মাস্টার মুহাম্মদ আসলাম (প্রমোদ কুমার)-এর সাক্ষাৎকার

আমার ভাইদেরকে শুধু এতোটুকু অনুরোধ করতে চাই যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের ভাষণে সকলকে এই ওসীয়ত করে গেছেন فليبلغ الشا هد الغائب দ্বীনের এ কথাগুলো অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দিবে। খতমে নবুওয়তের পর দাওয়াতের এ জিম্মাদারী ইসলামের এক মহান দায়িত্ব হিসেবে আমাদের উপর অর্পিত হয়েছে, এ কাজের প্রতি আমাদের উদাসীনতা ও মানুষের কাছে না পৌঁছানোর কারণে আমাদের হযরতের ভাষায় প্রতি মিনিটে ৩১৩ জন ভাই কুফর ও শিরকের উপর মৃত্যুবরণ করে চীরস্থায়ী জাহান্নামের উপযুক্ত হচ্ছে। এরা সকলেই আমাদের ভাই। তারা যদি অজ্ঞতার কারণে আমাদের সাথে দুশমনি করে এতেই তাদের পাওনা শেষ হয়ে যায় না। আমাদের উন্নতি ও মুক্তির একমাত্র উপায় হল দাওয়াতের মেহনত। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার দাবী এবং তাঁর দরদভরা এই ওসীয়ত ও শেষ আকুতিটুকুর প্রতি যেন আমরা খেয়াল রাখি। এ ব্যপারে অবহেলা করা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ।
মুহাম্মদ আসলাম: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিচয়?
মুহাম্মদ আসলাম: আমার নাম মুহাম্মদ আসলাম। দেওবন্দের নিকটবর্তী একটি গ্রামের অধিবাসী। আমার পূর্বনাম প্রমোদ কুমার। প্রসিদ্ধ জাট সম্প্রদায়ের লোক আমি। আজ হতে প্রায় সাড়ে সাত বছর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ আমি দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার খান্দান সম্পর্কে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ আসলাম: আমার তিন ভাই এক বোন। পিতামাতা এখনো জীবিত আছেন। আমার যখন ছয় বছর বয়স তখন তিনি সন্নাস গ্রহণ করেন। গঙ্গার পাড়ে তিনি একটি প্রসিদ্ধ আশ্রম চালাতেন। আমার পিতা হিন্দুধর্মের একজন বড় পন্ডিত ছিলেন তাছাড়া বংশের মধ্যে চাচা, জ্যাঠা ও বড় ভাইরাও ভাল জ্ঞান রাখেন। এককথায় আমাদের বংশটা নানা কারণে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল।

আহমদ আওয়াহ: আপনি বললেন, আপনার পিতা বড় পন্ডিত ছিলেন, তিনি কি এখনও আছেন?
মুহাম্মদ আসলাম: আলহামদুলিল্লাহ! এখন তো তিনি ইসলাম কবুল করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি শুনাবেন কি?
মুহাম্মদ আসলাম: ইসলাম মূলত স্বভাবগত একটি ধর্ম। যেমনটি আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যেমনিভাবে মানুষের পেটে ক্ষুধা-পিপাসা লাগে এবং খানা-পিনা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারেনা। তেমনিভাবে মানুষের অন্তরাত্মা দ্বীন ইসলাম ও তাওহীদে খালেসের সন্ধানে অস্থির থাকে। ছোটবেলা থেকেই এই চিন্তা করতাম, কিভাবে বিশ্বস্রষ্টা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। এ লক্ষ্যে অনেক ধর্মগুরুর সাথে কথা বলেছি কিন্তু এতমেনান হচ্ছিল না। ইতোমধে একজন হাফেজ সাহেবের সাথে যোগাযোগ হল, তাঁর সাথেও এ বিষয়ে কথা বললাম। তিনি আমাকে ইসলাম গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। তার এ পরামর্শ খুব ভাল লাগলো।

