নওমুসলিম ডক্টর মুহাম্মদ আহমদ (রামচন্দ্র) (দিল্লী) এর সঙ্গে আলোচনা

আমাদের দেশে পঞ্চাশ কোটি দলিত (অচ্ছ্যুত, অস্পৃশ্য) আছে। বাংলাদেশে পঞ্চাশ লাখ লোক দলিত বাস করে। এভাবে বিশ্বে দেড়শ’ কোটি লোক তারা যারা জাত-পাতের ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত ও নির্যাতিত, নিপীড়িত। তাদের ভেতর সকলেই আমার মত কেবল একবার সাথে খাওয়া ও খাওয়াবার জন্য হাপিত্যেস কাপছে। রসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজ্জের খুতবাকে প্রকৃত অর্থে যদি তাদের পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া যায় এবং যদি একটু ইসলামী আন্দাযে তাদেরকে গলায় জড়িয়ে ধরা হয় তাহলে এত বড় বিরাট জনবসতি উভয় জাহানে হেদায়াত পেয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারে। আমরা ফুলাতে দেখেছি, পরিচ্ছন্ন কর্মী জমাদার ও কাজ করনেওয়ালা দলিত মজদুর মাওলানার সাথে একত্রে বসে চা পান করছে ও নাশতা করছে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
ড. মুহাম্মদ আহমদ: ওয়া আলায়কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আহমদ আওয়াহ: ভাই মুহাম্মদ আহমদ সাহেব! বহুত শুকরিয়া। আপনার শুভ পদার্পণ ঘটেছে। আমি আপনাকে কষ্ট দিয়েছি এজন্য যে, আব্বুর নির্দেশ ছিল আমি আপনাকে ফোন করে ডেকে আনব এবং আগামী মাসের আরমুগান-এর জন্য আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করব।
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আহমদ ভাই! শুকরিয়ার কিছু নেই। মাওলানা সাহেব আমাকেও কয়েক মাস থেকে বলছেন যে, আমি নিজে আপনার সঙ্গে মিলিত হয়ে আরমুগানের জন্য কিছু কথা বলি। কিন্তু আমার নিজেরই আপনার সঙ্গে কথা বলার সাহস হচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার অবস্থানইবা কী-যে, আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিনের জন্য সাক্ষাৎকার দেব। আমার এও ধারণা ছিল যে, আমাকে নির্দেশ পালন করতে হবে। আপনি আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, আমার সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার পরিচয় দিন।
ড. মুহাম্মদ আহমদ:আমার পুরানো নাম রামচন্দ্র। আমার বাড়ির লোকেরা এ নাম রেখেছিল। প্রায় ২৮ বছর আগে দিল্লীর মেহেরওয়ালীতে এক সুইপার পরিবারে আমার জন্ম। আমার চাচা আমার পিতাজীর কাছ থেকে জোর করে বলতে কী প্রায় ছিনিয়ে আমাকে ছয় বছর বয়সে এক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে আমি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ি। ছোটবেলা থেকেই আমার খুব পড়াশোনার আগ্রহ ছিল। আর আল্লাহ আমার স্মরণশক্তিও ভাল দিয়েছিলেন। এরপর সরকারী স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হই। আমি একাদশ শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন আমার পিতা মারা যান। আমি ছিলাম বাড়ির বড় ছেলে। বড় কষ্ট করে শ্রম বিক্রি করে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইন্টার পাস করি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় আলহামদুলিল্লাহ প্রথম বিভাগে পাস করেছিলাম। আমার ঘরোয়া অবস্থা এমন খারাপ ছিল যে, আমি বলতে পারব না যে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত আমি কিভাবে পৌঁছেছিলাম। কয়েকবার এমন ধারণা হয়েছিল যে, আমাকে লেখাপড়া ছাড়তে হবে। আমার চাচা সরকারী কলেজে চাকুরী করতেন। আমাদের কলেজে কয়েকজন ব্রাহ্মণ শিক্ষক ছিলেন আর একজন ছিলেন রাজপুত। আমাকে সুইপার জেনে আমার