নওমুসলিম তৌহীদ ভাই (ধর্মেন্দ্র)-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

গীতা দিদির বাড়ির লোকেরা তার বিয়ে অমুসলিম পরিবারে দিতে চায়। সে কয়েকজন মুসলমানর কাছে যায় যে, কেউ তাকে মুসলমান বানিয়ে নিক এবং হিন্দু ধর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে সাহায্য করুক। কিন্তু কেউ এজন্য তৈরি ছিল না। সবাই ভয় পাচ্ছিল, সে আমাকে ফোন করল যে, তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও। আমি বললাম, রবিবার আমার সাপ্তাহিক ছুটি। কিন্তু শনিবারে তার বিয়ে হবার কথা। সে জুমার দিন জনা দশেক মুসলমানের কাছে গিয়েছে যে, সে মুসলমান হতে চায়। আজ যদি তাকে মুসলমান না বানানো হয় তাহলে তার বাড়ির লোকেরা তাকে বিয়ে দিয়ে দেবে। আর তাকে সারাজীবন হিন্দুই থাকতে হবে। কিন্তু কেউ তাকে মুসলমান করার জন্য তৈরি হল না। বাধ্য হয়ে রাত্রে সে সালফেজ-এর বড়ি খায় এবং মারা যায়। সে বলেছিল, হিন্দু সমাজে থাকা ও বিয়ে করার চেয়ে মৃত্যুকে সে প্রধান্য দেয় ও পছন্দ করে। আমার আল্লাহ আমাকে নিজেই মুসলমান বানিয়ে নেবেন। আমি রবিবারে ভূপাল পৌঁছি। এরপর দুর্ঘটনার কথা জানতে পারি। আজ পর্যন্ত আমি সেই দুঃখজনক দুর্ঘটনার কথা ভুলতে পারি না। দু’পয়সার চাকুরীর জন্য কতবড় জুলুম করেছি আমি। আমার আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
তৌহীদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: তৌহিদ ভাই! আরমুগান পত্রিকার জন্য আপনার থেকে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে হবে।

তৌহীদ: হ্যাঁ, আহমদ ভাই! আব্বুজী বলছিলেন, আহমদ তোমার সাথে কিছু কথা বলবে। তিনি কাল সফর করতে এজন্যই নিষেধ করেছিলেন। আমিও থেমে গেছি যাতে আরমুগানের দাওয়াতী আন্দোলনে আমার মত অযোগ্যের কাজের জন্য নাম এসে যায়। আশ্চর্য কি আল্লাহ আমার ওপর এতটুকু কথায় রাজী হয়ে যাবেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার পারিবারিক পরিচিতি পেশ করুন।

তৌহীদ: আমি মধ্য প্রদেশের সীহূর জেলার এক দরমা পরিবারে আজ থেকে বাইশ বছর আগে জন্মগ্রহণ করি। আমার পরিবার আমার নাম রেখেছিল ধর্মেন্দ্র। আমার পিতা কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দু। আমার পরিবারের লোকেরা বজরং দল, শিবসেনা ও সনাতন ধর্ম আখড়ার দায়িত্বশীল। আমার আরও তিন ভাই ও এক বোন আছে। আমি আমাদের এখানে স্কুলে লেখাপড়া করেছি। এরপর মণ্ডিদীপ ভূপালে একটি কারখানায় চাকুরী নিই। সেখানে আমার কয়েকজন তরুণ সাথী শিবসেনার সদস্য ছিল। আমার ছোটকাল থেকেই ব্যয়াম ও শরীর চর্চার অভ্যাস ছিল। এজন্য আমার বন্ধুরা আমাকে চেষ্টা-তদবীর করে ভূপাল শিবসেনায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আমি শিবসেনার অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী ছিলাম। প্রত্যেক কর্মসূচিতেই আমি শামিল হতাম এবং মুসলমানদের ঘৃণা এবং তাদেরকে কষ্ট দেবার কয়েকটি প্রোগ্রামে আমি অতি উৎসাহে অংশগ্রহণ করি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলুন।

