মুহাম্মদ সালামান (রাম বীর সিং)-এর সাক্ষাৎকার

পুরো মানবতাই এখন সত্যের তৃষ্ণায় অধীর। মরীচিকা দেখে তারা পানি মনে করে ছুটছে। কখনও এই ধর্মে কখনও ঐ ধর্মে। কখনও এই সিস্টেম আবার কখনও ঐ সিস্টেম, কখনও জয় গুরুদেব। আবার শ্রী ডি ওয়ালার বাবা। অথচ সর্বত্রই অন্ধকার। সত্য একমাত্র ইসলাম। ইসলামই একমাত্র শান্তি ও স্বস্তির ঠিকানা। বর্তমানে এই অর্থকড়ির উত্তেজনাময় কালে সাইন্স এবং টেকনোলজির উৎকর্ষের যুগে মানুষ পূর্বের তুলনায় আরও অনেক বেশি উৎকণ্ঠিত। আল্লাহর ওয়াস্তে এই উৎকণ্ঠিত মানবতার প্রতি আপনারা একটুু দয়াপরবশ হোন। ইসলামের স্বাদ আস্বাদন করার জন্যে দুঃখী অস্থির মানবতার প্রতি সামান্য দয়ার হাত বাড়াতে আপনারা দাওয়াতী আসনে উঠে আসুন। আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মুহাম্মদ সালমান: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপনার পরিচয় বলুন।
মুহাম্মদ সালমান: হিন্দুধর্মে আমাকে রাম বীর সিং বলে ডাকা হত। কিন্তু আমি যখন ১৯৯৪ সালে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করি তখন আমি আমার নাম রাখি বীর ছোট্টো। তারপর ১৯৯৭ সালে আমি খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করি। তখন সেখানকার লোকেরা আমার নাম বদলে ব্যাপ্টাই করে দেয়। ইসলাম গ্রহণ করার পর আমার নাম রাখা হয় মুহাম্মাদ সালমান। আমরা মূলত মিরাঠের অধিবাসী, এখন অবশ্য দিল্লীতেই থাকছি। আমার বাবা খুব কম বয়সে দিল্লী চলে এসেছিলেন। তারপর দিল্লীতেই নিজের নিবাস বানিয়ে নেন। আমার জন্ম হয়েছে দিল্লীতেই। এখন আমাদের বসবাস দিল্লীর উজিরাবাদে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার লেখাপড়া সম্পর্কে কিছু বলুন ?
মুহাম্মদ সালমান: আমি ইংরেজী এবং মার্শাল আর্টে এম.এ করেছি, আমি তিন বছর পর্যন্ত দিল্লী জেলার মার্শাল আর্টে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। তাছাড়া পূর্ব দিল্লীতে আমার একটি কোচিং সেন্টার আছে, বিশেষ করে ইংলিশ স্পিকিং-এর প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কবে মুসলমান হলেন?
মুহাম্মদ সালমান: ২০০৭ সালের ৬ এপ্রিল আমি ইসলাম গ্রহণ করি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি বৌদ্ধ এবং খৃষ্টান ধর্ম কবে কিভাবে গ্রহণ করলেন? আপনাকে কেউ এসব ধর্মের প্রতি আহ্বান করেছিল কি?
মুহাম্মদ সালমান: আসলে আমার মধ্যে সত্য সন্ধানের একটা অনুসন্ধিৎসা ছিল। গোড়া থেকে এই অনুসন্ধিৎসাই আমাকে বিভিন্ন দ্বারে নিয়ে উপস্থিত করেছে। আমি আমার জীবনে স্বস্তির একটা পথ খুঁজছিলাম। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ- তিনি আমাকে কতক অলীক ধর্মের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেন। তারপর আমি দেখাদেখি নয় বরং বুঝে-শুনে ইসলাম ধর্ম বেছে নিয়েছি। ১৯৯৪ সালে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই তাদের উপাসনালয়, সেখানে তাদের একজন ধর্মগুরু থাকতো। বীর ছোট্টো। পরে তার নামেই আমার নাম রাখি। মূলত তিনিই আমাকে বৌদ্ধধর্মের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আমাকে লোভ দেখিয়েছিলেন আমি যদি তার ধর্ম গ্রহণ করি তাহলে আমাকে বাইরে কোনো দেশে পাঠিয়ে দেবেন। আমি তার কথা মেনে নেই এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করি।