সঙ্গে তারা যে ব্যবহার করতেন আমি সেই লাঞ্ছনাদায়ক ও অপমানকর আচরণের কথা বর্ণনা করতে পারব না। কখনো কখনো আমার মন চাইত আমি আত্মহত্যা করি। কখনো এ ধরনের খেয়ালও এসেছিল তাদেরকে আমি আত্মহত্যা করি। ইন্টারমিডিয়েটের পর আমি রেগুলার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারিনি। আমি চাকুরী খুঁজছিলাম। আমার পিতা গ্রেটার কৈলাশে এক সৈয়দ সাহেবের বাংলোয় কাজ করতেন। আমি সৈয়দ সাহেবের কাছে যাই। তিনি আমাকে বাংলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং চৌকীদারির জন্য নিযুক্তি দেন। আমি প্রাইভেট বি.এ. পরীক্ষা দেবার জন্য ফরম পূরণ করি। ব্যাস, এটুকুই আমার পারিবারিক পরিচয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বলুন।

ড. মুহাম্মদ আহমদ:আহমদ ভাই! আমার ইসলাম গ্রহণ, আমার নবী (সা.)র ওপর কোটি কোটি সালাম ও দরূদ। তাঁর রহমাতুললিল আলামীন হবার জীবন্ত প্রমাণ। একজন সুইপারের ওপর আল্লাহর এমন অনুগ্রহ ও দয়া যে, প্রতিদিন কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে আমার শরীরের সব পশম খাড়া হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মের জাত-পাতের ব্যবস্থার ফলে আমি বর্ণনা করতে পারব না, এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আমি কত কষ্টকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। জাত-পাতের এই নির্যাতন ও নিপীড়িনমূলক ব্যবস্থা দ্বারা দলিত ও মথিত সীমাহীন বিধ্বস্ত ছিল যখন মন তখন হঠাৎ করেই ইসলামের করুণা বায়ুর একটি মৃদুমন্দ হিল্লোল আমাকে ছুঁয়ে গেল। আর সেই মৃদু হিল্লোলের শীতল পরশে মায়ের মমতার মত তার কোলে তুলে নিল। সম্ভবত মাওলানা সাহেব আপনাকে ঘটনাটা বলেছেন।

আহমদ আওয়াহ: একবার আব্বু তাঁর এক বক্তৃতায় অত্যন্ত দরদভরে আপনার ঘটনা শুনিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের প্রবল বেগে ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন যে, নবীয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমানতের আমরা আমানতদার, দেশবাসীর প্রথা-পদ্ধতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উঁচু-নীচু ও জাত-পাতের ব্যবস্থার মধ্যে বেঁচে আছি। পঞ্চাশ কোটি মানুষ আমাদের রক্ত সম্পর্কের দলিত ভাই কেবল আমাদের সাথে খাওয়ার এবং আমাদের পাত্রে পানি পান করার জন্য হা-পিত্যেস করছে। আমরা আল্লাহর কাছে কী করে মুখ দেখাব? আপনি একটু পুরো ঘটনাটা বলুন।

ড. মুহাম্মদ আহমদ:  সৈয়দ নাদীম সাহেব যার বাংলোয় আমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও চৌকীদারি কাজের জন্য নিয়োজিত ছিলাম, তিনি ছিলেন মালদার মানুষ ও খান্দানী লোক এবং তিনি ছিলেন এলাহাবাদের অধিবাসী। বৃহত্তর কৈলাশে তাঁর বাংলো, নওয়াইডাতে তাঁর দু’টো কারখানা রয়েছে। আপনার মুহতারাম পিতা (মাওলানা কালীম সিদ্দিকী)-এর সাথে বেশ কিছু দিন থেকে সম্পর্কিত এবং দাওয়াতী মেযাজ রাখেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, মাওলানা সাহেব তাঁর দাওয়াত একবার কবুল করুন। একবার মাওলানা সাহেব ওয়াদাও করেছিলেন। কিন্তু কোন কারণে তিনি আসতে পারেননি। একদিন আগে ফোন আসল যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, যে জন্য তিনি আসতে পারবেন না। আসলে আমাকে সৈয়দ সাহেব বলেছিলেন যে, রামচন্দ্র! আমাদের মাওলানা সাহেব আসবেন। আমি তোমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব। তাঁকে দোআ করতে বলবে। আমারও খুশী লাগছিল যে, কোন ধর্মগুরু হবেন। ঠিক আছে, দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর ফোন আসায় হতাশা ছেয়ে গেল। ১৯৯৯ সালের ২০ জুন তিনি তাঁর আলওয়ার সফর থেকে ফেরার পথে আমাদের সৈয়দ সাহেবের এখানে দুপুরের পর আসার ওয়াদা করেন। পৌনে তিনটার সময় মাওলানা সাহেব এলেন। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। ঝড় ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাসের কারণে গোটা বাংলো ধূলোমাটিতে ভরে গিয়েছিল। মাওলানা সাহেব আসছেন এ জন্য আমি তাড়াতাড়ী ঝাড়– নিয়ে পরিষ্কার করছিলাম। অর্ধেক পরিষ্কার করেছি এমন সময় মাওলানা সাহেবের গাড়ী এসে গেল। যেহেতু বারবার সৈয়দ সাহেবের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছিলাম যে, মাওলানা সাহেব কখন আসবেন সেজন্য যেই না কার আমি ভেতরে আনার জন্য দরজা খুলেছি, সৈয়দ সাহেব আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন যে, আমাদের জমাদার রামচন্দ্র। আমি তাকে আপনার আসার কথা বলেছিলাম। সে আজ দুপুরে খানা খেতেও যায়নি। মাওলানা সাহেব আমাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখলেন। না জানি কিভাবে আমার ভেতরকার যখমগুলোও তিনি দেখে ফেললেন। সৈয়দ সাহেবের আগে আমার সাথে করমর্দন করলেন এবং আমাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন ও অনেকক্ষণ হাত দিয়ে আমার পিঠ চাপড়াতে থাকলেন সোহাগ ভরে। এরপর সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে মিলিত হলেন। দুপুরের খানা এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে ড্রয়িং রুমে চৌকির ওপর দস্তরখান বিছিয়ে দিলাম। আমি ঝাড়– দেবার বাকী কাজটুকু শেষ করতে থাকলাম, আমার ভেতর এক ধরনের তোলপাড় অবস্থা কাজ করছিল। ইনি মুসলমানদের ধর্মগুরু। আমি তো মনে করতাম যে, তিনি আমার সঙ্গে দেখাও করবেন না, মিশবেন তো না-ই। কিন্তু ইনি কোন জগতের মানুষ। একজন সুইপারকে সৈয়দ সাহেবের আগে গলার সঙ্গে জড়িয়ে ধরছেন। একজন চৌকীদার, একজন চাপরাসীকে এমন আদর ও সোহাগভরে যিনি গলায় জড়িয়ে ধরেন তিনি কোন যুগের মানুষ? আমি ভাবছিলাম এমন সময় মাওলানা সাহেব ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ডাকলেন, এস রামচন্দ্র। খানা খেয়ে নাও। প্রথমে তো আমি মনে করেছি, মাওলানা সাহেব আসলে এমনিই ফর্মালিটি পালন করছেন। কিন্তু তিনি জোর দিতে শুরু করলেন এবং বললেন যে, দেখ তুমি খানা তো খাও নাই। এই বলে আমার হাত থেকে ঝাড়– নিয়ে একদিকে রেখে দিলেন এবং আমার হাত ধরে পানির বেসিনের কাছে নিয়ে গেলেন, বললেন, হাত ধুয়ে নাও। আরও বললেন, তোমার হাতে ঝাড়– ছিল। সাবান দিয়ে হাত ধোও। এরপর হাত ধুইয়ে আমার হাত ধরলেন এবং ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেলেন ও চৌকির ওপর বসাতে চাইলেন। আমি বারবার নিচে বসতে চাইছিলাম। কিন্তু মাওলানা সাহেব আমার একটি কথাও মানলেন না। তিনি বললেন, তোমাকে আমার বরাবর বসে খানা খেতে হবে। আমার জন্য এ ছিল এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আমার জন্য এই দস্তরখানের ওপর বসা কতটা কঠিন ছিল। তারপর আবার সাথে বসে খানা খাওয়া। প্লেটে মাওলানা সাহেব নিজ হাতে তরকারী তুলে দিতে থাকলেন। রুটি উঠিয়ে দিতে থাকলেন। আমার জন্য এক একটা লুকমা কতটা কষ্টকর হচ্ছিল আমি তা বলতে পারব না।
