প্রত্যেক বিশৃঙ্খলার জন্য রয়েছে একটি কারণ

প্রত্যেক বিশৃঙ্খলার জন্য রয়েছে একটি কারণ

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على النبى الكريم الهادى الى الرب الرحيم وعلى اله وصحبه ومنباحسان الى يوم الديمن.

খাজা গাইছ দারাজ রহ. সমুদ্রের কিনারে অযু করতে বসলেন। হাত বাড়ালেন পানি নিতে। এমতবস্থায় দেখলেন, একটি বিচ্ছু স্রোত থেকে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু স্রোতের গতি তার চেষ্ঠায় সফল হতে দিচ্ছে না। তার অন্তরে খেয়াল এল, বিচ্ছুটি তো আল্লাহ তা‘আলার মাখলুক। তার সাহায্য করা উচিৎ। এই ভেবে বিচ্ছুটিকে উদ্ধার করতে তিনি পানিতে হাত বাড়ালেন। যখনই পানি থেকে বিচ্ছুটি উদ্ধার করতে লাগলেন, তখনই বিচ্ছুটি তার হাতে কামর মেরে হাত থেকে বের হয়ে গেল। তিনি ব্যথা পেলেন। খাজা গাইছ নওয়াজ রহ. হাত মালিশ করে কাটাটি বের করতে চেষ্টা করলেন। পুনরাই আযু করতে হাত বাড়ালেন। আবার দেখলেন সেই বিচ্ছুটিই উলটপালট করে পানি থেকে বের হতে চেষ্টা করছে। খাজা সাহেব তার দায়িত্ব মনে করে পুনরায় তাকে সমুদ্র থেকে বের করা জন্য চেষ্টা করলেন। বিচ্ছুটিকে উদ্ধার করার জন্য হাত বাড়াতেই সে আবার ছোবল মেরে হাত থেকে বেরিয়ে গেল। দ্বিতীয়বার ছোবল মারার পর পূর্বের তুলনায় বেশী ব্যথা পেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ওযুর জন্য হাত বাড়ালেন। বিচ্ছুটিকে একই অবস্থায় দেখলেন। দয়া করে আর একবার হাত বাড়ালেন তাকে উদ্ধার করতে। বিচ্ছুটি তৃতীয়বারও তার সাথে একই আচরণ করল।
পাসেই বসা ছিল এক যুবক। বসে বসে এই তামাশা দেখছিল। যুবকটি খাজা গাইস নাওয়াজ রহ.কে এসে বললো, মুরব্বি! আপনি কি পাগল, না মাতাল? তিনি উত্তরে বললেন, কেন? আপনার কী সমস্যা? যুবকটি বলল, বিচ্ছুটি বার বার আপনার হাতে ছোবল মারছে, আর আপনি তাকে বার বার সমুদ্র থেকে বের করার চেষ্টা করছেন? খাজা গাইস নাওয়াজ রহ. বললেন, বেটা তুমি তো ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমার মনে হলো, আল্লাহ তাআলা বিচ্ছুটিকে ছোবল মারার স¦ভাব দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। আর আমি হলাম রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামের গোলাম। আমার স্বভাবের মধ্যে রয়েছে, সৃষ্টিজীবের খেদমত ও সাহায্য। আমার মনে হচ্ছিল এই বিচ্ছুটি যেহেতু তার বদ অভ্যাস থেকে বিরত হচ্ছে না। আর আমি কীভাবে আমার ভালোগুণটি ছেড়ে দিই।
বাস্তবতা হলো দুনিয়াতে যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তার মূল কারণ রিএকশন ও প্রতিবাদ।
ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম। মানুষকে কোনো অন্যায়ের বদলা নেয়ার অধিকার দিয়েছে। ইসলাম কখনো এই হুকুম দেয় নি যে, এক গালে চর দিলে অন্য গাল পেতে দাও। এটা মানুষের স্বভাবের সাথে মিল হওয়ার মত হুকুম নয়। কিন্তু মানুষ যখন বদলা নেয়, তখন বদলা নেয়ার সময় অতিরঞ্জন করে ফেলে। তাই শরিয়তের চাওয়া হল ক্ষমা করে দেয়া। এর কুফল বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ.
অর্থ:মন্দের বদলা তেমন মন্দের দ্বারা, কিন্তু যে ক্ষমা করে দিবে বা সন্ধি করে দিবে তার বিনিময় আল্লাহর নিকট।
মন্দের বদলা ভালো দ্বারা দেওয়ার জন্য বারবার বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, – وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ (৩৪) অর্থ:ভাল ও মন্দ সমান হয় না।তুমি মন্দকে প্রতিহত কর এমন পন্থায়,যা হবে উৎকৃষ্ট ফলে যার ও তোমার মধ্যে শত্রু ছিল,সে সহসাই হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্দু।
সাথে সাথে মন্দের প্রতিদান ভালো দ্বারা করার মজা অনুভব করার জন্য আল্লাহ তাআলা আরো বলেন- .وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ
এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব যারা ধৈর্য্যধারণ করে এবং অনেক বড় মনের অধিকারী এবং সৌভাগ্যবান। ৩
প্রতিশোধ ও বদলা নেওয়ার স্পৃহা মানুষকে মাজলুমের কাতার থেকে বের করে জালেমের কাতারে দাড় করিয়ে দেয়। আমাদের উপর যদি কেউ জুলুম করে তাহলে আমরা হবো মাজলুম। আর মাজলুমের পক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে। জালেমের প্রতি আসে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি। এখন আমরা যদি প্রতিশোধ নিতে যাই, তাহলে অধিকাংশ সময় অতিরঞ্জন করে ফেলি। দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রতিপক্ষ হয়ে যায় মাজলুম, আর আমরা হয়ে যাই জালেম। আমরা আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আল্লাহর রাগ ও আজাবের হকদার হয়ে যাই। তাই মন্দের প্রতিদান ভালো দ্বারা দেওয়ার জন্য কুরআন উৎসাহ দিয়েছে। ক্ষমা করাকে বাহাদুরী ও বিরত্বের কথা বলে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ.
অর্থ: এবং যারা সবর করে এবং ক্ষমা করে দেয়, অবশ্যই এটা বড় হিম্মতের কাজ।
কিন্তু সমস্যা হলো উম্মতের অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে হোক আর সামষ্টিগত ভাবে হোক, তাদের সময় প্রতিশোধ নেওয়ায় খরচ করে। আর আমাদের দুশমন শয়তান আমাদেরকে ভালো ও উপকারী কাজ, রহমত ও দয়া এবং দাওয়াতের গুণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
صل من قطعك واعط من حرمك واعف عمن ظلمك.

যে ব্যক্তি তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে সম্পর্ক কর, যে তোমার হক না দেয় তাকে দান কর, যে তোমার উপর যুলম করে তাকে ক্ষমা করে দাও। অন্য বর্ণনায় আছে- واحسن الى من اسا اليك” যে তোমার সাথে খারাপ আচরণ করে তার সাথে ভালো আচরণ কর।
মোট কথা, এই প্রতিশোধ ও বদলা নেওয়ার পরিবর্তে অনুগ্রহ ও ক্ষমা করার সিফত গ্রহণ করতে হবে। আর এটাই সেই গুণ, যা দাওয়াতের কাজকে সহজ করে। হায়! এই উম্মত যদি এই গুন নিয়ে সামনে চলতো।
মূল. হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