নওমুসলিম ড. আব্দুর রহমান(কমল সাকসেনা)-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

আমাদের মাওলানা সাহেব বলেন, যে রাস্তা পেরিয়ে এসেছ তার দিকে আর যেন ফিরে না তাকাই। সামনে যে রাস্তা রয়ে গেছে, যা অতিক্রম করতে হবে তার দিকে তাকাও। আজ পাঁচশ কোটি মানুষ ইসলাম থেকে মাহরূম হয়ে জাহান্নামের পথে হাঁটছে এর বিপরীতে যারা হেদায়েত পেয়েছে তা একেবারেই ‘না’-এর শামিল। এটা মোটেই উল্লেখ করার মত নয়। কখনো কখনো উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য পেছনে ফিরে তাকানোটাও খারাপ নয়। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর এই নগণ্য বান্দার মাধ্যমে কমপক্ষে এমন দু’শ লোক ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে যারা কমপক্ষে গ্রাজুয়েট। এছাড়াও কতকগুলো জায়গায় সামগ্রিকভাবে বেশ কতকগুলো পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ!


আহমেদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।
ড. আব্দুর রহমান: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমেদ আওয়াহ: আপনি ভাল আছেন? বর্তমানে আপনি কোথায় আছেন?

ড. আব্দুর রহমান:আলহামদুলিল্লাহ! ভাল আছি। বর্তমানে আমি মহারাষ্ট্রের পুনায় আছি। এলাহাবাদ যাচ্ছি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে একটি পদ খালি হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের জন্য যাচ্ছি। পথে মাওলানা (মাওলানা কালীম সাহেব)-র সঙ্গে দেখা করার জন্য দিল্লী এসেছি।

আহমেদ আওয়াহ: খুবই ভাল হল। আপনি এসেছেন। আমাদের এখানে ফুলাত থেকে প্রকাশিত ‘আরমুগান’ পত্রিকায় কিছু দাঈ (ইসলাম প্রচারক) ও ভাগ্যবান নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
ড. আব্দুর রহমান:বলুন, বলুন, কি বলতে চান। খুবই ভাল সিলসিলা শুরু করেছেন। ইনশাআল্লাহ পাঠকদের খুব উপকার হবে।

আহমেদ আওয়াহ:আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিন।
ড. আব্দুর রহমান:আলহামদুলিল্লাহ। আমার বর্তমান নাম আব্দুর রহমান। ১৯৯৫ সালের ৯ই জুনের আগে আমার নাম ছিল কমল সাকসেনা (কে সি সাকসেনা)। হিন্দু কায়স্থ পরিবারের সঙ্গে আমি সম্পর্কিত। প্রতাপগড়ের কসবা রাণীগঞ্জে আমার পৈতৃক আবাস। আমার পিতা আই.সি.এস. অফিসার। বর্তমানে মোগল সরাঈ-এ ডি.আই.জি. হিসাবে আছেন। কায়স্থ হবার দরুন এখানে উর্দূ আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। আমার পিতা একজন ভাল কবিও বটেন এবং তাঁর কবিনাম সাহির। আমি সাইকোলজিতে এম.এ. করেছি এবং মনঃস্তত্ত্ব বিষয়ে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী অর্জন করি। আমার জন্ম তারিখ ১৯৬৫ সালের ৯ই জুন। আমার বর্তমান বয়স প্রায় ঊনচল্লিশ বছর। কিন্তু আমার প্রকৃত বয়স ৯ বছর। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আমার ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড়। আমার একটি ছোট বোন এবং তার থেকে ছোট আরেকটি ভাই আছে। সে ইঞ্জিনিয়ার। সে রুড়কী আই.টি.আই. থেকে ইলেকট্রোনিক্স-এ ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর গত বছর বি.এইচ.এল.-এ চাকুরী নিয়েছে। আর আমি বর্তমানে পুনায় একটি ডিগ্রী কলেজে সাইকোলজি পড়াচ্ছি।

আহমেদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন। কিভাবে আপনি মুসলমান হলেন?

