মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ (সঞ্জয়)-এর সাক্ষাৎকার

আম্বিয়া কেরামের মতো নির্লোভ-নিঃসার্থ ও মহব্বতপূর্ণ হৃদয় থাকতে হবে। সেই সাথে ইসলামের মতো সত্য নিয়ামত সাথে থাকলে কঠিন থেকে কঠিন মানুষও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় না নিয়ে পারবেনা। এজন্য আমাদেরকে মানবতার হক আদায় করতে হবে। অমুসলিমদের দাওয়াত দিতে হবে। তাদের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচাতে হবে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: আব্দুল ওয়াহিদ ভাই! আব্বু আমাকে আরমুগানের জন্য আপনার সঙ্গে কিছু আলোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে দাওয়াতী কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে ফায়দা হতে পারে।
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: গতরাতে আমাকেও মাওলানা সাহেব বলেছিলেন, আহমদ আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলবে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পারিবারিক পরিচয় দিন?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: পূর্বে আমরা আসামের অধিবাসী ছিলাম। ইংরেজ আমলে আমার দাদা গোহাটিতে অফিসার ছিলেন। পিতাজীও সেল ট্যাক্সের অফিসার ছিলেন। বাঙ্গালের বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে অবশেষে কোলকতায় বাড়ি বানিয়েছিলেন। সেখানেই তার ইন্তেকাল হয়। আমার পুরনো নাম ছিল সঞ্জয় আস্থানা। ১৯৫৯ সালের এগারো সেপ্টেম্বর আমার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা মালদহতে হয়েছিল। তারপর কলেজের সময় হলে পিতাজী কোলকতা ট্রান্সফার হন। এখানেই আমার শিক্ষাদীক্ষা হয়। এম.এস.সি ও বি.এড করে সরকারী হায়ার সেকেন্ডারী স্কুলে সায়েন্সের শিক্ষক হয়ে যাই। তারপর এক ডিগ্রি কলেজের লেকচারার হই। আল্লাহর শোকর, এখনও সায়েন্সই পড়াই। আজ থেকে চৌদ্দ বছর পূর্বে এক শিক্ষিত পরিবারে বিবাহ করি। আমার শ্বশুর সাহেব এক কলেজের প্রিন্সিপ্যাল। আমার স্ত্রীও একটি কনভেন্ট স্কুলের শিক্ষিকা।

আহমদ আওয়াহ: একটু বিস্তারিতভাবে আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি বলুন?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ার কারণে তিন বছর পর পর আমাদের পারিবারিক ভ্রমণভাতা দেয়া হয়। আজ থেকে নয় বছর পূর্বে বালবাচ্চাসহ পিকনিক ট্যুরে বের হই। যাওয়ার পথে দুদিনের জন্য ভূপালে ব্রেকজার্নি করে ভূপাল দেখারও প্রোগ্রাম ছিল। ভূপাল নেমে স্টেশন থেকে একটা ট্যাক্সি ভাড়া নেই। ঘটনাক্রমে আমি জ্বরে আক্রান্ত হই। ট্যাক্সিওয়ালার কাছে উপযুক্ত একটি হোটেলের অনুসন্ধান করি। বলল, একটু দূরেই ভালো এবং সস্তা একটি হোটেলের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সে আসলে ভালো লোক ছিল না। আমাকে নিয়ে এক হোটেলে গেল। বলল, আপনি হোটেলে কামরা পছন্দ করুন। আমি ভেতরে গিয়ে কামরা পছন্দ করলাম। ট্যাক্সিওয়ালা আমাকে বলল, আমি সামানপত্র আর বাচ্চাদের নিয়ে আসছি, আপনার জ্বর এসেছে আপনি কামরায়ই আরাম করুন। গাড়িতে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বলল, আপনি বাচ্চাদের নিয়ে যান, আমি মালপত্র নিয়ে আসছি। আমার দুর্ভাগ্য বলব, না সৌভাগ্য সফরে কখনও ট্যাক্সি ভাড়া করলে সবসময়ই গাড়ির নম্বর নোট করায় অভ্যস্ত ছিলাম, কিন্তু জ্বরের প্রকোপে এবার নম্বর টুকে রাখার কথা মনে ছিল না।