হঠাৎ মাওলানা সাহেব এক লুমকা আমার প্লেটে তুলে দিলেন। আমি তো লাফিয়ে উঠলাম। মাওলানা সাহেব ভালবেসে জিজ্ঞেস করলেন, রামচন্দ্র! আমার মত ময়লা-আবর্জনা থেকে ঘৃণা লাগছে? তোমার সাথে আমিও খুব ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছি। আমার মুখ দিয়ে কথা ফুটে না। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না। মাওলানা সাহেব নিজের প্লেট থেকে আমার প্লেটে সব তরকারী ঢেলে দিলেন। এরপর আমার প্লেটে খেতে লাগলেন। বিরিয়ানী নিলেন। মিষ্টি ও জর্দাও এক প্লেটে খেলেন। আমি এমতাবস্থায় আর কীভাবে খানা খাব। বাধ্য হয়ে অসহায়ের মত কিছু না কিছু খেতেই হল। অবশেষে দস্তরখান উঠানো হল। কিন্তু আমি এর উপযুক্ত রইলাম না যে, আমি পায়ে উঠে দাঁড়াব। আমি ভাবছিলাম যে, এই জগতে এই জনমে আমার সাথে এ সব কী হল। আমার মালিক যার আমি চৌকীদার, তাঁর পীর সাহেব ও ধর্মগুরু আমার প্লেটে খানা খেলেন। আমি এসব স্বপ্ন দেখছি না তো। আসলেই কি এসব সত্য ছিল? আমার নিজের বোধ-অনুভূতির ওপর আস্থা উঠে যাচ্ছিল। সম্ভবত আধা ঘণ্টা আমি ঐ অবস্থায় বসে থাকি এবং না জানি আমি আরও কত কি ভাবছিলাম। হঠাৎ সৈয়দ সাহেব আমাকে বললেন, রামচন্দ্র! তুমি ঘরে যাবে না? মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছিলে কেন? যদি কিছু বলতে চাও বলে ফেল। এরপর ঘরে যাও। ঘরে সকলেই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমার মা পেরেশান হচ্ছেন যে খানা খেতে এল না কেন? আমি সাহস করে মাথা উঠালাম এবং সৈয়দ সাহেবকে বললাম, মিঞা সাহেব! এখন আপনি আমাকে সেই ময়লা-আবর্জনার মধ্যে কেন পাঠাচ্ছেন? যখন সাথে বসিয়ে খাইয়েছেন তখন ব্যাস মুসলমান করে নিজেদের মধ্যে মিশিয়ে নিন। মাওলানা সাহেব জওয়াব দিলেন যে, বেটা! তুমি তো আমাদেরই তো আছ। তোমার কি এটা জানা নেই যে, তুমি ও আমি এক মা-বাপের সন্তান এবং তুমি আমাদের রক্ত সম্পর্কিত ভাই কিংবা ভাতিজা। অবশ্যই একই খান্দান ও একই পরিবারের লোকদের এক খোদার বান্দা হয়ে এক ইসলামের আইন অবশ্যই মানা উচিত। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই আইন ইসলামের আকৃতিতে আমাদের জন্য এনেছেন এবং যিনি উঁচু-নীচু ও জাত-পাতের ব্যবস্থাকে এসে পায়ের নিচে দলেছেন তা মানা তোমার জন্যও এতটাই জরুরী যতটা জরুরী আমাদের জন্য। তুমি খুব ভাল চিন্তা করেছ। ব্যস, তুমি ইচ্ছা করেছ যখন তখন মুসলমান তো তুমি হয়েই গিয়েছ। কিন্তু আমরাও সাক্ষী হই এজন্য আমাদের নিজেদের স্বার্থে তোমাকে বলছি যে, দু’লাইনের সেই কলেমা তুমি পড়ে নাও। আমি বললাম, জী, আমাকে পড়ান। মাওলানা সাহেব আমাকে কলেমা পড়ালেন এবং হিন্দী ভাষায় তার অর্থ আমাকে বলে দিলেন ও বলালেন। এরপর বললেন, নাম বদলানো জরুরী নয়। কিন্তু তারপর যদি নামও বদলাতে চাও তাহলে বল। আমি বললাম, না জী, নাম অবশ্যই বদলে দিন। মাওলানা সাহেব বললেন, আমি তোমার নাম মুহাম্মদ আহমদ রাখছি। মুহাম্মদ ও আহমদ আমাদের নবী (স.)-এর নাম। তুমি যেহেতু এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত উঁচু-নীচু ব্যবস্থাধীনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সয়েছ, এখন ইসলামে তোমার জন্য সবচেয়ে সম্মানিত বরং দুই নাম মিলিয়ে সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় নাম রাখছি এবং আমাকে জামা’আতে যাবার পরামর্শ দিলেন।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হল?