নওমুসলিম জনাব মুহাম্মদ নাঈম (উত্রপাল সিং চোহা)-এর সাক্ষাৎকার

তবে আমার কাছে মনে হয়েছে সমগ্র পৃথিবীর পিপাসা এখন ইসলাম। যাদের কাছে ইসলাম আছে তাদের কর্তব্য হলো সকল তৃষ্ণার্তদের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেয়া। যারা তৃষ্ণার্ত তারা পরম ভালোবাসার সাথে ইসলামকে গ্রহণ করবে। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যেমন পানি পান করে, তেমনিভাবে ইসলামকে গ্রহণ করবে।
অথচ মুসলমানদের অবস্থা হলো, আমরা তাদের তৃষ্ণা নিবারণের পরিবর্তে তাদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবছি। এটা ইসলামের চরিত্র নয়। আমাদের উচিত আল্লাহকে সন্তষ্ট করার জন্য তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির প্রতি দয়াবান হয়ে তাদের পিপাসা মিটানো। তাদের অজ্ঞতার কারণে অন্যায়ের বিনিময় অন্যায় দ্বারা দেয়া উচিত নয়।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
নাঈম মুহাম্মদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: নাঈম সাহেব, আপনি ভালো আছেন?
নাঈম মুহাম্মদ: আলহামুদলিল্লাহ! আমার আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি খুব ভালো রেখেছেন।

আহমদ আওয়াহ: আব্বু হয়তো আপনাকে ফোন করেছেন। তিনিই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।
নাঈম মুহাম্মদ: হ্যাঁ, হযরত ফোন করেছিলেন আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। হযরত বলেছেনÑ আরমুগানের জন্য আপনার একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করতে চাই। আমি বললাম- আর আমার জন্য এরচেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে। কোনো দীনি কাজে আমারও একটি অংশ থাকবে। তা-ও আবার আমার শায়েখের নির্দেশে।

আহমদ আওয়াহ: নাঈম ভাই! আপনার বংশীয় পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
নাঈম মুহাম্মদ: এখন থেকে ৫০ বছর আগে বাহরাইচ-এর রাজপুত পরিবারে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বাবা ছিলেন সরকারী স্কুলের হেড মাস্টার। বাহরাইচে ইন্টার পাস করার পর ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হই। দিল্লী ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিলে বি এ পাস করার পর ডিডিএতে চাকুরি পেয়ে যাই। আমার মেযাজ ছিল একটু বেশি গরম। বংশীয়ভাবে জমিদার মেযাজ ছিল। তাছাড়া ঘুষ দেয়া-নেয়া অনেক বড় পাপ এ কথা আব্বু আমাদের ছোটবেলায় শিখিয়েছিলেন। অফিসার এবং নেতাদের সাথে আমার এ নিয়ে ঝগড়া হতো। ফলে আমাকে সাসপেন্ড হতে হয়। একদিন রাগ করে রিজাইন দিয়ে দিই। একজনের সাথে মিলে একটি কনস্ট্রাকশন কম্পানি খুলি। প্রাইভেট ঠিকাদারির কাজ করতে শুরু করি। কাজ-কাম ভালোই চলতে থাকে। আমাদের কর্মের পরিধি যখন বাড়তে শুরু করল, তখন এল এফ- এর কাজও নিতে থাকি। এর বাইরেও কয়েকটি বড় বড় কোম্পানির কাজ করি।

আমাদের ব্যবসা যখন বড় হলো তখন দিল্লিতে একটি শপিংমলের ঠিকাদারী নিলাম। আশা ছিল এই কাজটিতে আমাদের ভালো লাভ হবে। কিন্তু আমার পার্টনারের নিয়তে গরমিল এসে গেল। শপিংমলের মালিকও আমাদের সাথে প্রতারণা করলো। ফলে হঠাৎ করেই আমাদের কোম্পানির ধস নেমে গেল। এদিকে লোহা এবং সিমেন্টের দাম বেড়ে গেল। এটা ছিল বিপদের ওপর বিপদ। দিল্লীর নয়টি প্লট ও সাতটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেও ক্ষতিপুরণ করা সম্ভব হলো না। তারপর আদালতে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হলো। আমার গাড়িটিও বিক্রি করতে হলো। মাত্র পঁচিশ হাজার টাকার একটি পুরানো গাড়ি ক্রয় করি। পাওনাদাররা আমার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুললো। আর তখনই আমার প্রতি সৃষ্টিকর্তার করুণা হলো। অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে ঈমানের আলো দেখতে পেলাম। এই পাপী কৃষ্ণ বান্দার জীবন তিনি ঈমানের আলোয় আলোকিত করে দিলেন।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করলেন কীভাবে বলবেন কি?