তৌহীদ: প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি হাদীস শুনেছিলাম, যার অর্থ এরকম : দিনরাতের মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত আছে যা আল্লাহর নিকট খুবই
মকবুল মুহূর্ত। এ সময় বান্দার মুখ দিয়ে যা বের হয় আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়, মঞ্জুর হয়। আমার ঈমান এই হাদীস পাকের সত্যতার নিদর্শন। আমি স্কুলে পড়তাম। এ সময় দু’জন মুসলমান ছেলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। দু’জন ছিল আপন ভাই। একজনের নাম শাহযাদ, আরেকজনের নাম আযাদ। আমি তাদের সাথে খেলতাম। তাদের বাড়ি যেতাম এবং তাদের সাথে খাবারও খেতাম। গোশতও খেতাম। অধিকাংশ সময় যখন তাদের বাড়ি খানা খেতাম আমরা তিনজন একই প্লেটে খেতাম। তাদের ক্ষেত-খামার ও আমাদের ক্ষেতের সাথেই ছিল। শাহযাদের পিতা একবার আমাদের ক্ষেতের আইল কেটে দেয়। এতে করে আমার পিতার সাথে তার ঝগড়া হয়। কথায় কথা বাড়ে। তখন শাহযাদের আম্মা বেরিয়ে আসে এবং আমার পিতা ও বলতে থাকে, আপনারা বড় হয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ফাসাদ করছেন আর এই বাচ্চারা নিজেরা পরস্পরকে ভালবাসে। আপনার ছেলে এবং আমার ছেলে এক থালয় খানা খায় ও এক গ্লাসে পানি পান করে। এ কথা শুনে আমার পিতা তখন তো ঘরে ফিরে আসলেন, কিন্তু এসেই আমাকে খুব মারলেন এবং বললেন, তুই অধার্মিক হয়ে গেছিস। গরুর মাংস খাস। আমাকে গালাগলি করলেন এবং বলতে লাগলেন, তোর মুখ নাপাক হয়ে গেছে। একে পাক করার জন্য তোকে আগুন দিয়ে জ্বালাতে হবে। আমারও রাগ হল। ছোট তো ছিলামই। আমি বললাম, আপনি আমকে ওখানে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারবেন না। তিনি আমাকে আরও মারতে লাগলেন। তখন আমি বললাম, আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে মুসলমান হয়ে যাব। সত্যি বলতে কি, আমার মনে হয় যে, আমার আল্লাহ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কথা কবুল করে নিয়েছেন এবং আমাকে ধর্মেন্দ্র থেকে তৌহিদ বানিয়ে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: তুমি কিভাবে কলেমা পড়লে একটু বিস্তারিতভাবে বল।

