মুহাম্মদ আকবর (মহেশচন্দ্র শর্মা)-এর সাক্ষাৎকার

আমাদের মুসলমান ভাইগণ আমার মতো অসহায়দের প্রতি একটু করুণাপ্রবণ হোন। কত মানুষ পথ জানা না থাকার দরুন জাহান্নামে যাচ্ছেÑ একটু তাদের কথা ভাবুন। প্রসঙ্গত নওমুসলিম ভাইদের সম্পর্কে আমি একটি কথা বলবো। তাদের দুরাবস্থার কথা আমাদের ভাবতে হবে। তাদের অন্যের উপর নির্ভরশীল না রেখে কিভাবে স্বনির্ভর করে তোলা যায় সেটা ভাবতে হবে। তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ এবং একমাত্র আল্লাহর প্রতি মুখোপেক্ষিতার চরিত্র কিভাবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে জোর দিতে হবে। সকল খোদা থেকে বেরিয়ে এসে একমাত্র মালিকের উপর ঈমান আনার পর দুনিয়ার কারও সামনে হাত পাতা কী করে সম্ভব? অনেকেই অসহায় নওমুসলিমদের দান সদকা করে তাদের অভ্যাসটাই বিকৃত করে ফেলেন। তাদের আত্মা নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি মনে করি, তাদের সহযোগিতা করা কর্তব্য। সেই সাথে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলাও আমাদের কর্তব্য। তাদের পরনির্ভরশীল করে রাখা এটা তাদের জন্যও একটা আত্মঘাতী বিষয়।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আকবর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের জন্য ও সাধারণ মুসলমানদের উপকারার্থে আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।
মুহাম্মদ আকবর: অবশ্যই বলুন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বংশগত পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলবেন?
মুহাম্মদ আকবর: আলহামদুলিল্লাহ! এখন আমার নাম মুহাম্মদ আকবর, কর্নাল জেলার একটি গ্রামে আমার জন্ম। (সামান্য থেমে) এখন থেকে নয় বছর তিন মাস আট দিন তিন ঘন্টা আগে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ইসলামের দৌলত দান করেছেন। আমি ব্রা‏হ্মণ খান্দানে জন্মেছি। আমার পিতা আমার নাম রেখেছিলেন মহেশচন্দ্র শর্মা। আমার পিতার নাম পন্ডিত সুন্দর লাল শর্মাজী। তিনি আমাদের অঞ্চলের বিখ্যাত পন্ডিত ছিলেন। কুষ্ঠি তৈরি করা এবং বিভিন্ন ধার্মিক রেওয়াজ সম্পাদন করাই ছিল তার কাজ। আমার ইসলাম গ্রহণের এক বছর আগে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমার মা আছেন ও একটি বোন আছেন। বর্তমানে আলহামদুলিল্লাহ তারা উভয়ে মুসলমান। বোনের নাম ফাতেমা ও মায়ের নাম আমেনা। তারা আমার সাথেই থাকেন। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে আমরা বেশ সুখেই আছি এবং দিল্লীতেই আছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বয়স কত?
মুহাম্মদ আকবর: আমার প্রকৃত বয়স তো নয় বছর আট দিন তিন ঘন্টা এবং পনের মিনিট। তবে আমি আমার পিতা-মাতার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে এসেছি এখন থেকে প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে, ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কিছু বলুন!
