মুহাম্মদ সালমান (বানাওয়ারী লাল)-এর সাক্ষাৎকার

আমি চিন্তা করি, পৃথিবীতে প্রায় দুই বিলিয়ন অন্তত দেড় বিলিয়ন দলিত, কৃষ্ণাঙ্গ এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ আছে। ইসলাম এবং একমাত্র ইসলামই তাদের দুঃখ-শোকের চিকিৎসা। তাদের নির্যাতিত হওয়া থেকে কেবল ইসলাম রক্ষা করতে পারে। মুসলমানরা যদি তাদের ইসলামের ইনসাফ ও সাম্যের পরিচয়টুকু করিয়ে দিতে পারে তাহলে সবাই ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। আর সকল দলিত, নমিত সমাজের মানুষ উচুঁদের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আমার মতই অনুভব করবে যে, তাদের ফাঁসি থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এজন্য দুই বিলিয়ন মানুষের প্রতি অবশ্যই দয়া করতে হবে। ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মুহাম্মদ সালমান: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ:  আল্লাহর শোকর, আপনি একেবারে যথা সময়ে উপস্থিত হয়েছেন। আমরা গতকালই মক্কা মুআযযমা থেকে ফিরেছি। আব্বু মক্কা মুআযযমায় আপনার কথা অনেক বলেছেন। আমাকে বলছিলেন, আমি যেন থানায় গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করি। আর আমাদের ম্যাগাজিন আরমুগানের জন্য একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি।
মুহাম্মদ সালমান: কারী সাহেব আমাকে বলেছিলেন, মানুষ যেখানে হজ্জ করতে যায় মাওলানা সাহেব সেখানে (মক্কা শরীফ) সফরে গিয়েছেন। ১৭ই আগস্ট দেশে ফিরবেন। গতকাল ফোন করে জানতে পেলাম, আপনারা ফিরে এসেছেন। সাক্ষাতের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পরামর্শও করতে হবে। এজন্য রাত দেড়টায়ই দিল্লী পৌঁছে গেছি। মালিকের শোকর! দেখাও হয়ে গেল। মনটাও প্রশান্ত হল।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পারিবারিক পরিচয় বলুন?
মুহাম্মদ সালমান: আমার প্রথম জন্ম তো হয়েছিল মুজাফফর নগরের মালহোপুরা মহল্লায় এক দলিত বরং চামার পরিবারে। স্কুল সার্টিফিকেটে লেখা ছিল ৬ই আগস্ট ১৯৫৮ খৃস্টাব্দ। আসল জন্মতিথির খবর চামারের ঘরে, তা-ও আবার পঞ্চাশ বছর পূর্বে কীভাবে পাওয়া যাবে। আমার পিতা বেচারা মজদুরী করতেন। পরে দুর্বল হয়ে পড়লে সব্জি বিক্রি শুরু করেন। তার নাম ছিল অত্রসিং। তিনি আমার নাম রেখেছিলেন বানাওয়ারী লাল। আমাদের বাড়িতে পড়াশোনার প্রচলন ছিল না। কেবল আমার এক মামা এক ব্যাংকে দারোয়ানীর চাকুরী করতেন। তিনি ছিলেন অষ্টম শ্রেণী পাশ। এই মামাই আমাকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করেছেন। গোটা বংশে আমিই দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করি। তারপর টাইপিং শিক্ষা করি। ফলে পুলিশে আমার ক্লার্কের চাকুরী হয়ে যায়। অত্যন্ত প্রতিকুল পরিবেশে আমি পড়াশোনা করি। স্কুলে এক হেডমাস্টার পন্ডিতজী ছিলেন। তিনি এমন অমানবিক আচরণ করতেন যে, কয়েকবার বিষ খাওয়ার ইচ্ছা করি। ক্লাশের একেবারে পেছনে বসাতেন। বড় বড় গালি দিতেন। যা হোক, ২৫ বছরে একশ ছেষট্টিতম থানায় আমার বদলী হয়েছে। এখানকার রতনপুর থানায়ও কিছুদিন থেকেছি। বর্তমানে আপনাদের থানাতেই প্রধান লিপিকার পদে কাজ করছি। আর আমার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে দুই মাস পূর্বে ১৮ই জুলাই।

