জনাব ড. কাসেম সাহেব (প্রমুদ কেশওয়ানী)-এর সাক্ষাৎকার

আমার পয়গাম শুধু এতটুকুই যে, ইসলাম যেহেতু একটি সত্যধর্ম তাই এই সত্য সবার জন্য। একে সবার কাছে পৌঁছানো উচিত। মানুষ তো সত্যের সামনে দূর্বল হয়ে যায়। তার দূর্বলতা হলো, সে সত্যকে গ্রহণ করবে।


আহমদ আওয়াহ. আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লহি ওয়া বারাকাতুহু।

ড. মুহাম্মদ কাসেম. ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ. ডক্টর সাহেব! আব্বুর কাছে প্রায়ই আপনার কথা শুনেছি। তিনি দাওয়াতী আভিযানের আলোচনা করতে গিয়ে আপনার কথা আলোচনা করেছেন। তাই আপনার সাথে সাক্ষাতের খুব ইচ্ছা ছিলো। আজ মন ভরে কথা বলা যাবে।

ড. মুহাম্মদ কাসেম. হ্যাঁ! আমারও মাওলানা সাহেবের পরিবারের লোকদের সাথে সাক্ষাতের খুব ইচ্ছা ছিলো।

আহমদ আওয়াহ. আপনার সম্ভবত জানাই আছে যে, আমাদের ফুলাত থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি মাসিক উর্দূ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রায় দু‘বছর থেকে দাওয়াতী কর্মীদের উপকারার্থে ইসুুুুুুুুলাম গ্রহণকারী নওমুসলিম ভাই-বোনদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হচ্ছে। আপনার একটি সাক্ষাতকার নেওয়ার খুব ইচ্ছা ছিলো। তাই আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমার কথা দাওয়াতী কর্মীদের কী উপকার আসতে পারে। এখন তো আমার ইসলামের প্রাথমিক জীবন চলছে।

আহমদ আওয়াহ. আপনার জীবনী সত্যিই আমাদের জন্য ঈর্ষাযোগ্য। প্রথমে আপনার পরিচয় দিন।

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমার পূর্ব নাম ছিল প্রমুদ কেশওয়ানী। আমি গুহাটির কাস্ত পরিবারে ১৭ জানুয়ারি ১৯৭৪ইং শ্রী হিনসরাজ কেশওয়ানীর ঘরে জন্মগ্রহণ করি। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করি। এর পর গুহাটি থেকে কম্পিউটার সাইন্সে বি,এইচ,সি,করি। অতঃপর দিল্লী থেকে এম, এইচ,সি,তে গোল্ড মেডেল পাই এবং নিউইয়র্কে কম্পিউটার সফটওয়্যারে পি,এইচ,ডি, করি। আমার বড় ভাই অনুদ কিশওয়ানী খুব ভালো সার্জন। তিনি নিউইয়র্কেই থাকেন।
আমার পিতা সায়েন্সের লেকচারার ছিলেন। আমার নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইদানিং আমি আমেরিকার একটি সফ্টওয়্যার কোম্পানির গাড়গাওয়া শাখার পরিচালক। আল্লাহ তা’আলা আমাকে নিজ হেদায়াতের কারিশমা দেখিয়েছেন। এই যমীন থেকে উপরে পৃথক এক জগতে ৬ ফেব্রুয়ারি২০০৩ ইং আমাকে হেদায়াতের নেয়ামত দান করেছেন। আমি এমন স্থানে ইসলাম গ্রহণ করেছি, সম্ভবত পুরো দুনিয়ায় আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ সেখানে হেদায়াত পায়নি।