ইসলামে পবিত্রতার বিধান আমার কাছে সবচেয়ে বেশী পছন্দ লেগেছিল। আমার মনে হতো যে পেশাব- পায়খানার মত এমন গান্ধা বস্তু মানুষ যার পাশে দাঁড়াতেও ঘৃণা বোধ করে- যখন তা মানুষের কাপড়ে বা শরীরে লেগে যায় তখন তা থেকে পবিত্র হওয়ার উপায় কী? আর মালিক তো পবিত্র। নাপাকের সাথে তিনি কিভাবে মিলবেন? পাক-পবিত্রতার প্রতি আমার এই আগ্রহ ও অনুরাগের মাধ্যমেই আমার আল্লাহ আমাকে কুফর ও শিরকের নাপাকি থেকে পবিত্র করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করে আমি চিরধন্য হয়েছি। হাফেজ সাহেব আমাকে ফুলাতে হযরতের নিকট নিয়ে গেলেন। এরপর আল্লাহর রাস্তায় চার মাস সময় লাগালাম। তারপর অনেক মেহনত করে দ্বীন শিখলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে যমুনা নগর এলাকায় পাঠালেন। সেখানে আমি মাদরাসায় কোরআন শরীফ, তাজবীদ এবং দ্বীনের অন্যান্য জরুরী বিষয়াদী শিক্ষা করি এবং বাচ্চাদের শিখাই। তারপর দুবছর যাবত ফুলাতেই রয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর আপনাকে কোনো সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়েছিল?
মুহাম্মদ আসলাম: একজন মানুষ যখন নিজের সবকিছু ছেড়ে নতুন কোনো পরিবেশে যায় তখন কিছু পেরেশানী তো হবেই। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। আমার জন্য সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় ছিল মুসলমান ভাইদের নানাবিধ প্রশ্ন এবং মানুষের সাক্ষাৎ দেয়া। কিন্তু এতদসত্বেও আমি যে মূল্যবান ঈমানের সওদা করেছি তার তুলনায় এসব কোনো বিষয়ই ছিল না।

আহমদ আওয়াহ: শুনেছি আপনি একবার রাগ করে কোথাও চলে গিয়েছিলেন, তা কী কারণে পুনরায় ফিরে এলেন?
মুহাম্মদ আসলাম: নিজের অজ্ঞতা এবং কিছু লোকের উপর্যুপরি প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে গুড়গাঁও একটি খৃস্টান মিশনারীর কার্যালয়ে চলে গিয়েছিলাম। আমার ভুল এই ছিল, আমি মনে করেছিলাম, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এখন আমার সকল প্রয়োজন পুরা করা মুসলমানদের দায়িত্বে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইসলাম গ্রহণ করাকে মুসলমানদের উপর অনুগ্রহ মনে করেছিলাম। তবে আল্লাহর অনুগ্রহে আমার আক্বীদা ঠিক ছিল। যদিও বাহ্যত খৃষ্টান মিশনারীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেখানকার অবস্থা দেখেও আমার কাছে ইসলামের কদর বেড়ে গেল। বিশেষ করে আমার প্রতি মাওলানা সাহেবের আন্তরিক তাওয়াজ্জুহ আমাকে চম্বুকের ন্যায় আকর্ষণ করছিল। সর্বদাই সেখানে অস্থিরতা অনুভব করতাম। অনিচ্ছাকৃতভাবেই ফুলাত আসতে হল। খাতুলী এসে হযরতকে ফোন করলাম। তিনি ফুলাত ডেকে পাঠালেন। আমি পোশাক পাল্টিয়ে ফেলেছিলাম। আমার খুবই শরম লাগছিল। কিন্তু হযরত জামে মসজিদে ডেকে আমার সাথে কোলাকুলি করে খুব কাঁদলেন। আমাকে খুব বুঝালেন। দোযখের আগুনের ভয় অন্তরে বসিয়ে দিলেন। আমাকে বললেন, তোমার সবচেয়ে বড় ভুল হল ঈমান আনাকে তুমি মুসলমানের উপর অনুগ্রহ মনে করছো। হযরত বললেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ডুবন্ত বা অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধার করে তারপর সে উদ্ধারকারীকে বলে যেহেতু উদ্ধার করেছ অতএব, অন্ন-বস্ত্রসহ আমার যাবতীয় প্রয়োজন তোমাকেই পূরণ করতে হবে। তাহলে এটা তার কত বড় বোকামী হবে?
আলহামদুলিল্লাহ! আমার ভুল ভেঙ্গে গেল এবং সাথে সাথে সালাতুত তওবা পড়ে খালেছ দিলে তাওবা করে নিলাম।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করে আপনার কাছে কেমন লাগছে?
মুহাম্মদ আসলাম: আমি ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর শোকার আদায় করছি। যখনই আমার ঈমানের কথা মনে পড়ে তখনই আল্লাহর সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়তে মনে চায়। আমার আরো মনে হতো যে, যদি আল্লাহ আমাকে হেদায়েত না দিতেন। এবং হযরতের মুহাব্বতের কারণে যদি খৃস্টান মিশনারী থেকে বের করে না আনতেন আর এ অবস্থাতেই আমার মৃত্যু এসে যেতো তাহলে আমার কী করুণ পরিণতিই না হতো, আমি যথারীতি শিউরে উঠি যেমন এখন উঠছি।
الحمد لله الذى هدا انا لهذا وما كنا لنههتدى لو لا ان هدان الله