ড. আব্দুর রহমান:আসলে আজকের বিশ্বে পাশ্চাত্যের রাজত্ব চলছে। সভ্যতা-সংস্কৃতি ও শিল্পের সকল ময়দানেই মানুষ তাদেরকে অনুসরণ করছে। আজকাল পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে জ্ঞানের একটি শাখায় উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করছে। তারা এর নাম দিয়েছে প্যারা সাইকোলজি। এই শাখায় চিন্তার উর্ধে বিষয় ও বস্তুর ওপর গবেষষণা হয়ে থাকে। এর একটি অংশে তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানও রেখেছে। আপনি যদি অধুনা ইউরোপীয় উপন্যাসগুলোর দিকে তাকান তাহলে আপনি এতে ডাইনী-জিন-পরী ইত্যাদির অত্যাধিক গুরুত্ব দেখতে পাবেন বরং কোন কোন সময় অনেক উচ্চশিক্ষিত ও ডিগ্রীধারী মানুষ এবং চাঁদ-তারা নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিজীবনেও জিন-পরী ও ভূত-প্রেতের কাহিনী দেখতে পাবেন। আসলে আমাদের মাওলানা মুহাম্মদ কলীম সিদ্দীকি সাহেব ঠিকই বলেন যে, মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতিতে এবং তার আত্মার মেযাজে আল্লাহই এই প্রেরণা রেখে দিয়েছেন যে, সে এমন এক সত্ত্বার সামনে মাথানত করবে তার সামনে নিজের দিল ও দিমাগ তথা মন-মস্তিষ্ক ঝুকিয়ে দেবে যা জ্ঞান-বুদ্ধি ও কল্পনারও অতীত। এজন্যই মানুষ যখন কোথাও জ্ঞান-বুদ্ধির অতীত ও অবোধগম্য কলা-কৌশল দেখতে পায় তখনি সে প্রভাবিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, এমনকি সে তার ভক্তে পরিণত হয়। আসলে এটা সেই যে রূহের জগতে আল্লাহ তা’আলা সমস্ত আরওয়াহকে একত্র করে তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই’ এর শিক্ষার কারিশমা তথা বিস্ময়কর চমৎকারিত্ব। এই আবেগ ও প্রেরণার সান্ত্বনা প্রদানের জন্য পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দুনিয়া প্যারা-সাইকোলজির আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

যুবকদের মধ্যে জ্ঞানের এই শাখায় গবেষণার প্রতি খুব আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং আমার তিন সাথী সাইকোলজির ওপর গবেষণা করছিল। আমারও আগ্রহ জন্মাল যে, আমি জার্মানী গিয়ে প্যারা-সাইকোলজিতে গবেষণা করব। আমি জিন প্রজাতির ওপর গবেষণা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার ধারণা হল যে, এ সম্পর্কিত মৌলিক তথ্যাদির জন্য হিন্দুস্তান সর্বোত্তম জায়গা।
যুবক বয়সে আমার জীবনের লক্ষ্য ও মিশনের প্রতি ছিল আমার একমাত্র আকর্ষণ। এ ব্যাপারে আমি বহু লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। বহু পরিণত বয়স্ক বুদ্ধিমান লোক ও তান্ত্রিকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। বহু যাদুকরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। সমগ্র বাংলা সফর করি। দেওবন্দ যাই। আমি নিজেও অনেক আমল করি। চিল্লা-কাশী করি। জালালী ও জামালী পরহেয করার সাথে সাথে বহু ওজীফা পাঠ করি। বহু তাবিয-তুমারও আমার হাতে আসে। যাদু-টোনাসহ ভূত-প্রেতের রোগীর চিকিৎসা করতে থাকি। এলাহাবাদের বড় বড় আলিমের খেদমতে বারবার আসা-যাওয়া করতে থাকি। আমার ঐকান্তিক আকাক্সক্ষা ছিল কোন জিন আমার আয়ত্ত্বে আসুক। আমার অনুগত হোক কিংবা জিন-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটুক। কিন্তু কোন যাদুকর কিংবা ঐন্দ্রজালিক কোন তান্ত্রিক সাধুই আমার এই আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। কয়েকবার বিভিন্ন আমল করার সময় কিছু ভীতিকর আওয়াজও শুনতে পেয়েছি কিন্তু কোন জিন আমার চোখে পড়েনি। কিছু রোগীর মুখ থেকে জিন কথা বলেছে, এর চিকিৎসাও আমি করেছি।