আহমদ আওয়াহ: এটা তো আমাদের গোটা পরিবারই জানে তবুও আপনার এই জন্মের ব্যাপারে আপনার ভাষাতেই একটু বলুন। অর্থাৎ, আপনার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি খুলে বলুন। আর এজন্য আপনাকে এক দীর্ঘ কাহিনী শোনাতে হবে।
মুহাম্মদ সালমান: আপনারা শুনে থাকবেন, বিহারের এক বড় ডাক্তারের মেয়ে মীরাঠ কলেজে পড়াশোনা করতো। থাকতো তার বড় বোনের বাসায়। এক মুসলমান ছেলের সঙ্গে মেয়েটার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ছেলেটার নাম ছিল বেলাল। দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। এক পর্যায়ে দুজন বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মেয়েটি একদিন বোনের বাসা ছেড়ে ছেলেটির কাছে চলে আসে যে, আমাকে মুসলমান বানিয়ে বিবাহ কর।

ছেলেটা ছিল সরল সোজা আর ভীরু প্রকৃতির। সে অস্বীকার করে দিল, আমার পরিবার কিছুতেই তোমাকে বাড়ি তুলবে না। আর আমি যে কোথাও রাখবো সে সাধ্যও নেই। মেয়েটি মানল না। বলল, আমাকে বিয়ে না করলে আমি বিষ খাবো। ছেলেটি অপারগ হয়ে মেয়েটিকে নিয়ে কয়েক জায়গায় বিবাহের জন্য গেল। কেউ রাজী হল না। কেউ তাদের ফুলাত যাওয়ার পরামর্শ দিলে তারা ফুলাত পৌঁছল। মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেব পুরো ঘটনা শুনলেন। মেয়েটিকে খুব ভালো করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সে জানাল, আমার পরিবার রাজী হয়ে যাবে। আমার পিতা তো অর্ধেক মুসলমান। দৈনিক কুরআন শরীফ পড়ে। হযরত কালিমা পড়িয়ে তাদের বিবাহ দিয়ে দিলেন এবং আইনী নিয়মকানুন পূর্ণ করতে বলে দিলেন। ছেলেটি ছিল সহজ সরল। সে বলল, এখন আমার কোনো ঠিকানা নেই। আমার নানা কোলকাতা থাকেন। ভেবেছিলাম সেখানে চলে যাবো। কিন্ত ফোনে এ ব্যাপারে কথা বললে তারা সাফ না করে দিল। আমার পরিবার আমাকে কিছুতেই বাড়িতে ঢুকতে দিবে না। মাওলানা সাহেব উত্তর দিলেন, তোমার পরিবার তোমাকে না রাখলে আমরা কিভাবে রাখবো? সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।
মাওলানা সাহেবের দয়া হল। তিনি তাদের দু-চারদিন ফুলাত রেখে দিল্লী পাঠিয়ে দিলেন।

মেয়েটির জন্য একটি রূম ভাড়া করে দিলেন। আর তাঁর বোনকে মেয়েটিকে ইসলাম শিখানোর দায়িত্ব দিলেন। মেয়েটির নাম রাখলেন, সানা। মাওলানা সাহেবের বোনের ওখানে মেয়েটির ইসলাম বুঝে এসে গেল। ইসলাম এখন তার কাছে বেলালের চেয়েও প্রিয় হয়ে গেল। মেয়েটির বড় বোন বেলাল এবং তার পরিবারের বিরূদ্ধে থানায় অপহরণের মামলা করল। বিহারের এক সিনিয়র আই.পি.এস অফিসার ছিল মেয়েটির আত্মীয়। তিনি মীরাঠের এস.এস.পির ওপর মেয়েটিকে খুঁজে বের করার প্রচন্ড চাপ দিলেন। পুলিশ বেলালের পিতা আর পরিবারের লোকজনকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। মাওলানা সাহেবের বারবার চাপ দেয়া সত্ত্বেও বেলাল নিজের অলসতা ও ভীরুতার কারণে আইনী প্রক্রিয়া শেষ করতে পারল না। মেয়েটি থানায় ফোন করল, আমি একজন গ্রাজুয়েট। আমি সেচ্ছায় ওকে বিবাহ করেছি। কিন্তু পুলিশের উপর এর কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। বেলালের বড় ভাই কোনো মতে মাওলানার নাম্বার সংগ্রহ করে ফোন করে বলল, যেভাবেই হোক বেলালের সন্ধান দিন। আমরা শুধু আইনী কিছু কাগজ করব যাতে থানায় দেখিয়ে পরিবারকে ছাড়িয়ে আনতে পারি। মাওলানা সাহেব তখন মুম্বাই ছিলেন। তিনি পরামর্শ দিলেন, দুদিন পর দিল্লীর এক মসজিদে বেলাল থাকবে। আপনারা সেখানে গেলে আমার বোন জামাই আপনাদের বেলালের সঙ্গে সাক্ষাত করিয়ে দিবে।

