দাওয়াতি কাজ ঈমানী দায়িত্ব ঃ তারই একটি দিক

দাওয়াতি কাজ ঈমানী দায়িত্ব ঃ তারই একটি দিক
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ আমানত এবং ওয়াদা পূর্ণ করা ঈমানের শর্তের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনÑ
لايمان لمن لا امانة له و لادين لمن لاعهدله
: যার আমানতদারী নেই তার ঈমান অসম্পূর্ণ। যে ওয়াদা পূর্ণ করে না তার দ্বীন অসম্পূর্ণ। অন্য এক বর্ণনায় মুনাফিকের তিনটি আলামত বর্র্ণনা করা হয়েছে।
اية المنافق ثلاث اذا وعد اخلف واذاحدث كذب واذا أوتمن خان و رواية واذاعهد نسخ ـ
অর্থ: মুনাফিকের আলামত তিনটি। ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। কথা বলার সময় মিথ্যা বলে। তার কাছে যদি কেউ আমানত রাখে, তা খেয়ানত করে। অন্য এক বর্ণনায় যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে। আমরা কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে একটি অঙ্গীকার করেছি। আমাদের এই যে সত্য তা প্রকাশ করার জন্য আমলের দ্বারা তার বাস্তবতা পেশ করা খুবই জরুরি। এ ব্যাপারে নিষ্ঠা, দাসত্ব ও রেসালতের অনুসরণের খেয়াল করেছি কি না?
দ্বিতীয় বিষয় হলো আমানতদারী। আমানতের হক আদায় করা ছাড়া ঈমানদার হওয়া যাবে না। আমাদের হক আদায় করা এবং খেয়ানত থেকে বাঁচার জন্য ফুকাহায়ে কেরাম আমানতের তিনটি হক নির্দিষ্ট করেছেন।

আমানতের হক ৩টি
এক. সাধ্যানুযায়ী আমানতের হেফাজত করা। এটা ফেকাহ শাস্ত্রের মূলনীতি। সাধ্যানুযায়ী আমানতের হক আদায় না করার কারণে আমানত যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমানতদাতাকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
দুই. আমানতের দ্বিতীয় হক হলো, আমানতের মাল খরচ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। আমানতের মালের মধ্যে কম-বেশি করারও অনুমতি নেই। এমনকি মালিকের অনুমতি ছাড়া আমানতকৃত টাকা পরিবর্তনও করা জায়েজ হবে না।
তৃতীয়. আমানতের তৃতীয় হক হলো, মালিক যখনই তার মাল ফেরত চাবে, অথবা অন্য কাউকে দেয়ার জন্য বলবে, তখনই কোনো ধরনের কম-বেশি ও আপত্তি ছাড়াই তার মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিবে। মোটকথা প্রত্যেক আমানতের ব্যাপারে এই মূলনীতি বুঝা গেল। এই তিনটি হক আদায়কারীকে আমানতদার বলা হবে। অন্যথায় তাকে বলা হবে খেয়ানতকারী, আর এই খেয়ানত মুনাফিকের একটি আলামত।

