নওমুসলিম জনাব রেজওয়ান আহমদ (রাজন)-এর সাক্ষাৎকার

মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের ভাষায় পুরো পৃথিবী এখন তৃষ্ণার্ত। এই তৃষ্ণার্তদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রাম এবং শহরে যেমন রেশনের দোকানের সামনে এক দুই লিটার কেরোসিনের জন্য মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে-সামান্য তেলের আলোয় তাদের ঘরকে আলোকিত করবে বলে, তেমনিভাবে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয় অন্ধকারে ছেয়ে আছে। মুসলমানদের উচিত তাদের দিকে দৃষ্টি দেয়া। তাদের কথা ভাবা, ঈমান ও ইসলামের মশাল জ্বেলে তাদের অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করা।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
রেজওয়ান আহমদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: রেজওয়ান সাহেব, ভালো আছেন তো? সফরে কোনো অসুবিধা তো হয়নি?
রেজওয়ান আহমদ: আলহামদুলিল্লাহ! সফর খুব ভালোই হয়েছে। ফুলাতে এসে আমার সফরের ক্লান্তি অনুভই হচ্ছে না। আল্লাহ তায়ালার শোকর! তিনি আমাকে ফুলাত দেখিয়েছেন। হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের সাথেও সাক্ষাত হয়েছে। খুব তৃপ্তির সাথে সাক্ষাত হয়েছে। আমার এ নতুন দুই ভাইও সাক্ষাত করেছেন। মাওলানা সাহেবও খুব খুশি হয়েছেন তিনি আমাদের বারবার বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। আনন্দে হযরতের চোখে পানি এসে ছিল।

আহমদ আওয়াহ: আসলে আব্বু আমাকে বাসা থেকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, বললেন- রেজয়ান সাহেব কিছুক্ষনের মধ্যে বাড়ি চলে যাবেন, তাই আমি যেন আপনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে নিই। আমাদের ফুলাত থেকে আরমুগান নামে একটি উর্দূ মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানদের মাঝে দ্বীনি দাওয়াতের প্রেরণা সৃষ্টি করা। আমি আপনার সাথে মূলত এই পত্রিকার পক্ষ থেকেই কিছু কথা বলতে চাই।
রেজওয়ান আহমদ:অবশ্যই বলুন! আমাকেও হযরত হুকুম করেছেন। বলেছেন- আমি আহমদকে পাঠাচ্ছি আপনি তার সাথে কিছু কথা বলবেন। উদ্দেশ্য, আপনার প্রতি আল্লাহ তায়ালার হেদায়েত ও করুণার যে ঘটনা ঘটেছে তা যেন লাখ লাখ পাঠক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং এ ঘটনা যেন অন্যদের হেদায়েতের মাধ্যম হয়ে যায়। তিনি বলেছেন আপনার ও আমার অংশেও যেন কিছু ছওয়াব চলে আসে। এবার বলুন, আমাকে কী বলতে হবে?