বেলাল যোহরের নামাযে মসজিদে গেল না। বেলালের ভাই খোঁজ করতে করতে মাওলানা সাহেবের দিল্লীর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে বাড়ির লোকজন বলল, আমরা বেলাল বলে কাউকে চিনি না। সে মাওলানা সাহেবকে ফোন করলে মাওলানা সাহেব কোনওভাবে বেলালকে খোঁজ করে তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। পুলিশের ওপর চাপ পড়লে তারা বেলালের সেই ভাইকেও ধরে নিয়ে গেল। তাদের সবার ওপর তারা চাপ দিল এবং লোভ দেখাল, আমরা শুধু মেয়েটিকে চাই। মেয়েটির সন্ধান দিলে তোমাদের সবাইকে ছেড়ে দেয়া হবে। বেলালের ভাই নিজেকে মুক্ত করার লোভে থানা ইনচার্জকে বলে দিল, মেয়েটিকে দিল্লী পাওয়া যেতে পারে। তারা তাকে এবং মেয়ের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বেলা দিল্লী পৌঁছল। ১৭ই জুলাই রাত সাড়ে তিনটায় বাটালা হাউজে মাওলানা সাহেবের বাড়িতে পুলিশ হানা দিল। মাওলানা সাহেব কোথাও সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পুলিশ বাড়ি তল্লাশি করল এবং মাওলানা সাহেবের নিকট বেলালের ঠিকানা জানতে চাইল। মাওলানা সাহেব বললেন, বেলাল তার কাছে নেই। গতকাল তার ফোন এসেছিল। কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, আপনার কামরা তো খালি করে দিয়েছি এখন কী করব? আমি সফর থেকেই ফোনে তাকে পাঞ্জাবের এক বন্ধুর নাম্বার দেই যে, চেষ্টা করে দেখো। হয়তো তিনি তোমাকে কোনো ঘর ভাড়া বা চাকুরী দিতে পারেন।

পুলিশ মাওলানা সাহেবকে জামেআ নগর চৌকিতে নিয়ে গেল এবং তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে মীরাঠ থানায় রওয়ানা হয়ে গেল। তার মোবাইলটিও কব্জা করে নিল। মাওলানা সাহেব বলেছেন, জীবনে সেবারই প্রথম পুলিশের মুখোমুখি হতে হল। সাথে সাথে আমার খেয়াল হল, দাওয়াত সব সমস্যার সমাধান। মাওলানা সাহেব দাওয়াতী কথা শুরু করে দিলেন। থানা ইনচার্জ মোতলা সাহেব আর মাওলানা সাহেব এক গাড়িতে ছিলেন। মাওলানা সাহেব থানা ইনচার্জের নিকট জানতে চাইলেন, আপনারা শুধু পুলিশেরই লোক, না মানুষও। তিনি বললেন, আমরা প্রথমে মানুষ, তারপর পুলিশ। মাওলানা! আমরা উত্তর খন্ডের পাহাড়ী মানুষ। উত্তর খন্ডের পাহাড়ীরা প্রথমে মানুষ হন।

মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি আমার দিকে তাকান। আমার চেহারা থেকে কোনো অপরাধ ঝরে পড়ছে বলে মনে হয়? আমি কি কোনো মেয়েকে অপহরণ করতে পারি? ওসি সাহেব বললেন, স্যার আমরা তো আপনার কোনো অনাদর (বেইজ্জতী) করিনি। আপনি পুলিশকে সহযোগিতা করুন। আমাদের শুধু মেয়েটিকে চাই। আমাদের ওপর প্রচন্ড চাপ রয়েছে। মাওলানা সাহেব বললেন, একজন ভদ্র মানুষকে বিনা অপরাধে রাত তিনটায় থানায় নিয়ে যাচ্ছেন, এটাও কোন আদর? মাওলানা সাহেব মুরাদনগর মসজিদে নামায পড়ার অনুমতি চাইলেন। ওসি সাহেব হাত জোড় করে বললেন, স্যার! আমি আপনাকে মসজিদে নামায পড়তে দিতে পারব না, আপনি রাস্তায় কোথাও নামায পড়ে নিন, গাড়িতে চাটাই আছে। মাওলানা সাহেব বললেন, নামায তো আপনাকেও পড়তে হবে। একদিন মালিকের সামনে আপনাকেও যেতে হবে। সেখানে প্রশ্ন করা হবে, নামায কেন পড়োনি? মাওলানা সাহেব তাকে ইসলাম সম্পর্কে বলা শুরু করলেন। থানায় পৌঁছলে ওসি সাহেব মাওলানাকে চেয়ারে বসিয়ে এক সেপাইকে চা বিস্কুট আনতে বললেন। হযরত নিষেধ করলেন। বললেন, আমরা পুলিশের চা পান করি না। কিন্তু ওসি সাহেব বললেন, চা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, আমরা কিভাবে পয়সা দিয়ে দেই। আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে তবেই চা গ্রহণ করুন। অন্যথায় চায়ের পয়সা নিজের তরফ থেকেই দিয়ে দিন, তবু চা’ টা গ্রহণ করুন।