তৌহীদ: মুসলমানদের সাথে আমার বন্ধুত্ব আমার পিতার খুব খারাপ লাগে। তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমাদের ব্রেন ওয়াশ শুরু করার চিন্তা করলেন। মোগল বাদশাহ ও সুলতান মাহমূদ গযনবী প্রমুখের জুলুম-নির্যাতনের কাহিনী তিনি আমাদের প্রতিদিন রাতে আমাদের পড়িয়ে শোনাতেন। আমাদের মাথায়ও বাসা বাঁধা শুরু হল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষের । আর এই ঘৃণা-বিদ্বেষই আমাকে শিবসেনার সদস্য হতে সাহায্য করল। কিন্তু আমার মনে আমার শৈশবের বন্ধুদের সাথে থাকার দরুন মুসলিম সমাজের সঙ্গে এক ধরনের সম্বন্ধ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। এজন্য এই ঘৃণা সত্ত্বেও আমার কোন না কোন বন্ধু সব সময় অবশ্যই মুসলমান ছিল। ভূপালে আমি যে কোম্পানিতে চাকুরী করতাম সেখানেও ওয়াসীম নামে এক বন্ধু ছিল। আমি অনেক সময় ডিউটি ছেড়ে তার ঘরে যেতাম। রমযান এলে সে রোযা রাখত এবং আমাকে সন্ধ্যাবেলায় ইফতারে শরীক করাত এবং আমাকে খুব খাতির-যতœ করত। তার কাছে জামা’আতের লোকেরা আসত। তখন সে আমাকে ছেড়ে তাদের কাছে চলে যেত। আমি দূর থেকে জামা’আতের লোকদের কথা শুনতাম। কখনো কখনো আমি অনিচ্ছা সত্বেও তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যেতাম এবং মাথায় রুমাল বেঁধে তাদের কথা শুনতাম। তারা কেবল মৃত্যু পরবর্তীকালের কথাই বলতেন এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ও জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করত। আমার অন্তরে এ কথাগুলো খুব ভালো লাগত ও সত্য মনে হত। এ ফ্যাক্টরী থেকেও কতগুলো অসুবিধার জন্য আমাকে চাকুরী ছাড়তে হয়। অন্য ফ্যাক্টরীতে চাকরি পাই। ভাগ্যক্রমে এই ফ্যাক্টরীতেও জাবিদ নামে একটি ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। সেও আমাকে ইফতারীতে নিয়ে যেত। ইফতারীর পর সে নামায পড়ত। আমি দূর থেকে তাকে নামায পড়তে দেখতাম। একদিন জাবিদ আমাকে বলল, ভূরা ভাই! মরতে তো তোমাকেও হবে! তোমারও নামায পড়া দরকার। তুমি মুসলমান হয়ে যাও। আমি বললাম, তুমি কি আমাকে এজন্য খানা খাওয়াও যে লোভ দেখিয়ে আমাকে মুসলমান বানাবে। সে বলল, আমি তো ভালবেসে এবং সত্যিকারের সমবেদনা নিয়ে কথা বলছি। এরপর হঠাৎ করেই আমার শরীর খারাপ হয়ে গেল। কয়েকদিন ছুটি নিলাম। শেষ পর্যন্ত ছুটি দীর্ঘায়িত হবার দরুণ সেখানকার চাকুরীও আমাকে ছাড়তে হল। এই ফ্যাক্টরীতে গীতা নামে একটি মেয়ে চাকুরী করত। আমি তাকে বড় বোন বানিয়েছিলাম এবং তাকে আমি গীতা দিদি বলতাম। আমার কোম্পানীর প্রথম সুপারভাইজার ভূপাল ছেড়ে নাওয়াইডাতে চাকুরী করছিলেন। তিনি আমাকে ফোন করেন যে, আমি নাওয়াইডা এসে গিয়েছি। আমি ঘোরাফিরার জন্য গীতা দিদিকে নাওয়াইডা নিয়ে এসেছি। তাকে দেখে আমার কোম্পানীর মালিক আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন যে, এই ছেলে তো বদমাশ। মেয়েদের ডেকে এনে কাছে রাখে। তিনি আমাকে চাকুরী থেকে বাদ দেন। আমি গীতা দিদিকে বলি, জাবিদ আমাকে মুসলমান হতে বলে। সে বলে, সে তো ভাল কথাই বলে। ইসলামই সত্য ধর্ম। আমাদের প্রতিবেশী একজন মিঞাজী থাকেন। তাঁর দুই মেয়ে! আমাকে মৃত্যুর পর কী হবে সে সম্পর্কে পড়ে শুনায়। তাদের কাছে একটি উর্দূ ম্যাগাজিন ‘আরমুগান’ আসে। এতে সেসব লোকের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় যারা এককালে অন্য ধর্মে ছিল, এখন মুসলমান হয়ে গেছে। তুমি অবশ্যই মুসলমান হয়ে যাও। তুমি মুসলমান হলে আমাকেও অবশ্যই ডেকে নেবে। দেখ, নিজের দিদিকে অবশ্যই মনে রাখবে। তারপর দিল্লী ঘুরিয়ে আমি গীতা দিদিকে তো ছেড়ে আসলাম, কিন্তু তার বলায় আমার অন্তরে এ কথা বসে গেল যে, আমাকে মুসলমান হতে হবে। আমি অন্য একটি কারখানায় চাকরি নিলাম। সেখানে শরীফ নামে একটি ছেলে থাকত। আমি তাকে বললাম, আমি মুসলমান হতে চাই। তুমি আমাকে মুসলমান বানিয়ে দাও। সে বলল, তুমি মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে চলে যাও। তিনি তোমাকে মুসলমান বানিয়ে দেবেন। আমি মসজিদে গেলাম। বহু মুসলমান সেখানে ওযূ করছিলেন। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি। এই ভয়ে না জানি ঝগড়া-ফাসাদ না বেধে যায়। আমি বাইরে বসে সিগারেট খেতে থাকি। অতঃপর পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত মসজিদের বাইরে অপেক্ষা করে ফিরে আসি। মসজিদে প্রবেশের সাহস করে উঠতে পারিনি। সেখানে বসার পর মুসলমান হবার জন্য আমার অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পায়। পরদিন বেলা ডোবার পর আমি পুনরায় মসজিদে যাই। লোকজনকে বললে, তারা জানান, ইমাম সাহেব বাজারে গেছেন। আমি অপেক্ষা করতে থাকি। আটটার সময় তিনি এলেন। আমাকে দেখে বললেন, রোগী সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দেখে থাকি। এরপর তাবিয দিই না। আমি বললাম, আমি চিকিৎসা চাই না। আমি অন্য রোগের রোগী। আমি জানতে চাই, যদি কোন মানুষ আপনার ধর্মে আসতে চায় তাহলে আপনার কোন অসুবিধা নেই তো? তিনি বললেন, আমার কোন অসুবিধা নেই।
আমি বললাম, আমি মুসলমান হতে চাই। তিনি আমার নাম, ঠিকানা, বাড়ি নং, ফোন নং ইত্যাদি লিখলেন এবং বৃহস্পতিবার পুনরায় আসতে বললেন। বৃহস্পতিবার গেলে তিনি শুক্রবার আসতে বললেন। আমি জুমুআর দিন গেলে সেখানে জামা’আতের সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ হল। তারা আমার কাছে জানতে চাইল আমি কেন মুসলমান হতে চাই? আমি বললাম, এমনিই। তারা বললেন, একটি গাছে অনেকগুলো পাখি ছিল। একজন লোক আসল। সে পাথর তুলে মারল। কিছু পাখি মরল, কিছু পাখি উড়ে গেল। আর কিছু বসে রইল। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি পাখিগুলোকে পাথর মারলে কেন? সে বলল, এমনিই। তুমিও তেমনিই মুসলমান হতে চাচ্ছ। আমার এ ধরনের কথা খুব খারাপ লাগল। আমি নাওয়াহদাতে লোকের কাছে জানতে চাইলাম, আমাদের কাছাকাছি দিল্লীতে সবচেয়ে’ বেশি মুসলমান কোথায় বাস করে। লোকের ওখলার কথা বলল। আমি ভাবলাম, ওখলায় গিয়ে মুসলমান হব। এমন সময় হঠাৎ করেই ওখলার একটি জামা’আত জুমুআর দিন এসে গেল, আমাকে শরীফ ডেকে পাঠাল এবং জামা’আত ওয়ালাদের বলল যে, এই ছেলে মুসলমান হয়ে গিয়েছে। জামা’আতের লোকেরা আমাকে বলল, ওখলার জামা’আত চল্লিশ দিনের জন্য যাবে। আপনি এতে চল্লিশ দিন লাগিয়ে দিন। আমি তৈরি হলাম। তিনদিন পর আমি জামা’আতের সাথে বেরিয়ে গেলাম। খরচ-পত্রের জন্য আমি ঘড়ি ও স্বর্ণের আংটি বিক্রি করলাম। পানিপথ, সোনীপথে আমরা সময় লাগালাম। আমি ফোন করার প্রতি খুব আগ্রহী ছিলাম। কখনো ভূপাল, কখনো সীহর ফোন করতাম, কখনো নওয়াইডা ফোন করতাম। আমার সাথীরা আমাকে সন্দেহ করতে লাগল। আমার থেকে পৃথক হয়ে তারা পরামর্শ করল, এই ছেলেকে ফেরত পাঠিয়ে দাও। এ সি.আই.ডি.র লোক। জামা’আতে একজন লোক ছিলেন যিনি মাওলানা কালীম সাহেবের মুরীদ। তিনি বললেন, সি.আই.ডি.র লোক হল তো কী হল? আমরা তো চুরি-ডাকাতি কিছু করছি না। কিন্তু জামা’আতের লোকেরা তা মানল না। তারা মাওলানা কালীম সাহেবকে ফোন করল এবং আমার সব কিছু বলে দিল। মাওলানা সাহেব কেবল ফোনের কথা শুনে তাদেরকে বললেন, তোমরা এই ছেলেকে নিয়ে নিজেদের সাথে চল্লিশ দিন লাগাও। যদি তার থেকে কোন বিপদের আশঙ্কা কর তজ্জন্য আমি দায়ী থাকব। আপনারা তাকে আমার ছেলে মনে করে সাথে রাখুন। যে কোন ক্ষয়ক্ষতির যিম্মাদার আমি হব। মাওলানা সাহেব খুব ভালবেসে কথা বললেন এবং বললেন, জামা’আত থেকে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবে এবং আমীর সাহেবকেও বললেন, ও আমার ছেলে। যে কোন ক্ষয়ক্ষতি ও বিপদের দায়-দায়িত্ব আমার। এজন্য তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যে, আমি জামা’আত থেকে ফিরে গিয়ে হযরত মাওলানার হাতে যেন বায়’আত হই। পানিপথে হযরতের এখানে একজন মুফতী সাহেব (মুফতী সারাফত সাহেব)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে সান্ত্বনা ও মুবারকবাদ দেন।