আহমদ আওয়াহ:  প্রথমেই আপনার বংশীয় পরিচয় দিন।
রেজওয়ান আহমদ: ৩ জানুয়ারি ১৯৫৯ইং সালে আমি বেনারসের একটি ব্রা‏‏হ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। বাবা আমার নাম রেখেছিলেন রাজন। গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করি। তারপর বিভিন্ন কলেজে বি কম পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমার বাবা শ্রী সৃজন কুমারও একজন পুরনো দিনের গ্রাজুয়েট ও সহকারী তহসিলদার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষী। যে কারণে অফিসারদের সাথে তার বনিবনা হতো না। ফলে চাকরি জীবনে সর্বদা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার স্বীকার হতে হয়। বি কম পাস করার পর আমি ব্যবসা আরম্ভ করি। প্রথমে গার্মেন্টসের ব্যবসা করি। এভাবে একের পর এক কয়েকটি ব্যবসা পরিবর্তন করি। একসময় আমার এক বন্ধুর সাথে গয়ায় চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে কাপড়ের ব্যবসায় সেট হয়ে গেলাম। আমি বিয়ে করেছি এলাহাবাদের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। আমার শ্বশুর মগোলছড়ায় জজ পদে চাকরী করেন। আমার স্ত্রী পোস্ট গ্রাজুয়েট। আমার এক ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলেকেও একটি দোকান ধরিয়ে দিয়েছি। আমাদের পরিবার এখন গয়াতেই সেটেল হয়ে গেছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কিছু বলুন।
রেজওয়ান আহমদ: মাওলানা আহমদ সাহেব! আমার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী মূলত এক অপবিত্র বান্দার প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালার অপার দয়া ও করুণার উজ্জ্বল নিদর্শন। আমার আল্লাহর জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক। ভেবে আশ্চর্য হই কীভাবে তিনি আমার প্রতি হেদায়েতের বারি অবতীর্ণ করলেন! আসলে আল্লাহ তো আল্লাহই। তাঁর শান বুঝার ক্ষমতা কার!

আহমদ আওয়াহ: আমাদের বাসায় আব্বু আপনার ঘটনা আলোচনা করেছিলেন। ফলে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল যে আপনার মুখ থেকেই আপনার জীবন বৃত্তান্ত শুনি। অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
রেজওয়ান আহমদ: আহমদ সাহেব! ২০০০ সালের কথা। সে বছর আমার ব্যবসায় কয়েক লাখ টাকা ক্ষতি হয়ে গেল। আমার দু-একজন কাস্টমার দোকান বন্ধ করে পালিয়ে গেল। এরপর বিভিন্ন প্রকার সমস্যা হয়ে যায়। আমি খুবই অস্থির হয়ে পরলাম। বন্ধুরা আমাকে ট্রেডিং করার পরামর্শ দিল। আমি সে উদ্দেশ্যেই একটি পরিকল্পনা তৈরি করলাম। মালপত্র সার্ভে করার উদ্দেশ্যে দিল্লী এবং লুধিয়ানায় সফর করার ইচ্ছা করলাম।
আমরা মূলত সনাতন ধর্মের অনুসারী। আমাদের ঘরে শিবাজী এবং হনুমানের মূর্তি আগে থেকেই রাখা ছিল। পূর্বেও আমি এদের পূজা করতাম। তারপরও আমার মনে হতো মূর্তিগুলো তো মৃত। মরা আমাদের পূজার উপযুক্ত নয়। ব্যবসায় একের পর এক ক্ষতির ঘটনা আমাকে মূর্তিগুলোর মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে দিল। ব্যবসায়িক সফরে বের হওয়ার আগে আমার কেন যেন মনে হলো- এই ভগবানদের কারণেই আজ আমার ঘরে এই দুর্গতি আসছে। আমরা যতই এদের পূজা করছি ততই ক্ষতি বাড়ছে। আমি এই দুই মূর্তি ও গণেশের মূর্তি নদীতে ফেলে দেই। এদের পূজা ছেড়ে দিয়ে আমি আমার আল্লাহকে স্মরণ করলাম। মনে-মনে প্রার্থনা করলামÑ হে সর্বব্যাপী সর্বশক্তিমান মালিক, এখন থেকে আমি কেবল তোমারই পূজা করবো। আর তুমি আমার এ সফরকে সফল করো। এই সফর যেন আমার সংসারের জন্য অশেষ কল্যাণ আনে। আর এখন থেকে সর্বদা তুমি আমাকে এই মূর্তিগুলোর ক্ষতি থেকে রক্ষা করো।

