নওমুসলিম জনাব নূর মুহাম্মদ (রামফল)-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

ইসলাম গ্রহণের আগে আমার মা’র সঙ্গে আমার বনি-বনা হত না। তিনি আমার এই খেদমতদৃষ্টে খুবই প্রভাবিত হন এবং তাঁর মনে ধারণার উদয় হয় যে, মুসলমান হয়ে এ এমন হয়ে গেছে। আমি সুযোগ বুঝে তাঁকে মুসলমান হতে বলি। তিনি তৈরি হন। আমি তাঁকে কলেমা পড়াই এবং ফাতেমা নাম রাখি।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নূর মুহাম্মদ: ওয়া আলায়কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: জনাব নূর মুহাম্মদ সাহেব। আমাদের এখন থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি উর্দূ মাসিক পত্রিকা বের হয়। আমি এজন্য আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই, যাতে সেসব কথা পত্রিকায় আসে এবং লোকে উপকৃত হয়।
নূর মুহাম্মদ: আহমদ ভাইয়া। আমার মত এক গ্রাম্য লোকের সঙ্গে কী কথা বলবেন যদ্দারা লোকে উপকৃত হবে।

আহমদ আওয়াহ: আল্লাহ তা’আলা আপনাকে এমন যুগে আপন অনুগ্রহে হেদায়াত দান করেছেন। আপনার জীবন আল্লাহ্র বদান্যতার নমুনা।
নূর মুহাম্মদ: হ্যাঁ ভাইয়া। এতে সন্দেহের কী আছে যে আমার আল্লাহ আমাকে হেদায়াত দান করেছেন। (কাঁদতে কাঁদতে) আমি কখনো এর উপযুক্ত ছিলাম না। যদি আমার শরীরের প্রতিটি পশম এক একটি জীবন হয় আর আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনে সেগুলো কুরবান করে দিই তারপরও শোকর আদায় হবে না। জান ও পশগুলোও তাঁরই নেয়ামত।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার পরিচয় দিন।
নূর মুহাম্মদ: আমার পুরানো নাম রামফল। মীরাট জেলার দাদরী নামক গ্রামে গোজর পরিবারে আমার জন্ম। পিতাজী ছিলেন এক ক্ষুদ্র কৃষক। ২৫ বছর হল তিনি মারা গেছেন। ১৩/১৪ বছর আগে আল্লাহ আমাকে হেদায়াত দান করেন। আমি ফুলাত এসে আপনার আব্বার হাতে ইসলাম কবুল করি এবং আমার ইচ্ছানুক্রমে তিনি আমার বড় ভাইয়ের নামে নূর মুহাম্মদ নাম রাখেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বড় ভাইও মুসলমান হয়েছিলেন?
নূর মুহাম্মদ: জী হ্যাঁ! আসলে মুসলমান তিনিই হয়েছিলেন এবং আমি তাঁর সাদাকায় হেদায়াত পাই।

