ভাই উবাইদুল্লাহ (বিনোদ কুমার গোয়েল)-এর সাক্ষাৎকার

প্রত্যেক জিনিসে দৃঢ়তার জন্য চাই ইস্তিকামাত। সমস্ত সৃষ্টিকে অস্বীকার করে একক সত্তার হয়ে যাওয়ার স্বাদ এই পৃথিবীর বরং যদি বলি গোটা সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং সর্বাধিক স্বাদের জিনিস তাহলে তা সঠিকই হবে। মানুষ দুর্বল। আল্লাহ তাআলা তার নিয়ত আর সংকল্প দেখেন। তার কাছে অসহায় হয়ে দাঁড়ালে তিনি সাহস যোগান। তৌফিক দিয়ে দেন। তার করুণার প্রতি কুরবান হই তিনি স্বাদ ও লযযত দান করেন। আর আখেরাতের মহা পুরস্কার তো সেনায় সোহাগা। এমন দয়ালু দাতা পরওয়ারদেগার ছাড়া আর কে আছে হৃদয় সঁপে দেয়ার লায়েক? উৎসর্গিত হওয়ার উপযুক্ত? তবে তার হতে হলে অন্য সবাইকে অস্বীকার করা জরুরী। لا اله الا الله -এর মধ্যে আগে অস্বীকার তারপর স্বীকারোক্তি। সবাইকে দূরে ঠেলে সকলকে বাই বাই বলবে, ব্যস তাঁর হয়ে যাবে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
উবাইদুল্লাহ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: উবাইদুল্লাহ ভাই! খুব খুশী হয়েছি। আপনি নিজেই আগমন করেছেন। আজই আব্বু বলছিলেন, কাল তোমাকে নাবীডায় গিয়ে আরমুগানের জন্য উবাইদুল্লাহ সাহেবের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করতে হবে। হঠাৎ জানতে পেলাম আপনিই স্বয়ং এখানে এসেছেন।
উবাইদুল্লাহ: হযরতের সঙ্গে আমার কিছু জরুরী পরামর্শ ছিল। হঠাৎ হযরতের ফোন আসল, আহমদ আরমুগানের ব্যাপারে কথা বলতে আসছে, আমি হযরতের নিকট দরখাস্ত করলাম আপনার সময় হলে বরং আমিই আপনার খেদমতে হাজির হব। হযরত অনুমতি দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ সাক্ষাত হয়েছে। সাক্ষাত ও পরামর্শের পর খুব প্রশান্তি অনুভব করছি। এখন বলুন, আমার প্রতি কী নির্দেশ?

