মুহাম্মদ ইসহাক (অশোক কুমার)-এর সাক্ষাৎকার

ইসলাম প্রতিটি মানুষের জন্যই অত্যাবশ্যক। কারো ইসলাম বিদ্বেষ দেখে একথা ভাবা যাবে না যে, তার আর ইসলাম গ্রহণের আশা নেই। সকল ইসলাম বিদ্বেষী ভুল বুঝে কিংবা অজ্ঞতার কারণে ইসলামের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করছে। এ ব্যাপারে আমাদের চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা বজরং দল করতাম। ইসলাম আর মুসলমান ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আর সেই আমরাই এখন ভাবি, আল্লাহ না করুন যদি হিন্দু হয়ে মারা যেতাম (ঝর ঝর করে কেঁদে দিয়ে) তাহলে আমরা ধ্বংসের কোনো অতল গহ্বরে পড়ে যেতাম। আল্লাহ তাআলার কতটা অসন্তুষ্টি আর জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি আমাদেরকে সহ্য করতে হতো।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মুহাম্মদ ইসহাক: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: ইসহাক ভাই! গত বছর ৭ই ডিসেম্বরের পর থেকে তো আপনার আর দেখাই হলো না। গতকাল আব্বু বললেন, আপনার ফোন এসেছিল, দিল্লী এসেছেন। শুনে খুব খুশী হয়েছি। রাতেই আব্বু বলে দিয়েছেন, আগামী সংখ্যার আরমুগানের জন্য আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে।
মুহাম্মদ ইসহাক: হ্যাঁ, আহমদ ভাই! মাওলানা সাহেব আজ সকালেই আমাকে বলেছেন, আরমুগানের এই সংখ্যায় তোমার সাক্ষাৎকার ছাপাতে হবে। বললাম, আমার তো লজ্জা করছে। তিনি আদেশ করলেন, তোমার অবস্থা জেনে লোকদের মধ্যে দাওয়াতের জযবা সৃষ্টি হবে। তাদের ভীতি কমে আসবে। তোমার ছাওয়াব হবে। বললাম, তাহলে ঠিক আছে।

আহমদ আওয়াহ: ইসহাক ভাই! আপনার পরিচয় বলুন?
মুহাম্মদ ইসহাক: আহমদ ভাই! উত্তর প্রদেশের প্রসিদ্ধ জেলা রামজপুরের টান্ডাবাদলী কসবার নিকটবর্তী এক গ্রামের সাইনী পরিবারে আমার জন্ম। জন্ম তারিখ ৭ই ডিসেম্বর ১৯৬৭ খৃস্টাব্দ। বাড়ির লোকজন আমার নাম রেখেছিল অশোক কুমার। পিতা শ্রী পূরণ সিং ছিলেন অল্প শিক্ষিত এক কৃষক। গ্রামের জুনিয়র হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করি। স্কুল ও ইন্টার পাশ করেছি রামপুর থেকে। তারপর লক্ষ্মৌ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করি। একটা প্রাইভেট কন্সট্রাকশন কোম্পানীতে চাকুরী পেয়েছিলাম। ছোটবেলায় খুব বদরাগী ছিলাম। স্কুলে শিক্ষকদের সঙ্গেও ঝগড়া করতাম। কোম্পানীতেও নিত্যদিন একটা না একটা লেগেই থাকতো। ব্যস, চাকুরী ছেড়ে দিলাম।

আমার দুজন বন্ধু ছিল। প্রথম শ্রেণী থেকে ইন্টার পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে লেখা পড়া করি। একজনের নাম যোগীশ কুমার আর অপরজন যোগীন্দ্র সিং। দুজনেই আমাদের আত্মীয় ছিল। সম্পর্কে একজন ভাই হতো। তিনজন এক সঙ্গে পড়াশোনা করতাম আবার ব্যায়ামও করতাম একত্রে। কিছুদিন কারাতেও শিখেছি। রামজন্মভূমি আর বাবরী মসজিদ নিয়ে লড়াই শুরু হলে আমরা তিনজনই বজরং দলে নাম লেখাই। আদভানীর রথযাত্রায় আমরা গোয়ালিয়র গিয়ে শামিল হই। চারদিন তাদের সঙ্গে ছিলাম। পরিবারের সবাই আমাদের এই সিদ্ধান্তে খুশী হল।