আহমদ ভাই! আমি আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না। আগে থেকেই রাতের রিজার্ভেশন টিকিট কাটা ছিল। আমি প্রস্তুতিস্বরূপ এই মূর্তিগুলো যখন ঘর থেকে সরিয়ে ফেললাম, মনে হলো আমি আমার মাথা থেকে কাঁটার বোঝা সরিয়ে ফেলেছি। আমি ট্রেনে সফর করলাম। দিল্লি আসার পর খুব ভালো অভ্যর্থনা পেলাম। ট্রেডিং এর কয়েকটি দিক সামনে এলো। তারপর সেখান থেকে ডিলাক্স এক্সপ্রেসে লুধিয়ানা যাব ভেবেছিলাম। দিল্লী থেকে যখন ট্রেনে উঠলাম, মনে হলো, আমার রিজার্ভেশন সিটটি থেকে এক অপূর্ব সুঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। আর সেই সুঘ্রাণ আমাকে এতোটাই মোহিত করে তুলেছিল যে- আমার মস্তিষ্ক, অন্তর এবং আমার কল্পনাব্যাপী এর অনুপ্রবেশ ও বিস্তারকে ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না। মোটকথা, আমার অস্তিত্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এক বিস্ময়কর সুবাস। ভিতর থেকে আমার অন্তর বলছিল এটা কোনো আনন্দের সুবাস। ভাবছিলাম কোনো বড় মানুষ এই সিটে উপবেশন করেছিলেন। তার সেই ঘ্রাণ এই গাড়িতে ও সিটে লেগে আছে।

আমি ভাবতে পারিনি এটা হেদায়েতের ঘ্রাণ। ট্রেন পানিপথে পৌঁছার পর কিছুটা ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হলো। আমি আমার সহযাত্রীদের অনুমতি নিয়ে মাঝখানের সিটটি খুলে ফেললাম। সিটের পকেটে মোবাইল রাখতে গিয়ে দেখি একটি ছোট পুস্তিকা। পুস্তিকাটির নাম ‘আপকি আমানত আপকি সেওয়া মে’। পুস্তিকাটি ছিল হিন্দীতে লেখা। বুম্বাই থেকে প্রকাশিত। বইটির নাম আমার কাছে খুব চমৎকার লাগলো। বইটা বের করলাম এবং পড়তে শুরু করলাম। এক সময় পুরো পুস্তিকাটি পড়ে ফেললাম। আমার ঘুম চলে গেল। ক্লান্তি ও দুর্বলতা কিছুই অনুভব হচ্ছিল না। মনে হলো আমার জীবন জেগে উঠেছে। আমি সিটটি বন্ধ করে নিচে নেমে এলাম। পুস্তিকাটি আরেকবার পড়লাম। এতেও আমার মন ভরলো না। তৃতীয়বার পড়লাম। কথা হলো কী, যখন থেকে আমার ব্যবসায় মন্দা পড়েছে তখন থেকেই আমার অন্তরে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ স্থান করে নিয়েছে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর নির্দেশনা আমাকে আল্লাহর সুবাস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। আমি মনে মনে আগেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলাম।
ট্রেন রাজপুরা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তখন। পড়তেপড়তে পুস্তিকাটির লেখক মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ জাগল। আমি পুস্তিকাটিতে তাঁর ঠিকানা সন্ধান করলাম। কিন্তু সেখানে শুধু তার নাম ও ফুলাত লেখা ছিল। সাথে মুম্বাইয়ের একজন প্রকাশকের নাম ছিল। যখন আমি লুধিয়ানা থেকে ফিরলাম তখন মনে হলো ব্যবসায়িক দিক থেকে আমার সফর পরিপূর্ণ সফল। আমি যখন লুধিয়ানায় তখন একবার একটি মসজিদ সামনে পড়লো। আমি এর ভেতর প্রবেশ করতে চাইলাম। এগিয়ে গিয়ে জানতে পারলাম, ১৯৪৭-এর পূর্বে এটা মসজিদ ছিল। এখন একজন পাঞ্জাবীর বাড়ি। ভেতর থেকে আমি চরম অস্থির ছিলাম। পথ খুঁজছিলাম কিভাবে প্রকাশ্যে মুসলমান হওয়া যায়। গাওয়ায় পৌঁছে আমি সোজা এক মসজিদে গেলাম। সেখানকার এক মাওলানা সাহেবের সাথে আমার সাক্ষাত হলো। তিনি আমাকে এক মুফতি সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর বাড়ি মিরাঠে, তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন। মাওলানা কালিম সিদ্দীকি সাহেবকে তিনি ভালো করেই চিনেন। ওই মুফতি সাহেব আমাকে মাওলানা সাহেবের ঠিকানা লিখে দেন, এবং ওয়াদা করেন যে, আমাকে ফোন নম্বরও সংগ্রহ করে দেবেন। কথামতো তিনি আমাকে ফোন নম্বর যোগাড় করে দেন। কিন্তু হাজার বার চেষ্টা করেও আমি ফোনে মাওলানা সাহেবকে পেতে ব্যর্থ হই। সময় পেলেই আমি সেই মুফতী সাহেবের কাছে ছুটে যেতাম। তাঁর কাছে দীন শিখতাম। আমি তাঁর কাছে কায়দা পড়েছি। তারপর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে কুরআন শরীফ পড়া শিখেছি। সামান্য উর্দূ শিখেছি। দুই তিনবার দশ দিনের জামাতেও গিয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি মুম্বাই এসেছিলেন। এখানে আব্বুর সাথে সাক্ষাত হবে জানলেন কী করে?
রেজওয়ান আহমদ: আমাকে মুফতি আদেল মিরাঠী সাহেব বলেছিলেন মুম্বাইয়ে একটি দাওয়াতী ক্যাম্প হতে যাচ্ছে। সেখানে মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব আসবেন। একথা শুনে আমি সাথে সাথে প্রস্তুতি নিই। মারকাযুল মাআরিফ খুঁজে বের করতে আমার পুরো একদিন লেগে যায়। আমি রাতের বেলা সেই ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছি, তখন শেষ অধিবেশন চলছিল। প্রোগ্রাম শেষে মাওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাত হয়। তখন কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না।

