মুহাম্মদ উমর (গৌতম)-এর আত্মজীবনী

বহু অমুসলিম ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে আমার এ কথা অনুভব হলো যে, আসল অর্থে ইসলামের দাওয়াত তাদের কাছে পৌঁছানো হয়নি। যার ফলে তারা ভুল ধারণার শিকার হয়। বাস্তবতা হলো ইসলাম সমস্ত মানুষের জন্য। মৌলিকভাবে ইসলাম মনবতার শিক্ষা দেয়। আজ পৃথিবীতে অনেক জাতি ও দেশ এই ইসলাম থেকে উপকৃত হচ্ছে আর মুসলমানরা তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছে আর প্রশংসা করছে। এদেশে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলো অমুসলিম সেখানে দাওয়াতের খুবই প্রয়োজন। আজও যদি মুসলমানরা দ্বীনের উপর চলে এবং তাদের চরিত্র অভ্যাসকে ঠিক করে এবং মানবতার খেদমতকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানায় তাহলে হাজারো মানুষ ইসলামকে গ্রহণ করায় সফল হত।

আমার জন্ম ১৯৬৪ সালে। উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর জেলার রাজপুত পরিবারে জন্মেছিলাম। এ বংশ গৌতম নামে পরিচিত। আমার পিতাজীর নাম জনাব ধনরাজ সিংহ গৌতম। তিনি একজন সরকারী অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। কয়েক শ’ বিঘা জমির মালিক। আল্লাহ তাআলা তাকে প্রচুর ধন-দৌলত দান করেছেন। আমার প্রাথমিক শিক্ষা হাই স্কুল পর্যন্ত আমাদের গ্রামেই হয়েছে। পনের বছর বয়সে এলাহাবাদ চলে আসি। শুরু হয় উচ্চশিক্ষা। দ্বাদশ শ্রেণীর পর নৈনিতাল জেলার পন্থনগর এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটিতে বি এস সিতে ভর্তি হই। সেটা ১৯৮০ সালের কথা। এই ভার্সিটিতে পড়াকালীনই ১৯৮৪ সালে আল্লাহ তায়ালা আমার হেদায়েতের ব্যবস্থা করেন। আমি মুসলমান হই। শ্যামপ্রতাপ সিং গৌতম থেকে মুহাম্মদ উমর গৌতম হই।

আমার বয়স যখন পনের তখনই আমার মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিতে থাকে- আমাদের ঘরে আমাদের খান্দানে যে পূজা-পাটের পদ্ধতি চালু আছে, যে দেব-দেবীদের পূজা করা হচ্ছে তা কতটুকু সত্য? পনের বছর বয়স পর্যন্ত আসলে আমাকে জানানোই হয়নি যে আমরা হিন্দু কেন? আমাদের বিশ্বাস বা আকিদাই কী? আমার চারপাশের সামাজিক অবস্থা যতটুকু সম্ভব দেখেছি। চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমার চিন্তা ও দর্শন আমার ভেতর নানা রকমের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যেমন আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং আমাদের মালিক কে? কে আমাদের রিযিক দেন? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যই বা কী? মৃত্যুর পর আমাকে কোথায় যেতে হবে? তাছাড়া আমাদের পূজার উপযুক্ত কে?

তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর পূজা একত্রে কিভাবে সম্ভব? ৮৬ লাখ যোনিতে পুনঃজন্মই বা কিভাবে সম্ভব? তাছাড়া আমাদের মা-বাবাই তো আবার আমাদের সৃষ্টিকর্তা নন? এই সমাজে আমাদের মতই মানুষকে কেন অচ্ছুৎ মনে করা হয়? সব প্রশ্ন নানা দিক থেকে আমাকে অস্থির করে তোলে। এর উত্তর জানার জন্য আমি সর্বপ্রথম আমার পরিবারের শরণাপন্ন হই।
আমি আমার পরিবারের লোকদের নানা প্রশ্ন করতে থাকি। কিন্তু তারা কখনই আমাকে সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। কারণ, তারাই তাদের ধর্মের বিষয়ে তেমন কিছু জানে না। না জানলে বলবেই বা কিভাবে? তারা আমাকে বুঝায়- বেটা! তোমার বাপ-দাদাদের ধর্ম যেটা সেটাই তোমার ধর্ম। তোমাকে এই ধর্মই মেনে চলতে হবে। তোমার জীবনের লক্ষ্য হলো নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বাবা-মার সেবা করতে হবে, অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু কোনভাবেই আমি জানতে পারিনি এই যে বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমত- হিন্দুধর্ম যাকে বিভিন্ন বেদের নামে আমরা স্মরণ করে থাকি এর মূল শিক্ষাটা কী? এর প্রকৃত শিক্ষাই ছিল-

একম ব্রক্ষ্মা দ্বিতীয় নাস্তি“ব্র‏হ্ম কেবল একজন তার কোনো দ্বিতীয় নেই।”

এর অর্থ হলো পূজা এবং বন্দেগী হবে কেবল একজন ঈশ্বরের। তাঁকে ব্যতীত অন্য কারও নয়। বেদগুলোতে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। সেখানে আছে, জীবনে সফল হতে হলে একজন ঈশ্বরের ইবাদত করতে হবে। আমি আমার মনের প্রশ্নের জবাব জানার জন্য পরিবারে যারা বড় তাদের কাছে গেছি। যারা পরিবারে পূজা করানোর জন্য আগমন করতেন- মানে বড় বড় পন্ডিতগণ তাদের কাছেও গেছি। তাদের কেউ আমাকে সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। অবশেষে আমি ধর্মীয় বইপত্র পাঠ করতে শুরু করি।

প্রথমেই আমি হিন্দুধর্মের বইগুলো পাঠ করি। বিশেষ করে গীতা মনোযোগ সহকারে পড়ি। রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-পুরান এবং মনুসংহিতা সম্পর্কে বেশ কিছু দিন লেখাপড়া করি। এ সম্পর্কে বেশ কিছু বই-পুস্তক আমার পড়ার সুযোগ হয়। আমি বুঝতে চেষ্টা করি। প্রস্থ নগর ভার্সিটিতে পড়ার সময় বেশ কিছু বই আমি লাইব্রেরীতে বসে পড়ি। বিশেষ করে গৌতম বুদ্ধ, বিবেকানন্দ পরম হংস রামকৃষ্ণ, গান্ধী, নেহেরু তাছাড়া বিভিন্ন সমাজ সংস্কারকের জীবনীও আমি মনোযোগসহ পাঠ করি। আসলে আমি চেষ্টা করছিলাম এসব ব্যক্তিত্বের সফলতার মূল রহস্যটা আবিষ্কার করতে। কিন্তু অধিক পড়াশোনার কারণে আমার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন সৃষ্টি হতে থাকে। ফলে আমি সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাই। ভাবতে থাকি, আমি সত্যকে খুঁজে পাচ্ছি না কেন? আমি মনেমনে প্রস্তুত হয়ে পড়ি যে আমার ডিগ্রি কমপ্লিট করার পর পিতাজীকে চিঠি লিখবো। তিনি আমার পড়াশোনার যে ব্যয়ভার বহন করছেন – সেজন্যে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো এবং এজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো যে, আমার জীবনের মূল্য লক্ষ্য সত্য সন্ধানের কারণে তার আশা ও কামনা পূরণ করতে পারলাম না। তারপর আমি কোনো পাহাড়ে গিয়ে সন্ন্যাসীর মতো বাকি জীবনটা পার করে দেব। আমি মেডিটেশান এবং ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পেতে চেষ্টা করবো। আমি খুঁজে বের করবই তিনি কোথায় আছেন আর আমার কাছে তিনি কী চান।