জামা’আত থেকে ফিরে এসে আমি নওয়াইডায় আসি এবং মাওলানা সাহেবকে বারবার ফোন করতে থাকি। এক মাস পর্যন্ত মাওলানার সঙ্গে দেখা হয়নি। যখনই ফোন করতাম উত্তর পেতাম তিনি সফরে আছেন। একদিন মাওলানা সাহেব বললেন, সকাল ন’টা পর্যন্ত আমি আল্লাহ চাহে তো দিল্লী পৌঁছাব। আপনি মসজিদে খলীলুল্লাহ-এ এসে পড়ুন। আমি আটটার সময় খলীলুল্লাহ মসজিদে পৌঁছি। মাওলানা আসতে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েন এবং এগারোটা পর্যন্ত আসতে পারেননি। মসজিদে খলীলুল্লাহতে আমার এক জামা’আতী সাথী ভাই ইউসুফের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাকে পরামর্শ দেন আমি যেন হাকীম মাহমূদ আজমিরীর কাছে গিয়ে বায়’আত হই। তিনি আমাকে তার কাছে নিয়ে যান। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মুসাফাহা করেন ও বলেন, আমি তো একটার পর দেখা করতে পারি। আমার আফসোস হল, কিন্তু বায়’আত হবার আগ্রহে আমি মসজিদে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। হঠাৎ করেই সাড়ে এগারটার সময় মাওলানা সাহেব এসে গেলেন। খুব আদরের সাথে আমাকে গলায় জড়িয়ে ধরলেন। দেরিতে সাক্ষাৎ হবার জন্য ক্ষমা চাইলেন। তারপর আমার কাছে জানতে চাইলেন কতদিন আগে আমি মুসলমান হয়েছি। আমি বলি, আমাকে কেউ মুসলমান করেনি। মাওলানা সাহেব বললেন, কলেমা পড়া ব্যতিরেকে সমস্ত আমল বেকার ও অর্থহীন। মৃত্যুর কোন নিশ্চয়তাই নেই। প্রথমে আপনি কলেমা পড়ে নিন। এরপর আমাকে কলেমা পড়ালেন এবং বললেন কোন নাম পছন্দের থাকলে নাম বদলে ফেল। আমি বললাম, আমি শির্ক থেকে তওবাহ করেছি। এজন্য আমি আমার নাম তৌহীদ রাখতে চাই। মাওলানা সাহেব এই নাম পছন্দ করলেন। ‘আপ কি আমানত’ বইটি চেয়ে আমাকে দিলেন। অতঃপর আমার পীড়াপীড়িতে আমাকে বায়’আত করে নিলেন।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হল?

