দাওয়াতী কজে জাগতিক লোভ দেখানোও প্রশংসনীয়

ধরে নিন কেউ বিয়ের উদ্দেশ্যে বা জাগতিক কোনো লোভে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এরপরও তা যাচাই-বাছাই করার সুযোগ নেই। কারণ জাগতিক লোভ দিয়ে ভাইয়ের কল্যাণ ও তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য দাওয়াত দেওয়াও প্রশংসনীয়। আম্বিয়া আ. এর ঘটনাবলি থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে হযরত নুহ আ. তার কওমকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মাল ও সন্তান দিয়ে সাহায্যের আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

{ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا}

  অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি। 

 এই আয়াতে মাল, সন্তান, বাগান, নদী এর লোভ দেখিয়ে তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া প্রমাণিত হয়। এমনকি শরিয়তে যাকাতের অষ্টম প্রকারের যাকাত প্রদানের ক্ষেত্র হলো তালিফে কলব। অর্থাৎ অমুসলিমদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাদেরকে যাকাত প্রদানে নিয়ম ইসলামে রয়েছে। কাউকে লোভ দেখিয়ে দাওয়াত দেওয়া এটা তার প্রতি অনুগ্রহ করা, তাকে কঠিন মসিবত থেকে মুক্তি দান করা এটা তার প্রতি এহসান বরং চূড়ান্ত পর্যায়ের এহসান।

এজন্য অনার্থক যাছাই-বাছাই, সন্দেহ-শোবাহাত তার এখলাস ও নিয়তের যাচাইয়ের পরিবর্তে তার এসলাহের ফিকির করা। দায়ীদের অভিজ্ঞতা হলো, অধিকাংশ সময় জাগতিক কারণে দুনিয়াবী সুবিধা অর্জনের জন্য ইসলাম গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে মুখলেস মুসলমান হয়ে যায়। এ বিষয়ে কিছু ঘটনা পেশ করছি।

কিছু ঘটনা

হরিয়ানার একজন বড় অফিসার। তার নাম চোপড়া। তিনি সেলটেক্সে চাকরি করতেন। তার স্ত্রীর সাথে কঠিন অমিল থাকায় বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ায়। আইনজীবী তাকে পরামর্শ দিলেন, আপনি কোথাও থেকে ইসলাম গ্রহণের একটি সর্টিফিকেট বানিয়ে নিয়ে আসুন। সেই সার্টিফিকেট আদালতে উপস্থিত করলে আপনার স্ত্রীর দাবি-দাওয়া থেকে বাঁচতে পারেন। লোকটি সার্টিফিকেট খোঁজাখুঁজি করতে লাগলেন। একজন তার কাছে বিশ হাজার রুপি চেয়েছে। এমতাবস্থায় কেউ তাকে ফুলাতের ঠিকানা দেয়। সময়টি ছিল রমজানের শেষ দশদিন। আমরা সাথীদের সাথে মসজিদে এতেকাফে ছিলাম। লোকটি তার গার্ডকে সাথে নিয়ে নিজে একটি রিভলবার নিয়ে ফুলাতে চলে এলেন। মাগরিবের সময় ছিল। আমরা তাকে ইফতারে শরিক করে নিলাম। মাগরিবের পর আমাকে বললেন, আমার ইসলাম গ্রহণের একটি সার্টিফিকেট প্রয়োজন। শুধু দেখানোর জন্য। আমি বললাম আদালতে আপনি কী বলবেন? লোকটি বললেন, আমি বলব আমি মুসলমান হয়ে গিয়েছি। অর্থাৎ মন থেকে মুসলমান হয়েছি। আমি বললাম তাহলে আপনি আমাদেরকে কেন বলছেন দেখানোর জন্য মুসলমান হতে চাই। আপনি কালেমা পড়ুন আর আমাদেরকে বলুন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। লোকটি এতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তার নাম রাখা হলো আব্দুল্লাহ। রাতে আমাদের সাথেই মসজিদে ছিলেন। সকালে আমরা তাকে কাগজ ও সার্র্টিফিকেট বানিয়ে দিই। মসজিদের পরিবেশ তার খুব ভালো লাগে। সকালে বললেন, আমাকে আরও একদিন মসজিদে আপনাদের সাথে থাকার অনুমতি দিন। আমরা বললাম সুবহানাল্লাহ অবশ্যই। মসজিদে অনেক লোক এতেকাফে ছিল, লোকটি বিকালে খাতুলি গিয়ে সবার জন্য মিষ্টি নিয়ে এলেন, ইসলাম গ্রহণের আনন্দে তিনি মিষ্টি বণ্টন করলেনন। এরপর চলে গেলেন।

