দাওয়াতের ফিকির এবং আমলের ময়দান

الحمد لله رب العلمين و الصلاة و السلام علي سيد المرسلين خاتم النبين و علي اله واصحابه اجمعين ومن تبعهم باحسان ودعي بدعوتهم إلي يوم الدين

একজন সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, তা হল মুসলমানদের ওপর যখন কোনো মুসিবত আসে, অথবা সমস্যার পাহাড় যখন মাথার উপর এসে অবস্থান করে, তখন চতুর্দিক থেকে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে যে, সমসাময়িক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের কী করা উচিত? এই প্রশ্নটি একেবারেই অযৌক্তিক এবং অনর্থক। এর উদাহরণ এমন, কেউ প্রশ্ন করল ডাক্তারদের কী করা উচিত? উকিলদের কী করা উচিত? ইঞ্জিনিয়ারদের কী করা উচিত? প্রকাশ থাকে এমন প্রশ্নের কোনো প্রয়োজনই নেই। কারণ ডাক্তারদের ডাক্তারী করা উচিত। উকিলদের ওকালতি করতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের প্রকৌশলের কাজ করতে হবে। ঠিক এমনি ভাবে এই মুসলিম জাতিকে বিশ্বের ¯্রষ্টা উত্তম জাতি বানিয়েছেন। তাদেরকে দুনিয়াতে পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো দাওয়াত। তাদের পরিচয় এমনকি তাদের পেশাই বানানো হয়েছে দাওয়াত। এই দা’য়ী উম্মতকে দাওয়াতের কাজ করতেই হবে। এজন্য এ প্রশ্নের কোনো সুযোগই নেই যে, এই কঠিন অবস্থায় মুসলমানদের কী করা উচিত। মুসলিম জাতির পাঠানোর উদ্দেশ্যই হল দাওয়াত; দ্বীনের দাওয়াতের এই কাজকে এ যুগে কীভাবে করা উচিত কোন পদ্ধতিতে করা যেতে পারে এবং এই যুগে বিভিন্ন ময়দানের জন্য কী কী পদ্ধতি উপকৃত হতে পারে এর ওপর চিন্তা ফিকির করা। এই ব্যাপারে পুরো দুনিয়াকে সঠিক দিক নির্দেশনার জন্য সর্বদা মাশওয়ারা করা। একত্রিত হওয়া এবং চিন্তা- ফিকির করার অবকাশ রয়েছে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের পূর্বে দুনিয়াতে যত নবী রাসূল এসেছেন, তাদের দাওয়াত ও শরীয়ত নির্দিষ্ট সময় ও অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম হলেন শেষ নবী, তাঁর শরীয়তও বিশ্ববাসীর জন্য কেয়ামত পর্যন্ত চলবে। এই জন্য দুনিয়ার আনাচে-কানাচে এই স্বভাবজাত ধর্মকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এই ধর্মকে দাওয়াতের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শরীয়তের চিন্তাধারাকে নিজের সংরক্ষণ ও আত্মরক্ষামূলক না বানিয়ে, আক্রমণাত্মকও বানানো হয়োছে। মুসলিম জাতির প্রতিটি ব্যক্তিকে নিজ নবীর আনুগত্যে দাসত্বের চুড়ান্ত মর্যাদা, রিসালাতের কাজ করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। মুসলিম জাতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এবং ইমলাম গ্রহণ করার শর্ত হল কালেমা শাহাদাত। اشهد إن لاإله إلاّالله و اشهد انّ محمداً عبده و رسوله এই কালেমাকে স্বীকার করে, এই অঙ্গিকার করবে, যে, এক আল্লাহ্র দাসত্ব ও গোলামীর মধ্যে, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে, দাসত্ব এবং রিসালাত এই দু’টোর মধ্যে আনুগত্য করবে। অর্থাৎ দাওয়াতের দায়িত্বে এই মর্যাদার হক আদায় করবে।
আফসোস! তাওহীদের অঙ্গিকার আমাদের মুখে যেমন আছে, এমনি ভাবে বরং এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশী দাসত্ব এবং রিসালাতের আনুগত্যের অঙ্গিকার থেকে প্রতিনিয়ত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম শাহ ওলীউল্লাহ রহ.-এর জন্মস্থান ‘সালেহীনদের গ্রাম’ নামে খ্যাত। ফুলাতে এক বিরাট সম্মেলনে আমার শায়খ মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেছিলেন-
“এখানে হযরত শাহ ওলীউল্লাহ রহ. যিনি ইমামুল মুতআখিরীন এবং জামিউল উলূম ওয়াল কামালাত খেতাবে সম্ভাষিত এবং নিজ যুগের একজন মুজতাহিদ এবং যুগসংস্কারক। যার ব্যক্তিসত্তা ও বংশপরম্পরার সাথে এই জমিনের সম্পর্ক। এই স্থানে এই কথা বলা এবং বলার জন্য উপযুক্ত স্থান, তা হল মুসলমান তাদের এই দাওয়াতের দায়িত্ব ভুলেই গিয়েছে। মুসলমান সব কিছু করবে, কিন্তু নিজে কোনো নমুনা উপস্থাপন করে না। এ কথা বলেও না যে, এটা ভুল, এটা সঠিক। অথবা এটা খারাপ বা বিপজ্জনক।
হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. আরো বললেন, “চাই কত বড় মাদরাসা হোক (আমি নিজেই মাদরাসার মানুষ) যে কোনো জামাতেই হোক না কেন। যে কোনো সংগঠন হোক না কেন, যত বড় গবেষণাগার হোক না কেন, যত বড় শিক্ষাবিদ হোক এবং যত বড় বিশ্লেষক অথবা লেখক অথবা যত বড় আল্লাহ্ ওয়ালাই হোক, (তাকেও আমি বলছি) কিন্তু মুসলমানরা যদি ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজকে ছেড়ে দেয়, এই স্থানের বসবাসকারী সাধারণ জনগণ এবং অধিকাংশ মানুষের সামনে ইসলামের মর্মবাণী প্রকাশ না পায়, তাহলে আমরা যেই জীবন যাপন করছি তা যেন জীব-জন্তুর জীবন অথবা তার চাইতেও নিকৃষ্ট। মনের খাহেশাত মেটানোর জন্য ব্যস্ত জীবন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো শয়তানের মতো করে ব্যয়িত জীবন। আসলে, প্রকৃত জীবন তো সেটাই যা আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যে অতিবাহিত হয়। মুসলমানদের হেদায়েত এবং দাওয়াত দেয়ার কাজ এবং كنتم خير امة اخرجت لناس এর ধর্ম বা কাজের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে যদি এই জাতি ভুলে যায় অথবা অবহেলা করে, তাহলে মনে রাখা প্রয়োজন- “আজকের এই পৃথিবীর জীবন ভবিষ্যতে এমনটি থাকবে না। থাকবে না এই শিষ্টাচার। আমরাও বেঁচে থাকতে পারবো না।”
এই জাতির দুনিয়াতে আসার উদ্দেশ্য এবং তার ঈমানী দায়িত্ব হলো, সে রহমাতুল্লাহিল আলামিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের প্রতিনিধিত্বের হক আদায় করবে। পুরো বিশ্বে ইসলাম ও ঈমানের বার্তা পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আদায় করবে। আল্লাহর কালেমাকে তার জমিনে উড্ডীন করার জন্য তনু-মন-সম্পদরাজিকে নিঃস্বার্থ ভাবে বিলিয়ে দেবে। নবুওয়াতের কাজকে ব্যস্ততা এবং পেশা বানাবে। পুরো দুনিয়াতে ইসলাম পৌঁছানোর কাজ এমন এক পথ যা থেকে অধিক সতর্কিকরণ এবং উম্মতের এসলাহের সহজ পথ উম্মতের জন্য অসম্ভব।
বিশ্বজগতের ¯্রষ্টা মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টিগতভাবে এই যোগ্যতা দান করেছেন। যখন সে অন্য কাউকে ভালো কাজের দাওয়াত দেয়, তাহলে সেই ভালো গুণটি প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আপনা আপনিই তার নিজের মধ্যে এসে যায়। আর যখন কোনো মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে, তাহলে সেই মন্দ কাজ হতে নিজে বেঁচে থাকার তৌফিক হয়। এই জন্য সর্বজ্ঞ, সব কিছু সম্পর্কে খবর রাখনেওয়ালা, মহান মালিক আল্লাহ্ তা‘আলা দ্বীনের দাওয়াত তথা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধকে ফরজ দায়িত্ব বানিয়ে দিয়েছেন। ইসলামের প্রচার এবং পুরো দুনিয়াতে ইসলামকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা চালু রেখেছেন। একজন দুর্বল মুসলমানের জন্য দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে উম্মতের সংশোধনের সহজ পুঁজির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
“মুসলমানদের কী করা উচিত?”- এখন এই প্রশ্নের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আল্লাহ্ তাআলা দা‘য়ী হিসাবেই আমাদেরকে চিহ্নিত করেছেন। তাই আমাদেরকে দাওয়াতের কাজ করতেই হবে। দুনিয়ার যেখানেই কোনো মুসলমান থাকে, সেখানে ঐস্থানেই দাওয়াতের কাজ করা তার দায়িত্ব। তার জন্য দ্বীনের দাওয়াত দেয়া ফরজ জিম্মাদারী। এই মহান কাজকে নিজের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য মনে করতে হবে। আমাদের এখানে যে ধারণাটি খুব বেশী পাওয়া যায়, তাহলো আমলের দাওয়াতের তুলনায় আকিদার দাওয়াত খুবই কঠিন। কিন্তু এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, দুনিয়াতে এমন কোনো মানুষ নেই যিনি কোনো বিষয়কে সত্য মনে করে এবং সেই সত্য বিষয়টি তার অন্তরে বসিয়ে নেয়, অথচ তারপরও সেই বিষয়ের ওপর আমল করে না। এখানে তো শুধু চিন্তা-চেতনা আর মন পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।
এখানে একটি প্রশ্ন উদয় হতে পারে যে, দাওয়াতের এই মহান কাজের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির কি যোগ্যতা আছে? সকলের জন্য কি এই মহান কাজ করা সম্ভব?