যখন আমি এসব কথা ভাবছি তখনই আল্লাহ তায়ালা আমার মনের মধ্যে এ কথা উদয় করে দিলেন- তুমি তোমার সৃষ্টিকর্তার কাছে এ বিষয়ে প্রার্থনা করছো না কেন? তুমি কেন তার কাছে সত্যপথ ও সত্যের ঠিকানা চাচ্ছ না? তিনিই তো ইচ্ছা করলে তোমাকে এ পথে সাহায্য করতে পারেন। এ ভাবনার পর আমি রাতের বেলা প্রার্থনা করতে শুরু করি। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা আমার পথ সহজ করে দেন।

১৯৮৪ সালের কথা। আমার এক বন্ধু নাসির খান। বিজনুরে থাকে। আমার ক্লাসমেট, সেই আমার হেদায়েতের উপলক্ষ হয়েছিল। একবার আমি গাড়িতে একসিডেন্ট করি। পায়ে মারাত্মক আঘাত পাই। ফলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এজন্য আমাকে সাইকেল চালানো ছাড়তে হয়। নানা পেরেশানীর মুখোমুখি হতে হয়। আমার এ চরম দুর্দিনে নাসির খান আমাকে খুব সাহায্য করে। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, কলেজে নিয়ে যাওয়া, মেস থেকে খাবার এনে আমার সাথে বসে খাওয়া এগুলো সব করতো। প্রায় এক মাস এভাবে চলতে থাকে। তার সেবায় আমি দারুণভাবে প্রভাবিত হই। একদিন তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনি আমার প্রতি এতোটা আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করছেন- এই চরিত্র আপনি কোথায় পেলেন?

তিনি বললেন- গৌতম সাহেব! আমি এই কাজ কোনো লোভ কিংবা চাপে পড়ে করছি না। আমি একজন মুসলমান। আমার ধর্ম ইসলাম। আমাদের ধর্মের শিক্ষা হলো- একজন প্রতিবেশী সে প্রতিবেশীই। সে যেই হোক। তার সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। বিপদে তাকে সাহায্য করতে হবে। এটা একজন মুসলমানের মৌলিক কর্তব্য। আমার ভয় হয়, আমি যদি আপনাকে সাহায্য না করি, আমি যদি পাশে থেকেও আপনার কোনো উপকারে না আসি, তাহলে হাশরের মাঠে আল্লাহকে মুখ দেখাতে পারবো না। আমাকে এজন্য জিজ্ঞাসিত হতে হবে।

এই বন্ধুর কথায় আমি খুবই প্রভাবিত হই। ইসলাম সম্পর্কে প্রথম যে কথাটি আমি জানতে পারি তা হলো-  প্রতিবেশীর অধিকার এবং হাশরের মাঠের হিসাব-কিতাব। আমি আশ্চর্য হই এমনও কি হবে? তারপর নাসির খানের মাধ্যমে আমি ইসলাম সম্পর্কিত বইপত্র সংগ্রহ ও পড়াশোনা শুরু করি। আমার এই পড়াশোনা টানা ছয় মাস চলতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে আমি বিভিন্ন ধরনের প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশটি বই পড়ে ফেলি। ফলে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই আমি জানতে পারি। কুরআন শরীফ পড়ার আগে নাসির খান সাহেব আমাকে এতটুকুন অনুভূতি দেয়ার চেষ্টা করেন- কুরআন শরীফ এক আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থ। এটা সমগ্র মানবের হেদায়েতনামা। যখন আমি এ বিশ্বাস ও এখলাসের সাথে কুরআন শরীফের অনুবাদ পড়তে শুরু করি, তখন আমার মনে উদিত পূর্বের সকল প্রশ্ন একটা একটা করে উড়ে যেতে থাকে। আল্লাহ বলেছেন- যারা হেদায়েত পেতে চায়, তারা হেদায়েত পাবে। এই অঙ্গীকার আমার জীবনে সত্য হয়ে উঠে। আমার প্রতি আল্লাহ তায়ালার অসীম অনুগ্রহ, এত বড় নেয়ামত তিনি আমাকে দান করেছেন কোনরূপ চেষ্টা-সাধনা ও বিসর্জন ছাড়াই।

