তৈয়ব ভাই (রামদীর)-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

আমার বিনীত আবেদন, প্রত্যেক ঈমানদারকে তার মর্যাদা বুঝতে হবে যে, সে একজন ঈমানদার ও মুসলমান। এজন্য তিনি যেখাবেই থাকবেন তাকে খেয়াল রাখতে হবে সে রহমাতুল্লিল আলামীন নবী (সা.)-এর একজন উম্মত। তাকে নিজেকে শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তাবাহক মনে করতে হবে। নিদেনপক্ষে তিনি যেখানেই থাকুন, মানুষকে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচাবেন। অন্যের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করবেন। তিনি যখন অন্যের কথা চিন্তা করবেন তখন তিনি নিজেই সব সময় প্রত্যেকেই যাতে ঈমানের সাথে মারা যেতে পারে সেজন্য চিন্তা করবেন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
তৈয়ব: ওয়া আলায়কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: মাসিক আরমুগানের নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকারের ধারাবাহিকতা কয়েক মাস থেকে চলে আসছে। এজন্য আমি আপনাকে এখানে আসার জন্য কষ্ট দিয়েছি। আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য আব্বার সাথে বেশ কিছুদিন যাবত কথা হচ্ছিল। আর আব্বার সঙ্গে আপনার কোন কাজও ছিল। এজন্য আপনাকে সোনীপথ থেকে ডেকে পাঠিয়েছি আমি। এতে করে আপনার কাজও হয়ে যাবে আর আমি সেই সুযোগে সাক্ষাৎকারটিও গ্রহণ করে নেব।

তৈয়ব: হাঁ, হযরত আমাকে তিন-চার দিন আগেই সাক্ষাৎকার সম্পর্কে বলেছিলেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি ভাল আছেন?

তৈয়ব: আলহামদুলিল্লাহ! ভাল আছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার পরিচয় দিন।

তৈয়ব: আমার নাম ছিল রামদীর বিন আজব সিং। আমরা সাত ভাই-বোন। দু’জন মারা গেছেন। বর্তমানে আমরা তিন ভাই ও দু’বোন বেঁচে আছি। আমি মুজাফফরনগর জেলার কাকড়া নামক জায়গায় বসবাস করি এবং অস্টিয় ইন্টার কলেজ শাহপুর থেকে হাইস্কুল করেছি। আমার পিতা একজন শরীফ ও সজ্জন কৃষক। সেই সাথে আমাদের খান্দান খুবই ধার্মিক হিন্দু খান্দান। হিন্দু জাট বংশের সঙ্গে আমরা সম্পর্কিত।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

