নাদীম আহমদ সাহেবের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার

কোন দোকানে কোন জিনিস প্রভৃতি কিনতে কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গেলে কারুর না কারুর সঙ্গে অবশ্যই কথা বলতাম। আজমগড়ের ইজতেমায় হযরত মাওলানা সা’দ সাহেব তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, “আমরা ব্যক্তিগতভাবে তো সবাইকে দাওয়াত দেবার কথা বলছি এবং সফরকালে জামা’আত ট্রেন প্রভৃতিতে সবাইকে স্মরণে রেখে তা’লীম করবেন।” আলহামদুলিল্লাহ! এরপর থেকে আমার জন্য জামা’আতের সাথীদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার সুযোগ মিলল এবং এ পর্যন্ত ৭৭ জন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন।


আহমদ আওয়াহ. আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নাদীম আহমদ. ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ. নাদীম সাহেব! আব্বুর কাছে আপনার কথা শুনতাম। সাক্ষাতের আগ্রহী ছিলাম। আজ আব্বু বলছিলেন যে, আপনি এক বছরের জন্য জামা’আতে যাচ্ছেন এবং নিজামুদ্দীন মারকায থেকে কোন নতুন জামা’আত যাচ্ছে। যাবার আগে আপনি খলীলুল্লাহ মসজিদে আসছেন। খুশী হলাম যে, সাক্ষাৎ হয়ে যাবে।
নাদীম আহমদ. আহমদ ভাই! আমার তিন চিল্লা বাকী। আলহামদুলিল্লাহ! এক চিল্লা প্রথমে এবং এরপর ছয় চিল্লা লাগাতারভাবে লেগেছে। এখন আমরা গোধরায় সময় লাগিয়ে এসেছি। মারকাযে এসেছিলাম। মাওলানা সাহেবকে (কলীম সিদ্দিকী) ফোন করে জানতে পারলাম দিল্লীতে আছেন। বাহরাইন প্রভৃতি দেশে সফরে যাবেন। খুব খুশী হলাম যেন ভাগ্য খুলে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ! এ সময়ে আল্লাহ তা’আলার মেহেরবানীতে বারবার সাক্ষাত ঘটতে থাকে। যখন দেখা হয় না তখন স্বপ্নে সাক্ষাৎ জোটে। মাওলানা আহমদ সাহেবের কাছ থেকেও অনেক সান্ত্বনা পাই।

আহমদ আওয়াহ. নাদীম ভাই! আপনার সঙ্গে ‘আরমুগান’-এর জন্য কিছু কথা বলতে চাই।
নাদীম আহমদ.জী আহমদ ভাই! এজন্যই তো আমি থেমে আছি। এই এখন হযরত বলে গেলেন যে, আহমদ আসছে। আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবে।

আহমদ আওয়াহ. আপনি আপনার পারিবারিক পরিচয় দিন।
নাদীম আহমদ. আহমদ ভাই! দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত রাজ্যের কেন্দ্রে এক মারাঠী পরিবারে আমার জন্ম। পিতা ছিলেন একজন ব্যাংক ম্যানেজার। প্রাথমিক শিক্ষা একটি ভাল স্কুলে হয়। বি.কম. করি, এরপর এম.বি.এ.। অতঃপর ইংল্যান্ড চলে যাই। ২০০০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আমার পিতা আকস্মিকভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। ফলে আমাকে দেশে ফিরে আসতে হয়। হিন্দুস্তানের একজন বিখ্যাত মুসলমান ব্যবসায়ীর সঙ্গে জড়িত হই। প্রথমে ম্যানেজার হিসেবে এক কোম্পানীতে থাকি। পরে কোম্পানীর ডাইরেক্টর হয়ে যাই। আলহামদুলিল্লাহ! এখান থেকে খুব উপার্জন করি। বাপের একমাত্র সন্তান। তিনিও অনেক সম্পদ রেখে গেছেন। আমার আল্লাহর অপার দয়া, বিনা পরিশ্রমে গাধাকে মলীদা (ঘি ও চিনি চূর্ণ রুটি) খাওয়াচ্ছেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন।
নাদীম আহমদ. আহমদ ভাই! আমার ইসলাম আমার আল্লাহর হেদায়াতের শানের অপর কুদরত ও কারিশমা।