রমজানের পর একদিন সনিপথ কাসিমুল উলুম মাদরাসায় এলেন। মাদরাসার সকল ছাত্রকে তার ইসলাম গ্রহণের মিষ্টি খাওয়ালেন। তিনি বলে গিয়েছিলেন, স্ত্রীর মামলা থেকে বাঁচার জন্য একটি সার্টিফিকেট প্রয়োজন, তাই কোনো আশা ছিল না বলে তার সাথে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। বাগপতে আমাদের প্রোগ্রাম ছিল, তিনি ও প্রোগ্রামের খবর পেয়ে আমাদের আগেই মেজবানের বাসায় উপস্থিত হয়ে যান। খুব হ্যাংলা পাতলা হয়ে গিয়েছেন, তাকে দেখে বললাম চপড়াজি কী খবর আপনার, এই অবস্থা কেন? বললেন, জনাব আপনি আমাকে চপড়া না বলে আব্দুল্লাহ বলুন। বললেন, ঈদের পরে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়, পনের দিন আমাকে আইসিইউতে থাকতে হয়, এখন মোটামুটি সুস্থ। খাবারের ক্ষেত্রে কিছু বাছবিচার ছিল। বললেন, আপনার সাথে তো সবকিছুই খাবো। খানা খাওয়ার পর আমি নিজেই খুব বিস্মিত হলাম। তিনি যখন বললেন, আমি যদি এই ধর্ম গ্রহণ না করতাম, মুসলমান না হতাম তাহলে এই কঠিন সমস্যা থেকে বাঁচতে পারতাম না। কারণ আগে আমি মৃত্যুকে খুব ভয় পেতাম। আপনি তো বলেছিলেন মৃতুর পর নিশ্চিত জান্নাত, ইসলাম গ্রহণ করার পর মনে হলো, পরকালের চিন্তা তো আমার নেই, তাই অন্তরের ব্যথায়ও আমার পেরেশানী ছিল না। তিনি এও বললেন, যেদিন থেকে আমি কালেমা পড়েছি, আজ পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাযও কাজা হয়নি। আমি পুরো নামায শিখে ফেলেছি। আর সার্টিফিকেট আদালতে আর পেশ করিনি। কারণ আল্লাহর জন্য যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন এর দ্বারা দুনিয়াবী ফায়দা উঠানো ঠিক মনে করিনি।

   আরও একটি ঘটনা শুনুন। কয়েক বছর আগে আমার মুর্শিদ ও মুরব্বী হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। সেখানে মাখদুম বুযুর্গ সাথী মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসানী দা. বা. -এর সাহেবের সাথেও সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, আপনার একটি শিকারি রয়েছে। জিজ্ঞাসার পরে বললেন, কে সি শিখসেনা নামে এক যুবক কয়েক দিন ধরে আসছেন। তিনি সাইকোলজিতে পিএইচডি করেছেন। এখন তিনি পেরা সাইকোলজিতে গবেষণা করতে চান। (দায়ীদের জন্য একটি বাস্তবতা জানা জরুরী। আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে স্বভাবতই এক ধরনের তৃঞ্চা ও আকাক্সক্ষা রেখেছেন, সে এমন শক্তির সামনে আত্মসমর্পণ করে, পূজা করে যার কল্পনাও আসে না বা জ্ঞানবহির্ভূত। তাই মানুষ অকল্পনীয় কিছু জিনিস দেখলে তার প্রতি দুর্বল হয়ে যায়, এতে সে প্রভাবিত হয়। তার দিকে মানুষের অন্তর ঝুঁকে যায়। পশ্চিমা দেশগুলোর থেকে যেসব মাসিক পত্রিকা ম্যাগাজিন বের হয় এবং নভেল-উপন্যাসগুলোতে দেখবেন, বড় বড় শিক্ষিত লোকেরা, বড় বিজ্ঞানীরা, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকাবেন, তারা জিন, ভূত, ডায়েন, চিড়িয়েলের মতো জিনিসের ওপর গবেষণার জন্য একটি বিষয় আবিষ্কার করেছেন, যেসব জিনিস সাধারণ মানুষের আকল-বুদ্ধিতে আসে না। এটাকে প্যারা সাইকোলজি বলা হয়। এই ফন মানুষের আকল ও ধারণার বাইরে। এটা খালেক ও মালিকের পূজার উপাসনার জন্য তলব ও আকাক্সক্ষার ফল।)

    মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসানী বললেন, তিনি এগুলো গবেষণার জন্য জার্মানি বা ফ্রান্সে যাবেন। তবে এর আগে কোনো জিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চান। আপনি আসবেন জানতে পেরে রবিবার তাকে রায়বেরেলীতে আসতে বলেছি। এই ওসিলায় তার সাথে কিছু দাওয়াত হয়ে যাক। হযরত মাওলানার সাথে আমরা রায়বেরেলীতে পৌঁছলাম। রবিবারে খাবার খেয়ে আমরা শুয়ে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে এস্তেঞ্জার প্রয়োজন থেকে ফারেগ হয়ে ফিরে এসে দেখলাম একজন যুবক দাঁড়ানো। ভাবলাম তিনি হয়তো কে সি শিখসেনা হতে পারেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি কে সি শিখসেনা? একজন অপরিচিত লোক থেকে এধরনের কথা শুনে চমকে গিয়ে বললেন, আপনি কীভাবে জানতে পারলেন? আমি বললাম, আসুন ভেতরে আসুন। তাকে ভেতরে নিয়ে বসালাম, পানি পান করালাম। এরপর বললাম, আমার অদৃশ্যের কোনো জ্ঞান নেই, আল্লাহ ছাড়া এই জ্ঞান আর কারও থাকে না। আমাকে মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসানী সাহেব আপনার আগমনের কথা বলেছিলেন, আমি ভাবলাম হতে পারে আপনিই সেই লোক, তাই ধারণা করেই জিজ্ঞাসা করলাম। পরিষ্কার কথা শুনে তিনি খুব প্রভাবিত হলেন। আমি বললাম, আমি আপনার কী খেদমত করতে পারি? তিনি বললেন, গবেষণার জন্য বিদেশ যাওয়ার আগে আমি কোনো জিনের সাথে দেখা করতে চাই। যাতে এই সৃষ্টিজীবের বাস্তবতা জানতে পারি। অনেক আলেমের কাছে গিয়েছি, অনেক আমল করেছি, চিল্লাকাশি করেছি, তাবিজও শিখেছি, চিকিৎসাও করছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো জিনের সাক্ষাৎ হয়নি। আমার সাথে আরও কয়েকজন সাথী আছে যারা এই বিষয়ে গবেষণা করতে চায়।

   আমি তাকে বললাম, প্রথমত জিনকে অধীনস্থ করা এবং অধীনস্থ করার জন্য আমল করা ইসলামে জায়েজ নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা যেই সৃষ্টিজীবকে অধীন হওয়ার জন্য সৃষ্টি করেননি, তাকে অধীনস্থ করা জুলুম। দ্বিতীয়ত জিন সাধন করার জন্য যেসব আমল করা হয় সেগুলোর ওপর প্রভাব সৃষ্টির জন্য ঈমান শর্ত। ঈমান ছাড়া এই আমলে কোনো প্রভাব হবে না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আমি এর জন্য ইসলাম গ্রহণ করতেও প্রস্তুত। জিন অধীনস্থ করার আমলে প্রভাব আনার জন্য, আপনাকে মুসলমান বানাবো, এটা আমার ঈমানী আত্মমর্যাদাবোধ মেনে নেয় না।

