ডাঃ মুহাম্মাদ আসআদ সাহেব (রাজকুমার)-এর সাক্ষাৎকার

এর জন্য অনেক লম্বা সময়ের প্রয়োজন। আমার ধারণা, আমরা মুসলমানদের বাহিরের কোনো শত্র“ নাই, ইসলাম থেকে দুরে থাকাই আমাদের বড় শত্র“তা। শুধু তাই নয় বরং আমরা ইসলাম থেকে দূরে থেকে সমস্ত মানব জাতির সাথে শত্র“তা করছি এজন্য যে, ইসলাম এবং ঈমান মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা ইসলাম ধর্ম শুধু মুসলমানদের জন্য মনে করে এবং মুসলমানদের দেখে ইসলামের প্রতি ঘাবড়ে যায়। তারা নিজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এবং নাজাতের রাস্তা থেকে আমাদের কারণে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের শুধু নিজেদের স্বার্থে নয় বরং সমস্ত মানবজাতির প্রতি কল্যাণকামী হয়ে তাদরেকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া উচিত। কমপক্ষে তারা যেন বাহ্যিকভাবে মুসলমান হয়ে যায়। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের এ বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার।


আহমাদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: ওয়া আলাকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমাদ আওয়াহ: ডাঃ সাহেব খুব ভাল সময়েই এসেছেন আমি আপনার মতো মহা সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকেই খুঁজছিলাম।
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: কেন ভাই আহমাদ! এমন কী প্রয়োজন দেখা দিল? আপনি তো মাশাআল্লাহ বড় হয়ে গেছেন।

আহমাদ আওয়াহ: অনেক দিন যাবত আমাদের এখানে আরমুগানে নওমুসলিমদের ইন্টারভিউ ছাপা হচ্ছে, আব্বার ইচ্ছা ছিল যে, এ মাসে যদি ফূজীর কোনো সাথীর ইন্টারভিউ ছাপা হত তাহলে ভাল হতো। এরই মধ্যে আপনি এসে গেলেন। ভালই হলো।
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: কিন্তু আপনার আব্বার কাছে নওমুসলিম পরিভাষাটি পছন্দনীয় নয়। আমার মনে হয়, এর দ্বারা সমস্যা হয়। স্বাভাবিকভাবে মুসলমানরা তাকে নিজেদের থেকে আলাদা মনে করে আর ইসলাম গ্রহণকারীও অনেকদিন পর্যন্ত ভুল ধারণার মধ্যে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো সে তার সমস্ত প্রয়োজন মুসলমানদের দায়িত্ব মনে করে। এ ধারণাটা তার জন্য অনেক ক্ষতিকর। আমি নিজেকে নওমুসলিম বলি না। এমনকি নওমুসলিম মনে করি না আর যখন থেকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- ‘সকল শিশু ইসলামী শিষ্টাচারের উপর জন্মলাভ করে, তার পিতা মাতা তাকে খ্রিস্টান ও মূর্তিপূজক বানায়, শুনেছি তখন থেকে আলহামদুলিল্লাহ! নিজেকে জন্মসূত্রে মুসলমান মনে করি। যাক সে কথা। তা আপনার কী উপকার করতে পারি?

আহমাদ আওয়াহ: বাস্তবিকপক্ষে আপনার কথাই সত্য। যদিও হিন্দুঘরে জন্মলাভ করার কারণে কিছু দিন বাহ্যিকভাবে ইসলাম থেকে দূরে ছিলেন অন্যথায় আপনি যে জন্মসূত্রে মুসলমান এতে কোনো সন্দেহ নাই। কেননা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীও চিরন্তন সত্য। আরমুগানের পাঠকদের জন্য কিছু প্রশ্ন করতে চাই, এতে যারা দাওয়াতের কাজ করছে তাদের জন্য উপকার হত।
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: অবশ্যই। এটা তো অত্যন্ত খুশির কথা।

আহমাদ আওয়াহ: আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিন?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: আলহামদুলিল্লাহ এখন আমার নাম আসআদ। বর্তমান বাগপাথ জেলার সরুরপুর নামক স্থানে হিন্দু জাট জমিদার ঘরে আমার জন্ম, আমার আব্বু আমার নাম রাখেন রাজকুমার,। গ্রামেই আমি প্রাথমিক শিক্ষালাভ করি পরবর্তীতে বড়োত থেকে সাইন্স এবং বায়োলোজীতে ইন্টার পড়ি। ইলাহাবাদ থেকে আয়ুর্বেদীক ডিগ্রী কোর্স বি এ এম এস (ইঅগঝ) করি।

আহমাদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে কিছু বলুন?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: আমার ইসলাম গ্রহণ করার ঘটনা আল্লাহ তাআলার গুনবাচক নাম (ها دى) হাদী (পথপ্রদর্শক) এর কারিশমা। বি, এ, এম, এস এর কোর্স শেষ করে। ৩রা এপ্রিল ১৯৯৩ ইং ফুলাত এসে মাওলানা কালীম সাহেবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করি। এরপর জামাআতে সময় লাগাই। এখন আমি মুজাফফরনগর প্রাকটিস করছি। সেই নিজ গ্রামে মেডিকেল প্রাকটিস শুরু করি কিন্তু আল্লাহ তাআলার অন্য কিছু ইচ্ছা ছিল। আমার ক্লিনিক চলল না অথচ আমি তিন বছর যাবৎ পূর্ণ দায়িত্বের সাথে ক্লিনিক করি, তখন আমার এক আত্মীয় আমাকে পরামর্শ দিল কান্ধলার আইলাম গ্রামে ক্লিনিক করতে কারণ সেখানে ডাক্তারের সংখ্যা কিছুটা কম। আব্বা রাজি হওয়াতে সেখানে ক্লিনিক করি। সেখানেও এক বছর নিয়মিত ক্লিনিকে বসি। পরবর্তীতে ক্লিনিক চলল না। এ সময় আইলাম গ্রামে সংসার পাল ওরফে ফূজীর আতংক ছড়িয়ে পড়েছিলো। চারদিকে ফূজীর বাহিনীর আতংক। আইলাম গ্রামে তাদের ছাউনি ছিল। পি.এ.সি লেগে ছিল কিন্তু দিনের বেলা মনে হত যে ফূজী এসে কাউকে গুলি করে মেরে চলে গেল। দেশের অধিকাংশ সংবদাপত্রে ফূজীর সংবাদ আসত। পুলিশ ফূজীকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার উপর এক লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। আমারও তার সাথে দূরবর্তী আত্মীয়তা ছিল। ক্লিনিক থেকে নিরাশ হয়ে হতাশ দিন কাটানো অবস্থায় আমার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়ে গেল। খুনি, ডাকাত ফূজীর মধ্যে আমি এক মহামানব দেখতে পেলাম। প্রথম সাক্ষাতেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম এবং তার সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আহমাদ আওয়াহ: আপনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, আপনি কিভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: তার ব্যক্তিত্ব বুঝার জন্য আপনাকে তার ইতিহাস শুনতে হবে। তিনি এক সম্ভ্রান্ত সভ্য যুবক। তার চেহারা এতটাই সুন্দর যে, মানুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকত। সেনাবাহিনীতে তার চাকরি হয়ে গেল, সে ছিল অত্যন্ত সাহসী। সে যে অফিসারের অধীনে ছিল তার ব্যাপারে শুনেছিল যে, সে ঘুষ খেয়ে শত্র“র গোয়েন্দাদের কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়। সে এই খবর যাচাই করল এবং সত্যতা পেল। তখন সে বলল, এমন গাদ্দারের দুনিয়াতে থাকার অধিকার নাই। আমি তাকে হত্যা করব। সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী অফিসার গুলি করে মেরে পালিয়ে চলে আসে। কিন্তু সমস্যার কারণে বাড়ী যেতে পারলনা। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ফিরে দিন কাটাত। কেননা পুলিশ তাকে খুঁজে ফিরছিল।