ট্যাক্সিওয়ালা সামানসহ ট্যাক্সি নিয়ে পালিয়ে গেল। সমস্ত সামানপত্র কাপড়-চোপড়, মানি ব্যাগের পাঁচশত রূপি ছাড়া সমস্ত টাকা, এমনকি টিকিটও গাড়িতে ছিল। জরাক্রান্ত অবস্থায় দুর্ঘটনার ফলে অচেনা শহরে যে দুর্ভোগের শিকার হলাম, তা বলার নয়। জ্বরের প্রকোপ নিয়েই হোটেল থেকে বের হয়ে থানার খোঁজ করলাম। সেখানে রিপোর্ট করলাম। পুলিশ অনেক সান্তনা দিল কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় পড়ে থেকেও কিছু করা গেল না। জ্বরের জন্য দোকান থেকে ওষুধ এনে খেলাম। জ্বর কিছুটা কমল। ফিরে আসার জন্য রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে ঘরে ফোন করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিপাত এবং ঢলের ফলে বাঙ্গালের লাইন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফোন কাজ করছিল না। ঝাঁসিগামী একটি গাড়ী প্রস্তুত ছিল টিকেট ছাড়াই ওতে চেপে বসলাম। রিজার্ভেশন ডাব্বায় টি.টি. টিকেট চেক করতে আসল। আমাদের জরিমানাসহ টিকেটের মূল্য দিতে চাপ দিতে লাগল। আমি আমার পরিচয় তুলে ধরে ঘটিত সমস্ত দুর্ঘটনা খুলে বললাম। তিনি নরম হলেন। বললেন, ঠিক আছে চিন্তা করবেন না।
ঝাঁসি থেকে সঙ্গে সঙ্গেই কাটিহারের গাড়ি পেয়ে যাবেন। আপনি ওটাতে উঠে যাবেন। আমার পরিচিত কোনো টি.টি-কেও পেয়ে যাবো, তাকে বলে দিলে তিনি বিনা টিকেটেই আপনাকে কাটিহার নিয়ে যাবেন। সেখানে গিয়ে আপনি কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেবেন। আমার প্রাণ ফিরে এল, যাক কাটিহার পর্যন্ত যাওয়ার তো ব্যবস্থা হল। ভূপাল থেকে রওয়ানা হতেই জ্বর আবার সওয়ার হল। জ্বরের তীব্রতায় শরীর কাঁপতে লাগল। কোনমতে ঝাঁসি পৌঁছলাম। কিন্তু আমার অবস্থা এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল, সামনে আর সফর করার উপযোগী ছিলাম না। বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, ঝাঁসির কোনো সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দরকার। ঝাঁসি স্টেশন থেকে স্থানীয় হাসপাতালের ঠিকানা জেনে নিলাম। কোনমতে অটোরিক্সা করে হাসপাতালে পৌঁছলাম। ডাক্তাররা বললেন, মস্তিষ্কের জ্বর হয়েছে। চিকিৎসায় বিলম্ব করলে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন। বললাম, আপনারা আমাকে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করে দিন। ঔষুধপত্রের জন্য টাকার প্রয়োজন হলে আমি বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করব।

দশদিন হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতালের ডাক্তাররা দয়া পরবশ হয়ে আমাদের খানার ব্যবস্থাও হাসপাতাল থেকে করে দিল। এই দিনগুলোতে আমার স্ত্রী তার নিজের বাড়িতে এবং আমাদের বাড়িতে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়নি। শরীর কিছুটা ভালো হয়ে উঠলে ডাক্তাররা আমাকে সফর করার অনুমতি দিয়ে দিল। আমরা স্টেশনে পৌঁছলাম। ঘটনাক্রমে সেই টি.টি যিনি আমাদের ভূপাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তার ট্রেনটি দু’ঘণ্টা লেট করে ফেলেছিল। আমি তাকে পরিচয় দিয়ে আমাদের কাটিহারের গাড়িতে তুলে দেয়ার অনুরোধ করলাম। তিনি তার সঙ্গীর খোঁজ করতে লাগলেন এবং পেয়েও গেলেন। ট্রেন দু’ঘণ্টা পর রওয়ানার কথা। তিনি আমাদের ট্রেনে তুলে দিলেন। পথে আবার আমার জ্বর আসল এবং অবস্থা আগের মত হয়ে গেল। অবিরাম কাঁপছিলাম। কত কষ্ট করে যে কটিহার পর্যন্ত পৌঁছেছি বলার নয়।