আহমদ আওয়াহ: আপনি বলেছিলেন যে আপনার পিতা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার ঘটনাটি কিছু বলুন।
মুহাম্মদ আসলাম: আমাদের হযরত আমাদের পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে, আমি তাকে পিতার সন্নাসব্রত গ্রহণ এবং তার আশ্রমের কথা তাকে জানালাম। তখন তিনি আমাকে তাঁর হেদায়েতের দুআ করতে বললেন। হযরতের অভিমত এই ছিল যে, নওমুসলিমদের দাওয়াতের কাজে না লাগালে পেরেশানীর কারণে এক সময় তাদের মুরতাদ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। মাওলানা সাহেব আমাকে তাঁর কাছে যেতে বললেন এবং সাথে মাওলানা ইমরান মুজাহেরীকে পাঠালেন। আমরা আশ্রমে পৌঁছলাম। আমার আব্বা চিনতে পারলেন কিন্তু পরিবেশের কারণে প্রকাশ করলেন না। আমরা তার গুরুর রেফারেন্স দিলাম ফলে তিনি এই বাহানায় অনেক আদর যত্ম করলেন। ফেরার সময় দুজনকে কিছু রুপি দিলেন। পরবর্তীতে আসার আবেদনও করলেন। আমরা ফুলাত ফিরে আসলে হযরত কারগুজারী শুনলেন এবং আফসোস করে বললেন, তোমরা দাওয়াত কেন দিলেনা? পুনরায় তাদের কাছে গিয়ে ফুলাত আসার দাওয়াত দিয়ে এসো।

আমরা আবার তার ওখানে গেলাম। দাওয়াত দেওয়ার তো হিম্মত হল না। শুধু মাত্র ফুলাত আসার ওয়াদা নিলাম এবং হযরতের কিতাব আপনার আমানত নামক বইটি হাদিয়া দিয়ে ফিরে এলাম। তারা এক সপ্তাহ পর আসবেন বলে কথা দিলেন। এক সপ্তাহ পরে তাকে আনতে গেলাম। পরিবেশের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য প্রথমে চাচাকে মাদরাসায় নিয়ে গেলাম। দুই দিন পর ফুলাত পৌছুলাম। তিনি হযরতের আপনার আমানত নামক বইটি পড়ে খুবই প্রভাবিত হয়েছেন। হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। রাত ১টায় হযরত সফর থেকে ফিরে এলেন। সকাল ৮টার সময় হযতের সাথে সাক্ষাত হল।