এ বিষয়ে একটি কথা পেশ করছি, তা হলো- উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তি যদি দাওয়াতের এই মহান কাজকে নিজের মিশন বা নিজের আসল কাজ বানিয়ে নেয় এবং উম্মতের দুনিয়াতে আসার মাকসাদ (উদ্দেশ্য) মনে করে, তাহলে সরাসরি এই কাজ না করতে পারলেও দাওয়াতের পরিবেশ সৃষ্টি এবং দাওয়াতের ময়দানের কর্মীদের সহযোগী হতে পারবে। যেমনি ভাবে একটি হাসপাতালের সকল কর্মচারীদের জানা আছে, হাসপাতাল স্থাপনের উদ্দেশ্য হলো রোগীদের সুস্থতা। চিকিৎসা তো ডাক্তাররাই করবে, কিন্তু ওখানকার ধুপি, সুইপার, বাবুর্চি, লাইব্রেরিয়ান সকলেই রোগীর সুস্থতায় সহযোগী হওয়ার জন্য চেষ্টা করে।
অধমের একটি বিষয় পেশ করতে মন চায়। দাওয়াতের যে মহান দায়িত্ব আদায় করা এই উম্মতের উদ্দেশ্য সেটা হলো শুধুমাত্র দ্বীনের দাওয়াত। আর কোরআন-সুন্নাহ পালনের ধর্মই হলো আসল ধর্ম বা দ্বীন বা জীবনবিধান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আমলের ওপর সাহাবীদের রেখে গিয়েছিলেন। জাতি এই ধর্মের দাওয়াত ও তাবলিগকে ছেড়ে দিয়ে নিজের মতবাদ ও চিন্তা-ফিকিরের প্রতি দাওয়াত দেয়া নিজের গুরুদায়িত্ব মনে করছে। যে কারণে আমাদের সমস্ত যোগ্যতা আহলে হকের বিরুদ্ধে এবং তাদের হেয় করার অশেষ চেষ্টা-মেহনতের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
ইসলামি শিক্ষা কাউন্সিলের এক বিশাল সম্মেলনে হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেছিলেন, আফসোস! আজ আমরা মাসলাক বা মতবাদের যুদ্ধের মধ্যে পড়ে আছি। আজ আমাদের এই যোগ্যতাকে যদি ইসলামের প্রচার ও তার পরিচয় করানোর ক্ষেত্রে খরচ করা হতো, তাহলে হিন্দুস্তানে আজ ইসলাম এত অপরিচিত ও অজ্ঞাত হতো না। এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা খুবই জরুরী। আমাদের দায়িত্ব হলো ধর্মের প্রচার ও দাওয়াত পৌঁছানো। ধর্ম বা দ্বীন বা জীবনবিধান হলো সেটাই যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের সময় বলেছিলেন- تركت فيكم امرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله و سنة رسوله
অর্থ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এর ওপর টিকে থাকবে, কেহই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো- আল্লাহ্র কিতাব ও আমার সুন্নাত।”
খাইরুল কুরুনদের সোনালি যুগের মতো ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসা এবং বিশ্বজুড়ে ইসলামের বিজয় কামীদের জন্য একমাত্র পথ হলো এটাই যে আমরা ধর্মকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় বুঝবো, তার ওপর আমল করবো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চিন্তা-মেহনত করবো। যেমন করে সোনালি যুগের লোকেরা করেছেন। ইমাম মালেক রহ. বলেন- لايصلح اخر هذه الامة إلا بما صلح به اولها
অর্থ: ‘এই জাতির শেষের লোকদের পরিশুদ্ধি ঐ একই ভাবেই হবে, যে পদ্ধতিতে এই জাতির শুরুর লোকদের হয়েছিল।
চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-দীক্ষা, মিশন প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিম জাতি যত বেশী খাইরুল কুরুন, তথা সোনালী যুগের কাছাকাছি হবে, সেই পরিমাণ তাদের নিজেদের আত্মশুদ্ধি করতে পারবে। তার এসলাহের সাথে সাথে দুনিয়াতে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কতই না ভালো হতো, যদি কুরআন ও সুন্নাহকে গভীর ভাবে তার হক আদায় করে বুঝার চেষ্টা করা হতো। যে যুগের মানুষ কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করেছে, তাদের মতো যদি আমরাও হতে পারতাম, তাদের পরিবেশের মতো যদি আমাদের পরিবেশও সৃষ্টি করা হতো, তাহলে কতই না উত্তম হতো! (যে যুগের লোকেরা মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর ফিকির করতো, আল্লাহ্র কালেমাকে তাঁর জমিনে প্রতিষ্ঠার জন্য জান কুরবান করে দিত। দুনিয়াবিমুখতা, আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাতের জন্য অস্থিরতা এবং শাহাদতের উম্মাদনা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হতো।) এর সাথে আমাদের যুগের অবস্থা হল আত্মাপূজারী, দাম্ভিকতা, মৃত্যুর ভয়, ইসলামের দাওয়াত থেকে উদাসীনতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আমাদের সমাজ কেন সোনালি যুগের সাথে যদি তুলনা করি, তাহলে আমাদের হীনমন্যতার মতো মারাত্মক রোগ এবং পরাজয়ের আসল কারণ জানা থাকবে। আর আমরা কুরআনুল কারীম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের আলোকে রোগগুলোর প্রতিকার করতে পারি।
কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে দ্বীনি দাওয়াতের চাওয়া এতটুকুই যে, আমরা শুধু চেষ্টা করবো। যেন পুরো দুনিয়ার মানুষ জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যায়। এর আবার দু’টি অংশ। গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- যাদের কাছে ঈমান নেই, তাদের পর্যন্ত যেনো ঈমান পৌঁছে যায়। আর কুফর-শিরকের মহা আগুন থেকে বেঁচে যায়। দ্বিতীয় অংশ হলো, যাদের কাছে ঈমান-ইসলাম আছে। কিন্তু তার মধ্যে দুর্বলতা ও অবহেলা বিদ্যমান, সেটাকে দূর করা। প্রথম অংশকে ঈমানের দাওয়াত অথবা ইসলামের প্রচার বলা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় অংশকে আমলের দিকে দাওয়াত বা হেফাজতে ইসলাম বলা যেতে পারে। আর এই দু’টি কাজই মুসলমানের উপর ফরজ। একটি অপরটির সম্পূরক। যার একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করা যায় না। অন্যের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য আবশ্যিক বিষয় হলো, মানুষ তার আখলাক ও চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিবে। দাওয়াতের মাঠে প্রভাব ও আছর সৃষ্টির জন্য জরুরী হলো নিজের পরিবেশ ও সমাজকে পরিপূর্ণভাবে ঈমান ও ইসলাম দ্বারা সুসজ্জিত করা। আর নিজের ঈমান ও ইসলামকে পূর্ণ করার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের দাওয়াত এবং তার পরিপূর্ণতা জিহাদকে নিজের পরিচয় বানানো জরুরী।
বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি
দাওয়াতের কাজ হল একটি অকাট্য হুকুম। কিন্তু তার পদ্ধতি অকাট্য বিধান নয়। এজন্য এর নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা জরুরী নয়। কিন্তু, যাতে কাজের ক্ষেত্রে তারা উপকৃত হতে পারে, বন্ধু-বান্ধবদের ও দাওয়াতি ময়দানের কর্মীদের জন্য অভিজ্ঞতার আলোকে সে জন্য কিছু আলোচনা পেশ করছি।

ঈমানের দিকে দাওয়াত তথা ইসলামের প্রচার
এটি হলো দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এর গুরুত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি ভাষণ থেকে অনুমান করা যায়। যা হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মসজিদে নববীতে, সাহাবাদেরকে একত্রিত করে বলেছিলেন। হে লোক সকল! আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে সারা বিশ্বের জন্য রহমত এবং পয়গাম্বর বানিয়ে পাঠিয়েছেন। পুরো দুনিয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তার রাসূল বানিয়ে প্রেরণ করেছেন। আসমান জমিনের ¯্রষ্টার বার্তা সারা দুনিয়াতে পৌঁছিয়ে দিতে চাই। যেনো আল্লাহ্ তা‘আলার হুজ্জত পুরো হয়ে যায়। আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত এবং তাঁর পয়গাম থেকে দুনিয়ার কোনো জামাত যেনো বঞ্চিত না হয়। আল্লাহ্র উপর ভরসা রেখে, দুনিয়ার সকল বাদশাহদের নিকট ইসলামের বার্তা পৌঁছিয়ে দাও। জেনে রাখো- তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের জীবন আল্লাহ্র বান্দাদের কাছে তাঁর পয়গাম পৌঁছানোর কাজ হওয়া উচিত। আল্লাহ্র জান্নাত ঐ ব্যক্তির উপর হারাম, যে লোকজনের সাথে লেনদেন করে, চলাফেরা করে; কিন্তু তাদেরকে ভালো কাজের উপদেশ ও নসিহত করে না। এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من اسلم علي يديه رجل واحد وجبت له الجنة “যে ব্যক্তির মেহনতে একজন মানুষ ইসলাম কবুল করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।” তাই, এই কাজকে বিভিন্ন শাখায় বণ্টন করা যেতে পারে।
সাধারণ অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি
প্রবন্ধকারের অভিজ্ঞতা হলো, এই কাজ ব্যক্তিগত ভাবে করা যেতে পারে। হিন্দুস্থানের পরিবেশে আমাদেরকে মক্কার প্রাথমিক যুগের পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য বানাবো। যারা আমাদের খুবই নিকটবর্তী তাদের ওপর কাজ শুরু করবো। দুই চারজনকে লক্ষ্য বানিয়ে তাদের জন্য দোয়া শুরু করবো যে, হে আল্লাহ্! অমুক ব্যক্তিকে হেদায়েত দিয়ে দিন। এমনটি করা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন মহান একটি সুন্নাত যা বিশেষ থেকে বিশেষ মানুষদের থেকেও ছুটে যাচ্ছে। এই সুন্নাত আদায় করার দ্বারা, শুরুতেই একশত শহীদের সাওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ্। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- من تمسك بي سنتي عند فساد امتي فله اجر مأة شهيد ‘যে আমার উম্মতের মধ্যে ফেতনা ফাসাদের সময় আমার একটি সুন্নাত প্রতিষ্ঠা করবে, সে একশত শহীদের সওয়াব পাবে।’ এই দোআা করতে হবে হে আল্লাহ্! অমুক ভাইকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে দিন।