মুসলমান হওয়ার পর সর্বপ্রথম যাদের বিরোধিতার মুখোমুখি হই তারা হলো আমার ভার্সিটির বন্ধু-বান্ধব। তাদের প্রায় অধিকাংশই এসে জিজ্ঞেস করতো- এমন কী দায় পড়েছিল যে, তোমাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হলো? ইসলাম ছাড়া কি আর কোনো ধর্ম ছিল না? আসলে এই বন্ধুরা জানতোই না ইসলামের শিক্ষা কী, ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তিগুলো কী। কয়েকদিন পর কলেজের দেয়াল পত্রিকায় ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত আমার একটি ইন্টারভিউ ছেপে দেয়। লেখাটি ভার্সিটির কয়েক হাজার ছেলে পড়ে এবং পুরো ভার্সিটি জুড়ে হইচই পড়ে যায়। এমনকি বেরেলি থেকে প্রকাশিত অমর উজালা নামে একটি পত্রিকায় “গৌতম হলো উমর” শিরোনামে লেখা ছাপা হয়। বাতাসের মতো সংবাদটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নানা শ্রেণীর নানা লোক এমনকি সিআইডির লোকজন পর্যন্ত অনুসন্ধানে নেমে পড়ে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য যেই আসতো আমি তাদের আমার হিসাব মতো জবাব দিতাম। আর এস এস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না। তারা আমাকে হোস্টেল থেকে গভীর জঙ্গলে নিয়ে মারধর করে। শাসিয়ে বলে, যদি দুই তিন দিনের মধ্যে পুরনো ধর্মে ফিরে না আস, তাহলে তোমাকে টুকরো-টুকরো করে ফেলবো। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে আমাকে এম এস সির ফাইনাল পরীক্ষা রেখে ভার্সিটি ছাড়তে হয়। আমি দিল্লী চলে যাই। এভাবে দুই তিন বছর কেটে যায়। ১৯৮৮ সালে জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ায় ইসলামিক স্টাডিজ এম এ ভর্তি হই। বাধ্য হয়ে আমাকে এগ্রিকালচার বিভাগ ছাড়তে হয়। পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রচন্ড বিরোধিতার মধ্যে পড়ি। তারা আমাকে বয়কট করেন। যে কারণে কয়েক বছর পর্যন্ত আমাকে পরিবার এবং খান্দানের সাথে পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়। এভাবে অন্তত দশ-বারো বছর কেটে যায়। তারপর ধীরেধীরে অবস্থা স্বাভাবিক হয় এবং আসা-যাওয়া শুরু হয়।

দাওয়াতের বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ; পরিবারের মধ্যে প্রথমে আমার স্ত্রী তারপর আমার মুহতারাম মা মুসলমান হন। আমার আত্মীয়-স্বজন সবার সাথেই আমার একটা দাওয়াতের সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। তাদের অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন দুঃখ পাই যখন দেখি, একদিকে ইসলাম যেমন একটি সত্যধর্ম, তেমনি তার শিক্ষাও পরম সুন্দর। অথচ এর বিপরীতে মুসলমানদের সামাজিক এবং চারিত্রিক অবস্থা বর্ণনাতীত। তারপরও এ পর্যন্ত প্রায় একশ’ জনকে ইসলামের ভেতর আনার চেষ্টা করেছি এবং সফল হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।