আহমদ আওয়াহ. আব্বুও আপনার সম্পর্কে এ ধরনের কথাই বলে থাকেন। এ জন্যই তো আরও বেশি আগ্রহী ছিলাম আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।
নাদীম আহমদ. আমার কোম্পানীতে এক সুন্দরী মুসলিম যুবতী এ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করত। ইংল্যান্ড থেকে এসে আমি যখন কোম্পানীতে কাজ শুরু করি তখনই মেয়েটি আমাকে আকৃষ্ট করে। মেয়েটি ছিল ভদ্র ও অভিজাত পরিবারের। প্রতিদিন তার প্রতি আমার আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। ধর্ম ও গোত্রের প্রাচীর ভেঙে যে কোন মূল্যে তাকে আমি বিয়ে করতে চাইতাম। কিন্তু সে কোনভাবেই কাজ ছাড়া আমার সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করত না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন পালা-পার্বন উপলক্ষ্যের বাহানায় তাকে উপহার পাঠিয়েছি। এজন্য আমাকে আরও লোককেও উপহার পাঠাতে হয়েছে। মূলত সে তার বংশেরই কোন ছেলেকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিল। আমাদের কোম্পানীর মালিক ছিলেন খুব দানশীল ব্যক্তি। তাঁর ইন্তিকাল হয়। অনেক বয়স হয়েছিল তাঁর। তাঁর ইন্তিকালের পর যে সমস্ত জনকল্যাণমূলক কাজ তাঁর সাহায্য-সহযোগিতায় চলছিল এক সময় সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য কিছু লোকের অভিমত হল যে, তাঁর (মৃত ব্যক্তির) জ্যেষ্ঠ পুত্রের (যিনি এক ধরনের দায়িত্বশীল ছিলেন) সঙ্গে হযরত মাওলানা কালীম সাহেবের সাক্ষাৎ হোক এবং তিনি তাকে তার পিতার মাধ্যমে কৃত জনকল্যাণমূলক কাজগুলো সম্পর্কে অবহিত করুন এবং এসব কাজের জন্য তিনি তাকে সময় দিতে মন-মানস গঠনও করবেন। লোকের পীড়াপীড়িতে মাওলানা সাহেব সফরের কর্মসূচী বানান। সাক্ষাতের সময় স্থির হল। পিতার দফতর ছিল পৃথক এবং পুত্রের দফতর ছিল অন্যত্র। মাওলানা সাহেব নির্ধারিত সময়ে পিতার নির্দিষ্ট দফতরে পৌঁছে যান। আধা ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি অফিস সেক্রেটারিকে ফোন করতে বলেন। জানা গেল, তিনি তার দফতরে অপেক্ষা করছেন। অফিস সেক্রেটারি তার গাড়িতে করে অন্য দফতরে পৌঁছলেন। তিনি ওযরখাহি করার নিমিত্ত আপন দফতরের বাইরে অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে নিচে নেমে আসেন। সাক্ষাতের জন্য আধা ঘণ্টা সময় স্থিরীকৃত ছিল। কিন্তু কথা চলতে থাকে। দেড় ঘণ্টা যাবত কথা হয়। ফেরার সময় তিনি তাঁকে বিদায় জানাতে গাড়ি পর্যন্ত আসতে চাইলে মাওলানা সাহেব বহু পীড়াপীড়ি করে লিফট পর্যন্ত আসতে বলেন এবং বলেন, মেহমানকে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়াই সুন্নত। ব্যাস, লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। শেঠ সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং নিচে গাড়ি পর্যন্ত মাওলানা সাহেবকে এগিয়ে দেবার জন্য বললেন। আমি মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দফতরের সপ্তম তলায় লিফটে চড়ি। পঞ্চম তলায় যেখানে আমার অফিস সেখানে গিয়ে লিফটের দরজা খুললে ঐ মেয়েটি লিফটে ওঠে। মাওলানা সাহেব খুব ভাল খোশবু লাগিয়েছিলেন। নাক দিয়ে বারবার নিঃশ্বাস নিয়ে জীবনের এই প্রথমবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে আমার সঙ্গে কথা বলল, কী খোশবূ ব্যবহার করেছেন। চোখ না লেগে যায়।