হরিজন ও এবং দুর্বল শ্রেণির লোকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত
এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে ইসলামের সঠিক পরিচয় পেশ করা এবং ইসলামের কার্যকরী রূপ তাদের সামনে উপস্থাপন করা। এমনকি শিক্ষিত লোকদের কাছে ইসলামের ব্যাপারে অভিব্যক্তি পেশ করাও অনেক উপকারী। এই বিষয়ে জমিয়তে শাহ ওয়ালিউল্লাহ ফুলাত থেকে ড. আম্বেত কারের এই বিষয়ে কিছু বই প্রকাশ করেছেন। সেগুলো থেকেও সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
মুরতাদদের মাঝে দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি
এই শ্রেণীর লোকেরা হিন্দুস্থানী মুসলমানদের থেকে বিশেষ দৃষ্টি পাওয়ার অধিকার রাখে। হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, ইউপি, রাজস্থান- এসব অঞ্চলের যেসব এলাকায় আমাদের বন্ধুরা পৌঁছেছে, এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষ মুরতাদ হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ মুরতাদ হয়েছে দেশ ভাগের পর। আর কিছু লোক এর পূর্বেই ধর্মান্তরিত হয়েছে।
খাইরুল কুরুনের এবং তার পরবর্তী যুগে বিশেষ করে আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর যুগে যে ভাবে সত্য ছেড়ে মিথ্যা ধর্মে ধর্মান্তরের ফেতনার মোকাবেলা করা হয়েছে। এই যুগেও ঐ একই পদ্ধতিতে সত্য ছেড়ে মিথ্যা ধর্মে ধর্মান্তরকে প্রতিহত করা জরুরী। তাদের বড় একটি অংশ শিখ বা হিন্দু হয়ে গিয়েছিল। শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল, এছাড়াও অনেক মুসলমান কাদিয়ানী, বাহায়ী, রাধাসাওয়ামী, নেরংকারীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে। এই মুরতাদদের মধ্যে একশ্রেণীর লোক তো এমন যারা নিজেদেরকে অমুসলিম বলে স্বীকার করছে। আর এক শ্রেণীর লোক হলো যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করে, অথচ পূজা, দেওয়ালী ইত্যাদি সব কিছুই করে। এই সব লোকদের মাঝে কাজ করার সবচেয়ে সহজ ও উপকারী পদ্ধতি হলো, ঐ সব এলাকায় প্রাইমারি স্কুলের নামে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যেতে পারে। যেখানে থাকবে ইসলামি শিক্ষা ব্যাবস্থা। দাওয়াতি চিন্তাধারা রাখে এমন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছাত্রদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বয়স্কদেরকে তাবলিগ জামাতে পাঠিয়ে ঈমান বৃদ্ধির ফিকির করা যেতে পারে। যেই শিশুটি পাঁচ বছর আমাদের পরিবেশে থাকবে, আশা করি, তার ও তার পরবর্তী বংশধরদের ফিকির করতে হবে না।

কাদিয়ানীদের মাঝে দাওয়াতের কর্মীদের প্রতি আবেদন
সত্য ছেড়ে মিথ্যা ধর্মে ধর্মান্তরিত এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রভাব হলো কাদিয়ানীদের। যেখানে সেখানে তারা তাদের ইমাম নিযুক্ত করছে। বিভিন্ন স্থানে তাদের কেন্দ্র তৈরী করে রেখেছে। অন্যদের ন্যায় এদের প্রতিও দৃষ্টি রাখা খুব প্রয়োজন। সত্য ছেড়ে মিথ্যা ধর্মে ধর্মান্তরের আন্দোলন এই জন্যই ভয়াবহ, এটা রীতিমত তাদের প্রচারমুখী আন্দোলন এবং এটা তাদের মিশন। তাদের খপ্পর থেকে বাঁচানোর জন্য সাধারণ মুসলমানদেরকে তাদের সম্পর্কে অবগত করা খুবই জরুরী। আর এই কাজটি হল আলেমদের। তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝাবে। কারণ কাদিয়ানীরা সাধারণত সহজ-সরল মানুষগুলোকে ইসলামের নামেই দাওয়াত দিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ মনে করে, বিনা মূল্যে ফ্রি ইমাম পেয়ে গেছি, সমস্যা কিসের, তাই কাদিয়ানী ইমামকে মুসলমানদের মসজিদের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেয় তারা। মানুষ যদি জানতো, এই কাদিয়ানীরা মুসলমান নয়, তাহলে তারা নিজেরাই তাদের থেকে দূরে থাকতো। দেখা গেছে, অনেক মুসলমান কিছু অর্থের লোভে তাদের প্রচারক হিসেবে কাজ করছে। তাদেরকে বুঝানো হলে সত্যটা বুঝতে পারে। কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকদের সাথে কথা বলার জন্য মির্জা গোলাম আহমদের জীবনী সম্পর্কে ধারণা থাকা খুবই জরুরী।