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: সন্ধ্যায় ঘরে চললাম। কিন্তু সেখানে আমাকে ভীষণ ছোট মনে হতে লাগল। সারা রাত বিভিন্ন খেয়ালের ভেতর আমার ঘুম এল না। পরদিন আমি কাজে গেলাম। সৈয়দ সাহেব আমাকে জামা’আতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ঘরের লোকদের এ কথা বল যে, আমাকে আমার মালিক সোয়া মাসের জন্য বাইরে পাঠাচ্ছেন। আমি জামা’আতে চলে গেলাম। মারকাযের সামনে থেকে কিছু কিতাবাদি ও বই-পুস্তক হিন্দী ও ইংরেজিতে সৈয়দ সাহেব আমাকে কিনে দিলেন। আলীগড় জামা’আতের সাথে মুরাদাবাদে আমাদের সময় লাগে। সকলেই শিক্ষিত লোক ছিলেন। আমার সময় খুব ভাল কাটে। জামা’আতে সময় লাগিয়ে যখন মারকাযে ফিরে আসি তখন সৈয়দ সাহেব (যাকে আমি আব্বী বলি,) আমাকে নেবার জন্য মারকাযে আসেন, আমাকে নিয়ে বৃহত্তর কৈলাশে পৌঁছেন। সাথে খানা খাওয়ান। অতঃপর আমাকে বললেন, তুমি লেখাপড়া ছেড়ে দিলে কেন? আমি আমার পারিবারিক অবস্থা জানালাম। তিনি আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে কোথাও ভর্তি করিয়ে দেব? আমি বলি, যদি কোথাও ব্যবস্থা হয়ে যায় তবে আমার জন্য এর চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে? অতঃপর আল্লাহর কৃপায় সৈয়দ সাহেবের সুপারিশে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভর্তি হয়ে যায়। আমি বি.এ. অনার্স করি এবং আলহামদুলিল্লাহ বিএতেও প্রথম বিভাগ পাই। এরপর আমি ইংরেজিতে এম.এ. করি। এ সময় আমি নওয়াইডা ফ্যাক্টরীতে যেতে থাকি। এম.এ. ১ম বছরে একদিন সন্ধ্যায় সৈয়দ সাহেব আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলতে থাকেন যে, তুমি যদি রাজী হও ও কবুল কর তাহলে আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই। আমি হতচকিত হয়ে যাই যে, ইনি কী বলছেন? আমি চুপ হয়ে যাই। তিনি বলেন, আজ রাতেই তোমার বিয়ে হবে। এশার নামাযের পর কিছু লোক একত্র হল। সৈয়দ সাহেব নিজেই আমার বিয়ে পড়ান এবং লোকদেরকে বলেন, মেয়ের বাপ যদি বিয়ে পড়াতে পারেন তাহলে তিনিই বিয়ে পড়াবেন। মদীনার খেজুর বিয়ের পর বিতরণ করা হয়। রুখসতী অনুষ্ঠান পরে হবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিয়ের পর সারা রাত আমি চিন্তা করতে থাকি আসলে এ আমি কোন জগতে আসলাম। ২০০৩ সালের ১০ জানুয়ারি আমার বিয়ে হয় এবং ঐ বছরই মে মাসে রুখসতী হয়। রুখসতীর পর আমাদের উভয়ের জন্য আব্বু সাহেব ওমরার প্রোগ্রাম বানান। ওমরায় আমার অবস্থা ছিল আশ্চর্য ধরনের। মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছবার পর রওযা আতহারে আমার আরেক আশ্চর্য অবস্থা ঘটে। আমার ধারণা ছিল এই গোটা নুতন জগত আমার সেই মুহসিন নবী (স.)-এর কদম মুবারকের সদকা। মন চাচ্ছিল ভালবাসা ও শ্রদ্ধার আবেগে জীবনটাই বিলিয়ে দিই। আমি তখন পর্যন্ত দাড়ি রাখিনি। রওযা মুবারকে হাজির হয়ে মনে হল আমার নবী (সা.) আমাকে মুশরিকদের সূরতে তাঁর এই উম্মতকে দেখছেন। আমি সে সময় দাড়ি রাখার অঙ্গীকার করি।
হারাম শরীফের ইমামদের কুরআন শরীফ পাঠ শুনে আমার দিল খুব প্রভাবিত হত। আমি অনুভব করলাম যে, এটাও কোন বন্দেগী যে, আমি আমার মালিকের কালাম বুঝতে পারব না? আলহামদুলিল্লাহ! কুরআন শরীফ নাজেরী তাজবীদ সহকারে এম.এ. পড়াকালে পড়ে নিয়েছিলাম এবং ভালভাবে উর্দূও শিখেছিলাম। আমি আরবী শেখার সংকল্প করি এবং মদীনা মুনাওয়ারায় একজন মাওলানা সাহেবের কাছে এর বিসমিল্লাহও করি। আলহামদুলিল্লাহ! এই ওমরার সফর বড় মুবারক ছিল। আমি কয়েকবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে যিয়ারত করি। একবার আমি স্বপ্নে রসুলুল্লাহ (সা.)-র কদম মুবারক জড়িয়ে ধরি এবং খুব চুমু খাই। ঐ বছর আলহামদুলিল্লাহ আমাদের উভয়ের হজ্জ সফরও নসীব হয়। পি.এইচ.ডি.তে আমার রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ ২০০৩ সালের ঐ বছরই আমার গবেষণা পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কোন বিষয়ে পি.এইচ.ডি. করেছেন এবং শিরোনাম কী ছিল?

