যসমাজী? আমি বলি হ্যাঁ। মাওলানা সাহেব অত্যন্ত ভদ্রতা সহকারে আমার কুশলাদি জেনে কিছুক্ষণ পর আমাকে বললেন, অনেকদিন থেকে আমি কোন আর্যসমাজ গুরু সন্ধান করছিলাম। আসলে ধর্ম আমার দুর্বলতার বিষয়। আমি সব ধর্ম সম্পর্কেই পড়ি। আমার খেয়াল হয় যে, আমাদের কাছে যা আছে তাই সত্য। এই ধারণা তো ভাল নয়। যা সত্য তা আমাদের তা সে যেখানেই থাকুক না কেন। এটাই আসলে সত্য কথা। আমি সত্যার্থ প্রকাশও পড়েছি এবং বারবার পড়েছি। কতকগুলো কথা আমার উপলব্ধিতে আসেনি। সম্ভবত আমার বুদ্ধিও মোটা। আপনি যদি খারাপ মনে না করেন তাহলে আপনার থেকে জেনে নিই? আমি আপত্তি হিসাবে নয় বরং বোঝার জন্য জানতে চাই। আমি বললাম, অবশ্যই। বলুন কী জানতে চান? এরপর মাওলানা সাহেব আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমি উত্তর দিতে থাকি। একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন। সত্যি বলতে কি আহমদ ভাই! মাওলানা সাহেব প্রশ্ন করছিলেন আর আমার মনে হচ্ছিল মাওলানা কালীম সাহেব অনিল রাওকে নয় বরং অনিল রাও স্বামী নিত্যানন্দজীকে প্রশ্ন করছে। একেবারে সে সব প্রশ্ন যা আমি আমাকে করতাম। যার উত্তর সে আমাকে দিতে পারত না, আমার ওপর রাত্রে দেখা স্বপ্নের প্রতিক্রিয়া ছিল, প্রভাব ছিল। চার-পাঁচটি প্রশ্নের পর আমি আত্মসমর্পন করি এবং মাওলানা সাহেবকে বলি, মাওলানা সাহেব এসব প্রশ্ন যা আমার মনেও কাঁটার মত খচ খচ করে বিঁধে। আর এসব প্রশ্নের উত্তর আমার গুরু স্বামী নিত্যানন্দজীও দিতে পারেননি। অতএব আমি আপনাকে কীভাবে তৃপ্ত করব।
মাওলানা সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাকে বললেন, আমি একজন মুসলমান। ইসলাম সম্পর্কে সব কিছু তো আমিও জানি না। কিন্তু কিছু জানার চেষ্টা করেছি আমি। আমার মন চায় ইসলাম সম্পর্কে কিছু কথা আমি আপনাকে বলি এবং ইসলাম সম্পর্কে যদি কোন খটকা কিংবা প্রশ্ন আপনার মনে জাগে অথবা আপনার জ্ঞান-বুদ্ধিতে ধরা পড়ে আপনি ইতস্তত না করে নির্দ্বিধায় তা আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না। ইসলাম সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। কাজেই কী প্রশ্ন করব। ব্যাস, সত্যার্থ প্রকাশে কিছু পড়েছিলাম। কিন্তু সে সব আমার মনে ধরত না। আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আপনি ইসলাম সম্পর্কে অবশ্যই বলুন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন সম্পর্কে যদি বলেন আমার ওপর আপনার বিরাট অনুগ্রহ হবে। মাওলানা সাহেব বলা শুরু করলেন এবং সর্বপ্রথম আমাকে বললেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিচয় সম্পর্কে সবচে’ বড় রকমের ভ্রান্ত ধারণা হল লোকে মনে করে যে, তিনি কেবল মুসলমানদের ধর্মগুরু (রসূল)। অথচ কুরআনের জায়গায় জায়গায় এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার একথা বলেছেন যে, তিনি মসগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত আখেরী রসূল (অন্তিম সন্দেষ্টা, সংবাদবাহক)। তিনি যেমন আমার রসূল, তেমনি আপনারও। এখন আমি তাঁর সম্পর্কে যা বলব তা এই মনে করে শুনবেন তো বেশি আনন্দ পাবেন। মাওলানা সাহেব যখন একথা বললেন, তখন আমার রাত্রের স্বপ্নের কথা মনে হল এবং আমার এমন লাগল যে, রাত্রে যেসব লোক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন ইনি তাঁদের মধ্যে অবশ্যই ছিলেন এবং সেই সমব্যথী ও সংবেদনশীল সত্তাই ইনি। মাওলানা সাহেব এমন ভালবেসে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, মানবতার প্রতি তাঁর দরদ এবং তাদের পথ প্রদর্শনের জন্য সীমাহীন ত্যাগ-তিতীক্ষা ও কুরবানী এবং আপন ও পর শত্র“দের শত্র“তার অবস্থা এমনভাবে বর্ণনা করেন যে, আমি একাধিকবার কেঁদে ফেলি। আনুমানিক দেড় ঘণ্টার সফর এমনভাবে শেষ হয়ে যায় যে, বুঝতেও পারিনি কখন ও কিভাবে তা শেষ হল। বহালগড় এসে গেলাম। বহালগড় নেমে আমাকে অন্য বাস ধরতে হবে। মাওলানা সাহেব সোনীপথ যাবেন। কিন্তু তিনি টিকিট ছেড়ে আমার সাথেই বহালগড় নামলেন। আমাকে বললেন, শীতকাল। আসুন, আমার সাথে এক কাপ চা পান করুন। আমি রাজী হই এবং সামনের দিকে এক রেস্টুরেন্টের দিকে ইশারা করে বলি, চলুন। মাওলানা সাহেব বলেন, এখানে আমার এক বন্ধুর দোকান আছে। সেখানে গিয়েই চা পান করা যাবে। আমরা সেখানে গিয়ে চা পান করি। আমি মাওলানা সাহেবকে দেখছিলাম আর বারবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা মনে হচ্ছিল। কোন সমব্যথী পেলে কদর করবে। আমি মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করি, আপনারা যখন কাউকে মুসলমান বানান তো কী রসম আদায় করেন? তিনি বলেন, ইসলামে কোন রসম বা প্রথা নেই। এই ধর্ম তো এক বাস্তব ধর্ম। ব্যাস দিলের মধ্যে এক খোদাকে সত্য জেনে তাঁকে রাজী-খুশি করার অঙ্গীকারকারী মুসলমান হয়। এরপর আমি বলি, এরপরও তো আপনারা কিছু বলিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, হ্যাঁ, ইসলামের কলেমা আছে। আমরা নিজের মঙ্গল ও সাক্ষী হবার জন্য সেই কলেমা পড়িয়ে থাকি। আমি বলি, আপনি আমাকেও কি সেই কলেমা পড়াতে পারেন? মাওলানা সাহেব বললেন নিশ্চয়! তিনি খুব আগ্রহের সাথে পড়ালেন: আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।” মাওলানা সাহেব এর অর্থও হিন্দীতে আমাকে বলেন ও বলতে বলেন।

