জনাব বেলাল আহমদ (হীরালাল)- এর সাক্ষাৎকার

সকলের কাছে দুআ চাই, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে ইলম দান করেন। আমাকে যেন কুরআনের আদলে মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠার তাওফিক দান করেন। আমার পরিবারকে যেন হেদায়েত দান করেন। আর একটি কথা হলো, পৃথিবীর সকল মানুষ আমাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়। তাদের সকলের ঈমানের কথা ভাবতে হবে। আল্লাহ তায়ালা যদি তাদের হেদায়েত দান করেন তাহলেই আমাদের ভ্রাতৃত্বের হক আদায় হবে।


বেলাল আহমদ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
আহমদ আওয়াহ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: বেলাল ভাই! আরমুগানের পক্ষ থেকে আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।
বেলাল আহমদ: আহমদ ভাই! অবশ্যই বলুন। এটা আমার জন্য অনেক বড় খুশির কথা।

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানতে চাচ্ছি।
বেলাল আহমদ: আমার জন্ম আজমগড় জেলার বোমেগাঁও গ্রামে। আমার পুরনো নাম হীরালাল। আমার বাবা বাবু নন্দন বিহার দেওয়াজা একজন ধার্মিক হিন্দু। আমরা সাত ভাই। আমার পরিবার এবং গ্রামের অনেক মানুষ দিল্লিতে বিল্ডিং পেইন্টিং- এর কাজ করে। অবশ্য বাবা দিল্লিতেই পান- বিড়ি- সিগারেটের দোকান করেন।

আহমদ আওয়াহ: কিভাবে মুসলমান হলেন জানতে পারি?
বেলাল আহমদ: আগের কথা। আমার বয়স তখন বারো বছর। আমি আমার বাবার সাথে দিল্লি তাইমুর নগরে তার দোকানে বসতাম। আমাদের দোকানের উপর তলায় আব্বাজী আবু ফাইয়াজ কড়াই প্রভৃতির একটি কারখানা চালাতেন। আমার বাবা সেই কারখানাতে রাতের বেলা থাকার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেন। আমরা রাতে কারখানার কারিগরদের সঙ্গে ঘুমাতাম। প্রতি রাতেই আব্বাজী কারখানার সব কারিগরকে এক সাথে করে ফাজায়েলে আমল পাঠ করে শোনাতেন। আমিও তাতে অংশ গ্রহণ করতাম। কথাগুলো আমার খুব ভাল লাগতো। রাতের বেলা আগেভাগে গিয়ে তালিমের অপেক্ষা করতাম। কোনো দিন যদি আব্বাজী তালিম করতে না চাইতেন, আমি তাকে গিয়ে সামান্য সময়ের জন্য হলেও তালিম করতে অনুরোধ করতাম। কারখানার কারিগরগণ যখন নামায পড়তে যেতেন, আমিও তাদের সাথে যেতাম। মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে নামাযের দৃশ্য দেখতাম। নামায পড়ার এই দৃশ্য আমার কাছে খুব ভাল লাগতো।

এক রাতের ঘটনা। আমি আব্বাজী আবু ফাইয়াজকে বললাম- আব্বাজী আমি কি মুসলমান হতে পারি? তিনি আমাকে মমতার সাথে বললেন- অবশ্যই হতে পারবে বেটা! তুমি যদি মুসলমান না হও তাহলে তোমাকে নরকে যেতে হবে। অনন্তকাল আগুনে জ্বলতে হবে। আমি বললাম, তাহলে আমাকে মুসলমান করুন। তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন। আমার গায়ের রং কাল বলে আমার নাম রাখলেন, বেলাল আহমদ। বললেন- বেলাল হলেন আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর মুয়াজ্জিন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামের জন্য অনেক কষ্ট সয়েছিলেন। তারপর আমি বাটলা হাউজ মসজিদে নামায পড়তে যেতে শুরু করি। আব্বাজী আমাকে নামায পড়তে যেতে নিষেধ করলেন। বললেন- তোমাকে নামায পড়তে দেখলে তোমার পরিবারের লোকেরা মারপিট করবে। আমি বললাম- একবার আপনি নামায পড়তে যাচ্ছিলেন। আমি তখন আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম- আব্বাজী! আপনি এক ওয়াক্ত নামাযও ছাড়েন না, ব্যাপারটা কী? তখন আপনি বলেছিলেন- যদি কোনো ব্যক্তি এক ওয়াক্ত নামায ছেড়ে দেয়, তাহলে সে আর মুসলমান থাকে না। তাহলে আমি কি দুই নম্বর মুসলমান হবো? যদি দুই নম্বর মুসলমানই হই, তাহলে আর মুসলমান হয়ে লাভ কী! আপনি আমাকে এক নম্বর মুসলমান করুন। আব্বাজী তখন জবাব দিলেন- কথা তুমি ঠিকই বলেছো। নামায ছাড়া কোনো মুসলমানি নেই। কিন্তু তুমি এখন ছোট। তোমার পরিবারের লোকদের ভয় আছে। এজন্যই তোমাকে নিষেধ করেছিলাম। আমি বললাম- আব্বাজী! মা- বাবাকে বেশি ভয় করবো, না আল্লাহকে? আমার কথা শুনে তিনি বললেনÑ বেটা! ঠিক আছে তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তে যেও।