আমি মাওলানা সাহেবকে বিদায় জানাই। অফিস সেক্রেটারিকে ফোন করি যার সঙ্গে মাওলানা সাহেবের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। আমি তাকে বলি, মাওলানা সাহেব খুব ভাল খোশবূ লাগিয়েছিলেন। এ খোশবূ আমার চাই। তিনি মাওলানা সাহেবের কাছে জানতে চান তিনি কোন্ ধরনের খোশবূ ব্যবহার করেছিলেন। মাওলানা সাহেব এ সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর নাম জানা নাই। দুবাইয়ের এক বন্ধু তাঁকে হাদিয়া হিসেবে দিয়েছিলেন। তিনি মাওলানা সাহেবকে এটি তার দরকার বলে জানান। মাওলানা সাহেব এক শিশি তাঁর পকেটে আছে বলে জানান এবং কাউকে পাঠিয়ে তা নেবার জন্য বলেন। তিনি ড্রাইভার পাঠিয়ে সেই আতরের শিশি নিয়ে আসেন। এরপর আমি সেই আতর লাগাই। মেয়েটি প্রত্যেকবার এই সুগন্ধির প্রশংসা করে। আমি সেই আতরের শিশি তাকে দিয়ে দিই। এর দ্বারা তার সঙ্গে কিছু কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মেয়েটির পিতা ‘আরমুগান’ পড়তেন, এজন্য তাঁর ভেতর দাওয়াতী মানসিকতা ছিল। আমার কিছু জানার সুযোগ ঘটে। তখন আমি তার পিতার কাছে পয়গাম পাঠাই যে, আপনি যদি আপনার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেন তাহলে আমি মুসলমান হয়ে বিয়ে করার জন্য তৈরি আছি। তিনি শুনে এতে স্বাগত জানান। নিজের মেয়েকে সম্মত করতে চেষ্টা চালান এবং চাপ সৃষ্টি করে রাজীও করান। আমাকে বলেন, ইসলাম গ্রহণ করে জামা’আতে চল্লিশ দিন লাগালে তিনি সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য তৈরি আছেন। আমি তাদের সাথে শহরের জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে কলেমা পড়ি এবং জামা’আতে যাই। বাঙ্গালোরে সময় লাগিয়ে আসার পর আমাদের বিয়ে হয়।

আহমদ আওয়াহ. আপনার খান্দানের লোকেরা বিরোধিতা করেনি?
নাদীম আহমদ. কিছু লোকে আপত্তি করেছিল। কিন্তু খান্দানে কিছুটা স্বাধীনচেতা মেযাজ বিরাজ করায় এবং সকলেই লেখাপড়া জানা শিক্ষিত হওয়ায় খুব বেশি বিরোধিতা হয়নি।

আহমদ আওয়াহ.বিয়ের পর দাম্পত্য জীবন কেমন কাটছে?
নাদীম আহমদ.মাওলানা আহমদ সাহেব! কেমন দাম্পত্য জীবন? সেই মেয়েটি আমার সঙ্গে পারস্পরিক সম্বন্ধ মেনে দিতে পারেনি। সে তার খান্দানের একটি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইত। সে নিজ থেকে এই বিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়নি। বরং পরে জেনেছি তার পিতা তাকে বলেছিল, যদি সে এই বিয়ের জন্য তৈরি না হয় তাহলে তিনি (তার পিতা) বাড়ি থেকে চলে যাবেন। এই চাপের দরুন সে একে মেনে নিয়েছিল। ফল দাঁড়াল এই যে, অল্প দিনেই মতানৈক্য দেখা দিল এবং আট মাসে আমিও হাঁপিয়ে উঠলাম ও তালাক হয়ে গেল।