আহমদ আওয়াহ: তারপর এই ধর্ম ছাড়লেন কী করে?
মুহাম্মদ সালমান: ঐ ধর্মগুরুর সাথে আমার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল বেশ ঘনিষ্ট। তার ঘরে আমার রীতিমত যাতায়াত ছিল। আমাদের সম্পর্কে কোনো লৌকিকতা ছিল না। একবার তার ফ্রিজ খুলে দেখি সেখানে শূকরের গোশত রাখা। আমি বুঝে ফেলি এর ধর্ম মিথ্যা হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। এরা মানুষকে ধর্মের কথা বলে অথচ নিজেরা শূকরের গোশত খায়। এ কথা আমি তাদের মুখের উপর বলে চলে আসি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি খ্রিষ্টান হলেন কিভাবে?
মুহাম্মদ সালমান: আমার মা নিয়মিত চার্চে আসা-যাওয়া করতেন, তার সাথে আমাকেও যেতে হতো। সেখানে পাদ্রী আমাকে খৃষ্টধর্ম বোঝাতেন। আমার সাথে তার ব্যবহার ছিল খুবই মার্জিত। মাঝে মধ্যে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। কখনও বা আমার প্রতি পরম ভালোবাসা দেখাতেন। আমি তার আচার-আচরণে প্রভাবিত হই। মূলত এই আচার-আচরণের ভেতর দিয়েই পাদ্রী আমাকে খৃষ্টান ধর্মের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আমি খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করি। তাছাড়া এই পাদ্রীও সেই বৌদ্ধ ধর্মগুরুর মতো আমাকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলতেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। আমি এদের মাধ্যমে পৃথিবীর কোনো দেশে যাবো এমন কোনো ইচ্ছা আল্লাহ তায়ালার ছিল না। তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করলেন। ধীরে-ধীরে খৃষ্টধর্মের প্রকৃত রূপ আমার সামনে ভেসে উঠলো। আমি দেখলাম হিন্দুধর্মের মতো এরাও মূর্তিপূজা করে। তারপর আমি খৃষ্টধর্ম ছেড়ে দিলাম।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হল? ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হলেন কবে?
মুহাম্মদ সালমান: আসলে আমি প্রকৃত সত্যকে খুঁজে ফিরছিলাম।
যেখানেই যাচ্ছিলাম সেখানেই কেবল অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছিলাম না। আমি চাচ্ছিলাম- আত্মিকতার সন্ধান এবং সত্যের সাক্ষাত। আমার এক হিন্দু বন্ধু একবার বাদায়ুনের এক পীর সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। সেই পীর সাহেব দিল্লীতেও আসতেন। প্রথম সাক্ষাত হয় দিল্লীতেই। তিনি আমাকে বাদায়ুন যেতে বললেন। আমি বাদায়ুনে তার দরগায় যাই। সেখানে গিয়ে দেখি মানুষ দলেদলে মুরীদ হচ্ছে। কিছু লোক আমাকেও কাপড় ধরিয়ে দিল। আমি কাপড় ধরে বসে রইলাম। তারপর তারা জানালো আপনি আমাদের হযরতের মুরীদ হয়ে গেছেন। পীর সাহেব কালেমা এবং আল্লাহ তায়ালার যিকির বলে দিলেন।
ভাই আহমদ! কালেমা এবং যিকিরের মধ্যে সত্যিই আমি এক ভিন্ন ধরনের স্বাদ অনুভব করলাম। কিন্তু পীর সাহেবের সব আচার-আচরণ আমার কাছে মনে হতো হিন্দুধর্মেরই মতো। সেখানে মূর্তি আর এখানে পীর। পার্থক্য এতটুকুই। সকলে এসে পীর সাহেবকে সিজদা করছে। মনের বিরুদ্ধে আমাকেও এই কান্ড করতে হয়েছে। তারপর বেশ কয়েকবার আমি বাদায়ুন গিয়েছি। আমার ঘরে বসে আমি যখন যিকির করতাম, বেশ শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করতাম, কিন্তু বাদায়ুনে গিয়ে যিকিরে বসলে বেশ অস্থিরতা বোধ করতাম।

