ভাই মুহাম্মদ রঈস (রমেশ কুমার)-এর সাক্ষাৎকার

আমার জন্য দুআ করবেন আল্লাহ তাআলা আমাকে বংশগত মুসলমানের মতো দোযখের ব্যাপারে অনুভূতিহীন না করুন। আমি যেন আমার পিতার দুঃখকে বুকে ধারণ করে মানবতাকে আগুণ থেকে রক্ষা করার ফিকির করতে পারি। আর মুসলমানরাও এই ঘটনাকে নভেল-নাটক মনে না করে ঈমান ও একীনের সঙ্গে সত্য মনে করে দোযখের পথে রওয়ানাকারীদের জন্য ফিকির করে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ রঈস সাহেব: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: রঈস সাহেব! আপনি ভালো আছেন? কবে এসেছেন?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব:  আলহামদুলিল্লাহ! খুব ভালো আছি। দশ দিন হল দিল্লী এসেছি। হযরতের সঙ্গে সাক্ষাত করার পাক্কা এরাদা করে এসেছিলাম। ১০ই ফেব্রুয়ারি দিল্লী এসেছি। শুনলাম হযরত সাহেব মুম্বাই সফরে আছেন। ফিরতে চার পাঁচ দিন দেরী হবে। ভাবলাম, বাড়িতে গেলে কারখানা ইত্যাদিতে ফেঁসে যাবো। কাজেই দেখা করেই ফিরবো। নেযামুদ্দীন চলে গিয়েছিলাম। ১৭ তারিখ সকালে এসে জানতে পেলাম, হযরত এখনো ফিরেন নি। আজকেই চলে আসবেন। আবার চলে গেলাম। ১৮ তারিখ এসে শুনলাম, হযরত ফজর নামায পড়ে বের হয়ে গিয়েছেন, আগামীকাল আসবেন। গতকাল এখানেই থেকে গিয়েছি যে, যখনই আসবেন দেখা করবো। সত্যকথা হল, খোঁজ করলে মানুষ পেয়ে যায়। নেক নিয়তে চেষ্টাকারীকে আল্লাহ তাআলা নিরাশ করেন না। অবশ্য কখনও কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়। আলহামদুলিল্লাহ! হযরতের সঙ্গে ভালোভাবে সাক্ষাত হয়েছে। খুব সান্ত¡না পেয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: আব্বু বলেছেন হয়তো, ফুলাত থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন আরমুগানের জন্য আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলবো?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: জ্বী, হ্যাঁ, হযরত আমাকে মসজিদে বসিয়ে গিয়েছেন যে, আহমদ মিয়া আসছে। আপনি তাকে আপনার কারগুযারী শোনাবেন। এটা ম্যাগাজিনে ছাপা হবে এবং ইনশাআল্লাহ! লোকদের হেদায়াতের উপলক্ষ হবে।

আহমদ আওয়াহ: অনুগ্রহপূর্বক আপনার পারিবারিক পরিচয় বলুন!

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: প্রসিদ্ধ জেলা ফতেহপুরের সিরুবীর এক রাজপূত পরিবারে ১৯৬২ সালের ৩রা জানুয়ারী আমার জন্ম। পিতাজী আমার নাম রাখেন রমেশ কুমার। দ্বাদশ ক্লাসে দু-দুবার ফেল করায় পড়াশোনা ছেড়ে দেই। আমার চাচার গাড়ি মেরামতের কারখানা ছিল। পিতাজী আমাকে তার নিকট কারের কাজ শেখার জন্য সোর্পদ করেন। আমি কার মেকানিক হয়ে যাই। ১৯৮৭ সালে বিবাহ করি। দিল্লীর জয়পুর হাইওয়েতে একটা ওয়ার্কশপ দিয়েছি। আমার পিতা নায়েবে তহশিলদার থেকে রিটায়ার্ড হয়েছেন। আমার এক বড় ভাই কানুন গো। ছোট ভাই পুলিশ ইন্সপেক্টর। আমার স্ত্রীও ভালো পরিবারের মেয়ে- গ্রাজুয়েট। স্ত্রী, দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে নিয়ে আমার সংসার।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন!