কাটিহার থেকে কোলকাতাগামী অনেকগুলো গাড়ি ছিল। টি.টির সঙ্গে কথা বললাম, কিন্তু কেউ আমাদের বিনা টিকেটে নিয়ে যেতে রাজী হল না। আমার পকেটে মাত্র তেরটি রূপী অবশিষ্ট ছিল। বাচ্চাগুলো রাত থেকেই অভুক্ত ছিল। ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদতে লাগল। আমি স্ত্রীকে তেরো রূপীর খানা কিনতে পাঠালাম। সে ডাল ভাত নিয়ে এল। স্ত্রী বাচ্চারা খেয়ে নিল। স্টেশনে বসে ফকীরের মত সারা সপ্তাহর ময়লা কাপড়ে তাদের ডাল ভাত খেতে দেখে আমার কান্না বাঁধ মানল না। আমার কান্নায় আমার মালিকের দয়া হল। আমাকে তিনি শুধু সেই পরীক্ষা আর বিপদ থেকেই উদ্ধার করলেন না, বরং মৃত্যুর পর দোযখ থেকে উদ্ধারেরও ব্যবস্থা করলেন।

আহমদ আওয়াহ: ডাল-ভাত খেতে দেখে কান্নার বদৌলতে-এর কী মর্ম?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: মর্ম তো অবশ্যই আছে। আমি প্লাটফর্মের যেখানে শুয়েছিলাম সামনেই আমার বাচ্চারা খানা খাচ্ছিল। জ্বরের প্রকোপে আমি কাঁপছিলাম। আমার গোটা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এমন সময় আমার সমস্ত অসুখের আরোগ্যকে মালিক আমার সামনে এনে বসিয়ে দিলেন। আপনার আব্বু মাওলানা কালীম সাহেব বিহারের এক সফর শেষে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। কাটিহার থেকে তিনি রাজধানী এক্সপ্রেস ধরবেন। গাড়ি চার ঘণ্টা লেট ছিল। যারা মাওলানা সাহেবকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন তাদের অন্য ট্রেনে ফিরতে হবে। এজন্য তিনি তাদের জোর করে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর নিজ গাড়ির অপেক্ষায় আমার সামনের বেঞ্চে এসে বসলেন। আমাকে কাতরাতে দেখে আমার নিকট এলেন। আমি তখন কাঁদছিলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে কাতরানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমার তখন বলার মত অবস্থা ছিল না। আমার স্ত্রী তাকে আমার দুঃখের কথা শোনাল। মাওলানা সাহেব আমাদের পেরেশানীর কথা শুনে তার সঙ্গীর নিকট সামানপত্র রেখে তিনি স্টেশন থেকে বের হয়ে গেলেন। নিজে দোকান থেকে ঔষুধ আনলেন আর সঙ্গীকে দিয়ে চা স্টল থেকে দুধ আনালেন। নিজে হাতে ঔষধ বের করে আমাকে দুধ আর ঔষধ খাওয়ালেন। আরো পাঁচদিনের ঔষুধ আমার হাতে দিলেন। একটু পরই কিছুটা আরাম বোধ করলাম। আমাকে বললেন, ভাই! আমার নিতান্তই লজ্জা করছে তবু বাধ্য হয়ে আপনাকে একটি অনুরোধ করছি। আপনি আমার রক্ত সম্পর্কীয় ভাই। আপনার জায়গায় আমারও এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। আপনি আমার থেকে দুই হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করুন। ঋণ এজন্য বললাম, আপনি