আহমদ ভাই! আমি মুখে সেই অবস্থা বর্ণনা করতে পারব না যে, সেই কালেমা পড়ার পর আমি আমার ভেতর কী অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল একজন মানুষ একদম অন্ধকার ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে একেবারে মুক্ত আলো ও বাতাসে এসে গেল এবং ভেতর থেকে না জানি কত রকমের বাঁধন থেকে মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে গেল। আমার যখনই সেই অবস্থার কথা স্মরণ হয় তখন আমার ওপর খুশি ও মজার এক নেশা ছেয়ে যায়। ঈমানী নূরের মজা! আল্লাহ! আল্লাহ! দেখুন এখনও আমার শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ। আসলে আপনার ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। আপনি ছিলেন সত্যিকারের সত্যানুসন্ধ্যানী। এজন্য আল্লাহ আপনাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। এরপর রাই-এর প্রোগ্রামের কী হল?
আব্দুর রহমান: মাওলানা সাহেব আমাকে অনেক মুবারকবাদ দিলেন এবং আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। আমার ঠিকানা নিলেন এবং সোনীপথের পথ ধরলেন। তাঁকে সেখানে ভুরা রসূলপুর নামক মুরতাদদের একটি গ্রামে যেতে হবে যারা ১৯৪৭ সালে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং বংশীয় হিন্দুদের চেয়েও কঠিন হিন্দু হয়ে গিয়েছিল। মাওলানা সাহেবকে আমি বললাম, আপনি আমাকে কোথায় রেখে যাচ্ছেন? এখন তো আমাকেও আপনার সাথে নিতে হবে। মাওলানা সাহেব বললেন, আসলেই আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে বরং থাকতে হবে। কিন্তু আপনার রাই এর প্রোগ্রামের কী হবে? আমি বললাম, এখন ঐ প্রোগ্রামে শরীক হওয়া কি আমার ভাল লাগবে? মাওলানা সাহেব আমার এই কথায় খুব খুশি হলেন। গেরুয়া কাপড় পরিহিত কপালে তিলক ও ডমরু হাতে আমিও মাওলানা সাহেবের সঙ্গী হলাম এবং আমরা ভূরা রসূলপুর পৌঁছুলাম। মাওলানা সাহেব বললেন, এই এলাকার লোকেরা ইসলাম জানত না। ঈমানের কদর ও কীমত (মর্যাদা ও মূল্য) জানা ছিল না তাদের। এজন্য ১৯৪৭ সালের রায়টের সময় ভয় পেয়ে এরা মুরতাদ (হিন্দু) হয়ে যায়। ছোট্ট বাচ্চার হাতে হীরকখণ্ড থাকলে সে হীরকের মূল্য কী বুঝবে? ধমক দিলে কিংবা ভয় দেখালে সে হীরকখণ্ড দিয়ে দেবে পাথর ভেবে। কিন্তু জহুরীর হাতে সেই হীরকখণ্ড হলে জীবন দিয়ে দেবে কিন্তু হীরকখণ্ড সে কিছুতেই দেবে না। এখন আমাদের ওদেরকে ঈমানের আবশ্যকতা ও এর মূল্য বুঝিয়ে পুনরায় ইসলামে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। ভূরা গ্রামে একটি মসজিদ ছিল। একেবারে বিরান। মাওলানা সাহেব বললেন, এখানে এখন কেবল একঘর গোজর মুসলমান আছে। অথচ ১৯৪৭ সালের আগে গোটা গ্রাম মাওলা জাট মুসলমানদের ছিল। এখন এই মাওলা জান এমন কঠিন (হিন্দু) হয়ে গেছে যে, কয়েক বছর আগে এখানে একটি তবলীগ জামা’আত এসেছিল। মসজিদে অবস্থান করে। এই বেচারা গোজর মুসলমান তাদেরকে দিয়ে মাওলা জাটদের কাছে নিয়ে যায়। ব্যাস! গোটা গ্রামে হাঙ্গামা দেখা দেয়। ঐ সব মুরতাদ কোর্টে মামলা দায়ের করে এই বলে যে, এরা হাঙ্গামা সৃষ্টির জন্য আমাদের এখানে মোল্লাদের ডেকে এনেছে। মামলা চলল এবং ঐ বেচারা গোজর মুসলমানকে গাশতের রাহবরী করার মূল্য হিসাবে মামলায় প্রায় ২০,০০০ টাকা জরিমানা স্বরূপ আদায় করতে হয়। উত্তর কাশীর ভূমিকম্পের ধাক্কা এখান পর্যন্ত এসেছিল। লোকের মন এতে একটু ভীত ও নরম ছিল। মাওলানা সাহেব মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলেন, চেষ্টা-তদবীর করে কিছু দায়িত্বশীল লোককে মসজিদে ডেকে আনুন। তাদের সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে চাই, কথা বলতে চাই। নিদেনপক্ষে কোন বাহানায় লোক আল্লাহর ঘরে আসুক।