নাঈম মুহাম্মদ: ১৩ই আক্টোবর আমার জীবনে একটি কালো অধ্যায় ছিল। আমাকে পাওনাদারদের চাপে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল। আমার সাথে পাওনাদাররা এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করলো যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। আমি আমার পনের বছরের ছেলের সাথে আমার স্ত্রী এবং দু’সন্তানকে ইজ্জত রক্ষার জন্য গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। ১৪ই অক্টোবর সকালে মোকাদ্দমার প্রয়োজনে আমাকে জামেয়া নগরে গাফফার মঞ্জিলে একজন উকিলের সাথে পরামর্শ করার জন্য যেতে হয়েছিল। সেখানে আমি সকালেই পৌঁছালাম। পরামর্শ শেষে সকাল সাড়ে নয়টায় আমি ফিরছিলাম, গাফফার মঞ্জিলের বাহিরে বিশ্ববিদ্যালয় বাউন্ডারির পাশ দিয়ে আমি একাই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখি আপনার আব্বু হেঁটে মেইন রোডের দিকে যাচ্ছেন।
তাঁকে দেখে আমার মনে হলো, ইনি কোনো ধার্মিক মানুষ হবেন। মনে-মনে ভাবলাম একজন ভালো মানুষ! পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি তাঁকে গাড়িতে তুলে নিই। হতে পারে তিনি আমাকে কোনো চিকিৎসা বলে দিবেন। আমি তাঁর পাশে গাড়ি থামালাম। বললাম- আসুন! আপনাকে মেইন রোডে নামিয়ে দেব। তিনি বললেনÑ ধন্যবাদ আপনাকে, আসলে আমি আজ মর্নিং ওয়াক করতে পারিনি এজন্যেই হেঁটে যাচ্ছি। আমি বললামÑ আমার সেবা করার সুযোগ হয়ে যাবে, অনুগ্রহ করে আসুন! তিনি গাড়িতে উঠলেন, আমার পাশের সিটে বসলেন। আমি জানতে চাইলাম-কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন- বাটলা হাউজ খলিলুল্লাহ মসজিদের কাছে যাবো। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হবার পর প্রধান সড়কে এসে তিনি নেমে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আরো কিছুক্ষণ তাঁর সাথে চলি। বললাম, মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যাপার! আমি আপনাকে বাটলা হাউজে পৌঁছে দিচ্ছি। তাঁর বারবার নিষেধ করতে থাকলেন আমি গাড়ি থামালাম না। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন- আমি বললাম- উত্রপাল সিং চৌহান। নাম জানার পর তিনি আমাকে বারবার ধন্যবাদ জানালেন। বললেন- দেখুন, আপনি আমার সাথে কেবলমাত্র মানবিক কারণেই এই সদয় আচরণ করেছেন। আপনার ব্যবহার আমার খুব ভালো লেগেছে।
আমার মন চাচ্ছে আপনাকে এমন একটি উপহার দিই; যা ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনে আপনার কাজে আসবে। যেই মালিক পুরো দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর গুণবাচক নাম রয়েছে। তারমধ্যে দুটি নাম হলো- ‘ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম।’ হাদী অর্থ- যিনি মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেন। আর রাহীম অর্থ সর্বাধিক করুণাময় এবং সবচে’ বড় দাতা। সকালে ঘুম থেকে ওঠে গোসল করে অথবা হাতমুখ ধুয়ে এই নাম দুটি একশ’ বার পড়বেন। পড়ার সময় মনে-মনে ধ্যান করবেনÑ আমি আমার মালিককে স্মরণ করছি। তারপর পরিবার, ব্যবসা কিংবা অন্য যে কোনো সমস্যায় সরাসরি মালিকের কাছে প্রার্থনা করবেন, ইনশাআল্লাহ তিনি অবশ্যই বিপদ দূর করে দেবেন। আমি আপনাকে মালিকের ফোন লাইন ও ই-মেইল লাইন বলে দিলাম। আমি তখন বললাম- মিয়া সাহেব! বর্তমানে আমি খুব সমস্যায় আছি। আমার সমস্যার কথা শুনলে আপনারও চোখে পানি চলে আসবে।