তারা ঈসা আ.-এর জীবিত থাকা ও মৃত্যু সম্পর্কে দার্শনিক কিছু কথা বার্তা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে মির্জা কাদিয়ানীর কর্মপদ্ধতি ও চরিত্র এবং তার বদ আমলগুলো আলোচনা করলেই তারা মাঠ ছেড়ে পলায়ন করে। এই জন্য মির্জার মিথ্যা প্রচার ও কাজ-কর্মের কথা আলোচনা করলে সহজেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এ সব স্থানে যদি প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেয়া যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ের জন্য তাদের এই কাজ বন্ধ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্।

অন্যান্য মুশরিক জামাতের সাথে সম্পৃক্তদের মাঝে দাওয়াতের পদ্ধতি
হিন্দুস্থানের পরিবেশ সর্বদা সুফী-সন্ন্যাসী ও যোগীদের জন্য অনুকূল ছিল। তাদের ক্ষেত্র ছিল উর্বর। ফলে তাদের আধ্যাত্মিক আন্দোলন এখানে খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বাহায়ী ধর্ম, রাধাস্বামী, সতসঙ্গ, জয়গুরুদের, নেরংকারী এমন অনেক শিরকি সংগঠন আছে, যাদের ভিত্তিই হল আধ্যাত্মিক ও যোগ। কিছু মুসলমান তাদের চমকপ্রদ কিছু জিনিস দেখে তাদের ঈমানকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হলো, এদেরকে আল্লাহ্ওয়ালা বুজুর্গদের সহবতে নিয়ে যাওয়া। তাদের সাথে সাক্ষাৎ করানো ও রীতিমত সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হলো এধরনের লোকদের সহজ চিকিৎসা। এর মাধ্যমেই এই সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে।

বিদআতিদের মধ্যে কাজ করার পদ্ধতি
যারা কবর পূজা করে এবং নানা ধরনের কুফর-শিরকি-বিদআতি কাজে লিপ্ত থাকে, তাদের মধ্যে কাজ করার হেকমত হল, এই কুফর-শিরকি-বিদআতি কর্ম বন্ধ করার জন্য তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার পরিবর্তে এবং তাদেরকে জিদ ও রাগ থেকে বাঁচার জন্য, তাদের সামনে সুন্নাতের আজমত ও মাহাত্ম্য তুলে ধরা। সাধারণ সুন্নাতের ফজিলত তাদের সামনে বর্ণনা করা, যাতে সেই সুন্নাতসমূহে তিনি অভ্যস্ত হয়ে যান। দরূদ শরীফের ফজিলত বলে অধিক হারে দরুদ শরীফ পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে।
হযরত গাঙ্গুহী রাহ. একশ বার দরুদ পাঠকারীকে অধিক দরুদ পাঠকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই জন্য কমপক্ষে দিনে তিনশত বার দরুদ শরীফ পাঠ করার উৎসাহ দেয়া। আশা করা যায়, অধিক হারে দরুদ শরীফ ও সুন্নাহর উপর অভ্যস্ত হওয়ার বরকতে বিদায়াতের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি হবে এবং তওবার সুযোগ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্।
যদিও দাওয়াত ও তাবলিগের পদ্ধতি অকাট্য ভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু প্রতিটি জিনিসের মতো অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে এখানে অনেক পথ খুলতে পারে এবং অনেকগুলো পদ্ধতি ঠিক করা যেতে পারে। যার ফলে এ কাজ অনেক সহজ ও শক্তিশালী হতে পারে। এই প্রয়োজন পূরণ করার জন্য মাদরাসাসমূহের মধ্যে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ফারেগীন ছাত্রদের জন্য তাদের মধ্যে দাওয়াতি মানসিকতা তৈরীর জন্য, বিশেষ কোর্স বা বিশেষ ক্লাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জমিয়তে শাহ ওলিউল্লাহ এই দিক বিবেচনা করে একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স চালু করেছে দিল্লিতে। যার ফলে অনেকগুলো সুফল আমাদের সামনে আসছে। বিভিন্ন স্থানে মাদরাসার জিম্মাদারগণ যদি এই কোর্স শুরু করতেন, তাহলে দা’য়ীদের একটি টিম তৈরী হয়ে যেত। আশাতীত ফল পাওয়া যেতো। এমনি ভাবে মাদরাসাওয়ালাদের এই দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। তারা পড়ালেখা সম্পন্নকারী ছাত্রদের জন্য কাজের ময়দান নির্বাচন করে সে অনুযায়ী পুরো প্রস্তুতি নেওয়ায় ব্যবস্থা করবে। সেই ময়দানে কাজ করার উৎসাহ দিয়ে ছাত্রদের একটি জামাতকে দাওয়াতের ময়দানে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদের মাধ্যমে দাওয়াতের ময়দানের দুর্বলতাকে কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে। আর তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ওস্তাদদেরই। তবেই এই ময়দানে কাজ করা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ্।

