দাওয়াতের সম্পৃক্ততাকে স্বাগতম

দাওয়াতের সম্পৃক্ততাকে স্বাগতম
আমার শায়েখ (হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী মিঞা নদভী রহ.) এর পক্ষ থেকে একটি পত্র এলো। পত্রে নির্দেশ ছিল, ধেরাধুন এলাকার একজন অবসর প্রাপ্ত কর্ণেল, যিনি বেশ অনেকদিন আগেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে অনেক চিন্তিত ছিলেন। বহু চেষ্টা করার পরও ইসলামের দিকে ধাবিত করতে পারেন নি। তাই আমি যেন সময় বের করে হরি দুওয়ারে সফর করি এবং কর্ণেল সাহেবের স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করি। কমপক্ষে কর্ণেল সাহেবকে যেন সান্তনা দেই। ঐ সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য প্রায় একমাস আবদ্ধের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। কিন্তু হযরতের নির্দেশ পালনার্থে ধেরাধুন সফর করলাম। নির্দেশ পালনের বরকতে সফর খুবই উপকারী হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ কর্ণেল সাহেরের স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করতে রাজী হলেন। এবং খুশি মনে কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। এদিকে মুজাফ্ফর নগর কারফিউ চলছিল। এই কারফিউএর মধ্যেই আমরা ওখান থেকে রওনা দিলাম। রাত বারটার দিকে মুজাফ্ফার নগর রেলওয়ের উপরের ব্রীজ পার হচ্ছিলাম, এমন সময় আমাদের গাড়ি ব্রেক ফেল করল। উত্তেজনামুলক অবস্থার কারণে রাস্তাও খালি ছিল। এই কারণে আল্লাহ আমাদেরকে হেফজত করেছেন। গাড়ি থামল অনেক দূরে গিয়ে। ড্রাইভার ম্যাচ জ্বালিয়ে দেখল। একদিকের ব্রেইক পাইপ লিক হয়েছে। এই জন্য জুতায় লাগানোর মত একটি ছোট্ট খিল প্রয়োজন। আমাদের কারো জুতার মধ্যে কোনো খিলও ছিল না। গাড়ীতেও খোঁজে পাওয়া গেল না। ২২০ গজ পর একটি হোটেলের আলো দেখা যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে গাড়িকে ঐ পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। হোটেলের মালিক ঘুমিয়ে ছিল, তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে খিল খুজতে বললাম। কিন্তু সেখানেও পাওয়া গেল না। এর থেকে অল্প একটু সামনে আর একটি হোটেল ছিল। যার সামনেই ছিল ছোট একটি মন্দির। মন্দিরের পুরোহিত আমাদের অস্থিরতার কারণ জানতে চাইলে তাকে বললাম, আমাদের গাড়ির ব্রেক ফেল হয়ে গিয়েছে। একদিকের লাইন বন্ধ করার জন্য একটি ছোট্ট খিল প্রয়োজন, যা জুতার মধ্যে লাগানো হয়। আমাদের পুরো কথা শুনে বললেন, আপনারা অপেক্ষা করুন। আমি আসছি। আমার কাছে একটি পেরেক আছে। কিছুক্ষণ পর একটি পেরেক নিয়ে এল, বলল- আপনাদেরকে দেখেই মনে হল আপনারা খুব ভালো মনুষ। এতো রাতে কী সমস্যায় পরে এসেছেন তাই আমি এগিয়ে এলাম। এই পেরাকটি আমি তিন চার মাস আগে পেয়েছি। পেরাকটি উঠিয়ে মন্দিরে শীবজীর মাথায় গুঁজিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। হতে পারে যাওয়া আসার পথে কারো উপকারে আসতে পারে। ভগবান মূলত আপনাদের জন্যই হয়তো আমার দ্বারা এটা সংরক্ষণ করিয়েছেন। তা না হলে এমন একটি খিল কে আবার উঠিয়ে রাখে? খিলটি নিয়ে একদিকের লাইনের লিক বন্ধ করা হলো, এবার ধীরে ধীরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে করতে আনন্দের সাথে বাসায় ফিরলাম।
আজ পযর্ন্ত আল্লাহর নেয়মতের কথা স্মরণ করে সঙ্গী সাথীদের সাথে এর আলোচনা করে থাকি। ৩০ অক্টোবর বাবরী মসজিদ ও আদবানীর রথযাত্রা, এই কঠিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মন্দিরের একজন পুরোহিত ধর্মীয় বেশের লোকদেরকে দেখে ঘৃণা না করে, রাত ১২টার সময় শংকাকে পদদুলিত করে আমাদেরকে ভালো মানুষ মনে করে সহযোগীতা করেছে। মানবতার জন্য এর চেয়ে বেশী উত্তম আর কী আশা করতে পারি।
দ্বিতীয়ত, দ্বীনের দাওয়াত আল্লাহর নিকট কত মাহাব্বতের কাজ যে, তিনি প্রজ্ঞাময় সব কিছুর খবর রাখেন। তিনি জানতেন দ্বীনের দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত আমার এক অধম বান্দা এই দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলার সময় রাতের বেলায় সফর করবে, আর গাড়ীর জন্য একটি পেরাকের প্রয়োজন হবে এবং প-িতের মাধ্যমে এই পেরাকটি সংরক্ষণ করে রাখবে। যেমনটি পুরোহিত সাহেব নিজেই স্বীকার করেছেন।
তৃতীয় : বিষয় যা সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ। যার জন্য মাথা নত হয়ে যায়। দাওয়াত ও তার সাথে সম্পৃক্ততাকে কত সম্মান ও মর্যাদা যে, জুতার পেরেক কে বাতিল উপাস্যের মাথায় সংরক্ষণ করেছিলেন।
দাওয়াতের সম্পৃক্ততা যদি একটি সাধারণ জুতার পেরেকের এতো সম্মান হয় যে, তাকে চার মাস পযর্ন্ত শীবজীর মাথায় রেখে সংরক্ষণ করা হয়। এতেই অনুমান করা যায় যে, এই উম্মত বা কেউ যদি দাওয়াতের সাথে তার সম্পর্ক রাখে, তাহলে আল্লাহ তাআলা বাতিল সরদার বরং তাদের বাতিল উপাস্যদের মাথা কেন নতো করাবেন না? হায়! আমরা যদি এথেকে কিছু শিক্ষা নিতে পারতাম এবং নিজেদের সম্মান ও অসম্মানের কারণ গুলো বুঝতে পারতাম।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