আহমদ আওয়াহ: একটু বিস্তারিতভাবে আপনার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী শোনান।
নূর মুহাম্মদ: আমার এক বড় ভাই ছিলেন জয়পাল। তিনি খাতূলীতে মীরাটের লালাদের এখানে চাকুরি করতেন। তাদের ওখানে বিরাট কারবার ছিল। ভাই সাহেব ছিলেন বড়ই ধার্মিক, সজ্জন ও রহমদিল মানুষ। কোন দুঃখী মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি দেখতে পারতেন না। আহত জীব-জানোয়ার দেখলে তিনি পেরেশান হয়ে যেতেন। বড্ড ভাবুক কিসিমের লোক ছিলেন তিনি। ফুল ও গাছ-গাছালীর চারা দেখলে তিনি এড়িয়ে যেতেন। তারকারাজি দেখলে অস্থির হয়ে উঠতেন। উঠে বসে পড়তেন। সারাটা রাত মালিকের তারীফ করতেন, প্রশংসা গীতি গাইতেন। তার কারখানার পাশে ফুলাতের দু’জন লোকের দোকান ছিল, যারা ফার্নিচার ইত্যাদি বানাত। তাদের দোকানে আপনার আব্বা (মাওলানা কালীম সাহেব) কখনো কখনো আসতেন। ভাই সাহেব তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। দু’চার জন জমা হত, মাওলানা সাহেব তাদেরকে দীনের কথা বলতেন। আমার ভাইও নিচে বসতেন, সেসব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ইসলামের কথা তাঁর খুব ভাল লাগত। মাওলানা সাহেব বলেন যে, তাঁর ধারণাই ছিল না যে এই লোকটি হিন্দু। আগস্ট মাসে খাতূলীতে ছড়ির মেলা বসত। ১৯৯০ সালে মেলা বসতে যাচ্ছিল। মাওলানা সাহেব বলেন, আমি সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম তখন কসীমুদ্দীন দ্রুতগতিতে এসে আমাকে সালাম করল এবং বলল, দাদরীতে এক গোজর মীরাটওয়ালাদের কারখানায় থাকে, সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ছটফট করছে। আপনি পাঁচ মিনিটের জন্য তার সঙ্গে দেখা করুন। মাওলানা সাহেব এসে দোকানে বসেন এবং কারখানার ভেতর থেকে আমার ভাইকে ডেকে আনেন। ভাই সাহেব মাওলানা সাহেবকে বলেন, মাওলানা সাহেব। আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। দেখেছি একটি খুব সুন্দর ও সুদৃশ্য স্বর্ণ-রথ। এর ওপর বহু হযরত অর্থাৎ মাওলানা মানুষ উপবিষ্ট। আপনি সেই রথ চালাচ্ছেন। সামনেই এক বিরাট প্রাসাদ, খুবই মনোরম ও সুদৃশ্য যা হীরা দ্বারা মণ্ডিত! কাচের গোলাকৃতি বেলুন দ্বারা সজ্জিত। আটটি দরজা। লোকে বলছে, এটি স্বর্গ। আমি এটা শুনতেই রথ ধরে ঝুলতে থাকি। কিন্তু আপনি আমার হাত ধরে নামিয়ে দিলেন এই বলে যে, এ হিন্দু! তুমি এ অবস্থায় স্বর্গে যেতে পার না। আপনারা সকলেই স্বর্গে চলে গেলেন আর আমি দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকি। এই বলে ভাই সাহেব মাওলানা সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন এবং খুব কাঁদলেন। মাওলানা সাহেব! আপনি আমাকে স্বর্গে যেতে দিলেন না কেন? আপনার কী ক্ষতি হত? মাওলানা সাহেব তাকে সান্ত¡না দিলেন এবং বললেন যে, ভাই! আমি তো এই স্বপ্ন সম্পর্কে জানিও না। কাউকে স্বর্গে যাওয়া থেকে বাধা দেবার কোন অধিকারও আমার নেই। আসলে স্বর্গে যাওয়া থেকে তিনি বাধা দিয়েছেন যিনি স্বর্গের মালিক। তাঁর আইন হল, তিনি কেবল ঈমানদারদের ও মুসলমানদের জন্য স্বর্গ বানিয়েছেন। সত্যি কথা হল এই, যিনি ঈমান না আনবেন এবং মুসলমান না হবেন দুনিয়াতে তার থাকার ও বসবাসের কোন অধিকারই নেই। তার সংসারের ন্যাশনালিটি বা জাতীয়তা নেই।
ঈমানবিহীন মানুষ বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকের মত দুনিয়াতে থাকে। এই দুনিয়ার মালিক এক ও একক খোদা এবং তিনি তাঁর দুনিয়ার মানুষের জন্য এক ইসলামের আইন তাঁর সত্য নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। যেসব লোক সেই এক ও একক মালিককে মানবে না এবং তাঁর তৈরি ইসলামের আইন মানবে না সে তো আল্লাহর দ্রোহী ও গাদ্দার। দুনিয়াতে থাকার ও বসবাসের কোন অধিকার তার নেই। অতএব সে কীভাবে স্বর্গে যাবে? আপনি যদি স্বর্গে যেতে চান তাহলে আপনি কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। আজ তো স্বপ্ন দেখে এতটা পস্তাচ্ছেন তখন যে মৃত্যুর ব্যাপারে আদৌ জানা নেই তা কখন আসবে, মৃত্যুর পর আল্লাহ না করুন, আপনি যদি মুসলমান না হন তাহলে এই স্বপ্ন বাস্তব সত্যে পরিণত হবে এবং এরপর আর সেখান থেকে ফিরেও আসতে পারবেন না। ভাই সাহেব বললেন, দাদরীর মত গ্রামের আজকের এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে যদি আমি মুসলমান হয়ে যাই তাহলে আমার ঘরের লোকেরাই আমাকে মেরে ফেলবে। মাওলানা সাহেব বললেন, মেরে ফেললে তো আপনি শহীদ হয়ে যাবেন এবং আরও তাড়াতাড়ি জান্নাতে চলে যাবেন। ভাই সাহেব বললেন, আমি যদি মুসলমান হই তাহলে আমাকে ঘর ছাড়তে হবে। এরপর আমি থাকব কোথায়?

মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি ফুলাত চলে আসবেন এবং আমাদের এখানে থাকবেন। ভাই সাহেব বললেন, আমি দু’চার দিনের মধ্যেই বাড়ির লোকদের বলে এসে যাব। মাওলানা সাহেব বললেন যে, দেখা করেই যেন ফুলাত চলে আসেন। মনে করেছিলাম যে, দু’চার দিনের মধ্যেই জয়পাল ভাই ফুলাত এসে যাবেন। কিন্তু তিনি আসলেন না। নভেম্বরের শেষ দিকে এক দিন মাওলানা সাহেব জোহরের নামাযের জন্য বের হলে দেখতে পান জয়পাল ভাই বাইরে বসে। কিছু ফলমূল ইত্যাদি নিয়ে এসেছে। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন ও বললেন, মাওলানা সাহেব! আপনি ভেবে থাকবেন যে, ধোঁকা দিয়ে গেছে। আসলে আমার নামে কিছু জমি-জমা ছিল। আমার মা আছেন। আমি ভাবলাম যে, মা’র সেবা করাও তার হক। আমি এখন থেকে চলে যাব। তাঁর সেবার কী হবে? আমি আমার ভাতিজাকে ডেকে পাঠাই এবং তাকে কসম দিয়ে বলি ও তার থেকে ওয়াদা নেই যে আমি আমার সমস্ত জমি-জমা তোমার নামে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শর্ত হল, তুমি আমার মা’র অর্থাৎ তোমার দাদীর অন্তর মন দিয়ে সেবা করবে। সে রাজী হল। জমি-জমা ও ঘরের অংশ তার নামে করতে এত সময় লেগে গেল। এখন আমি এসে গেছি। আমাকে মুসলমান হতে কী করতে হবে? মাওলানা সাহেব তাকে সাথে করে মসজিদে নিয়ে যান এবং তাকে গোসলের নিয়ম-কানুন বলে মসজিদের গোসলখানায় গোসল করতে বলেন। ফুলাতে তখন একটি আরব জামা’আত এসেছিল।

জামা’আতের দু’চার মিনিট আগে মাওলানা সাহেব তাকে মসজিদের ভেতর অংশে নিয়ে যান এবং গিয়ে তাকে কলেমা পড়ান। মসজিদে সাহানে রোদের ভেতর জামা’আতের লোকেরা বসেছিল। সবাই দেখতে থাকে একজন অপরিচিত লোককে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? জামা’আত দাঁড়িয়ে গেল। মাওলানা সাহেব ভাই সাহেবের নাম রাখেন নূর মুহাম্মদ। তিনি তাকে নিজের বরাবর জামা’আতে দাঁড় করিয়ে দেন। ভাই সাহেব কোন রকম নামায পড়ে ঘরে এসে খানা খান। আসরের নামাযে আবার মসজিদে যান। নামাযে আরবের লোকদের দেখতে পান। ভাই সাহেবকে তাদের ভাল লাগে। রাত্রে তিনি তাদের সাথে থাকেন।

পরদিন ছিল রবিবার। জামা’আত মীরাট যাবার কথা। ভাই সাহেব মাওলানা সাহেবকে বলেন, আমার মন চাচ্ছে এই জামা’আতের সঙ্গে যেতে। মাওলানা সাহেব গুজরাটের অধিবাসী আমীর সাহেবের সঙ্গে ভাই সাহেবকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তার ইচ্ছার কথা জানান। আমীর সাহেব খুশী হন এবং বহু পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও মাওলানা সাহেব থেকে তার খরচ বাবদ কিছু নেননি। জামা’আত মীরাট যায়। তিন-চার দিন পর মাওলানা সাহেব ভাই সাহেবের খবর নেয়ার জন্য একজন হাফেজ সাহেবকে মীরাট পাঠান। অতঃপর জানতে পারেন যে, জামা’আত মীরাট পৌঁছেছে। সোমবার দিন ভোরে ফজর নামায পর মুযাকারা ও নামায প্রভৃতি মুখস্থ করাবার জন্য নূর মুহাম্মদকে তালাশ করা হয়। এ সময় কেউ বলে আজ সম্ভবত ফজরের নামাযও পড়েনি। সে ভেতরে তাহাজ্জুদের নামায পড়ছিল। তালাশের নিমিত্ত এক সাথী মসজিদের ভেতর গিয়ে দেখতে পায় সদরী বরাবর একটি আলাদা অংশে সে সেজদারত। সাথী ডাকলে সে সাড়া দেয় না। সাথীটি ধারণা করে সম্ভবত সে সিজদার মধ্যে ঘুমিয়ে গেছে। ঠেলা দেবার পর জানা যায় সে চিরদিনের মত রহমতের ছায়াতলে ঘুমিয়ে গেছে। সর্বমোট ৯টি ফরয নামায এবং একটি তাহাজ্জুদ নামায তার নসীব হয়েছিল। যে-ই শুনতো এ ধরনের মৃত্যুর জন্য আকাক্সক্ষা জাহির করত। জোহরের নামাযের সময় মীরাটেই তাকে দাফন করা হয়।