মুহাম্মদ আকবর: আমি তখন স্কুলের ছাত্র। আমার আব্বুর কাছে পৃথিবীর সব পেশা ধোকাবাজি মনে হতো। ফলে তিনি বাধ্য হয়েই আমাদের বাড়ির পাশে একটি ছোট্ট মন্দির তৈরি করেন। আমার মনে যখনই কোনো প্রশ্ন জাগতো আমি আমার আব্বুর নিকট জানতে চাইতাম। তিনি আমাকে তার উত্তর বুঝিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে বলতেন, বেটা! আসলে পেট পালতে হয়। নইলে এই অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে আর এমন কী আছে! মূলত পিতাজীর একথা শোনার পর ধর্মের প্রতি আমার আস্থা কমে যায়। ছোটবেলা থেকেই আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠায় অভ্যস্ত ছিলাম। পরিবারের রেওয়াজ অনুযায়ী সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে মন্দিরে পূজা দিতাম।

আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। যেদিন পরীক্ষা শুরু হবে সেদিনের কথা। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করলাম। ভাবলাম, আজ ভগবান মহারাজ মূর্তির কাছে পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন চেয়ে প্রার্থনা করবো। চলে গেলাম মন্দিরে। সেখানে গিয়ে দেখি একটি কুকুর পূজারীদের দেয়া মিষ্টি খেয়ে জিহ্বা চাটছে। আমি থেমে গেলাম। দেখি এই কুকুর কী করে! এখন ভাবি আল্লাহ তায়ালাই হয়তো আমার মনে এ কথা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন, তোমাকে সত্য বুঝতে হবে। আর সেজন্য দেখ এই মূর্তিশালায় কী তামাশা হচ্ছে! আমি দেখলাম প্রসাদ খেয়ে কুকুর তার জিহ্বা দিয়ে ভগবানের মুখ চাটছে। ভাবতে লাগলাম, এই মূর্তি তার মুখটাকে পর্যন্ত কুকুর থেকে বাঁচাতে পারছে না! কিন্তু আমার খান্দানী বিশ্বাস সাথেসাথে আমাকে এ কথা ভাবতে বাধ্য করলো, বোকা কোথাকার! এই কুকুরও পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসে ভগবানের কৃপা সন্ধানে সেবা দিচ্ছে। জিহ্বা দিয়ে ভগবানের মুখ চাটছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আমার সমস্ত আস্থা ধূলোর সাথে মিশে গেল দেখলাম, কুকুরটি প্রসাদ খাওয়া শেষ করার পর একটা পা উঁচু করে একেবারে ভগবানের উপর প্রস্রাব করে দিল। সেই প্রস্রাব মাটি থেকে সোজা ভগবানের মুখ স্পর্শ করলো। আমি আর মন্দিরে ঢুকলাম না। পূজা রেখে ফিরে এলাম। আমি আমার ঘরে এসে চোখ বন্ধ করে একক ও অদ্বিতীয় মালিককে স্মরণ করলাম এবং মনেমনে বলতে লাগলাম, হে মালিক! এই মূর্তি যখন নিজেকেই কুকুরের প্রস্রাব থেকে রক্ষা করতে পারছে না তখন আমাকে কিভাবে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেবে? মালিক তুমি আমার প্রতি করুণা করো। তারপর থেকে আমি মন্দিরে যাওয়া ছেড়ে দিই। প্রতিদিন সকালে চোখ বন্ধ করে একক মালিকের কাছে প্রার্থনা করি। আমার পরীক্ষাও ভালো হতে থাকে। একসময় পরীক্ষা শেষ হলো। এবার ফলাফল প্রকাশের পালা। যেদিন পরীক্ষার ফল বের হলো একটা পত্রিকা কিনে আনলাম। দেখলাম আমি ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। মনে মনে মালিককে ধন্যবাদ দিলাম।

আমি যখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ি হঠাৎ একদিন আমার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার পেটে ব্যথা হচ্ছিল। মা আমাকে জোর করে মন্দিরে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, মন্দিরে গিয়ে পিতার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করে এসো। আমি বারবার না করছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, এভাবে বলতে হয় না, ভগবান নারাজ হবেন। শেষে আমি মন্দিরে গিয়ে খুব করে প্রার্থনা করলাম। শিবজীর চরণে মাথা রেখে এক ঘন্টা পর্যন্ত বিলাপ করে কাঁদলাম। আমি আমার পিতাকে খুব ভালোবাসতাম। বারবার আমি বলছিলাম, আমার পিতাজীকে সুস্থ করে দিন। প্রায় এক ঘন্টা পর ঘরে ফিরে এলাম। আমার মন বলছিল নিশ্চয়ই আমার পিতাজী এতোক্ষণ সুস্থ হয়ে গেছেন। ঘরে এসে দেখলাম, পিতাজী মারা গেছেন।
এ ঘটনাটায় আমি নিদারুণভাবে আহত হলাম। আমি ভাবছিলাম আমার বিবেক কোথায় চলে গিয়েছিল। আমি কেন মন্দিরে গেলাম। যেখানে আমি কুকুরকে ভগবানের মুখ চাটতে দেখেছি। সে ভগবান কিভাবে আমার পিতাজীকে সুস্থ করবে? আমি কেন আমার একক মালিকের কাছে প্রার্থনা করলাম না?