ইমাম সাহেব বললেন, এরা মসজিদে আসবে না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও মাওলানা সাহেব বললেন, চেষ্টা করে দেখুন। যদি আসে তো ভাল, নইলে প্রধান-এর ঘরে লোকজন ডাকব। আল্লাহ্র কী মর্জি। লোকে মসজিদে এল। মাওলানা সাহেবের আগে আমি কিছু কথা বলার আকাক্সক্ষা জাহির করি। অনুমতি পাবার পর আমি উপস্থিত লোকদের সামনে আমার পরিচয় পেশ করে বলি, আমি ওরাঙ্গিলের এক বিরাট বড় ব্যবসায়ীর ছেলে। এম.এস.সি. করার পর পি.এইচ.ডি. যখন সম্পন্ন করতে যাচ্ছি তখন বাড়ির লোকেরা বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। আমি দুনিয়ার ঝামেলার হাত থেকে বাঁচার জন্য হরিদ্বার আসি। একের পর এক আশ্রমে ঘুরতে থাকি। সব আশ্রমই দেখেছি পরে ঋষিকেশ থাকি। সেখানেও বহু আশ্রমে কাটিয়েছি। তের বছর সেখানে কঠোর তপস্যা করেছি। হিন্দু ধর্মের এই সব কেন্দ্রে লোকে আমাকে শাস্ত্রীজি বলত , এছাড়া আমি আর কিছু পাইনি । এছাড়া শান্তি বলতে কিছু আমি কোথাও পাইনি। মালিকের মেহেরবানী হল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে বড়োত থেকে বহালগড় পর্যন্ত সফর করি। সত্য বলছি, যেই শান্তি আমি এই দেড় ঘণ্টার সফরে ইসলামের কথা শুনে ও কলেমা পড়ে পেয়েছি, গত ১৩ বছরে আমি তা পাইনি। আমার ভাইয়েরা! এমন শান্তি ও সত্য ধর্ম ফেলে এই অস্থিরতার মধ্যে আপনরা আবার কেন ফিরে যাচ্ছেন। এই কথা বলতে গিয়ে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আমি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকি। আমার এই সত্য ও ব্যথা ভরা কথার লোকদের ওপর প্রভাব পড়ে এবং সেখানে লোকেরা ইসলামী স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহ প্রকাশ করে বরং এজন্য প্রয়েজনীয় চাঁদাও দেয়। এক্ষেত্রে সর্বাধিক আগ্রহ প্রদর্শন করে গ্রামের প্রধান করণ সিং যিনি সর্বাধিক ইসলাম বিরোধী ছিলেন। মাওলানা সাহেব খুব খুশি হন এবং আমাকে মুবারকবাদ পেশ করেন। তিনি বলেন, আপনার ইসলাম ইনশাআল্লাহ জানি না কত লোকের হেদায়োতের মাধ্যম হবে।