এ কথা বলতেই আমার চোখ দিয়ে অশ্র“ ঝরতে লাগলো। তিনি আমার অবস্থা দেখে বললেনÑ আামাকে শুনিয়ে কী লাভ হবে! আমরা সবাই তো বিভিন্ন সমস্যায় ডুবে আছি। যে নিজেই বিপদের শিকার তাকে বিপদের কথা শুনিয়ে কী লাভ! আপনি বরং ইয়া হাদী এবং ইয়া রাহীম পড়ে বিপদের কথা আপনার মালিককে বলুন। তাঁকে বিপদের কথা বলতে কোনো লজ্জা নেই, কোনো আপমান নেই। আর তিনিই সবকিছু করতে পারেন। তবে এই যপের জন্য একটি বাছ আছে। একমাত্র এই মালিক ছাড়া আর কারো পূজা কিংবা কারও সামনে মাথানত করা যাবে না। কারও সামনে হাতজোড় করা যাবে না। পীরের সামনেও না; দেবীর সামনেও না। ভালো হয় ঘরে মূর্তি থাকলে সেগুলো বের করে ফেলবেন।
আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম। বিদায় জানাবার উদ্দেশে হাতজোড় করলাম। তিনি বললেন- এ থেকেই তো বেঁচে থাকতে বললাম। দাওয়া ব্যবহারে খাবার চেয়ে বাছ মেনে চলা বেশি জরুরী। আমি ‘সরি’ বলে ক্ষমা চাইলাম।
পরদিন সকালে আমি গোসল করলাম এবং চোখ বন্ধ করে একশ বার ‘ইয়া হাদী ও ইয়া রাহীম’ পাঠ করলাম। মাওলানা আহমদ সাহেব! আমি বলে বুঝাতে পারবো না, তখন আমার অনুভূতি কী হয়েছিল! মনে হয়েছিল, আমার মালিক আমার সামনে, আমি আমার বেদনাভরা ইতিহাস তাঁকে শুনিয়েছি। প্রার্থনা করেছি ও তাঁকে বলেছি মালিক! আপনাকে আমি কী শোনাবো! আপনি তো আমার থেকে বেশী জানেন। প্রায় আধা ঘন্টা যাবত মালিকের দরবারে কেঁদেছি আধা ঘন্টা পর যদিও আমার পূর্ব সমস্যার কোনো পরিবর্তন হয়নি তবুও আমার কাছে মনে হয়েছে আমার অন্তর এবং মাথা থেকে বিরাট বড় একটি বোঝা নেমে গেছে। মনে হয়েছে, আমি আমার মোকাদ্দমার ভার অন্য কারও কাঁধে সঁপে দিয়েছি। সেদিনও পাওনাদাররা এলো। কিন্তু সেদিন তারা আমার সাথে খুবই মার্জিত ভাষায় কথা বলল। মন চাচ্ছিল আমি সন্ধ্যায়ও এই দুআগুলো আবার পাঠ করি। আবার মনে হলোÑ হযরত তো আমাকে একবারই পাঠ করতে বলেছেন। পরক্ষণে মনে হল- মালিকের নাম যতো পারি নেব, তাতে সমস্যা কী! সাথে সাথে এ-ও মনে হলো- ওষুধ চিকিৎসকের কথামতই ব্যবহার করতে হয়। আমি সেদিন হযরতের নাম জিজ্ঞেস করিনি, ঠিকানাও জনতে চইনি এমনকি ফোন নাম্বারও না। আমি জামেয়া নগর এলাকার দিকে গাড়ি নিয়ে বের হলাম। বিকাল তিনটা থেকে রাত পর্যন্ত উখলা এবং তার আশপাশে ঘুরতে লাগলাম। কিন্তু তাঁর সাথে দেখা হলো না। সন্ধ্যার পর ফিরে এলাম। সকালের অপেক্ষায় ছিলাম। সকাল সকাল গোসল করে আবার ইয়া হাদী ইয়া রাহীম পাঠ করলাম। খুব ভালো লাগল। এক সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন এই দুআ পড়লাম। মনের অজান্তেই বারবার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম।