ড. মুহাম্মদ আহমদ:আমি জে.এন.ইউ. থেকে ইংরেজীতে পি. এইচ. ডি. করেছি আর আমার পি.এইচ,ডির শিরোনামও ছিল খুব প্রিয়। এজন্য আমাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হয়। আমার পিএইচডি’র শিরোনাম ছিল : ‘মানবতা ও সভ্যতার ওপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স.)-র অবদান ও অনুগ্রহ।’

আহমদ আওয়াহ: আপনার পি. এইচ. ডি. কি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে?
ড. মুহাম্মদ আহমদ:জী, আলহামদুলিল্লাহ! প্রায় শেষ হয়ে গেছে! ভাইভার একটি পর্যায় শেষ হয়েছে। একটি বাকী আছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর আচার-আচরণ ও ব্যবহার কেমন?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: তিনি খুব দীনদার ও ধর্মভীরু মেয়ে। চার বছর চাকুরীকালে আমি কোনদিন তাঁকে দেখিনি। একজন দীনদার মহিলা হিসেবে তিনি আমাকে তাঁর স্বামী মনে করেন। ইসলাম গ্রহণের পর আমার জন্য সবচেয়ে বড় মুজাহাদা ছিল কষ্টের ব্যাপার ছিল তাঁকে স্ত্রী মনে করা। প্রতি মুহূর্তে আমার মনে হত, ইনি আমার নবী (সা.)-র বংশধর। আলহামদুলিল্লাহ! আমি কখনো তাঁর কাছে পানিও চাইনি তাঁর সেই সম্মানের কারণে। দাওয়াতী মেযাজ পোষণ করেন। মাওলানা সাহেবের সমস্ত দাওয়াতী বই পড়েন। আমার যখন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভক্তি প্রযুক্ত আবেগ উথলে ওঠে আমি তখন বেএখতিয়ার তাঁর পা ধরে চুমু খাই যে, তাঁর পায়ে আমার নবীর রক্ত রয়েছে। প্রিয় নবীর আলোচনা ও স্মরণ তাঁর খেয়াল আমার জীবনের আশ্রয় ও অবলম্বন। তাঁর রহমাতুল্লিল আলামীনের যেই ছায়া আমার জীবনের ওপর আছে তা সম্ভবত আর কারুর নসীব হয়নি। হায়! যদি বিধ্বস্ত মানবতাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেত তাহলে মানবতা জুলুমের অন্ধকার থেকে বের হতে পারত। এই তো কিছু দিন আগে ডেনমার্কের অজ্ঞ ও আহমকদের ঘটনা ঘটল। নিজেদেরকে উন্নত মনে করে যেসব পশ্চিমা ও ইউরোপের লোকেরা কী ধরনের নীচু ধরনের কাজ করতে থাকল। আমি বলতে পারব না আমার কী কষ্ট হয়েছে! আমি কান্না ভারাক্রান্ত কণ্ঠে দোআ করেছি, আমার আল্লাহ! ঐ সব আহমক আমার প্রিয় নবী (সা.)-এর কোটি কোটি সালাম তাঁর ওপর ও কোটি কোটি দরূদ, শান তারা বোঝেনি। আমার আল্লাহ! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিন। আমার আশা যে, দুনিয়া ঐসব হতভাগাদের পরিণাম অবশ্যই দেখবে। আগুন তাদের গ্রাস করবে। কয়েকবার আমি উঠে বসে যাই। আমার নবী (স.)-এর অবমাননাকারীদের আল্লাহর যমীনের ওপর থাকার অধিকার নেই। মন চায়, এখনই উঠে হাঁটা শুরু করি এবং ঐসব আহমককে জুতার নিচে পদদলিত করি। একদিন মাওলানা সাহেবের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনাও করেছি। মাওলানা সাহেব বলেন, এই অবমাননার জন্য একদিক দিয়ে দায়ী আমরা মুসলমানরাও। আমরা রসূলে রহমত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুনিয়াবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিইনি। তখন আমারও অপরাধবোধ জাগল এবং ক্রোধের মাত্রা কিছুটা কমল। তারপরও আমার প্রভু প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাশা যে, ঐসব হতভাগারা অবশ্যই এই দুনিয়াতেই এর খারাপ পরিণতি দেখবে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আরবী পড়ার কী করেছেন?