তৌহীদ: পরদিন আমাদের জেলার কিছু লোক মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তারা হযরতকে বলেন, তৌহীদকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি। সে তার ঘরের লোকদের ওপর কাজ করবে। মাওলানা সাহেব আমাকে তাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ভূপালে ছিলাম। আমার গ্রামের কিছু লোক আমাকে দেখে ফেলে। তারা বলে যে, গ্রামের লোকেরা জেনে ফেলেছে যে, তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। আমরা সেখানে দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশংকা করছি। তোমার এখানে থাকা ঠিক হবে না। এরপর আমি আবার ফুলাত চলে আসি। মাওলানা সাহেবকে আমি বলি যে, আমি বায়আত করেছিলাম সুন্নত অনুসরণের জন্য। কিন্তু আমার থেকে একটি সুন্নত পালিত হচ্ছে না। আপনি আমার খতনা করিয়ে দিন। মাওলানা সাহেব বললেন, ঠিক আছে। পরদিন হাজ্জাম ডেকে আনলেন এবং অনেক লোককে এক সাথে খতনা করিয়ে দিলেন। সকলের খতনাই খুব তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে গেল। কিন্তু আমার ও আরেকটি ছেলের খতনা পেকে যায়। ফলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমার জ্বর এসে যায়। খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমার সাথী আমার থেকে জানতে থাকে। দু’একজন আমাকে এই বলে ভয় পাইয়ে দেয় যে, খতনা পেকে গেলে মানুষ মারাও যায়। আমি বলি যে, প্রিয় নবীর সুন্নতের জন্য যদি আমার জীবনও চলে যায় তবে তা হবে আমার জন্য পরম সৌভাগ্য। আলহামদুলিল্লাহ। আমার তবিয়ত ঠিক হয়ে যায়। আমি মাওলানা সাহেবের কাছে দরখাস্ত করি যে, হযরত আমি বায়আত হয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে একথা এসেছিল যে, সুন্নত অনুসরণের অঙ্গীকার তো করছি। কিন্তু একটি সুন্নত ছুটে যাচ্ছে। এখন আলহামদুলিল্লাহ সেই সুন্নতও আদায় হয়ে গেছে। আপনি আমাকে দ্বিতীয়বারে মত বায়আত করে নিন। হযরত আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো বায়আত করে নেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার গীতা দিদির কি হল?