সত্যি বলতে কী, এর পর থেকে আমার ধর্মের প্রতি আস্থা পরিপূর্ণভাবে উঠে যায়। আমি তখন মনে মনে কোনো একটা পথ খুঁজতে থাকি। একসময় আমি চার্চে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি হযরত ঈসা আ.-এর মূর্তি। তখন আমার এক বন্ধু আমাকে বললো, এখানে মাদরাসা-মসজিদে একজন ধর্মগুরু মাঝেমাঝে আসেন। তাঁর নাম মাওলানা কালিম সিদ্দীকি। আগামীকাল সকাল দশটায় তিনি এখানে আসবেন। তার কথা শুনে আমি মনে মনে প্রস্তুত হলাম। সকাল আটটার সময় আমি সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। দশটা বেজে গেল তবুও তিনি এলেন না। তিনি এলেন বেলা এগারটায়। আশপাশের মুসলমানরা মসজিদে আগে থেকে বসা ছিলেন। মাওলানা সাহেব সোজা মসজিদে চলে এলেন। প্রথমেই তিনি রাস্তায় গাড়ির সমস্যার কারণে বিলম্ব হওয়ায় সকলের কাছে ক্ষমা চাইলেন। তার এই কথায় আমি বেশ প্রভাবিত হলাম। তারপর তিনি আলোচনা করলেন। তার আলোচনার বিষয় ছিল, কোনো মানুষের প্রতি কেউ যদি উপকার করে তবে সারা জীবন সে তার গুণ গায়। সে তাকে নারাজ করতে চায় না। অথচ আমাদের প্রতি আমাদের প্রতিপালকের কত অসংখ্য অনুগ্রহ। তাই মানুষ হিসেবে তাঁকে খুশি রাখার চিন্তা করা আমাদের কর্তব্য। আলোচনা শেষ হওয়ার পর চা পান করার জন্য তিনি উপরের মাদ্রাসায় গেলেন। আমি তার সাথে দেখা করে পিতাজীর ইন্তেকালের কথা তাকে জানালাম। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পাশে বসিয়ে চা খাওয়ালেন। বললেন, আপনার মালিক আপনাকে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন বলেই আপনাকে পথ দেখাতে চান। হয়তো এ কারণেই এ অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন।

তারপর তিনি আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বললেন। আপকি আমানত পুস্তিকাটি আমাকে দিলেন। এ-ও বললেন, খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কারণ, আপনার পিতাজী যেভাবে হঠাৎ চলে গেছেন ঠিক সেভাবে আমি আপনি যে কেউ চলে যেতে পারি। মৃত্যুর পর আমাদের জন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না। যে নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেছে সেটা আর ফিরে আসার নয়। আমাদের জীবনের এক মিনিটের ভরসা নেই। তিনি আরও বলেন, আমার অনুরোধ হলো আপনি এখনই কালেমা পড়ে নিন। আমি বললাম বইটি পড়ে নিই। তিনি অনুমতি দিলেন। আমি বাইরে এসে বইটি পড়ে ফেললাম। ৩২ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র একটি পুস্তিকা। অল্প সময়ে পড়ে ফেললাম। আমার সামনে থেকে সবগুলো পর্দা সরে গেল। ১৯৯৪ সালের ৯ মে ১২টায় আমি কালেমা পড়েছি। মাওলানা আমার নাম রাখলেন মুহাম্মদ আকবর। তিনি আমাকে জোর দিয়ে বললেন, মুসলমান হওয়ার কথা এখনই প্রকাশ করবেন না। এখানকার ইমাম সাহেবের কাছে নামায শিখে নেবেন। গোপনে গোপনে নামায আদায় করতে শুরু করে দিন।
আর আপনি চাইলেও ঈমান লুকিয়ে রাখতে পারবেন না। সত্য কখনও চেপে রাখা যায় না। তবে আজকাল রাষ্ট্রের পরিবেশ ভালো না। আপনার ঈমান প্রকাশ পেয়ে গেলে আত্মীয়-স্বজন শত্র“ হয়ে যাবে।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো? আপনার মা-বোন কি মুসলমান হলো?