একদিন যোগীশের পিতা যিনি স্কুল শিক্ষক ছিলেন আমাদের তিনজনকেই তার বাড়িতে ডেকে নিলেন। যোগীন্দ্রের পিতাকেও ডাকলেন। বললেন, আমরা তোমাদের তিনজনকে রামের নামে পাঠিয়ে দিচ্ছি। রাম মন্দিরের নামে তোমাদের বলি হতে হলেও পিছু হটবে না। পৃথিবীতে তোমরা অমর হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের তিনজনের মাথায় ফেটি বেঁধে দিলেন। আমাদের মনোবল চাঙ্গা হল, আর সাহস বেড়ে গেল । ৩০শে অক্টোবর আমরা করসেবায় পৌঁছলাম। তখনও আমরা জায়গামত পৌঁছিনি, এদিকে মুলায়ম সরকারে গোলাগুলি হল। পুলিশ আমাদের গ্রেফতার করে ট্রেনে উঠিয়ে রামপুর নিয়ে ছেড়ে দিল। আমাদের রাগের অন্ত রইল না। পথে কয়েকজন পুলিশকে পিটুনীও দিলাম। কিন্তু তারা আমাদের একথা বলে শান্ত করল যে, মুলায়ম সরকার গদিচ্যুত হলে আমাদের সরকার আসবে। তখন তোমরা আকাক্সক্ষা পূর্ণ করে নিও। ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে বাবরী মসজিদ শহীদ করার উদ্দেশ্যে অযোধ্যা পৌঁছলাম। সঙ্গে শীতের কাপড়ও পুরোপুরি ছিল না। বিভিন্ন আশ্রমে থাকতে থাকতে আমরা বেশ হেনস্থা হলাম। তারা আমাদের ভয় দেখাল, তোমরা এসব পাপ কাজ করছ। এক সাধু তো বলেই ফেলল, আজ যদি রামচন্দ্র জীবিত থাকতেন তিনিও বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার এই পাপ করতে দিতেন না। এদের ওপর আমাদের প্রচন্ড রাগ হল।

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর লোকজন বাবরী মসজিদের নিকটে সমবেত হল। পরিচালক আমাদের বলেছিলেন, আমরা ইঙ্গিত করামাত্রই তোমরা মসজিদ গুড়িয়ে দিবে। ব্যস, উমা ভারতী শ্লোগান দিতেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম। যোগেশ তো ভীড়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। ওকে মাড়িয়েই লোকজন ছুটে যাচ্ছিল। কেউ একজন ওকে দেখে হাত ধরে উঠাল। একমাস পর্যন্ত সে অসুস্থ ছিল ওর মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। বিজয়ের আনন্দে আমরা প্রত্যেকে একটি করে ইট নিয়ে আসলাম। পথে লোকজন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। বাড়ির লোকজন আমাদের সম্মানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিল। তারা আমাদের বাহবা দিয়ে যাচ্ছিল।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন?
মুহাম্মদ ইসহাক: বাবরী মসজিদ শহীদ করে আহমদ ভাই! আমরা নিজেদের মনোবাসনা তো পূর্ণ করেছিলাম কিন্তু কেন জানি আমি একাই নই বরং তিন জনই এক অজানা ভয়ে শংকিত থাকতাম। প্রত্যেকেরই মনে হতো, এই বুঝি কোনো বিপদ এসে গেল। মাঝে মাঝে তো এমনও মনে হতো, আকাশ থেকে কোনো অগ্নিকুন্ডলী আমাদের ভষ্ম করে দিবে। বাবরী মসজিদের প্রত্যেক শাহাদাত বাষির্কীতে (৬ই ডিসেম্বর) আমাদের দিনরাত কঠিন অস্থিরতার মধ্যে কাটতো। ভাবতাম, আজ তো অবশ্যই শাস্তি এসে পড়বে। গত বছর ৬ই ডিসেম্বর আশংকা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ৬ই ডিসেম্বর আমরা কখনই বাড়ি থেকে বের হতাম না। ৬ তারিখ পার হয়ে গেলে আমরা স্বস্তি অনুভব করতাম।
১৯৯৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর সকালে আমরা তিন জন বাড়ি থেকে বের হলাম। রামপুর বাস স্ট্যান্ডে আমাদের কলেজের সাথী রঈস আহমদের সঙ্গে দেখা। আমাদের দেখে সে এগিয়ে আসল। বিদ্রুপের সুরে বলল, অশোক! তোমাদের পালা, প্রস্তুত হয়ে যাও। আমি বললাম, এবার কিসের পালা? বলল, পাগল হওয়ার, তারপর মুসলমান হওয়ার। বললাম ঠোঁট বন্ধ কর। বলল, পত্রিকা পড়োনি? বললাম, কী এসেছে পত্রিকায়? সে তার ব্যাগ থেকে একটি উর্দূ সাহারা পত্রিকা বের করল এবং মুহাম্মদ আমের আর উমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী পড়ে শোনাল। আমরা রাগও হলাম ভয়ও পেলাম। আমি বললাম, উর্দূ পত্রিকা, মিথ্যা সংবাদও ছাপাতে পারে। সে দুটি হিন্দী পত্রিকা বের করে আমাকে দেখাল। তাতে ছোট আকারে দুটি খবর দেয়া ছিল। আমি উর্দূ পত্রিকার বিস্তারিত সংবাদটি আবার পড়তে বললাম। আমার সাথীদ্বয় প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল। পরামর্শ হল, ফুলাত গিয়ে জানতে হবে কেন তারা এমন মিথ্যা সংবাদ ছাপাল, সেইসাথে সংবাদিকদেরও মজা দেখাতে হবে। ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে হবে, নইলে বহুলোক ধর্মভ্রষ্ট হয়ে যাবে।