আহমদ আওয়াহ:  এরপর আপনি কোথায় ছিলেন।
আব্দুর রহমান: মাওলানা সাহেবের সঙ্গে ফুলাত এলাম। কাপড় নামালাম (গেরুয়া বসন ছাড়লাম) টিকি কাটলাম, বেশবাস ও চেহারা-সুরত ঠিক-ঠাক করলাম। এরপর মাওলানা সাহেব চিল্লা দেবার জন্য আমাকে জামা’আতে পাঠিয়ে দিলেন। মথুরা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় চিল্লা লাগাই। আমি আমার ইসলামে খুব খুশি ছিলাম। বারবার আমি শোকরানা নামায আদায় করতে থাকি। আমার আল্লাহ আমার আশা-আকাঙক্ষা পূরণ করেছেন। যখন আমি কোন হিন্দুকে দেখি যে বেচারা পথ না জানার দরুন কুফর ও শির্ক-এর জন্য কী কুরবানী দিচ্ছে তখন আমার ধারণা হয় এতো মুসলমানদের জুলুম। কত লোক প্রতিদিন কুফর ও শির্কের ওপর মারা যেয়ে চিরদিনের তরে দোযখের জ্বালানীতে পরিণত হচ্ছে। প্রিয় নবী সাল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কাজ তো সমগ্র মুসলমানদের ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। আমি এ ব্যাপারে খুব ভাবতে থাকি এবং আমার আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। এই দুঃখে আমি ঘুরপাক খেতে থাকি যে, কীভাবে মানুষের কাছে সত্য পৌঁছবে। আমি মথুরা মারকায থেকে হযরত মাওলানা আলী মিঞার ঠিকানা সংগ্রহ করি এবং তাঁর নামে আমার এই অবস্থা জানিয়ে পত্র লিখি। যেই পত্র আপনি ‘আরমুগানে দাওয়াতে’ (দাওয়াতের উপহার) পড়ে থাকবেন।

পত্রটি আরমুগান পাঠকদের জন্য নিচে দেওয়া হল :

