নওমুসলিম ডা. ইরাম ছাহেবার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

‘আরমুগান’-এর মাধ্যমে পাঠক বোনদের খেদমতে বিনীত নিবেদন পেশ করব। একজন মুসলমানের দায়িত্ব সমগ্র মানবমণ্ডলীর কাছে ইসলামের বাণী ও পয়গাম পৌছে দেওয়া। এক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদেরকেও দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। বরং সত্যি বলতে কি দাওয়াতের বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যাবে দাওয়াতের বেলায় পুরুষেরও আগে মহিলাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বিপুল বন্ধু-বান্ধব, উপকারী ও একান্ত আপনজন পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও হেরা পর্বতে প্রথম ওহী নাযিল হবার পর তাঁর আহবানের সর্বপ্রথম লক্ষ্য (টার্গেট) আপন জীবনসঙ্গিনী হযরত খাদীজা (রাঃ)-কেই বানিয়েছিলেন। এ থেকে প্রমাণ হয় মহিলাদেরকেও তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বুঝতে হবে বরং পুরুষদের থেকে বেশি বোঝা দরকার।


আসমা যাতুল ফাওযাইন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
ডা. ইরাম : ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনি বড় ঠিক সময়ে এসেছেন। আব্বুর কাছ থেকে সব সময় আপনার কথা শুনতাম। তিনি বলছিলেন ‘আরমুগান’-এর জন্য আপনার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে। সম্ভবত আপনি ইতিমধ্যেই জেনেছেন যে, আমাদের এখান থেকে অর্থাৎ ফুলাত থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি উর্দূ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাতে ইসলাম গ্রহণকারী নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার প্রকাশের ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ডা. ইরাম : জী, হাঁ। আমি কিছু কিছু সংখ্যা দেখেছি। কিন্তু এখন আর আমি নওমুসলিম কোথায়? প্রিয়ে! তোমার থেকে কমপক্ষে দশ বছর আগে আমি বাহ্যিকভাবেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলাম। আর প্রকৃতঅর্থে এবং মেযাজগত ও জন্মগতভাবে আমি মুসলমানই ছিলাম।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনার কথা অবশ্য ঠিক। কেননা প্রত্যেক মানব শিশুই ইসলামী ফিতরতের ওপরই জন্মগ্রহণ করে থাকে।

ডা. ইরাম : সাধারণভাবে প্রত্যেক মানব শিশুই ইসলামে জন্মগ্রহণ করে থাকে। আর এতো আমাদের নবী করীম সাল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মোবারক ইরশাদ। এতে কারো সন্দেহ হতে পারে না। কিন্তু আমাদের পরিবার বিশেষত আমার পিতা নিজেও মেযাজগতভাবে মুসলমান ছিলেন। অর্থাৎ তিনি ইসলাম কবুলের আগেও শতকরা একশ’ভাগ ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা পছন্দ করতেন।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: মেহেরবানী করে প্রথমে আপনি আপনার পরিচয় দিন।

ডা. ইরাম : আমার নাম ইরাম। আমার পিতার নাম অনিল মোদী। কর্নাটক প্রদেশের বিজাপুরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি সোশ্যালিস্ট পার্টির সভাপতি পিলু মোদীর আপন ভ্রাতুস্পুত্র। তিনি আমেরিকা থেকে এম.ডি. করেছিলেন এবং খুব ভাল ডাক্তার ছিলেন। কিছু কিছু বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনের একান্ত অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে তিনি মীরাটে আসেন এবং ব্যাংক স্ট্রীটে একটি বাড়ি কিনে তারই এক অংশে তিনি তাঁর ক্লিনিক বানান। আমার দু’ভাই বয়সে আমার ছোট। একজনের নাম তারেক, আরেক জনের নাম শারেক। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আমার পড়াশোনা বিজাপুরেই হয়। মীরাট আসার পর মীরাট কলেজে আমি বিএসসিতে ভর্তি হই। বি.এস.সি. পাসের পর পি.এম.টি. প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি এবং মাওলানা আযাদ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস. তিন বছর সম্পূর্ণ করার পর আমার বোনের পীড়াপীড়িতে লন্ডন যাই। সেখানেই এমবিবিএস সম্পন্ন করি এবং এরপর এম.এস. করি। অতঃপর রুদাওয়ালীর এক সৈয়দ পরিবারে ডা. সৈয়দ আমরের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তিনি একজন ভাল নিউরোলজিস্ট। লাখনৌর সঞ্জয়গান্ধী পি.জি.আই.-এ আমাদের উভয়ের চাকুির হয়। আলহামদুলিল্লাহ। আমরা উভয়েই এখন প্রোফেসর হয়ে গেছি। আমার বোন যিনি লন্ডনে থাকেন তাঁর কোন সন্তানাদি নেই। তিনি খুব পীড়াপীড়ি করতেন আমরা যেন লন্ডনে চলে যাই। অবশেষে তাঁর একান্ত আগ্রহে তিন বছর আগে ২০০১ সালে আমরা এখানকার চাকুরি ছেড়ে দিয়ে লন্ডনে চলে যাই। আমার ননদের বিয়ে আমার ছোট ভাই শারেকের সঙ্গে হতে যাচ্ছে। আর সে উপলক্ষে আমাদের ভারতে আসা।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনার নিজের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কিছু বলুন। আপনি কিভাবে ইসলাম কবুল করলেন?