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: আহমদ ভাই! আমার মনে হয় সকল কর্মের কর্তা পৃথিবীতে তার প্রজ্ঞা অনুযায়ী যা ইচ্ছা করে যাবেন। গোটা জগত সংসার বরং সমগ্র সৃষ্টি যেন কাঠের পুতুল। তারই আঙ্গুলের ইশারায় সবাই নাচে। তিনি যার প্রতি প্রসন্ন হন সে বেড়া পার হয়ে যায়। না জানি কিভাবে যেন আমার প্রতি মালিকের করুণা হল। তিনি আমার জন্য হেদায়াতের ব্যবস্থা করে দিলেন। হতে পারে হযরত মাওলানাজী আমাকে খুঁজছিলেন, আমার জন্য দুআ করছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ মঞ্জুর করেছেন এবং আমাকে হেদায়াত দান করেছেন। বরং ঘাড় ধরে হযরতের এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: সেই বিবরণই তো আমরা জানতে চাচ্ছি!

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: জ্বী, বলছি। আমার ছোট ভাই আইজিতে ইন্সপেক্টর। আগ্রায় পোস্টেড ছিল। দু’বছর পূর্বে আগ্রায় এক তরুণকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বাসা থেকে যেসব মালপত্র ক্রোক করা হয়েছিল তার মধ্যে একটি ব্রিফকেসও ছিল। ব্রিফকেসের মধ্যে আমার ভাই ‘আপকি আমানত আপকি সেবা মে’ নামক একটি পুস্তিকা পায়। ওটি ছাপা হয়েছিল রাজস্থানের আজমীর থেকে। আমার ভাই সুরেশ কুমার পুস্তিকাটি পড়ে। কিতাবটি এমন প্রেমপূর্ণ ভাষায় লেখা হয়েছিল যে, পুস্তকের আবেদন সুরেশের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু যেহেতু অফিসারদের সামনে সামানপত্র খুলে তার তালিকা করা হয়েছিল এ জন্য কিতাবটি তাকে মহাফেজখানায় জমা দিতে হয়। আমার ভাই পুস্তিকাটির নাম এবং প্রকাশকের ঠিকানা লিখে নেয়। হযরত আজই বলেছেন, সেই কিতাবের কারণে সাহারানপুরের ডিআইজি হযরত সাহেবের এনকোয়ারী করিয়েছেন। আর মুজাফফর নগরের সিআইডি ডিপার্টমেন্টেও হযরত এই কিতাবটি পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার শোকর মুজাফফর নগরে একজন মুসলমান ইন্সপেক্টর ছিল। আমার ভাই সুরেশ কিতাবে মুদ্রিত ঠিকানায় তাকে চিঠি লিখল, যে কোনো মূল্যে কিতাবটি যেন তাকে পাঠানো হয়। কিন্তু চিঠির কোনো জবাব আসল না। আমি যখনই ফতেহপুর সিকরী যেতাম আর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো সে আমার কাছে আবদার জানাতো যে, আপনি রাজস্থানে ওয়ার্কশপ চালান। কোনোভাবে কিতাবটি আমাকে সংগ্রহ করে দিন। আমি তাকে বলতাম, কী এমন কিতাব যে, যখন দেখা হয় ‘আপকি আমানত’ বলে বলে মুখে ফেনা তোলো! সুরেশ বলল, ভাইয়া! আপনি কিতাবটি পড়লে বুঝতে পারবেন লেখক কী পরিমাণ মহব্বতের মধু তাতে ঢেলেছেন।
আমার ওয়ার্কশপটি হাইওয়েতে হওয়ায় গাড়ী নষ্ট হলে লোকজন আমার এখানে চলে আসতো। রাজস্থানের লোকজনও মাঝে মাঝে আসতো। আমাদের পিতা ছোটবেলা থেকেই আমাদের পথিক ও বিপদগ্রস্ত লোকের সেবা করাকে পরমধর্ম বলে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি যখন ওয়ার্কশপ দেই পিতাজী আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, যখন রাস্তার ধারে ওয়ার্কশপ খুলছো, সেখানে পথিক মুসাফিররাই বেশী আসবে। অন্ততপক্ষে তাদের বিপদ থেকে ফায়দা লুটবে না। রাতে কেউ এসে জাগালে উঠতে অলসতা করবে না। রাতের বেলা যে গাড়ী ঠিক করে দিবে তার মজুরী নিবে না। এটাকে পুঁজা মনে করবে। এর বিনিময় উপরওয়ালাই দিবেন।

