মাইকেল জ্যাকসনের ভাই জর্মন জ্যাকসনের সাক্ষাৎকার

ইসলাম গ্রহণের পর নিজেকে আমার নবজাতক শিশু মনে হতে থাকে। ইসলামে আমি সেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই যেগুলো খৃস্টধর্মে পাইনি। বিশেষত হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারে ইসলাম আমাকে প্রশান্তিদায়ক উত্তর দিয়েছে। ধর্মের মধ্যে এই প্রথমবারের মত আমি নির্ভরতা খুঁজে পাই। আমি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করছি, আমার পরিবার যেন এই সত্য সম্পর্কে অবগত হয়। আমার পরিবার খৃস্টধর্মের () মতাবলম্বী। এই বিশ্বাস মতে মাত্র এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার লোক জান্নাতে দাখেল হবে। এটা কিভাবে মেনে নেয়া সম্ভব? আকিদাটি আমাকে সর্বদা তাড়া করে ফিরতো। যখন জানতে পারলাম বাইবেল আসলে বিভিন্ন লোকের সংকলন তখন আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিশেষত জেমস সংকলিত কপিটির ব্যাপারে আমার ঘোর সংশয় সৃষ্টি হল। কারণ, ভদ্রলোক সরাসরি নিজেই বাইবেল লিখেন আর খোদাকে এর কারণ মনে করেন। উপরন্তু তিনি নিজেও এর পুরোপুরি অনুসরণ করেন না। সৌদী আরব অবস্থানকালে আমি প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ পপশিল্পী মুসলিম মুবাল্লিগ ইউছুফ ইসলামের  একটি অডিও ক্যাসেট ক্রয় করি। এর দ্বারা ইসলাম সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানতে পারি।


প্রশ্ন : কবে এবং কিভাবে আপনার ইসলামী সফর শুরু হয়েছে?
উত্তর : ১৯৮৯ সালে আমিও আমার বোন যখন মধ্যপ্রাচ্য সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করি, বাহরাইনে অবস্থানকালীন আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। সেখানে কিছু শিশুর সেেঙ্গ দেখা হয়। তাদের সাথে কথাবার্তা বলি। আমি তাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করি, তারা নিষ্পাপ মনে সেগুলোর উত্তর দেয়। আলাপকালে তারা আমার ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায়, ‘আমি খৃস্টান’ এই ছিল আমার উত্তর। আমি তাদের ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, সকলে একবাক্যে বলে ওঠে ‘ইসলাম’ তাদের জড়তাহীন প্রত্যয়দ্বীপ্ত উত্তর আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। তারা আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করতে শুরু করে। কণ্ঠের চড়াই-উতরাই বলে দিচ্ছিল ইসলাম নিয়ে তারা গর্বিত। এভাবে আমি ইসলামের প্রতি আকর্ষিত হই।
শিশুদের সঙ্গে এই সাধারণ বাক্যালাপ আমাকে মুসলিম আলেমদের সঙ্গে আলোচনা পর্যালোচনার সুযোগ করে দেয়। তাদের সেই আবেগ মাখা স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর আমাকে দোলা দিয়ে যায়। আমার এতটুকু সাধ্য ও মনোবল ছিল না, আমি এই ঘটনাকে ভুলে যাই। শেষ পর্যন্ত আমাদের পারিবারিক বন্ধু কমার আলীর নিকট ঘটনাটি আলোচনা করি। কমার আলী আমাকে সৌদী আরবের রাজধানী রিয়াদে নিয়ে যায়। সেখান থেকে এক সৌদী পরিবারের সঙ্গে আমি ওমরা আদায় করি এবং প্রথমবারের মতো নিজের মুসলমান হওয়ার ঘোষণা দিই।