এ সময় সে এক কারী সাহেবের বাসায় রাত কাটাত। সে কারী সাহেবকে তার আশ্রয়দাতা মনে করতো। এদিকে কুদরতীভাবে তার মামলা সেনা আদালতে স্থানান্তরিত হলে সেখান থেকে মামলা খালাস করে দিল। এরই মাঝে বাবরি মসজিদ শাহাদাতের ঘটনায় দেশ গরম ছিল। আইলাম গ্রামে কিছু মুসলমান থাকত। একদিন তারা ফূজীর কাছে এসে বলল, ফূজী ভাই আমাদের মাফ করে দিন। আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি। ফূজী কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, প্রধানজীর পরিবারের লোকজন মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর যদি আমাদের মসজিদই না থাকে তাহলে আমাদের এ গ্রামে থেকে কী লাভ? ফূজী উত্তরে বলল, আমি যতক্ষণ জীবিত থাকব তোমাদের মসজিদ কেউ ধ্বংস করতে পারবেনা, তোমরা গ্রামে গিয়ে শান্তিতে বসবাস করো। তারা গিয়ে প্রধান জীকে বলল, ফূজী বলেছে যতক্ষণ সে জীবিত থাকবে ততক্ষণ কেউ মসজিদ ধ্বংস করতে পারবেনা। প্রধানজীর সাথে ফূজীর পরিবারের সম্পর্ক ছিল, প্রধানজী বলল এমন লাখো ফূজী থাকলেও আমাদের ৬ সেপ্টেম্বর মসজিদ ধ্বংস করতে বাঁধা দিতে পারবে না। এই সমস্ত লোক কেউ ফুঁযা ছিল তারা এসে ফূজীকে একথা বলে দিল, সে রাইফেল হাতে নিয়ে প্রধানজী তার ছেলে এবং তার এক ভাতিজাকে গুলি করে মেরে ফেলে এবং মসজিদের সামনে লাশ টেনে এনে ফেলে রাখে এবং মুসলমানদের বলে, তোমাদের মসজিদ ধ্বংসকারী শেষ। এখন তোমাদের কোনো ভয় নেই।

প্রধানজীর বংশের জীবিত লোকেরা এক সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে আঁতাত করল, তারা ফূজীর পরিবারের উপর রাত্রিবেলা আক্রমণ করল, মালামাল লুটপাটের সাথে মহিলাদেরও লাঞ্ছিত করল। ফূজী বাড়ীতে ছিল না। সে খবর পেয়ে বাড়িতে এসে তার ভাবী এবং চাচীর লাশ দেখে তার মেযাজ বিগড়ে যায়, সে লাশের কসম খেয়ে বলল, যতদিন আমি জীবিত থাকব ততদিন প্রধানজীর পরিবারের একজন করে হত্যা করব। এরপর সে এক সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরী করে এবং প্রত্যেহ এক করে হত্যা করে এভাবে প্রায় ১৬৫ জনকে হত্যা করে। পুরো থানার মধ্যে পুলিশ পেরেশান হয়ে গেল। কিন্তু তাকে ধরতে পারল না। ফূজী এক আশ্চর্যজনক ডাকাত ছিল। ডাকাতি করত লোকদের থেকে মাসিক চাদা উসুল করত কিন্তু সে টাকা নিজেও ব্যবহার করত না এবং সাথীদেরকেও কিছু খাওয়াতো না বরং এর দ্বারা গরীবদের সাহায্য করতো। বিধবা এবং এতীমদের বিবাহ দিত।

আরও আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল যে, সম্ভবত এই কারণে আল্লাহ তাআলার রহমতের জোশ আসে। ফূজী কারী সাহেবের বাড়ীতে অবস্থান করছিল। এই সময়ে মাওলানা কালীম সাহেব হরিয়ানা থেকে সফর করে ফিরছিল। তাঁর কারী সাহেবের নিকট কিছু কাজ ছিল। তাই তিনি মসজিদে আসলেন। কারী সাহেব তাকে দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন, ফূজী কালীম সাহেবের আগমন অপছন্দ করছিল। কিন্তু কারী সাহেব তাকে বললেন, আমি তোমার কী হই? উত্তরে সে বলল, আপনি আমার (হিতাকাক্সক্ষী)। কারী সাহেব বললেন, এই মাওলানা সাহেব আমার হিতাকাক্সক্ষী। আমি তোমাকে তার সাথে সাক্ষাৎ করাতে চাচ্ছিলাম। ইতোপূর্বে মাওলানা সাহেবের নিকট বড়োত থেকে বড়হানার এক সফরে ফূজীর পরিচয় দিয়েছিল। মাওলানা বলেন যে, মসজিদ সংরক্ষণের জন্য ডাকাত হওয়া তাকে খুব প্রভাবান্বিত করেছে। তিনি বুধানা পর্যন্ত ফূজীর হেদায়েতের জন্য দুআ করতে থাকেন, হে আল্লাহ আপনার ঘরের সংরক্ষণের জন্য তাকে যেহেতু ডাকাত বানিয়েছেন। এজন্য তাকে অবশ্যই হেদায়েত দিয়ে দেন, মাওলানা সাহেবও তার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহী ছিলেন। এজন্য তাকে পেয়ে খুব খুশী হলেন।