দাওয়াতের সুবাদে হাজার হাজার মুসলমান বন্ধুর সাথে যোগাযোগ হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, তাদের কাছে যথাযথভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায়নি। ফলে তারা ভুল ধারণার শিকার। অথচ ইসলাম হলো- সকল মানুষের ধর্ম। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো মানবতাবোধ। মুসলমান না হয়েও পৃথিবীর যে কোনো ব্যক্তি ইসলামের শিক্ষা ও সভ্যতা দ্বরা উপকৃত হতে পারে। বর্তমান পৃথিবীর অনেক দেশ ও জাতি ইসলামের শিক্ষাদীক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে। আর মুসলমানগণ দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছেন এবং প্রশংসা করছেন। দুআ করি আল্লাহ তায়ালা আমাদের সমাজকে ইসলামী সমাজ করে দিন। আমাদের এমন এক সমাজব্যবস্থা দান করুন যাতে মানুষের সামনে আমরা তাকে নমুনা হিসেবে তুলে ধরতে পারি। এমন কথাও জানতে পেরেছি- অনেকেই মুসলমান হয়েছেন কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করার পর যথাযথ শিক্ষাদীক্ষার অভাবে সমাজে তারা স্বাতন্ত্র নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে মানুষের মাঝে একটা ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে- নতুন মুসলমানদের জন্যও এরা নমুনা হতে পারেনি।

আমি মনে করি- এখন যারা ইসলামের জন্য নানা ক্ষেত্রে কাজ করছেন বিশেষ করে যারা দাওয়াতের ময়দানে কাজ করছেন তাদেরকে ভাবতে হবে- অমুসলিমদের মাঝে আমরা কিভাবে দীনের কথা তুলে ধরবো। তাদেরকে অনাগত দিনে ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার নির্মাণের কথা ভাবতে হবে। মুসলমান জাতি যেন দৃঢ়ভাবে ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তার জন্য চেষ্টা করতে হবে। আমাদের এই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক অমুসলিম। এখানে দীনী দাওয়াত একটি অপরিহার্য বিষয়। এখনও যদি আমাদের মুসলমানগণ নিজেদের জীবনে ইসলামকে গ্রহণ করেন, চরিত্র কর্মসূচিতে ইসলামকেই প্রধান হিসেবে গ্রহণ করেন তাহলে তাদের উসিলায় লাখ লাখ মানুষ ইসলামকে বুঝতে পারবে এবং সফলকাম হতে পারবে।

পৃথিবীর সামনে একথাও স্পষ্ট হয়ে ওঠা উচিত, ইসলাম কাউকে জোর করে মুসলমান বানায় না; বরং এখানে বান্দা আল্লাহর সামনে বসে অঙ্গীকার করে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আত্মার গভীরতা দিয়ে ইসলামকে না বুঝবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে আখেরাতের সফলতার সাক্ষাত পাবে না। পারবে না পূর্ণমাত্রায় মুসলমান হতে। চোখ বন্ধ করে কেউ যদি মুসলমান হয়েও যায়, প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা তার জন্য কোনভাবেই সহজ হবে না। সবশেষে আমি সকল অমুসলিম ভাইকে দাওয়াত দেব- আপনারা কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইসলামকে পড়ে দেখুন, মুসলমানদের অবস্থা দেখে নয়। আমি এ-ও অনুরোধ করবো- ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি না জেনে কেউ কোনো মন্তব্য করবেন না। আর মুসলমান ভাইদের কাছে আবেদন জানাবো- তারা যেন অমুসলমানদের সাথে তাদের আচার-আচরণ। লেন-দেনকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। অমুসলমানগণ যেন তাদের ধর্মচিন্তা দ্বারা উপকৃত হতে পারেন। আপনার মন্দকর্মের কারণে মানুষ যেন আপনাকে এবং আপনার অপরাধে পুরো ইসলামকে ঘৃণা করতে না পারে। তাহলে সেটা হবে পৃথিবীর সবচে’ বড় ট্রাজেডী। দুআ করি আল্লাহ তায়ালা আমাদের সত্যিকার অর্থে ইসলামকে বোঝার তাওফীক দিন। (আমিন)

মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জানুয়ারী- ২০০৯