ডা. ইরাম : আসলে আমার পিতা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা খুব পছন্দ করতেন। বিরিয়ানী, কোরমা-কাবাব প্রভৃতির তিনি ছিলেন ভক্ত। তিনি শুধু যে উর্দূ জানতেন, তাই নয় তিনি ভাল ফারসীও জানতেন। পার্সী ধর্মের সাথে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি আমার নাম ইরাম, আমার ছোট ভাইদের নাম শারেক ও তারেক রাখেন। স্বয়ং নিজের নামও ডা. অনিল ওয়ারেছ মোদী লিখতে শুরু করেন। আমরা বিজাপুর থাকতাম। দক্ষিণ ভারতের পরিবেশ খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমরা মীরাটে আসার পর এখানকার আশ্চর্যজনক পরিবেশ দেখলাম বিশেষত মীরাট কলেজে গ্রামের জাট ও চৌধুরী ছাত্ররা খুবই বাজে ও নোংরা আচরণ করত। তারা এত নিচ ও হীন আচরণ করত যে, আমার মনে হতো হয়তো আমাকে এখানকার পড়াশোনাই ছেড়ে দিতে হবে অন্য কোন কলেজে যেতে হবে। কিন্তু আল্লাহ পাক এই নোংরা পরিবেশের ভেতরই আমার হেদায়াতের ফয়সালা করতে চাচ্ছিলেন। ঐ সব নোংরা ছাত্রদের মধ্যেই কয়েকজন ভদ্র ও সজ্জন ছাত্রও ছিল। তাদের মধ্যে আপনার আব্বাও ছিলেন যাঁর শরাফত ও ভদ্রতাদৃষ্টে আমাদের সকল সাথীই কেবল নয় শিক্ষকরা পর্যন্ত অভিভূত ছিলেন। শ্রদ্ধাবশত তাঁকে সকলে কালীম ভাই বলত। আমি বহুবার এমন দেখেছি বিভিন্ন ফিল্ম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এমন সময় কালীম ভাই এসে গেছেন আর অমনি সবাই চুপ মেরে গেছে। ক্লাসে তিনি মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিগণিত হতেন। তাঁর কণ্ঠস্বরও ছিল বেশ ভাল। তিনি কাব্যচর্চাও করতেন এবং ভাল ছবি আঁকতেন। আমাদের কলেজে গোটা প্রদেশব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এতে তিনি ১ম পুরস্কার জিতেছিলেন। কালীম ভাই ক্লাসের এই নোংরা আচরণের দরুণ খুব কষ্ট পেতেন। আমি ঘরে গিয়ে তাঁর ভদ্র স্বভাব ও আচরণের কথা বলতাম। আমার পিতা কখনো সময়-সুযোগমত তাঁকে বাসায় ডেকে আনতে বলতেন। তিনি দৈনিক গ্রামের বাড়ি ফুলাত থেকে খাতূলীর পথে ট্রেনে করে মীরাট ছাউনি এবং এরপর মীরাট কলজে থেকে আপ-ডাউন করতেন। কখনো কখনো তিনি বেগমপুর থেকে কলেজ যাবার পথে পায়ে হেঁটে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েও যেতেন।
একদিন সকালবেলা তাঁকে ডাকলাম এবং আমার পিতার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তাঁকে দেখে আমার পিতা এবং আমার পিতাকে দেখে তিনি খুবই প্রভাবিত হন। আমাদের ক্লাসের বাজে ছেলেগুলোর অধিকাংশ মীরাট কলেজের হোস্টেলে থাকত। এরই মধ্যে রাখী বন্ধনের উৎসব এসে গেল। কালীম ভাই সাড়ে আটটার সময় আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। তিনি আমাকে বললেন, বোন ইরাম! ক্লাসের নোংরা ও পঙ্কিল পরিবেশে আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি। চল, আমরা কিছু রাখী কিনে হোস্টেলে যাই। আমি পঁচিশটি রাখী কিনলাম এবং কালীম ভাই-এর সাথে হোস্টেলে গেলাম ও সমস্ত জাট ও চৌধুরী ছাত্রদেরকে ভাইয়া ডেকে তাদের হাতে রাখী বেঁধে দিলাম। এতে তারা খুব লজ্জিত হল। ফলে আমাদের ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেল। এই কৌশল খুবই কার্যকর হওয়ায় আমাকে তা খুবই প্রভাবিত করল। আমি এ ঘটনা আমার পিতামাতাকেও অবহিত করলাম। যার দরুন আমার পিতামাতা তাঁকে সীমাতিরিক্ত সম্মান করতে থাকেন।