তৈয়ব: আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে এক আজীব ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ইসলাম গ্রহণের কোন কল্পনাও আমার মাথায় ছিল না। লেখাপড়া ছেড়ে দেয়া ও স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর জীবন একদম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সব সময় জঙ্গলে থাকা এবং মানুষকে উত্যক্ত করা ও নেশা করা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এলাকার বদমাইশদের সাথে ছিল আমার সম্পর্ক। পশু ব্যপারীদের পথের মধ্যে থামিয়ে টাকা-পয়সা ছিনতাই করে আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। ঘর ও মহল্লার লোকেরা আমার ভয়ে খুব পেরেশান ছিল। শেষে আর না পেরে বাড়ির লোকেরা আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে অস্বীকার করি এবং টিউবওয়েল বসিয়ে ক্ষেত-খামার করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের জমি বরাবর একজন আনসারীর পুরাতন টিউবওয়েল বন্ধ অবস্থা পড়েছিল। আমি তা ঠিক করার জন্য রাত-দিন পরিশ্রম করি। অবশেষে তা ঠিক হয়ে যায়। আমি মোটার ও পাখা ধার নিই এবং চুরি করে বিদ্যুৎ কানেকশন নিই। কিন্তু টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠেনি। আমি চালাবার খুব চেষ্টা করি। ট্রাক্টরের সাহায্যে পাম্প চালাই। কিন্তু আমি সফল হতে পারিনি। অবশেষে পণ্ডিতের কাছে যাই। তিনি টিউবওয়েলের নামে কিছু উৎসর্গ করতে বলেন। আমার কাছে কিছু ছিল না। হাত ছিল একেবারে খালি। আমার মনে হল যে, দেবতা ভাঙ পেলে খুশি হন। আমি ভাঙ পিষে তার ওপর দিলাম। এরপরও পানি এল না।
একবার রাত্রিবেলা সামনের জমির আনসারী (ইয়াসীন) ও আমার পাশে ছিলেন। আমরা দু’জনে টিউবওয়েলের কাছে মাটির ওপর শুয়েছিলাম। ইয়াসীন বলতে লাগল, আজ যদি টিউবওয়েলে পানি ওঠে তাহলে আমি দু’রাকআত নামায পড়ব। আমি বললাম, তুমি দু’রাকআতের কথা বলছ, ‘আমি চার রাক’আত পড়ব। অধিকাংশ সময় রাত্র সাড়ে দশটার দিকে বিদ্যুৎ এসে যায়। কিন্তু ঐ রাত্রে ১২টা বেজে ৪৫ মিনিটে বিদ্যুৎ আসল। আমি ইয়াসীনকে কানেকশন দেবার জন্য বললাম। সে বলল, তুমিই দাও। আমার বিদ্যুতে ভয় লাগে। আমি কানেকশান লাগাতেই টিউবওয়েল থেকে পানি উঠতে শুরু করল এবং আড়াই মিটার দূরে গিয়ে পানি নিক্ষিপ্ত হতে লাগল ও সামনের রাস্তার ওপর পানি পড়তে থাকল। আহমদ ভাই! শুকনো মাটি হওয়া সত্ত্বেও নিক্ষিপ্ত পানির আঘাতে প্রায় দেড় মিটার গর্ত হয়ে যায়।

ভোরে যখন মহল্লাবাসী দেখল যে, এরা কৃতকার্য হয়ে গেছে তখন সকলে একত্রে এল এবং টিউবওয়েল বন্ধ করে দিল। তারা বলল, এই লাইন থেকে আমরা তোমাদের টিউবওয়েল চালাতে দেব না। নিজেদের লাইন মঞ্জুর করাও। টিউবওয়েল বন্ধ হবার পর ইয়াসীন আমাকে নামাযের জন্য বলতে থাকল। সে আমাকে বলর, তুমি চার রাক’আত পড়বে বলেছিলে। এখন তোমার পড়া উচিত যাতে কখনো টিউবওয়েল খারাপ না হয়। আমি বললাম যে, চল পড়ছি। আমরা কবীরপুর ক্ষেতের নিকটবর্তী এক গ্রামের মসজিদে নামায পড়তে যাচ্ছিলাম। ইয়াসীন আমাকে বলল, নিজেদের টিউবওয়েলে ওযু করব। আমরা ওখানে এলাম। ইয়াসীন ওযু করল এবং আমাকে ভাল করে গোসল করাল। এরপর আমরা নামায আদায় করি। নামাযের পর ইয়াসীন বলতে লাগল, তুমি মুসলমান হয়ে যাও। আমি তোমার বিদ্যুৎ মঞ্জুর করিয়ে দেব। আমি বললাম, আমার কারণে মুসলমানরাও পেরেশান। তারা আমাকে কোথায় রাখবে। ইয়াসীন বলল, তুমি যখন মুসলমান হয়ে যাবে তখন তুমি ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি তুমি ঠিক নাও হও তবু মুসলমানরা তোমাকে রাখবে। আর মুসলমানরা যদি নাও রাখে তবুও মৃত্যুর পর আল্লাহ তোমাকে জান্নাতে রাখবেন। আমি ইয়াসীনকে বললাম যে, তুমি আমাকে হারসূলী মাদরাসায় নিয়ে চল। আমি ওখানে এটা জানব যে, আমি মুসলমান হব কি না?

