দাওয়াতের পথে মন পরিষ্কার হওয়া জরুরী

দাওয়াতের পথে মন পরিষ্কার হওয়া জরুরী
নিজের আখলাক চরিত্রকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুযায়ী তৈরি করবে। এ জন্য সীরাতে পাকের একটি বিশেষ বিষয়ের দিকে ভালো করে চিন্তা করা উচিত। আল্লামা ইবনে কাসির রহ. সূরা আলাম নাশরাহ,-এর তাফসিরে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যে কোনো জিনিস জিজ্ঞাসা করতে পারতেন, যা অন্য কেউ পারতেন না। একবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! নবুওয়াতের ব্যাপারে আপনি সর্বপ্রথম কী দেখেছেন? তিনি সোজা হয়ে বসলেন। বললেনÑ আবু হুরায়রা! আমার বয়স যখন দশ বছর কয়েক মাস। আমি মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আসমানের দিক থেকে একটি আওয়াজ এল। একজন অপরজনকে বলছে, ইনিই কি উনি? অপর জন বললেন, হ্যাঁ। এবার দু’জন ব্যক্তি আমার কাছে এলেন। যাদের মুখ এতো নূরান্বিত ছিল, যা আমি এর পুর্বে কখনো দেখিনি। তাদের থেকে এমন সুগন্ধ আসছিল, যা আমি কোনো দিন পাইনি। তারা এমন কাপড় পরে এসেছে, যা কোনো দিন কাউকে পরতে দেখিনি। তারা এসে আমার বাহু ধরলেন। এমন ভাবে ধরলেন আমি বুঝতেও পারলাম না। একজন অপরজনকে বলছেন তাঁকে শুইয়ে দাও। আমাকে শুইয়ে দেয়া হলো। কিন্তু আমি এতে অনুভবও করতে পারলাম না। আমার কোনো প্রকারের কষ্টও হলো না। এরপর একজন অপরজনকে বলল, তার বুকটি ফাঁক কর। তারা আমার বুক চিরলো, আমার কোনো ব্যথা লাগল না। কোনো রক্তও বের হলো না। একজন বললেন, তার মধ্য থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, কপটতা বের করে দাও। তাই একজন রক্তের টুকরার মতো কি যেন বের করে নিক্ষেপ করল। এর পর একজন বলল, তার মধ্যে মহব্বত, রহমত, দয়া ভরে দাও। এর পর একটি পয়সার মতো কী যেন আমার বুকের মধ্যে রেখে দিলেন। এবার আমার ডান পায়ের আঙ্গুলকে হেলিয়ে বললেন যাও শান্তি ও নিরাপদে থাক। এর পর আমি ছোটদের দেখলে তাদের প্রতি ভালোবাসা আগের চেয়ে বেশী দেখতে।
কেমন যেন রেসালতের সর্ব প্রথম নেয়ামত ছিল, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরকে খুলে দেয়া। পরে উনার অন্তরে অন্যের ব্যাপারে ভালোবাসা ও রহমত ছিল বেশী। তাঁর অন্তর থেকে হিংসা, বিদ্বেষ বের করে ফেলা হয়েছে। ফলে তাঁর পুরো সত্তাই মাথা থেকে পা পর্যন্ত রহমতে পরিণত হয়ে ছিল।
যে ব্যক্তি জনাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকে আদর্শ বানিয়ে ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করতে চায়, তার জন্য জরুরী, সে যেন মহান সম্পদ অর্জন করার ফিকির করবে। নিজ রবের কাছে অন্তর খুলে দেয়ার দুআ করবে। কারণ যে যত চেষ্টা করবে, সে তা পেয়ে যাবে। এটা নবীর সুন্নাত। নিষ্ঠার সাথে নবীর আনুগত্য করবে। তাহলে আল্লাহ অন্তর খুলে দিবেন।