মুহাম্মদ আকবর: আমি চুপে চুপে ইসলাম সম্পর্কে পড়া-শোনা করতে লাগলাম। এর মধ্যে নামাযও শিখে নিলাম। আমার পিতাজী অমুসলিম অবস্থায় মারা গেছেন একথা আমাকে সবসময় ভাবাতো। তিনি আমার খুবই প্রিয় মানুষ ছিলেন। আমি বারবার ভাবতাম, এই মুসলমান সমাজ যদি আরো আগে আমাকে ইসলামের কথা বলতো। আমি যদি আমার পিতাজি বেঁচে থাকতে মুসলমান হতে পারতাম তাহলে পায়ে ধরে হলেও আমার পিতাজীকে আমি মুসলমান বানাতাম। আমার ভেতরে দুর্ভাবনার সৃষ্টি হলো। আবার কখন আমার মা, আমার বোন এভাবে ঈমান ছাড়া দুনিয়া থেকে চলে যায়। আমি একটি দোকানে চাকরি নিলাম। যেদিন প্রথম বেতন পেলাম বেতনের টাকায় আমার মা-বোনের জন্য কাপড়-চোপড় এবং মিষ্টি কিনে নিয়ে গেলাম। তারা খুবই খুশি হলো। সুযোগ বুঝে আমি তাদের সামনে মুসলমান হওয়ার ঘটনা বললাম। সেই সাথে তাদেরও মুসলমান হওয়ার আবেদন জানালাম। কেঁদে কেঁদে অনুনয় বিনয় করে বলতে লাগলাম। আমার কথায় মা ও বোন ক্ষেপে গেল। কেনা কাপড় আমার মুখের উপর ছুঁড়ে মারলো। মিষ্টির প্যাকেট বাইরে ছুঁড়ে ফেললো। আমি ধর্মহারা হয়ে পড়েছি বলে তারাও খুব কাঁদলো। মা আমাকে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলো।

আমি যখন কোনভাবেই রাজি হচ্ছিলাম না তখন আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তারা আমার সাথে কথা বলেনি। আমার উপার্জন থেকে কিছু খায়নি। এমনকি আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমি একটি আলাদা কামরা ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতে লাগলাম। আল্লাহ তায়ালার কাছে মা-বোনের হেদায়েত চেয়ে দুআ করতে থাকি। তবে তারা অন্য কারও কাছে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেনি। যে ঘরটায় আমি থাকতাম তার পাশেই একটি মন্দির ছিল। আমি দেখতাম প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা মানুষ সেখানে এসে মাথানত করে আছে। এই দৃশ্যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। একটি হাতুড়ি নিয়ে একেবারে ভোর বেলা গিয়ে সেই মন্দিরে মূর্তির মাথা ভেঙ্গে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমি যখন সত্যর উপর আছি তখন আর কতদিন এভাবে মাথা নিচু করে থাকবো? এরা প্রকাশ্যে শিরক করবে আর আমরা মালিকের দুনিয়াতে থেকে আমাদের অন্তরের সত্যকে গোপন করবো? এভাবে বেঁচে থাকার চে’ মরে যাওয়া ভালো। আর এ আবেগেই লাল রঙ্গের পেন্সিল পেয়ে মাথা ভাঙ্গা মূর্তির বুকে আমার নাম লিখে দিলাম। মুহাম্মদ আকবর। পুত্র – পন্ডিত সুন্দর লাল শর্মা (মহেশচন্দ্র শর্মা)। সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো এলাকায় একটা হইচই পড়ে গেল। কে এই মুহাম্মদ আকবর। পিতাজীর নাম ধরে তারা চলে গেল আমাদের ঘরে। আমার মা পরিষ্কার জানিয়ে দিল, অনেক দিন আগেই আমি ওকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছি। মানুষ তখন আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু লোক আমাকে ধরে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিল। পুলিশ আমাকে খুব মারধর করলো। সত্যের জন্য আগে থেকেই আমি মরতে প্রস্তুত ছিলাম। ফলে এই মার আমাকে আমার ঈমানের উপর আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। আমার ঈমানী আবেগ তখন শতগুণে বলীয়ান। কে যেন আমার মাকে গিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তোমার ছেলেকে থানায় মারা হচ্ছে। মায়ের মমতাময়ী হৃদয় স্থির থাকতে পারেনি। আমার বোনসহ মা ছুটে এসেছেন থানায়। পুলিশ তখন আমাকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল। বললো, আমার ছেলে মুসলমান হয়েছে বলে মারছো? যাও আমিও মুসলমান। আমার মায়ের কথায় আমার আনন্দের সীমা রইলো না। আমি এ প্রহৃত অবস্থায়ই মাকে বলতে লাগলাম, মা কালেমা পড়ে নাও। আমার মা এবং বোন উভয়েই কালেমা পড়ে নিল।
এই দৃশ্য দেখে পুলিশের লোকেরাও স্তম্ভিত হয়ে গেল। আমার আল্লাহ ঐ মুহূর্তেই কুদরতের আরেকটি কারিশমা দেখালেন। ক্রমশ বিজেপি এম এল এ সহ সর্বমহলেই ছড়িয়ে পড়েছে, এক অধার্মিক মূর্তির সাথে এই আচরণ করেছে। তারপর সে ধরা পড়েছে এবং এখন তাকে থানায় পেটানো হচ্ছে। সংবাদ শুনে এক বিজেপি এম এল এ ছুটে এল। থানায় সে কোতয়ালকে এই বলে ধমক দিল, তাকে যদি আর মারা হয় তাহলে কিন্তু ভালো হবে না। এটা তার বিশ্বাস। এটা তার আস্থা। ভারতে প্রতিটি নাগরিক স্বাধীন। যার যা খুশি সে সেই ধর্ম মানতে পারে। আমাকে বলল বেটা! তোমার যে ধর্ম ইচ্ছা পালন করো, কিন্তু পরধর্মের কাউকে আঘাত করো না। তোমার ইসলাম কি এই শিক্ষা দেয় না? তারপর তিনি আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। আমার মা এবং বোন মুসলমান হওয়ায় আমি তখন এতোটাই আনন্দিত ছিলাম যার তুলনায় এভাবে শতবার মার খাওয়াও তুচ্ছ ব্যাপার। আমি আনন্দে আমার মায়ের গলা ধরে কাঁদছিলাম। হাফেয সাহেবের সাথে কথা বলে আমি আমার মায়ের নাম রাখলাম আমেনা আর বোনের নাম রাখলাম ফাতেমা।

আহমদ আওয়াহ: তারপর দিল্লী চলে গেলেন কেন?