আহমদ আওয়াহ: আব্বু যেমন বলেছেন আরমুগানের জন্য আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলবো।
উবাইদুল্লাহ: জ্বী, জ্বী, এজন্যই জিজ্ঞেস করেছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পারিবারিক পরিচয় বলুন!
উবাইদুল্লাহ: ১৯৭০ সালের ৬ই ডিসেম্বর জালালপুর গ্রামের এক গোয়েল পরিবারে আমার জন্ম। পিতাজী বিদ্যুৎ বোর্ডে চাকরী করতেন। তিনি আমার নাম রেখেছিলেন বিনোদ কুমার গোয়েল। প্রাইমারী গ্রামের স্কুলেই শেষ করেছি। তারপর দিল্লী পাবলিক স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করি। কম্পিউটার সায়েন্স থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং করেছি। পরবর্তীতে নাবীডাতেই এক আমেরিকান কোম্পানীতে চাকুরীতে লেগে যাই। এখনও সেখানেই কাজ করছি। আমার ছোট্ট একটা ভাই আছেÑ প্রমোদ কুমার নাম। একটা বোনও আছে। পিতাজী বর্তমানে রিটায়ার্ড করেছেন। তিনি প্রপার্টি ডিলিংয়ের কাজ করেন। এই ব্যবসায় আল্লাহ তাকে অনেক উন্নতি দান করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন!
উবাইদুল্লাহ: মাওলানা আহমদ সাহেব! আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘাড় ধরে জান্নাতে নিয়ে যান আর তারা বার বার দোযখের দিকে ধাবিত হয়। আমি সম্ভবত ঐ নালায়েক সৌভাগ্যবানদের একজন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি দারুণ বলেছেন ‘নালায়েক সৌভাগ্যবান’ তো সেই নালায়েকী আর সৌভাগ্যের কথাটি খুলে বলুন?
উবাইদুল্লাহ: চার বছর পূর্বে আমি সেই কোম্পানীতে চাকুরী নেই। সহকর্মীদের মধ্যে কানপুরের ব্রাক্ষ্মণ পরিবারের একটি ছেলেও ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করে নিজের নাম রেখেছিল মুহাম্মদ ইউসুফ। সে ছিল খুবই ধার্মিক মুসলমান। দাড়ি রেখে দিয়েছিল। প্যান্টশার্ট ছেড়ে কোর্তা-পাজামা-শেরোওয়ানী পরতো। তার ধর্মান্তরিত হওয়াটা আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল। আমি তার সঙ্গে তার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনেক তর্ক-বিতর্ক করতাম। তাকে হিন্দুধর্মে ফিরে আসার কথা বলতাম। এ নিয়ে তার সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা চলতো। তর্ক চলাকালীন অধিকাংশ সময়ই সে বলতো, বিনোদ ভাই! আপনি আমাকে হিন্দুধর্মে ফিরে যেতে বলেন আমি তো আল্লাহর কাছে দুআ করছি আপনাকেই বরং মুসলমান হয়ে যেতে হবে। আলোচনাকালে যতবারই সে একথা বলতো, আমি ভেতরে ভেতরে চমকে উঠতাম। না জানি আমাকেই আবার মুসলমান হয়ে যেতে হয়! ভয়ে আমি তর্ক বন্ধ করে দিতাম। প্রায় চারমাস ধরে দীর্ঘ সময় নিয়ে আমাদের মধ্যে ধর্মতর্ক চলতে থাকে।

একদিন ইউসুফ সকাল সকাল অফিসে আসে। আমাকে বলে, আজ আমরা দুজন ছুটি নিয়ে কোনো পার্কে চলে যাই। সেখানে বসে নিরিবিলিতে কিছু কথাবার্তা বলবো। প্রথমে তো আমি না-ই করে দিলাম যে, কথা বলার জন্য আবার ছুটি নেয়ার কী দরকার? কিন্তু ইউসুফ জিদ ধরলে অগত্যা ছুটি নিয়ে পার্কে চলে গেলাম। সে খুব মহব্বতের সাথে আমাকে ইসলাম গ্রহণ করতে এবং কালিমা পড়তে আহ্বান জানাল। আমাকে এমন দরদ নিয়ে বোঝাল, শেষ পর্যন্ত তার কথা মেনে নিতে হয়। আমি কালিমা পড়ে নিই। সে বলে, রাতে আমাকে স্বপ্নে তোমার নাম উবাইদুল্লাহ বলে দেয়া হয়েছে। তোমার নাম আমি উবাইদুল্লাহ রাখতে চাই। আমরা চা ইত্যাদি পান করে বাড়ি চলে যাই। পরদিন সে আমাকে কিছু বইপত্র দিয়ে পড়তে বলে। আমাদের অফিসে জাভেদ নামের একটি ছেলে কাজ করতো। ইউসুফ আমাকে তার সঙ্গে সাক্ষাত করিয়ে আমার ইসলাম গ্রহণ ও নতুন নামের পরিচয় করিয়ে দেয়।