তৌহীদ: তার বাড়ির লোকেরা তাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছিল। সে কয়েকজন মুসলমানের কাছে যায় যেন কেউ তাকে মুসলমান করে নেয় এবং হিন্দু ধর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। কিন্তু কেউ এর জন্য রাজী হয়নি। সকলেই ভয় পাচ্ছিল। তার বাড়ির লোকেরা একজন মদ্যপায়ী ও জুয়াড়ীর সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে এবং সামূহক ও ওয়াস্মোলিনে নিয়ে যাবার জন্য বলে। সে আমাকে ফোনে জানায় যেন আমি এসে এর আগেই যেন তাকে নিয়ে যাই। আমি বলি, রবিবার আমার ছুটি হয়। কিন্তু হফতার দিন তার বিয়ে হবার কথা। সে জুমুআর দিন জনা দশেক মুসলমানের কাছে যায় যে, সে মুসলমান হতে চায়। আর আজ যদি তাকে মুসলমান না বানানো হয়, তাহলে আমার বাড়ির লোকেরা আমাকে বিয়ে দিবে এবং আমাকে সারাজীবন হিন্দুই থাকতে হবে। কিন্তু কেউই তাকে মুসলমান করার জন্য তৈরি হয়নি। বাধ্য হয়ে রাত্রে সে সালফাজেন বড়ি খেয়ে নেয় এবং রাত্রেই মারা যায়। সে বলতে থাকে যে, হিন্দু সমাজে থাকা ও বিয়ে করার চাইতে মৃত্যুকেই সে পছন্দ করে। আমার আল্লাহ আমাকে নিজেই মুসলমান বানিয়ে নেবেন। আমি রবিবার ভূপাল পৌঁছি, অতঃপর এই দুর্ঘটনার কথা জানতে পারি। আজ পর্যন্ত আমি এই জুলুম ভুলতে পারি না। আমি দু’পয়সার চাকরীর জন্য কত বড় জুলুম করেছি। আমার আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।

আহমদ আওয়াহ: এরপর আপনি কোথায় ছিলেন?

তৌহীদ: আমাকে হযরত হরিয়ানায় পাঠিয়ে দেন। সেখানে একটি কারখানায় চাকুরীর সন্ধানে যাই। তারা আমার অবস্থা জেনে চাকুরী দেওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। কিন্তু শর্ত আরোপ করে আমার দাড়ি কাটার। আমি বলি, চাকুরী তো আর কি, আমি জীবনের বিনিময়েও দাড়ি কাটতে পারি না। আমি মাথা কাটাতে পারি, কিন্তু দাড়ি কাটাতে পারি না। আমি না খেয়ে থাকতে পারি, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সুন্নত ছাড়তে পারি না। অতঃপর অপর একটি কারখানায় অর্ধেক বেতনে চাকুরী নেই। আমার আল্লাহ আমার ওপর দয়া করেন। আমার কাজ দেখে কোম্পানীর মালিক আমার প্রমোশন দেন এবং সুপারভাইজার বানিয়ে দেন। আমার সাথীরা হিংসায় জ্বলতে লাগল। একদিন কারখানায় পাঁচ টাকা কুড়িয়ে পাই। আমি জামা’আতের শুনেছিলাম যে, পড়ে থাকা জিনিস উঠানো ঠিক নয়। উঠালে ছত্রিশ বছর পর্যন্ত এর ঘোষণা দিতে হয়। আমি একটি কাগজে ঘোষণা লিখে কারখানার দরজায় লাগিয়ে দেই। আমার সাথীরা ম্যানেজারকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে বাধ্য হয়ে আমাকে চাকুরী ছাড়তে হয়।

