তুমি কি ভাবছ যে ফুলের মাঝে কাঁটা

তুমি কি ভাবছ যে ফুলের মাঝে কাঁটা
নাওয়াজ দেওবন্দী হলেন একজন ভালো উর্দূ কবি। আমার খুব কাছের বন্ধু। দেওবন্দের এক স্থানে আমার প্রোগ্রাম ছিল। আমার উপস্থিতির কথা শুনে তিনি আমার সাথে দেখা করতে এলেন। আমি তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঈর্ষণীয় একজন প্রেমিক মনে করি। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের একটি দোকান অনেক বেশী মূল্যে ভাড়া নিয়েছেন। সেই দোকানে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার করেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি দেওবন্দের তুলনায় এত দামী দোকান ভাড়া নিলেন কেন? তিনি বললেন, নিসবত একটি বড় জিনিস। আমিতো দারুল উলূমের উস্তাদও হতে পারলাম না, ছাত্রও তো হতে পারলাম না। কমপক্ষে দারুল উলূমের ভাড়ার নিসবত যেন অর্জন হয়ে যায়। দারুল উলূমের এক শিক্ষক সেখানে বসে ছিলেন, যিনি মাদরাসা প্রশাসনের উপর বেশী সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি বললেন দারুল উলূমকে তো ভূত বানিয়ে ফেলছে। সেখানে আর কী রাখবে। এমন আরো কিছু কথা বললেন। নাওয়াজ সাহেব বললেন, আমি গত কাল মাগরিবের সময় মসজিদে রাশীদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যখন মুয়াজ্জিন আল্লাহু আকবারের ধ্বনি দিলেন। ছাত্রদের ব্যাট, জাল রেখে সেই ময়লা কাপড়ে মসজিদের দিকে দৌড়ে আসতে দেখলাম। মনে হলো আল্লাহ ছাড়া আর কারো সাথে তাদের সম্পর্ক নেই।
সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে এল, যদি দারুল উলূমের কোনো ছাত্র নিজ প্রয়োজনেও সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যায়, তাহলে আর রেহাই নেই। এমনকি মুসলমানরাও তাদের পত্রিকায় ছাপিয়ে দিবে। কিন্তু নামাযের জজবার এই দৃশ্য তাদের চোখে পড়বে না। তখন আমি একটি কবিতা বললাম।
তুমি কি ভাবছ যে, ফুলের সাথে কাঁটা।
আমার তো খুশি হয় যে, কাঁটার সাথে ফুল।
এটাই হলো ইতিবাচক আর নেতিবাচক চিন্তার পার্থক্য। এক গ্লাসের মধ্যে অর্ধেক পানি। কেউ এসে বলে অর্ধেক গ্লাস পানি। আবার কেউ বলে অর্ধেক গ্লাস খালি। দুজনের কথাই সঠিক। কিন্তু মানসিকতার বা চিন্তার পার্থক্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিবাচক দিককেই দেখতেন। এটাই সীরাত অধ্যয়ন করলে বুঝা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই ইতিবাচক নীতি থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে সব স্থানে শুধু অন্যের খারাবিই চোখে পড়ে। সব জায়গায় শুধু বিপদই মনে করা হয়। কারো ভালো দিক খোঁজা এবং ভালো ভাবে তাকে স্মরণ করা, এই মানসিকতা তো হারিয়েই গেছে। সাধারণ দ্বীনি পরিবেশেরও একই অবস্থা হয়ে গেছে। কারো যদি হাজারো ভালো দিক থাকে, আর একটি দিক থাকে খারাপ, তাহলে সেই খারাপ দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা হবে। তার ভালো জিনিস গুলোকে স্বীকার করার তো প্রশ্নেই আসে না। কারো ব্যাপারে যদি কোনো খারাপ ধারণাও করার সুযোগ থাকে, শুধু ধারণার উপর ভিত্তি করে পুরো দুনিয়ায় পৌঁছিয়ে দেয়া আমাদের জিম্মাদারী মনে করি। মনে হয় তার প্রচার আমাদের উপর ফরজ হয়ে গেছে।
নিজের দোষের উপর ধারণা করে, অন্যের উপরও সেই দোষগুলো খুঁজতে শুরু করি। এটা আমাদের পরিচয় হয়ে গেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে কারো দোষ বলতে দেখলে তিনি নিষেধ করতেন। বলতেন, আমি অন্যের দোষ জানতে চাই না। আমাদের অবস্থা দেখলে মনে হয়, অন্যের দোষ চর্চা আমাদের চাকুরি হয়ে গেছে।
একবার দারুল উলূমের কিছু ওলামায়ে কেরাম আমাদের ফুলাতে এলেন। একজন জিজ্ঞাসা করলেন আপনারাতো ওলামায়ে কেরাম, আমি একটি ফতওয়া জিজ্ঞাসা করতে চাই। একজন বললেন, কী মাসআলা? লোকটি বললেন, বর্তমান যুগে কিছু দ্বীনদার মানুষ একত্রে কিছু সময় বসা জায়েজ হবে কি? মুফতি জফিরউদ্দী সাহেব বললেন কারণ কী? না জায়েয হবে কেন? সেই লোক বললেন কিছু মানুষ একত্রিত হলে, তারা গীবত আর অন্যের দোষ চর্চায় লিপ্ত হয়ে যায়। মুফতি সাহেব বললেন- আপনি তো ঠিকই বলেছেন। কত দুঃখজনক আমাদের অবস্থা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী আলোচনার সময় এমন ঘটনা কল্পনাও কি করা যায়?

মূল. হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