এক সপ্তাহ পর ইউসুফ অফিসে এসে বলল, পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে আমাকে চাকুরী ছেড়ে দিতে হচ্ছে। দুবাইতে চাকুরী ঠিক করেছি। পরশু আমার ফ্লাইট। যাওয়ার আগে আমাকে বলল, তোমাকে ঈমানের ওপর জমে থাকতে হবে। ঈমান হল জগতের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু। তামা কিনতে হলেও কিছু দাম দিতে হয়। রূপা পেতে হলে আরেকটু বেশী পরিশোধ করতে হয়। আর স্বর্ণ কিনতে চাইলে বহুমূল্যে তা খরীদ করতে হয়। ঈমান তো অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। তার জন্য মূল্যও দিতে হয় খুব চড়া। যে কোনো মূল্যে তুমি তা সংরক্ষণ করে রাখবে। তারপর সে দুবাই চলে গেল। এদিকে জাভেদ খুব একটা ধার্মিক ছিল না। আমি চাইলেও সে আমাকে খুব একটা সময় দিতো না। আমি এক মাওলানা সাহেবের নিকট গিয়ে নামায ইত্যাদি শিখতে লাগলাম। আমার বাড়িতে ছোট্ট একটা পারিবারিক মন্দির ছিল। সেখানে অনেকগুলো মূর্তি ছিল। একদিন আমি সেখান থেকে গনেশের মূর্তিটি উঠিয়ে নিয়ে নদীতে ফেলে দিই। মূর্তি নদীতে ফেলতে দেরী শয়তানেরা যেন ক্ষেপে উঠল। আমাদের বাড়িতে বিপদাপদ আসা শুরু হল।
আমার মোটর সাইকেল হঠাৎ পায়ের ওপর পড়ে গেল। আমার পা ভেঙ্গে গেল। প্লাস্টিক জুড়ে দিয়েও হাড় জোড়া লাগাল না। অপারেশন করতে হল। আমি তখনও সুস্থ হইনি আমাদের ছোট ভাই সিঁড়ি থেকে পিছলে গুরুতর আহত হল। পিতাজী অসুখে পড়লেন। বোন হাসপাতালে গেল। মোটকথা বিপদ যেন হামলে পড়ল। পিতাজী অনেক জ্যোতিষী ও ঝাড়-ফুঁককারীর শরণাপন্ন হল। সবাই বলল, কোনো কারণে দেবতা হয়তো বা রুষ্ট হয়েছেন কিন্তু চিকিৎসা কেউ করতে পারল না। দাদরীতে এক দেবতা পীর সাহেব থাকতেন।। তার ওখানে সিরিয়াল পেতে অনেক সময় লাগতো। পিতাজী নিরুপায় হয়ে তার কাছে গেলেন। আমিও তার সঙ্গে গেলাম। সে বলল, আপনার সন্তানদের মধ্যে কেউ ধর্মত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছে। এ কারণেই এই বিপদাপদ। হঠাৎ একথা শুনে আমি তার ভক্ত হয়ে গেলাম। আমি তাকে সব কথা পরিষ্কার বলে দিলাম। সে আমাকে বলল, যতক্ষণ না তুমি ইসলাম থেকে তাওবা করে পিতৃধর্মে ফিরে যাচ্ছো বাড়িতে এ জাতীয় বিপদাপদ লেগেই থাকবে।

আহমদ আওয়াহ: পীর সাহেব বলেছেন এমন কথা?
উবাইদুল্লাহ: জ্বী হ্যাঁ, ইয়া লম্বা দাড়ি। অনেক চেলাচামুন্ডাও আছে তার। তিনিই একথা বলেছেন। আমিও তার সামনে স্বীকার করি যে, আমি তিনমাস পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছি। পিতাজী আমাকে বোঝাতে লাগলেন, আমিও পীর সাহেবের হঠাৎ বলে দেয়াতে তার ভক্ত বনে গিয়েছিলাম। রোজ রোজের পেরেশানীতে আমিও কাবু হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে পিতাজী আর পীর সাহেবের জোর দেয়াতে আমি মুরতাদ হয়ে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। পিতাজী আমাকে একজন পন্ডিতের কাছে নিয়ে গেলেন। পন্ডিতজী আমাকে হনুমান মন্দিরে স্নান করিয়ে শুদ্ধি করলেন। মুরতাদ হয়ে হিন্দু হওয়ার পর বাড়ির পেরেশানীর আগুনে যেন পানি ঢেলে দেয়া হল। ঘরে শান্তি স্বস্তি ফিরে এল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার অস্থিরতা বেড়ে গেল। কয়েকবার তন্দ্রা অবস্থায় যেন ইউসুফের আওয়াজ আমার কানে বাজছিলÑ “ঈমানকে যে কোনো মূল্যে হেফাজত করতে হবে। তামা কিনলে দাম দিতে হয়, রূপা কিনলে মূল্য দিতে হয় আর স্বর্ণ কিনতে হয় বহুমূল্যে।
ঈমান হল জগতের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু। এটাকে যে কোনো মূল্যে আগলে রাখতে হবে।” সাথে সাথে আমার চোখ খুলে যেতো। কয়েকদিন পর্যন্ত অস্থির মতো হয়ে থাকতাম। কোনো মুসলমানকে দেখলে বেচাইন হয়ে উঠতাম। মসজিদের মিনার দেখলে আমি আর আমার মধ্যে থাকতাম না।