আহমদ আওয়াহ. কিছু কিছু তো আমরা শুনেছি। কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই। আপনি কি শোনাবেন?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমরা ছোটবেলা থেকেই ধার্মিক হিন্দু পরিবারে লালিত হয়েছি। আমাদের দাদা মূলতঃ লাখনৌ এর অধিবাসী ছিলেন। তিনি চাকরির জন্য গুহাটি চলে যান এবং ওখানের বাসিন্দা হয়ে যান। দীর্ঘদিন গুহাটিতে থাকা সত্ত্বেও আমাদের পরিবারে উর্দূ বিশেষত: লাক্ষনৌ কালচারের বেশ প্রভাব ছিলো। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়ার দরুন ধর্মের সাথে সম্পর্ক কিছুটা দূর্বল ছিলো। আর দিল্লীতে থাকাকালীন এমন পরিবেশে ছিলাম যেখানে ধর্মের কথা বলা গ্রাম্য, গোঁড়া ও মৌলবাদী মনে করা হতো। আরও সোনায় সোহাগা যে, আমি নিউইয়র্কে এম. ডি. করতে চলে যাই। সেখানে তো ধর্ম-কর্ম বিশেষ করে হিন্দুধর্মের উপর থেকে আস্থা উঠেই যায়। আমার নিউইয়র্কে অবস্থানকালীনই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা থেকে টি,ভি, পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়াসমূহ মুসলমানরা সন্ত্রাসী বিশেষ করে (twin tower) ইসলামি সন্ত্রাস বলে খুবই অপপ্রচার করে।

মুসলমানদের ব্যাপারে আমার শুধু এতটুকুই ধারণা ছিলো, ‘মুসলমান পুরোনো যুগের অবাস্তব কিচ্ছা-কাহিনীর বিশ্বাসী এক জাতি’। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের পর মুসলমান বলতে যে কিছু আছে! ইসলাম কী? মুসলমান কারা? ইসলামের অনূসারীদের ধর্মের সাথে এতো সম্পর্ক থাকে কেন? এবং কীভাবে এতো বড় ত্যাগ স্বীকার করে, বিশেষ করে ইসলাম এবং মুসলমানদের দ্বারা বিশ্বের কি ক্ষতি হতে পারে, এবং তারা কীভাবে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি? পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ করে আমেরিকার লোকজনের মাঝে এ ধরণের নানা প্রশ্ন জাগছিল। একসময় তো মিডিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখে এমন কোন আমেরিকান কমপক্ষে দাড়িওয়ালা কোন মুসলমানকে দেখলেও ভয় পেতো ।
আমার ইসলাম গ্রহণের ৬ দিন পূর্বে আমি নিউইয়র্কে ছিলাম। আমার ভাতিজাকে নিয়ে এক পার্কে ঘুরতে যাই। সেখানে একজন দাড়িওয়ালা মুসলমানকে দেখা গেলো। আমার ভাতিজা তাকে দেখে ভয়ে আমার কাছে ছুটে এলো। বলতে লাগল আংকেল! ওই দেখ উসামা। বালকটির এই বাক্যটি থেকেই আমার মানসিকতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের অবস্থা অনুধাবন করা যেতে পারে। আমি কোম্পানির কাজে হেড অফিসে যাই।ভারতীয় বিমানে আমার টিকেট কাটা ছিল। দুবাই থেকে অফিসের জন্য কিছু কেনা-কাটা করে কোম্পানির একটি শাখায় জমা দেওয়ার কাজ ছিল। পাঁচ দিন দুবাই এ অবস্থানের পর ৬ জানুয়ারি ২০০৩ সালে ভারতীয় বিমানে উঠলাম। প্রায় শেষ পর্যন্ত আমার পাশের সিটটি খালিই ছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে বিমান আকাশে উঠার বিশ মিনিট পূর্বে আপনার পিতা (মাওলানা কালীম সিদ্দিকী দা.বা.) আমার পাশের সিটে এসে বসলেন।