“আদরণীয় মাওলানা আলী মিঞা সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন যে, আমি আপনার নতুন সেবক। … এর সাথে সফরে করেছি এবং সেখানে সফর করেছি। জামা’আতে যাচ্ছি। সেখান থেকে এসে হরিদ্বারে কাজ করার ইচ্ছা আছে। সেখানে শান্তির সন্ধানে আগত আমার মত কত লোক পথ হাতড়ে ফিরছে। আপনি আমার জন্য দো’আ করুন। আপনাকে একটি প্রশ্ন করছি, ভুল হলে ক্ষমা করবেন, যারা ইসলামের দাওয়াত না দেবার দরুন ইসলাম থেকে দূরে ছিল, আজ তারা দুনিয়া থেকে চলে গেছে এবং স্থায়ী নরকের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে তার দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে? সেজন্য দায়ী কে? আপনার নিকট দো’আ প্রার্থী।
আপনার সেবক
আব্দুর রহমান (অনিল রাও শাস্ত্রী)

আহমদ আওয়াহ: জামা’আত থেকে ফিরে আসার পর আপনি কী পেশা গ্রহণ করেছেন?
আব্দুর রহমান: জামা’আতে আমি ইচ্ছা করেছিলাম যে, হরিদ্বার ও ঋষিকেশ গিয়ে দাওয়াতের কাজ করব। কত বিপুল সংখ্যক সত্যসন্ধানী হিন্দু ভাই পথ না জানার দরুন সেখানে অন্ধকারে ঠোকর খাচ্ছে বরং এখন তো বিরাট সংখ্যক ইংরেজ ও ইহুদিরাও সেখানে অবস্থান করছে। আমাকে এ ধরনের পথহারা লোকদের পথ দেখাতে হবে। জামা’আত থেকে ফিরে এলে মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন, আপনার কাজের ময়দান তো হরিদ্বার ও ঋষিকেশই। কিন্তু প্রথমে তো ঘরের লোকদের হক। আপনি এক-আধ বছর ওরাঙ্গিল থাকুন। আমি ওরাঙ্গিল যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, আমার পিতা-মাতা মারা গেছেন। তাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাকে স্মরণ করেছেন এবং ছটফট করেছেন। এখন পর্যন্ত আমার সঙ্গে সম্পর্কহীন হিন্দুদের কুফর ও শির্কের ওপর মৃত্যুর জন্য দুঃখ আমার ওপর সওয়ার ছিল। এখন আমার মা যিনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন, যার রক্তে আমি গঠিত ও বর্ধিত যিনি আমাকে দুধপান করিয়েছেন, আমার পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করেছেন, আমার প্রিয় পিতা যিনি আমাকে চোখের মণি ভেবে লালন-পালন করেছেন, ঘর থেকে পালিয়ে যাবার পাঁচ-বছর গোটা দেশে আমাকে সন্ধান করেছেন ও কেঁদে ফিরেছেন, আমার এমন মুহ্সিন পিতা-মাতা ঈমান থেকে বঞ্চিত হয়ে কুফর ও শির্কের ওপর মারা গেলেন এবং তাঁরা দোযখে জ্বলছেন হয়তো। আমার এই ভাবনা আমার বুকের এমন এক যখম যে, ভাই আহমদ! আপনি আমার এই ব্যথা বুঝবেন না। এ এমন এক যখম যার কোন উপশম নেই। এমন ব্যথা যার কোন ঔষধ নেই। আমি যখন ভাবি যে, মুসলমানরা তাদেরকে ঈমান পৌঁছে দেয়নি তখন আমি চিন্তা করি যে, এ ধরনের জালিমদের আমি কিভাবে মুসলমান বলি? একথা ঠিক যে, এই পথহারাকে মুসলমানই পথ দেখিয়েছি, কিন্তু আমার ঈমানের চেয়েও বেশি জরুরী ছিল আমার মা-বাপের ঈমান। তাঁরা ছিলেন ইসলামের খুব কাছাকাছি। নিজেদের ঘরে মুসলমান কর্মচারী রাখতেন। ড্রাইভার সবসময় মুসলমান রাখতেন। বিড়ি ফ্যাক্টরীর সমস্ত শ্রমিকই ছিল মুসলমান। হিন্দু ধর্মে তাদের এতটুকু বিশ্বাস ছিল না। তিনি বলতেন, সম্ভবত পূর্বজন্মে আমি মুসলমানই থেকে থাকব। এজন্য যে আমার কেবল ইসলামের কথা শুনতেই ভাল লাগে। একদিন তিনি তাঁর ড্রাইভারকে বলছিলেন, কোন খারাপ কর্মফলের দরুণ এই জন্মে আমি হিন্দু হয়ে জন্মেছি। আগামী জন্মে আশা যে আমি মুসলমান হয়ে জন্ম নেব।