আমি তাঁর কাছে আবেদন করলাম, আমাকে নতুন করে কালেমা পড়িয়ে দিন। তিনি বললেন আসলে আমাদের প্রত্যেকেরই বারবার ঈমানের নবায়ন করা উচিত। তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন। বললাম, আমার এক বন্ধুর সাথে মুম্বাই সফরে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে আপনার ‘আপ কি আমানত’ পুস্তিকাটি দেন। মূলত তিনি পুস্তিকাটি তার শেরওয়ানীর পকেটে রেখেছিলেন। রাতে যখন ট্রেনে ঘুমানোর সময় শেরওয়ানী খুলেছেন তখন সিটে রেখে দিয়েছিলেন। সকালে সফরসঙ্গীরা যখন নীচে বসতে গেছেন তখন মাঝখানের সিটটি ভাঁজ করে রেখেছেন। পুস্তিকাটিও তখন সেই ভাঁজে পড়ে গেছে। আর সেখান থেকেই আমি পুস্তিকাটি পাই এবং পড়ি। আমি আরও বললাম মুফতী সাহেব আমার নাম রেখেছেন। কিন্তু আমার ইচ্ছা হলো, আপনি আমার নাম রাখবেন। তিনি আমার নাম জানতে চাইলেন। আমি বললাম রাজন। মাওলানা তখন বললেন আপনার নাম রাখলাম রেজওয়ান আহমদ। রেজওয়ান অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টি। রেজওয়ান বেহেশতের প্রহরী। নামটি আমার কাছে খুব ভালো লাগলো। এর অর্থের কারণেও আবার মাওলানা সাহেবের নিজে নাম রাখার কারণেও।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিবারের লোকদের কী অবস্থা? আপনি কি তাদের আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা বলেছেন?
রেজওয়ান আহমদ: প্রথমে আমি আমার পুরো কাহিনী স্ত্রীকে বলি এবং ‘আপকি আমানত’ বইটি একবার তাকে পড়ে শোনাই। সে তখন বলেছিল আমি তো একজন শিক্ষিতা মেয়ে, আমাকে দাও আমি নিজে পড়ে নেব। আমি বললাম একবার আমার মুখে শুনে নাও না! আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসার হক আদায়ের জন্যই তোমাকে একবার পড়ে শোনাতে চাইছি। একবার পড়ে শোনানোর পর বইটি তাকে পড়তে দিলাম। এভাবে ‘মরনেকে বাদ কিয়া হোগা’ এবং ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়’ এই দুটি বই তাকে পড়তে দিই। তারপর এক রাতে আমি তাকে আমার অসুবিধার কথা বলি। আমি তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিই ইসলাম আমার রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে পড়েছে। এটাতো হতেই পারেনা যে, আমি ইসলাম থেকে সরে যাই। তাই আমি চাচ্ছি পরিষ্কারভাবে মুসলমান হয়ে যাবো। এখন আমার সাথে তোমার বসবাসের একটাই উপায় তুমিও মুসলমান হয়ে যাও। যদি মুসলমান হতে না পারো তাহলে ইসলামী বিধান মতে তুমি আমার জন্য পরনারী। পরনারীর সাথে বসবাস তো দূরের কথা কথা বলাও পাপ। আগামী কাল তোমার চিন্তা-ভাবনা করার জন্য শেষ সময়। যদি তুমি মুসলমান হতে না পারো। ইসলাম ধর্মকে সত্য বলে জানার পরও গ্রহণ করতে না পারো তাহলে আমি তোমাকে ঘর থেকে বের করবো না ঠিক কিন্তু আমি অবশ্যই তোমাদের ঘর ছেড়ে চলে যাবো। তারপর যেভাবে পারি, যেখানে পারি জীবন কাটিয়ে দেবো।