আমরা দু’জনে সেখানে পৌঁছলাম। মাওলানা আনীস সাহেবের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হল। আমি তার থেকে মুসলমান হওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, মুসলমান এভাবে হয় না বরং জামা’আতে গিয়ে নামায প্রভৃতি শিখতে হবে। তুমি চিল্লা দাও এবং দিল্লী মারকাযে চলে যাও। আমি বললাম, আমার তো কিছু জানা নেই। তুমিই পাঠিয়ে দাও। তিনি ফোনে মুজাফফরনগর মারকাযের সঙ্গে কথা বললেন এবং মুজাফফরনগর যেতে বললেন। সে সময় আমি তৈরি ছিলাম না। সেজন্য আমি পরদিন যাওয়ার ওয়াদা করলাম। যাবার আগে আমি মাকে বললাম, ঘরের লোকেরা আমার কারণে খুব পেরেশান। এজন্য আমি তো যাচ্ছি এবং মুসলমান হয়ে যাব। মা বললেন, ঠিক আছে। যাও, কিন্তু খেয়ে তো যাবে। আমি খানা খেয়ে এবং দুই গ্লাস দুধ পান করে পথে একজনের থেকে সাত শ’ টাকা নিয়ে মুজাফফরনগর পৌঁছি। সেখানে মারকাযে মাওলানা মূসা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি আমাকে বললেন, এখানে তো কোন জামা’আত যাচ্ছে না। তুমি ফুলাত চলে যাও। ফুলাত থেকে জামা’আত যায়। আমি ফুলাত যাই। সেখানে আব্বা ইলিয়াসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি সন্ধ্যাবেলায় হযরতের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেন। হযরত আমাকে কলেমা পড়ান। এরপর আমার জীবনের অবস্থা অবগত হন।

তিনি যখন আমার অবস্থা শুনলেন তখন তিনি আমাকে বললেন, ঈমান ও ইসলাম আসলে ঈমান ও শান্তির মধ্যে, নিরাপত্তার মধ্যে নিজে থাকা এবং অন্যকেও শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে রাখার নাম। এজন্য এখন তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। তুমি যদি চাও যে, নিজেও শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে এবং এই দুনিয়ার পর চিরস্থায়ী জীবনেও শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে, তাহলে জরুরী হলো, তুমি এভাবে জীবনযাপন কর যেন তোমার দ্বারা কেউ কষ্ট না পায় এবং সকল মানুষের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার মাধ্যম হয়ে যাও। এজন্য সর্বপ্রথম তোমাকে নেশা থেকে সত্যিকার তওবাহ করতে হবে। এজন্য যে, সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ নেশা অবস্থায় মানুষকে কষ্ট দেয়, নির্যাতন করে। হযরত আমাকে বললেন, তুমি চৌধুরী মানুষ। চৌধুরীরা বাহাদুর