আমি তাঁর সাথে মুসাফাহা করলাম এবং তার পরিচয় জানতে চাইলাম। তিনি নিজের নাম বললেন কালীম সিদ্দিকী। ঠিকানা জানতে চাইলে উত্তর দিলেন দিল্লীর পাশেই থাকি। আমি তাঁকে স্বাগত জানালাম। উস্কানী ও মজা নেওয়ার জন্য তাঁকে বললাম ভেরি গুড, খুবভাল। আমার নাম বললাম, উসামা। সম্ভবত আমার নাম শুনে তাঁর হাসি আসেনি। তিনি আশ্চর্যের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম উসামা? আমি বললাম, আসলে চার-পাঁচ দিন পূর্বে আমি নিউইয়র্কে ছিলাম। আমার ভাতিজাকে নিয়ে এক পার্কে ঘুরতে যাই। সেখানে একজন দাড়িওয়ালা ব্যক্তি এলেন, ভাতিজা তাকে দেখে ভয়ে দৌঁড়ে এসে বললো, আংকেল! দেখ উসামা আসছে। মাওলানা সাহেব পরে আমাকে বলেছিলেন যে, আপনার কথা শুনে কিছুটা ব্যথিত হয়েছিলাম। কিন্তু চিন্তা করলাম যে, তিন ঘন্টা তো এক সাথেই থাকবো, আল্লাহ যদি সম্মান রাখেন তাহলে তাকে উসামা বানিয়েই বিমান থেকে নামবো। (ইনশাআল্লাহ)।

বিমান আকাশে উঠার পূর্বেই আমার পরিচয় দিলাম এবং মাওলানা সাহেবের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, উজমান-এ (ইউ.আই.এ) তে একটি আরবি ও ইসলামী সেন্টার পরিচালনা করেন। আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো তাহলে ইসলাম সম্পর্কে ভালো জানেন। বহুদিন যাবত ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য কোন বিজ্ঞ আলেম এর সন্ধান করছি। ভালই হলো আপনার থেকে কিছু জানা যাবে। মাওলানা সাহেব বললেন, ধর্ম তো অনেক বড় জিনিস। এ সম্পর্কে সব কিছু জানাও বড় কঠিন। তবে যতটুকু জানা আছে তা থেকে আপনার সাথে কথা বলে খুব খুশি হবো। বিমান আকাশে উঠতে শুরু করলো, আমিও কথা চালিয়ে গেলাম। মাওলানা সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, বলুন তো ধর্মওয়ালারা বলেন যে, এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী এক ভগবান (ঈশ্বর)। তিনিই পৃথিবীর স্রষ্টা এবং তিনিই সকল কাজ পরিচালনা করছেন। এখন তো সায়েন্স এর যুগ। প্রত্যেকটি চিন্তা-ধারণাকে যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। আপনার কাছে কি এর কোন প্রমাণ আছে যে, তিনি মালিক এবং পৃথিবীর স্রষ্টা?

মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি কম্পিউটার সায়েন্স-এ ডক্টর হওয়া সত্ত্বেও পুরনো যুগের এক বৃদ্ধার মতো কথাও আপনি বুঝছেন না। সেই বৃদ্ধাকে কোন ব্যক্তি আপনার মতো একটি প্রশ্ন করলো যে, মা বলুনতো এই পৃথিবীর স্রষ্টা ক’জন? তিনি উত্তর দিলেন, এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও মালিক মাত্র একজন। প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এ কথা কিসের ভিত্তিতে বলছেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমার তাঁত (চরকা) আমাকে এ কথা বলেছে। জিজ্ঞাসাকারী জানতে চাইল, এ আবার কীভাবে? তিনি বললেন, আমি যখন তাঁত পরিচালনা করি তখন সুন্দরভাবে চলতে থাকে। যদি চালানো বন্ধ করে দেই তাহলে বন্ধ হয়ে যায়। যখন তাঁত চালাই তখন খুব ভালোভাবে চলে। আর যদি একটি ছোট বাচ্চাও যদি সুতায় হাত লাগায় তাহলে সুতো পৃথক হয়ে যায় এবং পুরো ব্যবস্থা ওলট-পালট হয়ে যায়। এতে আমার বুঝে আসলো, যদি একটি ছোট তাঁত কারো চালানো ছাড়া চলতে পারে না, তাহলে এই সারা বিশ্ব, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা রাত-দিন শীত-গরম ইত্যাদি এর পেছনে অবশ্যই কোন পরিচালক আছেন। আর তিনিই তা পরিচালনা করছেন। তিনি মাত্র একজনই। এ জন্য যে, আমার তাঁতে ছোট একটি বাচ্চা তাঁর একটু আঙুল লাগানোর ফলে আমার পুরো তাঁতের অবস্থা ওলট-পালট হয়ে যায়। আর যদি একজন প্রতিপালক না হয়ে কয়েকজন থাকতো; তাহলে এই বিশ্বের কী অবস্থা হতো?