মোতলা সাহেব গোসল-নাস্তা ইত্যাদি সারতে মীরাঠ বাড়ি চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মাওলানা সাহেবের বোন জামাই আর দুজন উকীল আসলেন। মাওলানা সাহেব তাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মাওলানা সাহেব বলেছেন, ইতোমধ্যে থানার এক সান্ত্রী এসে বলল, মাওলানা সাহেব আপনি চেয়ার নিয়ে ভেতরে গিয়ে একাকী বসুন। মাওলানা সাহেব ভাবলেন, থানায় নিজের সম্মান রক্ষা করতে হবে। তিনি ভেতরে চলে গেলেন। আসলে আমি মজলুমের ওপর আমার মালিকের দয়ার সঞ্চার হয়েছিল। তিনি কুয়াকে গ্রেফতার করে তৃষ্ণার্তের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।

আমি আমার এক সেপাইর সঙ্গে বিতর্ক করছিলাম যে, সব কাজ তো আমরাই করি। তোমাদের কাছে শুধু বুদ্ধি আছে। অতঃপর মাওলানা সাহেবকে লক্ষ করে বললাম, মিয়া সাহেব! মন্দির আমরা বানাই। মসজিদও আমরা বানাই। সব কাজতো আমরাই করি। কিন্তু আমাদের সেখানে ঢুকতেই দাও না। মাওলানা সাহেব বললেন, মন্দিরের কথা আপনি ঠিকই বলেছেন কিন্তু মসজিদের ব্যাপারে একথা বলবেন না, আপনি কোনো মসজিদে ইমামের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালে আপনাকে কেউ বাঁধা দিবে না। আপনি হিন্দু পরিচয়েই দিল্লীর জামে মসজিদে চলে যান কেউ আপনাকে ইমাম সাহেবের পেছনে নামায পড়তে বাধা দিবে না। আমি আরয করলাম, মাওলানা সাহেব! আমরা আসলে চামার মানুষ। বলতে পারবো না আমরা ঠিক কতটা দুঃখী। মাস্টার সাহেব স্কুলে সবার পেছনে বসাতেন। তার আওয়াজ ছিল খুবই ক্ষীণ। প্রশ্ন করলে দাঁত-মুখ খিচিয়ে উঠতেন। কতবার মনে হয়েছে, মালিক কেন আমাদের হিন্দু করে বানালেন। কখনও মনে হয়েছে, বৌদ্ধ বা মুসলমান হয়ে যাই।

মাওলানা সাহেব বললেন, বৌদ্ধ হয়ে তো আম্বেদকর সাহেবেরই সমস্যার সমাধান হয়নি। তিনি স্বয়ং লিখেছেন, মুসলমান হওয়াই সমস্যার সমাধান ছিল। বললাম, আমাকে মুসলমান করে দিবে এমন কাউকে তো পাই না। মাওলানা সাহেব বললেন, এইতো আমি আজ এসে গেছি। বললাম, মাওলানা সাহেব! ব্যাপারটাকে আপনি ঠাট্টা হিসেবে নিচ্ছেন, আমার তো হৃদয় ফেটে যাচ্ছে, আমি তো সিরিয়াসলি বলছি। মাওলানা সাহেব বললেন, আমি আপনার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সিরিয়াস। তারপর বললেন, কালিমা পড়ে নিন। لا اله الا الله محمد رسول الله জলদি পড়ুন, মুসলমান হয়ে যাবেন। বললাম, এটা তো আমার মুখস্থ। মাওলানা সাহেব বললেন, আমাকে শোনান। আমি শোনালাম। মাওলানা সাহেব বললেন, এখন এটাকে মুসলমান হওয়ার নিয়তে সাচ্চা দিলে পড়–ন। একথা খেয়াল করে পড়–ন, কুরআন যে মালিকের পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছে তার শপথ নেয়ার জন্য পড়ছি। আর সেই অবতীর্ণ কিতাবকে মেনে চলব।