গত ডিসেম্বরে বায়াওর আজমীর থেকে একটি গাড়ী আসল। গাড়ী ঠিকঠাক করে দেয়ার পর জানতে পরলাম, মালিক বায়াওরের লোক। চারদিন আগে আমি ফতেহপুর সিকরী গিয়েছিলাম। পিতাজীর শরীর ভালো ছিল না। সুরেশও এসেছিল। সে কিতাবটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। আমি ভদ্রলোককে বললাম, আপনার থেকে পারিশ্রমিক নেবো না। আপনি আমার একটি কাজ করে দিবেন। আমাকে ‘আপকি আমানত আপকি সেবা মে’ নামক কিতাবটি পাঠিয়ে দিবেন। তিনি বললেন, আগে পারিশ্রমিক তো নিন, ওয়াদা করছি, আপনাকে আমি কিতবাটি এনে দেবো। পয়সা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললাম, ব্যস, এটাই আমার পারিশ্রমিক। পারিশ্রমিক গ্রহণ করলে আপনার ওপর চাপ থাকবে না। এতে কমপক্ষে এই চিন্তা করবেন যে, পারিশ্রমিক তো দেনা রয়েছি। তিনি মজুরী গ্রহণ করতে জেদ ধরলেন। সর্বশেষ আমি বললাম, ঠিক আছে কিতাবটি এনে দিলে তখন দুটোই নেবো। তিনি বললেন, কিতাবের লেখক আমাদের এখানে বায়াওরে আসেন। সেখানকার প্রোগ্রামে আমাকে কিতাবটি দেয়া হয়েছে। এবার ‘আপকি আমানত আপকি সেবা মে’ এই টপিকের ওপরই আলোচনা হয়েছিল। অনেক লোকজন বরং শহরের সব দায়িত্বশীল বিশেষতঃ হিন্দু সংস্থাসমূহ ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, আর্যসমাজ, আর.এস.এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সকল নেতা সেই প্রোগ্রামে শরীক হয়েছিল। বায়াওরকে হিন্দুদের বিশেষত আর্যসমাজের কারণে অনেক ঐতিহাসিক শহর মনে করা হয়। সবাই এই সভায় শরীক হয়েছিল। প্রত্যেকেই বলছিল, এই যদি হয় ইসলাম তাহলে এই ইসলাম তো মুসলমানদেরও অজানা। এখন হিন্দুরা যদি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয় তাহলে তাদের কী দোষ? লোকজন বলছিল, শহরে এই প্রেমবাণীর গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়েছে।

আমি সেই গাড়ী মালিকের হাত ধরে খোশামুদ করে বললাম, ভুলে যাবেন না যেন! তার সঙ্গে পরিচয়ের পর আমার মনে কিতাবটি পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পরবর্তী শনিবারে দিল্লী যাওয়ার পথে সে আমার এখানে আসে। বলে, এক পত্রিকার মুখপাত্র যিনি প্রোগ্রামটি করেছিলেন তিনি তার সঙ্গী লালা ভাই ও শর্মাজীর সঙ্গে মিলে সেই প্রোগ্রামের রূপ বানিয়ে ছিলেন। তাদের আমি কিতাবের কথা বলেছি। তারা বলেছেন, কিতাবের সবগুলো কপিই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। তারা আজমীর থেকে এনে দিবেন। তাছাড়া দিল্লীর উখলায় একটি অফিস আছে। সেখান থেকে কিতাব পাওয়া যেতে পারে। আমি দিল্লী যাচ্ছি। সেখান থেকে ফেরার পথে আপনাকে দিয়ে যাবো।