মাওলানা সাহেব বললেন, কুরআনে হাকীমের বাস্তবতা এভাবে বর্ণনা করেছেন যে,

‘‘আল্লাহ ব্যতিত যদি আরো কোন প্রভূ থাকতো তাহলে এই ধরায় ঝগড়া ও ফাসাদ সৃষ্টি হতো”।

অর্থাৎ যদি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকতো তাহলে উভয়েই ঝগড়া করতো। ভগবান যদি কয়েকজন হতো, আর দেব-দেবীদের কোনো ক্ষমতা থাকতো, তাহলে প্রত্যেহ আসমান ও যমিনে ফাসাদ সৃষ্টি হতো। একজন বলতো, আজকের দিনটি বড় হবে; অন্যজন বলতো, না আজকের দিনটি ছোট হবে। একজন বলতো, এখন শীত হবে; অপরজন বলতো, না এখন গরম হবে। একজন বলতো, এখন বৃষ্টি হবে; দ্বিতীয়জন বলতো, না রোদ উঠবে। কোনো একজন তাঁর উপাস্যদের সাথে কোন কিছুর ওয়াদা করে ফেলতো; অন্যজন তার প্রতিবাদ করতো। কিন্তু আমরা দেখছি যে, এই দুনিয়া এতো সুন্দর ও সঠিক পদ্ধতিতে চলছে যে, এই পুরো ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিই বলছে যে, এর স্রষ্টা ও পরিচালক একজনমাত্র। তিনি একমাত্র আল্লাহ।
মাওলানা সাহেব বললেন, এই এক মালিক পুরো দুনিয়ার সর্দার। তিনি মানুষের ফিতরাতে বা নেচারে এই বৈশিষ্ট্য রেখেছেন যে, কোন তৈরি করা জিনিস দেখে তার প্রস্তুতকারককে চিনতে পারে এবং তার বীরত্বকে বুঝতে পারে। একটু খেয়াল করুন! আপনি যখন কোন ভালো খাবার খান, তখন ওই খাবারের স্বাদ থেকে আপনার মন প্রথমে ঐ দিকে যায়, যে এই খাবার কে রান্না করেছে? কোন ভালো সেলাইকৃত কাপড় দেখেই আপনার মনে প্রশ্ন জাগে যে, এই কাপড় কোন টেইলার্স সেলাই করেছে। কোনো ভাল বিল্ডিং দেখে প্রথমে এই প্রশ্ন জাগে, এই বিল্ডিং কে বানিয়েছেন। মোটকথা, কোন কারিগরি জিনিস দেখলে মানুষ তার কারিগর ও সৃষ্টিকে দেখে তার স্রষ্টাকে খোঁজার বা চিনার আগ্রহ জন্মগত ভাবেই থাকে। এই বিশাল পৃথিবীর এতো সুন্দর সুন্দর জিনিস। এই তারকা সজ্জিত আলোকময় আকাশ। চন্দ্র-সূর্য, দিন-রাত, আসমান-যমিন, ফুল-ফল, পাহাড় ও সমুদ্র, এবং জীব-জন্তু ও কীট-পতঙ্গ সব কিছুই সাক্ষী দিচ্ছে এবং আপনার আমার অন্তরও এ কথা সাক্ষী দিচ্ছে যে, এ সব বস্তুর স্রষ্টা কোন প্রজ্ঞাময় মালিক অবশ্যই আছেন ,আর তিনি হলেন আল্লাহ।