একবার আমি নদওয়া গেলাম। সেখানে মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসানী আমাকে বললেন, আমার একজন বন্ধু দুই-একদিনের মধ্যে ফুলাত থেকে এখানে আসবেন। তিনি আশা করি আপনার সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। তিনি আমাকে রবিবার দিন রায়বেরেলীর তাকিয়ায় আসার জন্য বললেন।

জুন মাস ছিল। আমি বেলা তিনটার দিকে তাকিয়া পৌঁছি। সকলেই খানাপিনার পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমি বাইরে চৌকির ওপর অপেক্ষা করছিলাম। একজন মাওলানা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে টয়লেটে যান। ফিরবার সময় আমাকে বসা দেখে বললেন, আপনিই কি ডক্টর কে. সি. সাকসেনা? আমি বিস্মিত হলাম এবং বিস্ময়ের সুরেই বললাম, জী হাঁ! কিন্তু আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? তিনি হাসতে হাসতে আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে ঠাণ্ডা পানি পান করালেন। এরপর বললেন, আমি একজন মানুষ, আল্লাহর বান্দা। অদৃশ্যের জ্ঞান আমার নেই। আর আল্লাহ ছাড়া অদৃশ্যের জ্ঞান আর কারও থাকে না। আসলে মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসানী আমাকে বলেছিলেন, ডক্টর কে. সি. সাকসেনা নামের একজন যুবক আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। তিনি রবিবারের দিকে আসবেন। আমি সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিলাম। আমি আপনাকে দেখেছি। আপনার চেহারা-সূরত দেখে মনে হল, আপনিই ডক্টর সাকসেনা। এজন্যই আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তাঁর এই স্পষ্টবাদিতায় আমি খুব প্রভাবিত হলাম। আমি যেসব যাদুকর ও তান্ত্রিক সাধকদের সঙ্গে দেখা করেছি তাদের সকলেই নিজেদের বিদ্যা জাহির করে আমাকে তাদের ভক্ত বানাতে চেয়েছে। কিন্তু মাওলানা কালীম সাহেবের এ কথা আমাকে খুবই প্রভাবিত করে। আমার ধারণা হল, অবশ্যই এখানে আমার সাহায্য মিলবে, কিংবা নিদেনপক্ষে সত্য জানা যাবে। মাওলানা আমাকে বললেন, বলুন! আমি আপনার কি খেদমত করতে পারি? আমার উপযোগী কোন কাজ আছে কি, যার জন্য এই প্রচণ্ড গরমে এত কষ্ট স্বীকার করে এত দূর এসেছেন? উত্তরে আমি আমার চাহিদার কথা বলতে গিয়ে বললাম যে, আমি প্যারা-সাইকোলজিতে গবেষণা করতে চাই। এজন্য আমাকে জার্মানী যেতে হবে। সেখানে যাবার আগে কোন জিনকে অনুগত কিংবা কমপক্ষে কয়েকদিনের জন্য তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। মাওলানা আব্দুল্লাহ বলেছিলেন যে, এ ব্যাপারে আপনি আমাকে অবশ্যই সাহায্য করতে পারবেন। এরপর এ পর্যন্ত এ নিয়ে কি কি করেছি তাও তাঁকে বললাম। চিল্লাকাশী করেছি, যেসব আমি করেছি, তাবিজ-তুমার যা শিখেছি, তাও তাঁকে বললাম। এসব শুনে মাওলানা সাহেব বিস্ময় প্রকাশ করলেন। এরপর হাসতে হাসতে বললেন, আপনি দেখছি খুব বীরপুরুষ, সাহসী মানুষ আপনি। আমি তো খুবই ভীরু। জিনের নাম শুনলেই আমার ভয় লাগে। আমাদের গ্রামে কয়েকটি বিরান ঘর রয়েছে, আছে কিছু ধ্বংসস্তূপ। জনশ্র“তি রয়েছে যে, সেখানে জিন থাকে। ছোটবেলায় আমার এর পাশ দিয়ে যেতে হলে এক দৌঁড়ে যেতাম। ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকাতাম না জানি কোন জিন পেছন থেকে এসে জাপটে ধরে। এরকম ভীতু মানুষ আপনার কোন্ কাজে লাগবে?