প্রশ্ন : মুসলমান হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কী ছিল?
উত্তর : ইসলাম গ্রহণের পর নিজেকে আমার নবজাতক শিশু মনে হতে থাকে। ইসলামে আমি সেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই যেগুলো খৃস্টধর্মে পাইনি। বিশেষত হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারে ইসলাম আমাকে প্রশান্তিদায়ক উত্তর দিয়েছে। ধর্মের মধ্যে এই প্রথমবারের মত আমি নির্ভরতা খুঁজে পাই। আমি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করছি, আমার পরিবার যেন এই সত্য সম্পর্কে অবগত হয়। আমার পরিবার খৃস্টধর্মের (আবফধহপব ড়ভ লবযড়াধ) মতাবলম্বী। এই বিশ্বাস মতে মাত্র এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার লোক জান্নাতে দাখেল হবে। এটা কিভাবে মেনে নেয়া সম্ভব? আকিদাটি আমাকে সর্বদা তাড়া করে ফিরতো। যখন জানতে পারলাম বাইবেল আসলে বিভিন্ন লোকের সংকলন তখন আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিশেষত জেমস সংকলিত কপিটির ব্যাপারে আমার ঘোর সংশয় সৃষ্টি হল। কারণ ভদ্রলোক সরাসরি নিজেই বাইবেল লিখেন আর খোদাকে এর কারণ মনে করেন। উপরন্তু তিনি নিজেও এর পুরোপুরি অনুসরণ করেন না। সৌদী আরব অবস্থানকালে আমি প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ পপশিল্পী মুসিলম মুবাল্লিগ ইউছুফ ইসলামের (ঈধঃ ংঃবহাবহং) একটি অডিও ক্যাসেট ক্রয় করি। এর দ্বারা ইসলাম সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানতে পারি।

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণ করে আমেরিকা প্রত্যাবর্তনের পর কী প্রতিক্রিয়া হল?
উত্তর : আমেরিকা প্রত্যাবর্তনের পর আমেরিকান মিডিয়া ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংস্র প্রোপাগান্ডা শুরু করল। গুজবের ছাড়াছড়িতে আমি বিব্রতবোধ করলাম। মুসলমানদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছিল। যদিও বহু বিষয়ে ইসলাম ও খৃস্টধর্ম ঐক্যমত পোষণ করে। যেমন : কুরআন হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে পবিত্র পয়গম্বর বলে থাকে। এতদসত্ত্বেও আমার আশ্চর্য লাগল, খৃস্টান আমেরিকা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন বিষোদগার করছে। হতাশার সেই দিনগুলোতে আমি মানসিকভাবে আমেরিকান মিডিয়ার উপস্থাপিত মুসলমনাদের ভুল ইমেজ সংশোধনের শপথ নিলাম। আমার ধারণা ছিল না আমেরিকার প্রচার মাধ্যম আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ হজম করবে না। তারা আদাজল খেয়ে বিরোধিতায় নামবে। এরা স্বাধীন মতামত ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করল। আমেরিকান সমাজের কপট চেহারা আমার সামনে প্রকাশিত হল। ইসলাম গ্রহণের পর আমার জীবনে বিস্ময়কর পরিবর্তন আসল। প্রকৃত প্রস্তাবে এরপর থেকেই আমি মানবতাকে বুঝতে শিখেছি। আমি নিষিদ্ধ বস্তু পরিহার করলাম। এতে পরিবারের লোকজন অসন্তুষ্ট হল। আমার ছোট্ট পরিবারটি দুশ্চিন্তার সাগরে ডুবে গেল। হুমকিসংবলিত পত্র আসতে লাগল। এতে পারিবারিক সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেল।

প্রশ্ন : কী ধরনের হুমকি?
উত্তর : উদাহরণত তারা বলতো, আমি নাকি আমেরিকান সভ্যতা ও সমাজের সম্মানকে আহত করেছি। বলতো, ইসলামের কোলে চড়ে তুমি অন্যদের প্রাপ্য অধিকার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছো। আমরা তোমার জীবনকে অতিষ্ট করে তুলবো। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার পরিবার উদার মানসিকতার। আমরা এমন পরিবেশে চোখ খুলেছি যেখানে সকল ধর্মকে সমান দৃষ্টিতে দেখা হতো। আমাদের পিতামাতা আমাদের এই ধাঁচেই গড়ে তুলেছেন। এজন্য আমি বলতে পারি, জ্যাকসন পরিবারের সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমার সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তা উদার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গত নয়।

প্রশ্ন : আপনার ভাই মাইকেল জ্যাকসনের কী প্রতিক্রিয়া ছিল?
উত্তর : আমেরিকায় ফেরার সময় সৌদী আরব থেকে বহু কিতাবাদি নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো থেকে মাইকেলও কিছু অধ্যয়ন করতে নেয়। ইতোপূর্বে আমেরিকান মিডিয়ার ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী অপপ্রচারের ফলে সে কিছুটা প্রভাবিত ছিল। তবে না সে ইসলামকে ঘৃণা করতো, না পছন্দ করতো। এই কিতাবাদী অধ্যয়নের পর থেকে সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত হল। কিতাব পাঠের প্রভাবে সে মুসলিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি করল। বর্তমানে সে সৌদি বিলিয়নার যুবরাজ ওলীদ ইবনে তালালের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর সমান অংশীদার।