মাওলানা সাহেবের এই সাদামাটা উদাহরণের মাধ্যমে বড় একটি বিষয় এতো সহজে বুঝিয়ে দেওয়ায় আমি ভিতর থেকে খুবই প্রভাবিত হলাম। যে, লোকটি তো ধার্মিক! খুবই যুক্তি-প্রমাণের সাথে আলোচনা করেন। আমি তাঁকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম, বলুন এ কথাতো আমার অন্তরও সাক্ষী দেয় যে, এই ধরার স্রষ্টা ও পরিচালক ইশ্বর বা প্রভু অবশ্যই একজন আছেন। কিন্তু একথা কোনোভাবেই সঠিক মনে হয় না যে, গীতা, কুরআন, বাইবেল মানবো আর এগুলো চিন্তা-বুদ্ধির খোরাক দিবে। নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারাই চিন্তা-ভাবনা করে মানলেই তো হয়; এতে অসুবিধা কী? মাওলানা সাহেব বললেন, বাহ! বাহ! ডক্টর সাহেব! আপনিও দেখি খুব আশ্চর্য মানুষ! আপনি বাজপেয়িকে (তৎকালিন ভারতের সরকার) মানবেন যে, ভারতের কোন পরিচালক আছে, কিন্তু ভারতের সংবিধান মানবে না, এ আবার কেমন কথা! এই পৃথিবীর একজন মালিক যেহেতু আছেন, তাহলে অবশ্যই তার সংবিধানও আছে। এক মালিক নিজের পক্ষ থেকে মানুষের জীবন যাপনের জন্য যেই আইন-কানুন ঠিক করেছেন তাকে ধর্ম বলে। তদ্রুপ ধর্মকে মানা ব্যতীত মালিক অর্থাৎ আল্লাহকে মানাও অকল্পনীয়।

মাওলানা সাহেব বললেন, ডক্টর সাহেব! এই বিষয়টি আপনার বুঝা খুবই জরুরি যে, ঐ মালিক যিনি আপনাকে এবং সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই দুনিয়ার একক মালিক ও বাদশা। ঐ মালিক যেহেতু এক; তার পক্ষ থেকে পাঠানো সত্যধর্ম ও সংবিধান একটিই। মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা বুদ্ধি দিয়েছেন। এটা মানুষের দায়িত্ব যে, সে ঐ সত্য ধর্মকে জানবে এবং মানবে। ঐ আল্লাহ তা’আলা তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থে এটা স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন, সেই সত্যধর্ম একমাত্র ইসলাম। মানুষের সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত ইসলামই একমাত্র সত্যধর্ম। যে ব্যক্তি এক মালিককে এবং তাঁর বানানো একমাত্র সত্যধর্ম ইসলামকে না মানবে, সে এই দুনিয়ায় গাদ্দার হিসাবে বাস করবে এবং তার এই পৃথিবীর কোন জিনিস থেকে উপকৃত হওয়ার অধিকার নেই। সে আল্লাহর যমিনে থাকার নাগরিকত্ব পাবে না। রাষ্ট্রদ্রোহী ও গাদ্দারের শাস্তি হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। তেমনি সেই মালিকের কাছেও ঈমানহীন ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী নরকের জেল। দুনিয়াতেও তিনি যে কোন সময় শাস্তি দিতে পারেন। অন্যথায় মৃত্যুর চেকপোস্টে যখন মানুষ ইহকাল ত্যাগ করে পরকালের জীবনে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা‘আলার ইমিগ্রেশন স্টাফ সর্বপ্রথম ঈমানেরই চেক করবে। একথা বলে মাওলানা সাহেব আমার হাত ধরে বসলেন এবং বললেন, ডক্টর সাহেব! আপনি আমার সাথে সফর করছেন। এ কথার উপরও আমার বিশ্বাস যে, আমরা সকলেই এক মা-বাপের সন্তান এবং রক্তের সম্পকের্র ভাই। এখন তো আপনি আমার সফর সঙ্গী। আর সফর সঙ্গির অনেক দায়িত্ব থাকে। তাই আপনার সাথে ভালোবাসার সাথে অন্তর থেকে বলছি যে, মৃত্যুর কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কখন চলে আসে তা জানা নেই। এর চাইতে উত্তম সময় আর হতেই পারে না। আপনি কলেমা পড়ে মুসলামান হয়ে যান।

আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আপনার কথা তো খুবই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে। আমি অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করবো। আর ধর্ম পরিবর্তন করা এতো সাধারণ ব্যাপার নয় যে, এতো দ্রুত ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলবো। মাওলানা সাহেব বললেন, এই সিদ্ধান্ত খুব দ্রুতই নেওয়ার দরকার। ডক্টর সাহেব! আপনি আমাকে কষ্ট দিবেন না। এখনোই কলেমা পড়ে নিন।

আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আমাকে কিছু সময় দিন। মাওলানা সাহেব বললেন, সময় শেষ হয়ে গেছে, এখনই কলেমা পড়ে নিন। এই জন্য যে, চারদিন পূর্বে আমেরিকা থেকে লিবিয়া যাওয়ার সময় একটি বিমান এক্সিডেন্ট হয়ে পড়ে যায়। আল্লাহ না করুন আমাদের বিমানও যদি নামার সময় কোন এক্সিডেন্ট হয়, তাহলে আর সময় থাকবে কোথায়? দীর্ঘ সময় মাওলানা সাহেব আমাকে বুঝাতে থাকেন এবং বারবার অস্থির হয়ে বলতে থাকেন, দেরি করবেন না! জলদি মুসলমান হয়ে যান। জানি না আপনার মৃত্যু চলে আসে না আমিই মারা যাই। ইসলামই একমাত্র সঠিক ধর্ম। এর প্রমাণ হিসাবে মাওলানা সাহেব আমাদের দেশ ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনার উদাহরণ দিলেন যে, এখন থেকে পূর্বের সকল প্রধানমন্ত্রী সঠিক ছিলেন কিন্তু এখন বাজপেয়ীর বিধান মানতে হবে। কারণ তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ইত্যাদি কথাগুলোতে আমার অন্তরকে তৃপ্ত করে দিলেন।

মৃত্যুর পর স্বর্গ-নরক সম্পর্কে প্রশ্ন উঠালাম যে, মৃত্যুর পর মানুষ পচে -গলে যাবে, কে গিয়ে দেখেছে? তিনি প্রথমে সত্য নবী (সা. )-এর হাদিস ও সত্য কুরআনের কথা বললেন। অতঃপর উদাহরণ স্বরূপ একটি মাছের ঘটনা শোনালেন। যার দ্বারা আমার বিষয়টি বুঝতে দেরি হলো না। হঠাৎ করে আমার দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন মনে পড়লো। আমি মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা বলুন তো মুসলমানদের নিজ ধর্মের প্রতি এতো বিশ্বাস কেন? আমাদের হিন্দুদের মধ্যে এমন হয় না কেন? মাওলানা সাহেব উত্তরে বললেন, মানুষের ইয়াকীন ও বিশ্বাস সত্যের উপর হয় মিথ্যার উপর নয়। কারণ, মিথ্যার উপর মানুষের সন্দেহ থেকে যায়। কুরআন হল ইসলামী মূলনীতি। তার বাহক সর্বশেষ নবী (সা.) এবং তার জীবনী ইতিহাসের মাধ্যমে বিশুদ্ধ সনদে আমাদের কাছে উপস্থিত আছে। তাই আমরা ইসলামের প্রতিটি কথার উপর অন্তর থেকে বিশ্বাস করি। ইসলাম এবং কুরআন এমন সত্য নবী (সা.)-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে, যাকে দুশমনেরাও ‘‘সত্য আমানতদার” বলতো। এমনকি মানুষ তার নামই রেখে দিয়েছিল সত্য ও আমানতদার।