ড. মুহাম্মদ আহমদ:আলহামদুলিল্লাহ! দৈনিক দু’ঘণ্টা করে আরবী পড়ছি। আল্লাহর শোকর যে, পুরো কুরআন শরীফ উপলব্ধিতে আসছে। শায়খ সুদাইসি ও শায়খ শুরায়ম উভয়ের উচ্চারণ ভঙ্গিতে কুরআন শরীফ পড়তে পারি। আমি কুরআন শরীফ হিফ্জ করতেও শুরু করেছি এবং চার পারা মুখস্ত করেছি। এবার নওয়াইডা মসজিদে জুমু’আর নামাযও পড়িয়েছি। মাওলানা সাহেব আমাকে পীড়াপীড়ি করলেন। আমিও সৌভাগ্য মনে করে কবুল করে নিলাম।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে দেখে আদৌ মনে হয় না যে, আপনি নতুন মুসলমান এবং আপনাকে সবাই মাওলানাই মনে করে।
ড. মুহাম্মদ আহমদ:আপনি ঠিকই বলেছেন। অধিকাংশ মানুষ আমাকে মাওলানাই বলে। আমি ওযরখাহি করি যে, আমি তো মাওলানার পায়ের ধূলোও নই।

আহমদ আওয়াহ: আপনি যখন আয়নায় নিজেকে দেখেন তখন কেমন লাগে?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আমার নিজেকেই নিজের মুখে চুমু দিতে ইচ্ছা জাগে। খেয়াল জাগে, আমার নবী (সা.)-এর অনুসরণে এই চেহারা। এটা মনে হয় না যে, আমি হতভাগার চেহারা! আমার আল্লাহ আমার অবয়ব ও আকৃতিকে সুইপার থেকে সৈয়দ বানিয়ে দিয়েছেন। অনৈসলামী অবয়ব ও আকৃতিতে আমার যে কোন লোককে মনে হয় ইসলাম-পূর্ব আমার সুইপারের চেহারা ও অবয়ব-আকৃতি।

আহমদ আওয়াহ: কিন্তু কাউকে অবজ্ঞার পাত্র মনে করা তো উচিত নয়।
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আপনি সম্ভবত জানেন যে, আমরা উভয়ে মাওলানা সাহেবের বায়আত। আলহামদুলিল্লাহ! কোন কাফিরকেও অবজ্ঞা করি না। কাউকে অনৈসালামী অবয়ব-আকৃতিতে দেখলে বিশেষ করে কোন মুসলমানকে ভেতর থেকে দোয়া বেরিয়ে আসে, প্রভু হে! অভ্যন্তরীণভাবে তো এই লোকটি মুসলমান বাহ্যিকভাবে অর্থাৎ বেশ-ভূষায়ও তাকে মুসলমান বানিয়ে দাও এবং তাকে বুঝিয়ে দাও যে, সুইপারের অবয়বের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদা নিহিত নাকি সৈয়দের চেহারা সূরতের মধ্যে?

আহমদ আওয়াহ: ঘরের লোকদের ব্যাপারে আপনি কিছু কাজ শুরু করেছেন কি?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আসলে লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ততা ছিল বেশি। তথাপি দাওয়াতের ব্যাপারে একেবারে গাফিল ছিলাম না। আমার মা এবং এক বোন মুসলমান হয়েছেন এবং আমরা নওয়াইডাতে এক পরিবার বানিয়েছি। এ বছর আমার ওমরাতে যাবার ইচ্ছা আছে। এরপর আমরা উভয়ে দাওয়াতের জন্য জীবন উৎসর্গ করব। আমার মুহতারামা স্ত্রী একজন অত্যন্ত উৎসাহী দা‘য়ী মহিলা। আলহামদুলিল্লাহ! তাঁর কয়েকজন বান্ধবী মুসলমান হয়েছেন এবং তিনি তাঁর পিতার খরচে তাদের বিয়েও দিয়েছেন। প্রত্যহ এক হাজার বার দরূদ শরীফ পাঠ এবং এক মনযিল কুরআন মজীদ তেলাওয়াত তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।

আহমদ আওয়াহ: আপনার মা’মূলাতের অবস্থা কি?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আলহামদুলিল্লাহ! আমিও তাঁর পেছনে পেছনে চলেছি। রাতে ঘুমুবার আগে এক হাজার বার দরূদ শরীফ এবং এক মনযিল কুরআন হাকীম পুরো করি। আমরা উভয়ে জরুরী কর্তব্য মনে করি। আল্লাহ এর মধ্যে জান ও ইখলাস সৃষ্টি করুন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আরমুগানের পাঠকদের কোন পয়গাম দিতে চাইবেন কি?