প্রশ্ন : মাইকেলের ব্যাপারে সংবাদ বেরিয়েছে সে নাকি মুসলমান হয়ে গেছে। প্রকৃত ঘটনা কী?
উত্তর : আমার জানা মতে মাইকেল তার জীবনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। তার সঙ্গীত মানুষের সঙ্গে মহব্বতের পয়গাম দেয়। আমরা পিতামাতা থেকে অন্যকে ভালোবাসতে শিখেছি। আমার মুসলমান হওয়ার ব্যাপারেই যখন এতো হইচই হতে পারে তাহলে মাইকেলের বিরুদ্ধে কীভাবে হবে না? তবে এখনও পর্যন্ত মিডিয়া তাকে গালাগালির পাত্র বানায়নি। যদিও ইসলামের নিকবর্তী হওয়ার কারণে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা জানে আজ না হয় কাল মাইকেল ইসলাম গ্রহণ করবেই।

প্রশ্ন : আপনার ব্যাপারে আপনার পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল?
উত্তর : আমেরিকা ফেরার পর মা আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পারেন। আমার মা খুবই ধার্মিক মহিলা। বাড়িতে যাওয়ার পর আমাকে শুধু একটি প্রশ্নই করেনÑ “তোমার এই সিদ্ধান্ত সাময়িক নাকি ভেবে চিন্তে পা বাড়িয়েছো?” বললাম, “আগাগোড়া ভেবেই পা বাড়িয়েছি” আমাদের পরিবারকে সবাই ধার্মিক পরিবার হিসেবেই মানে। আমরা যাকিছু করি তা আল্লাহর দয়াতেই করি, এর জন্য আমরা কেন কৃতজ্ঞ হবো না। এর একটি কারণ এ-ও যে, আমরা চ্যারিটি ইন্সটিটিউটে অংশগ্রহণ করি। স্পেশাল বিমানে করে দরিদ্র আফ্রিকান দেশগুলোতে ওষুধ পাঠাই। বসনিয়া যুদ্বের সময় আমাদের এয়ার ক্রাফট যুদ্ধকবলিতদের ত্রাণ সরবরাহ করতে গিয়ে ক্রাশ করেছিল।

প্রশ্ন : আপনি কি কখনও আপনার পপস্টার বোন জায়ান্ট জ্যাকসনের সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে কথা বলেছেন?
উত্তর : পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো আমার ইসলাম গ্রহণ তার কাছেও আশ্চর্যজনক ছিল। প্রথমদিকে সে খুব দুঃখ পেয়েছিল। তার জানা ছিল মুসলমান প্রবৃত্তিপূজারী জাতি। উদাহরণত তারা চার চারটি করে স্ত্রী গ্রহণ করে। কিন্তু আমি স্পষ্ট করে দেয়ার পর এবং ইসলামী আইনকে আমেরিকার প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখার পর তার সে ভুল ভেঙ্গে যায়। এটা বাস্তবতা, পশ্চিমা সমাজে অশ্লীলতা ও অবিশ্বস্ততা সাধারণ ব্যাপার। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমা পুরুষ কয়েকজন নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রাখে। এটা সামাজিক চরিত্রকে ধ্বসিয়ে দেয়। ইসলাম সমাজকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে। ইসলামী শিক্ষা হল, কোনো ব্যক্তি যদি আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হয় তাহলে তার উচিত সম্মানজনক পন্থায় নিজেদের সম্পর্ককে আইনী প্রক্রিয়ায় ঢেলে নেয়া। তাছাড়া ইসলাম একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে যেসব শর্তাবলী আরোপ করেছে একজন সাধারণ মুসলমান অর্থনৈতিকভাবে সেগুলো পূর্ণ করতে অক্ষম। মুসলিম বিশ্বে সর্বোচ্চ ১% লোকও হয়তো পাওয়া যাবে না যারা একাধিক বিবাহ করেছে। আমার মতে ইসলাম ধর্মে নারীর অবস্থান সেই ফুলের মতো যা কাটার নিরাপদ বেষ্টনীতে আবদ্ধ থাকে। সুন্দর মনোলোভা মনোহর। কিন্তু পশ্চিমা সমাজ এই বোধ ও দর্শন থেকে বঞ্চিত।

প্রশ্ন : মুসলিম সমাজের ব্যাপারে আপনার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কী?
উত্তর : পৃথিবীতে মানবতার প্রতি সর্বাধিক সহমর্মিতা মুসলিম সমাজেই রয়েছে। আমার বিশ্বাস সেই সময় খুবই নিকটে যখন পৃথিবী এই বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত হবে, ইনশাআল্লাহ।

সৌজন্যে : মাসিক আরমুগান,
জানুয়ারী- ২০০৪ ইং