আহমদ আওয়াহ: হ্যাঁ, হ্যাঁ। এ ঘটনা অধিকাংশ সময় আব্বু আমাদেরকে শুনিয়ে থাকেন। তা এ ঘটনা আপনার ভাইয়ের তাহলে? এখন আপনি আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা বলুন।
নূর মুহাম্মদ: ভাইয়া! মূলত আমাদের ইসলাম তো ভাই সাহেবের ঈমানের সদাকা। এতকাল পর্যন্ত আমরা তো জানতেই পারিনি তিনি ইন্তিকাল করেছেন। কিন্তু তিনি আমার ছেলেকে স্বপ্নে প্রায় দেখা দিতেন। বেশিরভাগ সময় ইসলামী পোশাকে টুপি, কোর্তা ও দাড়িসহ। একবার তিনি আমার ছেলেকে স্বপ্নে দেখা দেন। ভাই সাহেব বলছিলেন, বেটা! আমি আমার সব জমি-জমা তোমার নামে করে দিয়েছি। তুমি আমার এক কাজ করে দাও। এক ডজন কলা নিয়ে ফুলাতে বড় মাওলানা সাহেবকে পৌঁছে দাও। সে সকালে উঠল। খাতূলী থেকে কলা কিনল এবং ফুলাত গেল। মসজিদের মোল্লাজি তাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। মাওলানা সাহেব লাক্ষেèৗ গিয়েছিলেন। সে কলা মাওলানা সাহেবের ভগ্নিপতিকে দিয়ে আসে। বলে আসে যে, মাওলানা সাহেবকে বলবেন, দাদরীর জয়পাল এই কলা পাঠিয়েছে। একবার তাকে স্বপ্নে মাওলানা সাহেবকে এক কেজি মিষ্টি ফুলাত গিয়ে দিতে বলে। সে মিষ্টি নিয়ে যায়। ভাই নূর মুহাম্মদ মারা যাবার পর জান্নাতেও উপহার-উপঢৌকন পাঠাচ্ছেন। একবার আমাদের গ্রামে ঝগড়া হয়। একজন বড় ও শক্তিশালী মানুষ কিছু গরিব ও দুর্বল লোকের ওপর খুব অত্যাচার করে। আমার মন ছিল খুব দুঃখিত ও বেদনার্ত। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না। মনে মনে মালিকের কাছে অভিযোগ পেশ করতে থাকি যে, মালিক যখন সব কিছু দেখছেন তখন এই অত্যাচার কেন হয়? অনেক রাতে ঘুম এল। স্বপ্নে দেখি, লোকের ভিড় এক দিকে চলেছে। আমি জানতে চাইলাম, এত লোক কোথায় যাচ্ছে? হঠাৎ দেখি ভাই সাহেব! তিনি বললেন, এসব লোক ফুলাত যাচ্ছে, মুসলমান হতে এবং মুসলমান হয়ে স্বর্গে যেতে। রামফল! জলদী কর! নইলে তুমি পেছনে পড়ে যাবে। জলদী যাও, জলদী! ফুলাত গিয়ে মাওলানা সাহেবকে বলবে, আমাকে মুসলমান বানিয়ে দিন যাতে আমি স্বর্গে যেতে পারি। আমি তো আমার মালিকের দয়ায় স্বর্গে এসে গেছি। ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্বপ্ন আমি খুব কম দেখি। কিন্তু এই স্বপ্ন আমাকে অস্থির করে তুলল।

সকাল হল। আমি ফুলাত পৌঁছলাম। বড় মসজিদে গেলাম। মোল্লাজি আমাকে মাওলানা সাহেবের এখানে নিয়ে গেলেন। তিনি কোথাও গিয়েছিলেন। জানতে পারলাম তিনি রাত পর্যন্ত এসে যাবেন। অপেক্ষা করলাম। কিন্তু তিনি আসতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পেলাম, মাওলানা সাহেব রাত দেড়টায় এসে পৌঁছেছেন। দিনটা ছিল সোমবার আর এ দিনটি ছিল মাওলানা সাহেবের ফুলাতে থাকার দিন। সকাল থেকেই লোকজনের আসা শুরু হল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লোকে বিদায় নিতে লাগল। আমার পালা এল দেরিতে। ৯টার সময় সাক্ষাৎ হল। আমি জিজ্ঞেস করি, তিনি দাদরীর জয়পালকে চিনতেন কিনা। তিনি বললেন, খুব ভাল করেই চিনি। সে আমার কাছে এসেছিল। এরপর তিনি তার ইসলাম গ্রহণের পুরো কাহিনীটাই শুনিয়ে দিলেন। আমি আমার স্বপ্নের কথা তাঁকে বলি। মাওলানা সাহেব আমাকে মুবারকবাদ পেশ করলেন এবং বললেন, আজ রাতেই আমি তাকে স্বপ্নে দেখেছি। দেখলাম, নূর মুহাম্মদ খুব সুন্দর বেশ-ভূষায় সজ্জিত। সে আমাকে বলল, আমার ছোট ভাই রামফল আসছে। তাকে মুসলমান না হয়ে যেতে দেবেন না। মাওলানা সাহেব আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন, আপনি নূর মুহাম্মদের ছোট ভাই রামফল? না বলা সত্ত্বেও মাওলানা সাহেব আমার নাম তাঁর মুখে শুনে আমি আমার স্বপ্নের সত্য হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রত্যয় জন্মাল। আমি মাওলানা সাহেবকে আমার নিজের মুসলমান হওয়ার কথা বলি। তিনি আমাকে কলেমা পড়ান এবং আমাকে বলেন, আপনি যদি ইসলামী নাম রাখতে চান তাহলে তা পাল্টাতে পারেন। নাম পাল্টানো জরুরী কোন বিষয় নয়। জরুরী হল অন্তর পাল্টানো দিল বদলানো। আমি বললাম, আপনি আমার নাম রেখে দিন। আরও ভাল হয়, যে নাম নিয়ে আমার বড় ভাই স্বর্গে গেছেন আপনি সেই নাম রেখে দিন। আমার নাম কি নূর মুহাম্মদ রাখা যায়? মাওলানা সাহেব বললেন, কোন ক্ষতি নেই। এরপর তিনি আমার নাম রাখেন নূর মুহাম্মদ। অতঃপর একদিন থেকে দাদরীতে নিজের বাড়ি চলে আসি। পরদিন আমি আমার স্ত্রীকে গোটা ব্যাপারটি বলে দিই। সে খুব অসন্তুষ্ট হয় এবং আমার গোটা পরিবারে ব্যাপারটা ফাঁস করে দেয়।