বেচারা দিল্লী গিয়ে উর্দু বাজার গেলেন। সেখান থেকে কেউ তাকে উখলার ঠিকানা দিল। তিনি নওকর পাঠিয়ে উখলা থেকে দশটি কিতাব আনালেন। ফেরার পথে মঙ্গলবার আমাকে কিতাব দিয়ে গেলেন। আমার মঙ্গলের দুয়ার খুলে গেল। দুজন বড় মিস্ত্রীকে গাড়ীর কাজে লাগিয়ে আমি হাত ধুয়ে কিতাব পড়তে লেগে গেলাম। কিতাব শেষ হতে হতেই আমি হিন্দু ধর্ম বর্তমানে যেটা কোনো ধর্মই নয়; বরং দ্বীনে ইসলামেরই বিকৃতরূপ পরিত্যাগ করে ফেলেছিলাম। আমি স্নান করে কিতাব খুলে সাচ্চা দিলে কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে নিলাম। রাতে এক মাওলানা সাহেবের নিকট গেলাম। তাঁকে পবিত্রতা অর্জন ও নামায আদায়ের পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়ার অনুরোধ করলাম। তিনি মেওয়াতের মানুষ ছিলেন। আমাকে কিতাবের লেখক মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে ও জামাআতে সময় লাগানোর পরামর্শ দিলেন। একটি কিতাব রেখে বাকীগুলো আমি কারখানার এক চাকুরীজীবির মারফত আগ্রায় সুরেশের কাছে পাঠিয়ে দিলাম এবং সুযোগ করে চল্লিশ দিনের জামাআতে বেরিয়ে পড়ার প্রোগ্রাম বানালাম। আমি দিল্লী গিয়ে মাওলানা সাহেবের দফতর খুঁজে বের করলাম। মাওলানা সাহেব সফরে ছিলেন। সেখানে জুনায়েদ নামক একজন হাফেজ সাহেব আমার এফিডেভিট বানিয়ে দিলেন। এবং মারকাজে গিয়ে জামাআতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।

মারকাযে গিয়ে এত লোকের ভীড়ে আমি কোনো উপায় পাচ্ছিলাম না। কিছুটা নিরাশ হয়ে বের হচ্ছিলাম। হঠাৎ মারকাযের বড় মাওলানা সাদ সাহেবের ড্রাইভারকে পেয়ে গেলাম। তিনি আমাকে দারে আরকাম যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তাকে বললাম, আমি সেখান থেকেই এসেছি। আমার কাগজপত্র হয়ে গিয়েছে। তিনি আমাকে ভূপালের এক জামাআতে জুড়ে দিলেন। জামাআত লখনো সময় লাগাল। সাথীরা সবাই ছিল শিক্ষিত সজ্জন। জামাআত থেকে জানুয়ারীতে ফিরে আসলাম। উখলা গিয়ে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলাম। কিন্তু মাওলানা সাহেব আবারও সফরে গিয়েছিলেন। এক রাত থেকে বাহরাওয়াড় চলে আসি। জানতে পেলাম, পিতাজী গুরুতর অসুস্থ। ফতেহপুর গিয়ে দেখি সবাই কাঁদছে। শুনলাম, মাত্র এক ঘন্টা আগে আমার পিতার দেহান্তর ঘটে গেছে। (দীর্ঘক্ষণ কাঁদতে থাকেন)