আহমদ আওয়াহ: পীর সাহেব কি আপনাকে যথারীতি কালেমা পড়িয়ে মুসলমান বানিয়েছিলেন?
মুহাম্মদ সালমান: না। পীর সাহেবের দরবারে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্ম ধরে রেখেই মুরীদ হতো।

আহমদ আওয়াহ: তারপর ইসলাম গ্রহণ করলেন কীভাবে বলুন!
মুহাম্মদ সালমান: তখন আমাদের বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছিল। আমি মুজিব ভাইয়ের কাছ থেকে বেশ কিছু মালপত্র কিনেছিলাম। তিনি একবার আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। কথা প্রসঙ্গে আমি তাকে সত্য সন্ধানে যে দ্বারেদ্বারে ফিরছি সে কথা বলি। বাদায়ুনে পীর সাহেবের কাছে মুরীদ হওয়ার ঘটনাটিও তাকে শোনাই। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন- আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি কিনা? আমি বললাম- পীর সাহেব প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্মে রেখেই মুরীদ করেন। আমার কথা শুনে তিনি খুব হাসলেন। তারপর আমাকে মাওলানা কালিম সিদ্দীকির কথা বলেন। এ-ও বলেন- সত্যিকারের পীর কেমন হয় একবার মাওলানার সাথে সাক্ষাত হলেই বুঝবেন। তাছাড়া তখন আর আপনাকে দ্বারেদ্বারে ফিরতে হবে না। আমি তার সাথে ওয়াদা করি তিন দিন পর ফুলাত যাবো। কথামতো তিন দিন পর ফুলাতে রওয়ানা হই। পথে মুজিব ভাই আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন, তাছাড়া ‘আপকি আমানত’ বইটি আমার হাতে দেন। আমি বইটি পড়ি। তখন আমার কাছে মনে হচ্ছিল এতোদিন আমি যে সত্যকে খুঁজছিলাম তা আজ পেয়ে গেছি। মাগরিবের পর আমরা ফুলাত এসে পৌঁছাই। হযরত আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। মুজিব ভাইয়ের অনুরোধে হযরত আমাকে দ্বিতীয়বার কালেমা পড়ান। বিশেষ করে তাওহীদ ও শিরক সম্পর্কে হযরত আমাকে বিস্তারিত বলেন। তাঁর কথা শুনে আমি অন্তরে স্বস্তিবোধ করি। হযরত ‘আমাকে মরণে কে বাদ কিয়া হোগা’, ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়’ এবং ‘খুতবাতে মাদ্রাজ’-এর হিন্দি অনুবাদ পড়তে বলেন।