মুসলমানদের মাঝে দাওয়াতের কর্মীদের পদ্ধতি আবেদন
নিজের বংশধরদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাথমিক ভাবে দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এটা জীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক মক্তব প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এর জন্য এলাকায় বড় মাদরাসা এবং এলাকার দয়িত্বশীলগণ ফিকির করবে। সকল স্থানে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কায়েম করার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। কোথাও কোথাও আবার ভিন্ন মতও পাওয়া যাবে যে, বড় মাদরাসার পাশে যদি ছোট মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে বড় মাদরাসার ওপর প্রভাব পড়বে। ফলে তাদের শুভাকাক্সক্ষী কমে যাবে। অভিজ্ঞতার আলোকে জানা যায়, এ ধরণের খেয়াল সঠিক নয়। এ ধরনের মক্তব যদি আপনার নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে আপনার অনুসারীদের মিছিল আরো মজবুত হবে। এলাকার দায়িত্বশীলদের মাথায় যদি এর গুরুত্ব বসানো যায়, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে।
তাবলিগ জামাতের মোবারক কাজ, যার উপকার ও বরকত উম্মতের মাঝে সুুস্পষ্ট। বালেগ পুরুষ ও মহিলার জন্য এ কাজের ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা প্রয়োজন। এটা খুব উপকারী একটি খেদমত। এছাড়াও বিভিন্ন জামাত ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের জন্য যেই চেষ্টা-ফিকির চলছে, তার মধ্যে অংশগ্রহণ ও ভ্রুক্ষেপ করা জরুরী।
বিশেষ করে ওলামায়ে কেরাম এবং মসজিদের ইমামগণ যদি বিভিন্ন সময় সমাজের খারাবী গুলো, বিশেষ করে বিবাহ শাদীর মধ্যে কুসংস্কার সমূহ, সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে, ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি যদি মনযোগ দেন, তাহলে জাতি বিধ্বংসী এমন অনেক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে।
একটি জরুরী কাজ এটাও যে, নওমুসলিমদের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিশেষ করে তাদের শিক্ষার বিষয়ে সুপরিকল্পিত ভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রশিক্ষণ সেন্টার তৈরী করা যেতে পারে। যেখানে নওমুসলিম ভাইয়েরা নিরাপদের ও মুহাব্বত-ভালোবাসার একটি পরিবেশ তৈরী হয়ে যায়। সেখানে তাদের দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং এই সমস্যার সমাধান হয়। অভিজ্ঞতা বলে, যখন কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে, তখন তার পরিবার, বাড়ি-ঘর, বন্ধু-বান্ধব সব কিছু ছেড়ে আসতে হয় এবং ইসলামের উপর টিকে থাকার জন্য তাদের সামনে সমস্যার পাহাড় এসে যায়। মানসিক ও শারিরীক ভাবে তাদের তারা নির্যাতিত হয়। এসব অবস্থায় তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা খুবই জরুরী। এটা আমাদের ওপর তাদের জন্য প্রাথমিক জিম্মাদারী।
পরিশেষে আমার একটি আবেদন, দ্বীনের প্রতিটি কর্মীর অনুগ্রহ মনে করা এবং সহযোগিতার মনোভাব রাখা হলো ইখলাসের আলামত। আফসোস! আজ আমাদের থেকে এই মানসিকতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। পরস্পর সহযোগিতার মধ্যে যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে, ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করছি। আফসোস! আজ হক বাতিলের লড়াইয়ের মোকাবেলার পরিবর্তে মুসলমান মুসলমানের মাঝে এবং দ্বীনের বিভিন্ন লাইনের কর্মীদের মাঝে পরস্পর লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আমাদের মানসিকতা হল এমন, যেই কাজ আমাদের হাতে হচ্ছে এটাই হক, বাকিগুলো বাতিল। চাই এর মধ্যে যতই ত্রুটি থাকুক না কেন। আর যে কাজ অন্যের হাতে হয়, সেটা ভুল। চাই সেটা যত জরুরী আর গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন। অন্যের কাজকে স্বীকৃতি দেয়া এবং তাকে সহযোগিতা করা ও স্বাগত জানানো খুবই দূরহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ব্যক্তি অথবা তার কাজের হাজারো গুণ যদি বিশ্বস্ত সূত্রে আমরা জানতে পারি, তাহলে তাকে ধন্যবাদ জানানোর সাহসটুকুও আমাদের হয় না। আর ধারণাবশতও তার একটি দুর্বলতা, দোষ বা সন্দেহের আলামত পেতে পারি, তাহলে সেটা প্রচার-প্রসারে অশেষ প্রচেষ্টা চালাই। এই মন-মানসিকতার সাথে সফল হওয়া কীভাবে সম্ভব?