আমার কথা শুনে সে কাঁদতে লাগলো। সে বললো আত্মীয়-স্বজন এবং এই সমাজের লোকদের সাথে কীভাবে লড়বে? আমাদের উভয়েরই জন্ম পুরো ধার্মিক পরিবারে। এখান থেকে আমরা কিভাবে বেরিয়ে আসব? বললামÑ কাল কেয়ামতে আল্লাহর সাথে লড়াই করার চে’ পরিবারের সাথে লড়াই করাটা কি ভালো নয়? আমরা যদি আল্লাহর জন্য ইসলামকে গ্রহণ করে নিই, তাহলে তিনিই সমস্ত পেরেশানি দূর করে দেবেন। রাত একটা পর্যন্ত আমি তাকে বোঝাতে থাকি। একটা বিশ মিনিটে সে ইসলাম গ্রহণের জন্যে রাজি হয়। সে কালেমা পড়ে। পরের দিন আমি তাকে নিয়ে মুফতী সাহেবের কাছে যাই এবং দ্বিতীয়বার আমাদের বিহাহ সম্পাদন করি। আমার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণের কারণে সন্তানদের ওপর কাজ করা সহজ হয়ে গেল। আর আমার ছেলের তো মুসলমান ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব ছিল। ফলে সে খুব সহজেই ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে। বড় মেয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য কয়েক দিন লেগে যায়। আল্লাহ তায়ালার অসীম অনুগ্রহ এখন আমার পুরো পরিবারই মুসলমান।

এরই মধ্যে আমার ছেলে জামাতে এক চিল্লা পূর্ণ করেছে। মুম্বাইয়ে মাওলানার সাথে সাক্ষাত হয়। সেখানেই তিনি আমাকে ফুলাত আসতে বলেন। আমারও ফুলাত দেখার খুব আগ্রহ ছিল। যে মানুষটির সুঘ্রাণ আমার অন্তর এবং আমার মস্তিষ্ককে হেদায়েতের সুবাসে সুরভিত করেছে তাঁর ঘর তো আমার জন্যে এই দুনিয়ার বেহেশত। আল্লাহ তায়ালার জন্য নিবেদিত ভালোবাসা আমার সফরকে বরকতপূর্ণ করে দিয়েছে। পথে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। তাছাড়া ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি আমি গাওয়াতে এক হাজার ছাপিয়েছি। আমার সাথে এই যে আমার দুই বন্ধু দেখছেন, তাদের মধ্যে একজন আমার বেশ পুরনো বন্ধু। বেনারসেই থাকে। আমি যখন গয়ায় এসে থাকতে শুরু করি। তখন সেও আমার সাথে গয়ায় চলে আসে এবং থাকতে শুরু করে। সেখানেই সে একটি বেকারী খুলেছে। তার সাথে আমি প্রায় আটমাস ধরে কথা বলছি। ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। অবশেষে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফুলাত সফরের জন্য তাকে প্রস্তুত করতে সক্ষম হই।