দিল্লী গিয়ে বইগুলো সংগ্রহ করি। এগুলো পড়ার পর আমার কাছে মনে হয় এতো দিন অন্ধ ছিলাম। এখন সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। আমি হযরতকে বলি বিপুল সংখ্যক মুসলমানও এখন তাওহিদ থেকে অনেক দূরে। তারা পীরপূজা করে। তাছাড়া আমার পীর সাহেব তো নিজেও মুরীদদের সিজদা করান। এদের শিরক থেকে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি হযরতকে এ-ও বলি- আমি কি আমার পীর সাহেবের জন্য চেষ্টা করতে পারি? তিনি বললেন- পীর সাহেব আপনাকে যিকির শিখিয়েছেন। আপনার প্রতি তার অবদান রয়েছে, তার কথা অবশ্যই আপনাকে ভাবা উচিত। মুজিব ভাইয়ের পরামর্শে আমি হযরতের কাছে মুরীদ হওয়ার আবেদন জানাই। হযরত বললেন- আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ। যা কিছু করবেন খুব ভেবে চিন্তে করবেন। এ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই আপনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত আপনাকে আরও ভেবে নিতে হবে। আমি পীড়াপীড়ি করতে থাকি। এ-ও বলি আল্লাহ তায়ালা আমাকে বিভিন্ন দুয়ার ঘুরিয়ে আমার মনযিলে পৌঁছে দিয়েছেন। এখন ইনশাআল্লাহ আমাকে আর কোনো দুয়ারে যেতে হবে না। আমার বারবার অনুরোধে অবশেষে তিনি আমাকে মুরীদ করেন। আলহামদুলিল্লাহ।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কি আপনি আপনার পূর্বের পীর সাহেবের সাথে দেখা করেছেন?
মুহাম্মদ সালমান: হ্যাঁ, আমি তাঁর সাথে দেখা করেছি। বিভিন্নভাবে শিরকের খারাপ দিকগুলো বুঝাবার চেষ্টা করেছি। প্রথম দিকে তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ক্ষোভের সাথে বলেছেন- এটা ধোঁকাবাজি, তুমি কোনো ওহাবীর ফাঁদে পড়েছো।
তারপরও আমি সাহস ছাড়িনি। বারবার তার সাথে সাক্ষাত করেছি। তিনিও ধীরেধীরে নরম হয়েছেন। একবার তিনি কী যেন একটা স্বপ্ন দেখলেন। এখন ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই তিনি আমাদের হযরতের কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য আসবেন। তিনি তার পুরনো পথ ছেড়ে সত্য পথে ফিরে আসতে প্রস্তুত হয়েছেন। আমি আশাবাদী, তিনি যদি ফিরে আসেন তাহলে তার অনেক মুরীদও তাওবা করে শিরক ছেড়ে এ পথে চলে আসবেন।