উর্দূ ভাষা শেখার প্রতি আমার ছিল প্রবল আগ্রহ। আমার পিতারও খুবই ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল আমি উর্দূ পড়ি। তাঁর ধারণা ছিল বরং তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতেন উর্দূ ভাষা থেকেই ভাল ও শালীন সভ্যতার গন্ধ পাওয়া যায়। আমি কালীম ভাইকে বললাম আমাকে উর্র্দূ পড়াতে। তাঁর হাতে সময় নেই বলে তিনি আমাকে জানান। এরপর কলেজে উর্দূ বিভাগে গিয়ে মওলভী মাসরূরকে সন্ধান করেন যিনি উর্দূ ভাষায় এম.এ. করছিলেন এবং তাকে বলে-কয়ে আমাকে পড়াতে রাজী করান। তিনি আমাকে লাইব্রেরীতে দৈনিক আধা ঘণ্টা পড়াতে থাকেন। আমি খুব তাড়াতাড়িই উর্দূ শিখে ফেলি। এ সময় কালীম ভাই আমাকে ‘ইসলাম কিয়া হ্যাঁয়’ এবং ‘মরনে কি বাদ কিয়া হোগা’ (মৃত্যুর পর কী হবে?) নামক দু’টো বই পড়তে দেন। বই দু’টো আমাকে খুব প্রভাবিত করে। ‘মরনে কি বাদ কিয়া হোগা’ নামক বইটিতো আমার ঘুমই হারাম করে দেয়। মৃত্যুর পর আযাব সম্পর্কে আমার ভীষণ ভয় ছিল। আমি আমার অবস্থা সম্পর্কে তাঁকে বলি। মৃত্যু পরবর্তী শাস্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি আমাকে ঈমান আনতে ও ইসলাম কবুল করতে বলেন। আমি আমার পিতাকে ব্যাপারটা বললাম। তিনি আমাকে যা-ই করি না কেন খুবই চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। তিনি আমাকে আরও বললেন, তুমি এখন বড় হয়ে গেছ। নিজের সিদ্ধান্ত তুমি এখন নিজেই নিতে পার। অতঃপর ১৯৭৪ সালের ১ জানুয়ারী কলেজ লাইব্রেরীতে বসে কালীম ভাই-এর হাতে আমি ইসলাম কবুল করি।
আলহামদুলিল্লাহ। আমার পিতামাতা আমার এই ফয়সালায় কোনরূপ আপত্তি করেননি। ‘১৯৭৯ সালে আমার বোনের পীড়াপীড়িতে আমি লন্ডনে যাই এবং ‘১৯৮৪ সালে এম.এস. করে মীরাটে ফিরে আসি। কালীম ভাইকে আমার পিতা আমার বিয়ের ব্যাপারে পূর্ণ এখতিয়ার দিয়ে দিয়েছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! কালীম ভাই আমার জন্য খুবই উপযোগী একটি সম্পর্ক তালাশ করেন এবং দিল্লীর এক সৈয়দ পরিবারে আমার বিয়ে হয়। আমার স্বামী ডা. আমের একজন ডি.এম. (ডক্টর অব মেডিসিন) এবং ভাল নিউরোলজিস্ট। অধিকন্তু তিনি খুবই দীনদার, ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন লোকে তাঁকে খুবই সম্মান ও সমীহ করে। তাঁর ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের দরুণ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। তাছাড়া তিনি তাঁর বিষয়েও একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হন।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: ইসলাম গ্রহণের পর আপনি কেমন অনুভব করলেন?