মাওলানা সাহেবের বারবার ইসলাম গ্রহণ করার এবং মুসলমান হওয়ার কথা আমার অন্তরে অনেক দাগ কাটল। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তন করা এতো সহজ কাজ ছিল না। তিনি যখন বারবার বলছিলেন আমি পেশাবের বাহানায় বিমানের টয়লেটে চলে গেলাম। টয়লেট থেকে ফিরে আমার আসনে না বসে একদিকে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করতে লাগলাম যে, এই লোকটি আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন নয়। আমার থেকে তার কোন চাওয়া পাওয়া নেই। তিনি এমন শিক্ষিত ব্যক্তি যুক্তির সাথে কথা বলেন। আমি একজন ডক্টর শিক্ষিত মানুষ। বিষয়টি যেহেতু আমার কাছে শতভাগ পরিষ্কার, তাই আমাকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সমাজ কি বললো আর না বললো, এ ধরনের চিন্তা করা মূর্খতা। এটা আধুনিক যুগ। কমপক্ষে আমার মতো সাইন্সে পি,এইচ,ডি, করা প্রত্যেক ব্যক্তিই শতভাগ স্বাধীন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এই সৎব্যক্তির প্রেমপূর্ণ দাওয়াতকে ফিরিয়ে দেওয়া আমার জন্য উচিত হবে না।

মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন যে, তিনি দ্বুাই সফরে খুবই ব্যথিত ছিলেন। তিনি বললেন, আপনি যখন আসন থেকে উঠে চলে গেলেন তখন আমার মালিকের কাছে আবেগ আপ্লুত হয়ে দু’আ করলাম। হে আল্লাহ! আপনিই তো অন্তরকে পরিবর্তনকারী! আপনিই তাঁর অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দিন। আপনার ভাঙা দিলওয়ালা বান্দা খুবই ব্যথিত। আমার আল্লাহ! আপনি একটু আমার মনটাকে খুশি করে দিন।

আহমদ আওয়াহ. এরপর কী হলো?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. এরপর আর কি হবে, সিদ্ধান্ত তো উপর থেকেই হয়েছিল। খুবই বিশ্বাস ও প্রতিজ্ঞার সাথে আসনে গিয়ে বসলাম। এখনও আমার সেই প্রতিজ্ঞার স্বাদ অনুভব হয়। যেমন কোন সৈনিক কোন এক জগত বিজয় করে বসলো। আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আমাকে মুসলমান করে নিন। মাওলানা সাহেব আমার হাতে চুমু খেলেন এবং আনন্দের সাথে আমাকে কলেমা পড়ালেন এবং আমার ইসলামি নাম রাখলেন মুহাম্মদ কাসেম। আমাকে বললেন, এই ইসলাম আপনার মালিকানাধীন নয় বরং আমানত। আর আপনি হলেন কাসেম (বণ্টনকারী)। আমাদের নবী (সা.)-এর একটি উপাধি ছিল ‘কাসেম’। এখন এই আমানতটি সকলের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিমান থেকে ঘোষণা হলো, আমরা দিল্লীতে পৌঁছতে যাচ্ছি। বিমান অবতরণ করলো। আমরা দুজনও একই দেশে একই ধর্মের সাথে যমিনে নামলাম। আমার লাগেজ থেকে মিষ্টির ঐ প্যাকেটটিই বের করলাম যা পূর্বের ধর্মের গুরুর জন্য নিয়ে এসেছিলাম। সেই মিষ্টি ও চকলেট বের করে আনন্দের সাথে মাওলানা সাহেবের সামনে পেশ করলাম এবং আনন্দের সাথে ঘরে ফিরলাম।