আহমদ আওয়াহ: এর আগে কি আপনাকে কেউ ইসলামের দাওয়াত দিয়েছে?
মুহাম্মদ সালমান: না। আমাকে কেউ ইসলামের দাওয়াত দেয় নি। তবে আমার বন্ধুদের সাথে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কথা হয়েছে। মুম্বাইয়ে এক ভদ্রলোক আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। তবে তিনি আমাকে যথাযথভাবে বুঝাতে পারেননি। তাছাড়া কিছু মুসলমানের প্রতি আমার ব্যক্তিগত দূরত্বও ছিল। বলতে পারি ঘৃণাই ছিল। কারণ, আমরা যেখানে থাকি সেখানকার মুসলমানগণ সব ধরনের মন্দ কাজের সাথে যুক্ত। ক্রাইম করা, মদপান করা তাদের জন্য খুব সাধারণ ঘটনা। এই কারণে আমি কোনো মুসলমানকে পছন্দ করতাম না। যারা আমাকে ইসলামের কথা বলতো ইসলাম ধর্মের সাথে মূলত তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি তাদের মাঝে ইসলামের কিছুই খুঁজে পেতাম না। ফলে তাদের কথা আমাকে বিন্দুমাত্রও প্রভাবিত করতে পারেনি।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামী শিক্ষা কোথায় পেয়েছেন?
মুহাম্মদ সালমান: ইসলাম সম্পর্কে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন মুজিব ভাই। যখনই আমি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি মুজিব ভাই সমাধান করে দিয়েছেন। তাছাড়া বইপত্র পড়েও অনেক কিছু শিখেছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কখনও তাবলিগ জামাতে সময় লাগিয়েছেন?
মুহাম্মদ সালমান: জি, প্রতি মাসেই তিন দিনের জন্য জামাতে যাই।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়েছিল বলবেন কি?
মুহাম্মদ সালমান: ইসলাম গ্রহণের পর আমার অনুভূতি হয়েছিল খুবই স্বস্তিদায়ক। কারণ তখন পরিপূর্ণ জীবনের একটি পথ খুঁজে পেয়েছিলাম। সমাজে কিভাবে চলতে হবে, মানুষের সাথে কিভাবে মেলামেশা করতে হবে, কিভাবে অন্যের সাথে লেনদেন করবো তার একটা পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম। ফলে আমার অন্তরে পরম শান্তি অনুভূত হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি আপনার পরিবারের লোকদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ করেছেন?
মুহাম্মদ সালমান: আলহামদুলিল্লাহ! আমার হযরত আমার অন্তর ও মস্তিষ্কে এই কথাটা ভালোভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন- মুসলমানের জীবনের লক্ষ্য এমন কি তার পেশা ও পরিচয় হবে দাওয়াত। আজ আমরা মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের কোনো ছায়া দেখতে পাচ্ছি না। এর বড় কারণ হলো- আমরা দাওয়াতের জায়গা থেকে সরে এসেছি। তিনি বলেন- তোমরা যদি দা‘য়ী হিসেবে উঠে না দাঁড়াও তাহলে লবণের খনিতে যেভাবে কিছু পড়লেই লবণ হয়ে যায়, তেমনিভাবে তোমরাও অমুসলিমদের সমাজে থেকে তাদের মতোই হবে যাবে। তোমাদের মুখে ইসলামের শ্লোগান ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
আলহামদুলিল্লাহ! আমি একজন দা‘য়ী হিসেবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। এর বরকতে আল্লাহ তায়ালা আমার স্ত্রী-সন্তানদেরকে ইসলামের মতো মহান সম্পদ দান করেছেন। আমার স্ত্রী এখন শুধু একজন মুসলমানই নয় বরং আমার দাওয়াতের সঙ্গীও। আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহের জন্যে আমার জীবন উৎসর্গীত হোক। মুজিব ভাই বিভিন্ন দাওয়াতী কাজে আমাকে পরম আস্থার সাথে বারবার পাঠিয়ে থাকেন। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা মুজিব ভাই এবং আমার হযরতের আশা কখনও ভঙ্গ করেননি।

আহমদ আওয়াহ: এ সম্পর্কে আমাদের দু’একটি ঘটনা বলুন!
মুহাম্মদ সালমান: মধ্যপ্রদেশের সৈয়দ বংশের এক কন্যা। সে এক হিন্দু ছেলের সাথে একবার দিল্লী চলে আসে। তারপর তারা কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলে। বিয়ের পর মেয়েটি হিন্দুধর্মে চলে যায় এবং ছেলেটির সঙ্গে দিল্লীতে বসবাস শুরু করে। সংবাদ পেয়ে মেয়েটির চাচা এবং মামা আমাদের হযরতের কাছে আসেন। হযরত আমাকে ফোন করেন। আমি এবং মুজিব ভাই সেখানে চলে যাই। আমরা মেয়েটির সাথে সাক্ষাত করে বলি, আমরা তোমার স্বামীর সাথে দেখা করতে চাচ্ছি, কিন্তু সে কোনভাবেই আমাদেরকে তার সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিতে প্রস্তুত নয়। তার সাফকথা, আপনারা যদি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন তাহলে সে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।

হযরত তখন আমাদের ফোন করে বলেন- যদি এই দুজনকে কালেমা পড়িয়ে পুনরায় বিয়ে দিতে পার, তাহলে পেটভরে মিষ্টি খাওয়াবো। আমরা দুজন এদের পেছনে লেগে থাকি। তারপর মেয়েটিকে না জানিয়েই ছেলেটির অফিসে চলে যাই। আলহামদুলিল্লাহ! প্রথম বৈঠকেই ছেলেটি কালেমা পড়ে নেয়। তারপর আমরা মেয়েটিকে পুনরায় তার ঈমান নবায়ন করি। জাফরাবাদে ডেকে এনে তাদের পুনরায় বিয়ে সম্পাদন করি। এখন তারা মুসলমান হিসেবে জীবন-যাপন করছে। হযরত আমাদের এই সাধনায় খুবই আনন্দিত হন। আমরা হযরতের কাছে এসে উপস্থিত হলে আমাদের মাথায় চুমু খান এবং আমাদের পেট ভরে মিষ্টি খাওয়ান।