তিন দিন পর ঘর থেকে সবগুলো মূর্তি বের করে মন্দিরে রেখে এলাম। একুশে অক্টোবর শপিংমলের মালিকের বিরুদ্ধে আমাদের একটি মামলার রায় হওয়ার কথা। মামলাটি হাইকোর্টে চলছিল। হাইকোর্টে গেলাম। মামলার রায় হলো আমাদের পক্ষে। আদালত এক মাসের ভেতর পঁচাশি লাখ রুপি আদায় করার রায় দিলেন। আমার আনন্দের সীমা ছিল না। তারপর ২২শে অক্টোবর গ্রীন পার্কে এক পার্টির সাথে মিটিং করতে গেলাম। লোকজন মসজিদে যাচ্ছিল। আমি ভাবলাম মসজিদের মাওলানা সাহেবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করিÑ ইয়া হাদী এবং ইয়া রাহীম আরও বেশি পড়া যায় কিনা। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম আমি কি মসজিদের মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাত করতে পারবো? তিনি বললেন, আধাঘন্টা পর নামায শেষে আপনি অবশ্যই দেখা করতে পারবেন। আমি অপেক্ষা কর ছিলাম। লোকজন নামাযে চলে গেল, তখন এক ব্যক্তি আমাকে মাওলানা সাহেবের কক্ষে নিয়ে গেল। আমি তখন বললাম এক মিয়া সাহেব আমাকে একশ’ বার ‘ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম’ পড়তে বলেছিলেন। এগুলো পড়ে আমি খুব উপকৃত হয়েছি। এখন আমি আরো বেশী পড়তে চাই। এতে কোনো ক্ষতি আছে কি? তিনি বললেন- আরো পড়ে নিয়েন আরো পরামর্শ দিলেন আপনি উখলায় গিয়ে মাওলানা কালিম সিদ্দীকির সাথে সাক্ষাত করুন। তিনি আপনাকে আরো ভালো পরামর্শ দিবেন। আমি তাঁর কাছে মাওলানা সাহেবের ঠিকানা চাইলাম। তিনি বললেন বাটলা হাউজ জামে মসজিদের ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করবেন। সেখানেই তাঁর অফিস।

আমি সেখান থেকেই বাটলা হাউজ চলে গেলাম। ইমাম সাহেব বললেন মসজিদের সামনে যে ‘দারে আরকাম’ নামে অফিস দেখতে পাচ্ছেন সেখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করুন। সেখানে গিয়ে একজন হাফেয সাহেবের সাথে দেখা হলো। তিনি বললেন- খলিলুল্লাহ মসজিদের পাশেই তাঁর বাড়ি। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। সম্ভবত হযরত এখন সফরে আছেন। আমি খলিলুল্লাহ মসজিদে অনেক সময় খোঁজাখুজির পর তাঁর ফ্ল্যাট পেলাম। দরজায় নক করার পর একটা বাচ্চা এসে বলল- হযরত মাদ্রাজ সফরে গেছেন। এক সপ্তাহ পর ফিরবেন। আমি ওখান থেকে ফোন নম্বর নিলাম। মসজিদের বাইরে এসে লক্ষ করলাম টুপি মাথায় একজন লোক ঠেলা গাড়িতে করে বই-পুস্তক বিক্রি করছে। অনুমান করলাম ইসলামী বই হবে হয় তো। কাছে গিয়ে বললামÑ হিন্দীতে কোনো ভালো দুআর বই থাকলে আমাকে দাও। সে আমাকে ছোট সাইজের কয়েকটি বই দিল। ‘মাসনুন দুআ’ ও ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআ’ বই দুটি কিনে নিলাম।

মনে হলো ইসলাম সম্পর্কিত আরো অন্য কোনো বই কিনি। আমি তাকে বললে সে আমাকে ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়’ ও‘জান্নাত কি পুঞ্জী’ ও ‘দোযখ কা খটকা’ কিতাব তিনটি দিল। এই পাঁচটি কিতাবের সাথে দুকানদার ‘আপকি আমানত আপকি সেওয়া মে’ নামে আমাকে ছোট্ট একটি বই দিল, বলল-এই বইটি আপনাকে ফ্রি দিলাম। সে বলল আপনি বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। তারপর দুআ করবেন। আপনার অনেক উপকার হবে। আমি ক্ষুদ্র পুস্তিকাটির উপর লেখকের নাম দেখে বললাম- আমি তো মাওলানা কালিম সিদ্দীকির সাথেই দেখা করতে এসেছিলাম। তাঁর সাথে দেখা হলো না। হকার লোকটি বলল- তাঁর সাথে দেখা হওয়া তো খুব কঠিন ব্যপার। তবুও আপনি অবশ্যই দেখা করবেন আপনার ভালো লাগবে। আমি কিতাবগুলো নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