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আমাদের দেশে পঞ্চাশ কোটি দলিত আছে। বাংলাদেশে পঞ্চাশ লক্ষ দলিত আছে। এভাবে সমগ্র বিশ্বে দেড় শ’ কোটি লোক আছে তারা যারা জাত-পাতের নিষ্ঠুর ব্যবস্থার শিকার ও নিপীড়িত। তারা সকলেই আমার মত কেবল একবার এক সঙ্গে খাবার ও খাওয়াবার জন্য হাপিত্যেস করছে। রসূলুল্লাহ (স.)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণকে এর প্রকৃত অর্থে যদি তাদের পর্যন্ত পৌঁছানো যায় এবং একটু ইসলামী আন্দাযে তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরা যায় তাহলে এই বিশাল ও বিপুল জনগোষ্ঠী উভয় জগতে হেদায়াত প্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারে। আমরা ফুলাতে দেখেছি পরিচ্ছিন্ন কর্মী জমাদার ও কাজ করনেওয়ালা কর্মী শ্রমিক দলিত মজুর মাওলানা সাহেবের পাশাপাশি বসে চা পান করছে, নাশতা করছে এবং আল্লাহর শোকর হেদায়াত পাচ্ছে। কেবল দলিত ও পশ্চাদপদ এবং কালো লোক কেন ইসলাম তো সমগ্র দুনিয়ার নিপীড়ন সর্বস্ব ব্যবস্থাপনার প্রতিষেধক। গোটা মানব জাতির কাছে ইসলাম এবং দয়ার নবী করুণার ছবি (সা.)-এর পরিচয় তুলে ধরা আমাদের (মুসলমানদের) কর্তব্য মনে করা উচিত।

আহমদ আওয়াহ: বহুত বহুত শুকরিয়া। আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন। পরিশেষে শায়খ শুরায়ম-এর উচ্চারণ ভঙ্গিতে আপনার কুরআন তেলাওয়াত শুনতে চাই। (আপনি কারীদের মধ্যে কার তেলাওয়াত বেশি পসন্দ করেন?)।

ড. মুহাম্মদ আহমদ: আমার শায়খ শুরায়ম-এর তেলাওয়াত বেশি পছন্দের এবং তাঁর প্রতি আমি বেশি শ্রদ্ধা পোষণ করি। একেতো তিনি খুবই সহজ-সরল ও সাদা-সিধে মেযাজের মানুষ। উপরন্তু তিনি ভেতরে ভেতরে চুপসে যাচ্ছেন। হাদীছে যে বলা হয়েছে খোশ লেহান হল এই, ক্বারীর আওয়াজ ও উচ্চারণ ভঙ্গি থেকে অনুভূত হবে, কুরআনের ভাব গাম্ভীর্য ও মর্যাদার চাপে তিনি চুপসে যাচ্ছেন। শায়খ শুরায়ম-এর তেলাওয়াতে এটা পাওয়া যায় যেন কুরআনের ভীতিকর প্রভাবে তাঁর আওয়াজ চুপসে যাচ্ছে। (এরপর তিনি শায়খ শুরায়মের অনুকরণে আ’ঊযু বিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ থেকে নিয়ে সূরা মুদ্দাছছির শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করেন)।

আহমদ আওয়াহ:  সুবহানাল্লাহ! মুহাম্মদ আহমদ ভাই। আপনি চমৎকার তেলাওয়াত করেছেন। কুরআন মজীদের সঙ্গে আপনার এমন পর্যায়ের সম্বন্ধ বহুত মুবারক হোক।
ড. মুহাম্মদ আহমদ: আহমদ ভাই! আপনার মুবারক হোক। আমাদের মুবারক হোক। কুরআন মজীদ মুবারক হোক। ইসলাম মুবারক হোক। কুরআন মজীদের শব্দ সমষ্টি মুবারক হোক। এর উচ্চারণ ভঙ্গি মুবারক হোক। এর যবান মুবারক হোক। এর রসুল (সা.) মুবারক হোক। এর হেদায়াত মুবারক হোক। এর শিল্পমালা মুবারক হোক। নিঃসন্দেহে শত-সহস্র মুবারক। যমীনবাসী মুবারক। গোটা সৃষ্টিজগত মুবারক। বিশেষ করে আপনি মুবারক হোন। আপনার পরিবার মুবারক হোক। নবী (সা.)-এর ফয়েজ মুবারক। কুরআনী দাওয়াতের তৌফীক মুবারক। আল্লাহর কাছে আপনার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মুবারক হোক। আপনার আরমুগান মুবারক হোক। আরমুগানে দাওয়াত মুবারক। ছাদিয়ায়ে দাওয়াত মুবারক। তোহফায়ে দাওয়াত মুবারক (অত্যন্ত কান্নারত অবস্থায়)।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা মুহাম্মদ আহমদ ছাহেব। বহুত বহুত শুকরিয়া। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
ড. মুহাম্মদ আহমদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাািহ ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জুলাই, ২০০৬ ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