মাওলানা জোর দিলে আমি পড়ে নিলাম। মাওলানা বললেন, আপনি মুসলমান হয়ে গিয়েছেন। বললাম, এখন আমাকে মুসলমান হওয়ার জন্য কী করতে হবে। মাওলানা সাহেব বললেন, মুসলমান হওয়ার জন্য আর কিছু করতে হবে না। তবে ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে, নামায শিখতে হবে, পরিচ্ছন্নতার ইসলামী নিয়ম জানতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম এজন্য আমাকে কোথায় যেতে হবে? বললেন, ফুলাত চলে আসুন। আমি বললাম, রতনপুরের ফুলাত? যেখানে বড় একটা মাদরাসাও আছে সেখানকার মাওলানা সাহেবও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ মানুষ? মাওলানা সাহেব বললেন, হ্যাঁ, সেখানেই। তারপর বললেন, ফোন নম্বর লিখে নিন। তবে আমার উপস্থিতিতে আসলে ভালো হয়।

আহমদ সাহেব! আমি বর্ণনা করতে পারবো না, কালিমা পড়ে মনে হল, এক সংকীর্ণ ও অপমানকর যিন্দেগী থেকে নতুন এক জগতে জন্ম নিলাম। মাওলানা সাহেব বলেছেন, তিনি যেই আমাকে কালিমা পড়ালেন অমনিই ওসি সাহেবের নিকট হোম সেক্রেটারী, নেতৃবৃন্দ আর অফিসারদের ফোন আসা শুরু হল। তিনি থানায় ফোন করে ইন্সপেক্টরের সঙ্গে কথা বললেন, মাওলানা সাহেবকে সম্মানের সাথে অফিসে বসাও। নাস্তা ইত্যাদি করাও, আমি আসছি।

ওসি সাহেব এসে গেলেন। মাওলানা সাহেবের কাছে অনেক ওজর পেশ করলেন যে, পুলিশের আসল অবস্থা জানা ছিল না। আপনি সসম্মানে যেতে পারেন। আপনার নিকট অনুরোধ, আপনি এ ব্যাপারে আইনী কোনো ব্যবস্থা নিবেন না। আমার ঠিক এমন মনে হচ্ছিল, মালিক আমাকে দুনিয়ার জুলুম ও সংকীর্ণতা থেকে বের করার জন্য মাওলানা সাহেবকে গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মাওলানা নিজেও বলেন, আপনি আমাকে এমনিই ডেকে নিতেন। রাত তিনটার সময় কালিমা পড়ার জন্য একেবারে গ্রেফতার করেই নিয়ে গেলেন? তো আমি কোন্ মুখে আমার প্রিয় মালিকের শোকর আদায় করে শেষ করবো।

আহমদ আওয়াহ: এরপর ওসি সাহেবের কী হল?
মুহাম্মদ সালমান: পত্রিকাগুলোতে মাওলানা সাহেবের গ্রেফতারের সংবাদ বেরুল। প্রতিবাদে ফোনের পর ফোন আসা শুরু হল। ওসি আর ইন্সপেক্টরকে ট্রান্সফার করা হল। বরং তাদের পদাবনতি হল। প্রায় গোটা থানাই রদবদল হয়ে গেল। আমারও ট্রান্সফার হয়েছিল। ওসি সাহেব তার সামানপত্র নিতে আসলে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বললেন, দিল্লী থেকে আসার পথে মাওলানা সাহেব গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে যখন বললেন, আমার মুখের দিকে তাকান, এখানে কোনো অপরাধ দৃশ্যমান? আমি বলে বোঝাতে পারব না, আমার ওপর যেন বজ্রপাত হল। আমার মন বলে উঠল, তুমি কোনো মহান মানুষের ওপরই হাত দিয়েছো। পরবর্তীতে অফিসারদের চাপ থেকে বাঁচার জন্য মাওলানা সাহেবের নামে এফ.আই.আর এ লিখে তো দিয়েছি যে, মাওলানা সাহেবের ব্যাপারটা জানা ছিল। কিন্তু বানাওয়ারী লাল! আমার মনে হয়, সেই মেয়ে মুসলমান হয়েছে তো, আমাদের সকলেরই মুসলমান হয়ে যেতে হবে। আমি তাকে মাওলানা সাহেবের কিতাব আপকী আমানত হাদিয়া দিয়েছিলাম। তিনি ফোন করেছিলেন যেন ইসলামের পরিচিতিমূলক আরও কিছু কিতাব পাঠিয়ে দেই।