আহমদ ভাই! আমি বলতে পারছি না যে, এই কষ্টের কিভাবে উপশম ঘটবে। কখনো কখনো আমার মুসলমানদের ওপর সীমাহীন ক্রোধের সৃষ্টি করে। ভাইটি আমার। আমি যদি জন্মই না নিতাম! (কাঁদতে কাঁদতে)। আপনি একটু কল্পনা করুন সেই পুত্রের শোক ও জীবনের দুঃখ যার বিশ্বাস যে, তার স্নেহময় ও দয়ালু পিতা-মাতা জাহান্নামের আগুনে জ্বলছেন হয়তো। (অনেকক্ষণ ক্রন্দনরত)।

আহমদ আওয়াহ: কে জানে আল্লাহ্ হয়তো তাদের ঈমান দান করেছেন। তিনি যখন ঈমানের এত কাছাকাছি ছিলেন তখন হতে পারে যে আল্লাহ তা’আলা তাদের ফেরেশতাদের দিয়ে কলেমা পড়িয়ে দিয়েছেন। এমন ঘটনাও পাওয়া যায়।
আব্দুর রহমান: হ্যাঁ, ভাই যদি একথা সত্য হয়। মিথ্যা সান্ত্বনার জন্য আমি আমার মনকে এও বোঝাই। কিন্তু এওতো সত্য যে, এটা কেবলই সান্তনা।

আহমদ আওয়াহ: বাকী আত্মীয়-স্বজনদের কথাও তো আপনি ভাবতেন। আপনি তাদের ওপর দাওয়াতী কাজ করেছেন?
আব্দুর রহমান: আলহামদুলিল্লাহ! আমার বড় ভাই, ভাবী তাদের দুই সন্তানসহ মুসলমান হয়েছেন। পিতার মৃত্যুর পর কারবারের ওপর খুবই বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে যায়। তারা ঘর-বাড়ি বিক্রি করে এখন গুলবর্গাতে একটি বাড়ি কিনেছেন এবং কারবার শুরু করেছেন।

আহমদ আওয়াহ:  আপনার বিয়ের কী হল?
আব্দুর রহমান: আমার স্বভাব-প্রকৃতি যিম্মাদারি ভয় পায়। এজন্য ভেতর থেকে আমার মন বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমার মত
অপারগতার সম্ভবত শরীয়তেও অবকাশ থাকত। কিন্তু মাওলানা সাহেব বিয়ে সুন্নত হওয়া এবং এর ফযীলত কিছুটা এভাবে বর্ণনা করেন যে, একে নিরাপদ মনে হল। এক দরিদ্র মেয়েকে বিয়ে করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! খুবই নেক-চরিত্র ও সীমাহীন খেদমত গোযার মহিলা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের দুটি সন্তান একটি ছেলে ও একটি মেয়েও দান করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: হরিদ্বারে ও ঋষিকেশে কাজ করার ইচ্ছার কী হল?
আব্দুর রহমান: শির্ক ও কুফর অবস্থায় পিতা-মাতার মৃত্যু আমাকে দুর্বল ও ক্লান্ত করে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমার হুঁশ-জ্ঞান নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। পাগলপ্রায় হয়ে বনে-জঙ্গলে কাটাতে থাকি। ভাই সাহেব আমাকে ধরে নিয়ে আসেন। চিকিৎসা ইত্যাদি করান। বছর কয়েক পর শরীর-মন ঠিক হয়। তিন বছর আগে ঋষিকেশ গিয়েছিলাম। সত্যপ্রকাশ আশ্রমে যাই। স্বামী নিত্যানন্দজীর সঙ্গে দেখা করি। আমার কাছে কিছু বই ছিল। মাওলানা সাহেবের ‘আপ কী আমানত আপ কী সেবা মেঁ’ তার খুব মনঃপুত হয়। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন। তার কিডনীতে ক্যান্সার হয়েছিল। একদিন তিনি একান্ত আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, আমার মনও এ কথায় সায় দেয় যে, ইসলাম সত্য ধর্ম। কিন্তু এই পরিবেশে আমার জন্য তা কবুল করা খুবই কঠিন। আমি তাঁকে খুব বোঝাই যে, আপনি এত লেখাপড়া জানা মানুষ। নিজের ধর্ম মানা প্রত্যেক মানুষের গোটা জগদ্বাসীর সামনে আইনসম্মত অধিকার। আপনি খোলাখুলি ঘোষণা দিন। কিন্তু তিনি ভয় পান। ইসলামের ওপর তাঁর বিশ্বাসের কথা তিনি বারবার বলতেন আমাকে। আমি তাঁকে হিন্দী ভাষায় অনূদিত ‘কুরআন শরীফ’ এনে দিই। তিনি মাথায় ও চোখে লাগিয়ে তা গ্রহণ করেন এবং দৈনিক পড়তেন। তাঁর অসুখ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমি এই ধারণায় থাকি যে, তিনি যেন কুফর অবস্থায় মারা যাবার হাত থেকে বেঁচে যান, তাঁকে বলি, আপনি সত্যিকারের মন নিয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। চাই কি লোকের ভেতর এর ঘোষণা নাইবা দিলেন। দিলের ভেদ যিনি জানেন তিনি তো দেখছেন ও শুনছেন। তিনি এতে রাজী হন। আমি তাঁকে কলেমা পড়াই এবং তাঁর নাম রাখি মুহাম্মদ উছমান। মারা যাবার একদিন আগে তিনি আশ্রমের লোকদের ডাকেন এবং তাদেরকে নিজের মুসলমান হবার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমাকে যেন জ্বালানো না হয়, বরং ইসলামী তরীকায় দাফন করা হয়। লোকে ইসলামী তরীকায় তাঁকে দাফন করে নাই বটে বরং হিন্দু তরীকামতে বসিয়ে সমাধিস্থ করে। আল্লাহর শোকর যে, তিনি এখানকার আগুনের হাত থেকে বেঁচে যান। তাঁর মুসলমান হওয়াতে ঋষিকেশের অনেক লোক আমার বিরোধী হয়ে যায়। সেখানে থাকটা আমার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি আশংকা অনুভব করি। আমি ফুলাত এসে সমস্ত ঘটনা মাওলানা সাহেবকে বলি। তিনি বলেন দা’য়ীর ভয় পাওয়া উচিত নয়। তিনি আশ্বস্ত করে কুরআন পাকের আয়াত তেলাওয়াত করেন :