মোবাইলে মাওলানা সাহেবের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মোবাইল বন্ধ থাকায় কথা বলতে পারলাম না। সেই রাতেই ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি পড়ে ফেললাম। ছোট বইটি হাতে নিলাম এক একটি শব্দ না পড়া পর্যন্ত আমার মন ভরলোনা। একবার পড়ার পর দ্বিতীয়াবার পড়লাম। বইটি পড়ে মনে হচ্ছিল, কঠিন পিপাসার পর তৃপ্ত হবার মতো পানি পেয়েছি। এবার হযরতের সাথে সাক্ষাতের আকুলতা আরও তীব্র হয়ে উঠলো। আল্লাহ আল্লাহ করে চতুর্থ দিন তার সাথে কথা বলতে পারলাম। তার আওয়াজ শুনে সন্দেহ হলো- ইনি কি সেই লোক? যিনি আমার গাড়িতে ওঠেছিলেন এবং আমাকে ইয়া হাদী ও ইয়া রাহীম শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া সেই পুস্তিকাটির পিছনেও লেখা ছিল ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম।

চারদিন পর হযরত ফিরে এলেন। সেটা ছিল ৪ঠা নভেম্বর। সকাল সাড়ে দশটায় আমি খলিলুল্লাহ মসজিদে হযরতের সাথে দেখা করলাম। তাঁকে দেখে আমার খুশির আর অন্ত রইলো না। দেখলাম, ‘আপ কি আমানত’ এবং দারে আরকামের মাওলানা কালিম সিদ্দিকী আমার দেখা সেই মিয়া সাহেব। আর তিনিই আমাকে গাফফার মনজিল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম-এর সবক দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে আমার অবস্থা জানালাম, তাঁর প্রতি শুকরিয়া জানালাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপকি আমানত’ পড়ে আপনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আমি বললাম- এই পুস্তিকার প্রতিটি হরফ আমার অন্তরাত্মায় লেখা হয়ে গেছে। হযরত বললেন তাহলে কি আপনি কালেমা পড়েছেন? আমি বললাম- পুস্তিকায় তো পড়েছি। এখন আপনি পড়িয়ে দিন। তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন এবং নাম রাখলেন নাঈম মুহাম্মদ। আমাকে বললেন- জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে, প্রতিটি পদক্ষেপে এই হাদী ও রাহীম মালিকের সন্তুষ্টি মতে চলতে হবে। তিনি এমন মালিক যাঁর সামনে চোখের পানি ফেললে মনে হয় যেন আমার বোঝা নেমে গেছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! আপনার সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালা বরকতময় করুন। তারপর দীন শেখার ব্যাপারে কি কিছু ভেবেছেন?
নাঈম মুহাম্মদ: হযরতের পরামর্শে একজন মাওলানা সাহেবের কাছে নামায শিখেছি এবং এখন কুরআন শরীফ পড়ছি। এখন আমার তৃতীয় পারা শুরু হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: এসব কাহিনী আপনার পরিবারের লোকজনকে বলেছেন কি?
