দাওয়াত হলো দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তার একটি পথ

দাওয়াত হলো দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তার একটি পথ
কুরআনে কারিম মুসলমানদেরকে মৌলিকভাবে দুটি দলে বিভক্ত করেছে। আল্লাহর দল ও শয়তানের দল। সুপথগামী ও বিপথগামী। সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী। এই দুই দলের মধ্যে কারা শান্তি ও নিরাপদের হকদার? কুরআনে কারিম এ প্রশ্নের সুন্দর উত্তর দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَأَيُّ الْفَرِيْقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ .
অতএব, উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শাস্তি লাভের অধিক যোগ্য কে, যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক। – সূরা আনআম-৮১
আল্লাহ পাক আরো বলেন-
الَّذِيْنَ آَمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُوْنَ
যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শেরেকির সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী। -সূরা আনআম-৮২
ঈমান এবং জুলুম এ দু’টি স্ববিরোধ শব্দ। এখানে এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এর উদাহরণ হলো এমন- আলো জ্বললে অন্ধকার দূর হয়ে যায়। আলো যেই পরিমাণ হবে ঠিক সেই পরিমাণ অন্ধকার দূর হয়ে যাবে। এ জন্যই বলা হয়েছে, ঈমানদারগণই হলেন নিরাপদ ও হেদায়াতপ্রাপ্ত। তবে নিজ ঈমানের সাথে জুলুমকে যেন মিশ্রিত না করে।
ঈমান হলো আলো, জুলুম হলো অন্ধকার। আলো যত বেশী হবে অন্ধকার ততো কম হবে। অন্ধকার যদি বেশী হয় তাহলে আলো কমে যাবে। ঈমান যতো পরিপূর্ণ হবে, জুলুম ততো কমে যাবে। আর জুলুম যেই পরিমাণ বাড়বে ঈমান সেই পরিমাণ কমবে।
ঈমানদার তো সে, যে হকদারকে তার হক আদায় করে দেয়। জালেম তো সে, যে অন্যের হক নষ্ট করে। মানুষের উপর যেই হক অর্পিত হয়, তা দুই প্রকার হয়ে থাকে। আল্লাহর হক যা মহান। বান্দার হক যা গুরুত্ব পূর্ণ। আল্লাহর হক হলো তাকে যেইভাবে মানা উচিত সেইভাবে মানার হক আদায় করা। তার বিপরীত তার হকের সাথে কাউকে অংশীদার বানানো, যেমন তাঁর প্রভুত্বের ও বন্দেগীর মধ্যে তাঁর ইলমের ও গুণের এবং সত্তার সাথে কাউকে অংশীদার বানানোকে শরিক বলা হয়। নিজ স্রষ্টাকে তার হক না দেয়ার জন্য এটা সবচেয়ে বড় জুলুম।
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِه وَهُوَ يَعِظُه يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللّٰهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ .
অর্থ: যখন লোকমান তার পুত্রকে বলল: হে বৎস, আল্লাহ্র সাথে শরিক করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্র সাথে শরিক করা মহা অন্যায়।
-সূরা লুকমান-১৩
আল্লাহর হকের পর সবচে বড় হক হলো, তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হক আদায় করা। অর্থাৎ ঈমানের হক ঐ সময় পর্যন্ত আদায় হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের খায়েশ বা ইচ্ছা সমূহ সুন্নাতের অধীনে না হবে। অর্থাৎ সুন্নাত তবিয়ত হতে হবে। তাই নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার খায়েশ দ্বীনের অধীনে না আনতে পারবে। যা আমি নিয়ে এসেছি।”
এর উদ্দেশ্য হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত সুন্নাত স্বভাবে পরিণত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। সুন্নাতকে তবিয়ত বানানোর উদাহরণ হলোÑ মাছের চাহিদা হলো পানি। যদি তাকে পানি থেকে উপরে উঠিয়ে রাখা হয়, তাহলে সে ছটফট করতে থাকবে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। সে পানি ছাড়া বাঁচতে পারবে না। ঠিক মুমিনের অবস্থাও এমন হওয়া উচিত। পানির মতো সুন্নাত তার স্বভাব হতে হবে। সুন্নাত ছেড়ে দেয়ার গুনাহ দেখে তার ছটফটানি উঠবে। সুন্নাত বিহীন পরিবেশে তার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো মনে হবে।
কোনো মুমিন যদি নবীজীর আদর্শের আলোকে সুন্নাতের পরিবেশ দেখতে চায় তাহলে এ বাস্তবতা তার সামনে সুস্পষ্ট হবে যে, দাওয়াতি পরিবেশ হলো আসল পরিবেশ। যেখানে মানুষ কুফর ও শিরকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সেখান থেকে তাদেরকে বাঁচিয়ে আনা হলো আসল নববী ও সুন্নাতী পরিবেশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হক আদায় করার জন্য জরুরী হলো নিজ পরিবেশকে দাওয়াতি পরিবেশ বানানো। তাঁর প্রতিটি কাজে দাওয়াতের প্রাধান্য দেয়া। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরো একটি হক হলো তাঁকে ভালোবাসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে বেশী আমাকে ভালো না বাসবে।”
নবীজীর ভালোবাসা হলো এক মহা সম্পদ
নবীজীর ভালোবাসা, মুসলিম জাতির জন্য দামী ও সম্মানিত সম্পদ। তাঁর সত্তার ভালোবাসা, তাঁর কথা, আমল এবং প্রতিটি জিনিসের ভালোবাসা, এমনকি তাঁর পরিবারের তাঁর সাহাবাদের, তাঁর শহরের ভালোবাসা সেই শহরের গলির কুকুরের সাথেও ইশক ও বিশ্বাসের সম্পর্ক, একজন মুমিনের জন্য খুবই দামী উপার্জন। যারা কাজ করে সফলতা অর্জন করেছে, যাদের সম্পর্ক পুরো দ্বীনের সাথে তারাও এই সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত।
আফসোস, কিছু ইহুদি ও ইসলামের দুশমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই আন্দোলন থেকে, জাতির ভালোবাসার সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়। এর জন্য তারা সুপরিকল্পিত ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার হাওয়া তুলে দিয়ে আহলে বাইতের ভালোবাসা বিশ্বাসকে মানুষের অন্তরে শেষ করে দিতে চায়। আর অনেক সাদাসিধে মুসলমানকে এই কাজের মাধ্যম বানিয়েছে। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবারের মহাব্বত সম্মান তাদের বিশ্বাস ঈমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া। ইমাম শাফী (রাহ.) এর প্রসিদ্ধ বাণী “আহলে বাইতের ভালোবাসা যদি দলছুট হয়। তাহলে সারা পৃথিবী সাক্ষী যে আমি রাফেজী (দলছুট)।”