আহমদ আওয়াহ. এই বিয়ে ব্যর্থ হবার পর আপনার মনে পুনরায় ইসলাম থেকে ফিরে যাবার কথা আসেনি?
নাদীম আহমদ. আসলে আমার দয়ালু প্রভু আমার জন্য হেদায়াত লিখে দিয়েছিলেন। এ জন্য এ ধরনের খেয়াল একদম আসেনি এবং জামা’আতে সময় লাগানোর পর পর আমার ইসলামী বই-পুস্তক পাঠের আগ্রহও সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। আমার আল্লাহ আমার ওপর এই দয়া প্রদর্শন করলেন যে, তালাক হবার পর এবং এই সমস্যা মিটে যাবার তৃতীয় দিনে মাওলানা কালীম সাহেব আমাদের অফিসে আসেন। ওই অফিসেরই একজন জানাশোনা লোক আমার সম্পর্কে তাঁকে বললে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমি দুই ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে থাকি। তিনি আমাকে এক প্রোগ্রামে নিয়ে যান। এক জায়গায় দাওয়াতেও তিনি আমাকে শরীক করেন। এই সাক্ষাতে তিনি আমাকে এটা বোঝাতে চেষ্টা করেন বরং বুঝিয়ে দেন যে, এই মেয়েটিকে সিঁড়ি বানিয়ে আল্লাহ তা’আলা আপনাকে তাঁর নিজের বানাবার ব্যবস্থা করেছেন। এটা আপনার ওপর তাঁর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ। এই মেয়ের প্রতি কয়েক বছরের ভালাবাসায় আপনি দেখেছেন যে, ভালবাসায় কেমন মজা। এই দুনিয়ার সব কিছুই নশ্বর। অবিশ্বস্ত ও ধোঁকাবাজ। অধিকাংশ সময় জীবিত থাকতেই ধোকা দিয়ে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। জীবনে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিলেও আপনার মৃত্যু কিংবা তার মৃত্যু বিশ্বাস হওয়ার মাধ্যম হিসেবে পরিণত হবে। যখন সৃষ্ট এই নশ্বর ও অবিশ্বস্ত বস্তুর ও সৌন্দর্যের ভালবাসার মধ্যে এত মজা তখন সেই প্রকৃত সৌন্দর্য এবং এই নশ্বর সৌন্দর্যের যিনি স্রষ্টা তাঁর প্রেম ও ভালবাসার মধ্যে কত মজা হবে। মাওলানা সাহেব কিছু আল্লাহওয়ালা ও বিখ্যাত বুযুর্গদের কাহিনী শোনালেন যাদের দুনিয়ার কোন মানুষের প্রতি ভালবাসা ও আসক্তি জন্মেছিল এবং যখন তা পাগলামীর সীমায় পৌঁছে যায় তখন আল্লাহ তাঁদেরকে আপন করে নেন। মাওলানা সাহেব আমাকে দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করলেন, আমার মধ্যে প্রত্যয় জন্মিয়ে দিলেন যে, আমার আশা যে, আপনিও ঐসব ওলি-আল্লাহর মধ্যে একজন হতে যাচ্ছেন। ব্যস, এখন সেই প্রকৃত সৌন্দর্যের দিকে মন ফেরান এবং এরপর দেখুন জীবনের মজা দুনিয়ার সৌন্দর্যের মুহব্বতের ভেতর অনিশ্চয়তা অশান্তির আর তাঁর মুহব্বতের মধ্যে আরাম ও শান্তি, তৃপ্তি ও প্রশান্তি, মজাই আর মজা। আমার এক বনধু যিনি মাওলানা সাহেবের বায়’আত ছিলেন আমাকে মাওলানা সাহেবের কাছে বায়’আত হবার জন্য পরামর্শ দেন। আমিও সেটাই ভাল মনে করলাম। মাওলানা সাহেব প্রথমে আমাকে দু’জন বড় বুযুর্গের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি এই বলে পীড়াপীড়ি করলাম যে, আপনার খোশবূই আমার জন্য হেদায়াতের খোশবূ বয়ে এনেছে। তার পর আমি আর আপনি ছাড়া অন্য কারুর আঁচল আঁকড়ে ধরতে পারি না। মাওলানা সাহেব আমাকে তওবাহ করান এবং তাঁর হযরত (পীর) মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (না. মা.)-র সিলসিলায় বায়’আত করেন।