রামপুর থেকে আমরা মীরাঠের বাসে উঠলাম। মাওলানা সাহেবের ঠিকানা সংগ্রহ করে তার বাড়িতে গেলাম। মাওলানা সাহেব নামাযে গিয়েছিলেন। নামায পড়ে ফিরে আসলে এক ব্যক্তি বলল, ইনিই মাওলানা কালীম সাহেব। আমরা আগে থেকেই কিছুটা রেগে ছিলাম। কিছুটা কঠিন সুরে মাওলানা সাহেবকে পত্রিকা দেখিয়ে বললাম, সংবাদটি আপনি ছাপিয়েছেন? আপনি কিভাবে এই সংবাদ ছাপালেন? আমরা তিনজন একেবারে চাষার মত কর্কশ ভাষায় কথা বলছিলাম। কিন্তু মাওলানা সাহেব না জানি কোন দুনিয়ার মানুষ ছিলেন, অনেক নরম ভাষায় মহব্বত করে বললেন, ভাই আমার! আপনি আপনার রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের কাছে এসেছেন। বললাম আপনার আমার, আমার আপনার এগুলো তো শহুরেদের ব্যাপার।

মাওলানা সাহেব বললেন, আচ্ছা বলুন কোথা থেকে এসেছেন? আমি বললাম, আমরা রামপুর টান্ডাবাদলী থেকে এসেছি। মাওলানা সাহেব বললেন, ভায়েরা! এমন শীতের দিনে এতো দীর্ঘ সফর করে এসেছেন, কেমন ক্লান্ত হয়ে গেছেন! এটা আপনাদেরই বাড়ি, পরের ঘরে আসেন নি। যা জানতে চান বলবো। আগে তো বসুন, চা-নাস্তা করুন, খানা খান। সংবাদ আমরা ছাপাইনি তবে সংবাদ সত্য। আমরা কিছুটা শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। বললাম, আপনি এসব কী যা তা বলছেন। লোকদের ধর্মভ্রষ্ট করতে চাচ্ছেন। মাওলানা সাহেব বললেন, ঠিক আছে সত্য মনে হলে মেনে নিবেন অন্যথায় এ ব্যাপারে আমার কোনো জোরাজুরি নেই। আমের, উমরের মধ্য থেকে ঘটনাচক্রে মুহাম্মদ উমর নওমুসলিমদের একটি জামাআত নিয়ে ফুলাত এসেছিল। এদের মধ্যে নয় জন নওমুসলিম ছিল। আমীর না পাওয়ার কারণে মাওলানা সাহেব তাদেরকে ফুলাত ডেকে এনেছিলেন। এদের তিন জন ছিল হরিয়ানার। দুজন গুজরাটের আর চার জন ইউ.পির। তাদের দুজন আবার মন্দিরের সাধুও ছিল।