একবার এক জজের কাছে হযরত আমাদের দাওয়াতের মিশন নিয়ে পাঠান। আলহামদুলিল্লাহ! আলোচনা-পর্যালোচনার পর সেই জজ সাহেবও ইসলাম গ্রহণ করেন। সত্যি কথা কী, আমাদের হযরত যে বলেন- হেদায়েত তো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নেমে এসেছে। আমরা যেখানে যাবো, যেখানেই চেষ্টা করবো সেখানেই হেদায়েত আমাদের হাতে ধরা দেবে। একবার ইশার নামাযের পর আমি জানতে পারলাম- একজন মুসলমান উকিল মুসলমান মেয়েকে শুদ্ধি করে এক হিন্দু ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে।

একথা শোনার পর আমার কতটা রাগ হয়েছিল ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। উকিলের ঠিকানা সংগ্রহ করে রাত সাড়ে দশটায় তার বাসায় পৌঁছি। আমি তাকে সোজাসুজি বলি, আপনি মুসলমান নন, কেননা আপনি একজন মানুষকে জাহান্নামী বানিয়ে দিয়েছেন। এখন তো আপনি নিজেও আর মুসলমান নন। আপনাকে কি মরতে হবে না? আমাকে ঠিকানা দিন এই ছেলে মেয়ে দুটি কোথায় থাকে? উকিল সাহেব বললেন, ফাইল আমার অফিসে। সকালে এসে ঠিকানা নিয়ে যেও।
আমি বললাম, রাতের মধ্যেই যদি এই ছেলে মেয়ে দুটি মারা যায়, তাহলে কী হবে? আমি তাকে চাপ দিতে থাকি। আমাকে এখনই ঠিকানা দিতে হবে। আমি রাত সাড়ে দশটাতেই তাকে ধরে অফিসে নিয়ে যাই। ঠিকানা নিয়ে রাত সাড়ে এগারটায় তাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে উপস্থিত হই। তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে বলি- রাতেই আমি আপনাদের কাছে এসেছি।
কারণ, যদি এই রাতেই আপনাদের মৃত্যু হয়, তাহলে আপনাদের অবস্থা কী হবে! এভাবে তাদের সাথে কথা চলতে থাকে। রাত একটার সময় ছেলেটি কালেমা পড়তে প্রস্তুত হয়ে যায়। ছেলেটি ছিল কম্পিউার ইঞ্জিনিয়ার। মুসলমান মেয়েটিও কালেমা ভুলে গিয়েছিল ফলে তাকেও কালেমা পড়াতে হলো। পরের দিন তাদের নতুন করে বিয়ে পড়িয়ে দিই। তারপর আমি আমার স্ত্রীকে এই মেয়েটির কাছে পাঠাতে থাকি। আমার স্ত্রী তাকে দীন শেখাতে থাকে। এখন আলহামদুলিল্লাহ মেয়েটি নামায পড়তে শুরু করেছে।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর কি আপনাকে কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে?
মুহাম্মদ সালমান: ইসলামের মতো মহান নেয়ামত পাওয়ার পর যদি সামান্য কিছু বিপদাপদের মুখে পড়তে হয়, তাহলে সমস্যা কী? আসলে মূল্যবান জিনিস অনেক মূল্য দিয়েই কিনতে হয়। রূপার মূল্য কম, স্বর্ণের মূল্য অনেক। আল্লাহ তায়ালা তার অনেক বড় নেয়ামত এই বান্দাকে খুবই সস্তায় দান করেছেন। এ পথে খুব সামান্যই বিপদের মুখোমুখি হতে হয়ছে। প্রথমে যে সমস্যায় পড়েছিলাম তা হলো আমার ইনস্টিটিউট থেকে সকল ছাত্র চলে যায়। তারা বলতে থাকে পড়ালেখা করা এই মানুষটি এমন মূর্খ হয়ে গেল! ফলে আমার উপার্জনের পথে বিরাট সংকট দেখা দেয়। কিন্তু ঐ অবস্থায় আমাকে বেশিদিন থাকতে হয়নি।