সম্মানী মানুষ আপনার যেন খারাপ না লাগে। অন্যথায় দুই হাজার টাকা আপনাকে আমার উপহার দিতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ গ্রহণ করুন। বলার ভাষা নেই আমি কতটা আশ্চর্যজনক অবস্থায় ছিলাম। মনে হচ্ছিল, ইনি ঈশ্বর প্রেরিত কোনো দূত যিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে এমন স্বর্গীয় আচরণ করছেন। কত লোককে আমি নিজের দুরাবস্থার কথা শুনিয়েছি। কেবল ট্যাক্সিওয়ালাকে ভর্ৎসনা আর হায় হায় করা ছাড়া কোনো কিছুই তাদের মনে পড়ে নি। আর এই ভিনধর্মী মুসলমান কেমন সৌজন্য ও বিনয়ের সঙ্গে এতগুলো টাকা দিচ্ছে যে, মনে হচ্ছে নিজেই ভিক্ষা চাইছে। আমি তাকে বললাম, টাকা আমার এতোই প্রয়োজন যে, মানা করতে পারছি না। কিন্তু আপনি আগে আপনার ঠিকানা দিন যেন বাড়ি গিয়ে টাকাগুলো মানিঅর্ডার করতে পারি। মাওলানা সাহেব বললেন, আগে তো এগুলো নেবেন, তারপর না হয় ঠিকানা লিখে দেবো। তারপর সঙ্গীকে বললেন, মাস্টারজী! ইনাকে ঠিকানা লিখে দিন। তারপর তার কানে কানে কী যেন বললেন। সে উঠে চলে গেল। বাচ্চাদের জন্য আইসক্রীম আর কলা নিয়ে আসল। বাচ্চারা নিতে চাইল না। আমি বললাম, নাও বেটা! ইনিই তোমাদের আসল আংকেল। মাওলানা সাহেবকে আমি ঠিকানা লিখে দেয়ার কথা বলছিলাম আর তিনি টালবাহানা করছিলেন। এইতো দিচ্ছি, একটু সবুর করুন ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আমি যখন জোর দিলাম, বললেন, ভাই সাহেব! আপনি খোঁজ করলে পেয়ে যাবেন। আপনার এক রক্ত সম্পর্কীয় ভাইকে আপনি খুঁজে নিতে পারবেন না? ইতোমধ্যে গাড়ি এসে পড়ল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গী সেই টাকা থেকেই আমাদের জন্য টিকেট এনে দিয়ে ছিলেন। আমাদের তারা গাড়িতে তুলে দিলেন। আমি ঠিকানার কথা বললে মাওলানার সাথী মাস্টার জামশেদ সাহেব তাড়াতাড়ি একটি কিতাব বের করে বললেন, এটা মাওলানা সাহেবের লিখা কিতাব। এর নীচে হযরতের ঠিকানা দেয়া আছে।
দিনের বেলা রিজার্ভেশন ডাব্বা খালী পেয়ে আমরা বসে পড়লাম। ঠিকানা দেখার জন্য কিতাবটি বের করলাম। ওটার নাম ছিল ‘আপকী আমানত আপকী সেবা মেঁ’ কিতাবের শুরুতে ‘দু’টি কথা’ শিরোনামে মাওলানা ওয়াসি সাহেবের লেখা ছিল। সেখানে মাওলানা সাহেবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছিল। একটু আগেই আমি সেই ফেরেশতাসুলভ সেবককে দেখে এসেছিলাম। একেকটি শব্দ হৃদয়ে গেঁথে গেল। জ্বর থাকা সত্ত্বেও দুলতে দুলতে আমি পুরো বইটি পড়ে ফেললাম। তারপর স্ত্রীকে দিলাম। সে-ও একবারে পুরোটা পড়ে ফেলল। আমাকে বলতে লাগল, মাওলানা সাহেব কিতাবটি স্টেশনে দিলেই ভালো হতো। ঔষধের দ্বিতীয় ডোজটি নিলাম ট্রেনে বসে। ঔষধও জাদুর মতো ক্রিয়া করল।