ইতিবাচক ফিকির অন্তর খোলার একটি লাভ
অন্তর খুলে যাওয়ার মতো এই সম্পদ অর্জনের একটি লাভ হলো, দা‘য়ীর চিন্তা ফিকির সব কিছু নবীর মতো ইতিবাচক হয়ে যায়। সর্বপ্রকার খারাপ চিন্তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সীরাত অধ্যয়ন করে দেখুন। সেখানে ইতিবাচক দিক ছাড়া আর কিছু আপনার চোখে ধরা পড়বে না। দেখতে পাবেন সর্বোচ্চ দয়া, ভালোবাসা, অন্যের জন্য কল্যাণকামিতার অপূর্ব নিদর্শন। অন্যের দোষ বর্ণনা তো দূরের কথা, তা শ্রবণও করতেন না। তাঁর শত্র“দের জন্যও ছিলেন খুব খায়রখাহি। কল্যাণকামী।
মক্কী জীবনের জানের দুশমনদের জন্য সারা রাত কান্না করতেন। আর দিন ভর তাদেরকে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ঘোরাফিরা করতেন। তাকে ধিক্কার দিতো। তাড়িয়ে দিতো। এর পরও তাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতেন। কখনো নিরাশ হতেন না। এর মূল কারণ ছিল, তার ইতিবাচক চিন্তা। যা তাঁর সীরাতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল। তায়েফের ময়দানে তিনি পাথর খেয়েছেন। কঠিনভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। সব কিছু সহ্য করেছেন। এমন সময় জিব্রাইল আমিন (আ.) শাস্তির ফেরেস্তাদের নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু তিনি তাদের থেকে নিরাশ হননি। সেখানেও কল্যাণ দেখেছেন, বললেনÑ তারা হয়তো মুসলমান হয়নি। তাদের প্রজন্মে এমন লোক আসবে, যারা মুসলমান হবে। যারা আল্লাহর সামনে মাথা নত করবে। তার ইবাদতগুজার হবে।
উহুদ যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের পক্ষ থেকে খুবই কষ্ট পেয়েছেন। সত্তর জন সাহাবী শহীদ হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাঁত মুবারক শহীদ করেছেন। নিজে মাথায় চরম আঘাত পেয়েছেন। মাথা মুবারক ফেটে গেছে। এমন সময় কিছু সাহাবায়ে কেরাম উনার কাছে উপস্থিত হলেন। আবেদন করলেন, আপনিতো আল্লাহর নবী। তাদের জন্য বদ দুআ করুন। তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন, “ আমাকে অভিশাপকারী বানানো হয়নি। বরং আমাকে দা‘য়ী ও রহমত বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। ”

এর পর সেই জালিমদের কল্যাণ চেয়ে, পুরো দুনিয়ার মমতা আর রহমত উৎলিয়ে এলো। খেয়াল হলো, হায় আমার সাথে অত্যাচার করার কারণে যদি তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি চলে আসে। সঙ্গে সঙ্গে আসমানের দিকে হাত তুলে দুআ করতে লাগলেন। “হে আল্লাহ! আমার জাতিকে হেদায়াত দিয়ে দিন, তারা বুঝে না।”
জুলুম আর বর্বরতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। নিজ মাতৃভূমি মক্কা থেকে বের করে দিয়েছে। আবার মদিনায় এসে যুদ্ধ করছে। নির্যাতন করছে। এমন সময় তাদের জন্য কল্যাণের আশা করছেন। এটা আমার নবীর ইতিবাচক চিন্তার বহিঃ প্রকাশ। এটাই আমার নবীর চরিত্র।
এই উহুদ যুদ্ধে নবীর প্রিয় চাচা, সাইয়্যিদুশ্ শুহাদা হামজা রা.-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে। ওয়াহশি সে সময় হিন্দার গোলাম ছিলো। আর সে ছিলো ইসলামের কঠিন দুশমন। সে হযরত হামজা রা . এর নাক, কান কেটে, বুক চিরে কলিজা চিবিয়ে খেয়ে ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় তাঁর চাচার চিন্তায় এতো পরিমাণ চিন্তিত ছিলেন তাঁর চাচার কথা মনে পড়লে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। সেই শাহাদাতের প্রভাব এমন ছিল, ওয়াহশি (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাকে বলেছিলেন, তুমি আমার সামনে বসবে না। তোমাকে দেখলে আমার চাচার কথা মনে পড়ে যায়। আমার মনে কষ্ট লাগে। হতে পারে এর জন্য তোমার দ্বীনের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই জন্য ওয়াহশি রা. সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে বসতেন। সামনে বসতেন না।
এটাই ছিল নবীয়ে রহমতের ইতিবাচক চিন্তার ফল। মক্কা বিজয়ের পরও তিনি ওয়াহশির কাছে সাহাবাদের দিয়ে দাওয়াত পাঠিয়েছেন। যিনি প্রিয় চাচাকে শহীদ করেছে তার কাছে দাওয়াত।

মূল. হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