দাওয়াতি কাজে উদাসীনতা জাতির জন্য দুর্ঘটনা

দাওয়াতি কাজে উদাসীনতা জাতির জন্য দুর্ঘটনা
জাতির সামনে বিদ্যমান সমস্যাগুলো যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সব লাঞ্ছনার মূল কারণ হলো, যেই জাতি দাতা হিসেবে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এসেছিল, সেই জাতি আজ গ্রহণকারী মাদউতে পরিণত হয়েছে। ইজ্জত, সম্মান-মর্যাদা, বিদ্যা-বুদ্ধি ও চরিত্রের সম্পদে সুসজ্জিত উত্তম জাতি নিজেদের সম্পদ হারিয়ে ফেলর কারণেই বিধ্বস্থ ধর্ম, পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত জাতির মুখাপেক্ষী হচ্ছে। এ কারণে সে লাঞ্ছনা, অপদস্থতা,ও নীচুতার গভীর গর্তে দাফন হতে চলেছে। তারা শুধু নিজেরা অপদস্থতার শিকার হচ্ছে না বরং পুরো মানবজাতির জন্য একটি দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে। যেই জাতির অবস্থান ছিল উপরে, নামতে নামতে সে জাতি নিচু শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
দা‘য়ীজাতি যদি মাদউ (দাওয়াত গ্রহণকারী) হয়ে যায় তাহলে এটাও একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনা। এটি মুসলিম জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের শাস্তি। মানুষের জন্য এটা যদি ছোট কেয়ামত নাও হয়, কেয়ামতের লক্ষণ অবশ্যই। এই দুর্ঘটনা মানব সন্তানদের দুর্ঘটনা না হলেও ঘটনাস্থলে পতিত অন্যান্য জাতি এই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যায়। দা‘য়ীজাতি যখন তার দায়িত্ব ‘দাওয়াতকে’ ছেড়ে দিল তখন পৃথিবীতে কুফর, শিরকের সয়লাব হতে লাগল। ঈমানী ঢেউ স্তিমিত হতে লাগল। ধারাবাহিকভাবে এই অধঃপতন চূড়ান্তে পৌছতে লাগল। এভাবে এক সময় আসবে যখন পৃথিবীতে কোনো ঈমানদার অবশিষ্ট থাকবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা অনুযায়ী তখন কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পুরো দুনিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত হয় ঈমানদারদের আমল অনুযায়ী। কাফের মুশরিকদের আমলের শাস্তি দেয়া হবে মৃত্যুর পর। মুসলিম জাতি তার দাওয়াতের উদাসীনতার কারণে দুনিয়াতেই যে শাস্তি ভোগ করবে তা কল্পনাও করা যাবে না।

তৃষ্ণার্তদের তৃষ্ণা মিটানোই হলো এর সমাধান
এই মুসলিম জাতি যদি নিজ পূর্বসূরিদের মাঝে সম্মান, মর্যাদা ও বিজয় অন্বেষণ করতে চায়, তাহলে তার জন্য উচিত দা‘য়ীজাতি এবং اليد العليا উপরের হাত হয়ে থাকবে। এছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, এই উম্মতের সংশোধন ওইভাবেই হবে, যে ভাবে, যে পদ্ধতিতে পূর্ববর্তীদের সংশোধন হয়েছিল। এ বিষয়টি মানুষের ইচ্ছাধীন। সে দাতা হবে, না গ্রহীতা হবে। জাগতিক ও আর্থিক জিনিসের মধ্যেও যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাবÑ যে ব্যক্তি দাতা হতে চায়, সে যদি ফকিরও হয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে দাতা বানিয়ে দেন। আর যেই ব্যক্তি গ্রহীতা হয়, সে যত বড় ধনীই হোক না কেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে নিচের হাতের প্রতীক বানিয়ে দেন। এমন অনেক সুদখোর মহাজন আছে যাদের ধন-সম্পদের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও গরিবদের রক্ত চুষে নেয়। এমন অনেক অসচ্ছল ব্যক্তি আছে, তাদের অসচ্ছলতা সত্ত্বেও চূড়ান্তপর্যায়ের দান ও অন্যকে অনুগ্রহ করার চেষ্টা করে। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা ভিক্ষা দেয়ার জন্য অন্যের কাছ থেকে চেয়ে আনে।