আহমদ আওয়াহ: এ সময়ে আপনি কি পূজা ইত্যাদি করতেন?
উবাইদুল্লাহ: হ্যাঁ, আমি অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পূজা ইত্যাদি করতাম। তবে এটা ভক্তির কারণে নয়; অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকার জন্য। যেমন কেউ কোনো বদমাশের ভয়ে অথবা পুলিশের ডরে কোনো কাজ করে বা বর্ণনা দেয়।

আহমদ আওয়াহ: তারপর পুনরায় কিভাবে ইসলামে ফিরে আসা নসীব হল?
উবাইদুল্লাহ: আমার আল্লাহ আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে ঈমান ও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয়দান করেছেন। হল কি, একদিন অফিস থেকে এসে দেখি গ্রামে একটি জামাআত এসেছে। জামাআতওয়ালারা গাশত করছিল। আমি বাড়ি যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে জামাআতের সঙ্গে দেখা হয়। আমার মধ্যে অস্থিরতার সৃষ্টি হল যে, এদের সঙ্গে আমার মসজিদে যাওয়া দরকার, নামায পড়া দরকার। কিন্তু খুব ভয় পেলাম, নামায পড়লে বাড়িতে যদি আবার উৎপাত শুরু হয়। রাত পর্যন্ত এক অস্বস্তির মধ্যে কাটল।

স্বপ্নে দেখি জামাআতের কিছু লোক আমাকে ডাকতে এসেছে, তারা বলল মসজিদে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ এনেছেন, তিনি আপনাকে ডাকছেন। আমি আনন্দে বলে উঠি, আমাকে? আমার মতো অপবিত্রকে আমাদের নবী ডাকছেন? আমি অনেক খুশি হলাম। মসজিদে গিয়ে দেখি, অনির্বচনীয় নূরানী অবয়বে আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে উপবিষ্ট। আমি সালাম করলাম। তিনি দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে মুআনাকা করলেন। ইরশাদ করলেন, তোমার জানা আছে, আমিই যে তোমার নাম উবাইদুল্লাহ রেখেছি। তোমার জানা আছে, উবাইদুল্লাহ অর্থ হল শুধুমাত্র আল্লাহর বান্দা। তুমি শয়তানের কারসাজি দেখেই ভয় পেয়ে গেছো। পৃথিবী তো মুমিনের জন্য কয়েদখানা। আর কাফেরের জন্য জান্নাত। এখানকার বিপদাপদ আর কষ্ট দেখেই যদি ভয় পেয়ে যাও তাহলে আখেরাতে জাহান্নামের ভয়াবহ কষ্ট কিভাবে বরদাশত করবে?
আমার চোখ খুলে গেল। সকাল তখন সাড়ে চারটা বাজছিল। শীতকাল ছিল। অস্থির হয়ে গেলাম। গোসল করে সোজা মসজিদে চলে গেলাম। জামাআতের কিছু সাথী বিছানা ত্যাগ করেছিল। তাদের কাছে জানতে চাইলাম, আমীর সাহেব উঠেছেন কি? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, তিনি নামায পড়ছেন। আমি তার নিকট গিয়ে খোশামুদ করে সময় নিলাম। তারপর তার কাছে স্বপ্ন ও নিজের পুরো বৃত্তান্ত খুলে বললাম। তিনি ছিলেন মেওয়াতের অধিবাসী। আলেমে দ্বীন। মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি আমাকে পুনরায় কালিমা পড়ালেন। ঈমান নবায়ন করতে বললেন।