ডা. ইরাম : আসলে যেমনটি আমি আগেই বলেছিলাম যে, আমি এবং আমার পুরো পরিবার বিশেষত আমার পিতা স্বভাবগতভাবেই মুসলমান ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর আমার মনে হল যেন সকালের হারিয়ে যাওয়া লোকটি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এসেছে। সে যেমন খুশি হয় আমার অবস্থাও ছিল ঠিক তেমনি।

আসমা যাতুল ফাওযাইন:  লন্ডনের মত পাশ্চাত্যের পরিবেশে নিজেকে মুসলমান ভেবে কেমন অনুভব করেছেন?

ডা. ইরাম : লন্ডনে আসার পর আলহামদুলিল্লাহ। শরীয়তের ওপর আমল করার ব্যাপারে আমাদের অনুভূতি খুবই সজাগ হয়ে গেছে। আমার স্বামী এখানে এসে দাড়ি রেখেছেন। আমি নিজেই অনুভব করছি যে, বেপর্দাপনা বিষয়ে নিদেনপক্ষে এখানকার উলঙ্গপনার প্রতি আমার ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাহাজ্জুদ নামায আলহামদুলিল্লাহ খুব নিয়মিতভাবেই আদায় করি। কমপক্ষে রোগমুক্তি যে একমাত্র আল্লাহর হাতে এ ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস দৃঢ় প্রতীতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মুসলমান রোগীও একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আমাদের এখানে আসে। আমরা রোগীকে ও.টি.র ক্ষেত্রে টেবিলে শুইয়ে দেবার আগে আমি তাকে কলেমা পড়াই, তাকে সান্ত্বনা দেই এবং এও বোঝাই যে, হতে পারে মৃত্যুও। এজন্য অন্তর-মনকে ভালভাবে আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিন। আল্লাহর প্রতি নিবিষ্টচিত্তে মনোনিবেশ করুন। অমুসলিম রোগী এলে আমাদের ক্লিনিক তাদের জন্য আধ্যাত্মিক চিকিৎসালয়ও বটে। আমাদের উভয়ের টেবিলের ওপর খুব ভাল ভাল ইসলামী সাহিত্য ও বই-পুস্তক থাকে। যার ভেতর থেকে আপন আপন অংশ রোগীরা নিয়ে যায়। আসলে আমরা পাশ্চাত্যকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা ও বস্তুবাদনির্ভর পাশ্চাত্য বিশ্ব অস্থির এবং তাদের অধিকাংশ লোকের জীবনের স্বাদ ও শান্তি থেকে মাহরূম হয়ে আত্মহত্যার প্রান্তে দাঁড়ানো দেখতে পাওয়া যায়। তাদের অস্থিরতা ও বেচাঈন অবস্থার চিকিৎসা কেবল ইসলামের পবিত্র শিক্ষামালার মধ্যেই নিহিত। হায়! যদি তাদেরকে এই নিয়ামতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া যেত।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: অমুসলিম রোগীদের ইসলামী সাহিত্য হাতে তুলে দেওয়ার দ্বারা কি কোন প্রকারের দাওয়াতী ফলাফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে?

ডা. ইরাম : আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের উভয়ের দাওয়াতে এই তিরিশ বছরে সর্বমোট ২৭৩ জন লোক মুসলমান হয়েছে। আমার শ্বশুর হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র)-র হাতে বায়আত ছিলেন এবং তিনি দিল্লী থেকে আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন। আমার স্বামীও তাঁরই একজন খলীফা মাওলানা ওলী আদম সাহেবের সঙ্গে বায়াতের সম্পর্ক রাখেন। আমরা আমাদের লন্ডন অবস্থানের উদ্দেশ্যও ইসলামের দাওয়াত মনে করি। আমার সবচেয়ে’ খুশির বিষয় হল, আমার বোন যিনি আমার পিতামাতার চেয়েও আমাকে বেশি চাইতেন, ভালবাসতেন, আমাদের লন্ডন আসার দু’মাস পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং গত বছর তিনি খুবই ভাল ঈমানী হালতে কলেমায়ে তাইয়্যেবা পাঠ করতে করতে জায়নামাযের ওপর ইন্তিকাল করেন।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: ইসলাম গ্রহণের পরও কি আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনার ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন?