তারপর রমযান মাস এলো। সময় হলেই মসজিদে নামায পড়তে চলে যেতাম। কখনও হয়তো আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে মসজিদে যেতে দেখেও ফেলেছে। আমি রোজাও রাখতে শুরু করি। দিনের বেলা যখন পরিবারের লোকেরা আমাকে খেতে বলতো, আমি কৌশলে এড়িয়ে যেতাম। এতে করে তাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এক শুক্রবারের ঘটনা। আমি যাকেরবাগ মসজিদ থেকে জুমার নামায পড়ে ঘরে ফিরছি। আমার মাথায় তখনও টুপি। আমার বাবা আমাকে দেখে ফেললেন। দেখামাত্রই ধরে ফেললেন। বললেন- মসজিদে গিয়েছিলে কেন, বলো! আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বলে ফেললাম, আমি মুসলমান হয়ে গেছি। নামায পড়তে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে খুব বকাঝকা করলেন। ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আগে থেকেই আমার ভাই এবং খান্দানের লোকেরা ছিল। তারা দুপুরের খাবার খেতে এসেছে। সকলেই আমাকে আলাদা- আলাদা ডেকে ঝুঝাতে লাগলো। কিন্তু আমার এককথা, আমি মুসলমান হয়ে গেছি। আমার পক্ষে পুনরায় হিন্দু হওয়া সম্ভব নয়। আমার বড় ভাই আমাকে মারতে শুরু করলো। অনবরত কিল ঘুষি চালাতে লাগলো। কিন্তু আমার সাফ কথা, মারো আর যাই কর, একথা মাথা থেকে ফেলে দাও- আমি আবার হিন্দু হয়ে যাব। তোমরা যদি জীবনে সফল হতে চাও যে, মৃত্যুর পর যদি নরকের আগুন থেকে বাঁচতে চাও, তাহলে তোমরাও মুসলমান হয়ে যাও এবং কালিমা পড়ে নাও।

আমাকে আমার ভাই মারছে আর আমি তাকে কালিমার দাওয়াত দিচ্ছি, এতে অন্যরাও ক্ষেপে যায়। তারা তখন আমাকে লাঠি ইত্যাদি যার কাছে যা ছিল তাই দিয়ে মারতে শুরু করে। লাঠির আঘাতে আমার মাথা কেটে রক্ত বের হয়ে আসে। আর আমার ভেতরে তখন ঈমান তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠে। আমি তাদের উদ্দেশ্য করে বলি- জীবনের শেষ কথা শুনে নাও! যা খুশি আমাকে করো, তারপর আমি আমার পায়ের আঙ্গুলের দিকে ইশারা করে বলি এখান থেকে আমাকে কাটতে শুরু কর। কাটতে কাটতে আমাকে টুকরো টুকরো করে দাও। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কণ্ঠ স্থির থাকবে আমার শরীরে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলতে থাকবো। এখন তোমাদের খুশি, যা ইচ্ছা করতে পার।
আমার প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা দেখে তারা আমাকে ছেড়ে দিল। রাতের বেলা সুযোগ বুঝে আমি পালিয়ে গেলাম। দুই দিন পর্যন্ত তারা আমাকে নানা জায়গায় খোঁজাখুজি করলো। তৃতীয় দিন আব্বাজী আবু ফাইয়াজকে গিয়ে চাপ দিল- আপনি আমাদের ছেলেকে যাদু করেছেন। ছেলে আপনার কাছে আছে। আগামীকালের মধ্যে যদি আমরা আমাদের ছেলেকে না পাই, তাহলে পুলিশের কাছে আপনার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করবো। আব্বাজী তাদেরকে নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। বললেন- এই কি উপকারের পুরস্কার! বিনা ভাড়ায় আমি তোমাদের ছেলেকে থাকতে দিয়েছি। আজ এভাবে তার প্রতিদান দিচ্ছ! কিন্তু তারা তার কথা শুনতে নারাজ।