আমি কালিমা পড়ে প্রথমে তাহ্জ্জাুদ তারপর ফজর নামায আদায় করলাম। আমীর সাহেব আমাকে উখলা গিয়ে আপনার ওয়ালিদ সাহেব মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে পরামর্শ দিলেন এবং বার বার জোর দিয়ে আজই তার সঙ্গে সাক্ষাতের ওয়াদা নিলেন। তারপর ঠিকানা নিয়ে ফোনে যোগাযোগ করব বলে চলে আসলাম। এদিনই দুপুরে প্রথমবারের মত দুবাই থেকে ইউসুফের ফোন আসল। আমার অবস্থা জানতে চাইলে বললাম, তোমার সঙ্গে দীর্ঘ কথা আছে। সে ফোন কেটে দিল। অফিস থেকে বের হয়ে ইউসুফকে ফোন করে পুরো ঘটনা, রাতের স্বপ্ন এবং ঈমান নবায়নের কথা শোনালাম। ইউসুফ বলল, আপনার নাম আমি স্বপ্নে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে রেখেছি। আমাকে স্বপ্নে বলা হয়েছিল তুমি চলে গেলে তাকে কে দাওয়াত দিবে? যাও তাকে কালিমা পড়াও আর তার নাম উবাইদুল্লাহ রাখো।
ইউসুফ আমাকে হযরতজীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে জোর দিল। বলল, আমি তারই হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। আমি ইসলাম গ্রহণের জন্য কয়েক মাস ঘুরে ঘুরে মরছিলাম। তারপর একজন মাওলানা সাহেবের ঠিকানা দিয়েছিল। তিনি সাক্ষাতমাত্রই আমাকে কালিমা পড়িয়েছিলেন আর আমার নাম রেখেছিলেন মুহাম্মদ ইউসুফ। আইনী কাগজপত্র তিনিই করে দিয়েছিলেন। বিকেলে অনুমতি নিয়ে অফিস থেকে একটু আগেই বের হলাম। উখলা গিয়ে বাটালা হাউজ জামে মসজিদে পৌঁঁছলাম। ইমাম সাহেব বললেন, হযরত মাগরিবের নামায পড়ে এইমাত্র বের হলেন। তিনি একজনকে দ্রুত খোঁজ নিতে পাঠালেন। হযরত সংবাদ পেয়ে ফিরে আসলেন। মসজিদে বসে সাক্ষাত হল। আমার পুরো ঘটনা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। উঠে কোলাকুলি করলেন। মুবারকবাদ দিলেন। কয়েকবার আমার কপালে চুমু খেলেন। বললেন, আপনি কেমন খোশ কিসমত, শানে হোদায়াত স্বয়ং আপনাকে কবুল করে নিয়েছে। তাও আবার কেমন অভিনব পন্থায়। তবে দ্বিতীয়বার আর এই সুযোগ পাওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে এর হেফাজত করতে হবে।