আহমদ আওয়াহ: রঈস ভাই! আপনার নাম রঈস রাখল কে?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: (কিছুক্ষণ নীরব থেকে) উকীল সরফরাজ সাহেব যিনি আমার কাগজপত্র করে দিয়েছেন। তিনিই আমার জন্য ‘রমেশ’-এর সঙ্গে মিল রেখে রঈস নাম রেখে দেন। (আবার কাঁদতে থাকেন)

আহমদ আওয়াহ: আপনার পিতা কত ভালো মানুষ ছিলেন। আপনাদের কতো ভালো শিক্ষা দিয়েছেন। মানবতাকে ভালোবাসতেন। আব্বু তো বলেন, এমন লোকদেরকে মালিক তার ফেরেশতা পাঠিয়ে কালিমা পড়িয়ে দেন।

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: না আহমদ ভাই! তিনি প্রকৃতিগতভাবেই মুসলমান ছিলেন। তাকে কেউ ইসলামের কথা বলেনি। প্রিয় ভাই মাওলানা আহমদ! একটু ভেবে দেখুন, আমার সামনে আমার লালন পালনকারীকে, আমাকে প্রেমিকের মত মহব্বতকারীকে আমার জ্বর-সর্দিতে অস্থিরচিত্ত পিতাকে হায়! আমার আল্লাহ যদি আমার বদলে তাকে ঈমান দান করতেন! মাওলানা আহমদ,আমার জ্বরের কথা শুনে যার জ্বর চলে আসতো সেই পিতাকে আমারই সামনে কোনো শত্র“ নয় তারই আদরের পুত্ররা সর্বপ্রথম বড় ভাই এবং কানুনগো ছেলে অশীশ চৌধুরী লাকড়িতে ঘি ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল। আমি আর আমার ছোট ভাই যে ‘আপকি আমানত’ পড়ে মুসলমান হয়ে মুহাম্মদ উমর নাম ধারণ করেছিল দুজনেই ভিক্ষা চাইতে থাকি যে, হিন্দু নিয়মানুসারেই তাকে সমাধিস্থ করা হোকÑ পোড়ানো না হোক। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মাওলানা সাহেব! আমার প্রিয় বাবা শুধু এবং শুধু মুসলমানদের অবহিত না করার কারণে চিতায় জ্বলে ভস্ম হলেন। আর যদি… কাঁদতে কাঁদতে… যদি সেখানে জাহান্নামের আগুনে… না আহমদ ভাই! আমার দ্বারা ওকথা বলাবেন না, তাহলে এই সমস্ত জালেম মুসলমানকে দয়াবান ন্যায়নিষ্ঠ খোদা কখনও ক্ষমা করবেন না। যাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আমার এমন প্রিয় পিতা নরকে চলে গেছেন, তারা ঈমানওয়ালা নয়, তারা তো সবচেয়ে বড় বেঈমান!

আহমদ আওয়াহ: না, রঈস ভাই! এমনটি বলবেন না!

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: মাওলানা সাহেব! আপনি আমার স্থানে হলে কিছুটা উপলদ্ধি করতে পারতেন। আমার পিতাজীর অনেক মুসলমান বন্ধু ছিল। একজন মাওলানা সাহেব তার সঙ্গে প্রায়ই সময় কাটাতেন। এই হতভাগা পুত্রের দুর্ভাগ্য! আল্লাহ তাআলা তাকে বানিয়েছেন, হেদায়াত দিয়েছেন কিন্তু তার মুহসিন পিতা, তাকে আঙ্গুল ধরে হাঁটাচলা শেখানো পিতা, কোলে করে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করে দেয়া পিতা, প্রতিদিন রাতে আমাদের জীবন গড়ার ফিকিরে এক একটি শব্দ মুখস্থ করানো পিতা, আমাদের সকল চাহিদা পূর্ণকারী, আমাদের কল্যাণ ও মানবতার পাঠদানকারী পিতা মায়ের মমতা দিয়ে বুকে আগলে রাখা পিতা আমার সামনেই জ্বলে ভস্ম হচ্ছিলেন। জ্বলতে জ্বলতে আমার সামনেই তাঁর মাথা ফুঁড়ে দেয়া হয়। জ্বলন্ত অবস্থায় শত্র“র মতো লাঠি মেরে মেরে আগুনে ঠেসে ধরা হয়। আর আমরা দুই ভাই সবকিছু জেনেও তা দেখতে থাকি। মাওলানা সাহেব, আপনি সম্ভবত আমাদের ব্যথা অনুভব করতে পারবেন না। ভেবে দেখুন, এটা কোনো উপন্যাসের কাহিনী নয়, নাটক নয়, একেবারে সত্য সংঘঠিত ঘটনা। আমাদের চাক্ষুষ কাহিনী।