আমরা উভয়ে গাওয়া এক্সপ্রেসে সফর করছিলাম। আমাদের সাথে সফর করছিলেন আজমগড়ের এই ভদ্রলোক। পরিচয়ের পর জানতে পারলাম তিনি উত্তর প্রদেশের অধিবাসী। তারপর আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হতে লাগলো। ভদ্রলোক সরকারী ইন্টার কলেেেজর লেকচারার। আমি তাকে ‘আপ কি আমানাত’ বইটা পড়তে দিই। বইটি পড়ে তিনি খুবই প্রভাবিত হন। রাতভর আমাদের মাঝে কথাবার্তা এবং মতবিনিময় হতে থাকে। মথুরা এসেই তিনি কালেমা পড়তে প্রস্তুত হন। আমি তাকে কালেমা পড়াই, আমার বন্ধু অনিল কুমারও তখন কালেমা পড়ার জন্য রাজি হয়ে যায়। আমি তাকেও কালেমা পড়িয়ে দিই। আমাদের গাড়িটি মথুরায় বিশ মিনিট অবস্থান করে। মথুরা থেকে যখন গাড়ি ছাড়ে তখন আমি দুই বন্ধুকে বলি আল্লাহ তায়ালার কী অপার করুণা, আপনারা উভয়ে মথুরাতেই কুফর ও শিরককে রেখে যাচ্ছেন। এখানকার জিনিস এখানেই পড়ে থাকলো ভালোই হলো।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি আপনার পরিবার ও পরিচিত মহলে দাওয়াতী কাজ করার ব্যপারে কিছু ভেবেছেন?
রেজওয়ান আহমদ: মুম্বাইয়ে হযরতের সাথে সাক্ষাতের আগেই আমার স্ত্রী এবং সন্তানরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর বাইরে আমার বন্ধু অনিল কুমার ছাড়া আর কারও ক্ষেত্রে আমি কাজ করিনি। মুম্বাইয়ে মাওলানা আমাকে এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহিত করেন। এবার এখানে এসে তাঁর সাথে দেখা হলো। সফরের দীর্ঘ কাহিনী তাকে শুনালাম, শুনে খুব খুশি হলেন। কয়েকবার বসা থেকে উঠে জড়িয়ে ধরলে তাঁর চোখ তখন অশ্র“তে পরিপূর্ণ ছিল। তিনি অবশ্য আমাকে এ কথা বলেছেন মথুরা সম্পর্কে আপনি আপনার বন্ধুদের যে কথা বলেছেন তা ঠিক নয়। মথুরা শিরক ও কুফরের জায়গা হতে যাবে কেন? মথুরাও আল্লাহর জমিন। এখানকার সকলেই আল্লাহর বান্দা, সকলেই নবীজির উম্মত এবং আমাদের আদি পিতা আদম (আ)-এর সন্তান। আমাদের মধ্যে রক্তের বন্ধন। তাদের প্রতি আন্তরিক মমতাও ঈমানের অংশ। বিদ্যমান শিরক এখানের জিনিস নয়। এটা এখানকার মানুষের ব্যাধি। আপনি এখন মুসলমান। আপনার দায়িত্ব মানুষকে দীনের দাওয়াত দেয়া। একজন দা‘য়ী হলেন আত্মিক চিকিৎসক। চিকিৎসক কোথাও ব্যাধিকে নিরাপদ ছেড়ে যায় না। বরং কিভাবে ব্যাধিকে নির্মূল করা যায় সেটাই থাকে চিকিৎসকদের ভাবনা।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিবারের লোকেরা কি আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা জেনেছেন?
রেজওয়ান আহমদ: আমি আমার শ্বশুরকে বাসায় দাওয়াত করেছিলাম। তারপর আমি ও আমার স্ত্রী তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি ইসলাম গ্রহণের কথা এবং তাকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: তিনি রাগ হননি তো?