মাওলানা সাহেব বললেন, ইউসুফ সাহেবের আপনাকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। সম্ভবত একবার তিনি অফিসের এক ইঞ্জিনিয়ারের ইসলাম সম্পর্কে তর্ক-বিতর্কের কথাও আলোচনা করেছিলেন খুব সম্ভব তিনি আপনার কথাই বলেছিলেন। বললাম, জ্বী, হ্যাঁ, কয়েক মাসব্যাপী তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। হযরত বলেছেন, শয়তান জিন্নাত সর্বদা মানুষকে হেদায়াত থেকে হটানোর চেষ্টা করতে থাকে। আপনি অটল থাকলে আল্লাহ তাআলা এই মেঘ কাটিয়ে দিতেন। আপনার আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু হওয়া উচিত ছিল।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কি পরিবারের লোকজনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন?
উবাইদুল্লাহ: মাওলানা আহমদ সাহেব! আমার এবারের ইসলাম পূর্বের ইসলাম থেকে একেবারেই ভিন্ন ছিল। আমার আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন। হিম্মত দিয়েছেন এবার আমি গোটা পৃথিবী বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের বিরোধিতা খরিদ করে একমাত্র আল্লাহ তাআলারই হওয়ার দৃঢ় সংকল্পে আবদ্ধ হয়েছিলাম। রাতে বাড়িতে গিয়ে সবাইকে জড়ো করে বলেছিলাম, যে সত্তাকে আমার মন মস্তিষ্ক, আমার চিন্তা-চেতনা সত্য জেনে গ্রহণ করেছে মিথ্যা দেবতাদের ভয়ে আমি তাকে পরিত্যাগ করবো না। পরিবার আমাকে পেছনের বিপদাপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। আমি বললাম, এরচেয়ে হাজারও গুণ বেশী আপদ-বিপদ আসলেও আমি সত্যবিচ্যুত হতে পারি না। আমার ইসলাম তোমাদের পছন্দ না হলে আমি তোমাদের এবং তোমাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে প্রস্তুত। তারা আমাকে দরদের সাথে বোঝাতে লাগল। আমি যখন কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করলাম আমার ছোট ভাই খুব ক্ষেপে গেল। আমার পিতাও তার পক্ষ নিল। রাতের বেলা আমি বাড়ি ত্যাগ করার এরাদা করলাম। মা আমাকে একটি কামরায় নিয়ে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। কেঁদে কেঁদে আমার জন্ম ও লালন-পালনের কষ্ট মুসীবতের কথা শোনালেন।

আমিও কাঁদতে লাগলাম। বার বার মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, মা! আপনি আমাকে লালন পালন করে সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। এর বিনিময়ে বলছি, এই পৃথিবী দুদিনের পান্থশালা, ধোঁকার আবাস। কালিমা পড়ে নিন। আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবন বানিয়ে নিন। পরে তিনিও রেগে গেলেন। রাত একটার সময় আমি ঘর ছেড়ে বের হলাম। শীতের রাত। কিছুদূর গিয়ে এক পার্কের ছাউনীর নীচে বসে পড়লাম। পাশের একটি ট্যাংকি থেকে উযূ করলাম। ঘাসের ওপরই আল্লাহর সমীপে নামাযের নিয়ত করলাম। নামায শেষে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করলাম। কেঁদে কেঁদে বললাম, আয় আমার আল্লাহ! আপনি আপনার নবীকে দিয়ে আমার নাম উবায়দুল্লাহ রেখেছেন। আয় আল্লাহ! আমি তো কেবল আপনারই বান্দা। আল্লাহ! আপনি যেহেতু আমাকে কেবলমাত্র আপনারই বান্দা বানিয়েছেন এজন্য আপনার অনুগ্রহে প্রাণের দোসর ভাই-বোন, ঘর-বাড়ি, স্নেহশীল পিতা, মমতাময়ী মাকে স্রেফ আপনারই জন্য ছেড়ে এসেছি। আয় আল্লাহ! আপনি আমাকে শুধু আপনারই বান্দা বানিয়ে রাখুন। আয় আল্লাহ! আমাকে শুধু আপনারই বান্দা বানিয়ে রাখুন। মনে পড়ল, হযরত আমাকে একটি দুআ লিখে দিয়েছিলেন এবং দৈনিক তার যিকির করতে বলেছিলেন।

ربنا لا تزغ قلوبنا بعد اذ هديتنا و هب لنا من لدنك رحمة انك انت الوهاب
তরজমা : হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করবেন না- এরপর যে, আপনি আমাদের সুপথ প্রদর্শন করেছেন। আর আমাদের আপনার নিকট হতে (বিশেষ) করুণা প্রদান করুন। নিশ্চয় আপনি মহান দাতা। -সূরা আলে ইমরান : ৭