আহমদ আওয়াহ: তারপর আপনি ইসলাম জানার এবং শেখার জন্য কী করলেন?
মুহাম্মদ সালমান: প্রথমে আমি নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য এক দিনের ছুটি নেই। ধুতি পরে তিলক লাগিয়ে দিল্লীর জামে মসজিদে যাই। এগারোটার সময় সেখানে পৌঁছি এবং নামাযের সময় জেনে নেই। লোকজন বলল, আড়াই ঘণ্টা পর একত্রে নামায হবে। তবে একা আপনি যখন ইচ্ছা, পড়ে নিতে পারেন। আমি ইমাম সাহেবের ঠিক পেছনে গিয়ে বসে পড়লাম। দুই ঘণ্টা পর আযান হল। লোকজন আমাকে বলল, এখনই নামায হবে, আপনি অল্পক্ষণের জন্য চলে যান। আমি বললাম, আমি একজন চামার। হিন্দুরা কেউ আমাকে মন্দিরে যেতে দেয় না। আজ মসজিদ দেখতে এসেছি। আযানদাতা মিয়াজীর জন্য একটি জায়নামায বিছানো ছিল। তিনি সেটা ঝেড়ে পরিষ্কার করে আমাকে বললেন, আপনি এতে বসে পড়–ন। আমি ইমাম সাহেবের পিছনে নামায পড়লাম। লোকেরা আমার চামার হওয়ার কথা শোনে খুব খুশী হল। কয়েকজন আমার সঙ্গে কোলাকুলি করল।
ইসলামের সত্যতার প্রতি আমার একীন জমে গেল। বাড়ি ফিরে স্ত্রী-সন্তানদেরকে সব কিছু খুলে বললাম। তারাও খুব খুশী হল। আমি মাওলানা সাহেবের নিকট থেকে সময় নিয়ে চার সন্তান আর স্ত্রীকে ফুলাত এনে কালিমা পড়িয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বংশের লোকজন কোনো বিরোধিতা করেনি?
মুহাম্মদ সালমান: আমাদের বংশের লোকজন মুজাফফর নগর থাকে। তাদের সঙ্গে আমাদের খুব একটা যোগাযোগও হয়ে ওঠে না। তবে আমার একীন, সত্য বুঝে আসলে তারা বিরোধিতার পরিবর্তে ইসলামের ছায়াতলে এসে সীমাহীন খুশীই হবে। আমি নিজেই অনুভব করি, আমাকে যেন ফাঁসির আদেশ থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: দ্বীন শেখার জন্য আপনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
মুহাম্মদ সালমান: মাওলানা সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ শিগগিরই ছুটি নিয়ে জামাআতে অথবা কোনো মাদরাসায় চার মাস সময় লাগাবো। আমি নাম পরিবর্তন করারও আবেদন করেছি। বিভিন্ন কিতাব পড়া আরম্ভ করেছি। মাওলানা সাহেব আমাকে হিন্দিতে পাওয়া যাবে এমন পঞ্চাশটি কিতাবের লিস্ট দিয়েছেন। পঁচিশটি সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি লাইন পড়েই মালিকের কৃতজ্ঞতায় মাথা নোয়াতে ইচ্ছে করে।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের জন্য কোনো পয়গাম?
মুহাম্মদ সালমান: মাওলানা আহমদ সাহেব! আমি এখনও অল্প বয়স্ক বরং শিশু। আমার বয়স মাত্র দুই মাস। দুই মাসের শিশু কিছু বলতে পারে? তবে আমি চিন্তা করি, পৃথিবীতে প্রায় দুই বিলিয়ন অন্তত দেড় বিলিয়ন দলিত, কৃষ্ণাঙ্গ এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ আছে। ইসলাম এবং একমাত্র ইসলামই তাদের দুঃখ-শোকের চিকিৎসা। তাদের নির্যাতিত হওয়া থেকে কেবল ইসলাম রক্ষা করতে পারে। মুসলমানরা যদি তাদের ইসলামের ইনসাফ ও সাম্যের পরিচয়টুকু করিয়ে দিতে পারে তাহলে সবাই ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। আর সকল দলিত, নমিত সমাজের মানুষ উচুঁদের অত্যাচার থেকে নি®কৃতি পেয়ে আমার মতই অনুভব করবে যে, তাদেরকে ফাঁসি থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এজন্য দুই বিলিয়ন মানুষের প্রতি অবশ্যই দয়া করতে হবে। ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কিন্তু আপনার ইসলামী নামটি বলেন নি?
মুহাম্মদ সালমান: মাওলানা সাহেব আমার নাম মুহাম্মদ সালমান রেখেছেন। নামটি আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা সালমান ভাই! আপনি হাসি-ঠাট্টায় হেদায়াত পেয়ে গেছেন।
মুহাম্মদ সালমান: আপনারও অনেক অনেক শুকরিয়া। মাওলানা সাহেব! আপনি বলছেন, আমি হাসি-ঠাট্টায় হেদায়াত পেয়ে গেছি। আমার আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করে এক মহান দা‘য়ীর সম্মানকে খাটো করে আমার জন্য গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি খুব আনন্দ পাই, দুনিয়াবাসী আমাকে তুচ্ছ মনে করে, নীচু মনে করে তো কী হয়েছে, আমার মালিক তো আমাকে এতোটাই ভালোবাসেন। স্বয়ং মাওলানা সাহেব বলছিলেন, আপনার কালিমা পড়ার পর আমাকে ওসি সাহেবের এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়াতে রাগের পরিবর্তে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআও করেছি। আয় আল্লাহ! এক ব্যক্তির ঈমান আনার জন্য আমাকে যদি বহু বছরও জেল খাটাতে হয় তাতেও আমি গৌরববোধ করব। সে তুলনায় এক পরিবারের ইসলাম গ্রহণের জন্য কয়েক ঘণ্টা তো খুবই সস্তা।