হয়, সাহসী হয়। একজন যুবক যদি পাক্কা এরাদা করে, সংকল্পবদ্ধ হয় তাহলে পাহাড় থেকে দুধের নহর বইয়ে দিতে পারে। একজন যুবক মানুষ যদি পাক্কা ইচ্ছা করে তবে নেশা ছেড়ে দেয়া কোন কঠিন কাজ নয়। মাওলানা সাহেব আমার হাত ধরলেন এবং বললেন, পাক্কা এরাদা কর, কঠিন সংকল্পে আবদ্ধ হও আর কোন নেশা করবে না। এখন তুমি ঈমানওয়ালা মুসলমান হয়ে গেছ। এখন তো নেশা তোমার জন্য বড় অপরাধ! আমি মাওলানা সাহেবের সঙ্গে ওয়াদা করলাম। আহমদ ভাই! নেশা আমার এমন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল যে, আমি ভাবতাম, এই অভ্যাস আমার জীবনসাথী হয়ে গেছে। আমি ভাবতেও পারতাম না, নেশার ছাড়ার ইচ্ছা করার হিম্মত আমার হবে! কিন্তু হযরতের সামনে আমি যখন ওয়াদা করলাম তখন এই নেশা ছাড়াটা আমার জন্য একদম সহজ হয়ে গেল। সম্ভবত এ আমার ঈমানের বরকত ছিল। আমার আল্লাহ আমাকে হিম্মত দিলেন, আর এই অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু বহু অন্যায় ও মন্দ থেকে বাঁচায়নি বরং আমার দিলে এ কথা বসে গিয়েছে যে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে বিরাট হিম্মত দান করেছেন। পাক্কা এরাদা করত মানুষ অনেক বড় থেকে বড় কাজ করতে পারে। এই প্রত্যয় নিয়ে আমি জানি না কত মানুষকে নেশা, বিড়ি, সিগারেট ছাড়িয়েছি। পাঁচ-ছয় জনকে জুয়া ও তাস ছাড়িয়েছি, দু’জনকে মহিলাদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ত্যাগ করিয়েছি। সব আমার আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ। মাওলানা সাহেব আমাকে মীরাট পাঠিয়ে আমার এফিডেভিট করিয়েছেন। ঘটনাক্রমে পরদিন ফুলাত থেকে জামা’আত যাচ্ছিল। আমি তাঁদের সাথে চলে যাই। সেখানে নামাযসহ অন্যান্য জিনিস শিখি। এরপর চিল্লা পুরো করে ফুলাত ফিরে আসি। হযরতের সঙ্গে সাক্ষৎ ঘটে। হযরত জিজ্ঞেস করেন, এই জীবন ভাল না ইসলাম-পূর্ব জীবন? আমি বলি যে, হযরত! আমি তো অনেক শান্তি পেয়েছি। এই চল্লিশ দিনে নেশা তো দূরের কথা কোন নেশাখোরও আমার পাশ দিয়ে যায় নি! আর আমার স্বাস্থ্যও ভাল হয়ে গেছে। আমার এই জীবন তো খুব ভাল লেগেছে। হযরত জিজ্ঞেস করলেন, এখন কোথায় থাকতে চাও? আমি বললাম, আপনি যেখানে বলবেন। তিনি আমার লেখাপড়া সম্পর্কে জানতে চান। আমি বলি। তিনি বললেন, পড়াতে পারবে? আমি বলি, ছোট বাচ্চাদের পড়াতে পারি। হযরত আমাকে সোনীপথে পাঠিয়ে দেন।