হযরত আমার আব্বাকে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন। এরপর নির্জনে বসে কথা বললেন, কিছুক্ষণ পর সুসংবাদ পেলাম, আমার পিতা কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেছেন। লোকেরা বিস্তারিত জানতে চাইলে হযরত বললেন, আমি প্রথমে দুই রাকাআত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে দুআ করি। এরপর তাকে বললাম, আপনি মাস্টার আসলামের পিতা হওয়ার কারণে আমারও পিতার মতই। আমি যদি জানতে পারি, আপনি আনমনে কোনো এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন যেখানে অগ্নিকুওন্ড জ্বলছিল। আপনি তাতে যে কোনো সময় পতিত হয়ে অগ্নিদগ্ধ হতে পারেন। তাহলে আমার অবস্থা কী হবে? তিনি বললেন- আপনি দুশ্চিন্তায় থাকবেন। তখন আমি বললাম, আমার যখন এ ব্যাপারে একীন রয়েছে যে ঈমান ছাড়া পরকালে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় আর হঠাৎ কখন মৃত্যু চলে আসে বলা যায় না- তখন আমার কী অবস্থা হবে? তিনি বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই তখন আপনার অনেক কষ্ট হবে। আমি বললাম এবার চাইলে আপনি ঈমান গ্রহণ করে আমাকে প্রশান্তি দিন অথবা এভাবেই অস্থিরতার মাঝে রেখে দিন। তিনি বললেন, এটা হতে পারে না, আমি তো আপনার আমানত বইটি পড়ে ঈমান আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বারবারই আমার মনে একথা আসছিল যে, আপনার কিতাব পড়েই যখন এত আনন্দ পেলাম তাহলে সাক্ষাতে না জানি কতো স্বাদ রয়েছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, নিশ্চয় তিনি এমন এক মহাত্মা যাঁকে ঈশ্বর বিশ্ববাসীকে উদ্ধার করার জন্য প্রেরণ করেছেন।
এখন দুটি পথ সামনে। হয়তো আমাকে মুসলমান বানিয়ে দিবেন। তারপর আমিও মসজিদে বসে আল্লাহ আল্লাহ করবো। অথবা আমার সাথে অনেক লোক রয়েছে যারা এই উদ্দেশ্যে আমার অনুসরণ করছে যে তাদের আমি শান্তির পথ দেখাবো তাদেরও হক রয়েছে। অতএব, আমি মুসলমান হয়ে যাবো তবে এখনই তা প্রকাশ করবো না। ওখানে গিয়ে আমার অনুসারীদের বলবো যে, গঙ্গার তীরে আমাদের স্বাস্থ্য ভাল থাকছে না এখন আমরা পাহাড়ের পাদদেশে সুন্দর আলো বাতাস ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে আশ্রম বানাবো। এই বলে তাদেরও সাথে করে নিয়ে আসবো আর আপনি তাদের সত্যের পথ দেখাবেন। এখন আপনি যা বলবেন তাই হবে। আমি তাকে বললাম, শেষ প্রস্তাবটি সবচেয়ে উত্তম আপনি প্রথমে কালিমা পড়ে নিন। তিনি কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। তারপর তার নতুন নাম রাখা হল আব্দুল্লাহ।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হল?
মুহাম্মদ আসলাম: তিনি হযরতের খুব অনুরাগী হয়ে পড়লেন। তাঁকে বারবার জড়িয়ে ধরতেন। তিনি হযরতকে বললেন, আমি কোরআন শরীফ পড়া শিখতে চাই। আমাকে হিন্দী ভাষার কুরআনের কপি দিন। আমি ইতিপূর্বেও কোরআন পড়েছিলাম কিন্তু তখন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবে পড়েছি। এখন এজন্য পড়তে চাই যে আমার মালিক আমার কাছে কী চান। এরপর তিনি আশ্রমে চলে যান এবং অনুসারীদের নিয়ে সেখানে যমুনা নগর মাদরাসায় কিছুদিন অবস্থান করেন। তার দুই শিষ্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল। একজনের কথা তো কী বলবো! সে সাঢুয়ায় এক হিন্দু নাপিতের কাছে মাথার জটা চুল কাটানোর জন্য গিয়েছিল। নাপিত তাকে জিজ্ঞাসা করলো তোমার চুলে কী উকুন হয়েছে? সে উত্তর দিল, না। নাপিত জিজ্ঞাসা করলো তাহলে চুল কাটাচ্ছো কেন? সে নিঃসংকোচে বলে দিল আমি মুসলমান হয়েছি। তাই শিরক ও কুফরের সকল নোংরামীকে ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছি।
আফসোস! আমার পিতার জন্য এখনো কোনো ব্যবস্থা হলনা। তবে الحمد لله তিনি যথেষ্ট মজবুত। কুরআন পড়ছেন এবং জিকির করছেন।

আহমদ আওয়াহ: جزاكم الله আপনি আপনার খান্দানের জন্য কাজ করেছেন। তার কোনো ভাল ফলাফল দেখা যাচ্ছে?
মুহাম্মদ আসলাম: আমার হযরত এ বিষয়ে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। প্রথমদিকে আমাকে ঘরের লোকেরা ঘৃণা করতো। কিন্তু আমি তাদের হেদায়েতের জন্য দিল থেকে দুআ করলাম এবং সহমর্মিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে দাওয়াতের নিয়ত করলাম তখন অবস্থা পাল্টে গেল। আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করলেন। দায়ীর সাথে আল্লাহর মদদ থাকে এবং আল্লাহ রাস্তা খুলে দেন। এখন সকল আত্মীয়-স্বজনের সাথেই যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ হয়। তারা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করেন, মনযোগসহ কথা শোনেন বরং এখানকার বিশ্বাস নিয়েই মিলিত হন। দুনিয়াবী কোনো সমস্যায় পড়লে দুআ কামনা করেন। আমি হযরতের ‘আপনার আপমী’ নামক বইটি তাদের দিয়েছি। কিছু লোক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছেন। ইনশাআল্লাহ আমি আশাবাদী তাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করবে। তাদের অনেকেই বড় শিক্ষিত এবং উচ্চপদস্থ।

