দীনের সংরক্ষণ আল্লাহর হাতে

ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা তার নিজ দায়িত্ব নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন –

  إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 

আমি এই উপদেশগ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।

অত্যন্ত তাপ ও প্রতাপের সাথে আল্লাহ তাআলা হেফাজতের ঘোষণা করেছেন এবং কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত সকল জিনিসেরই হেফাজতের ঘোষণা দিয়েছেন। দীনের হেফাজতের জিম্মাদারী প্রথমে আসবে। পূর্ববর্তী উম্মতদের দায়িত্ব ছিল, তাদের কিতাবের হেফাজতের জিম্মাদারি। ইসলামকে আল্লাহ তাআলা কেয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবেন। তাই তার হেফাজতের জিম্মাদারি নিজেই নিয়েছেন। আমরা যদি আমাদের জাতি ও বংশদরদের হেফাজত করতে চাই, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষণকৃত ধর্মের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিজেদের হেফাজতের জিম্মাদারী নিয়ে নিই। মুসলমানদেরকে সম্মানিত করার জন্য তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ইসলামের প্রচার-প্রসার ও দাওয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম এবং শরিয়তে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেজাজ না বোঝার কারণে আমদের মেজাজ অগ্রগামী না হয়ে প্রতিরক্ষামূলক হয়ে গিয়েছে। ইসলামের প্রচার, দাওয়াতের পরিবেশ ও ইসলামের হেফাজতের জন্য সকল চেষ্টা ব্যয় হচ্ছে। অবস্থা এই পর্যায়ের যে, যাদের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ আছে তাদের কাছে অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতী কাজের চেষ্টা হয় আত্মরক্ষামূলক। এই চেষ্টা তাকে কীভাবে অন্যের ভুল ধারণা দূর করা যায়। ইসলামের ওপর আরোপ করা বিভিন্ন আক্রমণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেওয়া যায় ইত্যাদি। এসব চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও একটি কথা পেশ করা খুব প্রয়োজন মনে করছি। ইসলামের মেজাজ আত্মরক্ষামূলক নয় বরং আক্রমণাত্মক।  রিঅ্যাকশন ও দেফায়ী চিন্তার কারণে একের পর এক অমুসলিমদের পক্ষ থেকে আক্রমণের শিকার হচ্ছে। দীনি মাদরাসা হেফাজতের জন্য মুসলিম পার্সনাল ল বোর্ডের হেফাজত, দীনি ব্যক্তিদের কুরবানী মাথায় রাখার মতো, কিন্তু এটাও বাস্তবতা এই ক্ষেত্রে আমরা যদি আগে ভাবতাম তাহলে অন্যরা হেফাজত করতো।

দাওয়াতী কাজ কি আক্রমণাত্মক না আত্মরক্ষামূলক?

আমাদের উচিত ছিল আমরা অমুসলিম ভাইদেরকে বলব যে, আমরা যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছি এগুলো আপনাদের জন্যও ওই পরিমাণ জরুরী যে পরিমাণ আমাদের জন্য জরুরী। রবং এসব মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা আমাদের মতো আপনাদের জন্যও জরুরী। এই দাওয়াতটি আমাদের দেওয়া উচিত ছিল। এই দাওয়াত পাওয়া তাদের অধিকার ছিল। এও বলা উচিত ছিল যে, কুরআনের যেসব আইনের কথা বলা হয়েছে, মুসলিম পারসনাল ল বোর্ড যা আপনাদের জন্যও জরুরী। যতটুকু জরুরী একজন মুসলমানের জন্য। এই নিয়মে যদি আমাদের দাওয়াত হতো তাহলে নিজেদের হেফাজতের জন্য এই পরিমাণ মেহনত করতে হতো না।

   একজন অমুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ বিচারপতি ভারদওয়াজ তার বই ‘ইউনিফর্ম সওয়াল কোর্ট’ এ লেখেন, হিন্দুস্তানের শান্তির ও ঐক্যের জন্য ইউনিফর্ম সওল কোর্র্টের কোনো প্রয়োজন নেই। মনে করুন হিন্দুস্তানের সকলেই যদি একমত হয়ে যায় যে, ভারতে সকলের জন্য একটি আঞ্চলিক আইন মওকুফ করে দেওয়া হয়, তাহলে আমার মতে মুসলিম পার্সনাল ল’কেও মওকুফ করে দেওয়া উচিত। কারণ মানুষের জন্য এর চেয়ে পূর্ণ কোনো আইন নেই। তাহলে মুসলমান হয়ে দা‘য়ী হয়ে সকল মানুষকে কুরআনের দাওয়াত দিচ্ছি না কেন?