রেজওয়ান আহমদ: আমার শ্বশুর খুবই ঠান্ডা মেযাজের মানুষ। তিনি আমাদের বলেছেন এখন নতুন যুগ। ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের কঠোরতা হওয়া ঠিক নয়। তবে খুবই ভেবে-চিন্তে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ভেবে-চিন্তে যেটা ঠিক করবে সেটাই সযত্মে মেনে চলবে। আজ একটা কাল একটা এমন যেন না হয়। আমি আশাবাদী ইনশাআল্লাহ তিনি খুব শীঘ্রই মুসলমান হয়ে যাবেন। মাওলানা সাহেব আমাকে বলেছেন, তাহাজ্জুদ পড়ে যেন তার জন্য এবং খান্দানের সকলের জন্য দুআ করি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের বংশের সবাইকে হেদায়েত নসীব করেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার দুই বন্ধুরও কি নাম রেখেছেন?
রেজওয়ান আহমদ: মাওলানা সাহেব অনিল কুমারের নাম রেখেছেন মুহাম্মদ আদেল। আর রমেশ চন্দ্রের নাম রেখেছেন রঈস আহমদ। রমেশ কুমারজীর দিল্লীতেই নেমে যাওয়ার কথা ছিল। আমাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করার পর তিনি ফুলাত আসার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করলেন। তারপর আমরা একসঙ্গে চলে এলাম। আমরা মাওলানা সাহেবের সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছি যে, তিন বন্ধু আমরণ দীনের দাওয়াত দিয়ে যাব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সহায় হোন।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
রেজওয়ান আহমদ: মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের ভাষায় পুরো পৃথিবী এখন তৃষ্ণার্ত। এই তৃষ্ণার্তদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রাম এবং শহরে যেমন রেশনের দোকানের সামনে এক দুই লিটার কেরোসিনের জন্য মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সামান্য তেলের আলোয় তাদের ঘরকে আলোকিত করবে বলে, তেমনিভাবে পৃথিবীর কোটিকোটি মানুষের হৃদয় অন্ধকারে ছেয়ে আছে। মুসলমানদের উচিত তাদের দিকে দৃষ্টি দেয়া। তাদের কথা ভাবা, ঈমান ও ইসলামের মশাল জ্বেলে তাদের অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করা।

আহমদ আওয়াহ: রেজওয়ান ভাই! আপনাকে আবার শুকরিয়া!
রেজওয়ান আহমদ: আপনাকেও অনেক অনেক শুকরিয়া। আপনি আমাকে একটি দীনি কাজে অংশ লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন এবং আমাকে এর উপযুক্ত মনে করেছেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ!

আহমদ আওয়াহ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
اَسْتَوْدِعُ اللهَ دِيْنَكَ وَاَمَانَتَكَ وَخَوَاتِيْمَ عَمَلِكَ

আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিদায় জানাবার এ দুআ শিখিয়েছেন। অর্থ- “আমি তোমার দ্বীন আমানত এবং কর্মের সমাপ্তি আল্লাহ তায়ালার কাছে সমর্পণ করছি।”

রেজওয়ান আহমদ: খুব সুন্দর দুআ! সত্যিই এমন একটি দুআর প্রয়োজন ছিল আমাদের।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ফেব্রুয়ারী-২০০৮
অনুবাদঃ যুবায়ের আহমদ