আমি বললাম, আমাকে সাহায্য করতেই হবে আপনাকে। কয়েক বছর ধরে আমি এভাবে পথে পথে ঘুরছি। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, আপনি অবশ্যই আমার ইচ্ছা পূরণ করতে পরবেন। এরপর আমার অনেক পীড়াপীড়ির পর মাওলানা নাহেব বললেন, প্রথমত যেই সৃষ্টিকে আল্লাহ স্বাধীন বানিয়েছেন তাকে অনুগত ও অধীন করা ঠিক নয়। জায়েজ নয়। এটা পরিষ্কার জুলুম। যেমন বাঘের পিঠে আরোহণ করা আমাদের ধর্মে জায়েজ নয়। দ্বিতীয়ত, যেসব আমালিয়াতের মাধ্যমে মানুষ জিনদেরকে আয়ত্ত্ব করে, অনুগত বানায় সেসব আমালিয়াতের মধ্যে আছর সৃষ্টির জন্য ঈমান আনা জরুরী। ঈমান ব্যতিরেকে সেসবের মধ্যে তাছীর পয়দা হয় না, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না। তাছীর সৃষ্টির জন্য তার মুসলমান হওয়া জরুরী। জিন আয়ত্ত্ব করার স্বপ্ন আমার কাঁধে সওয়ার হয়েছিল। এজন্য প্রয়োজনে সবকিছু এমনকি আমি আমার ধর্মও বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। আমি তখনি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আমি এজন্য মুসলমান হতে তৈরি আছি।

মাওলানা সাহেব বললেন, তাড়াহুড়া করবেন না। কথা হচ্ছে, আমার আত্মমর্যাদাবোধ আমাকে এ অনুমতি দেয় না যে, কেবল জিন হাসিল করবার জন্য আমি আপনাকে কলেমা পড়াই এবং মুসলমান বানাই। এরপর যেই ইসলাম আপনি জিন হাসিলের জন্য, জিন আয়ত্ত্ব করবার জন্য গ্রহণ করবেন সেই ইসলাম আল্লাহর দরবারে কতটা গৃহীত হবে তাও তো দেখতে হবে। আমার কথা শুনুন এবং পূর্ণ প্রশান্তির সঙ্গে আপনি সিদ্ধান্ত নিন।

আমি এক্ষণে কিছুটা সময় নিয়ে আপনাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলছি, ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরছি। আশা করি, যদি কিছুটা মনোযোগ দিয়ে আপনি শোনেন এবং ইসলামের হাকীকত ও এর মূল তাৎপর্য জেনে নেন তাহলে আপনার জিন আয়ত্ত্ব করা কিংবা জিন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চাইতেও বেশি ইসলামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। কিছু বই-এর নাম আমি বলছি। খুব ভালভাবে আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়ুন। যদি আপনি তৃপ্ত হন এবং নিশ্চিতভাবে জেনে নেন যে, ইসলাম ব্যতিরেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না তাহলে আপনি কলেমা পাঠ করে সত্য মনে খোলা মনে মুসলমান হয়ে যান। মুসলমান হবার পর আমি ওয়াদা করছি, আপনি ফুলাত আসুন, আমি এক বা কয়েকজন জিনের সঙ্গে আপনাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দেব যারা আপনার সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত থাকবে যতক্ষণ না আপনি তাদের সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য হাসিল করছেন। এজন্য কোন আমলে প্রয়োজন হবে না, কোন ওজীফারও দরকার পড়বে না।

আহমেদ আওয়াহ: এরপর কী হলো?