‘যারা আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয় ও তাঁকে ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না, আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।’
-সূরা আহযাব-৩৯

আল্লাহর সাহায্য ও মদদ সব সময় দা’য়ীদের সাথে থেকেছে। কিছুদিন গুলবর্গায় থেকে আমি পুনরায় ঋষিকেশ সফর করি। আমাদের আশ্রমের কয়েকজন যিম্মাদার এখন আমার এবং ইসলামের খুব কাছাকাছি এবং অন্যান্য আশ্রমের লোকেরাও এর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। শান্তিকুঞ্জের তো বহু লোক ইসলাম সম্পর্কে পড়ছে। আশা করি, দাওয়াতের পরিবেশ অবশ্যই সৃষ্টি হবে। এখন যথেষ্ট লোক আমার কথা ভালবেসে শোনে। আমার ইচ্ছা স্থায়ীভাবে সেখানে থেকে কাজ করার। আল্লাহ তা’আলা আমাকে হিম্মত দান করুন।

আহমদ আওয়াহ: বহুত বহুত শুকরিয়া! আব্দুর রহমান সাহেব! আপনার সঙ্গে আরমুগানের পাঠকের বরাতে অনেক কথা হল। আপনি কি তাদের উদ্দেশ্যে কোন পয়গাম দেবেন?
আব্দুর রহমান: মুসলমান ভাইদের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমাদের মত যারা দুঃখী তাদের কষ্ট বুঝি যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন, কিন্তু তাদের মা-বাপ জাহান্নামে জ্বলছে। একটু গভীরভাবে এই কষ্টকে বুঝতে চেষ্টা করুন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই যিম্মাদারী ও দায়িত্ব আমাদের মুসলমানদের যিম্মায় সোপর্দ করেছেন সে সম্পর্কে ভাবুন।

আহমদ আওয়াহ: আসলেই আপনার কথা সত্য। আল্লাহ তা’আলা আমাদের এই ব্যথাকে বোঝার তৌফিক দিন।
আব্দুর রহমান: আমীন!

আহমদ আওয়াহ: জাযাকুমুল্লাহ খায়রান। আসসালামু আলাইকুম।
আব্দুর রহমান: ওয়া আলাইকুমুস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, সেপ্টেম্বর, ২০০০ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