আমার চাচা ছিলেন গ্রামের প্রধান। এ নিয়ে গ্রামে পঞ্চায়েত বসে। কেউ কেউ বলে, আমার মুখে কালি মেখে গাধার পিঠে বসিয়ে মিছিল কর। কেউ মত দিল, তাকে গুলি করে মেরে ফেল। সে কাফির হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামে ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল। তিনিও ছিলেন এ পঞ্চায়েতে। তিনি বলেন, এই যুগ-যামানা হল যুক্তি-প্রমাণের যুগ-যামানা। আপনারা তাকে বোঝান এবং প্রমাণ করুন যে, হিন্দু ধর্ম ইসলামের তুলনায় ভাল। জোর-যবরদস্তি করে আপনারা তাঁর দিল পাল্টাতে পারবেন না। ভাল হবে আপনারা তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। যেহেতু তিনি শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত লোক ছিলেন ফলে তাঁর বোঝাবার কারণে পঞ্চায়েত সমাপ্ত হয়। আমার মা আমাকে খুব বোঝান। তাঁর ধারণা ছিল, ফুলাতওয়ালা তার ওপর যাদু করেছে। যাদুর হাত থেকে আমাকে মুক্ত করবার জন্য আমাকে তিনি ফালাওদাহ নিয়ে যান। চেয়ারম্যান সাহেব যিনি, এসবের ঝাড়-ফুঁকের উস্তাদ ছিলেন,তার পায়ের ওপর তিনি পড়ে যান এবং তাকে বলেন আমার ছেলের ওপর যাদু করা হয়েছে। ফলে সে কাফির হয়ে গেছে। অবিশ্বাসী হয়ে গেছে। আপনি আমার ওপর দয়া করুন। তিনি আমাকে সান্ত¡ানা দেন এই বলে যে, তার ওপর কোন যাদু নেই। মালিকের স্রোত বয়ে চলেছে। আপনিও গিয়ে ফুলাতওয়ালাদের সঙ্গে মিলিত হন। তারা খুব মেহমান নাওয়ায। তারা দুঃখী-অসহায় মানুষকে সাহায্য করে। সেখান থেকে আমরা উভয়ে ফিরে আসি। মাকে বহুৎ বোঝাই যে, মা! আপনিও মুসলমান হয়ে যান। সবচেয়ে বেশি আমাদের চাচা প্রধানজী কষ্ট পান। তিনি বলতেন, রামফল আমাদের সমাজে মুখ দেখাবার মত রাখেনি। শেষে না পেরে একদিন তিনি পূর্ণিমার অজুহাতে দাওয়াত দেন। রাত্রে আমি স্বপ্নে আপনার আব্বাকে দেখি। মাওলানা সাহেব আমাকে বলছিলেন, পূর্ণিমার দাওয়াতে ক্ষীরের যেই পেয়ালা তোমার সামনে আসবে তা বিষ মাশানো, তা কখনো খাবে না। দাওয়াত হল। স্বপ্নে যা দেখেছিলাম বাস্তবেও তেমনটিই পেলাম। আমার চাচা আমার সামনে ক্ষীরের পেয়ালা রাখলেন, আমি রুটি খেতে শুরু করি এবং সুযোগ বুঝে সেই পেয়ালা চাচার সামনে ঠেলে দিই। তিনি জানতে পারেননি। দু’তিন চামচ ক্ষীর খেতেই এর প্রতিক্রিয়া শুরু হল।

তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মীরাট নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি মারা যান। তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আমি ফুলাত এসে মাওলানা সাহেবকে সমস্ত ঘটনা শুনাই এবং তাঁর কাছ থেকে জানতে চাই, তিনি কীভাবে জানতে পারলেন যে, ক্ষীরে বিষ মেশানো হয়েছে। মাওলানা সাহেব বললেন, গায়েব (অদৃশ্য)-এর খবর আল্লাহ ব্যতিরেকে আর কেউ জানে না। আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে বাঁচিয়ে থাকেন এবং মু’মিনকে যার সঙ্গে তার মুহাব্বত হয় তার আকৃতিতে তাঁর ফেরেশতা পাঠিয়ে পথ দেখান। তাঁকে মেহেরবান রব বা প্রতিপালক বলা হয়। ঘরে গিয়ে মাকেও এইসব ঘটনা সব খুলে বলি। আমি কাফির (অবিশ্বাসী) হওয়া সত্ত্বেও চাচার এই শত্র“তা তাঁর খুব খারাপ লাগে এবং তিনি ইসলামের খুব কাছাকাছি এসে যান। চাচার দুই ছেলে এরপর থেকে আমার জানের দুশমন হয়ে যায়। আর এদিকে আমি রোজকার ঝগড়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য গ্রাম ছাড়ি এবং ফুলাত এসে থাকতে শুরু করি। আমার বাড়ির লোকেরা এখানেও পিছু নেয়। কিন্তু এখানে তাদের করার কিছু ছিল না।

আহমদ আওয়াহ: ফুলাতে আপনি কতদিন থাকেন?
নূর মুহাম্মদ: তিন বছরের বেশি আমি ফুলাতে থাকি। সেখানে আমি নামায-রোযা প্রভৃতি মুখস্থ করি। যিকর করতাম এবং সমাগত মেহমানদের খেদমত করতাম।

আহমদ আওয়াহ: শুনেছি, আপনি ফুলাতে থাকাকালে নামাযের ভেতর খুব কান্নাকাটি করতেন।
নূর মুহাম্মদ: ভাইয়া! আমি কী কাঁদব (কাঁদতে কাঁদতে)? এক ফোঁটা নাপাক পানিতে সৃষ্ট এই মানুষের এত বড় মালিকের সামনে যাওয়ার যদি সুযোগ ঘটে আপন প্রিয় আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য জোটে তাহলে কান্না তো আসবেই। কোন দারোগা যদি থানায় ডেকে পাঠান কাউকে তাহলে তার কী অবস্থা হয়। আর মালিকের সামনে গেলে কী অবস্থা হওয়া দরকার। যখনই আমি নিয়ত বাঁধি আমার অন্তরে খেয়াল জাগে, এই গান্দা নূর মুহাম্মদ আর কোথায় তোমার দরবার! মসজিদে যাই তো মনে হয়, আপন মালিকের, যিনি আমার পরম প্রিয় তাঁর করতলে মাথা পাতছি। মাওলানা সাহেব আমাকে নামাযের সঙ্গে নামাযের সূরাসমূহ ও দোআ-দরূদের অর্থও মুখস্ত করিয়েছিলেন। আমার মনে হয়, নামাযে আত-তাহিয়্যাতু ও দরূদ পড়া হয় কেন? একদিন মাওলানা সাহেব বলেন, মি’রাজে আমাদের নবী করীম (সা.)-এর সদাকায় আমাদেরকে আল্লাহ পাক এই দুর্লভ সুযোগ দান করেছেন। এজন্য নামাযের শেষে মি’রাজের সেই কথোপকথন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরূদ পাঠ করত আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম -এর অনুগ্রহ স্মরণ করা হয়। আমার এই কথা খুব মনে ধরে। এখন আমার দিল আত-তাহিয়্যাতু ও দরূদ পড়ার সময় খুব ভরে যায়। মনে হয়, প্রিয় নবী (সা.)-এর রূহও আমার প্রতি খুব খুশি।