প্রিয়নবীর ভালোবাসার আলামত হলো তাঁর প্রতিটি নির্দেশ মানার জন্য, জানবাজি রাখার স্পৃহা রাখবে। তাঁর বাণীর মূল্যায়ন করবে। একজন ঈমানদারের জন্য তাঁর শেষ ওসিয়ত অনুযায়ী আমল করা উচিত। মানুষের শেষ ওসিয়তকে প্রতিপক্ষ এবং নিজের আত্মীয় স্বজনরাও মেনে নেয়। এবং মানুষ তা পূরণ করা ফরজ মনে করে। সারা জীবন যার সাথে লড়াই থাকে তাকেও কাছে টেনে নেয়। বিদায় হজ্জের সময় দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِىْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا فَمَنِ اضْطُرَّ فِىْ مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ
অর্থ: আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে, কিন্তু কোন গোনাহ্র প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল। -সূরা মায়েদা -৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বাস হয়ে গিয়ে ছিল এটাই তাঁর উম্মতের মাঝে একত্রিতভাবে শেষ ভাষণ। এর পর হয়তো আর সুযোগ হবে না। তাই তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দিলেন। এই বিদায়ী ভাষণে, রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষে যেই শব্দগুলো বলেছিলেন, সেগুলো সাধারণত সীরাতের সব বইগুলোতে পাওয়া যায়। উপস্থিত সকল মানুষকে লক্ষ করে প্রশ্ন করলেন, আমি কি তোমাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছিয়েছি? আমার দায়িত্ব আদায় করেছি? সকলেই উত্তর দিলেন, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি পরিপূর্ণ ভাবে আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন। এই সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসমানের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বললেন – হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকেন। এর পর সকল উম্মতকে শেষ ওসিয়ত হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। বললেন- তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের মাঝে যেন এই পয়গাম পৌঁছিয়ে দেয়।
অনেক বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, শেষ ভাষণ এটাই ছিল। তার ফলশ্র“তিতে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর ভালোবাসা ও সেই শেষ ওসিয়তের উপর আমল করেছেন। তাই নববী জবান থেকে এই কথা বের হয়েছে, তিনি বলেন, “আমার সাহাবারা তারকার মতো, তোমরা তাদের মধ্য থেকে যাকেই অনুসরণ করবে হেদায়াত পেয়ে যাবে।”
তারা শেষ ওসিয়তকে এভাবেই পালন করেছেন যে, তাদের উটের মুখ যেদিকে ছিল, সে দিকেই তারা বের হয়ে গিয়েছেন। অধিকাংশ সাহাবা তাদের বাড়িতে জানিয়েও যাননি যে, তারা কোথায় যাচ্ছেন। তারা একথা বুঝেছেন যে, আমার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন। আমাদেকে তিনি যেই ওসিয়ত করে গেছেন, তার উপর আমল করেছি কি না? তারা কেউ গিয়েছেন চীনে। কেউ আবার আফ্রিকায়। কেউ এসেছেন হিন্দুস্থানে। একেক জন একেক স্থানে গিয়েছেন। পুরো দুনিয়া সফর করেছেন। আর সেখানেই তাদের কবর হয়েছে। তাঁরা প্রিয় নবীর সেই হক আদায় করেছেন।
এ কথা পূর্বেও আলোচনা হয়েছে। দ্বীনি পরিভাষা ও তার বিধি-নিষেধ গুলো সে ভাবেই বুঝা ও আমল করা, যে ভাবে সাহাবায়ে কেরাম বুঝেছেন ও আমল করেছেন। তার হক আদায় করেছেন। দ্বীনকে বিকৃতি থেকে বাঁচিয়েছেন।
দ্বীনের বিভিন্ন পরিভাষাকে বিকৃতি থেকে বাঁচানোর জন্য ওলামায়ে কেরামের একটি জামাত বলেছেন, এব্যাপারেও সতর্ক থেকেছেন যে, পরিভাষার অনুবাদের ক্ষেত্রে আসল পরিভাষাই রাখা। যেমন সালাতের অনুবাদ নামায ও সাওমের অনুবাদ রোজা করাও মাকরুহ বলেছেন।
আমাদের প্রিয় নবীর বিদায়ী ওসিয়ত “উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়” এর অবমূল্যায়ন করা, তাকে পাস কাটিয়ে চলা, এর পরও নবীর ভালোবাসার দাবি করা, কী পরিমাণ মিথ্যা হতে পারে, একটু ভেবেছেন কি?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাম হুঁশিয়ার করেছেন। বলেছেন এই বছরের পর, আর তোমাদের সাথে সাক্ষাত হবে না। এর পর শেষ ওসিয়ত করেছেন। এই ওসিয়তের উপর আমল করা ছাড়া, ভালোবাসার হক আদায় হবে না।