কোলকাতা পৌঁছে মনে হল, আমি একেবারে সুস্থ হয়ে গেছি। আমি আর আমার স্ত্রী আপকী আমানতের প্রতিটি শব্দের শিকার হয়ে গেলাম। সত্য ও ভালোবাসার পয়গামের সামনে নিজেকে অসহায়রূপে আবিষ্কার করলাম। আমি কোলকাতা নেমে স্ত্রীকে বললাম, আমার শরীর বেশ ভালো হয়ে গেছে। মনে চাচ্ছে বাড়ি গিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে আজই মুজাফফর নগর চলে যাই এবং কিছু সময় মাওলানা সাহেবের সঙ্গে কাটিয়ে আসি। স্ত্রী বলল, ঔষুধ শেষ করে নিন তারপর তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। বাড়ি পৌঁছলাম। শরীর একেবারেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। স্ত্রী বলল, আগে টাকাগুলো মানিঅর্ডার করে দিন তারপর কয়েকদিন পর ছুটি নিয়ে দেখা করতে যাবেন। মানিঅর্ডারে ঠিকানা লেখার জন্য কিতাব খোঁজ করলাম কিন্তু না জানি শয়তানই কিতাবটি কোথায় লুকিয়ে ফেলল। দুই দিন ধরে আমরা তন্নতন্ন করে খোঁজ করলাম কিন্তু কিতাব আর খুঁজে পেলাম না।

আমার একথা মনে ছিল যে, মাওলানা সাহেবের নাম মুহাম্মদ কালীম। কিন্তু মুজাফফর নগরের পরিবর্তে মুজাফফরপুর মনে আসছিল। এক দুজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, মুজাফফর নগর ইউ.পিতে নয়, বিহারে। অস্থির অবস্থায় বিহার মুজাফফর পুরের টিকেট কাটলাম। একদিন পূর্বে ইউ.পির এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, ইউ.পিতে মুজাফফর পুর নামে কোনো জায়গা আছে? বলল, মুজাফফর পুর নয়, মুজাফফর নগর আছে। আমার মনে পড়ে গেল এটাই সঠিক ঠিকানা। সে আরও বলল, মুজাফফর নগরের সরাসরি কোনো গাড়ি নেই। আপনাকে দিল্লী অথবা সাহারানপুর যেতে হবে। সেখান থেকে মুজাফফর নগরের বাস অথবা ট্রেন পাবেন। আমি দিল্লীর রিজার্ভেশন করলাম। ২৭শে অক্টোবর প্রথমে দিল্লী তারপর দিল্লী থেকে মুজাফফর নগর পৌঁছলাম। স্টেশনে এক মিয়াজীকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মুজাফফর নগরের মাওলানা কালীম সাহেবকে চেনেন? বললেন, আপনাকে খাতুলী হয়ে ফুলাত যেতে হবে। স্টেশন থেকে বাস স্ট্যান্ড গেলাম। খাতুলীর বাসে উঠলাম। আমার পাশে এক তরুণ মৌলভী সাহেব বসে ছিলেন। পরিচয়ের পর জানতে পারলাম, তিনি ফুলাত মাদরাসায়ই থাকেন। রিজার্ভেশনের জন্য মুজাফফর নগর এসেছিলেন। তার নিকট থেকে জানতে পারলাম, মাওলানা সাহেব ফুলাত নেই পাঞ্জাব সফরে আছেন। তার সঙ্গে ফুলাত পৌঁছলাম। মাওলানা সাহেবের বাড়ি গিয়ে জানা গেল তিনি রাতেই ফিরবেন। অপেক্ষার স্বাদ আস্বাদন করলাম।
মাওলানা সাহেব রাত একটায় পৌঁছলেন। জেগেই ছিলাম। দেখা হল। সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললেন। আমাকে সুস্থ দেখে খুব খুশি হলেন এবং সকালে দেখা হবে বলে বাড়ি চলে গেলেন। পরদিন সকাল নয়টায় সাক্ষাত হল। আমি টাকাগুলো পেশ করলাম। মাওলানা সাহেব জোর করছিলেন, এগুলো উপহার হিসেবে গ্রহণ করুন, আমি আরও বেশী খুশী হবো। আপনি শুধু এই টাকা দেয়ার জন্য এত দীর্ঘ সফর করেছেন। বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন, আমি নিজেই গিয়ে নিয়ে আসতাম। তারপর হেসে দিয়ে বললেন, দেখুন আপনি খোঁজ করেছেন আর পেয়েও গিয়েছেন। ঠিকানা ছাড়াই খুঁজে পেয়েছেন। বললাম, আপনি কিভাবে জানলেন, আমি ঠিকানা অর্থাৎ, কিতাব হারিয়ে ফেলেছি? মাওলানা সাহেব বললেন, কোন্ কিতাব? আসলে আমি ঠিকানাই দিতে চাচ্ছিলাম না। বললাম, আপনার সঙ্গী গাড়ি চলতে চলতে ‘আপকী আমানত আপকী সেবা মেঁ” ধরিয়ে দিয়ে ছিলেন। আমরা সেটা পড়েছি। আর শিকারও হয়ে গিয়েছি। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে কিভাবে যেন ওটা হারিয়ে গিয়েছে। আমি পুরো ঘটনা খুলে বললাম। মাওলানা সাহেব অনেক খুশী হলেন। বললেন, আপকী আমানত পড়ে কী সিদ্ধান্ত নিলেন? বললাম, আপনার হয়েই এসেছি। আপনার যা ইচ্ছা করুন, বা ছেড়ে দিন। মাওলানা সাহেব বললেন, আমার হওয়ার দ্বারা কোনো কাজ হবে না, যিনি সৃষ্টি করেছেন তার হলেই কাজে আসবে। বললাম, এজন্যই তো আপনার নিকট এসেছি? মাওলানা সাহেব বললেন, কালিমা কি পড়ে নিয়েছেন? বললাম, কিতাবে তো পড়ে নিয়েছি আপনিও পড়িয়ে দিন। ২৯শে অক্টোবর সাড়ে নয়টায় মাওলানা সাহেব আমাকে কালিমা পড়িয়ে আমার নতুন নাম রাখলেন আব্দুল ওয়াহিদ।