ডা. ইরাম : আলহামদুলিল্লাহ! কালীম ভাই আমার ওপর জোর দেন যেন আমি প্রতিদিনের পাঠ্যসূচি ঠিক করে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনার ধারা অব্যাহত রাখি। আমি নিয়ত করেছি, মোটামুটি দৈনিক পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মত পড়ব। কিন্তু ৫০ পৃষ্ঠার সূচি আমি ঠিক রাখতে পারিনি। আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে গত তিরিশ বছরে দৈনিক গড়ে ২৫ পৃষ্ঠা যে পাঠ করেছি একথা বললে বোধ হয় ভুল বলা হবে না। আমি একশতের বেশি সীরাত গ্রন্থ পড়েছি। হযরত মাওলানা আলী মিঞা (সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, সারা ভারতে এ নামেই বেশি মশহূর।-অনুবাদক) লিখিত সব বই এবং হযরত মাওলানা (আশরাফ আলী) থানভী (রহ.)-র প্রায় সমস্ত বই আমি পড়েছি। মাওলানা মওদুদীর নানা বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়। আমরা খ্রিস্টানদের লিখিত বই-পুস্তকও দেখে থাকি।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: এভাবে তো আপনি কয়েক লাখ পৃষ্ঠা পড়ে থাকবেন?

ডা. ইরাম : আলহামদুলিল্লাহ! গড়ে প্রতিদিন ২৫ পৃষ্ঠার মত তো পড়েছি। এ হিসাবে বছরে দশ হাজার পৃষ্ঠার কাছাকাছি হবে। প্রথম দিকে আমার পড়াশোনার প্রতি খুব একটা বেশি আগ্রহ ছিল না। কালীম ভাই আমার ওপর জোর দেন, যবরদস্তিমূলকভাবে হলেও আপনাকে নিসাব পুরো করতে হবে। আমার উপকারী বন্ধুর নির্দেশ জেনে কয়েক মাস জোর করেই পড়া শুরু করলাম। অবস্থা তো আমার এখন এমন হয়েছে যে, খাবার না খেলে তত খারাপ লাগে না যত খারাপ লাগে বই না পড়লে। পিপাসার্ত মনে হয় তখন। কখনো নতুন বই না পেলে পুরানো বই আবার পড়ি। আর এভাবেই আমাদের ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী গড়ে উঠেছে। আর এর একটা অংশ কিছুটা হলেও স্মৃতিতে গেঁথে যায়।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনার ছেলেমেয়ে কতজন এবং তারা কোথায় পড়াশোনা করছে?
ডা. ইরাম : আমার তিনটি বাচ্চা। বড় ছেলে হাসান আমের, ছোটটার নাম হুসাইন আমের আর মেয়েটার নাম ফাতেমাতুয-যাহরা। দুই ছেলেই ডিউজবেরি মাদরাসায় লেখাপড়া করছে। হাসানের বয়স দশ বছরের বেশি। সে কুরআন মজীদ হিফ্জ শেষ করছে। আলিমিয়াত-এর ১ম বর্ষে পড়ছে। হুসাইন-এর বয়স নয় বছর। তারও ১৬ পারা মুখস্ত হয়ে গেছে। ফাতেমা একটি ইসলামী স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তার বাপই তাকে ঘরে কুরআন শরীফ পড়িয়েছে। আমরা উভয়ে কর্মসূচি তৈরি করেছি যে, আমরা আমাদের বাচ্চাদের রুযী-রোযগারের চিন্তা থেকে মুক্ত করে দেব যাতে করে তারা নিশ্চিন্তে ও নির্ভাবনায় একাগ্রচিত্তে নিজেদের জীবনকে দাওয়াতের জন্য ওয়াক্ফ করে দিতে পারে।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনার পিতামাতার কথা ভাবেন নি?