আহমদ আওয়াহ: আপনি ফুলাতে দিনরাত মসজিদ আর দাওয়াত নিয়েই পড়ে থাকেন। আপনার মাঝে এ প্রেরণা সৃষ্টি হল কিভাবে?
মুহাম্মদ আসলাম: আমার প্রতি হযরতের সুদৃষ্টি। তিনি আমাদের অন্তরে একথা বদ্ধমূল করে দিয়েছেন যে, একজন মুসলমানের জীবনের লক্ষ্যই হল দাওয়াত ও দ্বীনের মেহনত। আয়-উপার্জন ও অন্যান্য কাজগুলো জীবনের প্রয়োজনাদীর অন্তর্ভুক্ত। আমার মনে চায় বুজুর্গদের আবাসভূমি ফুলাত একটি ইসলামী আবাসে পরিণত হোক। যেন মানুষ এখানে এসে ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে এবং ইসলাম গ্রহণ করতে পারে।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
মুহাম্মদ আসলাম: আমি অধম আর কী বলবো, আমার ভাইদের শুধু এতোটুকু অনুরোধ করতে চাই যে, প্রিয়নবী (সাঃ) বিদায় হজের ভাষণে সকলকে এই ওসীয়ত করে গেছেন فليبلغ الشا هد الغائب দ্বীনের এ কথাগুলো অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দিবে। খতমে নবুওয়তের পর দাওয়াতের এ জিম্মাদারী ইসলামের এক মহান দায়িত্ব হিসেবে আমাদের উপর অর্পিত হয়েছে, এ কাজের প্রতি আমাদের উদাসীনতা ও মানুষের কাছে না পৌঁছানোর কারণে আমাদের হযরতের ভাষায় প্রতি মিনিটে ৩১৩ জন ভাই কুফর ও শিরকের উপর মৃত্যুবরণ করে চীরস্থায়ী জাহান্নামের উপযুক্ত হচ্ছে। এরা সকলেই আমাদের ভাই। তারা যদি অজ্ঞতার কারণে আমাদের সাথে দুশমনি করে এতেই তাদের পাওনা শেষ হয়ে যায় না। আমাদের উন্নতি ও মুক্তির একমাত্র উপায় হল দাওয়াতের মেহনত। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার দাবী এবং তাঁর দরদভরা এই ওসীয়ত ও শেষ আকুতিটুকুর প্রতি যেন আমরা খেয়াল রাখি। এ ব্যপারে অবহেলা করা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।
দ্বিতীয় আবেদন হল এই যে, মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তার বসবাসের জন্য একটি সমাজের প্রয়োজন। একজন নওমুসলিম ইসলাম কবুল করার পর তাকে হিজরত করে নিজের ঘর-বাড়ী সবকিছুই বিসর্জন দিতে হয়।
এই মুহূর্তে তার একটু আশ্রয় ও সহমর্মিতার বড় প্রয়োজন হয়।

প্রত্যেক নওমুসলিমের নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রয়োজন। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু চাঁদা তুলে সদকা খয়রাত দিয়ে তাদেরকে ভিখারী বানানো বা তাদের দিল বিগড়ানো উচিৎ নয় বরং যদি একজন মুসলমান ভাই মদিনার ভ্রাতৃত্তের নমুনা হয়ে একজন মুহাজির ভাইয়ের দায়িত্ব নিজের উপর নিয়ে নেয়; তাকে ঋণ দিয়ে বা পরিবারের সদস্য হিসেবে শরীক করে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন তাহলে পারিবারিক দাওয়াত দেয়া সহজ হয়ে যায়। এতে তাদের শান্ত¡নাও লাভ হবে। এজন্য কিছু দিন আমদের হযরতের কাছে গিয়ে মায়া-মুহাব্বত শিক্ষা করা উচিৎ।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মুহাম্মদ আসলাম: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ফেব্রুয়ারী- ২০০৩