ঈমানও একটি আমানত
কুরআনে কারিমে একটি বড় আমানতের ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُوْمًا جَهُوْلًا ۝ لِيُعَذِّبَ اللهُ الْمُنَافِقِيْنَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِيْنَ وَالْمُشْرِكَاتِ وَيَتُوْبَ اللّٰهُ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَكَانَ اللّٰهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا ۝
অর্থ : আমি আকাশ পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয় সে জালেম, অজ্ঞ। যাতে আল্লাহ্ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ, মুশরিক নারীদেরকে শাস্তি দেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-সূরা আহযাব -৭২-৭৩
কুরআনে কারিমের বর্ণিত এই আমানত সম্পর্কে জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এই আমানত দ্বারা উদ্দেশ্য ঈমান এবং পবিত্র ধর্ম ইসলাম। যার হক আদায় করতে আসমান-জমিন ও পাহাড়ও অক্ষমতা প্রকাশ করেছে। অতএব, এই ঈমান হলো: এক মহান আমানত, যা আমাদেরকে আমানত হিসেবে দান করা হয়েছে। ঈমানদারী প্রকাশ করা আর মুনাফিকের আলামত থেকে বাঁচার জন্য এই আমানতের হক আদায় করা। এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজ ধর্ম এবং ঈমানের হেফাজত করা। এর মধ্যে দ্বীন এবং সকল জিনিসের হেফাজতও অন্তর্ভুক্ত। আবার তাকে কুসংস্কার থেকে রক্ষা করাও জরুরি। অর্থাৎ যে জিনিস দ্বীন নয় ওই জিনিসকে দ্বীন মনে করা (বেদআত থেকে বাঁচানো) এবং যেই জিনিস দ্বীন এবং ঈমানের অংশ তাকে ছেড়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এই জন্য-
نُؤْمِنُ بِبَعْضِ وَنُكْفِرْبِبَعْضِ
অর্থাৎ আমরা কিছু অংশের উপর ঈমান আনি, আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করি। এ ধরনের চিন্তাধারাও খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগতভাবে এই ঈমানকে কবর পর্যন্ত পৌঁছানো। যাতে ওই ঈমানকে আল্লাহর সামনে পেশ করতে পারে। দ্বীনকে ওই সমস্ত লোকদের কাছে পৌঁছানো জরুরি, যারা তার হকদার এবং যাদের পর্যন্ত পৌঁছানোর হুকুম দেয়া হয়েছে,
بلغواعني ولوآية
আমার পক্ষে থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও। দ্বীনের প্রত্যেকটি বার্তাকে ওই ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছানো ফরজ, যার পর্যন্ত এ কথা পৌঁছেনি। এটা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। এই তিনটি হক আদায় করা ছাড়া আমানতদার হতে পারবো না। মানুষ খেয়ানতকারী বলবে। খেয়ানত হলো মুনাফিকের আলামত। তাই উপরোক্ত আয়াতে মুশরিক পুরুষ মুশরিক মহিলাদের আলোচনার পূর্বে মুনাফিকদের আলোচনা করা হয়েছে। কারণ মুনাফিকরাও আল্লাহর নিকট মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। তার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ
اِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ فِي الدَّرْكِ الْاَسْفَلِ مِنَ النَّارِ
অর্থ: নিশ্চয় মুনাফিকরা দোযখের সবচাইতে নিচের স্থানে যাবে। এইটা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
বাহ্যত সে নিজকে মুমিন বলে। এই জন্য মুশরিকদের আলোচনা প্রথমে করা হয়েছে। আর স্পষ্টভাবে মুশরিকদের আলোচনার পরে করা হয়েছে। এই আমনতের ভার মানুষকে প্রদানের উদ্দেশ্য হল যাতে করে আমানতদার ও খেয়ানতদার শনাক্ত হয়ে যায়। কে মুমিন, মুনাফিক, আর মুশরিক তা যেন চেনা যায়। ফলশ্র“তিতে মুমিন তার আমানতের হক আদায় করার জন্য বিশেষ ভাবে পুরস্কৃত করা হবে। আর মুনাফিক ও মুশরিকদেরকে আমানতের হক আদায় না করায় শাস্তি দেয়া হবে।
এই জন্য কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে যে ওয়াদা ও এখলাসের অঙ্গীকার করেছি, দাসত্বের অনুসরণ রেসালাতের এত্তেবার যেই ওয়াদা করেছি তা পূরণ করা। দাওয়াত ছাড়া এবং মানুষের কাছে তাওহিদের বাণী পৌছানো ব্যতিত অসম্ভব। মোটকথা আমানতদারী, সত্য কথা বলা, ওয়াদা পূরণ করা এবং ঈমানের অন্যান্য শর্তসমূহ পূরণ করার জন্য ঈমানের দাওয়াত দেয়া খুবই জরুরি। এই কাজ আদায় করা ছাড়া মিথ্যা কথা বলা খেয়ানতদারী। ওয়াদাখেলাপি এইসব মুনাফিকের আলামতের মধ্যে
অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনা আছে। তার প্রতিফলন,
في الدرك الاسفل من النار
জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের জায়গা। (এর শাস্তির চূড়ান্ত পর্যায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।)