এক বছর পর সকোতীতে আমার বিয়ে হয়। আমার বিয়ে আলহামদুলিল্লাহ! খুব দীনদার ও লেখাপড়া জানা মেয়ের সঙ্গে হয়। তারা সকোতী টাণ্ডার অধিবাসী। সকোতী টাণ্ডায় আমাদের বহু হিন্দু আত্মীয়-স্বজন থাকে। এই চিন্তায় যে তারা না জানি কোন ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে। হযরত আমার বিয়ের প্রোগ্রাম খাতুলীতে আমার সাতুর ঘর থেকে বানান। তারা মেয়ে নিয়ে খাতুলী আসেন। দু’তিনজন মানুষ নিয়ে আমাকেসহ খাতুলী যান এবং আলহামদুলিল্লাহ সহজ-সরল অনাড়ম্বরপূর্ণভাবে সুন্নত মুতাবিক বিয়ে ও বিয়ে পরবর্তী রুখসতী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আমার পিতাও আমার সাথে আমার বিয়েতে শরীক ছিলেন। তিনি খুব খুশি ছিলেন। হযরত মাওলানার (কালীম সাহেবের) বারবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছিলেন আর বলছিলেন, আপনি আমার ছেলেকে শুধরে দিয়েছেন। তার কারণে গোটা এলাকা পেরেশান ছিল। আমরা ছিলাম অসহায়। ফুলাতে রুখসতী অনুষ্ঠান হলে আমার মা’ও আসেন। আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি বারবার আমার স্ত্রীর মাথায় চুমু খাচ্ছিলেন আর বলছিলেন কেমনতরো সুমনী বেউ আমার মালিক আমাকে দিয়েছেন। আমার স্ত্রীও দু’দিনের বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমার মা’র খুব খেদমত করেন। প্রথমেই বেশ ভাল পরিবারে বিয়ে হওয়ায় আমার ভিত্তি মজবুত হয় এবং আমার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে ইসলামের দাওয়াত দেবার ক্ষেত্রে বিরাট শক্তি পাই। আমার পিতা যখন জানতে পারলেন যে, মাওলানা সাহেব সকোতীতে আমাদের আত্মীয়-স্বজনের ফেতনার আশংকায় ভয় পেয়ে খাতুলীতে মেয়ে এনে বিয়ে পড়িয়েছেন তখন তিনি মাওলানা সাহেবকে বলেন, মাওলানা সাহেব! আপনি যদি প্রথমেই আমাকে বলতেন, আমরা কারুর ঘেরাওর মধ্যে থাকতাম না। ঐ বেচারাদের ঘর থেকে বের করেছেন। আমরা নিজেরাই বরযাত্রী নিয়ে সকোতী যেতাম। আমার ছেলে কোন অন্যায় তো করে নি। মুসলমান হয়েছে তো কী হয়েছে? সে তো ভালই করেছে! কী ছিল আর কী হয়েছে? আমি সাত পুরুষ পর্যন্ত আপনার অনুগ্রহ শোধ করতে পারব না। আমার গ্রামের লোকেরা তার মুসলমান হবার পর পঞ্চায়েত বসিয়েছে যে, তোমার ছেলে ধর্মভ্রষ্ট হয়ে গেছে। তার ওপর কঠোর হও, তাকে শাসন কর। আমি তাদেরকে সাফ সাফ বলে দিয়েছি, সে ধর্মভ্রষ্ট হয়নি বরং ধার্মিক হয়েছে। ধর্ম যার যার ব্যাপার। আমি আপনাদের ভেতর কারুর দয়ায় খাই না। যদি বেশি বাড়াবাড়ি করবে তো ক্ষেত-খামার ও বাড়ি-ঘর বিক্রি করে আমিও পরশু যাচ্ছি এবং অমার ছেলেদের নিয়ে আমিও মুসলমান হয়ে যাব। যখন এ রকম অবাধ্য ও বেঁকে যাওয়া একজন মানুষ মুসলমানরা এভাবে শুধরে দিয়েছে, সজ্জনে পরিণত করেছে তখন আমার মধ্যেও সংশোধন আসবে। কিছু লোক কিছুটা ক্রোধানি¦ত হয়ে গালি দিতে থাকে। আমি তখন পঞ্চায়েত থেকে উঠে চলে আসি। আমি বলি এখনই এস.পি.এর কাছে গিয়ে রিপোর্ট লেখাব। কিছু লোক আমাকে বাধা দিল এবং এরপর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে লাগল যে, আমরা তোমার ভালর জন্য পঞ্চায়েত করছিলাম। মানুষের মধ্যে হিম্মত থাকা দরকার। আমি যখন গ্রামের লোকদের ভয় পাই না তখন সকোতীওয়ালাদের ভয় কিসের? হযরত বললেন, ভয় তো আমরাও পাই না। কিন্তু বিয়েতে কোন কথা হলে এর স্বাদ নষ্ট হত।
এখন আমি আমার স্ত্রীর সাথে সোনীপথে থাকছি। আমার প্রতিবেশীরা খুবই ভাল লোক। সকলেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে এবং আমাকে সম্মান করে। তারা আমাকে খুব ভালবাসে। আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে। আসলে আমি যখন সোনীপথে আসি তখন মাদরাসার লোকেরা আমার জন্য ঈদগাহ কলোনীতে ভাড়ায় একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সবাই জানত, দু’মাস আগে আমি ইসলাম কবুল করেছি।