আব্বাজী চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমি দিল্লিতেই ছিলাম। আমিও জানতে পেরেছি, আমার পরিবারের লোকেরা আব্বাজীকে পেরেশান করছে। পরে আমি নিজেই কারখানায় ছুটে আসি। আব্বাজীকে বলি আপনি আমার হাত ধরে আমাকে আমার পিতাজীর হাতে তুলে দিন। তাকে পরিষ্কার বলে দিন, এই নিন আপনার ছেলে! ভবিষ্যতে কিছু হলে আমাদের আর কোনো দায় থাকবে না। আব্বাজী আমাকে বলল, তারা তো আমাকে মেরে ফেলবে! আমি বললাম, আমাকে কিছুই করবে না, তিনি আমাকে আমার পিতার কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন, আল্লাহর অনুগ্রহ, আপনার ছেলে নিজেই চলে এসেছে। তার বিষয়ে আমার কিছুই জানা ছিল না। এখন তাকে বুঝে নিন। ভবিষ্যতে তার কিছু হলে এর কোনো দায় আমরা নেবো না।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
বেলাল আহমদ: তারপর আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আজমগড়ে আমাদের গ্রামে নিয়ে গেল। নানা রকমের তান্ত্রিক কবিরাজ দিয়ে আমাকে চিকিৎসা করালো। তাদের ধারণা ছিল, আমাকে যাদু করা হয়েছে। বাড়িতে যাওয়ার পর লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তে থাকি। কিছুদিন পর্যন্ত আমাকে তারা আটকে রাখে। আমাদের গ্রামের একজন মুসলমানের সাথে পরামর্শ করি। তিনি আমাকে বুঝালেন, তোমাকে যদি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হয়, তাহলে তোমার চাল- চলন বদলাতে হবে। আমি তখন পরিবারের কাছে নরম হয়ে পড়ি। আমার কোমল আচার-আচারণ দেখে এবং সহজ সরল চাল-চলন দেখে তারা ভাবতে শুরু করে, যাদু নামানো হয়েছে। জিনের আছর ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমার মা যাচ্ছিলেন তার বাবার বাড়ি। তিনি আমাকে সাথে নিয়ে গেলেন। ধারণা, পরিবেশ পরিবর্তন হলে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসবে। আমার নানা বাড়ির পাশেই একজন বুদ্ধিমান মুসলমান আছেন। আমার মা আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন- তাকে একটু বুঝিয়ে দিন। এ তো আমাদের জীবনকে অতিষ্ট করে তুলছে। তিনি আমার মাকে সান্তনা দিলেন। বললেনÑ একে ধরে রেখে লাভ নেই; বরং খুশি মনে ছেড়ে দিন। এ কোনভাবেই আপনার কাছে থাকবে না। এ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি আমার নানার বাড়ি থেকে সোজা আব্বাজীর কাছে চলে যাই। তিনি আমাকে মুজাফ্ফর নগর তার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে একটি মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। আমি কুরআন শরীফ নাজেরা পড়ি। কিছু উর্দু এবং কয়েক পারা হেফয করি। তারপর মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের পরামর্শে আমাকে নাদওয়াতুল উলামার এক বিভাগের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। আলহামদুলিল্লাহ! আমার পড়াশোনা ভালোই চলছে।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমান হওয়ার পর নতুন পরিবেশে আপনার কেমন লাগছে?