আহমদ আওয়াহ: শুনেছি, আপনি হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অনেকবার স্বপ্নে দেখেছেন? দু’একটি কি শোনাবেন?
নূর মুহাম্মদ: আলহামদুলিল্লাহ! আমি দরূদ শরীফ আত-তাহিয়্যাতু খুব মন দিয়ে পড়ি এবং তখন থেকেই হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারতও খুব নসীব হয়। সর্বপ্রথম আমার হুযুর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যিয়ারত যখন নসীব হয় আপনার আব্বার মত বয়স কিছুটা বেশি, পরিষ্কার বর্ণ, আমাকে বলছেন, যাও, তোমার মাকে কলেমা পড়িয়ে দাও। সে তৈরি, তোমার অপেক্ষা করছে। সকালে আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম। তিনি আমাকে ঘরে যাবার পরামর্শ দিলেন। আমার মা ছিলেন খুব অসুস্থ। আমি ডাক্তার এনে মাকে দেখাই। তাঁর খেদমতের জন্য আমি বাড়িতে থেকে যাই। আমার ছেলেও তাঁর খুব সেবা করত। তাঁর ঘন ঘন পেট নামার অসুখ হয়ে গিয়েছিল। বারবার পরিহিত কাপড়-চোপড় খারাপ হয়ে যেত। আমি নিজ হাতে তাঁকে গোসল করাতাম। কাপড় ধুয়ে দিতাম। ইসলাম কবুলের আগে মা’র সঙ্গে আমার বনিবনা হত না। তিনি আমার এই খেদমতে খুব প্রভাবিত হন। তাঁর ধারণা জাগে, মুসলমান হয়ে সে এমনটি হয়েছে। সুযোগ বুঝে আমি তাঁকে মুসলমান হতে বলি। তিনি রাজি হলে আমি তাঁকে কলেমা পড়াই এবং তাঁর নাম রাখি ফাতেমা। আল্লাহ্র অনুগ্রহ, তিনি ভাল হয়ে যান। গ্রামের লোকেরা আমার গ্রামে আসাটাকে ভালভাবে মেনে নেয়নি। তারা আমার সাথে শত্র“তা করতে থাকে। কয়েকবার আমার ওপর হামলাও করে। কিন্তু আল্লাহ্র শোকর, আল্লাহ্ আমাকে রক্ষা করেন। আমি ফুলাত গিয়ে পরামর্শ করি।

মাওলানা সাহেব আমাকে গ্রাম ছাড়তে বলেন। আমি আমার মাকে নিয়ে মীরাটে এক ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করি। শুরুতে ঘর ভাড়া করে থাকলেও মাওলানা সাহেব আমাকে বলেন, ইসলাম রুযী-রোজগারের ভেতর ব্যবসাকে বেশি পছন্দ করে। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম-ও ব্যবসা করেছেন। আমি তরি-তরকারির ব্যবসা শুরু করি। এরপর মাওলানা সাহেব লোহার ব্যবসায় লাভ সম্পর্কিত হাদীস শোনান। সেই প্রেক্ষিতে আমি গ্রিলের দরজা-জানালার দোকান দিই। কারবার জমে ওঠে আমার ছেলে আমার কাছে মুসলমান হয়। গ্রামের লোকেরা আমার ঠিকানা জেনে যায়। তারা মীরাটে আমার পেছনে লাগে। আমার চাচার বড় ছেলে এক বদমায়েশকে দশ হাজার টাকা দেয় আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার জন্য স্বপ্নে আমি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামকে দেখি। তিনি আমাকে বলেন, কাল তোমাকে মারার জন্য এক বদমায়েশ আসবে। তার নাম মুহাম্মদ আলী। সে হবে কালো প্যান্টধারী ও নলি জামা পরিহিত। তাকে বলবে, মুহাম্মদ আলী হয়ে এক রামফলকে ‘নূর মুহাম্মদ’ হবার জন্য মারতে এসেছ আমাকে। আমি রাত্রে দোকান বন্ধ করে যাচ্ছিলাম। সেই লোকটি আসল। আমি তাকে বলি, মুহাম্মদ আলী হয়ে একজন রামফলকে ‘নূর মুহাম্মদ’ হওয়ার জন্য আমাকে মারতে এসেছ?’ সে বিস্ময়ের সাগরে নিক্ষিপ্ত হয়। বিস্ময়ের সুরে সে জিজ্ঞেস করে, আমার নাম তোমাকে কে বলল? আমি বললাম, তিনি বলেছেন যিনি সকল সত্যের সত্য, যিনি দুনিয়াতে সত্য শিখিয়েছেন। এরপর আমি তাকে রাত্রে দেখা স্বপ্নের কথা বলি। আমার ইসলাম গ্রহণের কথা বলি। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। অতঃপর তার রিভালভার আমার হাতে তুলে দিয়ে বলতে থাকে, এমন প্রিয় নব(সা.)-এর নামকে বদনামকারী মুহাম্মদ আলীর থেকে তুমি রামফল কত ভাল। এমন কমীনার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এই নাও, আমার পেটে গুলি মার। আমি তাকে বলি, গুলি মারলে তো কাজ হবে না। সত্যিকারের তওবাহ সকল গোনাহর চিবিকৎসা। আল্লাহ্র কাছে তওবাহ কর এবং জামা’আতে গিয়ে চিল্লা লাগাও। সে ওয়াদা করল। সকালে আমার কাছে আসল। আমি তাকে নিয়ে হাওযওয়ালী মসজিদে যাই এবং আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে জামা’আতে যায়। মারকাযে এক জামা’আতের সাথী সেই জায়গা আমাকে দেখান যেখানে আমার ভাই তাহাজ্জুদ নামায পাঠরত অবস্থায় মসজিদে ইন্তিকাল করেন। রাত্রে আমি মসজিদে থাকি। সেই জায়গায় আমি তাহাজ্জুদ পড়ি। অনেকক্ষণ আমি মসজিদে এই আশায় পড়ে থাকি যে, সম্ভবত এটাই জান্নাতের দরজা। মসজিদে আমি ঘুমিয়ে পড়ি এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যিয়ারত নসীব হয়। তিনি আমাকে বলেন, ঈমানদারদের জন্যই জান্নাত। কিন্তু এখন তোমাকে অনেক কাজ করতে হবে। ঘুম ভেঙে গেল। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি অধমের কী কাজ করার আছে। আমি চিন্তা করতাম, আমিও কি কোন কাজ করতে পারি। প্রিয় নবী (সা.)-এর কিছু কাজ। মীরাটেও আমার থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। তিনি আমাকে মীরাট ছাড়ার পরামর্শ দিলেন। পরামর্শ মুতাবিক প্রথমে পাঞ্জাব এরপর হরিয়ানা যাই। কিন্তু কোথাও কাজ জমল না, ঋণ বৃদ্ধি পেতে থাকল। আমাকে একজন মনিপুর যাবার পরামর্শ দিল। মাওলানা সাহেব আমাকে ইস্তিখারা করতে বললেন। এমন সময় হঠাৎ করেই মাওলানা সাহেবের পরিচিত একজন লোক কানপুর থেকে আসেন এবং আমি তার সাথে কানপুর যাই। আলহামদুলিল্লাহ! চার বছরে এখানে আমার লোহা-লক্কড়ের কাজ জমে যায়। যত ঋণ ছিল তাও শোধ হয়ে যায়। প্রথমে তো আমি ছেলের বিয়ে দিই এবং গত বছর জনৈকা বিধবা মহিলাকে মুসলমান করে বিয়ে করি। তার দু’টি বাচ্চাও আমার তত্ত্বাবধানে আছে যারা মুসলমান।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! বহুৎ মুবারক! মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কোন পয়গাম দেবেন কি?
নূর মুহাম্মদ: আমাকে একটা দরখাস্ত আপনার কাছে, আর আমি এই সফর করেছি মাওলানা সাহেবের কাছে দো’আর আবেদনের জন্য এবং সমস্ত মুসলমানদের কাছেও আমার দোআর দরখাস্ত। আমি আমার সঙ্গে একটি দাওয়াতী টিম বানিয়েছি যেই টিম বাঙালি ছিন্নমূল ও যাযাবরদেরকে এবং মধ্যপ্রদেশে ভীল সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেছে। আসলে আমি এক চিল্লা লাগাই যমুনা নগরে, সেখানে বাঙালিদের কাঁচা-পাকা কিছু বস্তি আছে। তাদের মধ্যে সে সময় আমাদের মাওলানা সাহেবের সাথীরা কাজ শুরু করেছিল। এক চিল্লা লাগাই খাণ্ডোয়া এলাকায়। সেখানেও ভীল সম্প্রদায়ের বেশ কিছু লোক থাকে। সেখানে আমি অনুভব করি যে, ওদের ভেতর কাজ করলে দলে দলে লোক মুসলমান হতে পারে। কানপুরে মোটামুটি মানিয়ে নেবার পর গত বছর আমি দশটি সফর করেছি। আল্লাহর কাছে আমার প্রত্যাশা, ইনশাআল্লাহ লক্ষ লক্ষ লোক মুসলমান হবে। সমস্ত মুসলমানের কাছে আমার আবেদন, না জানি এ ধরনের আরো কত বস্তি ও জনবসতি আছে। যদি সঠিকভাবে ও পরিকল্পিতভাবে দাওয়াত দেওয়া যায়, চেষ্টা করা হয়, তাহলে অনেক লোক জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারে। নিজ নিজ অবস্থা অনুসারে দাওয়াতের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।