আমি চিন্তা করি, হিন্দুরা তো জানে না তারা অবুঝ, কিন্তু মুসলমানদেরও এই বিশ্বাস যে, বে-ঈমানদের জন্য চিতার বিধান। তাদের রাস্তা সোজা নরক। নইলে মাওলানা সাহেব! একটু ভাবুন আপনার সামনে কেউ আগুনের গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত, আর আপনি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন। আপনি দোকানের কাজে নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। কাউকে কুয়ো বা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখলে মানুষ সবকিছু ছেড়ে বাঁচাতে চেষ্টা করে। কতলোক ডুবন্তকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। আগুনের মধ্যে আমাদের সামনেই কোনো পাথর নয়, লাকড়ী নয়, আমাদেরই সঙ্গী সাথী, আমাদের ওপর অনুগ্রহকারী আমাদের সঙ্গে লেনদেনকারী চিতায় জ্বলছে, এদিকে প্রত্যেক ঈমানদারই তার চির নরকী হওয়ার একীন করেছে তবুও তারা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ঘর-বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। চিন্তার সামান্য রেখাও কপালে ভাঁজ ফেলছে না। এটা কিভাবে সম্ভব! এই মুসলমান কেমন মুসলমান? এ-তো মানুষও নয়, হিংস্র জানোয়ার। যে কিনা তার সঙ্গীর অগ্নিদগ্ধ হওয়া মেনে নিয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আসলেই এটা আপনার জন্য আবেগঘন ব্যাপার। আপনার এভাবেই চিন্তা করা উচিত।

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: মাওলানা আহমদ সাহেব! শুধু আমারই নয় আপনাকেও এভাবে ভাবতে হবে। অন্তত যে মুসলমানের জান্নাত-জাহান্নামের একীন আছে তাকে এভাবে ভাবা উচিত। বলুন! এভাবে ভাবা দরকার কিনা?

আহমদ আওয়াহ: নিঃসন্দেহে এভাবেই চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। আপনি সত্যই বলেছেন, আব্বু বলেন, আমাদের ঈমানে দুর্বলতা রয়েছে। আমরা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাকে হালকা নজরে দেখি। গভীরভাবে তলিয়ে দেখি না। আপনি বলেছিলেন, সুরেশ ভাইও মুহাম্মদ উমর হয়ে গিয়েছেন। এটা কিভাবে হল?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: তার কাছে কিতাব পৌঁছল; সে বার বার কিতাবটি পড়ে কুরআন অধ্যয়ন শুরু করে। আগ্রায় এক তাবলীগী আমীর সাহেব আছেন, ডাক্তারী করেন আমার ভাই তার কাছে গিয়ে মুসলমান হয়ে যায়। তিনি তার নাম রাখেন মুহাম্মদ উমর। সে বাড়িতে যায়। তখন পিতাজী খুবই অসুস্থ ছিলেন। তিনি একটা সময় একেবারে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। ভাই মুহাম্মদ উমর বাড়ির লোকজনকে বলে গিয়েছিল, পিতাজীর হুশ ফিরলে তাকে অবশ্যই যেন আপকি আমানত পড়তে দেয়া হয়। একদিন তার হুঁশ ফিরলে তাকে ‘আপকি আমানত’ পড়তে দেয়া হয়। তিনি শুয়ে শুয়ে কিতাব পড়া শুরু করেন। বলেন, কেমন সত্য আর ভালো বই! তারপর আবার বেঁহুশ হয়ে পড়েন। ইন্তেকাল পর্যন্ত আর তার হুঁশ ফিরেনি।