বেলাল আহমদ: আমার আব্বাজী আমাকে আমার পিতাজীর চাইতে হাজারগুণে বেশি ভালোবাসেন। মানুষ মনে করে আমি তাঁর আপন ছেলে। আম্মুজীও আমাকে অন্য ভাইদের চাইতে বেশি ভালোবাসেন। অন্য ভাইবোনদের তুলনায় আমার কথাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। একদিন আমাকে দেখে তার এক আত্মীয় আমার ভাইদের বলছিলÑ এখন তো আমার বাবার সম্পদেও এ অংশ পাবে। সাথে সাথেই আমার ভাইয়েরা বলে উঠলো, এ বরং আমাদের আগে আমাদের বাবার সম্পদের অংশ পাবে। আল্লাহ তায়ালা দয়া করে আমাদের এই ভাইটি দান করেছিলেন। আমরা কোথায় আর কোথায় মদীনার এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন! আমরা প্রয়োজনে আমাদের এই ভায়ের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি। আর সেটাকে আমরা সৌভাগ্য মনে করি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ভাই এবং মা বাবার সাথে কোনো যোগাযোগ আছে?
বেলাল আহমদ: একবার দিল্লিতে আমি বাসে করে যাচ্ছি। নেজামুদ্দীনের কাছাকাছি যাওয়ার পর লক্ষ করলাম, আমার ভাই সাইকেলে করে যাচ্ছে। আমি তাকে চিৎকার করে ডাকি। সে আমাকে দেখতে পায়। সাইকেল জোরে চালাতে থাকে। কিন্তু বাসের সাথে তো সাইকেলে কুলিয়ে উঠার কথা নয়। আমি পরের স্টপেজে নেমে পড়ি। আমার ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে হাজির। আমাকে দেখে লাফিয়ে পড়ে। আমাকে বলে পিতাজী মরণাপন্ন। তোর কথা খুব বলছেন। আমি বললাম- ঠিক আছে, আগামীকাল আসবো। আমি আব্বাজীর কাছে অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে দাওয়াতের নিয়তে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। আমি গেলাম। তিনি তখন একেবারে স্বাভাবিক। দীর্ঘক্ষণ আমাকে বুঝাতে থাকলেন। বললেন- তুমি আমার সবচে’ আদরের ছেলে। তুমি যদি আমাদে ধোঁকা দাও, তাহলে আমার কী হবে। তিনি এও বললেন, আমি এক পন্ডিতজির সাথে পরামর্শ করেছিলাম। তিনি আমাকে তোমাকে মেরে ফেলবার কথা বলেছিলেন। এ-ও বলেছিলেন, একে যদি না মারো তাহলে তোমার পুরো খান্দানকে ধর্মভ্রষ্ট করে ছাড়বে। পন্ডিতজীর পরামর্শের পর আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, এত আদরের ছেলে! এমন মমতার সাথে বড় করেছি, এখন মেরে ফেলবো! আমি বললাম, পিতাজী! যখন আমাকে ধরে এনেছিলেন তখনও আমি বলেছিলাম এবং এখনো বলছি, যদি আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় তাহলেও যতক্ষণ আমার মধ্যে প্রাণ থাকবে ততক্ষণ আমি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে যাবো।