আহমদ আওয়াহ.এরপর জামা’আতে সাল লাগাবার আপনি কিভাবে প্রোগ্রাম বানিয়েছিলেন?
নাদীম আহমদ. আমার মন দুনিয়ার নানাবিধ ঝামেলায় খুব ঘাবড়াচ্ছিল। আমি হযরতকে বললাম যে, আমি এত সম্পদ উপার্জন করেছি এবং আমার পিতা এত সম্পদ রেখে গেছেন যে, আমার সাথে আরও দু’একটি পরিবারও আগামী পঞ্চাশ বছর আরামে খেতে পারবে। এখন আমার মন চায় যে, ব্যস আমি কোথাও আল্লাহর হয়ে থেকে যাই। আপনি আমাকে আপনার সাথে রাখুন। হযরত বললেন, ইসলামের শিক্ষা হল এই যে, দুনিয়ায় থেকেই আল্লাহর হয়ে থাকো। দিলের মধ্যে দুনিয়া বসাইও না। বৈরাগ্যবাদ অর্থাৎ দুনিয়া ছেড়ে দেবার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়ূন এবং আধ্যাত্মিকতার পথ (সুলুক) অতিক্রম করুন। কুরআন মজীদ এভাবে পড়ূন যেন তা কেবল আপনার উপলব্ধিতেই আসবে না বরং আপনি স্বয়ং চলন্ত কুরআনে পরিণত হন যেভাবে সাহাবায়ে কেরাম কুরআন মজীদ পড়তেন এবং নিজেদের জীবনকে দাওয়াতের জন্য ওয়াকফ করে দিন। দাওয়াত আল্লাহর নিকট সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। এবং যিনি দাওয়াতের অবয়ব বা প্রতীকে পরিণত হন তিনিও আল্লাহর প্রিয়তমে পরিণত হন। আমি বললাম, আমি যখন আপনার আঁচল ধরেছি তখন আপনি আমার জীবনের নীতি, নিয়ম-শৃঙ্খলাও বানিয়ে দিন। মাওলানা সাহেব বললেন, আমি এখনও দু’দিন এখানে আছি। ইনশাআল্লাহ ভেবে-চিন্তে পরামর্শের মাধ্যমে স্থির করব। পরদিন হযরতের ফোন এল আমার কাছে। তিনি আমাকে ডাকেন এবং আমাকে বলেন, একজন খুবই বিশ্লেষণ শক্তিসম্পন্ন আলেম ও মুফতী এক বছরের জন্য জামা’আতে যাচ্ছেন। আমার ইচ্ছা, আপনি তাঁর সঙ্গে সাল লাগান। আমি আপনার জন্য শিক্ষা পাঠ্যক্রম তৈরি করে দেব। তিনি আপনাকে জাম’আতে থাকাকালে পড়াতে রাজী হয়েছেন। আমি রাজী হই। হযরত আমার মা’মুলাত (দৈনন্দিন আমলসমূহ) ও বলে দিয়েছেন এবং জামা’আতের সঙ্গে যোগাযোগও রাখতে বলেছেন। প্রাথমিক তসবীহসমূহ, এরপর যিকরে জিহরী, এরপর যিকরে কলবীও বলে দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ! এখন আমার সুলতানুল আযকার চলছে। কুরআন শরীফ তরজমাসহ এভাবে পড়েছি যে, আলহামদুলিল্লাহ আমি নির্দ্বিধায় পড়তে পারি। আল হিযবুল আজম মুখস্ত করে নিয়েছি। আল্লাহ আমার সময়ের মধ্যে বরকত দান করেছেন।

আহমদ আওয়াহ. আপনার সময় কোথায় কোথায় লেগেছে?
নাদীম আহমদ. শুরুর তিন চিল্লা কর্নাটক, মহীশূর ও বাঙ্গালোরে। এরপর এক চিল্লা আজমগড় ইজতেমার মেহনতে, দুই চিল্লা অন্ধ্র প্রদেশে আর বাকীটা মহারাষ্ট্রে। এখন আমাদের রোখ বিহারের দিকে। দুই চিল্লা বাকী আছে।