ডা. ইরাম : আলহামদুলিল্লাহ! আমি যে বছর এম.এস. করি এরপর এর পাঠ চুকিয়ে ভারতে ফিরে আসি তখন আমি কালীম ভাইকে ডেকে পাঠাই এবং পিতার ব্যাপারে কিছু করার জন্য আবেদন জানাই। তিনি আমার পিতাকে পড়ার জন্য অনেক বই-পুস্তক প্রদান করেন। হযরত মাওলানা আলী মিঞা (রহ.)-র ‘নবীয়ে রহমত’ নামক পুস্তকটি তাঁকে খুবই প্রভাবিত করে।
ইসলামের দ্বারা তিনি প্রথম থেকেই তো প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু এতদিন যাবত একটি ধর্মে থাকা এবং পরিবার ও খান্দানের লোক বিশেষ করে চাচা জনাব পিলু মোদী ও তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু আর. কে. করনজিয়ার কারণে তিনি ইসলাম গ্রহণে সংকোচ বোধ করছিলেন। ডক্টর আমের-এর সঙ্গে আমার বিয়ে তিনি নিয়মমাফিক ইসলামী তরীকায় বরং মুসলমানী প্রথামাফিক দেন এবং বিয়েতে প্রচুর খরচও করেন। যদিও বিয়েতে ব্যয়বাহুল্য ইসলামী তরীকা নয় মোটেই তবুও মুসলমানরা সেই পথই ধরেছে। পি.জি.আই.তে চাকুিরকালে আমার পিতা একবার গোমতীনগরে আমাদের বাসায় উঠে ছিলেন এবং দু’দিন থেকেও ছিলেন। সে সময় আমরা দু’জনই ছুটি নিয়েছিলাম এবং তাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়িও করেছিলাম। তিনি এই বলে পাশ কাটাতে চেষ্টা করেন যে, আনুষ্ঠানিক প্রথায় কিইবা যায় আসে? মন-মস্তিষ্কের দিক দিয়ে আমি তো তোমাদের আগে থেকেই মুসলমান আছি। কিন্তু আমার স্বামী বললেন, নিঃসন্দেহে মন-মস্তিষ্কের ইসলামই আসল ইসলাম। আর আমরাও একেই ইসলামের রূহ হিসাবে মানি ও স্বীকার করি। কিন্তু এও তো সত্যি যে, রূহ তথা আত্মা, আত্মর জন্য দেহও জরুরী। দেহ না হলে আত্মা থাকবেটা কোথায়? আপনি কলেমাটা পড়ে নিন। তিনি তৈরি হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। আমার মাম্মীও সাথেই ছিলেন। পিতার ইসলাম গ্রহণের পর তাকে মানানো আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। তিনিও কলেমা পাঠ করেন। মীরাট এসে দু’মাস পর তাঁর মারাত্মক হার্ট এ্যাটাক হয়। তাঁর হার্টের দু’টো ভাল্বই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাঁকে লাখনৌ নিয়ে আসি। কিন্তু জীবনের ফয়সালাকারী তাঁর চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়ে ফেলেছিলেন। লাখনৌয়েই তিনি ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ! জীবন সায়াহ্নে তাঁর ঈমানী হালত খুবই ভাল ছিল এবং তিনি ইসলামের ওপর সীমাতিরিক্ত আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আপনার ভাইদের অবস্থা কি?

ডা. ইরাম : আমার পরের ছোট ভাইটি তারেক, সি.এ. করেছে এবং মুম্বাই-এ একটি বড় কারখানার ম্যানেজার পদে কর্মরত। মুম্বাই-এ একটি তাবলীগি পরিবারে তার বিয়ে হয়েছে। সবার ছোট শারেক এম.বি.এ. পাস করার পর লাখনৌ-এর একটি হোটেলে ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। আমার স্বামীর ছোট বোন রাশেদার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এই ২৯ জুন তাদের বিয়ে হবে ইনশা আল্লাহ।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: আল্লাহ পাক স্বয়ং আপনাকে হেদায়াত দানে ধন্য করেছেন এবং আপনি নিজেও দাওয়াতের কাজ করছেন। কোন অমুসলিমের হেদায়াত পাবার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সর্বাধিক প্রভাবশালী বলে আপনি মনে করেন? আপনার সমগ্র দাওয়াতী জীবনে এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কি?