আমি আপনার কাছে এজন্য এসেছি, আপনি আমার পিতা। অসম্ভব মমতা করে আমাকে বড় করেছেন। আমার মা আমাকে দুধপান করিয়েছেন। আপনারা যদি হিন্দু অবস্থায় মারা যান, তাহলে অনন্তকাল নরকে জ্বলতে হবে। আমার অনুরোধ, আপনারা সকলে মুসলমান হয়ে যান। আমার সাথে চলুন। তিনি আমার কথার কোনো জবাব দিলেন না। তাকে দেখে খুবই হতাশ মনে হলো।

আহমদ আওয়াহ: তারপর তার সাথে আর কোনো যোগযোগ করেছেন?
বেলাল আহমদ: আমার এক চাচা সউদী আরবে থাকেন, তিনি ইসলামের খুবই কাছে চলে এসেছেন। একবার জানতে পারলাম দেশে এসেছেন। এটাকে সুযোগ মনে করে আমি দিল্লিতে গেলাম। পিতাজীর সাথে দেখা করলাম। পিতাজী বললেন, তোমার চাচা বলেছেন, সত্যধর্ম এবং একমাত্র যৌক্তিক ধর্ম হলো ইসলাম। আমরা কেবল এই কারণে হিন্দু যে, আমাদের জন্ম হয়েছে হিন্দু সমাজে। তোমার চাচা বলেছিলেন, হয় তোমরা সকলে মুসলমান হয়ে যাও আর না হয় ছেলেকে তার আপন অবস্থায় থাকতে দাও। তাকে নতুন করে হিন্দু বানানোর চেষ্টা করা বড় অন্যায়। আমি বললাম, পিতাজী! তারপর আপনি কী চিন্তা ভাবনা করেছেন? তিনি বললেন, সত্য বলতে গেলে তো এটাই বলতে হয়, ইসলামই একমাত্র সত্যধর্ম। কিন্তু আমরা সমাজ ছেড়ে কিভাবে মুসলমান হবো! মানুষ কি বলবে!

আমি দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তাকে বুঝাতে থাকি। কিন্তু তার কাছে সমাজের ভয় দোযখের ভয়ের চাইতেও বড় ছিল। আমার অন্তরে খুব ব্যাথা পাই। ঘরে ফিরে দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি করি। মাওলানা কালিম সাহেবের একটি আলোচনা মনে পড়তে থাকে। তিনি বলেছিলেন, আপনি যদি ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাসের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন, যারা ভুলক্রমে কিংবা ইসলামকে অসত্য ধর্ম মনে করার কারণে ইসলামের শত্র“তা করেছেন, যখন তাদের যথাযথভাবে দাওয়াত দেয়া হয়েছে, তারাও ইসলাম কবুল করে নিয়েছে। চাই তিনি হযরত উমর রা. হোন, খালেদ ইবনে ওয়ালিদ হোন, ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল হোন, হযরত ওয়াহশি হোন কিংবা জালেম বলে খ্যাত হিন্দাই হোন। কিন্তু যারা ইসলামকে সত্যধর্ম জেনেও বিদ্বেষবশত কিংবা সামাজিকতার ভয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে থেকেছে চাই তিনি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসীম মমতাপ্রবণ চাচা আবু তালেবই হোন না কেন তাদের ভাগ্যে ইসলামের দৌলত জুটেনি। আমার মনে হয়, আমার পিতাজীর বিষয়টিও অনুরূপ। তিনি ইসলামকে সত্যধর্ম বলেছেন, কিন্তু সামাজিকতার ভয়ে কবুল করতে পারছেন না। আল্লাহ না করুন, তিনি ইসলাম থেকে বঞ্চিত অবস্থায় এই পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করবেন। আহমদ ভাই! আমার বাবার জন্য অবশ্যই দুআ করবেন। হযরতকে দুআ করতে বলবেন। রমযানের দুআতেও আমার বাবা এবং পরিবারের কথা মনে রাখবেন। তাঁরা যদি এভাবেই মারা যায়, তাহলে অনন্তকাল নরকে জ্বলবে। আমার মা-বাবা আমাকে খুব ভালোবাসেন। আমার আল্লাহ যেন তাদের হেদায়েত দান করেন।

আহমদ আওয়াহ: না, না বেলাল ভাই! এভাবে ভেঙ্গে পড়বেন না। আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আপনাকে খুশি করবেন। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই তাদের হেদায়েত দান করবেন। আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখুন।
বেলাল আহমদ: আল্লাহ তায়ালা যেন আপনার কথাকে সত্য করেন।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
বেলাল আহমদ: সকলের কাছে দুআ চাই, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে ইলম দান করেন। আমাকে যেন কুরআনের আদলে মুসলমান হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করেন। আমার পরিবারকে যেন হেদায়েত দান করেন। আর একটি কথা হলো, পৃথিবীর সকল মানুষ আমাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়। তাদের সকলের ঈমানের কথা ভাবতে হবে। আল্লাহ তায়ালা যদি তাদের হেদায়েত দান করেন তাহলেই আমাদের ভ্রাতৃত্বের হক আদায় হবে।

আহমদ আওয়াহ: বেলাল ভাই, আপনাকে অনেক শোকরিয়া।
বেলাল আহমদ: আপনাকেও শোকরিয়া।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ডিসেম্বর- ২০০৩