বাপ-দাদাদের আমল, সত্য গ্রহণে বড় বাধা

বাপ-দাদাদের প্রচলিত বিষয়ের ওপর আমল করা মানুষের পুরোনো দুর্বলতা। সত্য গ্রহণে এই মানসিকতা অনেক বড় বাধা। সকল নবী মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন তারা যেন মূর্তিপূজা ছেড়ে একত্ববাদকে স্বীকার করে। আল্লাহকে মানে। কিন্তু তাদের দাওয়াতের উত্তর তারা কী দিয়েছে তা কুরআন উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনÑ

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللّهُ قَالُواْ بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لاَ يَعْقِلُونَ شَيْئاً وَلاَ يَهْتَدُونَ.

‘আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তাআলা নাজিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনও না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব। যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও।’   

দাওয়াতের মতো ফরজ বিধানে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, মানুষ মনে করে দাওয়াতী কাজ যদি জরুরী হতো, তাহলে আমাদের আকাবিররা এই কাজ কেন করেননি? এই ধারণাও হলো আমাদের অজ্ঞতার কারণ। আপনি দেশের ইতিহাস খুলে দেখুন। তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আমাদের বড়রা কীভাবে এই কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন।

   এটাও একটি ভুল ধারণা যে, আকাবির বুযুর্গ সুফীদের হাতে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। আপনি যেখানেই থাকেন যেকোনো বুযুর্গের জীবনী পড়ুন দেখবেন তাদের হাতে কিছু না কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ চিশতি সুফিয়ায়ে কেরামের জীবনী পড়ুন তাহলে দেখবেন, তাদের খানকাগুলোই সাক্ষী দিচ্ছে এগুলো দাওয়াতের উদ্দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজমীর ও পুশকরজীর ঘরে হিন্দুস্থান বিজয়ী খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি রহ. জমে বসে যাওয়া ও তার দাওয়াতী সফলতাকে অস্বীকার করতে পারবে? ছত্তরপুর তীর্থের পাশে মহরওয়ালীতে খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ারের রহ.-এর খানকা, দিল্লিতে হযরত নিজামুদ্দীন রহ.-এর খানকা, হরিদওয়ার ও রিশিকেশের কেলিইরে হযরত আলাউদ্দীন সাবের কেলেরী রহ.-এর দাওয়াতী প্রচেষ্টা ও তার বিজয়ের কথা কে না জানে? আপনি যেকোনো নিসবতওয়ালা বুযুর্গের অবস্থা ও জীবনী পড়ুন তাদের দাওয়াতী প্রচেষ্টা খুব সম্মানের সাথে পেশ করবেন। দুই আর দুই চারের মতো বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের বুযুর্গরা যে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিম্মাদারী ও নিজ উদ্দেশ্যের ওপর তারা কতটুকু আমল করেছেন। তারা দাওয়াতের কাজকে নিজের ওপর বাধ্য করে নিয়েছিলেন। আর কোনো বুযুর্গ বা আলেম ভুলবশত বা কোনো অপরাগতার কারণে দাওয়াতের কাজ করতে পারেননি, তাহলে আমরা তার সম্মান ও বুযুর্গীকে মেনে নিয়েই বলব তিনি এ ব্যাপারে মাজুর ছিলেন। আর তার এই কাজ অনুসৃত হবে না। এই জন্য প্রমাণ ও দলিল তো হলো কুরআন আর সুন্নাত ও সাহাবায়ে কেরামের জামাত। কারও যদি এই প্রশ্ন জাগে যে, আমাদের বড়রা কেন দাওয়াত দেননি, তাহলে উত্তর হবে আমাদের বড়দের বড়, সবচেয়ে বড়, যিনি আমাদের আদর্শ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল কী ছিল? প্রকাশ থাকে যে, সবচেয়ে বড়র মোকাবেলায় সাধারণ বড়দের কী গুরুত্ব আছে?

উদ্দেশ্যের সাথে ইশ্ক সমস্যার সমাধান

দাওয়াতী কাজে একটি প্রতিবন্ধকতা হলো এই ধারণা করা যে, দাওয়াতী কাজ করতে গেলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আর দাওয়াতী কাজে যেসব ওয়াসায়েল বা মাধ্যম প্রয়োজন সেগুলোতো আমাদের কাছে নেই। এ বিষয়ে পূর্বের কিছু আলোচনা করা হয়েছে। তা হলো, মাকসাদ ও উদ্দেশ্যের সাথে যদি ইশক ও ভালোবাসা থাকে তাহলে মাসায়েল-ওয়াসায়েল হয়ে যায়, অর্থাৎ সমস্যাগুলোই সমাধানের মাধ্যম হয়ে যায়। কেউ যদি দাওয়াতী কাজে মজা পেয়ে যায়, ফরহাদের ন্যায় ইশ্ক হয়ে যায়, তাহলে দুধের নহর খনন করাও মজার বস্তু হয়ে যায়। দা‘য়ীর সাথে আল্লাহর রহমত রয়েছে। তার হেফাজতের জন্য এমন আশ্চর্যজনক আচরণ হয়, তার অসম্ভব ইচ্ছাও পূরণ হয়ে যায়।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