ডা. ইরাম : এমনিতে তো বর্তমান যুগটি জ্ঞান-বুদ্ধির যুগ। অস্থির ও বিক্ষুব্ধ মানবতার জন্য জ্ঞান ও বুদ্ধির নিক্তিতে পুরোপুরি উত্তীর্ণ হবার মতো ধর্মের পরিচিতি মানুষকে সীমাহীন প্রভাবিত করে। কিন্তু আমি আমার ইসলাম গ্রহণ এবং নিজের থেকেই হেদায়েত প্রাপ্ত লোকদের অবস্থার ওপর চিন্তা-ভাবনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, আপনি আপনার দাওয়াতী বক্তৃতা ও ভাষণ দ্বারা আপনার সমর্থক তো বানাতে পারবেন কিন্তু এতটা প্রভাবিত করবার জন্য যাতে করে একজন মানুষ যে দীর্ঘকাল একটি জীবনপদ্ধতি আঁকড়ে ধরে আছে সে তা বাদ দিতে ও পরিবর্তন করতে তৈরি হয়ে যাবে। সেজন্য দাওয়াতের সাথে আপনার মহৎ কর্মের প্রয়োজন। আমি মনে করি, আমাদের পরিবারকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে বরং আমাদের উভয়কে দাওয়াতের ওপর টেনে তুলতে আপনার আব্বার স্বভাবজাত ভদ্রতা এবং দাওয়াতের সাক্ষাৎ অবয়ব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। আসমানী কিতাবের সঙ্গে নবী প্রেরণ আমার এ ধারণার পেছনে সবচে’ বড় দলীল। মানুষের কিতাবের সঙ্গে (প্রকৃত) মানুষ চাই। অর্থাৎ কথার সঙ্গে কর্মের সামঞ্জস্য প্রয়োজন। কেবল তখনই বিপ্লব সৃষ্টি হয়।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: ধন্যবাদ ইরাম ফুফু! আমি আপনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনি আরমুগান-এর পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন? কেননা আমাদের পাঠকদের কাতারে মহিলারাও আছেন। তাদের জন্য বিশেষ কোন পয়গাম বা বার্তা?

ডা. ইরাম :  ‘আরমুগান’-এর মাধ্যমে পাঠক বোনদের খেদমতে বিনীত নিবেদন পেশ করব। একজন মুসলমানের দায়িত্ব সমগ্র মানবমণ্ডলীর কাছে ইসলামের বাণী ও পয়গাম পৌছে দেওয়া। এক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদেরকেও দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। বরং সত্যি বলতে কি দাওয়াতের বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যাবে দাওয়াতের বেলায় পুরুষেরও আগে মহিলাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বিপুল বন্ধু-বান্ধব, উপকারী ও একান্ত আপনজন পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও হেরা পর্বতে প্রথম ওহী নাযিল হবার পর তাঁর আহবানের সর্বপ্রথম লক্ষ্য (টার্গেট) আপন জীবনসঙ্গিণী হযরত খাদীজা (রা.)-কেই বানিয়েছিলেন। এ থেকে প্রমাণ হয় মহিলাদেরকেও তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বুঝতে হবে বরং পুরুষদের থেকে বেশি বোঝা দরকার। দাওয়াতের ময়দানে অমুসলিম জাতিগোষ্ঠী; বিশেষত পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছাকাছি গিয়ে তারা এই বাস্তব সত্য সম্পর্কেও জেনে থাকবেন যে, যেই বস্তুবাদিতা ও নগ্নতা পাশ্চাত্য সভ্যতার চোখ ঝলসানো চাকচিক্যদৃষ্টে আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হচ্ছি এবং একে উন্নতির স্বর্ণচূড়া ভাবছি তা কতটা পতনোন্মুখী। তা অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ইসলামী শিক্ষামালার প্রতি সতৃষ্ণ তাকিয়ে আছে এবং ইসলামের অনুগ্রহ বর্ষণ করে আল্লাহ তা’আলা আমাদের ওপর কত বড় অনুগ্রহ করেছেন।

আসমা যাতুল ফাওযাইন: মন চাচ্ছিল, আপনার থেকে আপনার দাওয়াতী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানব। কিন্তু আপনাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আল্লাহ চাহেন তো আগামী সাক্ষাতে আমাদের এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ হবে। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

ডা. ইরাম : অবশ্যই। আসলেই দাওয়াতী জীবনে বিরাট অভিজ্ঞতা ও হেদায়েতের বিস্ময়কর সব ঘটনা আমাদের দু’জনের জীবনে দেখা গেছে। আল্লাহ চাহেন তো ভবিষ্যতে অন্য কোন সাক্ষাতে সেসব নিয়ে আলাপ করা যাবে। আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ ও শান্তিতে রাখুন।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
আসমা যাতুল ফাওযাইন
মাসিক আরমুগান জুলাই ২০০৪ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