আহমদ আওয়াহ. এখন আপনার প্রোগ্রাম কী? অর্থাৎ জামা’আত থেকে আসার পর।
নাদীম আহমদ. মূলত এমনিতে তো শেষ সিদ্ধান্ত আমাদের হযরতেরই হবে। আমার নিয়ত দাওয়াতের জন্য ওয়াক্ফ (উৎসর্গীত) হওয়া। আজ হযরত বলেছেন, দ্রুত দুই চিল্লা পুরো হোক। তাহলে আপনাকে দেশের বাইরে পাঠাবার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছি। আমার মত এক নগণ্যের জীবনকে আল্লাহ তা’আলা কোন কাজে লাগিয়ে দিন। আমি জামা’আতে অনেক দোআও করেছি। আমার হযরতও প্রতিটি সাক্ষাতে এটাই বলছেন, কোন শ্রমিক কিংবা কর্মচারী-কর্মকর্তার যখন সরকারের মাধ্যমে চাকুরীতে পোস্টিং হয় তখন তার প্রয়োজনীয় সামান ও উপায়-উপকরণ সরকার নিজেই দিয়ে থাকেন। অফিস, গাড়ি ইউনিফর্ম, কাগজ-কলম দেওয়া সরকারের দায়িত্ব, আপনি হেড অফিস থেকে অনুমোদন করিয়ে নিন। আল্লাহর পথে দোআ কবুল হয়। এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহতা’আলা আমার প্রত্যেক দোআই কবুল করছেন। আমাদের অধিকাংশ জামা’আতের সাথীদেরও এমনতরো ধারণা যে নাদীমের দোয়া কবুল হয়। কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রের এলাকার লোক আমার কাছে দোআর জন্য আসত ও বলত আপনি মুস্তাজাবুদ-দাওয়াত (যাঁর দোআ কবুল হয়)। আমাদের জন্য দোয়া করুন। আমি দোয়া করতাম। আমার আল্লাহ! আপনার ঈমানওয়ালা বান্দারা গোনাহগারের প্রতি যেই সুধারণা পোষণ করেন আপনি তার লজ্জা-শরম ও মান-মর্যাদা রক্ষা করুন। আলহামদুল্লিাহ! দোয়া কবুল হত। হযরত জামা’আতে গোটা দুনিয়ার হেদায়াতের জন্যও দোআ করতে বলেছিলেন। এজন্য আমি আল্লাহর কাছে দোআ করি।

আহমদ আওয়াহ. আব্বু বলছিলেন যে, সুলূকের রাস্তায় আধ্যাত্মিকতার পথে আপনি খুব কম সময়ে বিরাট উন্নতি করেছেন?
নাদীম আহমদ. যদি হযরত বলে থাকেন তাহলে তা আমার জন্য অত্যন্ত খুশীর কথা। এই নগণ্য তো আপন অবস্থার ওপর গভীরভাবে চিন্তা করে তখন সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম মনে করে নিজেকে। লজ্জা ও হীনতার এই অনুভূতি ভেতর দিয়ে এক চিল্লা পর্যন্ত আমার এই অবস্থা হত যে, আমার আত্মহত্যা করতে মন চাইত যে এমন নাপাক অস্তিত্ব থেকে আল্লাহর যমীন পাক হওয়া দরকার। ফোনে বারবার হযরতকে এ কথা বলতাম। হযরত বলেন, এটা হল ফানার মকাম। এই মকাম মুবারক হোক। হযরতের বলায় অল্প-স্বল্প সান্ত্বনা পেয়ে যেতাম। আলহামদুলিল্লাহ! যিক্র আমার জীবনে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আর এখন আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর ফযলে আমার কলব (হৃদয়, অন্তর) আশ্চর্য ও বিস্ময়করভাবে জারী হয়ে গেছে। ছয় লতীফাও আমার হযরতের বরকতে জারী হয়ে গেছে। বড় ভাল ভাল স্বপ্ন দেখি। কিন্তু হযরতের ভাষায় এসবই খেলনা মাত্র যা দিয়ে এ রাস্তার শিশুদের ভোলানো হয়। আসল তো এই যে, আল্লাহ ঈমানের ওপর আমার পরিসমাপ্তি ঘটান, গোনাহ-খাতা মাফ করে দেন এবং জীবন দ্বীনের কিছু খেদমত দ্বারা দামী ও মূল্যবান হয়ে যায়।