মুহাম্মদ আকবর: আসলে আমার কারণে শহরের অবস্থা বেশ গরম হয়ে পড়েছিল। সেখানে এমনিতেই মুসলমানদের অবস্থা খানিকটা দুর্বল। মূলত ১৯৪৭ এর পরে পুরো হারিয়ানা অঞ্চল উজাড় হয়ে গিয়েছিল। এক সময় এখানেও মুসলমানরা হিন্দুর মতোই বসবাস করতো। তাদের নামও হতো হিন্দুদের মতোই। আমাদের মসজিদ কমিটির একজনের নাম ধর্মা আরেকজনের নাম অনুপ সিং। সবাই মিলে পরামর্শ দিলো এখন তোমাদের এখানে থাকা ঠিক হবে না। তাছাড়া হযরত মাওলানাও বললেন, এখন এখানে না থাকাই ভালো হবে। এদিকে আমি কারও দয়ায় বেঁচে থাকবো এটাও ভালো লাগছিল না। আমি কখনও আমার পিতাজীর কাছেও কিছু চাইতাম না। আমি আমার মনের কথা হযরত মাওলানাকে বললাম। তিনি আমাকে একটি স্কুলে হিন্দী শিক্ষক হিসেবে ফরিদাবাদ পাঠিয়ে দিলেন। আমি মনে মনে অঙ্গীকার করে রেখেছিলাম যে, সকল মূর্তি পূঁজার সকল ভগবান ছেড়ে যখন এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস এনেছি তখন একমাত্র তাকে ছাড়া আর কারও কাছে কিছু চাইবো না। কারও কাছে হাত পাতবো না। আমার আল্লাহ বার বার আমাকে পরীক্ষা নিয়েছেন। তারপর আমাকে বুঝ দান করেছেন। আমাকে আমার বিশ্বাসের উপর অবিচল রেখেছেন। আমি আমার মা এবং বোনকে দিল্লী নিয়ে এলাম। নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে দিল্লীতে ছোট একটি বাড়ি কিনলাম। আল্লাহ তায়ালা ধীরে ধীরে তার মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থাও করে দিলেন। জীবনের সকল বাঁকেই আমার আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: বিশেষ কোনো ঘটনা থাকলে বলুন।
মুহাম্মদ আকবর: আমি তখন একটি দোকানে চাকরি নিয়েছি। প্রথম মাসের বেতন পেলাম দুই হাজার পাঁচশ রুপি, তখন আমার বাড়ির মূল্য পরিশোধের শেষ কিস্তি বাকি। তা-ও দুই হাজার পাঁচশ রুপি। বাড়িওয়ালা যখন তাগাদা করতে এলো তখন লজ্জাবোধ হওয়ায় পুরো বেতনটাই তাকে দিয়ে দিলাম। এদিকে ঘরে মা সদাই পাতির অপেক্ষায় আছে। কয়েকদিন হলো ঘরে কিছুই নেই। একদিন অবস্থা এমন হলো যে, ঘরে একটুও খাবার নেই। আমি মাগরিব নামাযের পর দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়লাম। আল্লাহ তায়ালার দরবারে খুব কান্নাকাটি করলাম। আমি তো একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারও কাছে চাইব না। নামায পড়ে যখন বের হলাম তখন দেখলাম, জুতার সামনে পাঁচশ রুপির একটি নোট পড়ে আছে। আমি খুব খুশি হয়ে নোটটি তুলে পকেটে পুরে নিলাম। ভাবলাম নিশ্চয়ই এটা আমার দুআর ফসল। দোকানের দিকে যাচ্ছি আর ভাবছি কিছু আটা ইত্যাদি কিনবো। সাথে সাথেই মনে হলো আচ্ছা, এই নোটটি কারও পকেট থেকে আবার পড়ে যায়নি তো? এটা কি আমার জন্য হালাল হবে? তখন আমি দোকানে না গিয়ে মাওলানা সাহেবের কাছে চলে গেলাম। আমি আমার অবস্থা গোপন রেখে কেবল জুতার সামনে পাঁচশ রুপির নোট পাওয়ার ঘটনাটাই তাকে বললাম। ইমাম সাহেব বললেন, মসজিদে এই রুপি পাওয়ার ঘোষণা করতে হবে। আপনার জন্য এটা হালাল হবে না। আমি নোটটি ইমাম সাহেবের হাতে তুলে দিলাম। খালি হাতে ঘরে ফিরে এলাম। তবে এই ভেবে আনন্দ হচ্ছিলো যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাঁর হুকুম মানার তাওফিক দিয়েছেন। আবার কষ্ট হচ্ছিল, মা’র অপেক্ষার কথা ভেবে।