আহমদ আওয়াহ: বহুৎ বহুৎ শুকরিয়া। নূর ভাই, আপনি অনেক খোশ কিসমত, অনেক ভাগ্যবান আপনি! আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন।
নূর মুহাম্মদ: প্রিয় ভাইটি আমার! এমন অকৃতজ্ঞ কে হবে যে, আপনার জন্য ও আপনাদের পরিবারের জন্য দোয়া করবে না। (কাঁদতে কাঁদতে) প্রতিটি পশম আপনাদের পরিবারের কাছে ঋণী। শরীরের চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে দেওয়া হলেও আপনাদের পরিবারের অনুগ্রহের বদলা দেওয়া সম্ভব হবে না। আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত আপনাদের পরিবারকে গোটা বিশ্বের হেদায়াতের মাধ্যম বানান।

আহমদ আওয়াহ: আমীন! আমাদের পরিবার নয়, মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাদের হেদায়াতের ফয়সালা হয়েছে।
নূর মুহাম্মদ: হাঁ! আল্লাহর মূল দয়া, রহম ও করম।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু। আল্লাহ হাফিজ। ফী আমানিল্লাহ।
নূর মুহাম্মদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আল্লাহ হাফিজ।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
জুলাই-আগস্ট, ২০০৫ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