মাওলানা সাহেব ফূজীকে জিজ্ঞাসা করলেন, পুরা শহরে এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ কেন ঘটালে? উত্তরে ফূজী বলল, আমি চিন্তা করে দেখলাম, মৃত্যু আমার নিকটবর্তী তাই একটু নাম করে যাই। মাওলানা সাহেব বললেন, মৃত্যু নিকটবর্তী মনে করে তার জন্য কোনো প্রস্তুতি নিয়েছেন? এখানকার পুলিশ এবং আদালত থেকে তো বাঁচতে পারবেন, সেখানের আদালত থেকে তো বাঁচা সম্ভব না। ফূজী বলল, মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে কেউ দেখেছে? মাওলানা সাহেব বললেন, যিনি দেখেছেন তিনি বলেছেন। সে জগতের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন। তার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাক। ফূজী বলল, জনাবের কথা তো বুঝে আসছে না। কিন্তু আপনি যেহেতু আমার হিতাকাংক্ষী কাজেই বলুন, আপনি কী চান? মাওলানা সাহেব বললেন, কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাও। ফূজী সাথে সাথে বলল, কালিমা পড়ান।
আপনার আব্বা বলেছেন, আমি মনে করেছিলাম সে আমার সাথে ঠাট্টা করছে। আপনার আব্বা তখন তার দৃঢ় ইচ্ছা সম্পর্কে জানতেন না কিন্তু তারপরও তিনি কালিমা পড়ালেন। সে কালিমা পড়ে বলল, আমিতো মুসলমান হয়ে গেছি এখন তো আর মৃত্যুর পরে শাস্তি হবে না? মাওলানা সাহেব বললেন, ইনশাআল্লাহ হবে না।

দিন শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সে অস্ত্র হাতে নিয়ে চলে যেতে উদ্দত হল। মাওলানা সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছো? ফূজী বলল, শত্রুপক্ষের এক লোক পুলিশকে ভুল সংবাদ দিয়ে আমাদের এক সাথীর পা ভেঙ্গে দিয়েছে। আজকে হাসিনপুরের এক বাগানে সে কাজ করতে আসবে। মাওলানা সাহেব বললেন, এখন আর এগুলোর সুযোগ নাই। এখন তুমি কাউকে খুন করতে পারবেনা। ফূজী বলল, আপনি তো আগে এগুলো বলেন নাই। মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি কালিমা পড়েছেন যার প্রথম শব্দ লা (لا) যার অর্থ না। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার সকল প্রকার অবাধ্যতা যেমন খুন, জুলুম, অত্যাচার, কুফরসহ সকল প্রকার মন্দ কাজ করব না। ফূজী বলল, আমার অস্ত্র তো রক্তপূজা চাচ্ছে। মাওলানা সাহেব বললেন, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আজকে আমাকে হত্যা কর, কালকে কারী সাহেবকে করো,। ফূজী বলল আমি তো পাগল নই। মাওলানা সাহেব বললেন, তুমি প্রত্যেক দিন একজনকে হত্যা কর তুমি কি জ্ঞানী? ফূজী বলল, আচ্ছা তাহলে কী আমি জ্ঞানী না? মাওলানা সাহেব বললেন, একদম না। ফূজী বলল, যদি তাই হয় তাহলে আজ থেকে ফূজী কাউকে খুনও করবে না এবং ডাকাতিও করবে না।