এই বড় হকের পর, দ্বিতীয় নাম্বার হক হলো বান্দার হক। যাকে হক্কুল ইবাদ বলা হয়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যতক্ষণ পর্যন্ত হকদারকে তার হক আদায় না করা হবে অথবা নিজের হক মাফ না করাবে ততক্ষণ পর্যন্ত হক আদায় হবে না। সকল মানুষের হক আদায় করা ঈমান ও ঈমানদারীর চাওয়া। আর সেই হকগুলো কুক্ষিগত করা এবং নষ্ট করা হলো জুলুম। যে পরিমাণ হক নষ্ট করবে, সে পরিমাণ জুলুম করবে। হকদারকে তার হক আদায় না করার কারণে যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই পরিমাণ জুলুম বাড়তে থাকবে। তাই বান্দার হক আদায়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা খুবই জরুরী।
শরিয়ত আমাদের উপর অনেক হক অর্পণ করেছে। যেমন ঈমানী হক, রুহানী হক, চারিত্রিক হক ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হক হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ ওসিয়তের উপর আমল করা। বুকভরা বেদনা নিয়ে, অন্যের কল্যাণ কামনায়, অমুসলিমদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেয়া।
তাদেরকে কুফর ও শিরক থেকে বাঁচানো। দোযখ থেকে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এই হক আদায় না করার কারণেই অনেক লোক কুফর ও শিরকের উপর মৃত্যু বরণ করছে। চিরস্থায়ী ভাবে দোযখের ইন্ধন হচ্ছে। তাদের কাছে দাওয়াত না পৌঁছানো, এটা আমাদের পক্ষ থেকে কত বড় জুলুম? [কারো কাছে অন্য কোনো ব্যক্তির কিছু খাবার জমা আছে। এগুলো তাদের হকদারকে দেয়ার কথা। আর সেই খাবার তাকে না দেয়ার কারণে যদি সেই লোক না খেয়ে মারা যায়, তাহলে সেটা কত বড় জুলুম? এর চেয়ে বড় জুলুম হলো কুফুর ও শিরকে ঘুরপাক খাওয়া মানুষকে ইমানের দাওয়াত না পৌঁছানো। তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচানোর ফিকির না করা। এটা কি ঈমানদারদের কাজ? এমন মানুষকে মুমিন তো দূরের কথা মানুষ বলারও অধিকার রাখে না।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বলুনÑ একজন চক্ষুবিশিষ্ট মানুষের সামনে একজন অন্ধ ব্যক্তিকে জলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিতে দেখেও তার হাত ধরে সেই আগুন থেকে বাঁচায়নি, তাকে কি মানুষ বলা যাবে? এমন পাষণ্ড দিলের অধিকারী মানুষকে কেউ মানুষ বলতে পারে না। আমাদের কাছে কুরআন মাজিদের নূর আছে। আছে আসমানী হেদায়াতের আলো। আর আমাদের সামনে পুরো দুনিয়া এই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। হেদায়াতের পথ খোঁজা থেকে অন্ধ হয়ে দোযখের কঠিন পরিণামের দিকে যাচ্ছে। আর আমরা পুরো অনুভূতিহীনতার সাথে রহমতে আলমের উম্মত ও অনুসারী মনে করছি। এটা কেমন বে ইনসাফি আর কেমন জুলুম? পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব সত্ত্বেও নবীর আনুগত্যের দাবিদার আমরা।
আসুন আমরা মন থেকে একটু ভাবি। রাতের বেলা একাগ্রচিত্তে একটু চিন্তা করি। আমাদের ঐ বৃদ্ধ সুইপার, ঝাড়ুদার, যিনি পুরোটা জীবন বাথরুমের নাপাকি পরিষ্কার করতে করতে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। যে নাপাক হাতে লাগলে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করি। যা কল্পনা করলে বমি চলে আসে। সেই সুইপার আমাদের সামনে কুফর ও শিরক করতে করতে বিভিন্ন কিছুর পূজা করে জীবন শেষ করে দিল। শেষ পর্যন্ত পাষণ্ড মৃত্যু তাকে আঁকড়িয়ে ধরল। তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ইন্ধন বানিয়ে দিল। আর আমাদের এই অনুগ্রহকারীর ভয়ানক শাস্তি একটুও ব্যথিত করল না। এ সত্ত্বেও নবীর এত্তেবা দাবি করা সুস্পষ্ট জুলুম ছাড়া আর কী হতে পারে? আর ঈমানের উপর বিজয়ের আশা করা কাল্পনিক পোলাও ছাড়া আর কী হতে পারে?