এবার একটি চুটকি শুনাই। মাওলানা সাহেবের ফুলাত পৌঁছে মনে হলো আমার নাম প্রমুদের স্থানে উসামা রাখা উচিত ছিলো। তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ভুলে আপনার নাম মুহাম্মদ কাসেম রেখেছি। আপনি তো আপনার নাম উসামা রেখেছিলেন। আপনি আপনার নাম উসামা রেখে নিবেন। আমি বললাম, জি-না মাওলানা সাহেব! উসামা নাম রাখলে মানুষ আমাকে বাঁচতে দিবে না। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এক নাম কাসেম। তা উসামা থেকে অনেক উত্তম। মাওলানা সাহেব হাসতে হাসতে ফোন রেখে দিলেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনি কাসেম নামের কী দায়িত্ব পালন করেছেন?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমি তো কোন হক আদায় করতে পারিনি। কিন্তু আমার একমাত্র ভাই যিনি আমেরিকায় থাকেন তিনি একজন বড় ডাক্তার। তার জন্য হেদায়াতের দু’আ করছিলাম। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর চিঠি এলো যে, তিনি তার নার্সিং হোমের এক নার্স এর আচরণে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়ে গিয়েছেন। এবং ঐ নার্সকে বিবাহও করেছেন। এটা তার দ্বিতীয় বিবাহ।

আহমদ আওয়াহ. আপনার ভাবির পক্ষ থেকে কি কোন বাধা আসেনি?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. ফোনে কথা হতো। শুরুতে তিনি খুবই ক্ষিপ্ত ছিলেন। হিন্দুস্থানে ফিরে আসতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য লাগলো যে, ঐ মুসলমান নার্সের সেবা ও আচার-আচরণে প্রভাবিত হয়ে তিনিও মুসলমান হয়ে গিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনার কথাগুলো খুবই মজার। আপনাকে আল্লাহ তা‘আলা আসমান ও যমিনের মধ্যস্থানে হেদায়াত দান করেছেন। আপনি শুরুতে বলেছিলেন যে, আপনারা দু‘জন ওই সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি কে?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. মাওলানা সাহেব বলেছিলেন যে, উনার পীর মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) কাউকে বিমানে কলেমা পড়িয়েছিলেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়া শোনার ব্যাপারে কী করলেন?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমি গুড়গাও-এ একজন মাওলানা সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেছি। প্রতিদিন রাত্রে এক অথবা আধা ঘন্টার জন্য যাই। আল্লাহর শোকর যে, আমি কুরআন শরিফ পড়া শিখে ফেলেছি। জানাযার নামাযসহ পুরো নামায শিখে ফেলেছি এবং প্রতিদিন কোন না কোন কিতাব পড়ি।

আহমদ আওয়াহ. আপনার কি বিবাহ হয়েছে?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আলহামদুলিল্লাহ মুম্বাইয়ের এক শিক্ষিত দীনদার মুসলিম পরিবারে আমার বিবাহ হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ. ডক্টর সাহেব! আপনার অনেক অনেক শুকরিয়া আপনি কি ‘আরমুগানের’ পাঠকদের জন্য কোন পয়গাম দিবেন?

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আমার পয়গাম শুধু এতটুকুই যে, ইসলাম যেহেতু একটি সত্যধর্ম তাই এই সত্য সবার জন্য। একে সবার কাছে পৌঁছানো উচিত। মানুষ তো সত্যের সামনে দূর্বল হয়ে যায়। তার দূর্বলতা হলো, সে সত্যকে গ্রহণ করবে।

আহমদ আওয়াহ. আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

ড. মুহাম্মদ কাসেম. আসলে ধন্যবাদ তো আপনাকে দেওয়া উচিৎ। কারণ, আপনি অনেক সম্মান দিয়েছেন, ওয়া আলাইকুমুুস্সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মার্চ’ ২০০৫ ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