ড. আব্দুর রহমান: জী, বলছি। আমি তাঁর কথায় একমত হলাম। তিনি প্রায় এক ঘণ্টা যাবত আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলতে থাকলেন। হুযুর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত মোবারকের সংক্ষিপ্ত আলোচনাও তুলে ধরলেন এবং এ কথার ওপর জোর দিতে থাকলেন যে, প্যারা-সাইকোলজিতে গবেষণা ও জিনের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে এটা বেশি জরুরী, আপনি প্রথম ভাগেই কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। কেননা মৃত্যুর কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। মাওলানা সাহেব বই-এর একটি তালিকা আমাকে বানিয়ে দিলেন। আমাকে ফুলাতের ঠিকানা দিলেন। এরপর আমার ঠিকানা ও ফোন নং চাইলেন। আমি বললাম, আমার পিতার প্রমোশন হচ্ছে, নতুন ঠিকানা ও ফোন নং ডাকযোগে পাঠিয়ে দেব এবং জুলাই-এর শুরুতে আমি আমার তিন সঙ্গীসহ ফুলাত আসব। পৌনে পাঁচটার সময় মাওলানা সাহেব উঠলেন। মাওলানা কালীম সাহেব এরপর আমাকে বড় হযরত, হযরত মাওলানা আলী মিঞার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নিয়ে গেলেন এবং তাঁর কাছে আমার উদ্দেশ্য হাসিলে সাফল্য ও হেদায়েতের জন্য দোআ করতে বললেন। আমাকে লাখনৌ যেতে হবে। এত দীর্ঘ সাক্ষাতের পর আমার দিল ইসলামের জন্য যথেষ্ট তৃপ্ত ও প্রশান্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি লাখনৌ এসে “ইসলাম কিয়া হ্যায়” (ইসলাম কী?) ও “খুতবাতে মাদরাস”, (নবী চিরন্তন ও ‘পয়গামে মুহাম্মদী’) কিনলাম।

আহমেদ আওয়াহ: এখন আপনি কী করছেন? আপনার পেশা কি?
ড. আব্দুর রহমান: আমি আমার জীবন মাওলানা সাহেবের পরামর্শ মাফিক পরিচালনা করতে চাই। তিনি আমাকে বলেছেন, দাওয়াতী উদ্দেশ্যের জন্য কোন পেশা থাকা দরকার। আমি বর্তমানে পুনায় একটি ডিগ্রী কলেজে সাময়িকভাবে শিক্ষকতা শুরু করেছি। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি রীডার-এর পদ খালি হয়েছ। সেজন্য সেখানে যাচ্ছি। এতে করে আমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও সম্পর্কিত জন এবং প্রাগপীঠে দাওয়াতের কাজ করার সুযোগ মিলবে।

আহমেদ আওয়াহ: আমরা শুনেছি, আপনি বেশ কিছুকাল থেকে দাওয়াতী মিশনে লেগে আছেন। আজ পর্যন্ত আপনার মাধ্যমে কতজন ইসলাম কবুল করেছে?

ড. আব্দুর রহমান: আমাদের মাওলানা সাহেব বলেন, যে রাস্তা পেরিয়ে এসেছ তার দিকে আর যেন ফিরে না তাকাই। সামনে যে রাস্তা রয়ে গেছে, যা অতিক্রম করতে হবে তার দিকে তাকাও। আজ পাঁচশ কোটি মানুষ ইসলাম থেকে মাহরূম হয়ে জাহান্নামের পথে হাঁটছে এর বিপরীতে যারা হেদায়েত পেয়েছে তা একেবারেই ‘না’-এর শামিল। এ মোটেই উল্লেখ করার মত নয়। কখনো কখনো উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য পেছনে ফিরে তাকানোটাও খারাপ নয়। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর এই নগণ্য বান্দার মাধ্যমে কমপক্ষে এমন দু’শ লোক ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে যারা কমপক্ষে গ্রাজুয়েট। এছাড়াও কতকগুলো জায়গায় সামগ্রিকভাবে বেশ কতকগুলো পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ!

আহমেদ আওয়াহ:আপনি আপনার ঘরের লোকদের মাঝে দাওয়াতী কাজ করেন নি?