দাওয়াত ছাড়া আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হক আদায় হয় না
হক আদায় করার নাম হলো ঈমান। এর বিপরীত জুলুম। আল্লাহর হক হলো, তাঁর সত্তা ও গুণাবলীর উপর ঈমান আনা। তাঁর হক আদায় করা। তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার না বানানো। এ ব্যাপারে ঈমানদারের চৌকষ হওয়া উচিত। শিরকের গন্ধেও যেন ঘৃণা সৃষ্টি হয় এবং সে যেন তার পরিবেশকেও শিরকমুক্ত করে। কারণ এই জুলুম থেকে আমাদের বাঁচতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاتَّقُوْا فِتْنَةً لَا تُصِيْبَنَّ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا مِنْكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوْا أَنَّ اللّٰهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ
অর্থ: আর তোমরা এমন ফাসাদ থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষতঃ শুধু তাদের ওপর পতিত হবে না যারা তোমাদের মধ্যে জালেম এবং জেনে রেখ যে, আল্লাহ্র আযাব অত্যন্ত কঠোর। -সূরা আনফাল-২৫
এর দ্বারা বুঝা গেল, জুলুম হচ্ছে কোনো অন্যায় জানার পরও তা দূর করার চেষ্টা না করা। এ কারণে তাকে শাস্তির সম্মুখিন হতে হবে। “শিরক আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় জুলুম।” এই বাণী অনুযায়ী হক আদায় করার জন্য শিরককারীকে একত্ববাদের দাওয়াত দেয়া খুবই জরুরী।
এই দাওয়াতের মূল্যায়ন এবং শেষ ওসিয়তের হক আদায় করা ছাড়া, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হক আদায়কারী হতে পারে না। বাকি মানুষের হক, কুফর শিরক থেকে বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়া, বান্দার হক আদায় হতে পারে না। হক আদায় করা যেহেতু ঈমান আর তা না দেয়া হলো জুলুম। এমন ঈমান হবে যা জুলুম মুক্ত। ইসলাম একটি পথ। এ পথে চললে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে হেদায়াত পাওয়া যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اَ لَّذِيْنَ آَمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُوْنَ
যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শেরেকির সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী। -সূরা আনআম ৮২

দাওয়াতি কাজ ত্যাগ করায় আখেরাতের লাঞ্ছনা
জালেমের পরিণাম এবং পরকালে তার লাঞ্ছনার কথা কুরআনে এভাবে চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلٰى يَدَيْهِ يَقُوْلُ يَا لَيْتَنِىْ اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيْلًا ۝ يَا وَيْلَتٰى لَيْتَنِىْ لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيْلًا ۝ لَقَدْ أَضَلَّنِىْ عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِىْ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُوْلًا ۝
২৭. জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস। আমি যদি রাসূলের পথ অবলম্বন করতাম। ২৮. হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। ২৯. আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়। -আল-ফুরকান -২৭-২৯
এখানে কয়েকটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা লক্ষণীয় :
১. প্রথমত : কোনো ব্যক্তি যতো বড় শিক্ষিত হোক, আর রুহানী শাইখ হোক, বা দার্শনিকই হোক না কেন, যদি নবীর পথ থেকে দূরে সরার দাওয়াত দেয়, তাহলে কুরআনের ভাষায় সে ‘ফুলানা’ (অমুক)-দের অন্তর্ভুক্ত হবে।
২. জালেম যেই জুলুমের কারণে সবচে বেশি লজ্জিত হবে, সেই ভুলকে স্বীকার করে নিবে। নিজের হাত চিবাতে থাকবে। তা হবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর অনুসরণ না করার কারণে।