আহমদ আওয়াহ: ইসলামে আসার পর আপনার কেমন লাগছে?

তৌহীদ: ইসলামের সব কিছুই আমার প্রিয়। মুসলমান হতে পারায় আমি গর্বিত এবং আমার প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নত আমার জীবনের চাইতেও প্রিয়। চুল বড় করে বাবরী রেখেছি। যখন আয়নায় মুখ দেখি তখন নবীর সুন্নতের কারণে আমার নিজকে খুব প্রিয় মনে হয়। আমি কাপড় সেলাইয়ের জন্য গিয়েছিলাম। দর্জি জানতে চাইলেন, পকেট কোনদিকে লাগাবেন। একজন হাফেজ সাহেব আমার সাথে ছিলেন। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, পকেট কোনদিকে লাগানো সুন্নত? তিনি বললেন, তাঁর জানা নেই। আমি বলি, আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন্ দিকে পকেট লাগাতেন তা না জানা পর্যন্ত কাপড় সেলাবো না। আমি মাওলানা সাহেবকে ফোন করি। তিনি ভালভাবে জেনে বলবেন বলেন, এরপর তিনি ওমরাহ করতে চলে যান। কিছুদিন পর আমি সৌদি আরব ফোন করি। তিনি সেখান থেকে আমার জন্য অনেক দোআ করেন। সেখানে পৌঁছে অনেক আলেম উলামাকে জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু তৃপ্ত হতে পারেননি। আমি আজ পর্যন্ত নতুন কাপড় সেলাই করি নাই। ইনশাআল্লাহ যতদিন না জানছি আমার নবী কোথায় পকেট লাগাতেন আমি কাপড় সেলাই করাব না।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম কবুলের পর আপনি কোন দাওয়াতী কাজ করেছেন?

তৌহীদ: আলহামদুলিল্লাহ! ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ! হযরত মাওলানার সঙ্গে জুড়বার পর এ কী করে হতে পারে যে, দাওয়াতের কাজ করব না। আলহামদুলিল্লাহ! এক বছরে কারখানার অনেক সাথীকে আমি দাওয়াত দিয়েছি এবং তারা মুসলমান হয়েছে। আজও এক সফরে যাচ্ছি। ঝিলঝানার কাছাকাছি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামের পাঁচ জনকে আগামী পরশু পর্যন্ত কলেমা পড়িয়ে নিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ। হেদায়াত তো আল্লাহর হাতে। তবে চেষ্টা করলে আল্লাহ সে চেষ্টা ফলবতী করেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আরমুগানের পাঠবদের জন্য কোন পয়গাম দেবেন?

তৌহীদ: ব্যাস, এর চেয়ে বেশি আর কী পয়গাম হতে পারে যে, ইসলামের দুশমন খান্দানের একজন মানুষকে যখন আল্লাহ তা’আলা সুন্নতের প্রতি এতটা ভালবাসা দিতে পারেন তখন সহজ-সরল নির্ভেজাল মানুষ যাদের সংখ্যাই দুনিয়াতে বেশি তাদেরকে যদি ইসলাম বোঝানো যায় তাহলে তারা কী করে নবী (সা.)-এর প্রেমিক না হয়ে পারে? আমাদের চেষ্টা করা উচিত।

আহমদ আওয়াহ: বহুত শুকরিয়া! তৌহীদ ভাই।

তৌহীদ: আপনাকেও শুকরিয়া আহমদ ভাই।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
সংগ্রহে, মাসিক আরমুগান, জুন ২০০৪ ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