আহমদ আওয়াহ: একটি কথা জানার রয়ে গেছে। আপনি আপনার বংশীয় লোকদের জন্য কী কোনো চিন্তা ভাবনা করেছেন? আপনার তো তাদের মধ্যে কাজ করা উচিত। এখন তো আপনিও একজন মুসলমান। আপনারও তো যিম্মাদারী রয়েছে?
মুহাম্মদ সালমান: একেবারে খাঁটি কথা। মাওলানা সাহেব প্রত্যেক সাক্ষাতে আমাকে শুধু এ ব্যাপারেই জোর দিয়েছেন আমি ‘আপকী আমানত, ও ‘আম্বেদকর আওর ইসলাম’ কিতাব দুটি এক এক হাজার কপি ছাপিয়েছি। আমার ধারণা, শুধু হাজার নয় আমাদের সমাজের লক্ষ লক্ষ লোক উঁচু-নিচুর অত্যাচার আর ফাঁসি থেকে রেহাই পেয়ে ইসলামে দাখেল হবে। আপনিও দুআ করুন, আমাকেও ইসলাম সম্বন্ধে কিছু পড়াশোনা করতে হবে। আমি কুরআন পড়াও শুরু করে দিয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: মুবারক হোক, মাশাআল্লাহ।
মুহাম্মদ সালমান: ব্যস, আপনি শুধু দুআ করবেন।

আহমদ আওয়াহ: সেই সানা আর বেলালের মামলা মোকাদ্দমা আর বেলালের পিতামাতার পরবর্তী কাহিনী আপনার জানা আছে?
মুহাম্মদ সালমান: জ্বী হ্যাঁ, সেটাও বেশ চমকপ্রদ ঘটনা।

আহমদ আওয়াহ: একটু বলুন!
মুহাম্মদ সালমান: পুলিশ বেলালের পিতা, ভাই, বোন জামাই আর তার মীরাঠের কামরা ভাড়াদাতা এবং সম্ভবত তার বোনকেও এক সপ্তাহ পর্যন্ত আটক করে রাখে। ভাড়াদাতা বাড়ির মালিককে তো সুপারিশের ভিত্তিতে আগেই ছেড়ে দিয়েছিল। এদিকে হযরত মাওলানাকে থানায় নিতেই চারদিক থেকে অফিসারদের ফোন আসা শুরু হয়ে যায়। এতে ঘাবড়ে গিয়ে থানাওয়ালারা সবাইকে ছেড়ে দেয়। এলাহাবাদ হাটকোর্ট থেকে এফ.আই. আরের বিবরণীর ওপর ইতোমধ্যে লিস্টেও নেয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের তেইশ তারিখে মেয়ের বক্তব্যের শুনানি ছিল। মেয়ের পিতা গোটা টিম নিয়ে এলাহাবাদ উপস্থিত হয়। তাদের চেষ্টা ছিল, আদালতের বাইরে থেকে মেয়ে নিয়ে চম্পট দিবে। ঘটনাক্রমে আগের রাতেই মেয়েটি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। বক্তব্য দেয়ার কোনো অবস্থা তার ছিল না। কিন্তু মাওলানা সাহেবের বোনের ওখানে তাকে এমন সমাদর করা হয়েছে যে, ইসলাম তার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। সে জীবন বাজী রেখে হাটকোর্ট পৌঁছে। পথিমধ্যে অজ্ঞানও হয়ে পড়ে। কোর্টে গিয়ে বক্তব্য দেয়ার পূর্বে সে তার পরিবারের লোকজনের দিকে তাকিয়েও দেখেনি। কোর্টে সে এমন বয়ান পেশ করে, আদালত পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে পড়ে। সে বলছিল, আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, শিক্ষিতও বটে। ইসলাম ধর্মকে জেনে বুঝেই মুসলমান হয়েছি। তারপর স্বেচ্ছায় নিজের পছন্দের পাত্রকে বিবাহ করেছি। আমার পরিবার অনর্থক লোকজনকে পেরেশান করছে।