আহমদ আওয়াহ. নাদীম ভাই! আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে এ কল্পনাও করতে পারি না যে, আপনি দুই-এক বছরের মুসলমান। আপনার কথাবার্তা, আচার-আচরণ, আপনার চেহারা-সূরতে কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা আলিম পরিবারের কোন আলেম মনে হয় আপনাকে। অথচ আপনি ভিন্নতর পরিবেশেই লালিত-পালিত হয়েছেন।
নাদীম আহমদ.  আহমদ ভাই! আল্লাহর ভান্ডারে কোন জিনিসের কমতি নেই। আমার হযরত বলেন, আপনি হিন্দু পরিবারে লালিত-পালিত হয়েও ইসলামী স্বভাব-প্রকৃতির ওপর ছিলেন। এজন্য আপনি খুব সত্ত্বর ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলী ও সৌন্দর্য দ্বারা মণ্ডিত হয়েছেন। আমারও এমনটাই মনে হয় যে, আমাকে এই জগতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল বরং হিন্দুয়ানা আচার-আচরণ আমার কাছে অপরিচিত মনে হয়।

আহমদ আওয়াহ.দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে আপনার কর্মসূচি কি?
নাদীম আহমদ. আমার মন আর এই ঝামেলায় পড়তে প্রস্তুত নয় এবং যেহেতু আমি নিজেকে অপর কারুর কাছে সোপর্দ করে দিয়েছি এজন্য আমার কিছু বলার অধিকারও নেই। বাঁশরী যেভবে বাজাবে বাঁশী সেভাবে বাজবে।

আহমদ আওয়াহ. মাশাআল্লাহ! আসলেই! আব্বু হযরত (আব্দুল কাদের) রায়পুরীর বাণী শোনান যে, “মুরীদ হবার মজা ফুটবল হবার মধ্যে”। কারুর হবার উপকারিতা তো এভাবেই হয় যে, আপনার এই জযবা ও আত্মসমর্পন মুবারক হোক।
নাদীম আহমদ. আপনি দোআ করুন। আল্লাহ তা’আলা আমাকে ফুটবল বানিয়ে দিন এবং মৃত্যু অবধি এর চেয়ে বেশি বানিয়ে রাখুন।

আহমদ আওয়াহ. ‘আরমুগান’ পাঠকদের জন্য কোন পয়গাম বা বার্তা দেবেন?
নাদীম আহমদ. আমাদের হযরত বলেন, এটা সেই যামানা যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত নাযিল হচ্ছে। আমরা এই সোনালী মওকা থেকে ফায়দা উঠাই এবং নিজের অংশ যতটা পারি লোকের হেদায়াত লিখিয়ে নিই। আমার নিজেরও এমনটিই মনে হয়। এ আল্লাহর পক্ষ থেকেই তো হেদায়াতের ফয়সালা যে, আল্লাহ একটি অনুমোদিত নয় এমন একটি সম্পর্ককে আমার জন্য হেদায়াতের মাধ্যম বানিয়ে দিলেন। আমরা মুসলমানরা যদি একটু চিন্তা করি তাহলে দুনিয়ার চিত্র ইসলামী হতে পারে।

আহমদ আওয়াহ. আপনি জামা’আতে সময় লাগানোর কালে কিছু অমুসলমানের ওপরও কাজ করেছেন?
নাদীম আহমদ. খুব বেশি কাজ তো করিনি। কোন দোকানে কোন জিনিস ইত্যাদি কিনতে কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গেলে কারুর না কারুর সঙ্গে অবশ্যই কথা বলতে হয়। বলতাম। আজমগড়ের ইজমেতায় হযরত মাওলানা সা’দ সাহেব তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমরা ব্যক্তিগতভাবে তো সবাইকেই দাওয়াত দেবার কথা বলছি এবং সফরকালে জামা’আত ট্রেন প্রভৃতিতে সবাইকে স্মরণে রেখে তা’লীম করবেন।” আলহামদুলিল্লাহ! এরপর থেকে আমার জন্য জামা’আতের সাথীদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার সুযোগ মিলল এবং এ পর্যন্ত ৭৭ জন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে। সময় পুরো হবার পর ইনশাআল্লাহ হযরতের পরামর্শে কাজ করতে হবে।

আহমদ আওয়াহ.বহুত বহুত শুকরিয়া নাদীম ভাই। আল্লাহ আপনার সময়কে, আপনার ইচ্ছেগুলোকে গোটা মানবতার হেদায়াতের মাধ্যম বানান, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নাদীম আহমদ. আমীন! ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাওলানা আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, আগস্ট, ২০০৮ ইং

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