ফূজী সেখান থেকে চলে গেল, এরপর সে তার সাথীদের একত্রিত করলো। যার মধ্যে ৯জন অমুসলিম এবং ৩১জন মুসলমান ছিল। সকলকে তার মুসলমান হওয়ার সংবাদ দিল এবং স্বীয় ইচ্ছা ব্যক্ত করল, যারা আমার সাথে জীবন নিয়ে খেলা করে তারা সবাই যেন মুসলমান হয়ে যায়। পরের দিন সে গ্রেফতার হয়। দেশের সমস্ত বড় বড় সংবাদপত্রে তার গ্রেফতারীর সংবাদ লাল কালিতে ছাপা হয়। তিহাড় জেলে তিন মাস ছিল। ইউপি পুলিশ অক্ষমতা প্রকাশ করেছিল যে, ফূজী বার বার পলায়ন করেছে। এখন যদি আরেকবার পালায় তাহলে আমাদের কোনো দায় নাই।

আহমাদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ করার কথা তো কিছু বললেন না?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: তার এক ভাই জেলখানায় তার সাথে দেখার করতে যায়। সে সিগারেটের প্যাকেটে মাওলানা সাহেবের নামে একটি চিঠি লিখে আমার কাছে পৌঁছাতে বলে এবং একথা বলে পাঠায় যে, ডাক্তার রাজকুমারকে গিয়ে বলবে, যদি ফুজীর সাথে মুহাব্বত থাকে তাহলে সে যেন ফুলাত গিয়ে মাওলানা সাহেবের হাতে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায় এবং এরপর জামাআতে বেড়িয়ে পড়ে আর আমার ওই চিঠি মাওলানা সাহেবকে দিয়ে দেয় এবং আমার ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার সংবাদ দেয়। ফূজী আমাকে অনেক ভালোবাসতো, আমি তার চিঠি নিয়ে ৩ এপ্রিল ১৯৯৩ ইং প্রায় ১২ টার দিকে ফুলাত পৌছি এবং মাওলানা সাহেবের কাছে তার চিঠি দিই। সেই চিঠি আরমুগানে ছাপা হয়েছে। আজ পর্যন্ত তার একটি কপি আমার পকেটে আছে (এরপর সে চিঠি বের করলে বলল) এই সেই চিঠি। চিঠির বিষয়বস্তু নিম্নরূপ :


প্রিয় মাওলানা সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহামাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আপনি তো সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, আমি তিহাড় জেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছি। জেলখানার সংকীর্ণ জীবনে ঈমান আনার কারণে বাদশাহীর স্বাদ পাচ্ছি। আমার অন্তিম ইচ্ছা হল, আমার সব সাথী যারা সদা সর্বদা জীবন নিয়ে খেলা করত তারা যেন কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়। আর দ্বিতীয় হল আপনি একটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমার ঈমান এখনও বহাল আছে। আপনার অনুগ্রহের বদলা আমার চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে দিলেও আদায় হবে না।
মাআস সালাম
আপনার সেবক
সংসার পাল ফুজী


অতঃপর মাওলানা আমাকে কালিমা পড়ান, খানা খাওয়ান, আমার নাম রাখেন আসআদ। সামান্য সময় কথা বলে উজু করিয়ে মাদরাসায় নিয়ে যান। আমি তাঁর সাথে জোহরের নামাজ পড়ি, মাদরাসার ছেলেরা আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কেননা আমি নামায পড়তে না পারার কারণে নামাযে এদিক সেদিক তাকাই। আমি দশ হাজার রুপি মাওলানা সাহেবকে দিয়ে বললাম যে, আমাকে জামাতে যেতে বলেছে কিন্তু আমি এই পয়সা দিয়ে জামাআতে যেতে চাইনা, আপনি আপনার কাছ থেকে খরচ দিন। মাওলানা সাহেব বললেন এই পয়সা তো আমরাও নিতে পারব না তবে আমি আপনার খরচের ব্যবস্থার করে দেই। এরপর তিনি আমাকে খরচ দেন। চার মাসের জন্য জামাআতে গিয়েছিলাম, জামাতে নিজস্ব জানমাল খরচ করা উচিৎ, এজন্য শুধু এক চিল্লা লাগিয়ে হালাল উপার্জন করার প্রোগ্রাম করি। এরপর পয়সা কামাই করে বাকি দুই চিল্লা লাগানোর ইচ্ছা করি। একচিল্লা দিয়ে ফিরে ফুলাত যাই। মাওলানা সাহেব প্রথমত সময়ের আগে ফিরে আসার কারণে পেরেশান হন পরে কারণ জানতে পেরে খুব খুশী হন।