আহমদ আওয়াহ: আল্লাহর শোকর তাহলে আর ভাবনার কিছু নেই। শুরুর কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে নিয়েছেন তো তাওহীদ স্বীকারই করে নিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ এতটুকুও যথেষ্ট।

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: মন ভোলানের জন্য এটা বলা যেতে পারে। কিন্তু সত্যকথা তো হল ইসলাম ও ঈমান বুঝে স্বীকার করা ব্যতীত পূর্ণ হতে পারে না। হায়! আমার দুঃখ.. এর কোনো উপশম নেই। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যবন্ধু হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. কেমন সত্যই না উচ্চারণ করেছেন, হায়! আমি যদি পাখি হতাম, খড়কুটা হতাম। হায়! আমার মা আমাকে জন্মই না দিতো।
এই দুঃখ আমার পিতাকে চিতায় জ্বালানোর দুঃখ। অতঃপর দোযখের আগুনে জ্বালানোর দুঃখ যা মৃত্যুর পরও শেষ হবে না বরং সেখানে আরও বেশী কষ্ট পেতে থাকবো। হায়! সদা সর্বদা ভষ্মীভূত হওয়ার একীন, দোযখের প্রতি একীন প্রিয় পিতার ঈমান বঞ্চিত হয়ে চিরতরে জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার একীনকারী রঈসের বিষাদক্লিষ্ট অন্তর্জালাকে বুঝতে পারবে! (দীর্ঘক্ষণ কাঁদতে থাকেন। পানি পান করানো হয়।)

আহমদ আওয়াহ: (প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে) আব্বু অনেকবার জয়পুর হাইওয়ের এক মিস্ত্রীর কথা আলোচনা করেছেন। একবার রাতে তাঁর গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মিস্ত্রি সাহেব তাকে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। আব্বু এই কারণে রাজস্থানের লোকদের ভদ্রতা ও মানবতাবোধের প্রশংসা করে থাকেন

মুহাম্মদ রঈস সাহেব:  আহমদ ভাই! সেই সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগা মিস্ত্রি আমিই ছিলাম। আজই মাওলানা সাহেব বলেছেন, জানুয়ারীর শেষ দিকে তিনি ফতেহপুর শিখবাটি গিয়েছিলেন। বহরাওয়াড় অতিক্রম করার পর আমার মনে পড়ল একবার এক শীতের রাতে আমরা এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের অ্যাম্বেসেডর গাড়ির প্যান বেলেট নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এক মিস্ত্রি সাহেবকে বাড়ি থেকে ডাকা হল, সে গাড়ি মেরমত করে বের করে দিল এবং পয়সা নিতে অস্বীকার করল। বলল, আমি কয়টা পয়সার জন্য রাত বিরাতে ধাক্কা খাওয়ার লোক নই। আমি তো এজন্য ঘুম নষ্ট করেছি যে, আপনারা আমার মেহমান। মানবতার সম্পর্কের কারণে আমি আপনাদের সেবা করেছি। মাওলানা সাহেব বলছিলেন, আমাদের সঙ্গে আব্দুর রশীদ নামে একজন দা‘য়ী ছিলেন। তিনি ছিলেন হরিদুয়ারের অধিবাসী। আমরা প্রোগ্রাম বানিয়েছিলাম, আব্দুর রশীদকে সেখানে রেখে যাবো। তিনি সেখানকার সমস্ত গাড়ী কারখানায় দাওয়াত দিবেন যাতে সেই অনুগ্রহকারীর নিকটও দাওয়াত পৌঁছে যায়।। আমি বললাম, সেই শীতের রাতে আপনি যখন জুসওয়ালার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে আসলেন আমিই স্পায়ার পার্টসওয়ালার বাড়িতে তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। হযরত সাহেব আমিই আপনার সেই চোর ছিলাম। আমার মালিক আপনার সঙ্গে কিভাবে দেখা করিয়ে দিলেন। মাওলানা সাহেব বলেছেন, সেই রাতে দিল্লী ফিরে তাহাজ্জুদ নামাযে আমি খুব দুআ করেছি। আয় খোদা! আমার প্রতি এই অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহ রয়েছে। কোনওভাবে তার সঙ্গে সাক্ষাত করিয়ে দিন এবং তাকে হেদায়াত দান করুন। আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, আপনার সেই দুআর কারণেই আমি আপনার প্রেমে বন্দী হয়ে দশদিন ধরে ঘর, পরিবার, ওয়ার্কশপ ছেড়ে দিল্লীতে পড়ে আছি। আর দিল্লীতে আমার পরিচিতও কেউ নেই। ব্যস, নিয়ত করেছিলাম, এক বছরও যদি পড়ে থাকতে হয় থাকবো। প্রয়োজনে কোনো ওয়ার্কশপে কাজ জুটিয়ে নেবো তবুও মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত না করে যাবো না। হযরত সাহেব আবেগাপ্লুত হয়ে সিজদায় পড়ে গেলেন এবং তৎক্ষণাৎ দুই রাকাআত নামায পড়ে দীর্ঘক্ষণ দুআ করলেন।