আল্লাহ তায়ালা খুব দ্রুত বিপুল সংখ্যক মুসলমান ছাত্র পাঠিয়ে দেন। যারা চলে গিয়েছিল তাদের মধ্যেও অনেকে অন্যত্র ব্যর্থ হয়ে আমার কাছে ফিরে আসে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন বয়কট করেছিল। বাড়ি বানাতে গিয়ে কিছু ঋণ করতে হয়েছিল। পাওনাদাররা যখন জানলো, আমি মুসলমান হয়ে গেছি, তখন তারা আমার সাথে কঠোর আচরণ শুরু করলো। কিন্তু এগুলো খুবই মানবিক বিষয়। একজন সাধারণ মানুষও এসব সংকটের মুখোমুখি হয়। এসব সঙ্কটকালে আল্লাহ তায়ালা আমাকে দুআর স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেন। দুআর প্রতি আমার বিশ্বাস বেড়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার দাওয়াতে আরও কেউ মুসলমান হয়েছে কি?
মুহাম্মদ সালমান: আলহামদুলিল্লাহ! সে সংখ্যা কম নয়।

আহমদ আওয়াহ: তাদের সংখ্যা কত হবে?
মুহাম্মদ সালমান: আমাদের হযরত বলেন, যারা এখনও মুসলমান হয়নি তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে হবে, তাদের সংখ্যা তো কোটিকোটি। যারা মুসলমান হয়েছে তাদের সংখ্যা এদের তুলনায় অনেক কম। আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করেছেন আমাদের প্রতি। তিনি আমাদের অন্যদের মুসলমান হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এজন্য তাঁর প্রতি অসংখ্য শুকরিয়া।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ সালমান: পুরো মানবতাই এখন সত্যের তৃষ্ণায় অধীর। মরীচিকা দেখে তারা পানি মনে করে ছুটছে। কখনও এই ধর্মে কখনও ঐ ধর্মে। কখনও এই সিস্টেম আবার কখনও ঐ সিস্টেম, কখনও জয় গুরুদেব। আবার শ্রী ডি ওয়ালার বাবা। অথচ সর্বত্রই অন্ধকার। সত্য একমাত্র ইসলাম।
ইসলামই একমাত্র শান্তি ও স্বস্তির ঠিকানা। বর্তমানে এই অর্থকড়ির উত্তেজনাময় কালে সাইন্স এবং টেকনোলজির উৎকর্ষের যুগে মানুষ পূর্বের তুলনায় আরও অনেক বেশি উৎকণ্ঠিত। আল্লাহর ওয়াস্তে এই উৎকণ্ঠিত মানবতার প্রতি আপনারা একটুু দয়াপরবশ হোন। ইসলামের স্বাদ আস্বাদন করার জন্যে দুঃখী অস্থির মানবতার প্রতি সামান্য দয়ার হাত বাড়াতে আপনারা দাওয়াতী আসনে উঠে আসুন। আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন।

আহমদ আওয়াহ: ইসলামকে জানার জন্য আপনি কী করছেন?
মুহাম্মদ সালমান: আল-হামদুলিল্লাহ! আমি নিয়মিত পড়াশোনা করছি। কুরআন শরীফ মুখস্ত করতে শুরু করেছি। আমার ইচ্ছা, আমি কুরআনের আলোকে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিব। এজন্যে কুরআন শরীফ মুখস্থ করাকে জরুরী মনে করছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অসংখ্য শুকরিয়া, জাযাকাল্লাহু খাইরান।
মুহাম্মদ সালমান: আপনাকেও অনেক অনেক শুকরিয়া।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মে-২০০৮