৩. যে কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ ছাড়া, দুনিয়ার যে কোনো মানুষের অনুসরণই করুক না কেন, সে হবে জালেম। কেয়ামতের দিন সে খুবই লজ্জিত হবে।
৪. এই আয়াতের মধ্যে সাবিল শব্দ দ্বারা বিশেষ করে রেসালাতের পথ বুঝানো হয়েছে। রেসালাতের পথ সম্পর্কে অন্য স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قل هذه سبلى ادعو إلى الله على بصيرة انا ومن تبعى
অর্থ: বলে দিন: এটাই আমার পথ। আমি আল্লাহ্র দিকে জেনে বুঝে দাওয়াত দেই- আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ্ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।-সূরা ইউসুফ-১০৮
এখানে একথাও স্পষ্ট হওয়া উচিতÑ সীরাত এবং সাবীল দুটো পৃথক পৃথক জিনিস। সীরাত দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণ সোজা পথ। যেমন হাইওয়ে। আর সাবিল ঐ পথ, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে বানানো হয়। প্রিয় নবী যা কিছু বলেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ۝ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوْحَى
৩. এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। ৪. কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। Ñআন-নাজম-৩-৪
বুঝা গেল রেসালাতের পথ হলো বুঝে-শুনে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়া। এছাড়া যত পথ আছে তা হলো, অমুকের পথ, যা এই আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। যারা পরকালে লাঞ্ছিত হবে এবং হাত কামড়াবে।

বিজয়ীদের জন্য একটি পথ হলো দাওয়াত
দুনিয়ার যে কোনো ময়দান আপনি বিজয় করতে চান, তা বিজয় করার জন্য দাওয়াতের পথ থেকে সহজ আর কোনো পথ নেই। আপনি যদি বিজ্ঞানীদের উপর বিজয়ী হতে চান। তাহলে আপনাকে বিজ্ঞানীদের একটি টিম তৈরি করতে হবে, যারা বর্তমান বিজ্ঞানীদেরকে পরাস্ত করে দিবে। এটা অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন। এর বিপরীত এই বিজ্ঞানীদেরকে দাওয়াত দিয়ে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসা অনেক সহজ। কারণ তারা সৃষ্টিজীবের সৃষ্টির মধ্যে চিন্তা করতে করতে অস্থির হয়ে উঠছে। তারা মারেফতের একটি বিশেষ স্তরে পৌঁছে গেছে। এখন যদি আপনি তাকে দাওয়াতের মাধ্যমে তার দৃষ্টির পর্দাকে সরিয়ে দেন, তাহলে তাওহীদ ও ইসলামের অন্যান্য শিক্ষার খুবই নিকটবর্তী হয়ে যাবে। এভাবে আপনি বিজ্ঞানের জগতে বিজয় অর্জন করতে পারবেন।
এমনি ভাবে যদি আপনি রাজনীতির মাঠে বিজয়ী হতে চান। বর্তমান ইসলামি রাজনীতি করে মুসলমানদেরকে আয়ত্ত্বে আনা খুবই কঠিন। এর বিপরীত রাজনীতিবিদদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদের মাধ্যমে এই ময়দানে বিজয় অর্জন করা খুবই সহজ। এমনিতেই আমাদের ধর্ম, কোনো মানুষের অন্তরকে জয় করা, তার হেদায়াতের মাধ্যম হওয়া, পুরো দুনিয়া বিজয় করা থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
খায়বার যুদ্ধে বিজয়ের প্রসিদ্ধ ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিলেন আজকে জিহাদের পতাকা ঐ ব্যক্তিকে দেয়া হবে, যার উপর আল্লাহ ও তার রাসূল খুশি। সকল সাহাবাগণ এই আশায় ছিলেন যে, এই পতাকা যেন আমার ভাগ্যে চলে আসে। যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রাজির সুসংবাদের অধিকারী হয়ে যাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রা. কে ডেকে তাঁর হাতে পতাকা দিলেন। এবং বললেন যাও, দাওয়াত দাও, আর জিহাদ কর। তোমার মাধ্যমে যদি একটি মানুষও হেদায়াত পেয়ে যায়, তাহলে সব কিছু থেকে উত্তম। যার উপর সূর্য উদিত হয়। যেন পুরো পৃথিবীকে বিজয় করার থেকে একজন মানুষের হেদায়াত পেয়ে যাওয়া বেশী উত্তম।
মূল. হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