তখন রাত এগারোটা। দরজায় আওয়াজ পেয়ে আমি দরজা খুললাম। মহল্লার এক ব্যক্তি এক হাজী সাহেবকে নিয়ে এসেছে। পরিচয় দিয়ে বললো, এই হাজী সাহেব আপনার সাথে কথা বলতে চান। হাজী সাহেব বললেন, আমি পশ্চিম দিল্লী থেকে এসেছি। এই এলাকায় মাগরিবের সময় পৌঁছেছি। বিভিন্ন মহল্লায় আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে রাত হয়ে গেল। তারপর বললেন, আমার একটি মাড়াইয়ের কারখানা আছে। আমার ছেলে এতোদিন এর দেখাশোনা করতো। এখন সে দেশের বাইরে চলে গেছে। কারখানা দেখাশোনার জন্য এই মুহূর্তে একজন লোক দরকার। এলাকার এক ব্যক্তি বললো, আপনি এর আগে কারখানার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। আমি আপনাকে ম্যানেজার হিসেবে নিতে চাই। প্রতি মাসে আপাতত পাঁচ হাজার রুপি দেব। পরে বেতন বাড়িয়ে দিব। আমাদের এলাকার লোকজন আপনার খুব প্রশংসা করে। তারপর তিনি পাঁচ হাজার রুপির একটি বান্ডিল বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা এক মাসের অ্যাডভান্স বেতন। প্রতি মাসের বেতন মাসের প্রথম তারিখে আপনাকে অ্যাডভান্স দেয়া হবে। আমি মনে মনে ভাবলাম, এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উপহার। তার সাথে কথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে গেল। আমি হোটেল থেকে রাতের খাবার কিনে আনলাম। মা এবং বোনকে নিয়ে খেলাম। তারাও খুব খুশি হলো। দুই রাকাত নামায পড়ে আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া আদায় করলাম, আমাকে হারাম পাঁচশ রুপি থেকে রক্ষা করেছো। বিনিময়ে পাঁচশ‘র জায়গায় পাঁচ হাজার দান করেছো। এমন ঘটনা আমার জীবনে বহুবার ঘটেছে।

আহমদ আওয়াহ: দাওয়াতের কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ আকবর: আলহামদুলিল্লাহ! হযরত মাওলানা কালিম সাহেবের তত্ত্বাবধানে জীবনের মিশন হিসেবে দাওয়াতকেই গ্রহণ করেছি। আল্লাহ তায়ালা এই অধমকে দিল্লী এবং হরিয়ানায় অন্তত পঞ্চাশ ব্যক্তির হেদায়েতে উসিলা হিসেবে কবুল করেছেন। তাছাড়া নিয়মিত তাবলীগের রুটিন এবং বার্ষিক চিল্লাও চালু আছে।

আহমদ আওয়াহ: আরমোগানের মাধ্যমে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে কি?
মুহাম্মদ আকবর: আমি কী, আর আমার বলবারই বা থাকবে কী? মন চায়, আমাদের মুসলমান ভাইগণ আমার মত অসহায়দের প্রতি একটু করুণাপ্রবণ হোন। কত মানুষ পথ জানা না থাকার দরুন জাহান্নামে যাচ্ছে। একটু তাদের কথা ভাবুন। প্রসঙ্গত নওমুসলিম ভাইদের সম্পর্কে আমি একটি কথা বলবো। তাদের দুরাবস্থার কথা আমাদের ভাবতে হবে। তাদের অন্যের উপর নির্ভরশীল না রেখে কিভাবে স্বনির্ভর করে তোলা যায় সেটা ভাবতে হবে। তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ এবং একমাত্র আল্লাহর প্রতি মুখোপেক্ষিতার চরিত্র কিভাবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে জোর দিতে হবে। সকল খোদা থেকে বেরিয়ে এসে একমাত্র মালিকের উপর ঈমান আনার পর দুনিয়ার কারও সামনে হাত পাতা কী করে সম্ভব? অনেকেই অসহায় নওমুসলিমদের দান সদকা করে তাদের অভ্যাসটাই বিকৃত করে ফেলেন। তাদের আত্মা নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি মনে করি তাদের সহযোগিতা করা কর্তব্য। সেই সাথে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলাও আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে পরনির্ভরশীল করে রাখা এটা তাদের জন্যও একটা আত্মঘাতী বিষয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক শুকরিয়া। আপনি খুবই জরুরী কথা বলেছেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আকবর: যা বাস্তব আমি কেবল তাই বলেছি। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, সেপ্টেম্বর- ২০০৩