মুজাফফর নগরে আমি আমার ক্লিনিকে কাজ শুরু করি, যে ক্লিনিক আগে চলত না এমনকি এক বছরে ৩ বার স্থান পরিবর্তন করেছিলাম। এক বছর পর এখন খুব ভালভাবে চলতে থাকে। মাওলানা সাহেব ইস্তেগফার এবং সদকা করতে বলেন। আলহামদুলিল্লাহ আমি তাঁর কথা অনুযায়ী আমল করার বরকতে এর মাধ্যমে আমি বাড়ি বানিয়েছি, আর এখন অবস্থাও খুব ভালো।

আহমাদ আওয়াহ: ফূজী সাহেবের কী হল?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: মাওলানা সাহেব বলেছেন, সেই চিঠি পড়ে তিহাড় জেলে গিয়ে ফূজীর সাথে তাঁর সাক্ষাত করার খুব ইচ্ছা জাগে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে যাওয়ার এক বাহানা পেয়ে যান। কিন্তু যেদিন সেখানে যাওয়ার কথা সেদিন হিন্দুস্তান টাইস পত্রিকা এই সংবাদ ছাপায়, সংসার পাল আত্মহত্যা করেছে। মাওলানা বলেছেন, আমি এই খবর শুনে অত্যন্ত কষ্ট পাই। অতঃপর তিনি তার শাইখের কাছে এই কষ্টদায়ক ঘটনা শুনান। মাওলানা সাহেব বলেন, মাওলানা আলী মিয়া সাহেবকে শুনানোর সময় হেচকি তুলে কাঁদতে থাকি। মরহুম আলী মিয়া মাওলানা সাহেবকে সান্তনা দিয়ে বলেন যে, আমি আশাবাদী ফূজী আত্মহত্যা করে নাই। আর যদি আত্মহত্যা করেই থাকে কোনো অসুবিধা নেই। কেননা, সে এর বিধান জানার সুযোগ পায়নি। ইনশাআল্লাহ তার খাতেমা বিল খায়র হবে।
পরবর্তীতে সেখানকার এক মুসলমান অফিসার যিনি সেখানের দায়িত্বশীল তিনি মাওলানা সাহেবকে বলেন, ইতোপূর্বে চারবার ফূজী জেলখানা থেকে পালানোর কারণে জেলকর্তৃপক্ষ তিহাড় জেলে রাখতে অক্ষমতা প্রকাশ করেছিল। এজন্য তিহাড় জেল থেকে নিয়ে গিয়েছিল এবং সম্ভবত ইলেকট্রিক শকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে দেয়। সেই অফিসার খুব আফসোস প্রকাশ করেন যে, যদি আমার আগে জানা থাকত তাহলে আমি অবশ্যই কিছু করতাম। আল্লাহর শোকর যে, ফূজীর ইচ্ছা অনেকটাই পুরা হয়েছে। তার ৩১ জন্য অমুসলিম সঙ্গীর ২৩ জন মুসলমান হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচ-ছয় জনের অবস্থা তো এমন যে, সাধারণ মানুষ এমনকি আমরাও তাদের থেকে দোআ চাই। তাদের যিন্দেগী এমন যে, তাদের জীবনী লেখা উচিৎ, আল্লাহ তাআলার কী আজীব শান যে, তিনি সন্ত্রাসীদের কত উচ্চ মাকামে পৌঁছে দিলেন।

আহমাদ আওয়াহ: আপনার বিবাহ হয়েছিল? আপনার পরিবারের কী অবস্থা?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: হ্যাঁ, আমার বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। আমার স্ত্রী সদা সর্বদা আমার সাথে ছিল। আমার ইসলাম গ্রহণ করার পর সে একবারও বিরোধিতা করে নাই। আমি জিজ্ঞাসা করার পর সে বলেছে, মালিক আমাকে আপনার সাথে বেঁধে দিয়েছেন। আমি এক ভারতকন্যা। আপনার সঙ্গে সহমরণেও আমি প্রস্তুত। জামাত থেকে ফিরার পর যখন আমি তাকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝালাম তখন সে খুব খুশি হল।