বার বার এর হিন্দী অনুবাদ পড়তে থাকি। মৌলভী আহমদ! সে রাতের দুআ আর আল্লাহর সমীপে ফরিয়াদের স্বাদ ও আস্বাদ বলে বোঝানো যাবে না। মনে হ্িচ্ছল আল্লাহ তাআলার করুণা আমাকে কোলে টেনে নিচ্ছে। সবকিছু ত্যাগ করে অন্ধকার শীতের রাতে জনশূন্য ময়দানে আসমানের শামিয়ানার নিচে আল্লাহর বান্দা হওয়ার সে কি স্বাদ আমি অনুভব করলাম! হঠাৎ খেয়াল হল, পৃথিবীতেই যদি তাঁর হয়ে যাওয়ার মধ্যে এমন স্বাদ নিহিত তাহলে জান্নাতে জুমার দিন আল্লাহ তাআলার দীদার হলে কেমন মজাটাই না হবে। এক আশ্চর্য তন্ময়তার ঘোরের মধ্যে শীতের দীর্ঘ রাতটি নিমেষেই শেষ হয়ে গেল।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হল?
উবাইদুল্লাহ: সকালে উখলা এসে পরামর্শ করতে মাওলানা সাহেবকে খোঁজ করলাম। কিন্তু তিনি ফজরের পরই সফরে চলে গিয়েছিলেন। একজন আমাকে নেযামুদ্দীন মারকাযে যাওয়ার পরামর্শ দিল। পরদিন মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত হল। মাওলানা সাহেব তার এক বন্ধুর ওখানে কয়েকদিনের জন্য আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। দুদিন পর্যন্ত পরামর্শ চলল। আমি বার বার ইসলাম সম্পর্কে পাড়াশোনা করে একজন আলেম ও দা‘য়ী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করছিলাম। মাওলানা সাহেব আমার কাগজপত্র তৈরী করে দিলেন এবং প্রথমে জামাআতে সময় লাগানোর পরামর্শ দিলেন।
আমি চল্লিশ দিনের জন্য জামাআতে চলে গেলাম। ফিরে আসার পর মাওলানা সাহেবের পরামর্শক্রমে কর্ণাটকের এক মাদরাসায় জামাআতের আমীর সাহেবের সঙ্গে গিয়ে ভর্তি হলাম! দু বছর আগে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম তিনি পরিবারের সঙ্গে দাওয়াতী ব্যাপারে যোগাযোগ করতে বললেন, আমি বললাম, আল্লাহর জন্য ছেড়েছি তো ছেড়েই দিয়েছি। গেলে না আবার তাদের কারণে পিছলে যাই।

মাওলানা সাহেব বললেন, আল্লাহর জন্য ত্যাগ করায় যে মজা, তার জন্য মিলিত হওয়ার এবং তাদের আল্লাহর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া আরও অধিক মজা। আমি বাড়িতে ফোন করলাম। মা ফোন রিসিভ করে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলেন। আমার ঠিকানা জানতে চাইলেন। আমি হুমায়ুনের সমাধির ঠিকানা বললাম। তিনি আমাকে দেখতে আসলেন। বাড়িতে যেসব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কেঁদে কেঁদে তার বিশদ বর্ণনা দিলেন। আমি বললাম, এই যে দেখুন হুমায়ুনের সমাধি। কেমন বড় বড় লোক আর কত কত ছোট লোক সবই মারা গেছে। মা! আমাদেরও মরতে হবে। মা আমি আপনার পুত্র। আপনাকে বাস্তবিকই ভালোবাসি। আপনি কালিমা পড়ে নিন। মা! শোকে একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিলেন। আমার আল্লাহর দয়া, ঘন্টাখানেক খোশামুদের পর তিনি প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আমি তাকে হযরতের সঙ্গে দেখা করালাম। হযরত তাকে পুনরায় কালিমা পড়ালেন। তাঁর নাম রাখলেন সালমা। আমার ছোট বোনও সঙ্গে ছিল। হযরত তাকেও বোঝালেন। সেও প্রস্তুত হয়ে গেল। হযরত তার নাম রাখলেন আসমা!