মাওলানা সাহেব একজন হাফেজ সাহেবকে ডেকে বললেন, উমর মিয়াকে ডেকে আনো। কিছুক্ষণ পরই মুহাম্মদ উমর উপস্থিত হল। মাওলানা সাহেব বললেন, যে দুজনের সংবাদ ছাপা হয়েছে তাদের একজন এই মুহাম্মদ উমর। আপনারা এর সঙ্গে কথা বলে আসল ঘটনা এবং সত্যতা জেনে নিন। উমর ভাইয়ের সঙ্গে ছোট একটি কামরায় আমরা মুখোমুখি হয়ে বসলাম। মাওলানা তাকে ডাক দিয়ে কিছু কথা বুঝিয়ে দিলেন। পরবর্তীতে উমর ভাইয়ের নিকট শুনেছি, মাওলানা সাহেব তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, এরা যত রাগই করুক তুমি সবর করবে এবং মহব্বতের সাথে নরম স্বরে রোগী মনে করে কথা বলবে। আর মনে মনে আল্লাহর নিকট দুআ করতে থাকবে। আমিও বাড়িতে গিয়ে দু‘রাকাআত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে হেদায়াতের দুআ করছি।

কিছুক্ষণ পরেই ভরপুর নাস্তা এসে গেল। আমাদের সবারই শীত লাগছিল। উমর ভাই জোর করে দু’পেয়ালা চা পান করালেন। খুব খাতির করে আমাদের বুঝাচ্ছিলেন। বলছিলেন, আদভানী সাহেবের রথযাত্রায় সানিপথ থেকে পানিপথ পর্যন্ত আমরা দুজনেই সামনে সামনে ছিলাম। ৩০শে অক্টোবর গম্বুজের উপরে আমাদের দুজনের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। ইতোমধ্যে খানাও এসে গিয়েছিল। আমি উমরকে বললাম, এখন আমাদের কী করতে হবে? সে বলল, দুনিয়ার শাস্তি তো কিছুই নয়, মৃত্যুর পর মহা দিবসের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আপনাদের আমার কথা শোনা উচিত এবং কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাওয়া উচিত। আমরা তিনজন পরামর্শের জন্য বাইরে যেতে উদ্যত হলে উমর ভাই বললেন, আমি একটি কাজে বাইরে যাচ্ছি আপনারা ভেতরেই বসুন।
আমরা তিনজন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের মুসলমান হয়ে যেতে হবে। তারপর উমর ভাইকে ডেকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম। উমর ভাই বললেন, তিনি দু’রাকাআত নামায পড়ে সত্য মালিকের নিকট আমাদের জন্য দু’আ করতে গিয়েছিলেন আর মাওলানা সাহেবও আমাদের জন্য দুআ করতে ভেতরে গিয়েছেন। উমর ভাই আনন্দিত হয়ে মাওলানা সাহেবকে ডেকে আবেদন জানালেন, এই তিন ভাইকে কালিমা পড়িয়ে দিন। মাওলানা সাহেব আমাদের কালিমা পড়িয়ে দিলেন।