মাওলানা সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ভাবীও কি কিতাবটি পড়েছে? বললাম, সে তিন তিনবার পড়েছে। মাওলানা সাহেব বললেন, তার ইচ্ছা কী? বললাম, আমি যা করেছি সে-ও আমার সঙ্গে আছে। তিনি কতগুলো কিতাব আনিয়ে আমাকে হাদিয়া দিলেন। একদিন সেখানে থেকে আমি কোলকাতা ফিরে আসি। মাওলানা সাহেবের পরামর্শক্রমে কোলকাতা মারকাযে যাই। সেখানে আলীগড়ের একটি জামাআত এসেছিল। তাদের সঙ্গে চল্লিশ দিন সময় কাটাই। এই চল্লিশ দিন আমার জন্য খুবই উপকারী হয়েছে। নামাযও পুরোপুরি শিখেছি আর জরুরী বিষয়াবলীও জানা হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার স্ত্রী-আহলিয়া সাহেবার কী হল?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: আলহামদুলিল্লাহ! ফুলাত থেকে গিয়ে আমি তাকে কালিমা পড়িয়েছি। সে খুবই খুশী হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর আপনার অনুভূতি কী?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: ইসলাম গ্রহণ করার খুশির কথা আপনাকে বোঝাতে পারবো না, কতটা আনন্দিত হয়েছি। এখন আমি সেই ট্যাক্সিওয়ালাকে দুআ দেই। সে যদি আমার মালপত্র লুট না করতো তাহলে আমার কী হতো? আমার আল্লাহর রহমতের প্রতি কুরবান হই, টাকা-কড়ি লুট করিয়ে আমার ঈমানের খাজানা ভরে দিয়েছেন। আমরা দুজন যখনই একত্রে বসি ব্যস, একথার ওপর শোকর আদায় করি, আল্লাহ আমাদের মালপত্র লুট করিয়েছেন আমাদের ঈমানের ধনে ধনী করার জন্য, কুফর শিরকের ব্যাধি থেকে সুস্থ রাখার জন্য। সত্যিই আহমদ ভাই! আল্লাহর রহমতের কি কেউ কোনো আন্দাজ করতে পারে?