আহমদ আওয়াহ: অতঃপর আপনার তালীমের কী হল?
উবাইদুল্লাহ: মা বাড়ি যেতে পীড়াপীড়ি করলেন। হযরত সাহেবকে খোশামুদ করতে থাকেন। হযরত আমাকে হুকুম করলেন, মায়ের কথা মেনে নাও। তিনি মাকেও ঈমানের ওপর অটল থাকার উপদেশ দিলেন। আর ওয়াদা করলেন, তিনি নবীডায় একজন শিক্ষকের ব্যবস্থা করে দিবেন যিনি আমাকে ইলম শেখাবেন। আমি বাড়ি চলে গেলাম। শুরুর দিকে পিতাজী খুবই বিরোধিতা করলেন কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের সঙ্গ দিলেন। আল্লাহ তাআলার দয়ায় আমার পিতা ও ভাইÑ আলহামদুলিল্লাহ মুসলমান হয়ে গিয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: বংশের লোকজন ও সমাজের পক্ষ থেকে কোনো বিরোধিতা হয় নি?
উবাইদুল্লাহ: অনেক হয়েছে, সে এক দীর্ঘ কাহিনী। বিরোধীদের সঙ্গে দুই দুইটি বছর সহাবস্থানের কাহিনী। হযরতের পরামর্শক্রমে আমরা সেখান থেকে হিজরত করে দিল্লীতে বাস করছি। যেহেতু আল্লাহ তাআলা ঈমান দান করেছিলেন কাজেই এ সব বিরোধিতা বেশ উপভোগ করেছি।

আহমদ আওয়াহ: তার কিছু বলুন!
উবাইদুল্লাহ: সে এক দীর্ঘ কাহিনী। অন্য এক সুযোগে শুনিয়ে দেব।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে দু’চার কথা বলুন!
উবাইদুল্লাহ: প্রত্যেক জিনিসে দৃঢ়তার জন্য চাই ইস্তিকামাত। সমস্ত সৃষ্টিকে অস্বীকার করে একক সত্তার হয়ে যাওয়ার স্বাদ এই পৃথিবীর বরং যদি বলি গোটা সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং সর্বাধিক স্বাদের জিনিস তাহলে তা সঠিকই হবে। মানুষ দুর্বল। আল্লাহ তাআলা তার নিয়ত আর সংকল্প দেখেন। তার কাছে অসহায় হয়ে দাঁড়ালে তিনি সাহস যোগান। তৌফিক দিয়ে দেন। তার করুণার প্রতি কুরবান হই তিনি স্বাদ ও লযযত দান করেন। আর আখেরাতের মহা পুরস্কার তো সেনায় সোহাগা। এমন দয়ালু দাতা পরওয়ারদেগার ছাড়া আর কে আছে হৃদয় সঁপে দেয়ার লায়েক? উৎসর্গিত হওয়ার উপযুক্ত? তবে তার হতে হলে অন্য সবাইকে অস্বীকার করা জরুরী।

لا اله الا الله -এর মধ্যে আগে অস্বীকার তারপর স্বীকারোক্তি। সবাইকে দূরে ঠেলে সকলকে বাই বাই বলবে, ব্যস তাঁর হয়ে যাবে।
আহমদ আওয়াহ: অনেক অনেক শোকরিয়া উবাইদুল্লাহ ভাই। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকেও এই অস্বীকার ও স্বীকারোক্তির স্বাদ আস্বাদন করান।
উবাইদুল্লাহ: আপনি আমাকে লজ্জিত করছেন।

আহমদ আওয়াহ: না, না, বরং সত্য হল, আল্লাহ তাআলা আপনাকে এর গভীর প্রত্যয় দান করেছেন। আপনার বর্ণনায় আমার লোমকূপও দাঁড়িয়ে গেছে।
উবাইদুল্লাহ: মৌলভী আহমদ! আল্লাহ তাআলা আপনার কথাকে বরকতময় করুন।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জানুয়ারী ২০১২