আহমদ ভাই! ইতোপূর্বে আমাদের মনের ওপর দিয়ে যে কী ঝড় বয়ে যেতো তা বলে বোঝানো যাবে না কিন্তু যখনই মাওলানা সাহেব আমাদের কালিমা পড়িয়ে তাওবা করালেন, মনে হল, কাঁটার একটি পোশাক যা এতদিন আমাদের শরীরে জড়ানো ছিল এক মুহূর্তে খুলে গেল। ভেতরের ভয় যেন কর্পুরের মত উবে গেল। কেমন যেন বিপদসংকুল স্থান থেকে আমরা এক সুরক্ষিত কেল্লায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। মাওলানা সাহেব আমার নাম রাখলেন মুহাম্মদ ইসহাক। যোগীশের নাম মুহাম্মদ ইয়াকুব আর যোগীন্দ্রের নাম মুহাম্মদ ইউসুফ। সেই সাথে হযরত ইউসুফ আ., হযরত ইসহাক আ., আর হযরত ইয়াকুব আ.-এর ঘটনাও শুনিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, কাল থেকে ফোন আসছিল, সংবাদ তো ছাপা হয়েছে, কোনো ফাসাদ না শুরু হয়ে যায়। বন্ধুদের আমি বলেছিলাম, ভয় পাবেন না, সংবাদ আমরা ছাপাইনি। আল্লাহ তাআলা ছাপিয়ে দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ! অবশ্যই এতে কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। এদিকে আল্লাহ তাআলা এতো বড় কল্যাণ করে দিলেন। মাওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। মুবারকবাদ দিলেন এবং তিনজনকেই ‘আপকী আমানত আপকী সেবা মে’ উপহার দিলেন।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হল?
মুহাম্মদ ইসহাক: সকালে নওমুসলিমদের জামাআতে আমাদেরও অনুর্ভুক্ত করে দেয়া হল। বুলন্দশহরের এক মুফতী সাহেব সাল লাগাচ্ছিলেন, তাকে আমাদের আমীর বানানো হল। আর দুজন লোককে শিক্ষক হিসেবে শামিল করা হল। ১৫ জনের জামাআত একদিন মীরাঠ রইল। আমরা তিনজনই মীরাঠ গিয়ে সার্টিফিকেট বানালাম। তারপর জামাআত আগ্রায় পাঠিয়ে দেয়া হল। আগ্রা মথুরায় আমাদের চল্লিশ দিন সময় লাগল। জাআমাতে সময় ঠিকই লেগেছিল, তবে বেশীর ভাগই ছিল নতুন। দু-একবার ঝগড়াঝাটিও হল। একদিন ঝগড়া করে রাতের বেলা আমরা পাক্কা এরাদা করলাম, সকাল হতে না হতেই চলে যাবো। রাতে ইউসুফ স্বপ্নে দেখল, মাওলানা সাহেব বলছেন, আল্লাহ তাআলা আপনাদের কীভাবে হেদায়াত দিয়েছেন। এরপরও আপনারা আল্লাহর রাস্তা থেকে পালাতে চাইছেন? ঘুম থেকে উঠে আমাদের দুজনকে সে স্বপ্নের কথা জানাল। আমরা ঠিক করলাম, জান চলে গেলেও চিল্লা পূর্ণ করেই মাওলানা সাহেবকে মুখ দেখাবো। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের চিল্লা পূর্ণ হয়ে গেল।

আহমদ আওয়াহ: জামাআত থেকে ফিরে আসার পর কী হল?
মুহাম্মদ ইসহাক: মাওলানা সাহেব আমার নিকট জানতে চাইলেন, এখন আপনাদের কী ইচ্ছা? এবং পরামর্শ দিলেন এক্ষুণি বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আমরা তাকে বললাম, আমরা শিশু নই। ধর্ম আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর সত্যকে মেনে নেয়া আমাদের মৌলিক অধিকার। আমরা বাড়িতে গিয়ে পরিবারের ওপর মেহনত করবো। তাছাড়া আমাদের কোনো প্রকার আশংকাও নেই। মাওলানা সাহেব বোঝানোর পরও আমরা গ্রামে ফিরে গেলাম। এলাকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। খবর রটেছিল, মুসলমানরা ওদের হত্যা করে ফেলেছে। আমরা বাড়ির লোকজনকে সাফ সাফ সব কথা বলে দিলাম। তারপর আর কী, আত্মীয় স্বজনের মাতম শুরু হয়ে গেল। বারবার সালিশ বসল। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজনেরা আসল। একবার সাংবাদিকও এসেছিল। গ্রামের লোকজন তাদের পয়সা দিয়ে দিয়ে ফেরত পাঠাল এবং কখনই এই সংবাদ ছাপাবে না বলে রাজী করাল।