নামাযের পাবন্দী ও তসবীহ-তাহলীল আদায় করতে দেখে লোকে লজ্জা পায় আমাকে। আমার স্ত্রীকে নিয়ে মহিলাদের মধ্যে তা’লীম শুরু করেছি। আমি নিয়মিত গাশ্ত করাতাম। ক্রমান¦য়ে আমার প্রতিবেশীরা নামায পড়তে শুরু করেছে। বহু বাচ্চাকে আমি মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ! বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক নামাযের পাবন্দ হয়ে গেছে। তারা আমাকে খুব সম্মান করে। মহল্লা ও মাদরাসার লোকেরা আমাকে যেভাবে ভালবাসে সেই ভালবাসা আমি আমার নিজের ঘরের লোকদের থেকেও পাইনি। এ শুধুই আমার আল্লাহর মেহেরবানী এবং আমার ঈমানের বদৌলতে।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম কবুলের পর আপনাকে কোন ধরনের পেরেশানীর সম্মুখীন হতে হয়েছে?

তৈয়ব: আহমদ ভাই! আমার হযরত আমাকে কলেমা পড়িয়েছিলেন। সে সময় তিনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে, আসলে ঈমান ও ইসলাম নিজে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে থাকা এবং অন্যকে নিজের অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে রাখার নাম। ইসলাম মানেই শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আহমদ ভাই! আমি এটা বলতে ভুলে গেছি যে, হযরত বলেছেন, শান্তি ও নিরাপত্তা ঈমান ও ইসলাম থেকেই এসেছে। ঈমান ও ইসলাম ব্যতিরেকে দুনিয়ার কোন মানুষের না শান্তি ও নিরাপত্তা নসীব হতে পারে, আর না দুনিয়ায় ঈমান ও ইসলাম ছাড়া কারো শান্তি ও নিরাপত্তা মিলতে পারে। এতে আমি হযরতকে বলেছিলাম যে, সমগ্র দুনিয়ার পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে যেসব খবর প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় তাতে বোঝা যায় যে, মুসলমানরা সারা দুনিয়ার স্বস্তি ধ্বংস করে দিয়েছে। এবং তারা ইসলাম ও জিহাদের দ্বারা গোটা দুনিয়াকে আতংকের অগ্নিগর্ভে নিক্ষেপ করছে। মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন, এটা ভুল ও মিথ্যা অপপ্রচার। কিছু অত্যুৎসাহী মুসলমানের ভুল বোঝাবুঝির মাধ্যমে কতকগুলো সিদ্ধান্তের দ্বারা ফায়দা তুলে ইসলামবিরোধী মানুষ ইসলাম ও মুসলমানদের ভুল চিত্র পেশ করছে। এতদসত্ত্বেও ইসলাম দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করছে। মাওলানা সাহেব চতুর্দিকে উপবিষ্ট গোটা দশেক লোকের সঙ্গে আমাকে পরিচিত করান যে, এরা সবাই সেই দিনগুলোতেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ইসলামের রহমতের ছায়ায় এসেছে। তিনি কুরআন পাকের আয়াত পড়ে বলেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে গোটা মানবাজাতির হত্যার তুল্য বলেছেন এবং কুরআন পাক পরিষ্কার ঘোষণা করেছে:

“আল্লাহ্ নিশ্চিয়ই অরাজকতাকে পছন্দ করেন না।”

কুরআনকে যারা মানে তারা সন্ত্রাসী হতে পারে না। ইসলাম রহমত ও নিরাপত্তার ধর্ম। মাওলানা সাহেব বলেন, আমরা তো পুরুষানুক্রমে মুসলমান। এজন্য পুরানো মুসলমানরা কেবল নামের ও প্রথাসিদ্ধ মুসলমান। যখন কোন শরীরে রক্ত খারাপ হয়ে যায় তখন জীবনকে স্বাভাবিকের ওপর আনতে এবং স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য রক্তের প্রয়োজন। এই দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নতুন রক্তের অর্থাৎ ভেবে-চিন্তে কুরআন মজীদের ইসলাম গ্রহণকারী নওমুসলিমের প্রয়োজন। এজন্য আপনাদের ওপর যিম্মাদারি বেশি এবং আল্লাহর শোকর যে নতুন লোকে এই কাজ করছে। তিনি বলেন যে, ইরাক ও সৌদি আরবে মুসলমানদের হত্যাকারী এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধরত মার্কিন সৈন্যরা ইসলাম গ্রহণ করছে, মুসলমান হচ্ছে। তাদের ইসলাম কেমন তার কিছু কাহিনী তিনি শোনান।