আহমদ আওয়াহ: একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আব্বুর সহমর্মিতা ও আখলাক আপনাকে বেশী প্রভাবিত করে ঈমানের নিকটবর্তী করে দিয়েছে, নাকি আপকী আমানত ইসলামের হক্কানিয়ত?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: আহমদ ভাই! এমন বিপদের সময় অপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে মাওলানা সাহেবের এমন সহমর্মিতা আমাকে প্রভাবিত করেছে। এ সহমর্মিতাই আমার ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়েছে। সেই নিঃস্বার্থ সহমর্মিতার কারণে আমার হৃদয়ে মাওলানার সহমর্মিতার প্রতি আস্থা জন্মেছে। আর আমি আপকী আমানতকে আমার সহমর্মি ও হিতাকাক্সক্ষীর কল্যাণকামিতা মনে করে পড়েছি। ফলে ইসলামের সত্যতা, মানবচরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাওহীদ এবং ইসলামী মতাদর্শ আমার ইসলাম গ্রহণের মাধ্যম হয়েছে। সহমর্মিতা তো কত লোকেই করে। কিন্তু কে তার ধর্ম বদলায়? আমার হৃদয়ে একথা উদিত হয়েছে, ইসলামের সত্যতা মানুষকে ফেরেশতা বানিয়ে দেয়। কাজেই সেই ইসলামে আমারও অধিকার আছে।

আহমদ আওয়াহ: সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে কী করছেন?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: বর্তমানে ছেলেটি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে। একজন মাওলানা সাহেবকে তার টিউশনিতে লাগিয়ে দিয়েছি। বাচ্চা আর আমরা দুজন রোজ রাতে কুরআন মজীদ, দীনিয়াত এবং উর্দূ পড়ছি।

আহমদ আওয়াহ: পরিবারের লোকজন আপনাদের ইসলাম গ্রহণের বিরোধিতা করেনি?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: অনেক করেছে। কেউ যখন বিরোধিতা করতো আমরা তাকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে দিতাম। পুরো ঘটনা শুনে আমার চাচা যিনি সবচেয়ে বেশী নারাজ হয়েছিলেন, বললেন, বেটা তুমি অনেক ভালো কাজ করেছো কিতাবটি আমাকেও দিয়ো। তিনি দিনাজপুর (ইন্ডিয়া) স্টেশনে পোস্টেড। আমি তাকে আপকী আমানত পড়তে দেই। মাওলানা সাহেবের পরামর্শক্রমে সফর করে তার ওখানে যাই। রাত দুটো পর্যন্ত তাকে বুঝাতে থাকি। আলহামদুলিল্লাহ! রাত দুটোর সময় তিনি কালিমা পড়ে নেন। আলহামদুলিল্লাহ! আমার বংশের পঞ্চাশজন লোক মুসলমান হয়ে গিয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের জন্য কোনো পয়গাম?
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: আম্বিয়া কেরামের মতো নির্লোভ ও মহব্বতপূর্ণ হৃদয় থাকতে হবে। সেই সাথে ইসলামের মত সত্য সঙ্গে থাকলে কঠিন থেকে কঠিন মানুষও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় না নিয়ে পারবে না। এজন্য আমাদের মানবতার হক আদায় করতে হবে। অমুসলিমদের দাওয়াত দিতে হবে।

আহমদ আওয়াহ: শোকরিয়া মাস্টার সাহেব! অনেক অনেক শোকরিয়া। আসসালামু আলাইকুম।
মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ: শোকরিয়া তো আপনার প্রাপ্য, দীর্ঘ সময় ধরে আমার কথা শুনলেন। ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, নভেম্বর ২০০৬