নাঈম মুহাম্মদ: আলহামদুলিল্লাহ! এরপর তিনটি মামলাতেই আমার পক্ষে রায় হয়েছে। আমি পুনরায় ঘর ক্রয় করেছি। আমি আমার ঘরের সবাইকে ডেকে পুরো কাহিনী শুনিয়েছি। আমার এই নতুন অবস্থা তাদের ভালো লেগেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই আমার তিন সন্তান ও আমার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছে। মাওলানা সাহেব আমার স্ত্রীর নাম রেখেছেন খাদিজা এবং আমার সন্তানদের নাম রেখেছেন আমেনা, ফাতেমা ও মুহাম্মদ উমর।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি আগে কখনও ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করেছিলেন?
নাঈম মুহাম্মদ: আমার বংশীয় প্রেক্ষাপট অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। বাবরি মসজিদ শাহাদাতের সময় ইসলামের প্রতি বিরোধিতা আরো বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের বংশের একজন পুলিশ ডিআইজি মুসলমান হয়ে হুযাইফা নাম ধারণ করেছিলেন। ফলে আমাদের পরিবারে ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি দূরত্ব আরও বেড়ে গিয়েছিলো। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য যখন সম্প্রসারিত হলো তখন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্য মনে করে আমি বজরং দলকে অনেক অর্থ যোগান দিয়েছি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় অনেক মুসলমান ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। বাহ্যত তাদের সাথে কথাবার্তার কারণে একটা প্রভাব তো ছিলই; তবে ইসলাম ও মুসলমানদের ইমেজ ভালো লাগতো না। তাদের কারণেই মুসলমানদের থেকে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এবার ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক ছিল ভিন্ন রকম। আমার বুদ্ধি ও অন্তরের পর্দা সরতে লাগল। মূলত ইসলাম বিরোধী মানসিকতা আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বুঝতে দেয়নি। ইসলাম ছিল আমার ভেতরের একটা প্রয়োজন। আলহামদুলিল্লাহ! সেটা আমি পেয়েছি। আমার কাছে মনে হয় যেন আমি আমার আসল ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার ঘর আমার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘর আবার ফিরে পেয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: ভবিষ্যতে আপনার বংশের লোকদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে কি চিন্তা ভাবনা করেছেন ?
নাঈম মুহাম্মদ: আলহামদুলিল্লাহ! আমি তিনবার তিন দিনের জামাতে গেছি। হযরতকে বলেছি- নতুন বছর থেকে প্রতি মাসে দীনি দাওয়াতের জন্য এক লাখ টাকা খরচ করতে চাই। তিনি আমাকে বলেছেনÑ জান এবং মাল উভয়টিই খরচ করতে হবে। ভালো হয় আপনার সম্পদ আপনিই খরচ করুন। আমি হযরতের পরামর্শে ‘আপকি আমানত সেন্টার’ খোলার কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এজন্য একটি ফ্ল্যাট কিনেছি। দুআ করুন আল্লাহ তায়ালা যেন আমার ইচ্ছা সফল করেন।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমানদের এবং আরমুগানের পাঠকদের জন্য কিছু বলবেন কি?
নাঈম মুহাম্মদ: মাত্র কয়েক মাসের মুসলমান এর উপযুক্ত কোথায়, যে অন্য মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবো! তবে আমার কাছে মনে হয়েছে সমগ্র পৃথিবীর পিপাসা এখন ইসলাম। যাদের কাছে ইসলাম আছে তাদের কর্তব্য হলো সকল তৃষ্ণার্তদের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেয়া। যারা তৃষ্ণার্ত তারা পরম ভালোবাসার সাথে ইসলামকে গ্রহণ করবে। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যেমন পানি পান করে তেমনিভাবে ইসলামকে গ্রহণ করবে।
অথচ মুসলমানদের অবস্থা হলো, আমরা তাদের তৃষ্ণা নিবারণের পরিবর্তে তাদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবছি। এটা ইসলামের চরিত্র নয়। আল্লাহকে খুশি করার জন্য তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির প্রতি দয়াবান হয়ে তাদের পিপাসা মিটানো উচিত। তাদের অজ্ঞতার কারণে অন্যায়ের বিনিময় অন্যায় দ্বারা দেয়া উচিত নয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অসংখ্য শুকরিয়া। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নাঈম মুহাম্মদ: শুকরিয়া জানাবো আপনাকে। আপনি আমাকে এতো বড়ো একটা কাজের যোগ্য ভেবেছেন। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ও রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ ইং

অনুবাদঃ যুবায়ের আহমদ