শাইখ আবুল হাসান নূরী (রহ.)-এর ঘটনা
আওয়ারিফুল মা‘আরিফের লেখক শাইখ আবুল হাসান নূরী (রহ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। একবার তিনি মসজিদের বাহিরে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে হাত পাতলেন। সেখানে জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর এক মুরিদ উপস্থিত ছিল। তিনি এই ঘটনা দেখে খুবই অবাক হলেন। কারণ শাইখ আবুল হাসান নূরী (রহ.) সে যুগের বড় ওলী ছিলেন। আর তিনি গাইরুল্লাহর কাছে হাত বাড়িয়েছেন। সেই মুরিদ শাইখ জুনাইদ (রহ.)-এর কাছে অভিযোগ করল, বলল শাইখ আবুল হাসান নূরী ওলামা মাশায়েখদের মান-সম্মানকে খাটো করছেন। হযরত জুনাইদ (রহ.) বললেন, শাইখ আবুল হাসান আল্লাহর ওলীদের একজন। তিনি নিজের জন্য চাচ্ছেন না। কাউকে দেয়ার জন্য হয়তো হাত বাড়িয়েছেন। আবার এ কথাও খেয়াল হলোÑ আল্লাহ না করুন, শাইখ আবুল হাসান সাহেব যদি তিনদিন ক্ষুধার্ত থাকেন। ধ্বংস থেকে বাঁচার জন্য, তার হাত বাড়ানো জায়েয হয়ে যাওয়ার কথা।
মুরিদকে বললেন, একটি পাল্লা নিয়ে এসো, তিনি একশত দেরহাম মেপে একটি পাত্রে সদকার নিয়তে শাইখ আবুল হাসান (রহ.)-এর খেদমতে পাঠালেন। আর সাথে কিছু হাদিয়াও দিলেন এবং সেই মুরিদকেই শাইখের খেদমতে পাঠালেন। শাইখ আবুল হাসান (রহ.) এ সবগুলো দেখেই বললেনÑ জুনাইদ বাগদাদী খুব চতুর মানুষ। তিনি নিজের হাতে লাড্ডু রেখে দিতে চান। শাইখ আবুল হাসান একটি পাল্লা আনালেন, একশত দেরহাম মেপে অতিরিক্ত দেরহামগুলো নিজের কাছে রেখে দিলেন। আর সদকার ১০০ দেরহাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। আর বললেন, যেগুলো আমার ছিল, সেগুলো গ্রহণ করলাম। আর জুনাইদ নিজের মতলবের জন্য যেগুলো দিয়েছিল, সেগুলো ফেরত পাঠালাম। আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দরবারের ফকির নই। সেই মুরিদ খুব আশ্চর্যান্বিত ও অস্থির হয়ে ফিরে এলো। তার বুঝেই এল না যে, শায়খ জুনাইদ (রহ.) ১০০ দেরহাম মাপার পর অতিরিক্ত দেরহামগুলো কেন দিলেন। আবার শায়খ আবুল হাসান নূরী অতিরিক্ত দেরহাম রেখে বাকি ১০০ দেরহাম ফেরত দিলেনইবা কেন?
মুরিদ হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর খেদমতে এসে শায়েখ আবুল হাসান (রহ.)-এর বার্তা পৌঁছালেন। আর ১০০ দেরহাম ফেরত দিয়ে বিনয়ের সাথে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। হযরত জুনাইদ (রহ.) বললেন, আমিতো পূর্বেই বলেছি শায়খ আবুল হাসান নূরী জামানার ওলী। তিনি নিজে নেয়ার জন্য হাত বাড়াননি বরং অন্য কাউকে দেয়ার জন্য চেয়েছেন। তার পরও তোমার বলার কারণে কোনো প্রয়োজন পড়ল কিনা এই জন্য আমি ১০০ দেরহাম সদকার নিয়তে দিয়েছিলাম। সেই সদ্কা আমার উপকারে আসবে। আবার চিন্তা করলাম শায়খ আবুল হাসান এই যুগের ওলি, তার কাছে কিছু হাদিয়া পাঠানো উচিত। তাই আমি দুই হাত ভরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাদিয়া হিসেবে অতিরিক্ত দেরহাম দিলাম। শায়খ আবুল হাসান (রহ.) হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। আর সাদকা ফেরত দিয়েছেন। অতঃপর বললেন, আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দরবারে ফকির হই না। এবার গিয়ে তুমি তাকে মসজিদের বাহিরে হাত পাতার কারণ জিজ্ঞাসা কর।
মুরিদ শায়খ আবুল হাসান (রহ.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলো। তাঁকে মসজিদের সামনে সওয়াল করার কারণ জিজ্ঞাসা করল। শায়খ উত্তর দিলেন, সেদিন আমার অন্তরে এই কথা আসল যে, আজকে আল্লাহর যেই বান্দা আমার সাথে উত্তম মু‘আমালা করবে আল্লাহ তাকে নিজের বিশেষ রহমত ও সন্তুষ্টি দান করবেন। তাই আমি ভাবলাম যত বেশি মানুষ আমার সাথে উত্তম ব্যবহার করবে, সকলেই সেই রহমত ও খুশি উপলব্ধি করতে পারবে। বাহ্যত আমার সওয়াল করা দ্বারা লজ্জিত হবো বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমার নিজের জন্য গ্রহণ করার নিয়ত ছিল না। নিয়ত ছিল দেয়ার। এই জন্যই আমি মসজিদে মানুষের সামনে হাত প্রসারিত করেছি। এমন কত মানুষ আছে, যারা মানুষের কাছে হাত বাড়ায় অন্যকে দেয়ার জন্য। অন্যদিকে এমন অনেক সম্পদশালী লোক আছে, যারা দান করে কিন্তু উদ্দেশ্য গ্রহণ করা। বর্তমান রাজনীতিকদের অবস্থা সকলের সামনে সুস্পষ্ট। বাহ্যতভাবে তারা দাতা হয়ে আসে, কিন্তু ভিতরে থাকে গ্রহণ করার আশা, ভোট ভিক্ষা চাওয়া। এজন্য মানবতার মুক্তির দূত খাইরুল বাশার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ
“সবচেয়ে উত্তম ধনী হলো মনের ধনী।” আর নফসের প্রাচুর্য আসে অল্পতুষ্টির মাধ্যমে। দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে এই বাস্তবতা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। বিশ্বের মালিক আমাদেরকে ইসলাম ধর্মের মহান সম্পদ দান করে, সকল প্রকার মুখাপেক্ষি এবং দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন। অমুখাপেক্ষি করেছেন। এর পরও অন্যের দরবারে হাত প্রশস্ত করা এবং অন্য ধর্মের কৃষ্টি-কালচারের দিকে চোখ উঠাতে হয় কেন?
সেই এক সেজদা যাতে তুমি মনে কর তুচ্ছ। হাজার সেজদা থেকে মানুষকে তিনি করেন মুক্ত।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