ড. আব্দুর রহমান: আসলেই আমি তাদের হক আদায় করিনি। মোটামুটি কিছু কাজ করেছি অথচ তাদেরই হক ছিল বেশি। কয়েক মাস থেকে আমি আমার পিতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছি। প্রথম দিককার সাক্ষাতগুলোতে তিনি হাসতেন এবং বলতেন “নিজে তো ডুবেছ, এখন আমাকে নিয়ে ডুবতে চাও।” কিন্তু গত দু’বার তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার খুব কান্না পেয়েছিল। আমার ডুকরে ডুকরে কাঁদা তার দিলকে স্পর্শ করেছে। তাঁর মনে লেগেছে। তিনি আমার কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়েছেন এবং গভীর মনোযোগের সহকারে পড়েছেন। আমার মনে হচ্ছে তাঁর ওপর হেদায়েত নাযিল হতে যাচ্ছে।

আহমেদ আওয়াহ: আপনি কিভাবে বুঝছেন যে, হেদায়েত নাযিল হতে যাচ্ছে ।

ড. আব্দুর রহমান: আমার বিগত নয় বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, হেদায়াত আসমান থেকে নাযিল হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এই অনুগ্রহের আছর কেবল যাকে দাওয়াত দেওয়া হয় তার ওপরই হয় না বরং দা’য়ী (দাওয়াত প্রদানকারী)’র দিলের ওপরও এক ধরনের প্রশান্তি ও আস্থার ভাব সৃষ্টি হয়। আমার অভিজ্ঞতায় বার বার ধরা পড়েছে, যাকে দাওয়াত প্রদান করা হচ্ছে দৃশ্যত সে বারবার তা প্রত্যাখ্যান করছে এবং দাওয়াতের প্রতি ভ্রক্ষেপ করছে না, মনোযোগ দিচ্ছে না আদৌ, অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতা অনুকূল নয় মোটোই বরং প্রতিকূল কিন্তু ভেতর থেকে মন ডেকে বলছে, কাজ হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাক। এরপর অবস্থা পাল্টে যায় এবং সে হেদায়াত পায়। এর বিপরীতে অবস্থা দৃশ্যত অনুকূল মনে হচ্ছে, মনে হয় দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি মুসলমান হয়ে যাবে।

কিন্তু ভেতর থেকে স্বভাব-প্রকৃতি রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং ঠিক যথাসময়ে দাওয়াত প্রাপ্ত ব্যক্তি হেদায়াত থেকে মাহরূম হয়ে যায়। এর চেয়ে বেশি প্রমাণ এ কথার আর কি হতে পারে যে, হেদায়াত সেখান থেকে অবতীর্ণ হয়। দা’য়ী (দাওয়াত প্রদানকারী)-কে আল্লাহ তা’আলা বাহন বানিয়ে ধন্য ও অনুগৃহীত করেন, তার অন্তরকে আনন্দে ভরপুর করে দেন। অন্যথায় হেদায়াত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দা’য়ীর কিছুমাত্র হাত নেই।

আহমেদ আওয়াহ:ডক্টর সাহেব! মন চাচ্ছিল আপনার সাথে আরও কথা বলতে এবং দাওয়াতের ময়দানে আপনার অভিজ্ঞতা আরমুগান-এর পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে। আলোচনা বেশ দীর্ঘ হয়ে গেছে। আল্লাহ চাহেন তো আপনার সাথে আবার বসব। একবার নয়, বার বার বসতে হবে। আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ আপনাকে এর বিনিময় দান করুন।

ড. আব্দুর রহমান: আপনি যখনই হুকুম করবেন আমি হাজির হয়ে যাব। দাওয়াতী খেদমতের জন্য আমার শরীরের চামড়া, আমার রক্ত, আমার জীবন যাই দরকার পড়–ক আমি তৈরি। একে আমি আমার সৌভাগ্য ভাবছি যে, কিছু সময় এই উদ্দেশ্যে দিতে পারলাম। এ আর এমন কি!

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহামাদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান,জুন ২০০৫ ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