আমাদের এটা খেয়াল করা উচিত যে, একজন দ্বীনের কর্মীর হাজারো ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহ্র দ্বীনের কর্মী। সেই করুণাময় মালিকের পক্ষ থেকে অবশ্যই এই দ্বীনের কর্মীর ত্রুটি লুকিয়ে রাখা হবে। আমাদের এই অধিকার নেই যে, আমরা আল্লাহ্র দ্বীনের দোষ খুঁজবো, দুনিয়ার কিছু উপকারের জন্য তা প্রচার করি। এতে কাজের গ্রহণযোগ্যতার ও বরকতের মধ্যে প্রচুর ক্ষতিসাধন হয়।
আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে মূল কাজের ফিকিরের ও দ্বীনের প্রত্যেক কর্মীর সহযোগিতার মানসিকতা ও স্পৃহা তৈরী করে দিন, সারা বিশ্বে দ্বীনের প্রচারক হিসেবে কবুল করুন। (আমিন)

واخردعوانا ان الحمد الله رب العلمين

আমরা যদি মুমিন হই। আলহামদুলিল্লাহ, অবশ্যই আমরা মুমিন। আমাদের জানা উচিত আমরা কালেমা শাহাদাত পড়ে ইখলাসের সাথে, আল্লাহ্র দাসত্ব ও রিসালাত এই দু’টোর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের অঙ্গিকার করেছি। আমাদের মন আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করছে।
আসুন, আমরা আমাদের নিজেদের মনকে একটু প্রশ্ন করি-
ক্স আমাদের আকিদা-বিশ্বাস খালেস তাওহিদের ভিত্তিতে শুদ্ধ আছে কি?
ক্স আমাদের ইবাদতগুলো নবীজীর আনুগত্যের পরিবর্তে রেওয়াজী হুজুগে তো নয়?
ক্স লেনদেনের ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ নবীজীর মতো পরিষ্কার আছে তো?
ক্স চাল-চলন ও চরিত্রের ক্ষেত্রে আমরা নবীজীর অনুসরণের বহিঃপ্রকাশ করছি তো?
ক্স আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, চিন্তা-চেতনা, পছন্দের মাঝে নবীজীর ভালোবাসা ও তার আনুগত্য প্রকাশ পায় কি?
ক্স আমাদের অস্তিত্ব কি আমাদের পরিবার, আত্মীয়-স¦জন, প্রতিবেশী, মহল্লাবাসী এমনকি সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ?
ক্স আমাদের অন্তরে নবীজীর মতো দ্বীনের জন্য শাহাদাতের স্পৃহা আছে কি? নাকি মৃত্যুকে অপছন্দ করছি?
ক্স আমাদের কি নবীজীর মতো জাহান্নামের পথিকদের জন্য চোখের অশ্রু ঝরানোর সুযোগ হয়েছে?
ক্স আমাদের মধ্যে কি নবীজীর মতো তায়েফের মধ্যে পাথরের আঘাত খেয়েও তাদের জন্য দু‘আ করার মতো মানসিকতা হয়েছে?
ক্স আমরা কি দাওয়াতের ময়দানে শি‘আবে আবু তালেবের মতো বছরের পর বছর নয়, বরং মাত্র কয়েক দিনও বন্দি থাকার কল্পনা করতে পারি?
ক্স আমরা কি নবীজীর মতো এক এক মানুষের কাছে সত্তর বার যাওয়ার পরও তার কাছে পূনরায় দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সাহস করতে পারি?
ক্স আমাদের জীবনে কি দাওয়াত ও জিহাদের ঐ মর্যাদা অর্জন হয়েছে যা নবীজী ও তার সাহাবীদের জীবনে ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি হয় ‘না’ তাহলে আমরা কোন মুখ দিয়ে নবীজীর আনুগত্যের দাবি করি? আসুন, এখনই তওবা করি এবং পরকালের প্রস্তুতি নেয়ার প্রতিজ্ঞা করি। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا.
অর্থ: যে দিন যালেম তাদের হাত কামড়িয়ে খাবে, আর বলবে, হায়! আমি যদি রাসূলের সাথে চলতাম।
এর থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন।
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
অর্থ: আপনি বলুন এটাই আমার পথ, আমি মানুষকে সুস্পষ্ট প্রমাণের সাথে আল্লাহ্র দিকে ডাকি । এটাই আমার পথ এবং যারা আমার অনুসরণ করবে তাদেরও।
আসুন আমরা এই আয়াতের অনুসরণ করি এবং দাওয়াতের পথে জান-মাল কুরবান করি। আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। (আমিন)

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