আলহামদুলিল্লাহ আমার তিন ছেলে। বড় ছেলের নাম আবু বকর ছোট ছেলের নাম উমর, মেয়ের নাম ফাতেমা। বড় ছেলে হেফজ পড়ছে। ছোট ছেলে ৩য় শ্রেণীতে পড়ে। ফাতেমাও এখন মাদরসায় যেতে শুরু করেছে আমার ইচ্ছা আছে তাদের এবং আল্লাহ আমাকে যত সন্তান দিবেন সকলকে আলেম, হাফেজ এবং দ্বীনের দা‘য়ী বানানোর চেষ্টা করব। পরিবারের লোকেরা প্রথমে বিরোধিতা করেছে এবং কিছুদিন অসন্তুষ্ট ছিল কিন্তু আমি সম্পর্ক ঠিক রেখে ছিলাম এবং পিতা-মাতার খেদমত করছিলাম। প্রত্যেক মাসে তাদের কাছে কিছু না কিছু নিয়ে যেতাম। এখন তারা খুব খুশী এবং ইসলামেরও নিকটবর্তী হয়ে গেছে। আমার ধারণা যে, আল্লাহ তাআলা খেদমতের বিরাট প্রভাব রেখেছেন। খেদমতের মাধ্যমে পাথরের মত শক্ত দিল মোমের মত গলে যায়। মুসলমান হওয়ার পূর্বে পিতা-মাতার খেদমত করি নাই কিন্তু এখন আমি এবং আমার স্ত্রী বাড়িতে গেলে তাদের খুব খেদমত করি। আলহামদুলিল্লাহ এখন সব ভাইবোনদের মধ্যে আমাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মুহাব্বত করে।

আহমাদ আওয়াহ: মুসলমানদের জন্য বিশেষ কোনো পয়গাম দিতে চান?
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: এর জন্য অনেক লম্বা সময়ের প্রয়োজন। আমার ধারণা, আমরা মুসলমানদের বাহিরের কোনো শত্র“ নাই, ইসলাম থেকে দূরে থাকাই আমাদের বড় শত্র“তা। শুধু তাই নয় বরং আমরা ইসলাম থেকে দূরে থেকে সমস্ত মানবজাতির সাথে শত্র“তা করছি এজন্য যে, ইসলাম এবং ঈমান মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা ইসলাম ধর্ম শুধু মুসলমানদের জন্য মনে করে এবং মুসলমানদের দেখে ইসলামের প্রতি ঘাবড়ে যায়। তারা নিজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এবং নাজাতের রাস্তা থেকে আমাদের কারণে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের শুধু নিজেদের স্বার্থে নয় বরং সমস্ত মানবজাতির প্রতি কল্যাণকামী হয়ে তাদরে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া উচিত। কমপক্ষে তারা যেন বাহ্যিকভাবে মুসলমান হয়ে যায়। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের এ বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার।

আহমাদ আওয়াহ: বাস্তবিকপক্ষে এর জন্য আলাদাভাবে বসা দরকার। ইনশাআল্লাহ সামনের বার এ বিষয়ে আলোচনা করব শুকরিয়া- জাযাকাল্লাহ!
ডাঃ মুহাম্মাদ আসওয়াদ: ইনশাআল্লাহ! অবশ্যই এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক ব্যাপার। যার অভিজ্ঞতা আমাদের থেকে যারা দাওয়াতের কাজের সাথে সম্পৃক্ত তাদেরই বেশী, আল্লাহর শোকর যে, তিনি আমাকে ইসলামের দিকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আহমদ ভাই! আপনি হাদী এবং দয়াময় প্রভুর শুকরিয়া আদায় করুন এবং তার কুদরত দেখুন যে, ডাকাতির অন্ধকার রাস্তা থেকে ইসলামের আলোকিত পথে আমার মত নগণ্য ব্যক্তিকে নিয়ে এসেছেন। (কাঁদতে কাঁদতে) আমি আমার আল্লাহর উপর কুরবান হয়ে যাব, তার প্রতি উৎসর্গিত হব।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, অক্টোবর-২০০৪