আমার পরিবারের ওপর আত্মীয়-স্বজন চাপ সৃষ্টি করল, ছেলেকে যে কোনো মূল্যে সামাল দাও। কিন্তু আল্লাহ শোকর, তাদের বিরোধিতা আমাদের আরও পাকা করে তুলল। আমাদের সঙ্গে অনেক কঠোর আচরণও করা হল। স্ত্রী-সন্তানদের তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হল। আমরা বাড়ি ত্যাগে বাধ্য হলাম। ফুলাত যেতে আমাদের লজ্জাবোধ হল যে, মাওলানা সাহেবের কথা শুনলাম না। প্রথমে আমরা দিল্লী গেলাম। তারপর এক ব্যক্তি আমাদের পাটনা নিয়ে গেল। পাটনায় আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিছুদিন রিক্সাও চালিয়েছি। প্রয়োজনে মজদুরীও করেছি। তারপর এক ব্যক্তি আমাকে কোলকাতায় তার কোম্পানীতে নিয়ে যান। অতঃপর আমার দুই সাথীও কোলকাতা চলে আসে।

আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের কষ্টের দিন বেশী দীর্ঘ হয় নি। এখন আমরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। এই দিনগুলোতে আমরা তিনজনই পালাক্রমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যিয়ারত লাভেও ধন্য হয়েছি। এতে আমরা খুব সান্ত¡না লাভ করতাম। মাওলানা সাহেবের কথা আমাদের খুব মনে পড়ে, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না। আল্লাহর দয়া, আজ সাক্ষাত হয়ে গেল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নয়-দশ মাসের সমস্ত কষ্ট আর কষ্ট মনে হল না।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেছিলেন কি?
মুহাম্মদ ইসহাক: ওদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। মা আর ভাই-বোনের সঙ্গে কথা হয়। আব্বুর সাথে অবশ্য হয়ে ওঠে না। ইনশাআল্লাহ! সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্য আমার স্ত্রী আর বাচ্চা দুটি এখনো শ্বশুরালয়েই আছে। এক মুসলমান মহিলাকে সেখানে পাঠিয়ে ছিলাম। স্ত্রী বলে দিয়েছে, “যখন যেখানে প্রয়োজন যেতে প্রস্তুত আছি। ভাবীদের সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছে না। এক স্বামীর সঙ্গে থেকেই মরতে চাই” আজকে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। এখন কোনোভাবে ওদের সঙ্গে করেই নিয়ে যাবো।

আহমদ আওয়াহ: দাওয়াতের ব্যাপারে আব্বু আপনাকে কোনো কথা বলেননি? এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ ইসহাক: মাওলানা সাহেব আমাদের অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, আমরা বাবরী মসজিদ শহীদকারীদের জন্য ফিকির করবো এবং করসেবকদের ওপর কাজ করবো। সেই সেঙ্গ তাদের জন্য আর পরিবারের জন্য দুআও করবো। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ হয়েছে, আমি শিগগিরই কোলকাতা থেকে জাআমাতে চিল্লা লাগাবো এবং আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট মঞ্জুর করানোর দুআ করবো। তারপর চিল্লা থেকে ফিরে এসে পরিবার এবং করসেবকদের ওপর কাজ করবো।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের জন্য কোনো পয়গাম?
মুহাম্মদ ইসহাক: ইসলাম প্রতিটি মানুষের জন্যই অত্যাবশ্যক। করো ইসলাম বিদ্বেষ দেখে একথা ভাবা যাবে না যে, তার আর ইসলাম গ্রহণের আশা নেই। সকল ইসলাম বিদ্বেষী ভুল বুঝে কিংবা অজ্ঞতার কারণে ইসলামের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করছে। এ ব্যাপারে আমাদের চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা বজরং দল করতাম। ইসলাম আর মুসলমান ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আর সেই আমরাই এখন ভাবি, আল্লাহ না করুন যদি হিন্দু হয়ে মারা যেতাম (ঝর ঝর করে কেঁদে দিয়ে) তাহলে আমরা ধ্বংসের কোনো অতল গহ্বরে পড়ে যেতাম। আল্লাহ তাআলার কতটা অসন্তুষ্টি আর জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি আমাদের সহ্য করতে হতো।

আহমদ আওয়াহ: শোকরিয়া ইসহাক ভাই! আপনাদের তিনজনকেই শোকরিয়া। আপনাদের দুজনের সঙ্গে অন্য সময় কথা হবে ইনশাআল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মুহাম্মদ ইসহাক: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ডিসেম্বর ২০০৭