দাওয়াতী মিশনের প্রসিদ্ধিও প্রয়োজন

ইসলাম প্রচারের জন্য প্রচার মাধ্যমগুলো পূর্ণ ব্যবহার করা উচিত। আমাদের দেমাগ থেকে এই ভুল ধারণা দূর করে ফেলতে হবে যে, খুব গোপনীয়তা ও চুপচুাপ এই দাওয়াতী কাজ করতে হবে। শুধু মানুষ দেখানোর জন্য নিজ আমল নষ্ট করার জন্য কাজ করা তো অবশ্যই রিয়া। কিন্তু দাওয়াতী কাজের জন্য যেখানে যেখানে ইসলামের প্রচার প্রয়োজন সেখানে প্রসিদ্ধিও প্রয়োজন। এই উম্মত এবং উত্তম জাতির প্রতিটি ব্যক্তির কাজ হলো, শেষ নবীর পয়গাম ও ইসলামকে মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া। নিজ দাওয়াতী অবস্থান প্রসিদ্ধিও সাধারণ মানুষের জন্য জরুরী। সীরাত অধ্যয়ন দ্বারা বোঝা যায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন, সেখানে একথা প্রসিদ্ধি হওয়া জরুরী মনে করতেন যে, আমরা দাওয়াতী কাজ করি। আর দাওয়াত হলো আমাদের মিশন। কুরআন হাকিম স্পষ্ট ঘোষণা করেছে।

قل يا ايها الناس اني رسول الله اليكم جميعا

শুরু যুগে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে وانذر عشيرتك الاقربين এর নির্দেশে নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ করা হয়েছে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাওয়াতের ব্যবস্থা করলেন। নিকটতম সকল আত্মীয়কে একত্রিত করে খাবারের দাওয়াত দিলেন। আর তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। বিশেষ কিছু আত্মীয় আবু লাহাব ইত্যাদি খুব কষ্ট পেল। কিছুদিন পর যখন কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন, মুসলমান হলেন, তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন –

 فصدع بما تؤمرواعرض عن الجاهلين

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠে ঘোষণা দিলেন يا صباحاه লোকজন এই আওয়াজ শুনে একত্রিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই কৌশলে তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন এবং পরকালের শাস্তি থেকে মানুষকে সতর্ক করলেন। কাজের শুরুতে খানা খাওয়ার দাওয়াত দিলেন, কিছুদিন পর প্রকাশ্যে দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ পেলেন। পাহাড়ে উঠে ইয়া সাবাহাহ্ আওয়াজ দিলেন। সে সময় মুসলমান নেই বললেই চলে। শক্তির দিকে থেকেও শূন্যের কোঠায়। এর দ্বারা বোঝা গেল ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে দাওয়াতী মিশনের প্রকাশও কাম্য ও প্রশংসনীয়। বরং পুরো আরবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে। আরব থেকে আজমে দাওয়াত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এতে মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তাই দুর্বলতা ও ইসলাম বিদ্বেষীদের বিজয়ের ভয়ে দাওয়াতী মিশনকে গোপনে রাখা কখনও কাম্য ও প্রশংসনীয় নয়।

দাওয়াতের পথে রিয়াও এখলাস

এরচেয়ে এক ধাপ বেড়ে এটাও বলা যেতে পারে, ইসলাম প্রচারের কাজ এমন মকবুল ও পছন্দনীয় কাজ, এর মধ্যে রিয়াও এক ধরনের এখলাস। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কোনো অমুসলিমের সামনে এই নিয়তে সুন্দর ব্যবহার করলেন, আমার আচরণ তার ইসলামের প্রতি আসার মাধ্যম হয়ে যাবে। আপনার অধীনস্ত ও সাথীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য তাদেরকে দেখিয়ে কোনো আমল করেন, যদিও এই কাজটি দেখানোর জন্য করা হচ্ছে, বাস্তব এই আমলই এখলাস।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবাগণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক দুআ জোর আওয়াজে পড়তেন। হ্যাঁ এই মুহাসাবাও থাকতে হবে, নিয়তে যেন এটা না ঢুকে, দাওয়াতের মেহনতে মানুষের মধ্যে আমার নাম হবে, আমার অনুসারী বাড়বে।

কালেমা পড়াতে দেরি করার অবকাশ নেই

গাইরুল্লাহর ভয়ে, মসিবতের ভয়ে অধিকাংশ মানুষ যারা ইসলাম গ্রহণ করতে প্রস্তুত, এমন লোকদেরকে কালেমা পড়াতে দেরি করি, আর বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা আর ভুলধারণা মাথায় আসতে থাকে। এই ক্ষেত্রে প্রথমে একটি মাসয়ালা মাথায় রাখা প্রয়োজন, তা হলো আপনার কাছে কেউ কালেমা পড়তে এলো। আপনি ভাবলেন তাকে কোনো বুযুর্গ বা আলেমের কাছে গিয়ে কালেমা পড়িয়ে নেব। আপনি ওই ব্যক্তিকে নিয়ে ওই বুযুর্গের কাছে যেতে যতক্ষণ সময় লাগে, এই সময়টুকু আপনি কুফরীর উপর রাজি রইলেন। আর কুফুরীর উপর রাজি থাকাও কুফুরী। কেমন যেন এতোটুকু সময় আপনিও কুফুরের ওপর লিপ্ত ছিলেন।

   বরকতের জন্য কোনো বড় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যেতে দেরি করা কুফুরী, এই দেরির অবকাশ যেখানে নেই, তাহলে অন্যান্য শঙ্কা ও ধারণার কারণে কালেমা পড়াতে দেরি করা জায়েজ হবে কীভাবে? আমরা কারও অন্তরের বিষয় দেখতে পারবো না। এরজন্য আমরা বাধ্যও না। তাই যখনই কেউ কালেমা পড়তে আসবে তখনই তাকে কালেমা পড়িয়ে দেওয়া উচিত। অনর্থক যাচাই আর এদিক ওদিকের প্রশ্ন করে কালেমা পড়াতে বিলম্ব করা উচিত না। প্রথমত, ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আগত ভাই উৎসাহ ও ভালোবাসা পাওয়ার উপযুক্ত ছিল। আর বিভিন্ন প্রশ্ন, কেন ইসলাম গ্রহণ করলেন? কীভাবে? ইত্যাদি প্রশ্ন করে তার মন ভাঙার কোনো অবকাশ নেই। এই ধারণা করা সে আবার কোনো গোয়েন্দা তো নয়? এর মধ্যে কোনো চক্রান্ত তো নেই! কোনো লোভে পরে ইসলাম গ্রহণ করছে না তো? এসব ধারণা একেবারেই অনর্থক। একজন মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় দিয়ে তার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের কল্যাণের কাজ করেছেন। ইসলামের দাওয়াত পাওয়া তার অধিকার। যা আপনি তাকে দিচ্ছেন। এতোদিন পর্যন্ত তার হক তার কাছে না পৌঁছানোর জন্য যে, আপনি তার হক মারলেন তখন কোনো ভয় ছিল না। এখন হক দেওয়ার সময় এসেছে এখন ভয় পাচ্ছেন। সুবহানাল্লাহ! ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি যদি চক্রান্তও করে, গোপন কোনো এজেন্টও হয়, আপনার কুরআনের এই ওয়াদা  وكفى بالله حسيبا এবং والله يعصمك من الناس  এর ওপর কি ভরসা নেই?

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