   এর জন্য একটি পদ্ধতি এই হতে পারে, আমি আপনাকে ইসলামী কিছু বইপত্র দিই, আপনি সেগুলো পড়েন। এতে যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, ইসলাম গ্রহণ করা সব মানুষের জন্য খুবই জরুরী, তাহলে আপনার সাথে ওয়াদা করছি আপনাকে কোনো জিনের সাথে দেখা করিয়ে দেব ইনশাআল্লাহ। আপনার সাথে কয়েকদিন থাকবে আপনি তাহকিক করে নেবেন। তিনি প্রস্তুত হয়ে গেলেন, অল্প সময় ইসলাম সম্পর্কে তার সাথে কিছু কথা হলো। তাকে কিছু বইয়ের নাম লিখে দিলাম। তিনি যাওয়ার সময় ওয়াদা করলেন, আগামী মাসে ফুলাত আসবেন, তার তিন সাথী সাথে থাকবেন। তার বাবা এলাহাবাদে এইচএইচপি ছিলেন। তিনি জানান, তার বাবা বদলি হয়ে গেছেন। বললেন, আমাদের নতুন ঠিকানায় আপনাকে চিঠি লিখব। আগস্ট মাস চলে গেল, তিনি এলেন না। কোনো পত্রও পেলাম না। ডিসেম্বরে আবর তাকিয়া রায়বেরেলী গেলাম, মাগরিবের নামাজ শেষে একজন যুবক এলেন, গায়ে পাঞ্জাবি, মুখে হালকা দাড়ি। যুবকটি আমাকে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তাকে চিনতে পারিনি। তিনি বললেন, আপনি কি আমাকে চিনতে পারেননি? আমি আব্দুর রহমান, (পূর্বের কে সি শিখসেনা।) সেই বইগুলো আমি পড়েছি। আর এক সপ্তাহ পর হযরতের কাছে এসে কালেমা পড়েছি। আমি খুব খুশি হলাম, দুই দিন তার সাথেই ছিলাম। মনে করেছি তিনি নিজেই জিনের কথা জিজ্ঞাসা করবেন, কিন্তু তিনি কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। আমি দুদিন পর ওয়াদা পূরণ হিসেবে বললাম আপনি গবেষণার জন্য কোনো জিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলে যেকোনো দিন দিল্লিতে চলে আসবেন, আমি চেষ্টা করব। লোকটি বললেন, ব্যস. রিসার্চ হয়ে গিয়েছে, এখন আর কোনো জিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই না। আমি নিয়ত করেছি আমার জীবনের বাকি সময়টুকু ইসলাম প্রচারের জন্য ওয়াকফ করে দেব। এরচেয়ে বড় আর কোনো গবেষণা নেই। কিছুদিন আগেও দিল্লিতে আমার সাথে সাক্ষাৎ করে গিয়েছেন। আর তার দাওয়াতী কারগুজারী শুনিয়েছেন। খুব বিস্মিত হলাম, কত মানুষ তার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেছে। ঈর্ষাও এলো, খুশিও হলাম। স্ত্রীর পাওনা থেকে বাঁচার জন্য আর জিনের সাথে সাক্ষাতের জন্য মুসলমান হয়ে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে যারা নিষ্ঠার সাথে ইসলাম গ্রহণ করতে আসছে তাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, সন্দেহ করে কালেমা পড়াতে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ আছে কি?

মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট। জীবনের কোনো ভরসা নেই। জানা নেই ইসলাম গ্রহণকারী সামনে এক মুহূর্ত বাঁচবে কি না। এও জানা নেই আমরা এই দুনিয়ার কয়দিনের মেহমান। তাই কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করতে আসে অথবা আপনার দাওয়াতে প্রস্তুত হয়েছে বা জানতে পারলেন অমুক লোক ইসলাম গ্রহণ করতে চায়, তাহলে প্রথমেই সকল কাজ বাদ দিয়ে তাকে কালিমা পড়ানো উচিত।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব দা,বা,

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