মেয়ের পিতা অনেক অনুরোধ করেছিল, মেয়েটিকে মাত্র তিনদিনের জন্য আমাদের নিকট দিয়ে দিন। কিন্তু মেয়ে রাজী হল না। বলল, সেখানে গেলে আমার ঈমান আশংকার মধ্যে পড়ে যাবে। বক্তব্য শেষে শুনানি হল। সে তার পিতাকে ফোন করে বলল, ড্যাডি! আপনি নিজেই তো সব সময় ইসলামের কথা বলতেন। নিয়মিত কুরআন পড়তেন। এখন আমি মুসলমান হয়েছি আর আপনি বিরোধিতা শুরু করেছেন। এরপর সে তার পিতাকে মুসলমান হয়ে যেতে বলে এবং মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে বলে। শুনেছি তিনি মাওলানা সাহেবের মক্কা মুআযযামা থেকে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করছেন এবং মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত করতে উন্মুখ হয়ে আছেন। আমার তো মনে হয়, আল্লাহ তাআলা সানার পরিবারকে হেদায়াত দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। নইলে এ ধরনের কেইসে কোনো মেয়ের পিতা এভাবে সাক্ষাতের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে? মাওলানা সাহেব বলছিলেন, সে-ও তো আমাদের ভাই। যতোটুকু সুযোগ হয় তার সঙ্গেও আমরা কল্যাণ ও সহমর্মিতার আচরণ করবো।

আহমদ আওয়াহ: বেলালের পরিবারের অবস্থা কি আপনার জানা আছে?
মুহাম্মদ সালমান: বেলালের ভাই গওহর রাতের বেলা পুলিশকে মাওলানা সাহেবের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। সে নিজের ভুলের জন্য খুবই অনুতপ্ত হয়। শুনেছি মাওলানা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে সে দিল্লী গিয়েছিল এবং অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চেয়েছে। মেয়েটির নিজের জীবন বিপন্ন করে এভাবে বর্ণনা দেয়ায় বেলালের পরিবার অনেক প্রভাবিত হয়েছে। তারা প্রথামত তাকে ঘরেও তুলে নিয়েছে। শুনেছি, বর্তমানে তাকে আপন মেয়ের চেয়েও বেশী আদর করে। সানা তাদের বাড়িতে দ্বীনদারীর পরিবেশ গড়ে তুলেছে। সবাই নামাযে অভ্যস্ত হয়েছে এবং বেশ ভালো মুসলমানে পরিণত হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: এই সব বিস্তারিত কাহিনী আপনি কিভাবে জানলেন?
মুহাম্মদ সালমান: ইসলাম গ্রহণের পর এ ব্যাপারে আমার একটা কৌতূহল জেগে ওঠে। আমি খোঁজ নিতে শুরু করি, এই কেইসের ফলে কে কে ইসলামের কল্যাণ লাভ করেছে। মাওলানা সাহেব চারটি সাক্ষাতেই এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, সত্যিকার মুসলমান যেখানে যায় সেখানেই কল্যাণের কাজ করে। আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা ছিল, বন্ধু তো বন্ধুই শত্র“কেও তিনি কল্যাণকামিতা থেকে বাদ রাখতেন না। সত্যিকার কল্যাণকামিতা হল, মুসলমান যেখানে যাবে ইসলামের প্রসার ঘটিয়ে আসবে এবং দা‘ঈ পরিচয়ে অবস্থান করবে। যেখানে যাবে সেখানেই দাওয়াতের কল্যাণ ছড়িয়ে দিবে এর নাম হল দায়ী। মাওলানা সাহেব বলেছেন, আমরা সেই রহমতময় নবীর উম্মত। ভেতর থেকে না হলে অন্তত বাহ্যিকভাবে দাঈ হওয়ার চেষ্টা করবো। এজন্যই আমি সবখানে শুধু দাওয়াত দাওয়াত করতে থাকি। আল্লাহ তাআলা এই নি®প্রাণ ডাকাডাকির ফলে নবীর অনুকরণের সাদৃশ্যের কারণে হয়ত এর মধ্যে প্রাণ ও হাকীকতও সৃষ্টি করে দিবেন।
মাওলানা সাহেব বলেছেন, আপনি লক্ষ্য রাখুন, আমার কয়েক ঘণ্টা থানায় থাকাতে আল্লাহ তাআলা কত লোককে কুফর থেকে বের করে এনেছেন। এজন্যই আমি চারদিকে নজর রেখেছি আর খোলা চোখে ইসলামের নূর ছড়িয়ে পড়তে দেখছি।
মুহাম্মদ সালমান: শোকরিয়া, বহুত শোকরিয়া।
আহমদ আওয়াহ: আপনাকেও অনেক শোকরিয়া।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, সেপ্টেম্বর ২০০৭