আমি বলছিলাম যে, আল্লাহর শোকর, আমি ইসলামে শান্তি ও নিরাপত্তা পেয়েছি। ইসলামের আগে আমি ঘরের ছায়া থেকে মাহরুম ছিলাম। মানুষকে জ্বালাতন করতাম, পীড়ন করতাম, বনে-জঙ্গলে থাকতাম, লড়াই করতাম, মারামারি করতাম। ঝগড়া-ফাসাদ ছিল আমার কাজ আর মুসলমান হবার পর দুনিয়ার যেই ঘরেই যাই না কেন আমি ভালবাসা পাই, স্নেহ পাই। মানুষ আমাকে সম্মান করে। সম্ভবত আমি এমন মুসলমান যে, ইসলাম গ্রহণের পর আমি কোন পেরেশানীর সম্মুখীন হইনি। আমার হিন্দু খান্দানের পক্ষ থেকে কোনরূপ বিরোধিতার পরিবর্তে আমি সম্মানিত হয়েছি। এখন তারা আমার কথা সম্মানের সঙ্গে শোনে। বিপদ-আপদে ও সমস্যা-সংকটে পরামর্শ নেয়। আমার আল্লাহ আমার মত একজন বখে যাওয়াকে কেমন শুধরে দিয়েছেন। আমি আমার জানও যদি দিয়ে দিই তবুও এর শোকর আদায় করতে পারব না। আল্লাহর শোকর যে, আমাকে কোন রকম পেরেশানীর সম্মুখীন হতে হয়নি। কেননা আমার প্রশিক্ষণ ভাল আলেম-উলামার ওপর ন্যস্ত ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর আমি যেই প্রশান্তি ও তৃপ্তি পেয়েছি সে সম্পর্কে আমি কখনো ভাবতেও পারিনি, পারতাম না। আল্লাহ তা’আলা আমার জন্য তাঁর নে’মতের দরজা খুলে রেখেছেন। আমি তো কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি যে, আমার জীবন এত সুন্দর হবে। আমি দো’আ করি, আল্লাহ যেন সকল মুসলমানকে আমার মত জীবন দান করেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পিতা-মাতার সঙ্গে কি দেখা-সাক্ষাৎ হয়? তাদের কখনো দাওয়াত দিয়েছেন?

তৈয়ব: আলহামদুলিল্লাহ! আমি এবং আমার স্ত্রী দু’জনেই বাড়ি যাই। আমার মা’র ওপর তার বাড়ির লোকদের প্রেসার আছে। নইলে তিনি ভেতর থেকে মুসলমান হয়ে গেছেন। একবার তাঁকে আমি কলেমাও পড়িয়েছি। আমার এক ভাই হযরতের কাছে আসেন। সে হযরতকে খুব ভালবাসে। আমার মনে হয় সম্ভবত হযরত তাকে কলেমা পড়িয়ে দিয়েছেন। এখন সে মন্দিরে একেবারেই যায় না। তার ছোটটি আলহামদুলিল্লাহ সোনীপথ এসেছে এবং একজন ভ্রাতুস্পুত্রসহ দু’জনেই ইসলাম গ্রহণ করেছে। একজন চিল্লায় গেছে, আরেকজন কিছুদিন পর ইনশাআল্লাহ জামা’আতে যাবে। আমার আশা, আমার বহু বন্ধু-বান্ধবও মুসলমান হয়ে যাবে। তারা নিজেরা আমার অবস্থাদৃষ্টে হযরতের সঙ্গে দেখা করতে খুব আগ্রহী। আপনিও দো’আ করুন যখনই আমার ইসলামের কথা মনে হয় আমার সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের ও বন্ধু-বান্ধবদের কথা মনে হয়। আমি অন্তর দিয়ে তাদের হেদায়াতের জন্য দো’আ করি।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের মাধ্যমে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কোন পয়গাম দিতে চাইবেন?