দাওয়াতি কাজ নিজের ঈমানের জন্যও জরুরি
নিজের আত্মশুদ্ধি এবং অন্তরে ঈমানকে টিকিয়ে রাখার জন্য, এর থেকে সহজ পথ আর কিছুই হতে পারে না। অন্যকে ঈমানের দাওয়াত দেয়া, মানুষের মানবিক দুর্বলতা। বরং এক দিক থেকে মানবিক সৌন্দর্যও বটে। তা হলো যখন মানুষ কাউকে কোনো ভালো কাজের দাওয়াত দেয় তখন সেই ভালো কাজটি তার নিজের মধ্যে এসে যায়। আর যখন কোনো খারাপ কাজ থেকে মানুষ বাধা দেয়, তখন সে নিজেও ওই খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। তার নিজের জন্য ওই মন্দ কাজ হতে বেঁচে থাকা সহজ হয়ে যায়।
হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) (যিনি সেই সময়ের মুজাদ্দিদ ছিলেন) তিনি বলতেন, যখন নিজের মধ্যে কোনো জিনিসের দুর্বলতা অনুভব হয় তখন ওই বিষয়ে দুই চার জায়গায় ওয়াজ করে নেওয়া। তাহলে সেই দুর্বলতা পূরণ হয়ে যাবে। এই কথা একেবারে স্পষ্ট যে, যদি কেউ নিজের ঈমানকে অটল রাখতে চায়, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো, ঈমানের দাওয়াত দেয়া। একজন মানুষের স্বভাবজাত ও মানসিক একটি দুর্বলতা হলো এই, তার উপরে সংস্রব-ছোহবতের প্রভাব পড়ে। সে যেই পরিবেশে, যেই স্থানে যেই অবস্থায় জীবন-যাপন করে, সেই পরিবেশের ভালো মন্দ প্রভাব থেকে সে বাঁচতে পারে না। সংস্পর্শের বা ছোহবতের প্রভাবের বাস্তবতা এমন সত্য। তা কখনও আস্বীকার করা যাবে না। অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রামাণিত, পশু-পাখি ও গাছ পালার সংস্পর্শও মানুষকে প্রভাবিত করে। যে অঞ্চলে কাটাযুক্ত গাছ বেশি, যেমন বাবলা গাছ ইত্যাদি, সেখানকার মানুষের স্বভাব-চরিত্র ও অভ্যাস কঠিন হয়ে থাকে। যেসব অঞ্চলে ফলযুক্ত গাছ-পালা বেশি থাকে, ওখানকার মানুষের মধ্যে বিনয় ও তাওয়াজু পাওয়া যায়, এমনিভাবে পশু পাখির সংস্পর্শও অনেক প্রভাবিত করে। আমার সহজ-সরল এক বন্ধুর কথা মনে হলো। তার কাছ থেকে দ্বীনের ব্যাপারে হেকমতপূর্ণ একটি কথা জানতে পারি। কোনো এক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের মাঝে মতানৈক্য দেখা দেয়, তা মীমাংসার জন্য এক মিটিংয়ে ওই বন্ধু উপস্থিত ছিল। দায়িত্বশীলগণ কোনো সমঝোতায় আসছিল না। সকল চেষ্টা ভেস্তে যাচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে একজন হাফেজ সাহেব কেঁদে উঠলেন। আর বলতে লাগলেনÑ আমরা হলাম দ্বীনের ঠিকাদার। আমাদের অবস্থা হলো কুকুরের মতো। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন? সে বলল, একটি মহিষ বা গরু যদি মারা যায়। সেই মৃত গরুটি একটি কুকুর খাচ্ছে। এমন সময় যদি অন্য একটি কুকুর চলে আসে, তাহলে সে তার খাওয়ার কথা ভুলে যাবে। আর তাকে ভাগিয়ে দেয়ার জন্য যুদ্ধ করবে। চাই সে নিজের জীবন দিয়ে দিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাকে ভাগিয়ে দিবে। চলে না যাওয়া পর্যন্ত সে শান্তিতে বসতে পারবে না। আমি তাকে বললাম, তাহলে আমাদের কেমন হওয়া উচিত? সে বলল, ছাগলের মতো। আপনি যদি তার সামনে কিছু ঘাস বা খাবার দিয়ে দেন, সেখানে একটি ছাগলের পালও যদি ছেড়ে দেন। তাহলে তারা পরস্পর মারামারি করবে না। সকলেই মিলে এক একটি পাতা শেষ করে দিবে।
তার একথা থেকে আমি খুবই উপকৃত হয়েছি। কত সুন্দর হেকমতপূর্ণ কথা। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে এল, ইসলামে কুকুর পালা নিষেধ করা হয়েছে। আর ছাগল প্রতিপালন করা সুন্নাত বলা হয়েছে। অনেক হেকমত থাকা সত্যেও এটিও একটি কারণ। ছাগলের সংস্পর্শে মানুষের মধ্যে মহব্বত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আর কুকুর ভালোবাসা দূর করে। হিংসা ও ফাসাদ সৃষ্টি করে। আল্লাহ আমাদের এ থেকে হেফাজত করুন। আমীন!

মূল. হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