আহমদ আওয়াহ:মাশাআল্লাহ! তাহলে আব্বজী যে মিস্ত্রীর আলোচনা করেন আপনিই তিনি। বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলার কী শান! কিভাবে তিনি দুজনকে মিলিয়ে দিলেন। এখন আপনার কী এরাদা?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: প্রথমে আমার ছোট ভাই আইজি উমরকে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাত করাবো। তারপর হযরতওয়ালা আমাকে সেই জুসওয়ালাকে দাওয়াত দেয়ার যিম্মাদারী দিয়েছেন যিনি হযরতকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। তারপর পরিবারের উপর কাজ করবো। আমার স্ত্রী সন্তানেরা তো আলহামদুলিল্লাহ মুসলমান হয়ে গিয়েছে। মুহাম্মদ উমরের স্ত্রী কিছুটা শক্ত ধাতের। বর্তমানে তাদের ঘরে ইসলাম নিয়ে ঝগড়াঝাটি চলছে। হযরতের কাছে দুআ চেয়েছি। এখন ইনশাআল্লাহ হযরতের পরামর্শ অনুযায়ী দাওয়াতের কাজে জীবন কাটানোর চেষ্টা করবো, এবং মেহনত করবো, যেন আমার পিতার মতো স্বয়ং পরিবারের লোকজনকে ভষ্ম করার ব্যাপারে লোকজন চিন্তিত হয়।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের জন্য কোনো পয়গাম?

মুহাম্মদ রঈস সাহেব: আমার জন্য দুআ করবেন আল্লাহ তাআলা আমাকে বংশগত মুসলমানের মতো দোযখের ব্যাপারে অনুভূতিহীন না করুন। আমি যেন আমার পিতার দুঃখকে বুকে ধারণ করে মানবতাকে আগুণ থেকে রক্ষা করার ফিকির করতে পারি। আর মুসলমানরাও এই ঘটনাকে নভেল-নাটক মনে না করে ঈমান ও একীনের সঙ্গে সত্য মনে করে দোযখের পথে রওয়ানাকারীদের জন্য ফিকির করে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! আপনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। অনেক অনেক শোকরিয়া! জাযাকুমুল্লাহ খাইরাল জাযা। আসসালামু আলাইকুম।
মুহাম্মদ রঈস সাহেব: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মার্চ- ২০১০

অনুবাদঃ মুফতি যুবায়ের আহমদ