তৈয়ব: হাঁ, এই পয়গাম দিতে চাইব যে, ইসলামের ভেতর খুবই শান্তি রয়েছে। ইসলাম এক বিরাট বড় নেয়ামত। আর যে নিয়মিত নামায পড়বে, এর পাবন্দী করবে সে এই নেয়ামত লাভ করবে। আর যে ফর্মালিটি পূরণ করবে সে এর থেকে বঞ্চিত থাকবে। সে কিছুই পাবে না। আমি এই পয়গামই দিতে চাইব যে, আমরা সকল মুসলমান নামাযের পাবন্দী করি এবং এর মূল্যায়ন করি। ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকি, আহ্বান জানাই। জানা নেই আল্লাহ তা’আলা কাকে মাধ্যম বানিয়ে সাফল্য ও কামিয়াবীর রাস্তা খুলে দেন। সবচেয়ে’ জরুরী কথা হল এই, দুনিয়াতে শান্তি, নিরাপত্তা ও দুশ্চিন্তাহীন জীবন পেতে হলে দুনিয়ার মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আসা প্রয়োজন। এ কেমন জুলুম, যে’ মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্মকে ধ্বংস, সন্ত্রাস মনে করতে শুরু করেছে। এতে শয়তান ও শয়তানের চেলাদের মানুষকে ইসলাম ও জান্নাত থেকে দূরে রাখার চক্রান্তের ভূমিকা রয়েছে। আর মুসলমানদের অবস্থাও তাদেরকে সাহায্য করছে। আপনি এলাকার জেলগুলোতে গিয়ে দেখুন, দেখবেন অধিকাংশ কয়েদী মুসলমান। অথচ জনসংখ্যার অধিকাংশ হিন্দু। আমি যখন দু’একবার মুজাফফর নগর জেলে গিয়েছি তো সেখানে এটা দেখে বিস্মিত হয়েছি যে, কয়েদীদের ৭৬% মুসলমান। যেখানে আমাদের জেলায় মুসলমানের সংখ্যা সম্ভবত শতকরা ৩০ অথবা ৩৫% হবে। মুসলমানদের এই খারাপ ক্রিয়াকাণ্ডের আড়ালে ষড়যন্ত্রকারী লোকেরা লোকের সামনে থেকে ইসলামকে দূরে রাখার জন্য এটা করে থাকে। এর ফলে দুনিয়াটা শান্তি ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমার আবেদন, প্রত্যেক মু’মিনের তার মর্যাদা বোঝা দরকার, বোঝা উচিত। কেননা সে ঈমানদার ও মুসলমান। সেজন্য সে যেখানেই থাকুক তাকে খেয়াল রাখতে হবে সে রহমাতুল্লিল আলামীন নবী (সা.)-এর উম্মত। তার নিজেকে শান্তি ও নিরাপত্তার বাহক মনে করা উচিত। কমপক্ষে সে যেখানে থাকবে মানুষকে অনিষ্ট ও মন্দ থেকে বাঁচাবে, অন্যের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার চেষ্টা করবে। যখন অন্যের চিন্তা করবে তখন সে নিজে সবসময় প্রত্যেকের মৃত্যু যেন ঈমানের ওপর হয় সেজন্য চিন্তা করবে। আমরা যদি আমাদের ইসলামের মর্ম বুঝি আর মানুষকে আসসালামু আলাইকুম-এর অর্থ ও মর্ম বুঝিয়ে দেই যে, ইসলাম সালামকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার নির্দেশ দিয়েছে, তাহলে ব্যস! ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকৃত চিত্র মানুষের সামনে এসে যাবে। এ দিকটা নিয়ে খুব ভাবা দরকার। ইসলামের অর্থই তো হল এই যে, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। চতুর্দিকে থেকে তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। একে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম দিয়েছেন। এরপর এই দ্বীন যারা মানে, অনুসরণ করে তারা কিভাবে জালিম হতে পারে? কীভাবে সন্ত্রাসী হতে পারে?

আহমদ আওয়াহ: শুকরিয়া, জাযাকাল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম ও রাহমাতুল্লাহ।

তৈয়ব: ওয়া আলায়কুমুস-সালাম ও রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মার্চ ২০০০ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